উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব তেইশ

পরদিন সকাল থেকে পুরাে বাড়ির চুনকাম শুরু হলোে। মিতুলের বাবাই কাজটা করাচ্ছেন। বিয়ে উপলক্ষে কিছু কিছু আত্মীয়-স্বজনও এসেছে ওদের বাসায়।
কেনাকাটা, কার্ড ছাপানাে ইত্যাদি নানা কারণে মিন্টু ঘন ঘন আসা-যাওয়া করে।
বঝি সব আয়ােজনই আমার বিয়ের, তবু ভালাে লাগে না। মেজাজ খারাপ থাকে।
সেই রাগের পর থেকে মিতুলের সঙ্গে দেখা নেই। লজ্জায় ওদের বাসায়েও যেতে পারি না।
ঝরনাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, তােমার আপু কি করে?
শুয়ে আছে।
এই অসময়ে শুয়ে আছে?
কি জানি, আপুর যেন কি হয়েছে, সব সময় শুয়ে থাকে। মা কত বকাবকি করে, তবুও ওঠে না। কোনাে কোনাে সময় আমি ভাত খাইয়ে দেই। আপুকে আমি
খুব ভালােবাসি কিনা।
অসুখ করেনি তাে?
না বােধহয়। বাবা তাে জিজ্ঞেস করে শরীর খারাপ কি না? তখন বলে, না,
এমনি শুয়ে আছি।
তুমি একদিন বিছানায় পানি ঢেলে দিতে পারাে না?
যাঃ তা কি হয়!
ঝরনা আমার পিঠে দুমদাম কিল বসায়।
আপনি ভারি হিংসুটে। দেখবেন বিয়ে হলে আবার আপুকে যেন না খাইয়ে রাখবেন না।
তােমার বুঝি তাই মনে হয়?
হয়ই তাে। নইলে কেউ পানি ঢালার কথা বলে?
ঝরনা চলে গেলাে। তবু আমার মেজাজ খারাপ হয়ে রইলাে। সেদিন অহেতুক মিতুলের ওপর রাগ করেছি। রাগ করার কোনাে সঙগত কারণ ছিলাে না। না, ভুল
আসলে আমারই ছিলাে। আমি ভেবেছিলাম মিতুল ওর মাকে দেখে আবেগে বিহবল হয়ে যাবে, জড়িয়ে ধরবে, কাঁদবে। দীর্ঘদিনের জমানাে কষ্টটা দূর হবে। কিন্তু হলাে
তার উল্টো। মিতুল ওর কষ্ট নিয়ে মিতুলই রয়ে গেলাে। মা-র সঙ্গে ও আপস করতে পারলাে না। মুখ ফিরিয়ে চলে এলাে। এই চলে আসাটা প্রাণে বড় বেজেছে।
আমি মিতুলের জন্যে একটা আশ্রয় তৈরি করতে পারিনি-যেখানে বসে ও দু’দণ্ড শান্তি পাবে। আমার এ ব্যর্থতা গ্রানি হয়ে মরমে মরছে। সেজন্যেই সব রাগ
মিতুলের ওপর গিয়ে পড়েছে। এখন আর পিছু হটার যাে নেই। ওর সঙ্গে দেখা করার পথ নেই। ও নিজেও বেরুচ্ছে না। আমাকে কষ্ট দেয়ার জন্যেই গুটিয়ে
নিয়েছে নিজেকে। অতএব বাসর রাতের অপেক্ষায় রইলাম। আর মাত্র কটা দিন।

মনে মনে প্রার্থনা করলাম এ প্রতীক্ষার প্রহর যেন তাড়াতাড়ি কাটে। অফিসের কাজ জমেছে প্রচুর। এখনাে ছুটি নিতে পারিনি। বিয়ের দু’দিন আগে
ছটি নেবাে। পরদিন বেশ রাত করে বাসায় ফিরলাম। চারদিক নিঝুম। রাস্তায় দু-একটা গাড়ি ছুস করে চলে যাচ্ছ। আমার দরজার সামনে কে যেন বসে আছে।
প্রথমে ঘাবড়ে গেলাম। পরে মনে হলাে নিশ্চয়ই রায়হান। ও ছাড়া এক রাতে আর কে আসবে।
সিড়ির মাথায় উঠে দেখলাম দরজায় হেলান দিয়ে ও দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমােচ্ছে। নাক ডাকার বিদঘুটে শব্দটা সেই নির্জন রাতে আমার কানে বডড বেসুরাে
বাজলাে। ওর গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিলাম।
এই রায়হান? রায়হান?
এ্যাঁ কে? কে? কোন শালার ক্ষমতা আছে আমাকে ধরবে? রুখে উঠলাে এই থাম, থাম। আমি জামেরী।
ওঃ জামেরী? তুই আমাকে তাড়িয়ে দিবি না তাে?
আয়, ঘরে আয়। আমি দরজা খুলে ঢুকলাম। ও পিছু পিছু ঢুকে আমার বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাে।
আমি তাের এখানে কয়েকদিন থাকবাে জামেরী। অন্য কোথাও থাকতে আমার একদম ভালাে লাগে না। শুধু তাের কাছে আসতে ইচ্ছে করে। তুই রাগ করেছিস?
না, তুই ঘুমাে। খেয়েছিস?
হ্যাঁ। পেটপুরে খেয়ে এসেছি।
রায়হান উল্টোদিকে মুখ ফেরালাে। একটু পরে ওর নাক ডাকার শব্দ পলাম। সঙ্গে সঙ্গে শুতে ইচ্ছে করলাে না আমার। সিগারেট জ্বালালাম। পায়চারি করলাম।
জানালায় দাঁড়ালাম। হঠাৎ মনে হলাে বেশ কিছুদিন আমি কোনাে বই পড়িনি। তবে হ্যাঁ, উপন্যাসটা গুছিয়ে এনেছি। আর দু’অধ্যায় লিখলেই শেষ হয়ে যাবে। টের
পেলাম শরীরে সুস্পষ্ট বিদ্রোহ। অর্থাৎ লেখা বা পড়া কোনােটাই চলবে না। অথচ সারারাত যদি চেয়ারে বসে সিগারেট টেনে শেষ করি, তাহলে তার কোনাে আপত্ত
থাকবে না। মাঝে মাঝে শরীরটা এমনি করে। আকাশে চাঁদের হুজ্জত। আঁচল-মেলা আলাের হাতছানি।জানালায় মুখ রেখে সেই আলাে দেখলাম। আলা কখনাে সাইকির মুখ হলাে। কখনাে মিতুলের। রায়হানের নাক ডাকার শব্দ মাঝে মাঝে প্রবল হয়। ওর জন্যে বুকটা ভার হয়ে রইলাে। অনেকটা পাথুরে-ভার। সহজে নড়ানাে যায় না। কোথায় গেলাে ওর সেই ঝকঝকে জীবনযাপন, কোথায় গেলাে অর্থের জন্যে মাতােয়ারা উল্লাস, কোথায় গেলাে সাইকির জন্যে আত্মঘাতী ভালােবাসা? রায়হান এখন কুকুরের জীবনযাপন করছে। ও এখন আন্তাকুঁড়ের
অধিবাসী। ওর হৃদয়ে প্রেম নেই। এমনি করে ভালােবাসার জন্যে জীবনের অন্য সব অর্থ ফুরিয়ে যায়, রায়হানকে না দেখলে আমার বিশ্বাস হতাে না।
রাথরুমে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। টপ্ টপ, টপ টপ জল পড়ার শব্দ আমি সইতে পারি না। মাথার মধ্যে যেন একটি কোটি পাওয়ারের বাল্ব জুলে ওঠে। বাথরুমে গিয়ে ট্যাপটা খুব ভালাে করে চেপে বন্ধ করলাম। ঘরে ইদুরের খেলা শুরু হয়েছে। এ মাথায় ও মাথায় দৌড়াদৌড়ি করছে। হাঁড়িকুড়ি ঝন্ ঝন্ করে উঠছে।
আশংকিত হলাম, রায়হান আবার জেগে না ওঠে। ওর মুখের ওপর ঝুঁকে দেখলাম ও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মনে হয় অনেকদিন ও এমন নিরিবিলি ঘুম ঘুমােয়নি। ওর
কানের কাছে ডিনামাইট ফাটলেও জাগবে না, যতক্ষণ না ওর উত্তেজিত স্নায়ু প্রশমিত হয়। স্যুটকেস থেকে একটা চাদর বের করে মেঝেয় পেতে শুয়ে পড়লাম। সহজে ঘুম আসতে চায় না। বিছানা বদল হলে আর রক্ষে নেই। এটা আমার অভ্যেস। উঠে সিগারেট জ্বালালাম। শুয়ে শুয়ে খানিকক্ষণ সিগারেট টানতেই আস্তে আন্তে ঘুম এলাে। সকালে উঠে দেখলাম রায়হান কখনাে ওঠেনি। তবে ওর ঘুম পাতলা হয়েছে। এপাশ-ওপাশ করছে। বাথরুমে বসে ঠিক করলাম, ওকে আজ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবাে। বিয়ের আগেই হাসপাতালে পাঠানাের কাজটা শেষ করতে হবে। চা বানিয়ে ওকে যখন ডাকলাম, তখন দু চোখ ভরা ঘুম ওর।
ওঠ। চা খেয়ে নে।
আর একটু ঘুমােবাে।
না না, এখন ঘুমােলে চলবে না। দুপুরে না হয় ঘুমােস। এখন একটা কাজ
আছে। ওঠ। কি কাজ?
ওঠ না। ডাক্তারের কাছে যাবাে।
ডাক্তার? ডাক্তার কেন?
ও লাফ দিয়ে উঠলাে। আমি কথা না বলে বাথরুম দেখিয়ে দিলাম। ও আর প্রশ্ন করলাে না। কি বুঝলাে কে জানে সােজা বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাে। চা খেয়ে কাপড় পরার পর রায়হান আবার বেঁকে বসলাে। না, আমি ডাক্তারের কাছে যাবা না। তুই যা। ডাক্তারের হাতে সুই দেখলে আমার ভীষণ ভয় করে। তাছাড়া আমার কি হয়েছে যে, ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?
তাের কিছু হয়নি। আমার হয়েছে। চল।
রিকশায় সারাক্ষণ বক্বক করলাে রায়হান। ছন্দার কথাই বেশি বললাে। মাঝে মাঝে চুপ করে থাকে। আবার ঝট করে বলে, না থাক, ছন্দাকে আমি ভুলে যাবাে।

ওকে ঘুমের ওষুধ দেয়া হয়েছে। রায়হানের পকেট হাতড়ে পাঁচশ’ টাকা পেয়েছি তাই দিয়ে ওষুধ কিনে নিয়ে এলাম। দুপুরে সামান্য কটা ভাত খেলাে ও। খেতেই চায় না। খাবার দেখলে রেগে ওঠে। ওষুধ খাইয়ে দেয়ার পর বিছানায় শুয়ে পড়লাে। এ কয়দিনে ওর চেহারা একদম অন্যরকম হয়ে গেছে। অসহায় শিশুর
মতাে দেখাচ্ছে ওকে। বিশ্রামের সঙ্গে সঙ্গে এখন ওর দরকার সেবা। কে ওকে সেবা দিয়ে, শুশ্রষা দিয়ে, মমতা দিয়ে ভরিয়ে রাখবে? তেমন কেউ নেই। আমার পক্ষেও
সম্ভব না। ভাবলাম ওর বড় বােনের ওখানে রেখে আসবাে। সেখানে ও যত্ন পাবে। এক একবার ভাবি, রায়হানকে নিয়ে সাইকির কাছে যাই, ওকে ডেকে দেখাই। পরক্ষণে মন সংকুচিত হয়ে আসে। থাক, সাইকি দূরেই থাক। অল্পক্ষণে রায়হান ঘুমিয়ে পড়লাে। ওকে তালা আটকে রেখে আমি বেরিয়ে পড়লাম। সকালে ওর একটা ওষুধ পাইনি। সেটা খুঁজতে বায়তুল মােকাররম যাবাে। মনটা আবার খারাপ হয়ে গেলাে। মনটা কেবল মিতুলের সঙ্গে দেখা করার জন্যে ছটফট করে। মিতুল যেন একটা অদৃশ্য গুহায় ঢুকে গেছে। কোনাে কালে আর সেখান থেকে বেরুবে না। গুহার মুখে দাঁড়িয়ে আমি প্রাণপণে চিতকার করছি, ও শুনতে পাচ্ছে না। ডাকতে ডাকতে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। মনে মনে ওকে শাসালাম। বাসর রাতে সব শােধ তুলে নেবাে মিতুল। তখন মজাটা টের পাবে। ও আমার ওপর রাগ করেছে, এ বােধ আমাকে অস্থির করে দেয়।বায়তুল মােকররমে ওষুধটা পেলাম না। অথচ ডাক্তার বলেছে এ ওষুধটা ভীষণ প্রয়ােজন। এটা না হলে হবে না। মেজাজ খারাপ। হাঁটতে হাঁটতে স্টেডিয়াম এলাম। শরাফীর সঙ্গে দেখা।
কি রে, এমন এতিমের মতাে ঘুরছিস যে?
তাের ওখানে যাবাে ভাবছিলাম শরাফী।
কি ব্যাপার বল তাে?
চল, ঐ রেস্তোরাঁয় বসি।
শরাফীকে কাফে রেস্তোরায় নিয়ে এলাম। ও নিজেই চা আর কাটলেটের অর্ডার দিলাে। বল তাের খবর কি? একটু শুকিয়ে গেছিস যেন? বিযের আগে সবাই ফুর্তিতে থাকে। তােকে দেখে মনে হচ্ছে মরতে যাচ্ছিস? কোনাে ঘাপলা হয়নি তাে?
আর বলিস না, মেলা ঝামেলায় আছি। শােন, তােকে যে জন্যে খুঁজছিলাম,
তাহলাে বিয়ের দিন তাের বাসা থেকেই বরযাত্রী রওনা দেবে।
এ আর এমন কি! এক কাজ কর, তুই আজই আমার বাসায় চলে আয়। এখন আর ওখানে থাকার দরকার নেই। আমার বৌ-ও তাই বলছিলাে। কি বলিস?
সে দেখা যাবে।
আমি ইচ্ছে করে রায়হানের ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলাম। বেয়ারা চা দিয়ে গেলাে। শরাফী কাটলেট মুখে পুরে বললাে, প্রস্তাবটা ভালাে করেছি কি না বল?
একটু অসুবিধা আছে শরাফী। আমি বিয়ের দিনই তাের ওখানে যাবাে।
ই, বুঝেছি ওখানে থাকলে মিতুলকে অন্তত চোখের দেখা দেখা যাবে এই আশা
তাে?
আমি হাসলাম।
তাের হাসি দেখলে গা জ্বলে। বিয়ের পর তুই কেবল বৌ-র আঁচল ধরে থাকিস কি না, আমার এখন এই আশঙ্কা হচ্ছে।
শরাফী হাে হাে করে হাসলাে। হাসতে হাসতে বিষম খেলাে। আমি গ্লাস থেকে পানি নিয়ে আচ্ছা করে ওর মাথা ভিজিয়ে দিলাম।
মিছেমিছি আমার সঙ্গে লাগতে আসিস কেন?
মিছেমিছি কি না বিয়ের পরই দেখবাে। থাকবাে তাে আশেপাশে। দূরে তাে কোথাও যাচ্ছি না।
দেখিস। আমিও তাের নাকে ডগায় বসে বসে দেখাবাে।
আর যা-ই করিস, লেখালেখিটা যেন ছেড়ে দিস না।
বাব্বা, এখন থেকেই উপদেশ! চল উঠি।
দু’জনে উঠলাম। শরাফী ওর নিজের কাজে চলে গেলো আমি বঙ্গবন্ধু এভেনিউতে দাঁড়িয়ে মানুষের স্রোত দেখি। একান্তই উদ্দেশ্যহীন সে দেখা। সে স্রােত আমাকে মৃত বাবা-মার কথা মনে করালাে। কতদিনে তাদের কথা মনে হয়নি। আমার বুকের তলে চুপটি করে বসে আছে। বুক ফেটে কান্না আসতে লাগলাে। সে জনস্রোতের মাঝে দাঁড়িয়েও উপলব্ধি করলাম, আমার চারপাশে কেউ নেই। আমার নিজস্ব কেউ নেই। যার ওপর আমার সব আবদার, সব অভিমান সব
অত্যাচার খাটবে। মিতুল ছিলাে সেও এখন আমার কাছ থেকে অনেক দূরে। দৌড় গিয়ে কোলে মুখ গঁজে শুয়ে থাকতে পারবাে না। বলতে পারবাে না, মিতুল, আমার ভারি ঘুম পাচ্ছে। আমি এখন কোথায় যাবাে? না কি রাস্তায় ইতস্তত হাঁটবাে? অনেক চেষ্টা করে একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজে পেলাম না, যেখানে গিয়ে একটুখানি স্বাচ্ছন্দ্য বােধ করতে পারি। মিতুল না থাকাটা আমার জন্যে ভীষণ কষ্টের। মানসিক দিক
থেকে আমি তখন সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। জনস্রোত দেখতে আর ভালাে লাগছে না। গলার কাছে কান্নার দলাটা চেপে বসেছে। কিন্তু কোথায় যাবাে? আমার ঘরে, হায় ঈশ্বর, সেটা এখন আমার জন্যে এক সিজোফ্রেনিক ভুবন।

ইদানিং ঘুম একদম কমে গেছে। সারারাত তিন-চার ঘন্টা ঘুমােই আরমি। রায়হান রাতদিন ঘুমােয় ওষুধের প্রতিক্রিয়ায়। নিচে ঘুমােতে হয় বলে ওষুধ এনে ইঁদুর
মেরেছি। কোথাও কোনাে শব্দ হয় না, তবু আমার ঘুম আসে না। কিছুক্ষণ পর টের পেলাম, বাথরুমে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। টপ টপ টপ। মাথাটা ঝা করে উঠলাে।
কিন্তু উঠে ট্যাপটা ভালাে করে বন্ধ করার ইচ্ছে হলাে না। সেই শব্দে নিজের স্নায়ুকে কষ্ট দিতে ভালাে লাগলাে। বাইরে মৃদু হাওয়া। ইউক্যালিপটাসের পাতা নড়ছে।
রায়হান চেঁচিয়ে উঠলাে।
জামেরী, জামেরী, বন্ধ কর ঐ কড়া নাড়ার শব্দ। উঃ অসহ্য! দোহাই লাগে জামেরী, ওদের থামতে বল।
রায়হান বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে আমাকে জড়িয়ে ধরলাে। আমি ওকে ঝাঁকুনি দিলাম। স্বপ্ন দেখেছে হয়তাে।
কোথায় শব্দ?
ঐ যে শুনতে পাচ্ছিস না? উঃ, কি ভীষণ জোরে জোরে কড়া নাড়ছে! আমার মাথাটা ঘুরছে জামেরী। তাের ঘরটায় কারা যেন চারদিক থেকে কেবল কড়া নাড়তে
থাকে। জামেরী, আমি কাল সকালেই এখান থেকে চলে যাবাে। এখন একটু চুপচাপ ঘুমাে তাে রায়হান। তুই হয়তাে স্বপ্ন দেখেছিস স্বপ্ন নয়, সত্যি। ঐ শব্দ বন্ধ না হলে আমি কিছুতেই ঘুমােতে পারবাে না।
রায়হান চুপচাপ কান পেতে শুনতে লাগলাে। আমার হঠাৎ মনে হলাে, জল পড়ার মন্দটা এখন আমার নিজের ভারি বিচ্ছিরি লাগছে। আর সইতে পারছি না।
উঠে বন্ধ করে দিয়ে এলাম। রায়হান অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাে।
তুই ওদের চলে যেতে বললি, না?
হ্যাঁ।
তাই তা শব্দটা থেমে গেছে। যাই, ঘুমােই গিয়ে।
রায়হান গিয়ে শুয়ে পড়লাে। আমি পারলাম না। উঠে আলাে জ্বালালাম। একটা বই টেনে বসলাম। উদ্দেশ্য সময় কাটানাে হালকা মেজাজের বই। ছুঁড়ে ফেললাম
মেঝের এক কোণায়। আসলে সবকিছুতেই এখন আমার ভীষণ বিরক্তি। জানালায় দাঁড়িয়ে পর পর কয়েকটা সিগারেট টানলাম। মেজাজটা কিছুটা ধাতে আসার পর আবার এসে টেবিলের সামনে বসলাম। এবার একটা চমৎকার উপন্যাস নিয়ে বসলাম। কবে কিনেছিলাম মনে নেই। পাতার পর পাতা আমাকে আরেক জগতে নিয়ে গেলাে। কেবলই মতে হতে লাগলাে, দু’দিন পর মিতুলের সঙ্গে আমার বাসর।
ভাের রাতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। চমকে উঠলাম। না, এ শব্দ রায়হানের মনগড়া ব্যাপার নয়। এটা সত্যিকার অর্থে দরজা খােলার ডাক। বইটা উল্টে রেখে
উঠলাম। আবার শব্দ। আর একটু জোরে। দরজা খুলতে দেখি মিন্টু।
জামেরী ভাই, বাবা আপনাকে ডাকছেন।
কি ব্যাপার, মিন্টু?
আপা অজ্ঞান হয়ে গেছে।
এ্যা! বলাে কি?
মাঝরাতেই আপা অজ্ঞান হয়। আমরা অনেক চেষ্টা করলাম, জ্ঞান ফিরছে না।
এখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার। আমি আনিসদের বাসা থেকে টেলিফোন করেছি এ্যাম্বুলেন্সের জন্যে। বাবা খুব নার্ভাস হয়ে গেছেন। আপনি সঙ্গে গেলে ভালাে হয়।
আমি আসছি।
তাড়াতাড়ি করুন। এখুনি এ্যাম্বুলেন্স এসে যাবে। আমি অনুভব করলাম, আমার সমস্ত শরীর কাঁপছে। ঠিকমতাে দাঁড়াতে পারছি না। টেবিলটার ওপর ঝুঁকে একটুখানি দম নিলাম। মিতুল এখন আমার মন থেকে
মুছে গেছে। ওকে নিয়ে আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। ওর সঙ্গে শেষ দেখার দিন আমি রাগ করেছিলাম। সে রাগ এখন সহস্র গুণ হয়ে আমার মধ্যে জলের মতাে
গড়াচ্ছে। আলনা থেকে শার্ট-প্যান্ট নিয়ে পরলাম। কাঁপুনি এখনাে থামছে না। হাঁটু থরথর করছে। দরজায় তালা দিয়ে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছি, তখন নীল মুকুট মাথায় এ্যাম্বুলেন্স রাজার মতাে এসে দাঁড়ালাে আমার বাড়ির সামনে। তার সে বিচিত্র সঙ্গীত আমার মগজের প্রতি সেলে পিপড়ের মতাে কাটুস কুটুস কাটছে। আহা, চারদিকে কেমন রৌদ্রের মতাে আলাে। আমি সিঁড়ির শেষ ধাপে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। ওরা সবাই স্ট্রেচারে করে মিতুলকে গাড়িতে উঠালাে। আমিও উঠলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলাে। বিচিত্র শব্দটা প্যা-পু বাজছে। মনে হলাে, ওটা আমার মুখ দিয়ে বেরুচ্ছে।
আমার মাথায় এখন নীল মুকুট। আমি রাজা। মিতুলকে নিয়ে বাসরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি। কেউ আমার চলা থামাতে পারছে না। অনন্তকালের পথে আমার যাত্রা।
তারপর মিতুলের সঙ্গে আমার বাসর। সেখানে আমি ওর রাগ ভাঙাবাে। কেন জানি না পাশে বসে থাকা মিন্টুর হাতটা জোরে চেপে ধরলাম।

Series Navigation<< উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব বাইশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *