উপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল।। নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর।। পর্ব পনরো

২০

সংস্কৃতির উত্তরাধিকার কেবল শহরের মানুষের নয়। কেবল তারাই সংস্কৃতি চর্চা করে তাও নয়। গ্রামের সাধারণ মানুষও নানা রকম আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাদের সংস্কৃতিকে লালন করে, চর্চাও করে। আসাদ করিম এখানে এসে বুঝতে পারছে।

সে দিনের সেই সন্ধ্যায় অচেনা লোকগুলোর সহজসরল গান, কিস্যা, পুথিপাঠ আসাদের মনে পড়ছে। আধুনিক সংস্কৃতির আয়োজন হয় না বলেই তারা তার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সে যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। এখন আর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আগ্রহী ছাত্রছাত্রীর অভাব নেই। প্রতিদিনই ছাত্রছাত্রীরা রিহার্সাল করতে আসছে। নতুন নতুন মুখ কবিতা, গান নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে। তারা অভিনয়ও করতে চাইছে। আগে কেন আসে নি এরকম কৈফিয়ত দিয়ে ওদের দলে নেবার জন্য অনুরোধ করছে। আসাদ সবাইকেই উৎসাহ দিতে রিহার্সালে অংশ নিতে দিচ্ছে। যাদের আবৃত্তি আর অভিনয় সবচাইতে ভালো হবে তারা চ‚ড়ান্ত অনুষ্ঠানে অংশ নেবে। আর এখানে যারা অংশগ্রহণ করতে এসেছে তাদের সবাইকে নিয়ে স্কুলের সাংস্কৃতিক দল গঠিত হবে। এই দল এর পর থেকে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। অভিজ্ঞতা অর্জন করার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সকলেই অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবে।

তোমরা সকলেই তো একসাথে কাজ করতে চাও, তাই না?
জ্বী, স্যার।
তাহলে তোমরা একটা কাজ করতে পারো।
কী করতে হবে, বলেন, স্যার।

তোমরা সকলে মিলে তোমাদের বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক দল গঠন করতে পারো। সে দল এখানে রবীন্দ্র, নজরুল জয়ন্তীসহ জাতীয় দিবসগুলোতে অনুষ্ঠান করবে। তাতে পর্যায়ক্রমে সকলেই কোনো না কোনোভাবে অংশ গ্রহণের সুযোগ পাবে। তোমরা তো জানো কিছু করতে গেলে আগে শিখতে হয়, বুঝতে হয়, বিষয়টা হৃদয় দিয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হয়। কাজ করতে চাইলে, শিখতে চাইলে আমি তোমাদের এ বিষয়ে সহযোগিতা করবো। এবার বলো, তোমরা কী শিখতে চাও না কি যেমন তেমন করে একটা কিছু করতে চাও?

স্যার, আমরা আগে শিখতে চাই।
বেশ। তাহলে আসো আমরা শেখা শুরু করি। তোমরা আমাকে বলো তো, আমরা কী দিয়ে শেখা শুরু করি?
বই দিয়ে।
তুমি বলো।
অক্ষর দিয়ে।
আর তোমরা কি অন্য কোনো উত্তর দিতে চাও?
আর কিছু বলতে পারব না।
আচ্ছা, প্রথমে কী শিখি?
কথা।
কথা কী দিয়ে হয়?
মুখ।
মুখ দিয়ে কী বের করি?
শব্দ।
শব্দের মূলে কী আছে?
ধ্বনি।

ঠিক বলেছো। আমরা সবচাইতে আগে মুখ থেকে ধ্বনি বের করি। যে ধ্বনিটা সহজ সেটা আগে বের হয়। সবচাইতে সহজ ধ্বনি কোনটি বলো তো।

অ।
আর?
আ। মা। বা।

তাহলে শব্দের মূলে আছে ধ্বনি। ধ্বনির সঙ্গে ধ্বনি যোগ করে আমরা শব্দ বানাই। মানে উচ্চারণ করি। তাহলে বলো আগে আমাদের কী ঠিক করা দরকার?

উচ্চারণ।

ঠিক বলেছো। আমরা উচ্চারণ দিয়ে শুরু করবো। আসো, রবীন্দ্রনাথের ‘ইচ্ছামতি’ কবিতার কয়েকটা চরণ আমরা পাঠ করি। চঞ্চল তুমি পড়ো।

                                যখন যেমন মনে করি তাই হতে পাই যদি,

                                আমি তবে এক্ষনি হই ইচ্ছামতি নদী।

                                রইবে আমার দখিন ধারে সূর্য-ওঠার পার,

                                বায়ের ধারে সন্ধেবেলায় নামবে অন্ধকার।

এ পর্যন্তই। এখন রশিদ।

রশিদ আবৃত্তি করবার চেষ্টা করল। তারপর আরো একটা মেয়ে। আসাদ করিম এবার নিজে আবৃতি করল।

                                যখোন্ জ্যামোন্ মোনে কোরি তাই হোতে পাই জোদি,

                                আমি তবে এক্খোনি হই ইচ্ছামোতি নদী।

                                রোইবে আমার দোখিন্ ধারে শুরজো-ওর্ঠা র্পা,

                                বার্য়ে ধারে শোনধেব্যালায় নাম্বে অনধোর্কা।

সবাই স্তব্ধ হয়ে শুনল। এমন করে কবিতার পাঠ ওরা আর আগে শোনে নি। ওরা অবাক হয়ে গেল। ওদের মনে হচ্ছে যা শুনল সেটা বাংলা ভাষা নয়। আর খুব কঠিন মনে হলো।

কী খুব কঠিন মনে হচ্ছে?
জ্বী, স্যার।

আমরা প্রত্যেকটা শব্দ খেয়াল করি। অক্ষরে লেখা আছে ‘যখন’ আর আমি উচ্চারণ করেছি ‘জখোন্’। আছে যেমন বলেছি ‘জ্যামোন্’। মনে বলেছি মোনে, করি বলেছি ‘কোরি’। হতে বলেছি ‘হোতে’। যদি বলেছি ‘জোদি’। তেমনি নদী করেছি ‘নোদি’। সবকিছুই উচ্চারণের নিয়ম মেনে করেছি। তোমরা যদি আমার মতো করে শিখে নাও তোমরাও পারবে। এসো, আমরা আবার শুরু করি। আমি আগে বলবো, তারপর আমার সাথে একসঙ্গে সবাই বলবে।

                                যখোন্ জ্যামোন্ মোনে কোরি তাই হোতে পাই জোদি,

                                আমি তবে এক্খোনি হই ইচ্ছামোতি নদী।

গুড। ভেরিগুড। খুব সুন্দর হয়েছে। আজ এ পর্যন্তই। কাল আবার দেখা হবে। সবাই ভালো থেকো।

স্যার, স্লেলালেকুম।
ওয়ালেকুম সালাম।

২১

‘এখানে একবার এসে উপস্থিত হলে এর পুরাতন মুখশ্রী আমার কাছে একটি নবীন মনোহারিতা আনয়ন করে। এই অতি ছোটো নদী এবং নিতান্ত ঘোরো রকমের বহিঃপ্রকৃতি আমার কাছে বেশ লাগছে। ঐ অদূরেই নদী বেঁকে গিয়েছেওখানটিতে একটি ছোটোগ্রাম এবং গুটিকতক গাছ, একতীরে পরিপক্কপ্রায় ধানের ক্ষেত, নদীর উঁচু পাড়ের উপর পাঁচ-ছটি গোরু ল্যাজ দিয়ে মাছি তাড়াতে তাড়াতে কচকচ শব্দে ঘাস খাচ্ছে, অন্য তীরে শূন্য মাঠ ধূ ধূ করছেনদীর জলে শ্যাওলা ভাসছে, মাঝে মাঝে জেলেদের বাঁশ পোঁতা, বাঁশের উপর মাছরাঙা পাখি ছবির মতো স্থির হয়ে বসে রয়েছে, আকাশে উজ্জ্বল রৌদ্রে একপাল চিল উড়ছে।’ রবীন্দ্রনাথ পতিসরকে এমন করেই দেখেছেন, তাঁর লেখায় তুলে এনেছেন। আসাদ করিম ছিন্নপত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বক্তৃতা শুরু করল।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা কিংবা সাহিত্যের গুঢ় তত্ত্বে র আলোচনায় না গিয়ে আসাদ করিম আলোচনায় পতিসরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যে আত্মিক সম্পর্ক ছিল সে দিক তুলে ধরার প্রয়াস নিল। পতিসরের মধ্যে কবি যে সমগ্র বাংলাদেশের মুখ দেখতে পেয়েছিলেন সে প্রসঙ্গ আলোচনা করল। রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনা করতে পতিসর এসে এখানকার মানুষকেই যে ভালোবেসে তাদের জাগিয়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন আলোচনায় সে উদাহরণ তুলে ধরল। আসাদ আলোচনায় উল্লেখ করল যে, পতিসর থেকে একপত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেন, ‘আমাদের এই মাটির মা, আমাদের এই আপনাদের পৃথিবী, এর সোনার শস্যক্ষেত্রে এর স্নেহশালিনী নদীগুলির ধারে, এর সুখ-দুঃখময় ভালোবাসার লোকালয়ের মধ্যে এই সমস্ত দরিদ্র মর্ত্যহৃদয়ের অশ্রুর ধনগুলিকে কোলে করে এনে দিয়েছে।’ এই হতদরিদ্র মানুষগুলোকে দেখে তাঁর উপলব্ধি হয়, ‘আমরা হতভাগ্যরা তাদের ধরে রাখতে পারি নে, বাঁচাতে পারি নে, নানা অদৃশ্য প্রবল শক্তি এসে বুকের কাছ থেকে তাদের কেড়ে নিয়ে যায়।’ তিনি লিখেন, ‘আমি এই পৃথিবীকে ভারী ভালোবাসি। এই জন্যে স্বর্গের উপর আড়ি করে আমি আমার দরিদ্র মায়ের ঘর আরো বেশী ভালোবাসি।’ আমরা কবির এই পত্রের সংগে তাঁর একটি কবিতাও মিলিয়ে পড়তে পারি:

                                ‘দরিদ্র বলিয়া তোরে বেশী ভালোবাসি

                                হে ধরিত্রী, তোর বেশী ভালো লাগে

                                বেদনাকাতর মুখে সকরুণ হাসি,

                                দেখে মোর মর্মমাঝে বড়ো ব্যথা জাগে,’

আর পতিসরের মানুষ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘এখানকার মানুষগুলি এমনি অনুরক্ত ভক্তস্বভাব, এমনি সরল বিশ্বাসপরায়ণ যে, মনে হয় আডাম ও ইভ জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাইবার পূর্বেই ইহাদের বংশের আদিপুরুষকে জন্মদান করিয়াছিলেন। সেইজন্য শয়তান যদি ইহাদের ঘরে আসিয়া প্রবেশ করে তাহাকেও ইহারা শিশুর মতো বিশ্বাস করে এবং মান্য অতিথির মতো আহারের অংশ দিয়া সেবা করে।’ তিনি বলেছেন, ‘আমি ইহাদিগকে আত্মীয়ের মতো ভালোবাসি।…এই নির্বোধ মানুষগুলি কেবল ভালোবাসা নহে, শ্রদ্ধার যোগ্য।’

রবীন্দ্রনাথ ২১ অগাস্ট ১৮৯৩ পতিসর থেকে একটি চিঠিতে লিখেন, ‘আহা এমন প্রজা আমি দেখি নি! এদের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং এদের অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জল আসে। আমার কাছে এই সমস্ত দুঃখপীড়িত অটল-বিশ্বাসপরায়ণ অনুরক্ত প্রজাদের মুখে বড়ো একটি কোমল মাধুর্য আছে, বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি দেশজোড়া বৃহৎ পরিবারের লোক। এইসমস্ত নিঃসহায় নিরুপায় নিতান্তনির্ভরপর সরল চাষাভুষাদের আপনার লোক মনে করতে একটা সুখ আছে। এরা অনেক দুঃখ অনেক ধৈর্য-সহকারে সহ্য করেছে, তবু এদের ভালোবাসা কিছুতেই ম্লান হয় না।’ অথচ একালেও গ্রামের দরিদ্র মানুষের এই বিশ্বাসপরায়নতা আর সরলতা শিক্ষিত ও স্বার্থপর মানুষগুলো, যারা ক্ষমতায় আসার জন্য তাদের উপর নির্ভর করে, তারা কোনো মর্যাদা দেয় না। রবীন্দ্রনাথের কাছে এই সহজসরল মানুষেরাই ‘দেশজোড়া বৃহৎ পরিবারের লোক।’ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ‘এইসমস্ত নিরুপায় নিতান্তনির্ভরপর সরল চাষাভুষাদের আপনার লোক বলে মনে করতে একটা সুখ আছে।’ আর জমিদার হয়েও তাদের কাছে গিয়ে আপনার লোক হতে তাঁর কোথাও বাধে না। আর এইসব অশিক্ষিত মানুষের মুখের ভাষায়ও এক অনাবিল মাধুর্য আছে। তাঁর কথায়, ‘এদের ভাষা শুনতে আমার এমন মিষ্টি লাগে─তার ভিতর এমন স্নেহমিশ্রিত করুণা আছে! এরা যখন কোনো-একটা অবিচারের কথা বলে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে─অন্য নানা ছলে আমাকে সামলে নিতে হয়।’ কবি বুঝতে পারেন, ‘এরা অনেক দুঃখ অনেক ধৈর্য-সহকারে সহ্য করছে, তবু এদের ভালোবাসা কিছুতেই ম্লান হয় না।’ আর উপলব্ধি করেন, ‘গ্রামের [পতিসর] মানুষের সরলতা মানুষের স্বাস্থ্যের একমাত্র উপায়! সে যেন গঙ্গার মতো, তার মধ্যে স্নান করে সংসারের অনেক তাপ দূর হয়ে যায়।’

কবি রবীন্দ্রনাথকে অনেকেই জানেন। পতিসরের উন্নতির জন্য, এখানকার মানুষের জন্য রবীন্দ্রনাথ কী কী করেছেন সেসব আপনারাই আমার চাইতে ভালো জানেন। আর এদেশ জাগিয়ে তোলার জন্য কবির লেখা কতটা প্রেরণা জুগিয়েছে সেটা জানে বিশ্ব, জানতেন বাহান্ন আর একাত্তরের শহীদেরা, জানেন জীবন বাজি রেখে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাঁরা। আমরা এখনো রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়ে, তাঁর হৃদয় দিয়েই দেশকে প্রতিদিন ভালোবাসি। আমাদের দেশকে ভালোবাসতে হলে নতুন প্রজন্মকে তাই আরো ভালো করে রবীন্দ্রনাথকে জানতে হবে, বুঝতে হবে। আজকের রবীন্দ্রজয়ন্তী তখনই সার্থক হবে যদি আমাদের ছাত্রছাত্রীরা রবীন্দ্রনাথকে জানার জন্য বোঝার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেই প্রত্যাশা রেখেই আমি আমার কথা শেষ করবো, তার আগে যারা প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে কবির জন্মদিন উদযাপন করার জন্য এগিয়ে এসেছে তাদের এবং রবীন্দ্রানুরাগী প্রধান শিক্ষককে অভিনন্দন জানাই। যাঁরা এই আয়োজনে শরিক হয়ে এই উদযাপনে উৎসাহ যুগিয়েছেন তাঁদের সবাইকেও ধন্যবাদ।

আসাদ করিম বক্তব্য শেষ করলে সভাপতির বক্তব্য দিতে প্রধান শিক্ষক আবুল কাসেম উঠে দাঁড়ালেন। তিনি এতক্ষণ বসে বসে তন্ময় হয়ে আসাদ করিমের কথা শুনছিলেন। তার সামনে সব চেনাজানা মানুষ। তারা সকলেই আশেপাশের গ্রামের। রবীন্দ্রনাথ যে তাদের কত আপন আসাদ করিম তার ভাষণে সেটা তুলে ধরেছেন। লোকজন মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আর কিছু বলবেন না। তবু তিনি তাদের কিছু কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার চিন্তা করলেন।

প্রিয় এলাকাবাসী। আপনারা আজ যে আয়োজনে অংশগ্রহণ করলেন এই অনুষ্ঠান এই স্কুলে আগে আর হয় নি। হয়নি যে সেখানেই আমাদের ব্যর্থতা। সূর্যের আলো ছাড়া যেমন গাছপালা বাঁচতে পারে না, তেমনি রবীন্দ্রনাথ বা রবির আলো ছাড়া বাঙালি জাতি বাঁচতে পারবে না। পাকিস্তানি শাসনের অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমরা যেমন রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ে ধারণ করেছিলাম, তেমনি অজ্ঞতা আর গোঁড়ামির অন্ধকার থেকে বাঁচার জন্য আমাদের রবীন্দ্রনাথকে চর্চা করতে হবে। তাহলেই জীবনের পথ আলোকময় হয়ে উঠবে। আমার ছাত্রছাত্রীরা যেন একথা ভুলে না যায়। আমাদের জীবন শেষ। তবু আমরা এ দাবী করতে পারি একাত্তরে আমরা ভোর এনেছিলাম রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলকে বুকে নিয়ে। আজ যারা দেশ গড়তে এগিয়ে যাবে তাদের হৃদয়েও রবীন্দ্রনাথ থাকতে হবে। রবীন্দ্রনাথকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে কম চেষ্টা করা হয় নি, পাকিস্তানিরা করেছে, এখনো সে চেষ্টা আছে। রবীন্দ্রনাথের সময়েও ছিল, তাই তাঁকেই বলতে হয়েছে, ‘আমি তোমাদেরই লোক/এই হোক মোর পরিচয়।’ যারা আজো রবীন্দ্রচর্চার বিরোধিতা করে তাদের থেকে আমাদের সাবধান থাকতে হবে। সকল শঙ্কা-ভয় কেটে যাবে রবীন্দ্রনাথের বাণী বুকে ধারণ করলে। আমার কথা এখানেই শেষ। আমরা এর পর আমাদেরই ছাত্রছাত্রীদের মুখে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আর গান শুনব। ওদের অভিনয়ও দেখব। আপনাদের সকলের জীবন আলোকময় হোক।

ছাত্রছাত্রীরা কবিতা আবৃত্তি করল। তারপর কনকচাঁপা গাইল ‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে/এ জীবন ধন্য করো…।’ সবশেষে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা ডাকঘর নাটকের অংশবিশেষ অভিনয় করে দেখাল। কেউ দইওয়ালা, কেউ কিশোর অমল, কেউ প্রহরী, কেউ দাড়িওয়ালা মোড়ল আর সেই আলেয়া সুধা সাজল। ছাত্রছাত্রীদের মুগ্ধ অভিনয় শেষে সকলের তুমুল করতালিতে অনুষ্ঠান শেষ হলো।

২২

আকাশ জুড়ে মেঘ করেছিল। আসাদের মনে হচ্ছিল, মেঘগুলো মাঠের উপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে আসছিল। ওরা আর পেটে জল ধরে রাখতে পারছে না। মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাঠের গবাদি পশু আর মানুষগুলো দৌড়াচ্ছে। ওর মনে পড়ছে, মেঘ-বৃষ্টি-বাদল রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতির কবিতা-গান আর গদ্যের মূল চরিত্র। রবীন্দ্রনাথ এমন বৃষ্টির দিন পতিসর-শাহজাদপুর-শিলাইদহে কাটিয়েছেন। ছিন্নপত্রে সে ছবি তাজা আর জীবন্ত। আজকের দিনটাও তাঁর দেখা সেদিনের সঙ্গে কত মিল!

                ‘…গাঢ় নীল মেঘ দিগন্তের কাছে একেবারে থাকে থাকে ফুলে উঠেছে, একটা প্রকান্ড হিংস্র দৈত্যের রোষস্ফীত গোঁফ-জোড়াটার মতো। এই ঘন নীলের ঠিক পাশেই দিগন্তের সব শেষে ছিন্ন মেঘের ভিতর থেকে একটা টকটকে রক্তবর্ণ আভা বেরোচ্ছে─একটা আকাশব্যাপী প্রকান্ড অলৌকিক ‘বাইসন’ মোষ যেন ক্ষেপে উঠে রাঙা চোখ দুটো পাকিয়ে ঘাড়ের নীল কেশরগুলো ফুলিয়ে বক্রভাবে মাথাটা নিচু করে দাঁড়িয়েছে, এখনি পৃথিবীকে শৃঙ্গাঘাত করতে আরম্ভ করে দেবে এবং আসন্ন সংকটের সময় পৃথিবীর সমস্ত শস্যক্ষেত এবং গাছের পাতা হী হী করছে, জলের উপরিভাগ শিউরে শিউরে উঠছে, কাকগুলো অশান্তভাবে উড়ে উড়ে কা কা করে ডাকছে।’

                আসাদ আজ সারাদিন ঘরে শুয়ে বসে কাটিয়েছে। বৃষ্টির জন্য বিকেলেও বের হতে পারেনি। ছিন্নপত্রের পাতা আর আজকের দিনটি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। সে ঘরে বসেই রবীন্দ্রভাবনা অনুভব করতে পারছে। সে দেখছে, ‘বৃষ্টি অবিরাম চলছে। মাঠের জল ছোটো ছোটো নির্ঝরের মতো নানা দিক থেকে কল কল করে নদীতে এসে পড়ছে। চাষারা ওপারের চর থেকে ধান কেটে আনবার জন্যে কেউ বা টোগা মাথায় কেউ বা একখানা কচুপাতা মাথার উপর ধরে ভিজতে ভিজতে খেয়া নৌকোয় পার হচ্ছে! বড়ো বড়ো বোঝাই নৌকোর মাথার উপর মাঝি হাল ধরে বসে বসে ভিজছে, আর মাল্লারা গুণ কাঁধে করে ডাঙার উপর ভিজতে ভিজতে চলেছে। এমন দুর্যোগ তবু পৃথিবীর কাজকর্ম বন্ধ থাকবার যো নেই; পাখিরা বিমর্ষ মনে তাদের নীড়ের মধ্যে বসে আছে, কিন্তু মানুষের ছেলেরা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। আমার বোটের সামনে দুটি রাখাল-বালক এক পাল গোরু নিয়ে এসে চরাচ্ছে; গোরুগুলি কচর-মচর শব্দ করে এই বর্ষাসতেজ সরস শ্যামল সিক্ত ঘাসগুলির মধ্যে মুখ ভরে দিয়ে ল্যাজ নেড়ে পিঠের মাছি তাড়াতে তাড়াতে স্নিগ্ধ-শান্তনেত্রে আহার করে করে বেড়াচ্ছে! তাদের পিঠের উপর বৃষ্টি এবং রাখালবালকের যষ্টি অবিশ্রাম পড়ছে, দুইই তাদের পক্ষে সমান অকারণ, অন্যায় এবং অনাবশ্যক, এবং দু’ই তারা সহিষ্ণুভাবে বিনা সমালোচনায় সয়ে যাচ্ছে এবং কচরমচর করে ঘাস খাচ্ছে। এই গোরুগুলির চোখের দৃষ্টি কেমন বিষণ্ন  শান্ত সুগভীর স্নেহময়! মাঝের থেকে মানুষের কর্মের বোঝা এই বড়ো বড়ো জন্তুগুলোর ঘাড়ের উপর কেন পড়ল? নদীর জল প্রতিদিনই বেড়ে উঠছে। পরশু দিন বোটের ছাতের উপর থেকে যতখানি দেখা যেত, আজ বোটের জানলায় বসে প্রায় ততটা দেখা যাচ্ছে! প্রতিদিন সকালে উঠে দেখি তটদৃশ্য অল্প অল্প করে প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে। এতদিন সামনে ঐ দূর গ্রামের গাছপালার মাথাটা সবুজ পল্লবের মেঘের মতো দেখা যেত, আজ সমস্ত বনটা আগাগোড়া আমার সম্মুখে এসে উপস্থিত হয়েছে─ডাঙা এবং জল দুই লাজুক প্রণয়ীর মতো অল্প অল্প করে পরস্পরের কাছে অগ্রসর হচ্ছে! লজ্জার সীমা উপচে এল ব’লে, প্রায় গলাগলি হয়ে এসেছে। এই ভরা নদীর মধ্য দিয়ে নৌকো করে যেতে বেশ লাগবে! বাঁধা বোট ছেড়ে দেবার জন্যে মনটা অধীর হয়ে আছে।’ 

অন্য একটি পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘পশ্চিমে ভয়ানক মেঘ করে এল! খুব কালো গাঢ় আলুথালু রকমের মেঘ, তারই মাঝে মাঝে চোরা আলো পড়ে রাঙা হয়ে উঠেছে! এক-একটা ঝড়ের ছবিতে যেমন দেখা যায় ঠিক সেই রকমের। যারা মাঠে শস্য কাটতে এসেছিল তারা মাথায় একএক বোঝা শস্য নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটে চলেছে! গোরুও ছুটছে, তার পিছনে পিছনে বাছুর লেজ নেড়ে নেড়ে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়োবার চেষ্টা করছে। খানিকবাদে একটা আক্রোশের গর্জন শোনা গেল! কতকগুলো ছিন্নভিন্ন মেঘ ভগ্নদূতের মতো সুদূর পশ্চিম থেকে ঊধর্ক্ষশ্বাসে ছুটে এল! তার পরে বিদ্যুৎবজ্র ঝড়বৃষ্টি সমস্ত একসঙ্গে এসে পড়ে খুব একটা তুর্কিনাচন নাচতে আরম্ভ করে দিলে। বাঁশগাছগুলো হাউ হাউ শব্দে একবার পশ্চিমে লুটিয়ে পড়তে লাগল, ঝড় যেন সোঁ সোঁ করে সাপুড়েদের মতো ফণা তুলে তালে তালে নৃত্য আরম্ভ করে দিলে।…বজ্রের যে শব্দ সে আর থামে না! আকাশের কোনখানে যেন একটা আস্ত জগৎ ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।’ পড়তে পড়তে এবং পড়ার চাইতে রবীন্দ্রনাথকে ভাবতে ভাবতে, তাঁর অনুভবকে নিজের মনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গিয়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে কখন রাত হয়ে গেছে আসাদ জানতেও পারেনি। সে আজ ঘড়িও দেখেনি। দেখার ইচ্ছাও মনে জাগেনি। বৃষ্টি আর বাতাসের মুর্ছনায় সে তন্ময় হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের যে গানগুলো সে কবছর আগে তন্ময় হয়ে শুনত, তারপর যে গানগুলো ওর মন থেকে ধীরে ধীরে মুছে গিয়েছিল সেগুলোর কথা আজ নতুন করে মনে উদয় হচ্ছিল। আজ গান শুনতে ওর খুব ইচ্ছে করছিল। সে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, এমন সময় কে যেন দরোজায় কড়া নাড়ল। বাতাস আর বৃষ্টির মাঝখানে কারো কণ্ঠ শুনতে কান পাতল। 

স্যার, দরজাটা একটু খোলেন। আমরা বিপদে পড়ছি। কুঠিবাড়িতে ঢুকতে পারি নাই। ফটকে তালা।

আসাদ বুঝতে পারল সেই শ্রমিকের দল আশ্রয় চায়। সে দরোজা খুলে দিল। আজ রাতেও তারা সে রাতের মতো এখানেই শরণ নিতে চায়। সে তাদের ফিরিয়ে দিতে পারল না। বরং সেদিনের মতো ঘুমিয়ে না পড়ে গল্প করে কাটানোর একটা ভাবনা ওর মনে জেগে উঠল। ওদের গল্প শুনতে ওর বেশ ভালই লাগে। এই ভাবনা মনে আসায় ওর আর লোকগুলোকে অপাঙ্ক্তেয় মনে হলো না।

কিন্তু লোকগুলো আগের মতো হুট হাট ঘরে ঢুকে পড়ল না। তারা বৃষ্টিতে ভিজে কাকের মতো কাঁপছে। আজ কারো হাতে ভাতের পাতিল, কারো বা রান্নার আয়োজনÑতেলের শিশি, ভেজা লাকড়ি, নিভে যাওয়া কুপিবাতি, যাকে কবি বলেছেন─পিদিম অথবা পিলসুজ। একটা পলিথিনে মোড়ানো কাঁথাবালিশও শ্রমিকরা সঙ্গে নিয়ে এসেছে। সে তাদের আহব্বান জানাল।

আসুন, ঘরে আসুন।

কোনো রকমে চারটা ডাল-চাল একপাতিলে গলাতে পারলেই চলবে। সারাদিন পানিতে ধান কাটছি। পেটে কিছু পড়ে নাই। মাঠ থেকে উঠে আগুন জ্বালানোর একরত্তি স্থান পাই নাই। খালি বাতাস আর পানি।

পাশের রুমে রাতটা কাটাতে পারবেন।

আসাদ খালি কক্ষের তালা খুলে দিল। ক্ষেতমজুররা বিলম্ব না করেই ঘরে ঢুকে পড়ল। কতক্ষণ পর পাশের কক্ষ থেকে প্রথমে ধোঁয়া তার পর খিচুড়ীর সুবাস ভেসে আসতে লাগল। তারপর গালগল্প, টিকাটিপ্পনি। তার পর গানও শোনা গেল। আসাদ মনে মনে হাসল। সে দেখল এদেশের মানুষ কত অল্পে তৃপ্তি আর সুখ পায়। কেবল একবেলা খেতে পেয়ে তারা মনের সুখে গান করতে পারে। কত সামান্য তাদের চাওয়া পাওয়া।

একটু পর আবার দরোজায় টোকা পড়ল। সে দরোজা খুলল। একজন শ্রমিক দাঁড়িয়ে আছে। এখন তার মুখে হাসি। যেন সব কটা দাঁত দেখাতেই সে এসে দাঁড়াল।

কোনো সমস্যা?
না, না। সমস্যা হবে কেন? আপনি আমাদের খুব উপকার করলেন।
তাহলে?

কী করে বলি। উস্তাদ হামাকরে পাঠাইছে। বলেছে, আপনি যদি আমাগর সাথে শরিক হন, খুব খুশি হবে।
কী-সে শরিক হতে বলল?

আপনার তো থালা বাটি ঘরে আছে। যদি একটু দিতেন, আমি গরম গরম একটু এনে দিতাম। এই বাদলার দিনে খারাপ লাগবে না নে। অবশ্য আমাগ রান্না আপনি খেতে পারবেন কিনা সেটাও একখান কথা।

আসাদ হাসল। সে জানে না আজ রাতে তার খাবার আসবে কিনা। আর না আসলেও কিছু আসে যায় না। ঘরে মুড়ি আর চিড়া-গুড় আছে। বিস্কিটও আছে। এমন দিনে খিচুড়ীর স্বাদ রসনায় অন্যরকম তৃপ্তি দেবে আসাদের ইন্দ্রিয় সে সংবাদ ইতিমধ্যে দিয়েছে। সে কোনো দ্বিধা না করে একটা বাটি এনে দিল।

খুব সামান্য দিবেন।

আমরা গরীব মানুষ, বেশী কী আর দিতে পারব?

ধারা পাতের রাতে গরম খিচুড়ী খেয়ে আসাদ এক অভূতপূর্ব তৃপ্তি পেল। সে খাচ্ছিল আর পাশের কক্ষে শ্রমিকদের গানও শুনছিল। কে একজন একটা বিচ্ছেদের গান করছিল। খাওয়া শেষ করে আসাদ ভাবল, পাশের কক্ষে গিয়ে লোকগুলোকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। সে পাশের ঘরে গিয়ে দেখল, লোকগুলো পলিথিনের উপর ময়লা কাঁথা মেলে দিয়ে তার উপর তেলচিটচিটে বালিশ ফেলে একে অপরের গায়ে গা মিশিয়ে গল্প করছে। হঠাৎ আসাদকে দেখে তাদের সবাই উঠে বসার জন্য তৎপর হয়ে গেল।

এই ওঠ, স্যার আসছে, স্যার আসছে। উঠে বস।

উঠে বসার দরকার নেই। আপনারা বিশ্রাম করুন। কে যেন সুন্দর সুন্দর গান করছিল। গান থামাল কেন? আর দু’একটা গান হলে বেশ হয়।

বসেন, স্যার। এই আহাদ, কর গান কর। তোর গান স্যারের মনে ধরেছে।

ছেলেটা লজ্জায় অন্ধকারে মিশে যেতে চাইছে। ওর লজ্জা ভাঙতে আসাদ একটা কৌশল নিল।

কে যেন সেদিন বাঁশী বাজিয়েছিল। গানের সঙ্গে বাঁশী হলে খুব ভালো হবে। বাঁশীও হোক।

গান হলো। সাথে বাঁশী বাজল। কয়েকটা গানের পর কিসসা শুরু হলো:

কোথায় থাকে সে কইন্যা? তবে শোনেন সবে। কইন্যার বাড়ি যেতে পথে পড়ে নদী, নদীর পাড়ে জঙ্গল। ঝড়ের রাইত। নদীতে তুফান, নৌকা নাই ঘাটে, মাঝি ঘুমায় খেতা মুড়ি দিয়া। কুমিরের কথা না হয় ছাইড়াই দিলাম। কইন্যার কাছে কেমনে যাবে, ঝড় তুফানের রাইতে কেমনে পার হবে যুবক উথালপাথাল নদী?

হ, পার ত হইতেই হইব। মনের মানুষের সঙ্গে মিলতে তো হবেই। কেমনে দেবে পাড়ি?

নদীর পাড়ে বিশাল বটবৃক্ষ। সেই বৃক্ষের শত শত শাখা, শত শাখায় ঝুলে আছে শত শত মূল। যুবক ‘ইয়া আলী-ই’ বলে সেই মোটা কাছির মতো একটা মূল ধরে ঝুলে পড়ল নদীর বুকে, এক লাফে পার হয়ে যায় অপর পাড়ে।

বাহ বা। কি তাকত! কি হিকমত!
কিন্তু ওপাড়ে জঙ্গল, জঙ্গলে বাঘ। তার কী হবে?

যার মনে আছে পিরীত, তার কীসের ভয়? আবার এক লাফে চড়ে বসল বাঘের পিঠে। বাঘ গেল ঘাবড়ে। ভাবল, এ আবার কে? চারিদিকে আন্ধার তবু আমার পিঠে চাপড় মারে এমন সাহস কার? চাপড় যেন পাথরের চাইতে ভার। আমি তোমার বড় মামু। আমি বাঘের উপরে টাঘ। ঠিক বলেছো। বাঘের পিঠে যে চড়ে। বাঘেও তারে ডরে। তবে এই বাদলার দিনে তুমি কোথায় চলেছ মামু? তোর মামী ডাকিছে আমায়। যাব তার ঠায়; সে আছে আমার পথ চায়। না পেলে তারে আমি, এ জীবনে সব হারাই। যাও, তুমি, নিশ্চয় পাবে তারে। যে আছে তোমার অন্তরে। তবে পেতে হবে সাধনায়। আর কোনো পথ নাই। তবে জেনে যাও। যদি তারে না পাও। এই পথে ফিরিবার সাধ আর তোমার না হয়। জেনে রাখ, তখন আমি আর তোমার মামু না হই। যে বটের ঝুরি ঝুলে হয়েছ নদী পার, সে আজদাহ তোমারে করবে সাবাড়। যদি সে নারী সত্যি তোমার হয়, তোমার প্রতীক্ষায় সে অধীর, বিরহিনী। আর যদি সে তোমার না হয়, বিপদসঙ্কুল রাত্রি পাড়ি দিলেও তার কবাট বন্ধ রয়।

তার পর কী হলো সাহসী যুবকের?
আর জানি না, স্যার।

আর না জানলেও ক্ষতি নেই। আসাদ তন্ময় হয়ে কিস্সা শুনছিল। যুবক থেমে গেলে সে দেখল, কথক আর সে ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। গল্প থেমে গেলেও মঙ্গল কাব্যের চরিত্রগুলো আসাদের চোখের সামনে ভাসছিল। সে অবাকই হলো! এখনো এমন সব গল্প গ্রামের সাধারণ মানুষের বুকের ভেতরে কত জীবন্ত হয়ে রয়েছে!

আমার ঘরে আসবেন, আমি আপনার কিসসা আরো শুনব।
আর শোনাতে পারব কিনা জানি না। আবার কখনও দেখা হবে কি-না তাও জানি না।
কেন?
ধানকাটা শেষ। আমরা কাল সকালে চলে যাচ্ছি।

আপনার কিসসা আমার খুব ভালো লেগেছে। চাঁদনিরাতে উঠোনে বসে সারারাত আপনার কিসসা শুনতে পারলে খুব ভালো লাগত।

আসাদের পেছনে লোকটাও বেরিয়ে এল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দূরে কোথাও ব্যাঙ ডাকছে। আসাদ তাকে বিদায় জানাতে ফিরে তাকাল। 

স্যার, আপনাকে মনে রাখব। আপনি খুব ভালো মানুষ।
আপনারাও খুব ভালো। 
আর একটি কথা বলতে চাইছিলাম।
কী কথা?
একটু সাবধানে থাকবেন। দিনকাল ভালো না।
একথা বলছেন কেন?

আপনি হয়তো গ্রাম এখনও ভালো করে চেনেন না। গ্রাম চিনলে শহর ছেড়ে আসতেন না।
আমি সত্যি সত্যি গ্রাম চিনি না। গ্রাম আর গ্রামের মানুষ চিনতেই এসেছি।
কে যে কার শত্রু কে বলতে পারে!
আমার তো এখানে আপন বলতেও কেউ নেই। আর শত্রু থাকার তো কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না।

আপনার নিজের অজান্তেই কাউকে কাউকে আপনি যেমন বন্ধু করে নিয়েছেন তেমনি শত্রুও হয়েছে। বন্ধু যেখানে হয়েছে, শত্রুও হয়েছে। আপনি হয়তো বন্ধু চিনতে পারবেন, কিন্তু গ্রামে আপনার শত্রু কে সেটা চিনতে পারবেন না। গ্রামে তো কেবল অন্ধকার, অন্ধকারে সহজে শত্রু চেনা যায় না।

যা হোক। আপনাকে ধন্যবাদ। আশা করি আবার দেখা হবে।

লোকটা চলে গেলেও আসাদ করিমের মনে বন্ধু আর শত্রুর বিষয়টি রয়ে গেল। এখানকার দেখা মানুষের মুখগুলো তার মনে উদয় হতে লাগল। প্রথমেই কনকচাঁপার মুখ মনে এল। তারপর শশাঙ্ক বাবু, তারপর প্রধানশিক্ষক আবুল কাসেম। তারপর তার ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ, বিশেষ করে, আলেয়া নামের মেয়েটির কথা তার মনে পড়ল। আলেয়াও বলেছিল, আসাদ গ্রামের মানুষ চেনে না।

আসাদের মনে ঘুরে ফিরে পুনর্বার কনকচাঁপা। তারপর ও ছাড়া আর কেউ না। কনকচাঁপা আসাদের মনের আকাশ জুড়ে একটা পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে হাসতে শুরু করেছে। এমন চাঁদ আর এর আগে সে কখনো দেখে নি।

Series Navigation<< উপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল।। নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর।। চৌদ্দউপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল।। নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর।। পর্ব ষোল >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *