উপন্যাস।। ছায়াপথ।। মোজাম্মেল হক নিয়োগী।। পর্ব এক

আসিফ প্রায় প্রতিদিনই যে কথাটি বলে আজকেও ভারি ভারি এবং বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, টেলিফোনটা কে যে করেছিল জানতে খুব ইচ্ছে করে, বুঝলি নাদিম—খুব ইচ্ছে করে। নাদিম কোনো কথা বলেনি। আসিফ কিছুক্ষণ নীরব থাকে। তার চোখেমুখে হতাশার ছায়া। সে আবার বলল, এতদিন পরও জানতে পারলাম না কে আমাকে ফোন করেছিল? কেন করেছিল? কী ছিল তার স্বার্থ? আমার এতো বড়ো একটা ক্ষতি করল! মেনে নিতে পারি না। আবার নীরবতায় কেটে যায় কিছুক্ষণ।

আসিফ আবার বলল, নাকি অলৌকিক কোনো ফোন—তাও বুঝতে পারছি না। নাদিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, জানতে পারলে কী হতো রে আসিফ? কী করতে পারতি?

তোর ভাগ্যে যা ছিল মনে কর তাই হয়েছে। তুই যে বাসে এসেছিলি সে বাসে যারা ছিল তাদের কি কেউ ফোন করেছিল? কয়েকজন তো মারাই গেল। তুই বেঁচে আছিস তাই বা কম কীসে?

দুপুরের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলেও ঘাম নিঙড়ানো মড়জ্বালা গরমটা এখনো কমেনি। নিস্তরঙ্গবাত—অনড় গাছের পাতা, ঝাঁঝালো নয় নিভন্ত রোদ, জমাট আর্দ্রতা—আকাশ ছাওয়া ছেঁড়া-টুকরো ত্যানার মতো মেঘখন্ডগুলো কখনো নিশ্চল আবার কখনো সচল। বৃষ্টি হবে হবে করেও হচ্ছে না। হয়তো আর একবার বৃষ্টি হলে ভ্যাপসা গরমটা কেটে যেত। অনেকেই চেয়ে আছে আকাশের দিকে—যদি মেঘের টুকরোগুলো জমাট বাঁধে তাহলে হয়তো বৃষ্টি হতে পারে। বাতাসের গতি বাড়লে হয়ত মেঘখÐগুলো জমাট বাঁধতে পারত কিন্তু সে-রকম ঘটনা ঘটবে কি হবে না কে জানে?

আসিফদের ড্রয়িং রুমে নাদিম বসে আছে আসিফের ঠিক সামনেই একটি কাঠের চেয়ারে। দুজনের মাঝখানে একটি বেতের কাঠামোয় কাচের টেবিল। দক্ষিণের জানালাটি খোলা। লোডশেডিংয়ের জন্যই রুমের ভেতরেও গরমটা বেশ জমজমাট। আসিফ ও নাদিম গরমের যন্ত্রণায় ছটফট করছে; নাদিম জামার বুকের বোতাম দুটি খুলে একটা খাতা নিয়ে বাতাস করছে।

তিনপাশে চৌতলা দালানের মাঝখানে আসিফদের বাড়িটি নিচতলায় হওয়াতে দিনের আলো-বাতাসের স্পর্শ পাওয়া বিরল ঘটনা।

আসিফ ভারি নিশ্বাস ফেলে বলল, তাও তো কথা। জানতে পারলে কি-ই-বা হতো? কি-ই-বা করতে পারতাম? যেটুকু ক্ষতি হবার সেটুকু তো হয়েই গেছে। এই ক্ষতি কি ফিরে পেতাম?

কষ্টঝরা একটা দীর্ঘশ্বাস তার বুকের গভীর থেকে হয়ে বের হয়। এ রকম দীর্ঘশ্বাস তার বুকের ভেতরে এখন বাসা বেঁধেছে। সময় সুযোগ পেলেই নাকমুখ দিয়ে বের হয়ে বাতাসে মিলায়। তখন নাদিমের বুকও ভারি হয়ে ওঠে। কিন্তু টেলিফোন কে করেছিল তা নাদিমও বলতে চায় না। এক প্রকার অন্তর্দহন নাদিমকে যখন বারবার দগ্ধ করে তখন তার বুকের ভেতরও যেন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুপাত ঘটে আর গলিত লাভা ছড়িয়ে পড়ে তার সারা শরীরে, প্রতিটি কোষে-কলায়। তখন সে কথা বলতে পারে না। মনে হয় সারা শরীর-মনে বিষের তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়।

কারো সঙ্গে ভালো আচরণও করতে পারে না। গম্ভীর হয়ে বসে থাকে অথবা মেজাজ খিঁচানো আচরণ করে। মাঝে মাঝে তার কষ্টের মাত্রা বেড়ে গেলে বাসার বাইরে গিয়ে রাস্তায় হাঁটতে থাকে কিংবা কোনো পার্কের বেঞ্চে বসে থাকে বা শুয়ে থাকে। তখন তার শরীর কাঁপতে থাকে।

যন্ত্রণার একটা হিমস্রোত শিরদাঁড়ায় বয়ে বেড়াতে থাকে। কখনো বা মনে হয় এই যন্ত্রণা গ্রীল মেশিনের মতো নাদিমকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। নাদিমের অস্থিরতা বেড়ে যায়।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আসিফের জন্য ভালো একটা কিছু করার জন্য সে পাগলপ্রায় হয়ে পড়ে। আসিফের জীবনকে সহজ করার জন্য সে কিছু একটা করতে চায়, আসিফকে স্বাবলম্বী করতে চায়, করতে চায় আত্মনির্ভরশীল।

আসিফ তার চোখের আলো কোনোদিন ফিরে পাবে কি না তা সে জানে না। ডাক্তারও পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারেননি। হাসপাতাল থেকে রিলিজ হওয়ার সময় বলেছিলেন, উন্নত চিকিৎসা করাতে পারলে আসিফ দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেতে পারে। আসিফের বুকের ভেতরও চৈত্রের খরাদাহ। এক অশান্তির দাবদাহ সারা শরীর জুড়ে ক্রমাগত বিস্তার লাভ করছে কিন্তু এই দাবদাহ নেভানোর কোনো উপায় নেই। এমন তীব্র মনোকষ্টে থেকেও আসিফের অটুট বিশ্বাস সে কোনো দিন হয়তো চোখে দেখবে, চোখের আলো ফিরে পাবে। তার বিশ্বাস বিদেশে চিকিৎসা করালে সে ভালো হবে। কিন্তু বিদেশে চিকিৎসার জন্য টাকা পাবে কোথায় সে প্রশ্নটা যখন সামনে আসে তখন চোখের আশা ছেড়ে দিয়ে রংচটা ছালচামড়া ওঠা ভাঙা বেতের সোফায় সে ঝিম ধরা লাটিমের মত বসে থাকে।

একতলার বাড়িটার দক্ষিণ দিকের রুমটিতে থাকে আসিফ। দক্ষিণের জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে সামান্য বাতাস বদ্ধ রুমের ভেতরে প্রবেশ করলেও সঙ্গে নর্দমার দুর্গন্ধ মিশিয়ে আনতে ভুলে না। বাসাটির দক্ষিণ পাশ দিয়েই এক বিরাট নর্দমা। নর্দমার অপর দিকেই আরেকটি গলি যেখানে বিরাট বিরাট প্রাসাদ আসিফদের বাড়িটিকে নিচে ফেলে রেখেছে। বটবৃক্ষের নিচে যেন ভাটফুলের গাছ। এই বাড়িতে সূর্যের আলো পড়ে না। সারাদিনই ছায়াচ্ছন্ন। স্থানে স্থানে পলেস্তারা উঠে গেছে। পুরো বাড়িতে তিনটি ছোট ছোট রুম। বাইরের দেয়ালে যেমন পলেস্তারা উঠে গেছে ঠিক তেমনি ভেতরের দেয়ালেও খসে পড়েছে এককালের নীল রঙে প্লাস্টিক ডিসটেম্পার। বাসার কোণা-কানায় পোকামাকড়ের কলোনি। রাতের আলো- আঁধারে ইঁদুর চিকা-ইঁদুরের অবাধ চিটমহল। অবাধে চলাফেরার সহজ আবাসন। এই এলাকায় নিচতলা বাড়ির জন্য তাদের কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না। মাঝে মাঝে দুএকটা বিড়ালও কোথা থেকে আসে আবার কোথায় চলে যায়। এদের মতিগতি বোঝা সহজ নয়। পুবপাশে একটি এবং দক্ষিণ পাশে চৌতলা বেশ কয়েকটি বাড়ি হয়েছে কিছুদিন আগে। পাশের বাড়িগুলো আস্তে আস্তে নতুন ঢঙে বদলে যাচ্ছে। সংস্কার হচ্ছে। শুধু আসিফরাই পারেনি তাদের বাড়িটির সংস্কার করতে। আসিফ মাঝে মাঝে ভাবে এটিকে বাড়ি বলা যাবে কি না—ঢাকায় রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষার মাথা গোঁজার সামান্য ঠাঁই।

আসিফের বাবা ব্যাংকে চাকরি করতেন। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত তৈরি করেই একদিন তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। এরপর বাড়ির কাজ আর এগোয়নি। তবু ঢাকায় থাকার একটু জায়গা হয়েছে তাতে কম কী? বাড়িটি ঠিকঠাক করার অনেক আগেই প্রয়োজন থাকলেও টাকার অভাবে বাড়িতে আর হাত দেওয়া হয়নি। একবার শুধু দরজা জানালা ঠিক করা হয়েছিল এই পর্যন্তই। বাড়িটা ঠিকঠাক করার প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ই আফিসের স্বপ্ন ভেঙে গেল। আসিফ এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একটা সুন্দর রুচিশীল বাড়ি নির্মাণের স্বপ্নটিও যেন স্মৃতি থেকে হারাতে বসেছে। বেঁচে থাকাই এখন বড় স্বপ্ন। রক্তমাংসের শরীরের ভেতরে আত্মার বাসা−আত্মা থাক নিশ্চিন্তে—একে বিরক্ত করে কোনো লাভ নেই। তাকে তার মতোই বাড়তে দেওয়া উচিত। ভাবতে ভাবতে আসিফ শান্ত হয়।

কয়েক বছর আগে আসিফ নিজের হাতে অনেকগুলো ফুলগাছ লাগিয়েছিল বাড়ির বারান্দায়। এখানে কয়েকটি টব আছে। রাতের শুরুতে সে মাঝে মাঝে বেতের চেয়ার পেতে এখানে বসত—তখন আত্মতৃপ্তিতে তার শরীর জুড়িয়ে যেত। লোডশেডিং হলেই আসিফ বেতের চেয়ারটা টেনে নিয়ে আসত এখানে। আবার বিদ্যুৎ এলে পড়ার টেবিলে ফিরে যেত। কোনো কোনো দিন গভীর রাতে এসে সে বাসার সামনের সরু রাস্তায় হাঁটত একান্ত আপন মনে। অনেকক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করে দু-একটা কবিতাও লিখত। কোনো দিন এই কবিতা ছাপার জন্য কোনো পত্রিকায় পাঠাত না কিংবা কাউকে বলতও না। কবিতা নিজের জন্যই লিখত। নিজেই পড়ে আনন্দ পেত। কবিতা যুতসই না হলে মনে মনে ভাবত, কোনো কিছু সৃষ্টি কি ঐশ্বরিক। আমার কবিতার ভাব আছে তো শব্দ নেই, শব্দ আছে তো ছন্দ নেই, ছন্দ আছে তো শব্দের গাঁথুনি নেই, গাঁথুনি আছে তো অন্তর্গত দর্শন নেই, অন্তর্গত দর্শন আছে তো বিমূর্ত শিল্প নেই—এমন ভাবনার জালে জড়িয়ে আক্ষেপও করত।

খুব বেশি দিন আগের কথা না হলেও সেসব দিন এখন মনে হয় পুরনো। বাতিল। আসিফ যখন রাজশাহী বিআইটিতে পড়ত তখন পদ্মার পাড়ে বসে মাঝে মাঝে গিয়ে বসত। একান্ত নিভৃতচারী, একান্তে ভাবনাচ্ছন্ন হয়ে ভাবত সাহিত্য নিয়ে। পদ্মার প্রমত্ত ঢেউ পদ্মাকে আলোড়িত করত ঠিক তেমনি তার মনোজগতেও ভাবনার ঢেউ তুলত—পদ্মার মত সেও আলোড়িত হত। পদ্মার পারে বসে বসে আসিফ ভাবত লেখা হয় স্বতঃধারায়। পদ্মা যেমন স্বতঃধারায় প্রবাহিত হয় ঠিক তেমনি কোনো লেখাও স্বতঃধারায় প্রবাহিত হয় অন্তর্গত ভাবনার স্রোত নিয়ে—জোর করে লেখা যায় না। নিজের ভাবনাগুলোকে শিল্পমানে প্রকাশ করতে না পারার ব্যর্থতায় মাঝে মাঝে চিন্তাক্লিষ্ট হতো, মনমরা হয়ে যেত। এখনও তার সেসব কথা মনে হয়; তার ভাবনার প্রবাহিত নদীর মধ্যে অতীত যেন কষ্টের ডুবোচর হয়েই জেগে আছে।

অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকাতে নাদিমের যেমন অসহ্য লাগছিল ঠিক তেমনি আসিফেরও। এক সময় নাদিম বলল, আজকে আসি রে। আমার ভালো লাগছে না। কাল এক সময় আসব। নাদিম বাইরে বেরিয়ে এসে উদভ্রান্তের মত হাঁটতে হাঁটতে গলির রাস্তাটা ছেড়ে এসে বড় রাস্তায় দাঁড়ায়। কোন দিকে যাবে ঠিক করে আবার হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে সে এক সময় চলে আসে চন্দ্রিমা উদ্যানের লেকের পাশে। উদ্যানে অনেক মানুষের ভিড়। গাছের চারাগুলো এখনো ছোট ছোট। কবে বড় হবে কে জানে? কোথায় বসবে কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর উত্তর দিকে হাঁটতে থাকে। সেখানে মানুষের ভিড় কম। তবে মেয়েদের দালালের খপ্পরে পড়ার আশঙ্কা আছে। সে ভয়ও তার মধ্যে কাজ করছে। এসব নানা দিক ভেবে উদ্যানের মাঝামাঝি একটি স্থানে এসে ঘাসের চাতালে চিৎ হয়ে আকাশটা বুকে নিয়ে শুয়ে থাকে।

পুরনো ঘা গা-সহা, নতুন ঘা দুর্বিষহ। আসিফের দুর্ঘটনাটা খুব বেশি দিনের পুরনো নয়। তাই সে নাদিমের সঙ্গে কিংবা ওর বোন নিশার সঙ্গে এই কষ্টের কথাগুলোই বেশি বলে। নিশার আপন ভাই বলে কথা, দরদ দিয়ে ভাইয়ের কথা শোনে, অনুতপ্ত হয়, সমব্যথী হয়। কিন্তু নাদিম তো বন্ধু মাত্র—পুরনো কথা আর শুনতে ভালো লাগে বরং অস্থির হয়ে ওঠে। এ অস্থিরতা

কীসের? পুরনো কথা বলে না কি অন্য কারণে?

এই তো কয়েক মাস আগে সিভিল ইঞ্জিনিয়াপর আসিফ পাঁচ-ছয় মাস আগে একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মে চাকরি নিয়ে চট্টগ্রামের মীরেরসরাই গিয়েছিল। নতুন চাকরিতে মানুষের কাজ শেখার অদম্য আগ্রহ থাকে বিশেষ করে উদ্যমীদের। আসিফের বেলাতেও তাই হয়েছিল। পুঁথিগত জ্যামিতিক থিওরি আর বাস্তবতার লোহা-ইট-সিমেন্ট-বালির সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য হাতড়ে বেড়াচ্ছিল বেপরোয়া হয়ে। কাজের ফাঁকফোঁকরে বন্ধু জীবন এবং তার পত্নীর সঙ্গে জম্পেশ আড্ডা দেওয়া ছাড়াও সুযোগ-সুবিধামত এই উপজেলায় বেড়াতে আসা এক অষ্টাদশী তন্বীর সঙ্গে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে বাহুবন্ধনে টেনে আনার প্রাণান্তকর প্রয়াসও চালিয়ে যাচ্ছিল প্রাণচঞ্চল এই তরুণ ইঞ্জিনিয়ার।

জীবন উপজেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তা। শৈশবের বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই আসিফ তার বাসায় থাকে। বাসা ভাড়া কিংবা খাওয়ার খরচ কিছুই সে দিতে পারে না বন্ধুত্বের খাতিরেই। তবে আসিফ কিছুটা হিসাব রেখে মাঝে মাঝে বাজার করে যাতে বাসা ভাড়া কিংবা খাওয়ার খরচের উসুল উঠে যায়। জীবন এবং তার স্ত্রী আসিফকে প্রথম প্রথম বাধা দিত। রাগও করত। আসিফ সে বাধা মানে না। প্রথম দিকে জীবন একদিন বলেও ছিল, যদি বাজার করেই খেতে চাস তাহলে মেসে চলে যা। অন্যত্র বাসা নে। এখানে কেন?

আসিফ কোনো কথা বলেনি। শুধু হেসেছিল।

জীবনের স্ত্রীও স্বামীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলল, তাহলে মেসে চলে যান। এখানে কেন?

এখানে থাকলে হলে এসব চলবে না।

জীবনের স্ত্রীকে আসিফ ভাবি ডাকে। সে বলেছিল, ভাবি, মেসে কেন? কাউকে জুটিয়ে

দিয়ে একটা বাসাই ঠিক করে দেন না কেন?

ভাবি হাসতে হাসতে বলেছিল, আমি কি ‘ঘটক পাখি ভাই’? ইঞ্জিনিয়ার মানুষকে

আবার জুটিয়ে দিতে হয়? হাত বাড়ালেই চলে আসবে কত্ধসঢ়;তো…

আসিফ বলল, জুটিয়ে প্রায় ফেলছি। সবুর করেন।

জীবন কান খাড়া করে রেখে এসব শুনছিল। এখন গলা খাকারি দিয়ে বলল, আমার কাছে আবার কোনো বিচার সালিস আসে না যেন। সেটাও মনে রাখিস। উপজেলার কোয়ার্টগুলোর এই বাসাটিতে কিছুক্ষণের জন্য বাতাসে শব্দ-তরঙ্গ উঠেছিল সেদিন। এরপর থেকে বাজার নিয়ে আর তেমন কোনো কথা হত না। উপজেলা ক্যাম্পাসের দক্ষিণ দিকে একটা বিশাল পুকুর। আসিফ সকালে সেখানে প্রতিদিন স্নান করে। পাকা ঘাটে এই টলমলে স্বচ্ছ পানিতে স্নান করলে তৃপ্তিতে মন ভরে যায়। ঢাকায় কোথায় পাওয়া যাবে এমন পুকুর আর টলমলে জল? ঢাকা কেন বড় শহরের কোথাও এমন পুকুর নেই। জীবনের বাসায় সুন্দর বাথরুম থাকা সত্ত্বেও আসিফ পুকুরেই স্নান করে। অবশ্য সকালে পুকুরে স্নানের জন্য আসার পিছনে আরও একটি কারণ আছে। এখানে কিছুদিন আগে এলেও এই জায়গাটা এত ভালো লেগেছে যে আসিফ মনে মনে স্থির করে অবসর জীবনে গ্রামে কোথাও গিয়ে একটা বাড়ি করবে। গ্রামের জীবনের সঙ্গে আসিফের খুব যোগাযোগ নেই। ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়…’ শুধু কবিতাতেই পড়েছিল। এখানে না এলে গ্রামের এই মোহনীয় রূপ স্বচক্ষে দেখা হত কিনা সন্দেহ। সে ভাবে গ্রামে একটা বাড়ি বানাবে যে বাড়ির সামনে থাকবে নির্মল টলটলে জলের একটা বিশাল দিঘি। সেই দিঘিতে থাকবে দেশিয় প্রজাতির মাছ। পাকা ঘাট। প্রশস্ত পুকুরের পাড়ে থাকবে সেগুনগাছ। জোছনার নরম আলো খেলে যাবে সেগুনের পাতায় পাতায়। পাকা ঘাটের ওপরের দিকে থাকবে বসার মত ব্যবস্থা। তার ওপরে ছনের ছাউনির একটি বড় ছাতা। কল্পিত বাড়ির

দৃশ্যটি তার চোখে ভেসে ওঠত মাঝে মাঝে।

মানুষের ভাবনার শেষ নেই। যা ভালো লাগে তা নিয়ে স্বপ্নের জাল বোনে। যেখানে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে সেখানে থাকার জন্য নিজেকে তৈরি করে। এরূপ স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ গ্রামের একটি স্বপ্নময় বাড়ির ছবি আঁকতে থাকে সে মনের ক্যানভাসে। সব মানুষের সব স্বপ্ন বাস্তবতার মুখ দেখে না। পুকুরের পশ্চিম পাশেই থানা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসা। সকালে স্নান করতে যাওয়ার সময় আসিফের সঙ্গে প্রায়ই রোজীর দেখা হয়। দোতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকে সে নিবিষ্ট চোখে। ছিমছাম স্মার্ট আদলের গৌরবর্ণা রোজীর চোখ দুটি যেন অমর কবিতার পাণ্ডলিপি। আসিফের পুকুরে স্নান করতে আসার পিছনে আরও একটি কারণ হলো এই কাব্যময়ী রোজী। মাঝে মাঝে আসিফের চোখে চোখ পড়ে। তখন আসিফ কেমন যেন উলট-পালট হয়ে যায়। সমস্ত চিন্তা-ভাবনা এলোমেলো হয়ে যায়। রোজী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বড় বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছে। আসিফ মাঝে মাঝে রোজীকে নিয়ে চিন্তা করে, স্বপ্ন দেখে। কথা বলতে ইচ্ছে হয় কিন্তু কথা বলার সুযোগ হয় না। রোজীর সাথে একদিন আসিফের পরিচয় হয়েছিল জীবনের বাসায়। সেদিন আসিফ খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিল বলে কোনো কথা গুছিয়ে বলতে পারেনি। অথচ রোজীর সঙ্গে কথা বলার জন্য সে মাঝে মাঝে অস্থিরতা অনুভব করে। চোখের ভাষায় যে কথাগুলো হয় তাতে দুএকটি কবিতা লেখা যায়—কিন্তু মনের ভেতর উথলে ওঠা ভাবাবেগকে নিবৃত করা যায় না। আসিফ অপেক্ষা করতে থাকে, কখন আসবে সে মাহেন্দ্রক্ষণ?

জীবনের বিয়ে কিছুদিন আগেই হয়েছে। জীবনের স্ত্রীর বাপের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। নিকট আত্মীয়দের এখানে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। হয়তো এজন্যই প্রায় প্রতি দিনই চিঠি লিখে এবং চিঠির উত্তর পায়।

আসিফ মাঝে মাঝে বলত, ভাবি একটা ভোটার লিস্ট নিয়ে বসেন। এত ঠিকানা তো মনে থাকার কথা নয়। ভাবি হাসে। সে হাসির মধ্যে কিছু কথা আছে। মানুষের হাসিতে অনেক কথা থাকে। আসিফের সাড়া দিন খুব ব্যস্ততায় কাটে। সকালে সাইটে চলে যায় আর ফিরে আসে সন্ধ্যার পর। সারাদিন ভাবি একা একাই বাসায় থাকে। কোনো কোনো দিন বিকেলে অন্য অফিসারদের বাসায় বেড়াতে যায়। রোজীর সঙ্গে মাঝে মাঝে জম্পেস আড্ডা দেয়। রোজীও সুযোগ করে এই বাসায় আসে। কথা বলে, অনেক কথা। জীবন সংসারের কোনো কথাই-বা বাদ যায়?

আসিফ একদিন ভাবিকে বলল, ভাবি আপনাদের দিন তো ভালোভাবেই কাটছে। তবে, প্রতিবেশীদের দিকেও লক্ষ রাখা উচিত।

ভাবি হেসে বলল, কী করব ভাই? কোনো কোনো কাজ তো শেয়ার করা যায় না।

তার চোখে দুষ্ট চড়ই। ঠোঁটে মাছরাঙার রং মেশানো মিষ্টি হাসি। রসিক ভাবি মাঝে মাঝে এমন কথা বলে আসিফের কান লাল হয়ে যায়।

সেদিনই মুখের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, রোজীকে পছন্দ হয়? মুখ-চোখ-বুক খুব সুন্দর তাই না? এমন রোমান্টিকভাবে বলল, আসিফ হকচকিয়ে যায়।

আজকে একটু সাহস করে আসিফ সুযোগ নিতে চায়। সে বলল, এই কথাই তো বলছিলাম। প্রতিবেশী কি আর আপনাকে বুঝাচ্ছিলাম নাকি? কিছু একটা করেন ভাবি। ভাবি বলল, এসব ব্যাপার লুকিয়ে রাখলে কাজ হয় না। প্রকাশ করলে দুটার একটা হয়। ‘হা’অথবা ‘না’। ফিফটি ফিফটি চান্স। প্রকাশ না করলে ‘না’-ই হয়। হানড্রেড পারসেন্ট নো। বুঝলেন সাহেব? তার মুখে মিষ্টি হাসি।

আসিফ হাসে। আড়চোখে তাকিয়ে বলে, অভিজ্ঞতা থেকে বললেন মনে হয়?

মেয়েদের বিচিত্র অভিজ্ঞতা থাকে। এগুলো প্রশ্ন করতে হয় না। ভাবির রঙিন ঠোঁটে দুষ্ট

হাসি।

আসিফ জিগ্যেস করে, হাসছেন কেন?

ভাবি বলে, খারাপ খারাপ ছবি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেন, না?

আসিফ লজ্জায় মরে। আসিফের এক বন্ধু বিদেশ থেকে এসে একটা এডাল্ট ম্যাগাজিন

দিয়েছিল। এটি তার বিছানার নিচে লুকিয়ে রেখেছিল। হয়তো এটা দেখেছে ভাবি।

আসিফের লজ্জার হাসি হেসে বলল, প্রাইভেসিতে ঢুকে গেলেন?

ভাবি হাসে। চোখে পড়লে কী করব? বিছানা গোছাতে গিয়ে…। রোজীকে দেখাব?

আরে না না। তাকে দেখাবেন কেন? পারলে ওর সাথে আলাপ করিয়ে দেন।

ঠিক আছে দেব। ছবি দেখে আর কত চলবেন? ভাবি একটু নীরব থেকে আবার আসিফের

দিকে তাকিয়ে বলল, এসব দেখে কী মজা পান?

এগুলো শৈল্পিক ছবি। শরীরের শিল্প। শিল্প শেখার জন্য শিল্প দেখা দরকার।

ফাজিল।

Series Navigationউপন্যাস।। ছায়াপথ।। মোজাম্মেল হক নিয়োগী।। দুই >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *