উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। প্রথম পর্ব

স্বপ্ন দেখাটা ভারি বাজে ব্যাপার। বিশেষ করে ঘুমের ভেতর। আমার একদম ভালাে লাগে না। নিবিড় ঘুমে স্বপ্নটা আমার কাছে গােলাপে পােকা। কোনাে একটা সুন্দর অবয়বকে ইচ্ছে করে দুমড়ে মুচড়ে ফেলা যেন। অথচ ঘুমের এই আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়াটিকে কিছুতেই এড়ানাে যায় না। মাঝে মাঝে স্বপ্নের কথা চিন্তা করলে আমার ঘুম আসতে চায় না। তখন বেশি কষ্ট হয়। এমনকি চমৎকার মধুর স্বপ্নও আমাকে মােহিত করে না। আমি বিরক্ত হই। ঘুম ভাঙলে জিভটা তেতাে ঠেকে। বিস্বাদে ভরে থাকে মন।
ইদানিং কখনাে কখনাে যে স্বপ্নটা আমি দেখি, তা আমার সমস্ত শরীর হিম করে রাখে। ঘামে জবজবে আমার অনুভূতি নার্সিসাসের মতাে একটা নির্দিষ্ট শূন্যে একাগ্র হয়ে যায়। তবুও চেতনার রদবদলে আমি নিজেকে আদিম সমুদ্রের প্রােটোপ্লজমের প্রথম বিন্দুটি বলেই ভাবি। ভাসতে ভাসতে চলেছি অজানার উদ্দেশ্যে। তখনাে। বাতাসে অক্সিজেন তৈরি হয়নি। সুতরাং বায়ুমণ্ডলের ওজন পদার্থটিও নেই। সে কারণেই সূর্যের আলাের আলট্রা ভায়ােলেট রশ্মির স্বচ্ছন্দ বিলাসভ্রমণ ছিলাে স্বাধীন ও অবাধ। এবং তা এক সময় প্রেয়সীর মতাে ছুঁয়েছিলাে সমুদ্রের জল। আলট্রা ভায়ােলেট রশ্মির প্রেয়সী – স্পর্শে সমুদ্রের জল আর জৈব – পদার্থ মিলে তৈরি হয়েছিলাে প্রােটোপ্লাজম। সে থেকেই চলছে প্রাণের দুর্দম অভিযান। প্রাণের সে বিন্দু থেকে আমার শুরু। ভাবতে ভালাে লাগে, আমার ভেতর চলছে ভাঙাগড়ার খেলা। আদিম পৃথিবীর উন্মুক্ত শরীরে এইমাত্র আমার পদার্পণ। আমার আগে কেউ আর এখানে আসেনি। আমি চিৎকার করে ঘােষণা করলাম যে, আমি এলাম। সমস্ত চরাচর অবাক হয়ে আমাকে দেখলাে এবং মাথা নােয়ালাে। ওরা আমাকে শ্রেষ্ঠ বলে বরণ করলাে।

অনুভূতির কাঁটাতার ডিঙিয়ে আমি আবার সেই স্বপ্নে এসে দাড়াই। কারা যেন। আমাকে হাতে – পায়ে শিকল দিয়ে টেনে নিয়ে যায়। পৃথিবীর শেষ প্রান্তে সুউচ্চ পর্বতচূড়ো তাদের লক্ষ্য। সে পর্বতের পাশ দিয়ে উর্মিল সমুদ্র বয়ে যায়। আমাকে ওরা পাথরের সঙ্গে বেঁধে রেখে চলে আসে। আমার মুখ দিয়ে গােঙানির মতাে ধ্বনি। বের হয়। আমি অনেক চেষ্টা করেও কোনাে কথা বলতে পারি না। শস্তি সমুদ্র গর্জে ওঠে। হাজার দৈত্যের মতাে ঢেউ এসে ভেঙে পড়ে পর্বতের গায়ে। আর তখনই বিরাট ডানাঅলা ঈগলের শোঁ শোঁ শব্দ পাই। রক্তমাখ ঈগলটা তীক্ষ্ণ বর্শার মতাে ছুটে আসছে। আমার কালাে নরম হৃৎপিও ছিড়ে খুবড়ে খাবার জন্যে। ঈগলটা আমার গায়ের ওপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে যায়। অনুভব করি হাত – পা অবশ লাগছে। নিজের ওপর রাগ হয়। মনে – প্রাণে স্বপ্ন নামক এই ভৌতিক প্রক্রিয়াটি তাড়াবার চেষ্টা করি। চেষ্টা করে ক্লান্ত হই। ক্লান্ত হয়ে ঝুম মেরে বসে থাকি। নতুন করে কোনাে কিছু ভাবতে চাই না।
জানি না কেন স্বপ্নটা দেখার পর আমি নিজের ঘরের আয়তন মাপি। মনে হয়। এই মুহূর্তে এটাই আমার কাজ। অন্য কিছু নয়। যে ঘরটায় থাকি, সে ঘরটা অসম্ভব ছােট। ওপরের ছাদ প্রায় মাথা ছুঁই ছুঁই অবস্থায়। আসলে এটা ঘর নয়। চিলেকোঠা জাতীয় একটা কিছু। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ঘরে ঢুকতে হয়। কোনাে বারান্দা নেই। তিন দেয়ালে তিনটে জানালা। ফলে ঘরে যতক্ষণ থাকি, ঘুরে – ফিরে আমাকে এই জানালার কাছে এসে দাঁড়াতে হয়। জানালায় দাঁড়িয়ে কলমু খর রন্তা দেখি, মাঝরাতের রাস্তা দেখি, ভরদুপুরের রাস্তা দেখি। রাস্তা দেখতে আমার ভালাে লাগে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা দেখতে আমার কোনাে ক্লান্তি নেই। ছুটে চলার সেই ভীষণ গতি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আবার মাঝরাতের রাস্তা আমাকে শান্ত সমাহিত করে। আমি তখন বুকের উত্তাপ উড়িয়ে দেই। উত্তাপটা উড়িয়ে দিলে সুতাের মতাে হিমপ্রবাহ বয়ে যায়।
কোনােদিন মাঝরাতে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম আসে না। তখন উঠে সিগারেট জ্বালাই। আমার এক বিদেশি বন্ধু আমাকে একটা ছােট্ট টেবিল ঘড়ি দিয়েছিলাে। জার্মানির ঘড়ি। রাতে ঘুমােনার সময় আমি ওটা উপুড় করে রাখি। কেননা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়াটা আমার অভ্যেস হয়ে উঠেছে। তখন কিছুতেই আমার সময় জানতে ইচ্ছে করে না। রাতে সময় দেখলে আমার মাথাটা কেমন করে। মনে হয়, নিজেকে সংকুচিত করে ফেলছি। অনন্ত রহস্যের কাছে আমার নীরব জিজ্ঞাসা অনুচ্চারিত থাক। নিঘুম ভাবনায় আমি তখন মিতুলকে আঁকড়ে ধরি। ওর চোখের ভেতর যেন পুরাে আকাশটা বাঁধা পড়ে আছে। ঐ দৃষ্টি আমাকে উজ্জীবিত করে। তাই মিতুলকে আমার ভালাে লাগে। মিতুলকে আমি ভালােবাসি। মনে মনে ঘুমের কাছে মিতুলকে ভালােবাসার দােহাই দেই। কিন্তু ঘুম আসে না।

ঐ স্বপ্নটা আমার সমস্ত অনুভূতি নিষ্ক্রিয় করে রাখে। উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ইচ্ছে করে একবার নিচে যাই। ওদের ঘরের দরজা ভেঙে মিতুলকে নিয়ে আসি। ওকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকি। চমৎকার প্রশান্তির ঘুম। যেখানে স্বপ্নের জ্বালাতন নেই। তবে রাতে ঘুম ভেঙে যাবার ফলে একটা জিনিস আমার খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে। সেটা হলাে রাতের তারাভরা আকাশ। আমার বুকের ভেতর তারাভরা আকাশের স্বপ্ন আসে। নিচের রাস্তা যখন নিঝুম থাকে, তখন ঐ আকাশ আমার আপন হয়ে ওঠে। আমি সময়ের হিসেব ভুলে তাকিয়ে থাকি। নিজের অস্তিত্বের কথা ভুলে যাই। মনে হয়, গ্যালিলিও হয়ে দুরবিন হাতে আমি এই জানালায় দাঁড়িয়ে আছি। আমি এখন ষােড়শ শতাব্দীর ইতালিতে। ইগলের মতাে তীক্ষ দৃষ্টি নিয়ে আমি গ্যালিলিওর প্রিয় আকাশ দেখছি। বিংশ শতাব্দীর কথা ভুলে যাই। ষােড়শ শতাব্দী আমার আপন হয়ে ওঠে। চোখের সামনে অসংখ্য তারকারাজির মেলা। ভেনাসের মতাে সৌন্দর্যের আলাে ছড়ায়। গ্যালিলিওর দৃষ্টিতে ছায়াপথের রহস্য উন্মােচিত। সাধক লােকটার আর কোনাে দিকে খেয়াল নেই। আস্তে আস্তে পট পরিবর্তন হয়। বৃদ্ধ লােকটি জীবনের শেষপ্রান্তে উপনীত। তাঁর কাছে পােপের সমন এসেছে। রােমে যাবার ক্ষমতা তার নেই। তবু তাঁকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বৃদ্ধের দেহে তখন। অমিত যৌবন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গ্যালিলিও চিৎকার করছেন, সত্যিই যে পৃথিবী সূর্যকে ঘিরেই ঘুরছে।’
তাঁর এই দুঃসাহসের জন্য বিচারকরা তাঁকে ক্ষমা করেননি। বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছিলাে তাকে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে যে, বাকি জীবনটা কেমন করে কেটেছিলাে তার। যে লােকটা আজীবনের সাধনায় সভ্যতার চাকায় গতিদান করেছিলেন, ক্ষমা তার জোটেনি। ধূসর একাকীত্ব হয়েছিলাে সঙ্গী। তারাভরা আকাশের স্বপ্ন সেই মানুষটাকে ব্যথিত করতে শুধু। আমার মনে হয়, আমার বুকের ভেতরও তেমন ব্যথা। আমি ষোড়শ শতাব্দীর ইতালিতে দাঁড়িয়ে সে মানুষটা সঙ্গী হতে চাই। আমি তাঁর বুকের পর্দা খুলে দেখবাে কেমন করে নিজের সত্যকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্যে একরােখা থাকা যায়।
শ্রাবণের বৃষ্টিমুখর আকাশ আমার ভালাে লাগে। বিদ্যুৎ চমকিত আকাশও; অবশ্য সবটাই রাতে হওয়া চাই। মেঘের দাপটে বিপর্যস্ত আকাশ আমার দৃষ্টিকে ক্লান্ত করে না বরং স্নায়ুতে অন্য ধরনের উত্তেজনা দেয়। জানালায় দাড়িয়ে হিমেল হাওয়ার স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে সমআনুভূতি বদলে যায়। আমি তখন মিতুলের ভালােবাসায় এসে ঠাঁই নিই।একদিন মিতুল আমার বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলেছিলাে, জানাে জামী, আমার মনে হয়, আমার জীবনে কি যেন নেই। কোথায় যেন একটা ফাঁকি আছে। আমি ঠিক বুঝতে পারি না। অথচ মাঝে মাঝে সে বােধ আমাকে পাগল করে তােলে।

মিতুল অতি সাধারণ মেয়ে। গায়ের রঙ কালাে। চকচকে আঁধারের ভেলভেটের মতাে। দৃষ্টি পিছলে যায়। ফিগার সুন্দর। চোখে যাদু আছে। নিজেকে ঘষে- মেজে। উজ্জ্বল করে তােলার কোনো প্রয়াস নেই। গত বছর বি, এ, পাশ করেছে। বিদেশী এক সাহায্য সংস্থায় ছোট্ট একটা চাকুরি করে। মা মারা যাবার পর আমি পুরো বাড়ির মালিক হয়ে গেলে ওপরের এই ছােট্ট চিলেকোঠায় এসে নিচতলা ভাড়া দিয়ে দেই। মিতুলের বাবা আলী আহমদকে নিয়ে এসেছিলাে আমার বন্ধু রায়হান। মিতুলদের সঙ্গে ওর পরিচয় ছােটবেলা থেকেই। ওর কাছেই শুনেছিলাম মিতুলের দু বছর বয়সে ওর মা আর একজনের সঙ্গে চলে যায়। মিতুল অনেক পরে জেনেছিলে কথাটা। ওর বাবা আবার বিয়ে করেছে। নতুন মা – র সঙ্গে মিতুলের ভালাে সমঝােতা আছে। তবুও পারিপার্শ্বিকের নানা কারণে মিতুল বিষন্ন হয়ে যায়। বুকে কষ্ট থাকে। চোখ ছলছল করে। মেঘলা মেদুর বাউল – ছায়া দু’চোখ জুড়ে।
বাবাকে মিতুল সহ্য করতে পারে না। সবসময় এড়িয়ে চলে। যেটুকু কথানা বললে নয়, সেটুকু কেবল বলে। বাবার প্রতি ওর বড় অভিযােগ যে, বাবা ওকে মা’র মতাে ভালােবাসতে চায়। বাবার মতাে নয়। মিতুল একদিন বিষন্ন হয়ে বলেছিলাে, জানাে জামী, ছেলেরা যখন মেয়েলি ভালােবাসায় বিশ্বাসী হয়, সেটা আমার কাছে অসহ্য লাগে। জঘন্য ব্যাপার।
ঘৃণায় মুখটা কুঁচকে, ভুরু জোড়া কপালে উঠিয়েছিলাে ও। আসলে মিতুল টের পেয়েছিলাে ওর প্রতি বাবার একটা গােপন দুর্বলতা আছে। সেটা দু’বছর বয়সে মা কর্তৃক প্রতারিত হবার কারণেই। অন্য কোনাে কারণে নয়। মা – র অভাবটা বাবা মা হয়ে পুষিয়ে দেবার চেষ্টা করে। তাতে নাকি মিতুলের হাসি পায়। হাসতে হাসতে বলে, তুমি বলাে জামী, দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে? নাকি ময়ূরপুচ্ছ পরলেই কাক ময়ূর হতে পারে? আহা বাবাকে যদি বাবার মতাে পেতাম কি ক্ষতি হতাে জামী? তাহলে আমি হয়তাে অনেক কষ্টের হাত থেকে বাঁচতে পারতাম। কষ্টটা দস্যি মেয়ের মতাে কেবলই বুকের ভেতর লাফালাফি করে।
মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমি মিতুলের কষ্টের সঙ্গী। ও আমাকে যতটুকু ভালােবাসে তার চেয়ে বেশি কষ্টের ভাগ দিতে চায়। আসলে ও আমার মধ্যে একটা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। নিজের মনের কাছে ওর কোনাে স্বস্তি নেই। সে মন ওকে নিশ্চিত নির্ভর ভরসা দেয় না। অহরহ সেখানে ঝড় ওঠে, বৃষ্টি হয়, বান ডাকে। সে তােড়ে ভেসে যায় মিতুলের সব বিশ্বাস, সব স্বস্তির কেন্দ্রস্থল। কখনাে কখনাে আমি নিজেও বুঝতে পারি না যে, কি করলে মিতুলের স্বস্তি হবে। আমার সাধ্য নেই ওকে বেরিয়ে গিয়ে কষ্ট পায়। আবার নগ্নপায়ে আমার সামনে এসে নতজানু হয়। তখন আমি ওকে বুকে তুলে নিই। ওর চোখের কোনে চিকচিক করে।

Series Navigationধারাবাহিক উপন্যাস।। মগ্ন চৈতন্যে শিস।। সেলিনা হোসেন।। পর্ব দুই >>

Leave a Reply

Your email address will not be published.