বিজ্ঞান কল্পকাহিনি।। ইলাবৃত।। কমলেশ রায়।। পর্ব তের

তের.

উদয় কাজ করেন সাচি বন্দরে। এই গ্রহে এই একটাই সমুদ্র বন্দর। চাকরির প্রথম দিকে বেশ লাগত। সামনে সাগর। নাম সাঙ্গ। বিশাল জলরাশি। যত দূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। বয়ে চলছে, বয়ে চলছে। অক্লান্ত, ক্লান্তিহীন। মৃদু লয়ের শোঁ-শোঁ আওয়াজ। রোদে ঝিলমিল করে চলমান ঢেউ। ঢেউয়ের ওপরে ডানা মেলে ওড়ে সাদা গাঙচিল। ওড়ে আলবাট্রস, ধলাপেট সিন্ধুঈগল। আরও নাম না জানা কত পাখি। ফ্রিগেট বার্ড নাকি আকাশে উড়তে উড়তেই ঘুমিয়ে নেয়। মেঘের উপর দিয়ে এরা দীর্ঘ সময় উড়ে বেড়াতে পারে। প্রয়োজনে দিনের পর দিন একটানা ওড়ে এই সামুদ্রিক পাখি। আর নোনা বাতাস মাঝে-মধ্যেই শীতল ঝাপটা দিয়ে যায়। মুগ্ধ হয়ে উদয় একটা সময় শুধু সাগরের সৌন্দর্য দেখতেন।

ব্যস্ততা তেমন নেই বললেই চলে। সকাল, দুপুর, বিকেল ও সন্ধ্যায় দুটো করে মোট আটটি জাহাজ ভিড়ে। জাহাজে করে আসে খাদ্যশস্য, সব্জি, মাছ, মাংস, ফল। এই সব জাহাজ আসে সপ্তবটী বন থেকে। ফিরে যায় প্রায় খালি হয়েই, ফাঁকা সব কন্টেইনার নিয়ে। নিত্য ব্যবহার্য অল্প কিছু জিনিসপত্র অবশ্য থাকে কিছু কন্টেইনারে। তবে জিনিসপত্র নেওয়ার পরিমাণ দিনকে দিন আনুপাতিক হারে কমছে। জাহাজ থেকে কন্টেইনার খালাস হয় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে, যান্ত্রিক উপায়ে।

সে এক দেখার মতো ব্যাপার! ঘন্টা খানেকের মধ্যে বিশাল জাহাজ খালি হয়ে যায়।
খালাসের পর কন্টেইনারগুলোও দ্রুততম সময়ে চলে যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে। চারটে জেটির দুটো তো বলতে গেলে বেশির ভাগ সময়ে ফাঁকাই পড়ে থাকে।
জাহাজে করে সাধারণত অল্প কিছু মানুষ মানে ব্যবসায়ী আসে সপ্তবটী বন থেকে ব্যবসার কাজে। কাজ সেরে ইলাবৃত থেকে তারা ফিরে যান দু’একদিনের মধ্যেই।
ফাঁকা জাহাজে করে শুধু তারাই ফিরে যান, তা নয়। এই বসতি থেকে প্রতিদিনই শত শত মানুষ জাহাজে উঠে পড়ে। তারা চলে যায় সপ্তবটী বনে। প্রিয় বসতির মায়া কাটিয়ে তারা একেবারে চলে যায়। এই যাওয়ার হার প্রতিদিনই বাড়ছিল। কঠিন এই সত্যটা যখন উদয়ের সামনে চলে এলো, তখন থেকেই তার ভালো লাগা কমতে থাকল।
সাচি বন্দরের মাঝারি মানের একজন কর্মকর্তা এই মধ্য বয়সী উদয়। চারটে জেটির একটার ব্যবস্থাপক। আধুনিক প্রযুক্তি আর নিখুঁত যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার কারণে কাজ নিজস্ব গতিতেই চলে। তারপরও তাকে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হয়। নজর রাখতে হয় সব দিকে।
কয়েক দিন আগের কথা। তখন বিকেল। অফিস কক্ষে বসে কাজে ব্যস্ত ছিলেন উদয়।
একটু বাদে একটা জাহাজ ছেড়ে যাবে। প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন। হঠাৎ এক প্রবীণ তার কক্ষে হাজির হলেন। চোখ তুলে তাকাতেই তিনি বললেন, কেমন আছো উদয়?

প্রবীণের চেহারাটা চেনাচেনা। গলার স্বর আগে শুনেছেন বলে মনে হচ্ছে। উদয় ভালো করে তাকালেন উনার দিকে। ঠিক মনে করতে পারছেন না, কে এই প্রবীণ?
তাই দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বললেন, ভালো আছি।

মৃদু হেসে প্রবীণ তাঁর পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন। তুলে দিলেন উদয়ের হাতে। কী লেখা এতে? প্রাথমিক ভাবে উদয়ের বুঝতে কষ্ট হলো। মনে হচ্ছে উল্টো করে লেখা। প্রবীণের দিকে তাকাতেই টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করলেন। হাত দিয়ে ইশারায় দেখালেন কাগজটি উল্টো করে ধরতে। প্রবীণের আচরণ উদয়ের কাছে বেশ রহস্যজনক মনে হচ্ছে। তার টেবিলটা কাঠের, উপরিভাগ শক্ত কাঁচ দিয়ে ঢাকা।

কাগজটা উল্টো করে ধরতেই সব কিছু স্পষ্ট হলো উদয়ের কাছে।
‘আমি সাংবাদিক আশীষ। জাহাজে চড়ার ব্যবস্থা করে দাও।’

এতক্ষণে উদয়ের কাছে পরিস্কার হলো প্রবীণের পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে ‘সবুজে বাঁচো’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখনই পরিচয় হয় খ্যাতনামা এই সাংবাদিকের সঙ্গে। তবে আজ উনি মাথায় ক্যাপ পরেছেন। উনার বহুল আলোচিত সাদা গোঁফ ফেলে দিয়েছেন। এই জন্যই চিনতে অসুবিধা হচ্ছিল।
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন উদয়, নিজ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায় তাকে কথা বলতে নিষেধ করলেন সাংবাদিক আশীষ।
হাতের কাগজটা টেবিলে রেখেছিলেন, সেটার দিকে তাকাতেই দেখলেন লেখা উধাও।

একটু বাদে কাগজটাই পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কেন এত গোপনীয়তা, ঠিক বুঝতে পারছিলেন না উদয়। এর পেছনে একটা কিছু অবশ্যই আছে, সেটা অনুমান করতে পারছিলেন। কিন্তু কী সেটা? এই প্রশ্নটাই তাকে বারবার ভাবাচ্ছিল।
প্রবীণ সাংবাদিক আশীষকে সতর্কতার সঙ্গেই জাহাজে তুলে দিয়েছিলেন উদয়।

এই কাজের জন্য তাকে খুব বেশি একটা বেগ পেতে হয়নি। উনি যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলেন। উনার কাছে অন্য নামের নাগরিক পরিচয় পত্র ছিল। শেষ মুহূর্তে প্রতিদিনই কিছু লোক জাহাজে ওঠে। তাদের দলে উনাকে সহজেই ভিড়িয়ে দেওয়া গেছে।

সেদিন দুপুর থেকে ডিউটি ছিল উদয়ের। ফাঁকে একবার ডিজিটাল নিউজ বুকটা দেখে নিয়েছেন। না, তেমন কোনো খবর নেই। ব্রেকিং নিউজ তো পরের কথা। তবে সন্ধ্যায় কবি ইরেশকে জাহাজে উঠতে দেখে মনের সন্দেহটা আরও একটু জোরাল হয়। নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে। ঝাকড়া চুলের কবি ইরেশ সব সময় নিও পলিমারের টি-শার্ট ও প্যান্ট পরেন। সেটাই তার সুপরিচিত পোশাক, নিজস্ব স্টাইল।

আজ তাকে পলি-ফাইবারের পাঞ্জাবি, পায়জামাতে কেমন অচেনা লাগছিল। তার ওপর আবার তেল দিয়ে চুলকে বশে আনতে পেছন দিকে টেনে ঝুটি বাঁধা হয়েছে।
কার সাধ্যি কবিকে চেনে? আর ইরেশ কিন্তু তার পোশাকী নাম, পারিবারিক নাম ইরম্মদ। এটাও সেদিন জানলেন উদয়।

রাত আটটার দিকে বাসায় ফিরেছেন। তখনও নতুন অধিপতি উতুর ক্ষমতা দখলের খবরটা জানেন না উদয়। বউ উপমা রান্নায় ব্যস্ত। মেয়ে অপলা পড়ছে। তারা তেমন কোনো খবর দিতে পারল না। পোশাক বদলে হাতমুখ ধুয়ে এসে টিভিটিতে গ্রহীয় চ্যানেল ‘ইত্তেলা’ ধরলেন তিনি। হ্যাঁ, ব্রেকিং নিউজ দেওয়া হচ্ছে।
হিসাবটা এতক্ষণে মিলল। একটু বাদেই শোনা গেল মিছিলের শব্দ। ধাতব গলায় সবাই সুর করে বলছে, ‘অভিনন্দন। অভিনন্দন। অধিপতি উতু, আপনাকে অভিনন্দন।’
রান্না ফেলে উপমা ছুটে এলেন। স্বামীকে জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে?
ক্ষমতার বদল হয়েছে। নতুন অধিপতিকে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে। উদয় জবাবে বললেন। তার গলায় উদ্বেগ, হতাশা।
ততক্ষণে অপলাও ছুটে এসেছে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে উপমা বললেন, কী হবে এখন?
অযথা চিন্তা করো না তো। আগে দেখা যাক কী হয় । উদয় বললেন।
কিছুক্ষণ পরে রাতের খাবার খেতে খেতে তারা গ্রহবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া নতুন অধিপতি উতুর ভাষণ শুনলেন।

পরদিন ছিল উদয়ের সাপ্তাহিক ছুটি। তাই অফিসে যাননি। অফিসের কেউ তাকে কিছু জানায়নি, তিনি নিজেও জানতে চেষ্টা করেননি। একদিন বাদে অফিসে গিয়ে বড়সড় একটা ধাক্কা খেলেন তিনি। অফিসে পা দিয়েই তিনি জানতে পারলেন বন্দরের দায়িত্বে নতুন পরিচালক এসেছেন। এবং তিনি কৃবুস প্রতিনিধি। নিয়ম পালনের জন্য তাকেও নতুন পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতে হলো।
বাসায় ফেরার পর সেদিন উপমা বললেন,
কী হয়েছে বলো তো? তোমার মুখ এত শুকনো লাগছে কেন? শরীর খারাপ?

এরপর থেকেই উদয়ের সারাক্ষণ মন খারাপ থাকে। উপমার কাছে তিনি কিছুই লুকাননি, খুলে বলেছেন সব। নতুন অধিপতি ক্ষমতা গ্রহনের পর সপ্তবটী বনমুখী মানুষের সংখ্যা আরও বেড়েছে। প্রতিদিনই কেবলই বাড়ছে। উদয় বেশ বুঝতে পারে, চাপা শঙ্কা নিয়ে বসতি ছাড়ছে তারা। মাঝে মাঝে তার ভয় হয়, তিনি নিজেও কী পরিবার নিয়ে এই বসতিতে থাকতে পারবেন? এই বসতি, এই ইলাবৃত কী তাহলে

প্রায় মানব শূণ্য হয়ে যাবে?

Series Navigation<< বিজ্ঞান কল্পকাহিনি।। ইলাবৃত।। কমলেশ রায়।। পর্ব বারোবিজ্ঞান কল্পকাহিনি।। ইলাবৃত।। কমলেশ রায়।। পর্ব চৌদ্দ >>

Leave a Reply

Your email address will not be published.