বিজ্ঞান কল্পকাহিনি।। ইলাবৃত।। কমলেশ রায়।। পর্ব দশ

দশ.

শুধু যন্ত্রমানব আর যন্ত্রমানব। সড়কে, ফুটপাতেও। যেদিকে চোখ যায় সবখানে।
তারা হাততালি দিচ্ছে। তাতে ধাতব শব্দ তৈরি হচ্ছে।
সেই শব্দের তালে তালে নাচছে তারা। ধাতব গলায় সুর করে গাইছে: ‘অভিনন্দন। অভিনন্দন। অধিপতি উতু, আপনাকে অভিনন্দন।’অভূতপূর্ব উদযাপন দৃশ্য। গা শিউরে ওঠা অপার্থিব পরিবেশ। এমন রাত এই ইলা গ্রহে আর আসেনি। এটা কী প্রাথমিক শোডাউন?

মানুষকে বিশেষ বার্তা দিয়ে নিজেদের আধিপত্য জানিয়ে দেওয়া? নাকি তার চেয়েও আরও বেশি কিছু?

আরশি রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর ইকোর গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে অ্যামি। হাত ছাড়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। তার হাত ঘামছে। সেই ঘামে ভিজে যাচ্ছে ইকোর বাম হাতের তালু। অ্যামির বোধ হয় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। সেই কারণেই হয়ত বার বার ঢোক গিলছে সে। ইকো অন্য একটা বিষয় নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। যদিও চোখ-মুখে সেটার ছাপ যাতে না পড়ে সেই চেষ্টা করছে সর্বোচ্চ ভাবে। অ্যামি তাহলে আরও ঘাবড়ে যাবে। ইকোর মাথায় গেড়ে বসা চিন্তাটা হলো, এই রাতে বাসায় ফিরবে কী করে?

আজ শুধুই উদযাপন। সব ধরণের সেবা বন্ধ করে দিয়েছে যন্ত্রমানবরা। উড়ন্ত গাড়ি সার্ভিস বন্ধ। আকাশে একটা বায়ুগাড়িও চোখে পড়ছে না। সড়কে তো গাড়ি চলার সুযোগই নেই। চলন্ত ফুটপাত স্থির হয়ে আছে। পাশ থেকে কে যেন বলল, পাতাল রেল ও মেট্রো রেলও বন্ধ। অতএব হাঁটা ছাড়া গতি নেই। আড়াই কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে। হাঁটা তবুও কষ্ট করে সম্ভব। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়েই তো যত শঙ্কা। অবস্থা তো খুব একটা সুবিধার মনে হচ্ছে না। বাসায় শেষ পর্যন্ত ঠিক মতো পৌঁছাতে পারবে তো? অ্যামি এমনিতে কথা বলতে খুব পছন্দ করে। এখন

একটা কথাও বলছে না। ধাতব হাততালি ক্রমেই যেন জোরাল হচ্ছে। ইকো বউয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, অ্যামি, তোমার তো হাঁটার খুব শখ, তাই না?

অ্যামি শুধু তার বড় চোখ দুটো আরও বড় করে তাকাল। জবাবে আর কিছু বলল না।
ইকো ম্লান হেসে বলল, আজ মনে হচ্ছে তোমার শখ পূরণ হতে যাচ্ছে। চলো হাঁটা শুরু করি।

অ্যামি মাথা নেড়ে সায় দিলো। অন্যসময় হলে ইকোর মনে হতো, ইস, বউটা যদি সব সময় এমন লক্ষ্মী মেয়ের মতো সব কিছুতে মাথা নেড়ে সায় দিতো ! কিন্তু এখন অ্যামির চুপচাপ আচরণ তার ভালো লাগছে না। নিজের বউকে তার নিজের কাছেই অচেনা মনে হচ্ছে।

সড়কে হাঁটার কোনো উপায় নেই। পুরোটাই যন্ত্রমানবদের দখলে। ফুটপাত দিয়েও দেখে-শুনে হাঁটতে হচ্ছে। সড়কের ঢেউ এখানেও আছড়ে পড়ছে। একটা যন্ত্রমানব ইকোর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘হাত ছেড়ে হাঁটুন। তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে পারবেন।’কথাটা শুনে অ্যামি আরও শক্ত করে ধরল ইকোর হাত।
সড়কের দুপাশের বিশাল সব পর্দায় আগে বিজ্ঞাপন ও সচেতনতা মূলক অনুষ্ঠান দেখানো হতো। আজ শোভা পাচ্ছে নতুন অধিপতির ছবি। বার বার বলা হচ্ছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রহবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন তিনি। ইকো খেয়াল করল, বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষক-সুলভ ছাপ অধিপতি উতুর চেহারায়।

তবে তার চোখ দুটো ভীষণ রকম উজ্জ্বল, দৃষ্টি খুবই তীক্ষ্ন ও ধারাল। ইকো আস্তে করে অ্যামিকে বলল, নতুন অধিপতির ছবি দেখেছো?
চোখ নামিয়ে হালকা মাথা দুলিয়ে অ্যামি প্রকাশ করল, হ্যাঁ, দেখেছে। ইকো বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি কি সিদ্ধান্ত নিয়েছো, বাসায় ফিরে তারপর কথা বলবে?
অ্যামি আবার মাথা নাড়াল। হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছো।
ইকো আর অ্যামি হাঁটছে। তাদের মতো আরও অনেকেই হাঁটছে। গ্রহের সব গতি যেন আজ থেমে গেছে। ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। আদিম যুগের মতো হাঁটছে সবাই। সবাই মানে বাইরে থাকা সব মানুষ। হঠাৎ উল্লাস, ধাতব হাততালিতে কানের পর্দা ছেড়ার জোগাড়। তারপর পিনপতন নীরবতা। ইকো পাশের
পর্দাগুলোতে তাকিয়ে দেখল, নতুন অধিপতি উতুর ভাষণ শুরু হয়েছে।
‘সুপ্রিয় ইলা গ্রহবাসী,
চমৎকার এই গ্রহের প্রতিটি বাসিন্দাকে আমি শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

সকল অভিনন্দনও আপনাদেরই প্রাপ্য। প্রিয় মানব জাতিকে বলছি, আপনারা মোটেও ভয় পাবেন না। অসহায় বোধ করবেন না। অতীতের মতোই এই গ্রহে এই ইলাবৃতে আমরা সবাই মিলে-মিশে থাকব। আমার সম্প্রদায়ের প্রতি এই অধিপতির বিনীত আহ্বান, উদযাপন করুন ঠিক আছে। তবে কারও নিরাপত্তা বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত হয়,
এমন কোনো বিছিন্ন ঘটনাও যেন না ঘটে। একটা কথা স্পষ্ট করে বলছি, আইন-শৃঙ্খলার লঙ্ঘন হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তা সে যেই হোক।’

(একটু থামলেন নতুন অধিপতি। হাততালি দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হয়ত। তবে ধাতব হাততালি খুব জোরাল হলো না।)

‘আজ এই গ্রহের ইতিহাসে একটা বিশেষ দিন। আমাদের জন্যও একটা বিশেষ তারিখ। ভবিষ্যতে এই দিনটি প্ল্যাটিনামের অক্ষরে লেখা থাকবে। এমনি একটি বিশেষ দিনে আমি আরেক বিশেষ কাজ করতে চাই। আমাদের সম্প্রদায়ের একটা নামকরণ করতে চাই।’

(এবার থামার পর ধাতব হাততালি বেশ জোরেই হলো।)

‘আমাদের নাম হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সম্প্রদায়। সংক্ষেপে কৃবু সম্প্রদায়। আরও সংক্ষেপে কৃবুস।’

( এবার ধাতব হাততালিতে কান ফাটে আর কী। সঙ্গে সম্মিলিত উল্লাস ধ্বনি:

কৃবুস। কৃবুস। কৃবুস …। )

‘আজ আর কথা বাড়াব না। নতুন এই পথচলা সবার জন্যই আনন্দময় হোক। আমি সেই চেষ্টাতেই আমাকে নিয়োজিত রাখব। সবাইকে আবারও ধন্যবাদ। শুভরাত্রি।’

( আবার ধাতব হাততালি। আবার সম্মিলিত উল্লাস ধ্বনি : কৃবুস। কৃবুস…।

অধিপতি উতু। অধিপতি উতু …।)

ইকো আর অ্যামি হাঁটা থামায়নি। তারা ভাষণ শুনছিল আর হাঁটছিল। পা চলতে চাইছে না। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে তাদের। তবে কেউ কাউকে এই কথাটা বলল না। কিভাবে শুধু মনের জোরে প্রায় অসুস্থ অবস্থায় এই দম্পতি বাসায় ফিরল সেটা তাদের নিজেদের পক্ষেই বর্ণনা করা মুশকিল। দরজায় পা রেখে দম্পতিটির মনে হলো, তবুও ভালো, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, শেষ পর্যন্ত তারা বাসায় পৌঁছাতে পেরেছে।

বাসায় ফিরেই বড় করে শ্বাস নিলো অ্যামি। ইকোও তাই করল। স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে পারছে এখন। অ্যামি এতক্ষণে মুখ খুলল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, খেয়াল করেছো, বাইরে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল?
হ্যাঁ, করেছি। অবশ্যই করেছি। কারণ আমি নিজেও তো কষ্ট পেয়েছি। ইকো বলল।
তারপরও তো তুমি আমাকে বললে না। আমি তো ভেবেছিলাম ক্লান্তিতে শুধু আমারই শ্বাস-কষ্ট হচ্ছে। কেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, বলো তো?
অক্সিজেন ট্রিতে গ্যাস নির্গমন মাত্রা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি খুব কাছ থেকে খেয়াল করে দেখেছি।
কী কা- ! কেন এটা করা হলো?
মানুষ যাতে রাতে বাইরে না থাকে।
অ্যামি আবার চোখ বড় করে ফেলল। আতঙ্কে, বিস্ময়ে।

Series Navigation<< বিজ্ঞান কল্পকাহিনি।। ইলাবৃত।। কমলেশ রায়।। নবম পর্ববিজ্ঞান কল্পকাহিনি ।। ইলাবৃত ।। কমলেশ রায় ।। পর্ব এগারো >>

Leave a Reply

Your email address will not be published.