উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব পঁচিশ

কি?

ওসব কথা রাখ। কৃত্রিম শ্বাস দিয়ে একজন মানুষকে কত বছর বাচিয়ে রাখা যায়? সেটা বলা শক্ত। কেউ তা বলতেও পারবে না। এ ব্যবস্থা অনির্দিষ্টকালের জন্যে চলতে পারে। আমি চুপ করে থাকি। বুঝতে পারি আমার চারদিকে বাতাস ভারি হয়ে এসেছে। কোথাও কোনাে সুবাতাস নেই। আমি যদি পারতাম পারমাণবিক মহাশূন্য যানযােগে আন্তঃগ্রহ ভ্রমণে চলে যেতে? আইনস্টাইনের মতে, “ভ্রাম্যমাণ ঘড়ি স্থিতিশীল ঘড়ির চেয়ে ধীরে চলে। ঘড়ির যন্ত্রপাতির সঙ্গে এই গতির কোনাে সম্পর্ক নেই। এই তত্ত্ব পরীক্ষায় সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। পারমাণবিক মহাশূন্যযানযােগে আন্তঃগ্রহ ভ্রমণের সমস্যার সমাধান হলে কেউ যদি সেই মহাশূন্যযানের ঘড়ির সময়ের হিসেব এক মাসের কোনাে সফর থেকে ফিরে আসেন, তাহলে তিনি দেখতে পারেন, তাঁর ফেলে যাওয়া শিশুপুত্রটির বয়স পিতার চেয়ে বিশ বছর বেশি হয়ে গেছে।” আমার জীবনে এমনটি ঘটলে আমি ফিরে এসে ঠিক দেখবাে, মিতুল আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। ওর ভিজে চুল থেকে টপ টপ করে পানি ঝরছে। সারামুখে ভােরের শিউলির স্নিগ্ধতা। দৃষ্টিতে যেন রাতের শিশির।

কি ভাবছিস?

ভাবছি, পারমাণবিক মহাশূন্যযানে যদি আন্তঃগ্রহ ভ্ৰমণে যাই, তবে কেমন হয়?

সেই যানটি কোথায় পাচ্ছিস? না! তাে নিয়ে পারা যাবে না। তুই কি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাবি নাকি? ‘শালা, তাের লেখক’ হওয়াই ভুল হয়েছে।

তাইতাে ভাবছি রেজা, লেখক না হয়ে যদি পারমাণবিক মহাশূন্যযান তৈরির চেষ্টা করতাম, তাহলে জীবনটা এত জটিল হতাে না।

জীবনের তত্ত্ব এত সহজ নাকি জামেরী? আইনস্টাইনের মতাে বিজ্ঞানীর ভালােবাসাও কিন্তু ধােপে টেকেনি। তবুও তিনি তাঁর মানসিক যন্ত্রণা অতিক্রম করেছিলেন।

এসব কথা বােঝাতে আসিস না।

আমি রেগে উঠি। রেজা চুপ করে যায়। আমার দিকে সিগারেটের প্যাকেটটা ঠেলে দেয়।

আর এক কাপ চা আনতে বল।

সিগারেটের টানে মাথাটা একটু হালকা হয়। বেয়ারা চা নিয়ে আসে। মিতুলের অসুখের ব্যাপারটা কিছুতেই আমার মাথায় ঢােকে না, রেজা।

মিতুলের ব্রেন ডেথ হয়েছে জামেরী। অথচ কোনাে অবস্থাতেই তাকে মৃত বলা যাবে না। ডাক্তারদের ধারণা, তার মস্তিষ্কের চারটি এলাকার যে-কোনা একটি অকেজো হয়ে গেছে। অথবা চারটিই। মস্তিষ্কের এ চারটি এলাকা আমাদের সচেতনতা, স্মৃতি, যুক্তি, স্পর্শ, কষ্ট, উত্তাপ, হিম প্রভৃতি অনুভূতি সমগ্ন শরীরে পরাহিত করে। সবচেয়ে বড় কথা কি জামেরী, প্লাস সেল একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা আর কখনাে সুস্থ হয় না।

বিশ্বাস করি না।

আমি টেবিলে ঘুষি মেরে চিৎকার করে উঠ।

রেজা শান্ত গঞ্জীর গলায় বলে, তুই আবেগ দিয়ে অবিশ্বাস করতে পারিস কিন্তু যুক্তি দিয়ে নয়।

উঃ রেজা, চুপ কর।

তাের জানা উচিত, বর্তমান মানুষের জানা আছে এমন কোনাে চিকিৎসা দিয়ে মিতুলের মস্তিষক সুস্থ করা সম্ভব নয়। বিদেশে পাঠিয়েও কিছু হবে না।

শালা তুই থামবি কিনা?

রেজাকে মারতে উঠে আমি নিজেই লজ্জিত হয়ে যাই। রেজা আমার হাতটা চেপে ধরে। মৃদু হাসে। আমার চোখে পানি আসে। চোখটা মুছে ফেলি। রেজা, আমি যদি পারতাম আমার জীবনের পরিবর্তে মিতুলকে বাঁচাতে। তাহলে কি হতাে? মিতুলও এমনি করে মরতে চাইতাে। তাের কষ্টটা আমি বুঝি জামেরী কিন্তু কিছু তাে করার নেই। চল, বাগানে গিয়ে বসি।

শেষ বিকেলের আলােয় রেজা আমাকে বাগানে নিয়ে আসে। হাসপাতালের ওষুধের গন্ধ এখন আর আমাকে তেমন আকর্ষণ করে না। বমি আসতে চায়। গা গুলিয়ে ওঠে। বাগানেও কোনাে স্বপ্তি নেই আমার জন্যে। মনে পড়ে, রায়হানের সেই জরুরি ওষুধটা আর কেনা হয়নি। কতদিন হলাে ওকে আর আমি ওধুধ খাওয়াই না। ও নিজে নিজেই খায়।

তাের উপন্যাসটা কি শেষ হয়েছে জামেরী?

না।

এবার সেটা শেষ করে ফেল?

লিখতে ইচ্ছে করে না।

তাের না ভারি আত্মবিশ্বাস ছিলাে?

তুই তাে বুঝতে পারছিস না ধাককাটা কত ভয়ানক। আচ্ছা, চলি রে রেজা।

হঠাৎ করেই রেজার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি। গেটের সামনে রিকশার জন্যে দাঁড়াতেই একটা পরিচিত মানুষ সামনে এলাে। মিতুলের মা। আমার

শরীরটা শিরশির করে উঠলাে। ভদ্রমহিলা নিজেই কথা বললেন।

আপনি এখানে?

এমনি দাঁড়িয়ে আছি। আপনি?

আমার বড় ছেলেটা অসুস্থ।

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলাে যে, মিতুলও অসুস্থ।

জানি। আমি ওকে দেখেছি। আচ্ছা, আসি।

ভদ্রমহিলা চলে গেলেন। নাকি আমার সামনে থেকে পালালেন? গলাটা একটু ভার মনে হলাে। আহ, উনি যদি ওদিন মিতুলকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন? মেয়ের

কাছে নিজেকে সমর্পণ করে দিলেই বা কি ক্ষতি হতাে? এখন গলা ভার হয়ে আসে,

চোখের কোনা ভিজে যায়।

আমি নিজেকে আর কষ্ট না দিয়ে তখুনি তাকে মন থেকে তাড়ালাম। নিউমার্কেটে নেমে বইয়ের দোকানে ঢুকলাম। কিন্তু কোথাও মন বসাতে পারলাম না।

ঘুরে-ফিরে মনে হতে লাগলাে, মিতুলের এ অবস্থার জন্যে ওর মা-ই দায়ী। দূর, আমি কি যা-তা ভাবছি! আসলে এ ধরনের সংকটের মূল আরাে অনেক গভীরে

নিহিত। ব্যক্তিবিশেষকে দোষারােপ করে লাভ নেই। তবে তিনি বেশ যুক্তিবাদী মহিলা, তাতে সন্দেহ নেই। মিতুলকে তাঁর জীবন থেকে অনায়াসে ছেঁটে ফেলে

দিয়ে স্ব্গীয় সুখ সন্ধানে ব্যস্ত। বেশ, আপনি সুখেই থাকুন। হে কৃতী মহিলা, আপনার সুখ অক্ষয় হােক। মিতুল কোানােদিন আর আপনাকে বিরক্ত করতে যাবে

না। আবার আমি নিজের ওপর রিবক্ত হয়ে উঠি। কি ভূতে যে আমাকে পেয়েছে! যা আমি সচেতনভাবে তাড়াতে চাচ্ছি, সেটাই আমাকে পেয়ে বসেছে।

স্যার আপনার কি হয়েছে?

দোকানের ছেলেটি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালাে।

কৈ, কিছু না।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসি। এ দোকানে আমার নিয়মিত যাতায়াত। ও আমাকে ভালাে করে চেনে।

আজ কিছু বই নেবেন না?

না, ভালাে লাগছে না।

ও কি বুঝলাে কে জানে। বললাে, স্যার বাকিতে নিয়ে যান।

না রে আজ থাক। আর একদিন আসবাে।

দোকান থেকে বেরিয়ে অহেতুক সারা নিউমার্কেট চক্কর দিলাম। আলাে ঝলমল দোকানে সুবেশ নরনারীর ভিড়। সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। আমি কি কিনবাে? না, আমার কিছু কেনার নেই। কোনাে কিছুতেই আমার কোনাে প্রয়ােজন নেই বলেই মনে হচ্ছে। অনেক শখ করে মিতুলের জন্যে বেনারসি কিনেছিলাম, কসমেটিক্স

কিনেছিলাম। ধুত, আমি এসব ভাবতে চাই না। আমি এক কোনায় দাড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে লােক চলাচল দেখি। দেখতে দেখতে আমার মনটা বদলে যায়। আমি নিজের মধ্যে তারুণ্যের শক্তি অনুভব করি। ঘরে যখন ফিরলাম তখন প্রায় রাত দশটা। রায়হান আজ জেগে বসে আছে।

চেহারায় আতঙ্ক। অবাক হলাম। ঘরের মেঝে সিগারেটের টুকরােয় নোংরা। আমাকে দেখে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলাে, তুই সারাদিন কোথায় থাকিস জামেরী?

কেন? কি ব্যাপার বল তাে? তাের খারাপ লাগে?

আজ কারা যেন এসেছিলাে।

কারা?

তাতাে জানি না। দরজায় কড়া নাড়ছিলাে। কথা বলছিলাে। মনে হলাে অনেক

লােক এসেছিলাে।

অনেক লােক কেন আসবে? সব তার মনের ভুল।

হতে পারে না। আমি ঠিক তনেছি।

আচ্ছা এখন ঘুমাে তাে। আবার এলে না হয় দেখা যাবে।

আমার ওষুধ ফুরিয়ে গেছে।

তাই নাকি আগে বলিসনি কেন?

আজই ফুরালাে।

ঠিক আছে কাল নিয়ে আসবাে।

তুই আমাকে এমন করে আটকে রেখে যাস যে, আমার ভয় করে।

তাহলে চল তােকে তাের বােনের বাসায় রেখে আসি?

না, আমি ওখানে যাবাে না। কাল থেকে তুই আমাকে আটকে রাখিস না,

কেমন? আমি ভেতর থেকে দরজা আটকে শুয়ে থাকবাে। তাের ঘর খােলা রেখে

কোথাও যাবাে না।

আচ্ছা।

ছন্দার সঙ্গে তাের দেখা হয় জামেরী?

নাতাে?

ছন্দাকে দেখতে আমার বড্ ইচ্ছে করে। একদিন ছন্দাদের বাসায় যাবাে। তুই

কি বলিস?

ছন্দা যদি তাের সামনে না আসে? যদি পুলিশে খবর দেয়?

ধুত্ ছাই কিছু ভালাে লাগে না। যাই ঘুমােই।

রায়হান সােজা বিছানায় গিয়ে তুয়ে পড়ে। কথাটা হয়তাে ওর মনে লেগেছে। আমার বলা উচিত হয়নি। আবার ভাবলাম ভালােই হয়েছে। ছন্দা সম্পর্ক্ক ওর মােহটা আন্তে আন্তে কেটে যাওয়া দরকার। রায়হান ভালাে হয়ে উঠক, ওর সেই ঝকঝকে জীবনযাপনে ফিরে যাক, এটাই এখন আমার একমাত্র কামনা। একটু একটু শীত পড়া শুরু হয়েছে। সূর্য ওঠার আগে নীল কুয়াশায় ঘাসের শরীর ডুবে ডাকে। জানালায় দাঁড়িয়ে শিশির-তরা ইউক্যালিপটাসের পাতা দেখি।

দূরের গাছের হলুদ পাতার নিঃশব্দ করে যাওয়া মনে দাগ কেটে যায়।ঘুম আসতে চায় না। কে এলাে আমার খোঁজে? নাকি রায়হানের ভুল। ইদানিং ও তাে বেশ সুস্থ হয়েছে। এতটা ভুল আর করে না। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে উঠে হাসপাতালে যাই। মিতুলের নির্মীলিত চোখের পাতায় জীবন খুঁজি। আমার জনে্য অমৃতভরা ঠোটজোড়া কালচে, শুকনাে। কোনাে আবেদনে আর সাড়া দেবে না। মিতুল তুই কি পাষাণ। একবার চোখ খােল। আমি জামী রে। তাের ঐ ডাকটুকু শােনার জন্যে বুকটা ফেটে যেতে চায় । তাের যে শরীরটা আমার জন্যে ছিলো শ্যামল দেশ, তার বিবর্ণ হতশ্রী অবস্থা আমি আর সইতে পারি না। আমি এখন কোথায় যাবাে তুই বল? আমার যে কোথাও যাবার জায়গা নেই।

দুপুরে রায়হানের জনযে একগাদা ওষুধ কিনে বাড়ি ফিরি। হঠাৎ করে আজ ওর জরুরি ওষুধটা পেয়ে যাই। মনটা খুশি হয়ে ওঠে। এই ওষুধটা আগে পেলে ওুর আরাে উপকার হতাে। সন্ধ্যায় ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। গত তারিখে যাওয়া হয়নি। নিজেকে বকলাম। ওর প্রতি আমি অমনােযােগী হয়ে গেছি। খুব অন্যায় করছি। অথচ সামানা অবহেলার কারণে বড় কিছু হয়ে যেতে পারে। মিতুলের প্রতি আমি সেই অবহেলাটা করেছি। বুকটা কালাে বেদনার বিড়াল ছানা হয়ে গেলাে। এখন অবােধ মিউ মিউ ডাক ছাড়া আর কিছু করার নেই। আরে ঢুকতেই রায়হান আমার হাত চেপে ধরে।

জামেরী, আজ আবার ওরা এসেছিলাে। আমার নাম ধরে ডেকেছিলাে। আমি একটুও তুল শুনিনি। ওরা বলছিলাে, রায়হান সাহেব এখানে থাকেন নাকি?

তুই কি বললি?

আমি কিছু বলিনি। চুপ করে ছিলাম।

ঠিক আছে। দেখি কি হয়। দরকার থাকলে ওরা আবার নিশ্চয় আসবে।

দরজাটা বন্ধ করে দে।

না, খােলাই থাক।

রায়হানের হাতে ওধুধতলাে দিলাম। ও খাটে বসে প্যাকেট খুলতে লাগলো। আমি স্টোভ জবালিয়ে ভাত বসালাম। খিদেয় পেট চো চৌ করছে। বাথরুমে ঢুকতে যাবাে ঠিক তখুনি খাকি পােশাক-পরা লােকগুলাে এলাে। সদয়ে ঘরে ঢুকে দাড়ালাে। আমার বুকে শিরশিরে কাপুনি। রায়হান বাথরুমের দিকে ছুটে যেতে চাইলে ওরা পথ আটকালাে। তয়ে, আতঙ্কে রায়হানের মুখ দিয়ে কোনাে কথা বেরুদ্ছে না। চোখে অস্বাতাবিক দীপ্তি। একজন রায়হানের হাতটা মুচড়ে ধরেছে। আমি সামনে এগিয়ে এলাম।

আপনি একজন খুনের আসামীকে দিনের পর দিন আপনার ঘরে লুকিয়ে রেখেছিলেন?

ও অসুস্থ। সিজোফ্রেনিয়ার রােগী।

সব ভান।

এই দেখুন ওষুধ, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন।

ঐ সব আমরা বুঝি। আপনি একজন লেখক?

হ্যাঁ।

আমরা এইরকম রিপাের্টই পেয়েছি।

রিপাের্ট।

হ্যাঁ, খুনী আপনার সঙ্গে থাকে। খুনীর সঙ্গে আপনাকে দেখা গেছে। আপনি ওকে প্রতিদিন তালা বন্ধ করে বেরিয়ে যান। বিদ্যুৎ ঝলকের মতাে আমার সাইকির মুখটা মনে পড়লাে। একদিন রাস্তায় দেখা হয়েছিলাে। হঠাৎ করে আমি মনে জোর ফিরে পেলাম।

ওর বিচার ও নিজেই করেছে। ও এখন পাগল। সেটাই বড় কথা নয়। দেশের আইন আছে। খুনীর বিচার দেশের আইন করবে। আপনি তাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন?

লুকিয়ে রাখিনি। ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলাম।

ওকে থানায় দেননি কেন? আপনি তাে সব ঘটনা জানেন।

একজন অসুস্থ লােককে কি করে থানায় দিয়ে আসবাে?

আইনের যুক্তিতে একথা টিকবে না। কাজটা আপনি ভালাে করেননি।

আমি তাে কোনাে অন্যায় করিনি।

নিজে নিজে যুক্তি খাড়া করলে ও রকম অনেক কিছুই ন্যায় মনে হয়। আমরা চলি। ওরা রায়হানকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলাে। ও চিৎকার করলো, জামেরী আমি যাবাে না। আমি যাবাে না। আমি তাের কাছে থাকবাে।

আমি সমস্ত পারিপাশ্বিক ভুলে গেলাম। খাটের ওপর ধপ করে বসে পড়লাম।

রায়হানের জরুরি ওষুধটা পড়ে রইলো হাতের কাছে। সাইকি রিপাের্ট করেছে।

আমার সম্পর্কে ওর কাছে অনেক গল্প করতাে রায়হান। মনে পড়ছে রায়হান ওর কাছে আমাকে লেখক বলেই পরিচয় করিয়েছিলাে। সাইকি তােমার অবিশ্বাসী ঘৃণায় আমার স্বচ্ছন্দ অবগাহন। আমি কিছুতেই ডুবে যাবাে না সাইকি। সাইকির বড় বড় চোখের পাতায় ছবির মতাে লেখা, ‘হে বুলবুল, চলাে এবার, চলে যাচ্ছে বসন্তর দিন।’

বড় বড় গোঁফঅলা লােকটা চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছিলাে। মাটিতে পা ঠুকছিলাে। হিংস্ বাঘের মতাে আমার কলজেটা টেনে বের করার জন্যে উসখুস করছিলাে। তেমন একটা দৃষ্টি আমি সব সময় অনুভব করেছি। কাজটা আমি ডালাে করিনি। বুকটা দপ করে জ্বলে উঠলাে। আমি মনে করি আমার ভালাে-মন্দ বােধ

অন্য দশজনের চাইতে আলাদা। উত্তোজিত হয়ে উঠলাম। যা ভালাে বুকেছি, তা করেছি। কারাে কাছে জবাবদিহি করতে পারবাে না। উঃ বলে কিনা নিজে নিজে যুক্তি খাড়া করলে? রায়হানের মতাে হাতটা আমার নিসপিসিয়ে উঠলাে। পরক্ষণে মনটা ফাঁকা হয়ে গেলাে। রায়হান শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার কাছে থাকতে

চেয়েছিলাে। আমি রাখতে পারিনি। রায়হানকে ধরে রাখার ক্ষমতা আমার ছিলো না।

মিতুল? মিতুলও তাে আমার কাছেই থাকতে চেয়েছিলাে। কৈ রাখতে তা পারলাম না। কাউকে ধরে রাখার আমার কোনাে ক্ষমতা নেই। দু’হাতে মাথাটা চেপে ধরলাম। কপালের শিরা দপদপ করছে। মনে হচ্ছে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, বিরান জনপদ। খাঁ খাঁ জনমানবহীন আমি একা একা পথ হাতড়ে চলি।

জানালার পাশে দোয়েলটি কিচমিচিয়ে ওঠে। চমৎকার ভঙ্গিতে নাচানাচি করে। ইউক্যালিপটাসের পাতার ফাঁকে গনগনে দুপুর। গ্যালিলিওর আকাশ আমার আলাের উৎস। ছায়াপথ দিগদর্শনের মতাে কাজ করে। তবু মাঝে মাঝে দিকস্বন্ত হই। স্টোভের ওপর টগবগিয়ে ভাত ফুটছে। ভাত ফোটা দেখি আর দোয়েলের গান শুনি। ইউক্যালিপটাসের হলুদ পাতার ঝরা দেখি। দেখতে দেখতে নিজস্ব শক্তিতে ফিরে আসি। বিশ্বাস মৌল শর্ত হয়ে কাজ করে। অনেকদিন উপন্যাসটা লেখা হয়নি। কতদিন? জানি না। দিনক্ষণের হিসেব ভুলে যাই। তবে উপন্যাসের শেষ অধ্যায় লেখার সময় হয়েছে। রায়হান নেই, মিতুল নেই। আমি একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে পৌঁছেছি। আর কি। এবার আমার ঝটপট লিখে ফেলার পালা। নইলে মেঘে মেঘে দিন ফুরিয়ে যাবে।

ডিম ভেজে গরম ভাত খেলাম। খাকি পােশাক-পরা লােকগুলাে এখন আর আমার মাথায় নেই। লিখতে বসে নিজের বিশ্বাসটা ফিরে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, আমার ভেতরে অফুরস্ত শক্তি। প্রচণ্ড গতিতে কাজ করতে পারবাে। একটানা কুড়ি পৃষ্ঠা লিখলাম। অবিশ্বাস্য মনে হলাে। কোনােদিন একসঙ্গে আমি কুড়ি পৃষ্ঠা লিখতে

পারিনি। সন্ধ্যার দিকে যখন লেখা থামালাম, টের পেলাম। মেরুদণ্ড টনটন করছে। হাতের আঙুল বাঁকা হয়ে আসছে। ফ্লাঙ্ক থেকে চা ঢাললাম। চুমুক দেবার আগে শুনলাম দরজায় টুকটুক শব্দ। খুব আন্তে। কেউ যেন দীনভঙ্গিতে আমার দরজায় আবেদন জানাচ্ছে।

দরজা খুলতেই দেখলাম, মিতুলের বাবা। অদ্রলােক বেশ বুড়িয়ে গেছেন। মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। আমার দিকে তাকিয়ে জোর করে হাসলেন।

কেমন আছে বাবা?

ভালাে। বসুন।

মিতুলের বাবা টেবিলের ধারে চেয়ারে বসলেন। আমি চা দিলাম। তিনি যেন অন্য কিছু ভাবছেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। চায়ের পেয়ালা সামনে দিতে আপত্তি করলেন।

Series Navigation<< উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব চব্বিশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *