সায়েন্স ফিকশন

বিজ্ঞান কল্পকাহিনি।। ইলাবৃত।। কমলেশ রায়।। পর্ব বিশ

বিশ.

দরজা খুলে চমকে গেলেন ডা. অমিয়। বিশ্বাস হচ্ছে না। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। এ কাকে দেখছেন তিনি? এটা কী সত্যি, নাকি ভ্রম?
কী হলো বাবা, এভাবে কী দেখছো? অরি বলল।
না, কিছু না। তুমি ভেতরে এসো।
অরি ভেতরে ঢুকে নিজের ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে রাখল মেঝেতে। সোফায় বসে জিগ্যেস করল, তোমার শরীর এখন কেমন বাবা?
আগের মতোই। পাশের সোফায় বসে ডা. অমিয় জবাব দিলেন।
আগের মতোই মানে কী। তোমার শরীর ঠিক আছে তো?
শরীর তো ঠিকই আছে।
যাক, খুব চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলে।
চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলাম, কী বলছো?
হ্যাঁ, চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলে। যে মেসেজ পাঠিয়েছো।
আমি মেসেজ পাঠিয়েছি? কই না তো!
তোমার শরীর ভালো নেই। এই মেসেজ তুমি পাঠাওনি?
না, পাঠাইনি। তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে।
অরির মনে অন্যরকম একটা সন্দেহ হতে থাকে। তাহলে মেসেজটা কে পাঠাল?
ইলাবৃতে পা রাখার পর থেকেই অনেক কিছুই তার স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।

বায়ুগাড়িতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার তো তখন ঘুমিয়ে পড়ার কথা নয়। তার ঘুম ভাঙল বাসায় পৌঁছানোর মিনিট পাঁচেক আগে। সেটাও আবার চালকের ডাকে। আরে উঠে পড়ুন। কোন ভবনে নামবেন, দয়া করে নম্বরটা বলুন। অরি ঘুম জড়ানো গলায় বলল, ১৭৪৫/ গ ৩। ও আপনি তাহলে ১৭৪৫ হোল্ডিং এলাকার গ কমপ্লেক্সের ৩ নম্বর ভবনে নামবেন। এসে গেছি তো। এই আর মিনিট দুয়েক বাকি। দেখবেন আবার ঘুমিয়ে পড়বেন না যেন। না, না, ঘুমাব না। আপনি নিরাপদ অবতরণের দিকে খেয়াল করুণ। সেটা নিয়ে মোটেই চিন্তা করবেন না। বায়ুগাড়ি এমন মোলায়েম ভাবে নামাব যে ছাদও টের পাবে না। নামার পর বুঝবেন পাকা হাতের কাজই আলাদা। হা-হা-হা। আসলেই লোকটা চালক হিসেবে খুবই ভালো। বেশ হাসিখুশিও। পাওনা বুঝে নেওয়ার পরও হাসিমুখে অপেক্ষা করছিল। কী হলো ? জিগ্যেস করাতে বলল, আগে আপনি ছাদ থেকে নামেন। তারপর আমি উড়ান দেবো। আরে, হঠাৎ করে আনমনা হয়ে গেলে কেন? ডা. অমিয় ছেলেকে বললেন। সঙ্গে যোগ করলেন, ওঠো পোশাক বদলে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।

অরি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আজ কী বার বাবা?
বৃহস্পতিবার, কেন?
না, আমি তো বুধবারে এই ইলাবৃতে পৌঁছেছি। তাহলে আজ বৃহস্পতিবার হয় কী করে?
ডা. অমিয় বুঝতে পারলেন কোনো কারণে তার ছেলে একটু বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে।
তিনি বললেন, ঠিক আছে। এসব কথা পরে হবে। আগে তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও তো।
অরি ব্যাকপাকের পকেটে জাহাজের টিকিট খুঁজল। পেলো না। প্যান্ট ও জামার পকেটেও টিকিট নেই। বরং মিলল বায়ুগাড়ির পাওনা মেটানোর রিসিট। এটাতে তো বৃহস্পতিবারই লেখা।
আহ্, এখন রাখো এসব। যেটা বলেছি আগে সেটা করো। ডা. অমিয় হালকা ধমকে উঠলেন।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও অরি ব্যাকপাক থেকে রাতের পোশাক বের করে ওয়াশ রুমের দিকে পা বাড়াল।
খাবার টেবিলে মুখোমুখি বসেছে বাবা ও ছেলে। কত দিন পর এই একসঙ্গে বসা।
ছেলের প্লেটে মুরগির রোস্ট তুলে দিয়ে ডা. অমিয় বললেন, তোমার মা কেমন আছে?
ভালো। আসার জন্য খুব বায়না ধরেছিল। অরি বলল।
নিয়ে এলেই পারতে।
তোমার এখানে যা পরিস্থিতি তাতে সাহস করি কি করে?
মেসেজের কথা কী তোমার মা জানে?
না, ইচ্ছে করেই বলিনি। অযথা চিন্তা করত।
খুব ভালো করেছো।
এখানকার পরিস্থিতি এখন কেমন?
ওই একই রকম। নতুন করে কিছু ঘটেনি।
আমার কী মনে হয়, জানো?
কী মনে হয়?
এই ইলাবৃতে ক্ষমতাধর আরও কেউ আছে।
ছেলের পাতে আরেকটা রোস্ট তুলে দিয়ে ডা. অমিয় বললেন, তোমাকে না কতদিন বলেছি খাওয়ার সময় এত কথা বলতে নেই।
তুমি কী প্রসঙ্গ ঘুরাতে চাইছো?
সবকিছু নিয়ে এত কথা বলতে হয় না।
কথা না বলারও তো কিছু নেই।
কিভাবে যে কী হয়ে গেল ।
হয়ে যায়নি। হওয়ানো হয়েছে। আচ্ছা, তুমি বলো তো, যা ঘটেছে তার জন্য দায়ী কে?
আমরা সবাই দায়ী।
এটা তো ঢালাও একটা কথা হলো বাবা। সবাই নয় আমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত দায়ী।
কী বলতে চাইছো তুমি?

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, পুরো ঘটনার জন্য কৃবুরা দায়ী। কিন্তু তারা কেন এমন করল? খুব জোরাল যুক্তি তো আমি খুঁজে পাই না। তাদের তো ক্ষমতার লোভ থাকার কথা নয়। এমন কী তাদের জৈবিক চাহিদাও নেই। তাহলে কী কারণে তারা এমনটি করল?
জানি না। বিষয়গুলো খুব জটিল। মোটেই সরল রৈখিক নয়।

হ্যাঁ, হয়ত জটিল। তবে কৃবুদের নিজে থেকে এ রকম করার কথা নয়। আমরা কেউ নিজেদের স্বার্থে ওদের ব্যবহার করতে চেয়েছি, ওরা বিগড়ে গেছে। আমার তো ধারণা, আমরা ওদের সঙ্গে যেমন আচরণ করব, ওরাও আমাদেরকে সেই রকম আচরণই ফিরিয়ে দেবে।
হঠাৎ করেই ডা. ওশিনের কথা মনে পড়ল ডা. অমিয়’র। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কবি ইরেশের অস্ত্রোপচার করেছিল সে। ডা. অমিয় বললেন, হয়ত তোমার কথা আংশিক ঠিক। তারপর ছেলেকে জিগ্যেস করলেন, তুমি ঠিক মতো খাচ্ছো তো?

হ্যাঁ, খাচ্ছি। আর আংশিক নয় বাবা, অনেকাংশেই ঠিক।
সহজ সিদ্ধান্তে যাওয়া মুশকিল। ওরা তো লাগাম-ছাড়া আনন্দও করেছে।
করেছে। করতে হতো তাই করেছে। তবে আমরা যতটা দেখেছি তার পুরোটাই কিন্তু সত্য বা বাস্তব নয়।
বাস্তব নয়, তাহলে কী?
কিছু সত্যের সঙ্গে কিছু মিথ্যার মিশেল। কিছু বাস্তবের সঙ্গে কিছু অবাস্তবের সংমিশ্রণ।
একটু বুঝিয়ে বলো।
কিছু কিছু ছবি তো আমি বাইরে থেকেও দেখেছি। যেমন ধরো আনন্দ মিছিলে আসল অনেক কৃবু ছিল, নকল অনেক কৃবু ছিল।
নকল কৃবু ছিল মানে?
আরে প্রোগ্রামিংয়ের কারসাজি। চোখের সামনে দৃশ্যমান, কিন্তু আসলে তাদের কোনো শারীরিক অস্তিত্ব নেই। জমায়েত বেশি দেখানোর জন্য এটা করা হয়েছে।
যাতে মানুষ কিছুটা হলেও ঘাবড়ে যায়।
কী বলছো এসব!

ঠিকই বলছি বাবা। নতুন অধিপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানও আমি দেখেছি। ওই অনুষ্ঠানের বেশির ভাগটাই তো ছিল প্রোগ্রাম করা। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অংশটা। সেটা ছিল আসলে একটা দুর্দান্ত প্রোগ্রাম করা ত্রিমাত্রিক প্রদর্শনী।
ওটা প্রোগ্রাম করা ত্রিমাত্রিক প্রদর্শনী ছিল!
আমার তো ধারণা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অধিপতি উতু সশরীরে যাননি। তিনি হলোগ্রাফির সাহায্যেই কাজ সেরেছেন।
কী যুগে যে এসে পড়লাম।
এটা হলো সাইবারনেটিক যুগ বাবা। ইলা গ্রহ তো অনেক আগেই এ যুগে প্রবেশ করেছে।

ডা. অমিয় আলোচনা আর বাড়াতে চাইছে না। ছেলেটা তখন থেকে বকবক করে যাচ্ছে। খাবার ঠিক মতো মুখে তুলছে না। তাই তিনি বললেন, যে যুগে প্রবেশ করেছে করুক। তুমি এখন ঠিক মতো খাও তো। খেয়ে গিয়ে ঘুমাও। ভ্রমণের ক্লান্তি তোমার চোখে-মুখে।
অরিও আর কথা বাড়াল না। মাথা গুজে খেতে থাকল।
ঘুমুতে আসার আগে সে আবার বলল কথাটা। বাবা, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, এই ইলাবৃতে ক্ষমতাধর আরও কেউ আছে। আড়াল থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি।
ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন ডা. অমিয়। গলাটা খাদে নামিয়ে বললেন, তুমি একবার বলেছো শুনেছি তো। একটা কথা সব সময় মনে রাখবে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বার বার বলতে হয় না। তাতে সেটার গুরুত্ব কমে যায়। যাও, ঘুমাতে যাও।
বিছানায় এপাশ ওপাশ করছে অরি। তার ঘুম আসছে না। অনেকগুলো বিষয় ভাবিয়ে তুলেছে তাকে। মেসেজ পাঠিয়েছে কে? সে কী কোনো ফাঁদে পা দিয়েছে?
একটা দিনের হিসাব মিলছে না কেন? সব মিলে তার শংকিত হওয়ার কথা। কিন্তু মোটেই ভয় করছে না তার। এটাও আশ্চর্য হওয়ার মতো বিষয়।

Series Navigation<< বিজ্ঞান কল্পকাহিনি।। ইলাবৃত।। কমলেশ রায়।। পর্ব উনিশবিজ্ঞান কল্পকাহিনি।। ইলাবৃত।। কমলেশ রায়।। পর্ব একুশ >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *