বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ।। ইলাবৃত ।। কমলেশ রায় ।। চতুর্থ পর্ব

চতুর্থ পর্ব

ডা. ওশিন সোফায় আরাম করে বসে বললেন, তারপর বলুন, কেমন আছেন ? সে এখন কবি ইরেশের বাসায়। কবির মুখোমুখি বসে।
আমি তো অনুক্ষণ আনন্দেই থাকি। জীবন মানেই কিন্তু আনন্দ আর আনন্দ। আমার কাছে বেঁচে থাকাই অপার আনন্দ। কবি ইরেশ বললেন। বলা তো নয়, বরং বলা চলে আবৃত্তি করলেন।
কোনো দুঃখবোধ, বিষাদ তাহলে আপনার জীবনে নেই?
আছে, অবশ্যই আছে। তবে ওগুলো আমি চাপা দিয়ে রাখি। কখনও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেই না। জীবন তো একটাই। সুতরাং অপচয় যত কম করা যায় তত ভালো। আমার জীবন দর্শন হলো আনন্দে বাঁচো। বেঁচে থাকো, আনন্দ করো।
তাহলে বেঁচে থাকাটা খুব উপভোগ করেন আপনি ?
হ্যাঁ, খুব উপভোগ করি। বেঁচে আছি বলেই তো তুমি এসেছো। তোমাকে দেখছি, তোমার সঙ্গে কথা বলছি। তোমাকে বুঝতে চেষ্টা করছি। তোমার এই উপস্থিতি তো আমি দারুণ ভাবে উপভোগ করছি। জীবন তো ক্ষণিকের। একটু বাদেই তো শেষ হয়ে যেতে পারে। কবি ইরেশ শুধু এটুকু বলেই থেমে থাকলেন না, তীক্ষ্ম চোখে তাকালেন।

ডা. ওশিন চমকে উঠলেন। কী অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। এই ভবনে ঢোকার সময় দারোয়ান তাকে আটকে ছিল। কিভাবে এসব সাধারণ যন্ত্রমানবকে সামলাতে হয়, সেটা তার ভালো করেই জানা আছে। তাই এই বাসায় আসতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। তবে এই কবিকে সামলানো মোটেই সহজ নয়। ডা. ওশিন মিষ্টি করে হেসে বললেন, আপনাকে যত দেখি তত মুগ্ধ হই। ঠিক আপনার কবিতার মতো।
তুমি নিশ্চয়ই আজ কবিতা নিয়ে কথা বলতে আসোনি ? চোখে চোখ রেখেই বললেন কবি ইরেশ।
না, আমি এসেছি কবিকে দেখতে।
কে পাঠিয়েছে তোমাকে ?
অমিয় স্যার। কেন, উনি আপনাকে জানাননি ?
হ্যাঁ, জানিয়েছেন। তুমি কি অস্ত্রোপচার করার জন্য তৈরি হয়ে এসেছো ?
অবশ্যই। স্যার তো বলেছেন আপনার বেডরুমকেই অপারেশন থিয়েটার বানানো হয়েছে। চলুন, যাওয়া যাক। খুবই ছোট্ট অপারেশন। একদম ঘাবড়াবেন না। আমার একটা অনুরোধ আছে।
কী অনুরোধ, বলুন ?
আমাকে অজ্ঞান করা চলবে না।
শুধু শুধু ব্যথা ভোগ করতে চান ?
হ্যাঁ, চাই। আমি যে ঘাবড়ে যাইনি সেটা বোঝানোর জন্যও চাই।
এবার কবি ইরেশের দিকে গভীরভাবে তাকালেন ডা. ওশিন। হেসে বললেন, তার মানে আপনি আমার ওপর ভরসা করতে চাইছেন না।
ধরো তাই। তুমি আমার কে, কেন তোমার ওপর ভরসা করব ? কবি ইরেশ তীক্ষè চোখে তাকিয়ে আছেন ডা. ওশিনের দিকে।
এই মুহূর্তে আমি আপনার চিকিৎসক। তার চেয়ে বড় কথা আমি আপনার কবিতার একজন বড় ভক্ত। এবার চলুন তো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
যেতেই হবে?
হ্যাঁ, না গিয়ে তো কোনো উপায় নেই।
তাহলে চলো। আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখী, আমি যে পথ চিনি না…।
এটা কি আপনার লেখা লাইন ?
না, দূরের একটা গ্রহের অনেক পুরাতন একটা গানের কলি। আমি শুধু সখার জায়গায় সখী বলেছি।
আপনি আসলেই খুব মজার মানুষ।
ডা. ওশিন একাই অস্ত্রোপচার করলেন। কবি ইরেশ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সব দেখলেন। তাঁর পাকস্থলীতে গুরুতর ঘা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফসল। ডা. ওশিন প্রথমে তাকে একটা ক্যাপসুল খেতে দিলেন। ওটা আসলে ক্যাপসুল নয়, ক্ষুদ্রাকৃতির একটা যন্ত্র। যন্ত্রটার লাটাই ডা. ওশিনের হাতে। খুবই যত্ন করে প্রথমে ঘা পরিস্কার করা হলো। কী একটা ওষুধ দিয়ে ধোয়া হলো জায়গাটা। তারপর যেটা করা হলো তাকে সহজ ভাষায় বলা চলে ঝালাইয়ের কাজ। কোষে কোষ মিলিয়ে দিয়ে আস্তে-ধীরে সমান করে ফেলা হলো ক্ষতের জায়গাটা। এরপর ভীষণ পাতলা একটা পর্দা দিয়ে সেখানটা ঢেকে দেওয়া হলো । ক্ষত শুকানোর সঙ্গে সঙ্গে পর্দাটা মিলিয়ে যাবে। কী আশ্চর্য, কাজ শেষ হলে ক্ষুদ্রাকৃতির যন্ত্রটা গলে গেল পাকস্থলীর ভেতর।
অপারেশন শেষ। ডা. ওশিন হেসে বললেন। এই হাসিটা মাপা, পেশাগত ভাবে দীর্ঘ দিনের চেষ্টায় অর্জন করা হাসি।
ধন্যবাদ। তাহলে এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম। কবি ইরেশের মুখে রহস্যের হাসি।
হ্যাঁ, তা বলা যায়।
তুমি তাহলে আমাকে বাঁচিয়ে দিলে। এবার কবি ইরেশের গলায়ও রহস্য।
চিকিৎসকদের কাজই তো তাই। আপনি এবার বিশ্রাম করুন, আমাকে যেতে হবে।
যেতে হলে যাবে। যাওয়ার আগে একটা সত্যি কথা বলবে ?
আগে শুনি কী কথা।
তুমি তাহলে মানবী নও।
হঠাৎ একথা কেন বলছেন ?
এই অধম কবি কোনো নারীকে হাত ধরতে বললে সাধারণত সেই আহ্বান কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। কিš‘ তুমি সেটা পেরেছো। (আরও কয়েকটি বিষয় আছে যা কবি ইরেশ বললেন না। নিজের ভেতরেই রাখলেন। গোটা অস্ত্রোপচারের সময় ডা. ওশিন ছিলেন অস্বাভাবিক রকমের সাবলীল। কোনো রকম চিন্তায় একবারও তার কপালে ভাঁজ পড়েনি। তার চোখের পলকও বলতে গেলে পড়েনি। জায়গা থেকে একটুও নড়েনি। অতটা সময় একই জায়গায় এমন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আরও আছে, থাক…। মনে মনে ভাবলেন কবি ইরেশ।)
কবি ইরেশের দিকে তাকিয়ে ডা. ওশিন মুচকি হাসলেন। বড় রহস্যময় সেই হাসি।

Series Navigation<< বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ।। ইলাবৃত ।। কমলেশ রায় ।। পঞ্চম পর্ববিজ্ঞান কল্পকাহিনি ।। ইলাবৃত ।। কমলেশ রায় ।। সপ্তম পর্ব ।। >>

Leave a Reply

Your email address will not be published.