ধারাবাহিক উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব চর্তুথ

জীবনটা বেশ বয়ে যায়। মিতুল যখন আমার ভেতরে এসে ঠাঁই নেয়, তখন মনে করি আছি। যখন ছিটকে বেরিয়ে যায় তখন ঐ চাঁদের দূরত্বের সমান মনে হয়। তখন অবসাদের বরফ জমে। জীবনের প্রাপ্তি মিথ্যে হয়ে যায়।ঘরের মেঝেয় ইউক্যালিপটাসের ছায়া পড়েছে। চাঁদ হেলে আছে আর একটু এদিকে। গাছের ফাঁক দিয়ে আমি তার এককণা দেখতে পাচ্ছি। মনটা কেমন উদাস লাগে। মাঝে মাঝে এ ধরনের বৈষ্ণবী আনচানে ব্যাকুল হই। কি করবো বুঝে উঠতে পারি না। উঠে ঘরে আলো জ্বালাই। টেবিলে, র‌্যাকে, মেঝেতে স্তূপ করে রাখা বইয়ের দঙ্গল থেকে বালজাকের জীবনীটা টেনে বের করি। বালজাকেরের কথা মনে পড়লে আমার কেবল দুটো কথা মনে হয়। এক, তিনি প্রতিদিন আঠারো ঘণ্টা লিখতেন। দুই, তিনি কোনাে কুমারী মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেননি। তাঁর চাইতে বয়সে বড় তিনজন বিবাহিত সন্তানের জননীর সঙ্গে তার প্রেম ছিলাে জমজমাট। শেষে একজনকে তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে বিয়ে করেছিলেন। তখন তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে গেছে, দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। ফলে বউ-র কাছ থেকে পেয়েছেন অবজ্ঞা, অবহেলা আর ঘৃণা। কত বিচিত্র নেশা তার, কত বিচিত্র খেয়াল। দেনায় জজরিত ব্যক্তিটি ছিলো সমকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ। মনে হয় বালজাকের পুরাে জীবনটাই এক উপন্যাস। পড়তে পড়তে সময়ের কথা আমার খেয়াল থাকে না। রাতের হিসেব ভুলে যাই। এতদিন বইটা পড়িনি বলে আমার আফসােস হলাে। এ আমার এক অভ্যাস। কিনে ফেলে রাখি। তারপর দু’চারমাস পরে সে বইয়ের কথা মনে হয়। তখন সারারাত পার করে সেই সে বইয়ের পেছনে। বইটা শেষ হয়ে যাবার পর চোখটা বুঁজেছি এমন সময় দরজায় টুক টুক শব্দ হলাে। বুকটা ধক করে উঠলাে। মিতুল এলে দরজায় এ ধরনের শব্দ হয়। মৃদু অথচ সঙ্গীতমুখর। আমি লাফ দিয়ে উঠে দরজা খুলে দেই। মিতুল তুমি? এত ভােরে?মিতুল কথা না বলে ঘরে ঢােকে। বাতিটা বন্ধ করে দেয়। তখনাে ভালাে করে ভোর হয়নি। ফ্যাকাশে আলাে ছড়ানাে। ইউক্যালিপটাস গাছের জন্যে আমার ঘরে আঁধার আঁধার ভাব। মিতুল সােজাসুজি আমার চোখের দিকে তাকালাে। কাল রাতে আমি একটুও ঘুমােইনি জামী। আমি ওকে হাত ধরে এনে বিছানায় বসালাম। ওর ঘুমহীন চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে। ক্লান্তির বদলে উত্তেজিত হয়ে মিতুল আমার হাত চেপে ধরলাে। জামী, তুমি না বলেছিলে আমার মাকেখুঁজবে?হ্যাঁ, খুঁজবাে তাে।কিন্তু কেমন করে? আমরা তাে কেউ তাকে চিনি না? একথা আমি কাল সারারাত ধরে ভেবেছি জামী। তুমি যখন ঘরে ফিরছে, তখনাে আমি জেগেই ছিলাম। ইচ্ছে করে বাতি বন্ধ করে রেখেছিলাম। মিতুল তুমি একটু ঘুমােবে? না জামী, ওকথা বলাে না। চলাে, আমরা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। ঘুরে ঘুরে খুঁজে দেখি কোথায় মাকে পাওয়া যাবে। মা কিসের তাড়নায় বাবা থেকে দূরে চলে গেলাে। আচ্ছা জামী, মা যখন চলে যায়, আমার কথা তার কি একবারও মনে হয়নি? নিশ্চয় হয়েছে, তবে তােমার আকর্ষণ তাঁর কাছে কম ছিলাে মিতুল, তুমি তাঁকে তেমন করে টানতে পারােনি। ঠিক বলেছাে। আমি কি বােকা! সহজ সত্যটা বুঝতে চাই না। না, ঠিক তা নয়। বুঝতেই পারি না। মিতুল আর কোনাে কথা না বলে আমার বিছানায় শুয়ে পড়ে। আমি বাথরুমে যাই। মুখ হাত ধুয়ে নিয়ে ঘরটাকে গােছগাছ করার চেষ্টা করি। আড়চোখে মিতুলকে দেখি। বুঝতে পারি, ও ঘুমােচ্ছে না। শুয়ে শুয়ে পায়ের পাতা নাচাচ্ছে। যদিও ডান হাত দিয়ে চোখ ঢাকা। আমাকে কাজ করতে দেখে একটু পরে উঠে আসে। তুমি বড় নােংরা থাকো জামী? সরাে, আমি ঠিক করে দেই।আমি ওর তিরস্কার নীরবে হজম করে সরে আসি। মিতুল কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘরটা গুছিয়ে ছিমছাম করে ফেলে। স্টোভ জ্বালিয়ে চা বানায়। ঠাণ্ডা পানিতে হাতমুখ ধুয়ে নেবার পর ওকে বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। ও টিন থেকে বিস্কুট বের করে আমাকে টেবিলে দেয়। তারপর দু পেয়ালা চা নিয়ে আসে। এই তাে লক্ষ্মী মেয়ের মতাে দেখাচ্ছে তােমাকে!বুঝেছি। মিতুল হাসে।কি? কি বুঝেছো?প্রশংসা করার পেছনে তােমার একটা মতলব আছে।আমি হাে হাে করে হেসে উঠি।নাও, চা খাও। না। তবে?মতলবের কথা বলো? একদম সােজা। আগে একটা চুমু খেতে চাই।মিতুল চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে। আমি ওকে টেনে সামনে নিয়ে আসি। মিতুলের চোখের শান্ত আকাশে ঝড়। সে দৃষ্টি আমাকে বাউরা করে। ভােরের আঁধার ভাব কেটে গেছে। ইউক্যালিপটাসের গাছে এখনাে আলাে। রােদ নেই। মিতুল আমার বুকে। চা জুড়িয়ে ঠাণ্ডা। সেই চা আমাদের কারাে আর খাওয়া হয় না। মিতুলের লম্বা বেণী আমি খুলে দিয়েছি। ও হাতে জড়িয়ে একটা এলাে খোঁপা বেঁধে রােদ ওঠার আগেই চলে যায়। আমি আরামে চোখ বুজে শুয়ে থাকি। আমার মনে হয় আমার কোনাে কিছু করার নেই। কোনাে কাজ নেই। পড়া নেই। লেখালেখি নেই। আমি অনন্তকাল ধরে এমন চোখ বুজে শুয়ে থাকতে পারি। মিতুলের সান্নিধ্যে বড় দ্রুত সব দুঃখের কথা ভুলে যাই। ভুলে যাই মা- র কথা, বাবার কথা, একলা জীবনের অসীম শূন্যতার কথা। নিঃসঙ্গতা আমার স্নায়ুর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। নিঃসঙ্গতা আমাকে বড় কষ্ট দেয়। বিশেষ করে দুপুরবেলা। তখন অকারণ শূন্যতায় বুকটা ফেটে যেতে চায়। লিখতে ইচ্ছে করে না। পড়তে ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে ঐ অবস্থায় ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। এলােমেলাে হাঁটি। রিকশা নিয়ে ঘুরি। এ রাস্তা ও রাস্তা। তারপর কোনাে রেস্তোরায় বসে চা খাই। কখনাে হাসপাতালে রেজার কাছে যাই। রেজা আমার বন্ধু। ডাক্তার ওষুধের গন্ধে আমার নেশা ধরে। হাসপাতালে আমার বেশ লাগে। প্রতিটি রােগীর দৃষ্টিতে আমি জীবনের এক ভিন্নতর অর্থ পাই। প্রত্যেকের দৃষ্টি আলাদা। কেউ মৃত্যুর সঙ্গে তীব্রভাবে বোঝে। কেউ হতাশ হয়ে যায়। বিষন্ন কাতর। তবে সবার একটা আলাদা চাউনি থাকে। ঐ চাউনিটুকু আমার ভালাে লাগে। আমি অনেক সময় ওদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলি। রেজা মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করে। তাের মতাে লােক আমি একটাও দেখিনি জামেরী! লােকে হাসপাতালের নাম শুনলে নাকে কাপড় দেয়। আর তুই নাক লাগিয়ে এর গন্ধ নিস। ওষুধের গন্ধ আর রােগীর ঐ নিস্পৃহ নিরাসক্ত দৃষ্টি আমার ভালাে লাগে রেজা। পাগল ! রেজা হাসতে থাকে। নিশ্চয় কোনাে নার্সকে তাের মনে ধরেছে। বল কাকে? ফ্রি থাকলে আমি সব ব্যবস্থা করে দেবাে। আমি ওর কথার উত্তর না দিয়ে হাসি। তখন এ্যাম্বুলেন্সের নীল আলাে আর তির্যক ভেঁপুটা আমার মাথায় এক নিরাসক্ত বােধের জন্ম দেয়। আমি সেই নীল আলাের ছায়ায় ভেঁপুর শব্দ বুকে নিয়ে হাঁটতে থাকি। জানি না কেন ঐ শব্দ আমাকে এত টানে। রায়হান এ্যাম্বুলেন্সের ভেঁপুর শব্দ সহ্য করতে পারে না। ও বলে মনে হয় মৃত্যু যেন আমার দিকে দাঁত খিচিয়ে ছুটে আসছে। অথচ ঐ ভেঁপুর শব্দটা আমার প্রিয় সঙ্গীত। ঘরে থাকলে এ শব্দে আমি সবসময় জানালায় এসে দাড়াই। দেখি নীল আলােটা কেমন জ্বলছে আর নিভছে। শব্দ মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আমি দাঁড়িয়েই থাকি। নড়তে ইচ্ছে করে না। একদিন গভীর রাতে সে শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিলাে। জানালার ধারে আসতে না আসতে ঐ শব্দটা মিলিয়ে গিয়েছিলাে। তারপর সারারাত আমি জানালায় বসে কাটিয়ে দিয়েছিলাম।

Series Navigation<< ধারাবাহিক উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব তৃতীয়ধারাবাহিক উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব পাঁচ >>

Leave a Reply

Your email address will not be published.