উপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল।। নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর।। পর্ব বারো

১৩

পতিসর এসেই আসাদ বিশাল আকাশ দেখেছে। অখন্ড আকাশের নিচে আরো বিশাল মাঠ দেখে সে অভিভূত হয়েছে। সেই বিশাল আকাশের বুক জুড়ে আবার রাশি রাশি মেঘ। মেঘেদের তান্ডব আর মাতামাতি। তারপর অফুরন্ত, অঝোর বৃষ্টির দিন। মাঠের ওপার থেকে থেকে ধেয়ে আসা মেঘের থেকে হঠাৎ তীরের ফলার মতো বৃষ্টির

শর আসাদ বহুদিন দেখে নি। বৃষ্টির শব্দে দীঘির জলে নুপুরের ঝঙ্কার। ছোটোবেলায় বৃষ্টিতে ভেজার কথা ওর মনে পড়ছে। ঝড়ো বাতাসে খড়কুটো উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া, ঘরের চালের উপর গাছপালার ডালের এলোপাথাড়ি ঠুস-ঠাস, টুং-টাঙ শব্দ, আকাশে মেঘের হঠাৎ কড়-কড়াৎ শব্দে বাজ পড়া─ তারপর ঝর-ঝর, ঝম-ঝম বৃষ্টি মধুর বৃষ্টি! শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। খেলার মাঠ, ফসলের ক্ষেত সবকিছু একাকার। কাঁঠালের গরম বিচি, শিমের বিচি─ কট কট। তারপর রাতের আঁধারে সোনা ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর। আসাদ এসব ভুলে গিয়েছিল। এখানে এসে কেবল দেখা নয়─ বৃষ্টি সে গভীরভাবে অনুভব করেছে। একেক দিন একেক রকম বৃষ্টি। কোনো দিন আকাশটা গভীর কালো হয়ে একদম মাঠের কাছে নেমে আসা, তার পর সহসা প্রবল বাতাসে মাঠের ঘাস, গাছের পাতা, পাখির দল উড়িয়ে নিয়ে পেছনে সফেদ বৃষ্টি ধেয়ে আসা দেখতে দেখতে বৃষ্টির আবির্ভাব হয়। এই বৃষ্টি চলতে থাকে সারাদিন, কখনো সারা রাত, অবিরাম। বৃষ্টির শব্দ ছাড়া চরাচরে আর কোনো শব্দ নেই, মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন আরো বেশী করে ধারাপাতকেই মনে করিয়ে দেয়। ঘরে বসে কী যেন করতে ইচ্ছে, কী যেন করার ছিল, এরকম মনে হয়। আবার কোনো কোনো রাতে গহন অন্ধকারে হঠাৎ বিদ্যুৎ-চমক, ঘড়-ঘড় শব্দ তারপর সোঁ-সোঁ, গাছপালায় মড়-মড় শেষে প্রবল বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টি। উঠে জানলা বন্ধ করতে করতে বিছানা ভিজে একসা। তারপর বৃষ্টি, আর বৃষ্টি। ব্যাঙের ডাক। ঝিঁঝিঁ পোকার কলরব।

সেদিন স্কুলে-ক্লাসে চারিদিক কালো করে আঁধার নেমে এলো। আকাশের এক কণাও ফাঁক নেই। আঁধার ঘরে বই-এর লেখা কিছুই দেখা যায় না। দক্ষিণ দিক থেকে আরো কালিমাখা মেঘ ধেয়ে আসছে। মাঠের লোকজন দৌড়ে চলে আসছে। তাদের পেছনে গরু ছুটছে। গরুর পেছনে বাছুর। স্কুল ঘরের পেছনে বাঁশঝাড়ের বাঁশগুলো ক্যাঁচ-কুঁচ শব্দে একবার এদিক একবার ওদিকে হেলে নিজেদের বাঁচাবার চেষ্টা করছে। দূরে মাঠের পানিতে ঢেউ ফণা তুলে নাচতে শুরু করেছে। সব ছাত্রছাত্রী চুপ করে বাতাস আর এর থেকে মানুষ এবং অবুঝ প্রাণীদের বাঁচার প্রয়াস তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। তারপর বৃষ্টি ঝর ঝর।

সহসা মনে পড়ে গেলে আসাদ আবৃত্তি করে, ‘নীল নবঘন আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই, আর নাহিরে…।’ সবাই তখন ওর দিকে ফিরে তাকায়।
কবিতাটা মনে আছে?
জ্বী, স্যার।
দেখো তো আজকের দিনটার সাথে মেলে কি না।

খুব মেলে। এমনি মেঘে ঢাকা আকাশ, ঘরের বাইরে যেতে অসুবিধা, গাভীটাকে গোয়ালে আনার জন্য হাম্বা হাম্বা করে ডাকছে। আজও হয়তো কেউ নদী পার হতে তীরে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝি নৌকাটা বেঁধে রেখে বাড়ি চলে গেছে।

স্যার, এরকম বর্ষার দিনের আরেকটা কবিতা আছে।
কী কবিতা? কার লেখা?
মেঘনায় ঢল। হুমায়ুন কবীর।

’শোন মা আমিনা, ত্বরা করে মাঠে চল, মেঘনায় নামে ঢল…।’
আমেনাকে মা মাঠে যেতে বলছে, ওদিকে আকাশ ছেয়ে আঁধার নেমেছে। মেঘনা নদী ফুলে উঠছে। নদীতে বান আসবে, কিন্তু গাভীটাকে ওপার থেকে আনতে হবে। আমেনা ওপারে গিয়ে আর ফিরতে পারে না। বানের জলে ভেসে যায়।

খুব করুণ একটা কবিতা, তাই না?
স্যার, বৃষ্টি নিয়ে মজার কবিতাও আছে।
মনে আছে?

জ্বী, স্যার। বিষ্টি নামে কাশবনে/জাগল সাড়া ঘাস বনে/বকের সারি কোথা রে/লুকিয়ে গেল বাঁশ বনে।/নদীতে নাই খেয়া যে/ডাকল দূরে দেয়া যে/কোন সে বনের আড়ালে/ফুটল আবার কেয়া যে।

বাহ! সুন্দর। আর কেউ?

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এল বান/খেঁক শিয়ালের বিয়ে হবে তিন কন্যা দান/এক কন্যা রাঁধে-বাড়ে আরেক কন্যা খান/আরেক কন্যা রাগ করে বাপের বাড়ি যান।
স্যার, আমি একটা কবিতা বলব। ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি/আজ আমাদের ছুটি/ও ভাই আজ আমাদের ছুটি।/ কী করি আজ ভেবে না পাই/কোন মাঠে যে ছুটে বেড়াই/ সকল ছেলে জুটি।’
তাই তো! মেঘ কেটে তো রোদ উঠেছে। আমরা কেউ খেয়ালই করি নি। ভালোই হলো, আজ মেঘ-বৃষ্টির দিনে মেঘ-বৃষ্টির কবিতা পড়া হলো। তাই না? কাল থেকে তো পুজোর ছুটি। মেঘ কেটে গেছে, রোদও উঠছেÑতোমরা ছুটিতে কী করবে ভেবেছো?

স্যার, আজকের ক্লাসটা খুব মজা হয়েছে। কাল পূজার ছুটি হবে। ছুটিতেও আমি কবিতা পড়ব।

বেশ তো। কিন্তু, এমন চমৎকার নীল আকাশ, তার নিচে সাদা মেঘ, তার নিচে টলমলে বিল, বিলের বুকে ফুটে আছে কত শত শাপলা ফুল, বিলের উপর দিয়ে নৌকায় করে বেড়াতে যাবে না?
জ্বী, স্যার। যাবো, নানাবাড়ি যাবো। স্যার, আপনি বাড়ি যাবেন না?
আমি! এবার তোমাদের সঙ্গেই ছুটি কাটাবো।
তাহলে আমাদের বাড়ি আসবেন।
আচ্ছা, ঠিক আছে। তোমরা ভালো থেকো।

১৪

পহেলা বৈশাখ বাংলা সংস্কৃতির সকল উপমা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। আজ বাংলা নববর্ষ। শোভাযাত্রা, আবৃত্তি, গান, পথনাটক, আলোচনা ছাড়াও নতুন পোশাকে সেজে প্রিয়জনকে শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে বর্ষ বরণের উৎসব রবীন্দ্রনাথই প্রথম চালু করেছিলেন। নতুন বছরকে আহব্বান জানানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ প্রতিবছর নতুন গান রচনা করেছেন। আবার সে গান পহেলা বৈশাখে গেয়ে শুনিয়েছেনও। তাছাড়া কত কত কবিতাও রচনা করেছেন পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে, নতুন বরণের জন্য। এসো এসো হে বৈশাখ, এসো।…

আসাদ একটা পাঞ্জাবি আর পাজামা পরে তৈরী হয়ে নিত্যানন্দ ঘোষের ঘরের দিকে যায়। বাইরে বের হয়েই ওর মনে হচ্ছে, আজ বৈশাখের সুর বাজছে। এলোমেলো হাওয়া বইছে। গাছের নতুন পাতারা নাচানাচি করছে। কুঠিবাড়ীর সামনের কৃষ্ণচূড়ার গাছটায় রঙের ডালি মাথায় নিয়ে আনন্দে নাচছে। বসন্ত চলে গেলেও কোথায় একটা কোকিলও ডেকেই চলেছে। মাঠের ধানও সোনালি রং ধারণ করে হাসছে।

কাল নিত্যানন্দ ঘোষ এসে ওকে হালখাতার নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেছে। সে আজ দইচিড়াও খাবে এবং মাঠা-মাখন দিয়ে মোয়াও খাবে। নিত্যানন্দকে কাল বলে দিয়েছে।
শুভ নববর্ষ, নিত্যবাবু, যা বলেছিলাম, আছে তো?

আজ্ঞে, স্যার। নববর্ষ। আমি সব করে রেখেছি। বাবা মারা যাওয়ার পর এতবছর দই করি। মাঠা করা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। আগে ঠান্ডার জন্য মাঠা পান করত। এখন এসে স্প্রাইট আর কোক চায়। মাঠার যুগ বহুবছর আগে পার হয়ে গেছে। তবু আপনি যে বিষয়টা চালু রেখেছেন সেকথা মনে রেখে আপনাকে ভক্তি করি। আপনি যতদিন চাইবেন নিত্যানন্দ বেঁচে থাকলে ততদিন পাবেন।

জানেন, ছোটো বেলায় আট আনার মোয়া, একটাকার মাখন আর একটাকার মাঠা দিয়ে অনেক দিন সকালে নাস্তা সেরেছি। সে অভ্যাসটা এখানে এসে আবার ফিরে এসেছে।
আসাদ এখানে আসার পর থেকে নিত্যঘোষের ঘরে কোনো দিন দইচিঁড়া, কোনো দিন সকালে মাঠা-মাখন আর মুড়ির মোয়া দিয়ে নাস্তা সেরে নেয়। নিত্যানন্দ এরকম নাস্তা দিতে পেরে খুব খুশি। আসাদ যেন ওর সনাতন পেশার একজন সমঝদার।

স্যার, এটাই বাঙালির আসল নাস্তা। আগেকার দিনে বাবুরা স্নান সেরে ভোর বেলায় এই নাস্তাই করতেন। আমাদের ছোটো বেলায়ও আমরা দেখেছি। খাঁটি দুধেরও অভাব, খাঁটি গোয়ালারও অভাব। আপনি পাবেন কই? আর পেলেও সেটা কতজনই বা পছন্দ করে? এখন শহরে চলে পাউরুটি আর ডিম। যাদের সামর্থ্য নেই তারা খায় চা বিস্কুট। আর গ্রামে তার দেখাদেখি মুড়ি আর চা। যারা এসবের ধারে কাছে যেতে পারে না, নগদ কেনার সামর্থ্য যাদের নেই তারা সেই পান্তা আর মরিচপোড়া। সঙ্গে পানি আর নুন।

ছোটোবেলায় মেলা হতো। মেলা যে কত আনন্দের ছিল!
স্যার, আজ কালীগঞ্জের মেলা।
অনেক দিন গ্রাম্যমেলা দেখা হয় নি। দেখি যাবো একবার।

স্যার, এই মিষ্টিটা খেতে হবে। আজ আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন। ছেলেপুলে নিয়ে যেন বছরটা ভগবানের কৃপায় ভালো কাটাতে পারি।
আপনি ভালো মানুষ, কাউকে ঠকান না। ভগবান আপনাকে ঠকাবেন না।
স্যার, বাঙালির আনন্দ করার দিন তো পয়লা বৈশাখ। আজকে আনন্দে কাটলে ভগবান বছরটা আনন্দে রাখবে।
আচ্ছা, আসি।

কনকচাঁপা একগুচ্ছ ফুল নিয়ে দরোজায় দাঁড়িয়ে আছে। আসাদ ওকে দেখে অবাক হয়, কিন্তু ওর হঠাৎ আগমন অপ্রত্যাশিত মনে হয় না। বরং মনে হয়, আজ ওর আসার কথা ছিল। কনকচাঁপা হলুদ শাড়ি আর কপালে লাল টিপ পরেছে। যেন আজ ওর এমনই শাড়ি আর কপালে টিপ পরার কথা ছিল। ওকে দেখে আসাদ করিমের মনে হচ্ছে, সত্যি আজ পহেলা বৈশাখ এসে দ্বারে উপস্থিত হয়েছে।

আসুন। শুভ নববর্ষ। কী যে আনন্দের দিন আজ আমার! আমার ঘরে তো বসার জায়গা নেই। কোথায় বসতে দিই, আচ্ছা, চলুন, রবিসরোবরের ঘাটে গিয়ে বসি। ওখানে মুক্ত বাতাসও পাওয়া যাবে। বেশ চলুন।

শানবাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে কনকচাঁপা পা মেলে দিয়ে বসেছে। আসাদ আরেকপাশের সিঁড়িতে মুখোমুখি বসেছে। মাথার উপর কৃষ্ণচ‚ড়ার ডাল ওদের ছায়া দিচ্ছে। আসাদ করিমের ভালো লাগছে। পথের দুধারের সোনালুর ডালে হলুদ ফুল। নদীর ধারেও আরেকটা কৃষ্ণচূড়ার ডালে লাল লাল ফুল ডালসহ বাতাসে দুলছে। আসাদ এসব এতদিন খেয়ালই করে নি! কনকচাঁপার চুল বাতাসে উড়ে এসে মুখের উপর পড়লে সে হাত দিয়ে কখনো কখনো সরিয়ে নিচ্ছে। আসাদ করিমের সহসা মনে পড়ে, চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য।
কী ভাবছেন?

সকাল বেলা মনে পড়ছিল, ঢাকায় থাকলে এদিক-ওদিক ঘুরতে যাওয়া হতো। ঘরে বসে এমন একটা দিন কাটাতে হবে, কারো সাথে দেখা হবে না, কথা হবে না। ভাবতেই পারছিলাম না। কিন্তু, দেখুন কি আশ্চর্য!
আশ্চর্য কী?
জানি না।
সত্যি বলছেন না।
কেন?
ঐ যে বললেন, কারো সাথে দেখা হবে না, কথা হবে না। কার সাথে দেখা হবার আর কথা হবার কথা ছিল, আজ?

আসাদ করিমের যা বলতে ইচ্ছে করছে তা সে বলতে পারল না। সে আজ কনকচাঁপাকে ভাবে নি সত্য, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ওর জন্য সে আসলেই প্রতীক্ষা করেছিল। কিন্তু এখন সেকথা বলতে পারছে না। সে প্রসঙ্গটা পাল্টে নিতে চায়।

আপনাকে আজ খুবই আনন্দিত মনে হচ্ছে।
সেই আনন্দ আপনার সাথে ভাগাভাগি করতে এলাম। কনকচাঁপা রং আর সুবাস ছড়িয়ে বলল। 
আনন্দ নাকি এককোষী জীবের মতো। একে ভাগ করতে গেলে দ্বিগুণ হয়ে প্রাণে প্রাণে ছড়িয়ে পড়ে।
তাহলে তো আরো ভালো। আনন্দর দ্বি-জীবন লাভ। একপ্রাণ দুটি প্রাণে মিলেমিশে এক হয়ে যাবে।

ভালো বলেছেন তো!
চলুন, আজ এই আনন্দের দিনে মেলায় ঘুরে আসি।
যাওয়া যায়। কিন্তু?
কিন্তু, আমার সাথে যাবেন কি-না ভাবতে হবে, তাই তো?
আসাদ কী বলবে বুঝতে পারে না। কনকচাঁপার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া ঠিক হবে কি না, সেটা যে ওর ভাবনার বিষয় এটা কনকচাঁপাও বুঝতে পারছে। সে চুপ করে থাকে।

মাস্টার মশায়। আপনার বিষয়টা আমি বুঝতে পারি। আমি গ্রামের মেয়ে, তাও সনাতন ধর্ম এবং জাতপাতের বেড়াজালে আবদ্ধ। তবু বলছি, আমার যদি আপনার সঙ্গে বেড়াতে যেতে দ্বিধা না থাকে, তাহলে শহরের মানুষ হয়ে আপনার ভেতরে এত দ্ব›দ্ব কাজ করছে কেন? আমি মেয়ে বলে, নাকি আপনার ধর্ম খোয়া যাবে বলে?

না, সেরকম কিছু নয়। আমরা তো আর শরৎচন্দ্রের যুগে নেই। আমার কাছে আগে মানুষ, তারপর ধর্ম। যেখানে ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন, সেখানে মানুষই মুখ্য বিষয়, ধর্ম এবং আর সব আচার আচরণ গৌণ। তবু আমি ভাবছিলাম, আপনার সমাজ আর গ্রামের কথা মনে না রেখে পারি না।

শরৎচন্দ্রের যুগ নেই, কিন্তু সেই সময়ের ভুতগুলো এখনও জীবিত। আপনি জানেন না যে, আমাদের সমাজ এখনও একটা মজা পুকুরের মতো, এখানে প্রয়োজনীয় জলের চাইতে আবর্জনাই বেশী। সেই আবর্জনার কথা ভেবে নদীতে অবগাহন না করবার কোনো যুক্তি আছে? আর আপনি আমি তো সমাজের আবর্জনায় হাবুডুবু খেতে পারি না। বরং কীভাবে আবর্জনা দূর করে হাজামজা পুকুরকে সংস্কার করা যায় সেটা ভেবে দেখা দরকার।

একটা ভ্যান এসে থামলে কনকচাঁপা উঠে দাঁড়ায়। ছোটো পুকুরটা টলটলে পানিতে ভরা থাকতে পারত। মাঝখানে দুটো কি তিনটা শাপলা ফুটে থাকতে পারত। তার বদলে শেওলা আর খড়কুটো, কচুরিপানায় ছেয়ে আছে। মাঝখানে একটুখানি পানি দেখা যায়। তবু সেখানেই দুটো হাঁস কোনোরকম করে ভেসে আছে। অত অল্প জল তবু তো হাঁসগুলো আনন্দ ভাগ করে নিতে পারছে। আসাদ সিদ্ধান্ত নেয়? আজ সে কিছুতেই কনকচাঁপার মন খারাপ করে দেবে না।

চলুন, যাই।
যাবেন আমার সঙ্গে!
কেন নয়?
আসুন। শুভ হোক নববর্ষ।

ভ্যান চলছে। বাতাসে কনকচাঁপার শাড়ির আঁচল আর চুল উড়ছে। ওর মুখ দেখে আসাদ করিমের মনে হচ্ছে, যেন ওর মনও একই সংগে কোন অজানার উদ্দেশে উড়ে চলেছে। আসাদ করিমের মনে হচ্ছে, আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে…। কনকচাঁপা গুন গুন করে গাইছে, আজি নব রূপে আসিয়াছি দ্বারে, বরণ করে লহো মোরে, রাঙিয়ে দাও নতুন রঙে, নতুন আনন্দে এসো নতুন প্রাণে…।

Series Navigation<< উপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল।। নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর ।। পর্ব এগারোউপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল সে কহিল ।। নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর।।পর্ব তেরো >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *