উপন্যাস।। ছায়াপথ।। মোজাম্মেল হক নিয়োগী।। পর্ব তিন

নজর লাগলে কী হবে?
নজর লাগলে কী তা বলে দিতে হবে? বেশি আহ্লাদ।
আসিফের মুখ কালো যায় মুহূর্তে। এমন কথা বলতে পারলে?

এজন্য এভাবে মন খারাপ করতে হয় বুঝি? জানো, আমি মনে করতাম ইঞ্জিনিয়াররা ইটপাথরসিমেন্টবালি আর লোহা লক্করের মতই কাঠকুট্টা হয়। কিন্তু তোমাকে দেখছি খুবই রোমান্টিক। এই রোমান্টিকভাব কি শুধু বিয়ের আগ পর্যন্তই থাকবে না কি পরেও থাকবে?

যারা রোমান্টিক তারা চিরকালই রোমান্টিক। আমি লোহালক্করের মতো নয়। অনেক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়ত কংক্রিটের মধ্যে মানুষের হৃদয় নিংড়ানো অনুভূতি দেখতে পায় না। আমি পাই। আমি কংক্রিটের দেয়ালে শ্রমিকের ঘামের গন্ধ, কষ্টের নিশ্বাস, আবার আর্কিটেক্টের শিল্পীময় নকশায় জীবনের ঘনিষ্টতা দেখি। আমি দেখতে পাই মানুষ আর প্রকৃতির মাঝে কংক্রিটের কখনো নিষ্ঠুরতা আবার কখনো স্বপ্নময়তা।

ভালো বললে। আর না। আমি কঠিন কথা বুঝি না। সহজ করে বলো।

আসলে জানো রোজী। প্রতিটি মানুষের জীবন এক ভাবে মাপা যায় না। একই শব্দ দিয়ে একটি জাতিকে বা একটি গোষ্ঠীকে ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রত্যেকটি ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যবোধ আছে। আমি বিশ্বাস করি প্রকৃত সত্যকে অবধারণ করে মানুষ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসাতেই জীবনের স্বার্থকতা।

আবার ভারি ভারি কথা।

রোজী আনমনা হয়ে পড়ে। মনে মনে বলল, দুর্নীতির জন্য এদেশের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারদের সুনামের চেয়ে বদনামের পাল্লা অনেক ভারি। শুধু রোজগারের জায়গাতে নিশ্চয়তা আছে বলেই তাদের সামাজিক মর্যাদা অনেক বেশি। আর তার সাথে আছে কিছু ভালো মানুষ যাদের কৃতিত্বের জন্য এই দুটি পেশার প্রতি মানুষের দুর্বলতা চরমে। উপর্জানের গূঢ়রহস্য জানলে হয়ত এদের সামাজিক এত প্রতিপত্তিশীল মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতো না।

 আসিফ হয়তো কিছু ভালো মানুষের মধ্যেই একজন।

কী ভাবছো এভাবে আনমনা হয়ে?

রোজী হকচকিয়ে যায়। না, কিছু না।

অবশ্যই কিছু ভাবছো।

ভাবছি, তুমি খুব সুন্দর করে কথা বলো। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

কেন নয়? অবশ্যই করবে।

মানুষ কি প্রেমে পড়লে এমন সুন্দর করে কথা বলে?

আসিফ হাসে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, আমার তো আর অভিজ্ঞতা নেই যে তার ব্যাখ্যা দিতে পারব। তবে আমার কথা তোমার ভালো লাগছে আর তোমার কথা আমার ভালো লাগছে; এই ভালো লাগালাগির সুতা ধরে টানাটানি করেই হয়তো প্রেম হয়। প্রেম হয় বলেই হয়তো সবকিছু ভালো লাগে।

রোজী হাসে। এখানেও দর্শন! বিয়ের পর এই দর্শন নাকি থাকে না? আচ্ছা তুমি বিশ্বাস করো প্রেমের বিয়ে নাকি টিকে না?
না, তা করব কেন? বিয়ে কেন টিকবে আবার কেন টিকবে না তা হলফ করে কেউ বলতে পারে না। হঠাৎ এমন উদ্ভট কথা বললে কেন?
ভাবছি যদি তোমাকে পেয়ে যদি কোনো সময় হারাতে হয়? ভয়ে বুক কাঁপছে।
শুরুতেই এমন অবান্তর ভাবনা ভাবছো কেন? আমার কাছে ভালো লাগছে না।

রোজী হাত বাড়িয়ে আসিফের হাত ধরে। আসিফ যেন বিদ্যুৎস্পর্শিত হয়। এমন বৈদ্যুতিক প্রবাহ কেন সারা শরীরে বয়ে গেল? রোজী আস্তে আস্তে বলল, আর বলব না। আমি সবটুকু সমর্পণ করে ফেলেছি। তাই ভাবছি যদি কোনোভাবে তোমাকে হারাতে হয় তাহলে আমি বাঁচব না।

আসিফ যেন হঠাৎ নিভে গেল। শরীরটা ঝিমঝিম করছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। নারীর হাতের স্পর্শ আর এমন কথা মধুময় কথা, জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা; আসিফ কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

আবার কখন দেখা হবে?

আমি তো সারাদিনই সাইটে থাকি। আসলে নতুন প্রাইভেট চাকরি।

তাহলে?

চিঠি লিখবে। খুব সুন্দর করে। অনেক দীর্ঘ চিঠি।

না, পারব না। আমি চিঠি লিখতে পারি না। আমার খুব বানান ভুল হয়।

তাতে কী? আমি বুঝতে পারলেই তো হলো।

না, পাছে আমার দুর্বলতা ধরা পড়বে আর তুমি আস্তে আস্তে আমাকে ছেড়ে যেতে থাকবে। ঘুড়ির উড়িয়ে দিয়ে যেভাবে সুতা ছাড়ে। তারপর একদিন সুতু কেটে আমি কোথাও হারিয়ে যাব ভুকাট্টা ঘুড়ির মতো।
যে এত সুন্দর উপমা দিতে পারে সে আবার লিখতে পারবে না। চিঠি লিখবে কিন্তু। না-হয়, রাগ করব।
রাগ ভাঙিয়ে নেব। রোজী আসিফের নাকের ডগায় আঙুল দিয়ে চাপ দেয়।
দূর থেকে ডাক দেয় জীবন। কীরে আসিফ? দুপুর যে গড়িয়ে গেল। খিচুড়ি যে গান্ধা অয়া যাইতাছে। খাইবি কখন?

ওরা দুইজনই ছাতিমগাছের তলায় এসে ওদের পাশে বসল। আসিফ বলল, এত বেলা হয়ে গেছে তো বুঝতেই পারিনি। খুব ক্ষিধে যে লাগছে তা এখন বুঝতে পারছি।

রোজীও বলল, ঠিকই ভাবি। আসলেই ক্ষিধে লেগেছে। তাড়াতাড়ি খাওয়ান।

ভাবি গুনগুন করে গান গায়, ‘না মজিলে কি তারে পাওয়া যায়?’

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে জীবন জিগ্যোস করল, আরও বসবি নাকি ফিরবি? না, এবার ফেরা যাক, আসিফ বলল। সন্ধ্যার আগেই ওরা বাসায় ফেরে। ধীরে ধীরে রাত নামে। চমৎকার জোছনা ঢালছে দূরের চাঁদ। জোছনা-ধোয়া রাতে আসিফের যেমন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে ঠিক তেমনি রোজীরও।

দুজনেরই বুকের ভেতরে নানা ভাবনা ফেনিয়ে ওঠে, চোখে মঞ্জুরিত হয় স্বপ্নের পুষ্পবীথিকা। আসিফ সেদিন দুপুর বেলায়ই বাসায় চলে এসেছে। অসম্ভব অস্থিরতা তার মধ্যে। শরীর কাঁপছে। আসিফ বলল, ভাবি একটা কথা বলব?

কী হয়েছে? আপনি এমন অস্থির কেন? ভাবি জানতে চাইল।

বাসা থেকে একটা জরুরি টেলিফোন এসেছে মায়ের অসুখ। আমি এখনই ঢাকা যাচ্ছি। আমাকে এখনই বের হতে হবে।
আসিফের কথা শুনে ভাবিও উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। আবার জিগ্যেস করল, কী অসুখ? তিনি কি হাসপাতালে, না বাসায়?
আসিফ বলল, টেলিফোনটা আমি রিসিভ করিনি। আমাদের ম্যানেজার রিসিভ করেছে।
আমাকে বলল, মায়ের শরীর খুব খারাপ। আমার ছোট বোন ফোন করে জানিয়েছে। আজকেই যেতে হবে। মার অসুখ হলে আমি স্থির থাকতে পারি না ভাবি।

আসিফ ছোট্ট একটা চিঠি লিখে রোজীকে, মায়ের অসুস্থতার খবর পেলাম আজ। টেলিফোন নিউজ। খুব সিরিয়াস না হলে টেলিফোন করার কথা নয়। তুমি হয়তো জানো না সংসারে আমার মা আর ছোট্ট বোন নিশা ছাড়া আর কেউ নেই। মাকে আমি কত ভালোবাসি তাও তুমি বুঝবে না। আমি আজই ঢাকায় যাচ্ছি। ভাবির কাছে তোমার একটা ছবি দিয়ো। মাকে দেখাব। ভালো থেকো। আসিফ।

ভাবি আপনি দয়া করে রোজীর সঙ্গে একটু দেখা করবেন? খুব জরুরি প্রয়োজন। চিঠিটি লিখেছি একটা ছবি চেয়ে─বুঝতেই পারছেন। ছবিটা মাকে দেখাব। আর আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে দেখব। ঘর্মাক্ত মুখে আসিফ হাসে।

ভাবি রোজীর হাতে চিঠিটা দেওয়ার পর রোজী চিন্তিত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর বলল, আপনার দেবরের একটা ছবি আনতে পারলেন না ভাবি?
ভাবি একটু চিমটি কেটে কথা বললে, চোখের ফ্রেমে ছবি নেই?
রোজী হাসে। তা আছে। কিন্তু চোখের ফ্রেমের ছবি তো মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়।
ভাবিও হাসে। ভাবি বলল, আমার বাসার দরজা তো তোমার জন্য খোলাই আছে। ওর কাছে
থাকলে রেখে দেবো। তুমি এক সময় এসে নিয়ে যেয়ো।
রোজী অনেকগুলো ছবি বের করে ভাবিকে বলল, কোন ছবিটা দেব ভাবি? ছবিগুলো ভালোভাবে দেখে রোজী একটা ভাবির হাতে দিল। ভাবি আপনি ওকে বলবেন, তাড়াতাড়ি চলে আসার জন্য। কেমন যেন অস্থির লাগছে।

ভাবি হেসে হেসে বলল, এখনই এমন লাগছে? পরে কী হবে?
রোজী বলে, সত্যি বলছি ভাবি কেমন যেন লাগছে। বোঝাতে পারব না। এমন হয় কেন?

ভাবি বলল, এমন হয় কারণ প্রেমের আগুন এভাবেই মানুষকে জ্বালায়। এই সত্য বড়ই কঠিন।
বুঝি তবে তোমাকে বোঝাতে পারব না। যাই।
সে আবার পথের দিকে চেয়ে আছে।

ভাবি চলে যাওয়ার পর রোজী বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল যাতে আসিফ যে পথ দিয়ে যায় তাকে দেখা যায়। পথ থেকে বারান্দা অনেকটা দূর। কোন কথা বলা সম্ভব হয়নি। চোখের ভাষা থেকে বোঝা যায় তাড়াতাড়িই তোমাকে আসতে হবে, না-হয় আমার খুব কষ্ট হবে।

Series Navigation<< উপন্যাস।। ছায়াপথ।। মোজাম্মেল হক নিয়োগী।। দুই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *