উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব দশ


একটানা লেখার পর মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। আমি ওর হাতটা কপালে রাখলাম।
কি লিখছিলে?
উপন্যাস।
নায়ক কে?
কেন আমি?
আর নায়িকা?
তুমি বলাে দেখি কে?
সত্যি বলবাে? তাহলে এই মিতুল।
ঠিক। তুমি যে কেমন করে সবকিছু টের পাও !
একদম সােজা।
কেমন?
আমার দিকে তাকালে তােমার চেহারা বদলে যায়। তখন আমি সব বুঝি।
তাই নাকি ?
আমি ওকে বুকের ওপর নিয়ে এলাম। পরিশ্রান্ত স্নায়ুতে মিতুলের স্পর্শ অমৃতের মতাে।
জানি না অমৃত কেমন!দেবতা তাে আর হইনি। কিন্তু আমি বুঝি মিতুল মানেই অমৃত।
মিতুলের দুটি ঠোঁটে এমন কোনাে সুরা নেই, যা আমি পাই না। সে অমৃত আমাকে অনন্ত যৌবনের জাদুকরী ক্ষমতা দেয়।
আমি ভুলে যাই বার্ধক্যের কথা, জরার কথা, মৃত্যুর কথা। আমার সামনে তখন একটা প্রশস্ত রাজপথ।
যে পথে হাজার হাজার মাইল হাঁটলেও জরা এসে হালুম করে ঘাড়ে চাপে না। ক্লান্তি সিন্দবাদের বুড়াে হয় না।
আমি আর মিতুল অনেকক্ষণ শুয়ে থাকলাম। একসময় মিতুল জিজ্ঞেস করলাে, তােমার মাথাটা এখন কেমন করছে জামী?
মাথার কথা ভুলে গেছি।
বলছিলে না ঝিমঝিম করছিলাে?
আঃ মিতুল, আমি সবকিছু ভুলে গেছি। আমি এখন জিউসের মতাে ইদা পর্বতের ঘাসের শয্যায় শুয়ে আছি।
দেবী হেরা ঘুম দেবতার কাছ থেকে আমার জন্যে ঘুম চেয়ে নিয়ে এসেছে। আমার সামনে আর কোনাে ট্রয়ের যুদ্ধ নেই।
জেগে উঠে যখন দেখবে যুদ্ধের মােড় ঘুরে গেছে?
তখন জিউসের মতাে ভীষণ রেগে উঠবাে।
মিতুল খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। বালিশে ছড়ানাে মিতুলের একরাশ ফুলের মধ্যে। আমি মুখ গুঁজে রাখি।
মিতুল এলেই আমি ওর চুল খুলে দেই। খোঁপা, বেণী কিছু আমার ভালাে লাগে না।
রাশি রাশি চুলের প্রপাত আদিম বুনাে অরণ্যের গন্ধে আমাকে মাতাল করে।
একসময় মিতুল হঠাৎ করে উঠে বসে, জামী, কাল রাতে আমি একটা ভীষণ বাজে স্বপ্ন দেখেছি।
কি?
দেখলাম কারা যেন আমার হাতে – পায়ে শিকল বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে ভীষণ উঁচু এক পর্বতের মাথায় ফেলে রেখে আসে।
আর তখুনি এক ভয়ানক ঈগল সাঁই সাঁই করে ছুটে আসে আমাকে খুবলে খাবার জন্যে। উঃ আমি যা ভয় পেয়েছিলাম জামী।
মিতুলের স্বপ্নের কথা শুনে আমার শরীরের এতক্ষণের রগরগে অনুভূতি একদম থিতিয়ে যায়। আমি মুখ খুলতে পারি না।
মনে হয় বেশ অনেকদিন আমি এই স্বপ্নটা দেখিনি। স্বপ্নের কথা আমার মন থেকে প্রায় মুছে গিয়েছিলাে।
তুমি কিছু বলছে না কেন জামী?
ওসব কিছু না। স্বপ্নটা একটা বাজে ব্যাপার।
কিন্তু স্বপ্নটা আমাকে একদম…
এসব খারাপ জিনিস নিয়ে চিন্তা করতে নেই মিতুল। চিন্তা করলে মন খারাপ হয়। মন খারাপ হলে
আর কিছুই ভালাে লাগে না। কেবল মরতে ইচ্ছে করে।
ঠিক বলছাে! মিতুল সােৎসাহে বলে।
তাহলে তুমি আর এসব নিয়ে ভাববে না?
একটুও না।
মিতুল আবার আমার পাশে শুয়ে পড়ে। শুয়ে শুয়ে আমরা একসঙ্গে। ইউক্যালিপটাসের পাতার ফাঁকে আকাশ দেখি।
সেই দোয়েলটা আবার আসে। জানালার পাশের ডালে নাচানাচি করে। এ ডাল এ পাত্র ও পাতা।
আর কোনাে কিছুতে ওর কোনাে খেয়াল নেই। ও আমাদের কথাও ভুলে গেছে।
আমার মনে হলাে আমি আর মিতুলও আজ পারিপার্শ্বিকের কথা ভুলে গেছি। এখন কেবল ঐ নাচানাচিটাই সম্বল।
কেবল আপন মনে, আপন ছন্দে নাচা। অন্য কোনাে মুদ্রা নয়। নিজস্ব নিয়মের মুদ্রা। মিতুল খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
পাখিটার কাণ্ড দেখেছো?
আমি যখন আনন্দে থাকি, তখন ও আসে মিতুল।
তাই নাকি? তাহলে ও তােমাকে ভালােবাসে।
তোমার চেয়ে বেশি নয়।
কেমন করে বুঝলে? দেখছে না ও কতভাবে নিজেকে প্রকাশ করছে। ও রকম করে আমি
নিজেকে প্রকাশ করতে পারি না।
মিতুলের কণ্ঠ কেমন মিইয়ে আসে। লককর ঝক্কর গাড়ি ডাকার মতাে ঘড়ঘড় শব্দ ওর কণ্ঠে।
চোখে পলকা ছায়া। আমি বুঝলাম মিতুল আমার মধ্য থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। ও এখন চুপ হয়ে গেছে।
কোনদিকে দৃষ্টি বােঝা যায় না। আকাশের গায়ে ছাই ছাই আভাস। ইউক্যালিপটাসের ডালে দোয়েলটা আর নেই।
কথন উড়ে গেছে কেউ টের পাইনি। আমি মিতুলকে উঠিয়ে দিলাম।
মিতুল, আজ না আমি তােমাদের ওখানে খাবাে?
ও মাথা নাড়লাে।
কি রাধছ?
জানি না। মা আর ঝরনা জানে।
আমি খাবাে আর তুমি বুঝি কিছু জানাে না?
রান্নাবান্না আমার ভালাে লাগে না জামী।
বেশ তাহলে আমি যাবাে না।
হুঁ, যাবে না বললেই আর হলাে। ঠিক আছে, তােমার জন্যে আমি একটা কাজ করবো।
কি?
খাবার টেবিলে ফ্লাওয়ার ভাসে ফুল দেবাে।
তাই দিও। তার আগে একটা কাজ আছে মিতুল।
কি?
এক ফ্লাস্ক চা।
উঃ কত চা যে তুমি খাও!
মিতুল স্টোভ জ্বালিয়ে চায়ের পানি চাপালাে। আমি প্রুফ কাটতে বসলাম। বইটার চার ফর্মা ছাপা হয়েছে।
আরাে পাঁচ ফর্মার মতাে হবে। আমার তৃতীয় উপন্যাস। নাম দিয়েছি ‘সরােবরে ঘােলা জল।
‘ নামটা অবশ্য আমার খুব একটা পছন্দ নয়। তবে শরাফী খুব পছন্দ করে।
আমি বদলাতে চাইলে ও প্রবল আপত্তি করেছিলাে। সেজন্যে আর বদলানাে হয়নি।
মিতুল আমাকে চা দিয়ে চলে গেলাে। আমি ক্রয় কাটি। হাওয়ায় দরজার কড়া নড়ে। টুং টাং শব্দ হয়।
মাথার ভেতর উপন্যাসের প্লটটা টেলিগ্রাফের তারে বসে থাকা দূরের পাখিটার মতাে মায়াবী হয়ে যায়।
কতক্ষণ সময় পার হয়েছে জানি না। শুনলাম নিচ থেকে ঝরনা ডাকাডাকি করছে। অর্থাৎ খাবার রেডি।
আর একটু দেখলে কাজটা শেষ করতে পারি। তাই উঠতে ইচ্ছে করছিলাে না। তবুও গায়ে শার্ট চাপিয়ে নেমে এলাম।
ঘরে ঢুকে দেখলাম আলী আহমদ সাহেব পায়ের ওপর পা উঠিয়ে চুরুট টানছেন।

Series Navigation<< উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব নয়উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব এগারো >>

Leave a Reply

Your email address will not be published.