উপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল।। নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর।। পর্ব নয়

আসাদ নবম শ্রেণীতে শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটা পড়াবে। কবিতাটা বেশ কয়েকবার সে পড়ে নিল। উপমা আর দৃশ্যপটগুলো সে পাশাপাশি সাজিয়ে নিল। সাজাতে গিয়ে বাংলাদেশের গ্রামের অনেকগুলো খন্ড খন্ড চিত্র সে পেয়ে গেল। যেগুলো সে এখানে এসে প্রতিদিনই দেখছে। আর গ্রামের যে জীবন এই কবিতায় চিত্রায়িত তাও এখানে বর্তমান। অথচ শামসুর রাহমান নাগরিক কবি। আধুনিক ব্যক্তিমানুষের মন তাঁর কবিতার প্রাণ। কিন্তু তিনি এই কবিতায় বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সুখের জীবনের নানান চিত্র আর প্রতীকে এদেশের স্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। এই গ্রামে না এলে যেমন রবীন্দ্রনাথের চেনা গ্রামকে আসাদের চেনা হতো না তেমনি জীবনানন্দ আর শামসুর রাহমানের গ্রামকেও জানা হতো না। তবু ওর মনে হচ্ছে, যে বিশাল ক্যানভাস নিয়ে এই কবিতার ব্যাপ্তি সেটা সে ধরতে পারছে না। শামসুর রাহমানের এই কবিতার প্রতিটি উপমা কিংবা রূপক সমাজ-জীবনের অতল স্পর্শ করতে আহব্বান করে। অথচ সবটুকু ধরা যায় না। ভাবে কেমন করে ছাত্রছাত্রীদের সে বোঝাবে? ক্লাসে কবিতা শুরু করার আগে সে গ্রাম নিয়ে কথা বলল।

তোমাদের গ্রামে কি পুকুর আছে?
জ্বী, স্যার অনেক পুকুর।
বটের ঝুরি দেখেছো?
জ্বী স্যার।
লাল জামা পেয়ে ছোটো শিশুরা কেমন খুশি হয়?
খুব খুশি হয়।
আচ্ছা, ঠিক আছে।
জায়নামাজে বসে কারা নামাজ পড়েন?
দাদা-দাদী, নানা-নানী সবাই পড়ে।

আমরা আজ একটা সুন্দর কবিতা পড়ব। এই কবিতাটায় তোমরা তোমাদের গ্রামের অনেক কিছু পাবে। এমনকি তোমাদের নিজেদেরকেও কবিতায় দেখতে পাবে। আমরা একবার কবিতাটা মন দিয়ে পড়ব। পড়বার পর শুনব। তোমরা তোমাদের পরিচিত যত শব্দ পাবে সেগুলো খাতায় লিখবে। তবে আগে শুনতে হবে ভালো করে। কবিতাটা লিখেছেন শামসুর রাহমান। স্বাধীনতা আমাদের কাছে কেমন ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় কবি তাই লিখেছেন। তাহলে শোনো, ‘স্বাধীনতা তুমি রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান, স্বাধীনতা তুমি নজরুল…।’

কবিতা আবৃতি শেষ করে আসাদ জানতে চাইল কেমন লাগল?
খুব সুন্দর।
এখন বলো, তোমরা কী কী পরিচিত ছবি এই কবিতায় পেয়েছো?
অনেক কিছু।
সেগুলো একটা একটা করে বলো।
‘গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।’
স্যার, ‘ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।’
‘রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।’
‘খুকুর লাল জামা।’
চমৎকার! তোমরা ঠিকই বলেছো। আমরা এই দুটি উপমার মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতাকে জানতে, বুঝতে এবং অনুভব করতে চেষ্টা করব। আচ্ছা, তোমাদের কার কার বাড়িতে পুকুর আছে?
সকলের বাড়িতেই আছে।
তোমরা কে কে সাঁতার জানো হাত তোলো।
সবাই জানি।
আচ্ছা! সকলেই জানো, বেশ। আচ্ছা, কে কে সাঁতার কাটো-এক-দুই-তিন-চার। দশজন। আর, বাকীরা? মেয়েদের ক’জন সাঁতার কাটো?
আসাদ দেখল কেউ হাত তুলল না।
তোমরা কেউ সাঁতার কাটো না?  কেন, সাঁতার কাটতে ইচ্ছে করে না?
স্যার, ইচ্ছা তো করে।

তাহলে, কেন সাঁতার কাটো না? ইচ্ছে করে, কিন্তু সাঁতার কাটতে পারো না। কেন সাঁতার কাটতে পারো না আমি আন্দাজ করে বলতে পারি। শুধু সাঁতার কাটা নয় আমাদের দেশের মেয়েরা নিজের ইচ্ছে মতো তেমন কিছুই করতে পারে না। মেয়েদের বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পদে পদে নিষেধ এসে বাধা দেয়। তাদের পায়ে এক অদৃশ্য শেকল পরিয়ে দেয়া হয়─ অল্প বয়সেই। কি, ঠিক বলিনি?

স্যার, আপনার কথা বুঝি নাই।
অদৃশ্য শেকলটার কথা বুঝলে না তাই তো?
তোমাদের যা করতে ইচ্ছে করে সব সময় কি সেটা করতে পারো? যেখানে যেতে ইচ্ছে করে যেতে পারো?
পারি না।

কেন পারো না? তোমরা ছোটো বেলা থেকেই কী শোনো? শোনো যে এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না। সব সময় মা-বাবার নিষেধের ভয় ভেতরে কাজ করে। কখন কী করতে গিয়ে বকা খাও। তাই না? যখন আস্তে আস্তে বড় হতে থাকো তখন তো তোমাদের জন্য নিষেধাজ্ঞার শেষ নেই। কী ঠিক বলেছি না?
জ্বী, স্যার।

স্বাধীনভাবে তোমরা কি কোনো কিছু করতে পারো? পারো না। একটা অদৃশ্য বাধা সবখানে টের পাও। কিন্তু সেটা দেখতে পাও না। এটাই আসলে নিষেধের শেকল। আমাদের মেয়েরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করারও সুযোগ পায় না। তোমরা দেখেছো পাখিকে খাঁচায় রাখা হয় অথবা পায়ে শেকল পরিয়ে রাখা হয়। যদি খাঁচা খুলে দেয়া হয় সেই পাখির শেকল খুলে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে সে মুক্তি পেয়ে বনে গিয়ে মনের আনন্দে গান গাইতে থাকবে। তাই না? কিন্তু আমাদের মেয়েদের পায়ের শেকল তো সাদা চোখে দেখা যায় না। সেটা দেখার জন্য অন্তর্চক্ষু লাগে, বিবেচনা লাগে, শিক্ষার আলোর প্রয়োজন হয়। আমাদের অশিক্ষা আর অজ্ঞতা মেয়েদের নিষেধের খাঁচায় বন্দি করে রাখে। মুক্তির জন্য তারা ছটফট করলেও তারা মুক্তি পায় না। বড় হতে হতে একসময় হতাশ হয়ে কপালের দোষ মনে করে সব কিছু মেনে নেয়। কিন্তু ছেলেদের বেলায় এমনটি হয় না। কোনো ছেলে যদি লেখাপড়া করতে চায় মা-বাবার সামর্থ্য থাকলে তাকে তো পড়ালেখা করাবেই, সামর্থ্য না থাকলেও চেষ্টা করবে। আর মেয়েদের বেলায় ঘটে উল্টো। মা-বাবা ধরেই নেয়, মেয়েরা বাইরে যাবে না, ঘরে থাকবে। ওদের বেশী পড়ালেখা তো দূরের কথা, পড়ালেখা না করলেও চলে। এখন তোমরা চিন্তা করো, যদি এমন হয়, আমাদের দেশে মেয়েরাও ছেলেদের মতো সকল সুযোগ ভোগ করতে পারছে, তাহলে কেমন হবে? যে মেয়েটাকে মা-বাবা কেবল সব কিছুতে নিষেধ করে আসছে ওকে যখন পুকুরে মনের আনন্দে সাঁতার কাটতে দেয়া হবে তখন ওর কী ভীষণ আনন্দ হবে, সে কী রকম খুশি হবে, একবার ভাবো। কবির কাছে আমাদের স্বাধীনতা সেরকম একটি আনন্দের এবং খুশির বিষয়। একটি মেয়েÑযে কিনা জীবন চলার পথে পদে পদে বাধা পায়, সে যখন অবাধ আনন্দে মেতে উঠতে পারে সে খুশির মতোই আমাদের স্বাধীনতা। আমরা যখন পরাধীন ছিলাম তখন খাঁচার পাখির মতো শতরকম বাধার মধ্যে ছিলাম কি, তোমরা বুঝতে পেরেছো?

পুরো ক্লাস চুপ করে আছে। আসাদ ভাবে বিষয়টা আরো একটু খোলাসা করে বলা দরকার।

আমরা যখন পরাধীন ছিলাম তখন পাকিস্তানী শাসকরা আমাদের পায়ে অদৃশ্যমান শেকল পরিয়ে রেখেছিল। তারা আমাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতেও দিতে চাইত না। অথচ আমাদের দেশের মানুষ আগে থেকেই স্বাধীনচেতা ছিল। স্বাধীনতার ভাব প্রকাশের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে ভাষা-মাতৃভাষা। এদেশের আরো অনেক কবি, এমন কি প্রাচীন কালের কবিও মাতৃভাষায় মনের ভাব প্রকাশের কথা বলে গেছেন। যেমন ‘বিনা স্বদেশী ভাষা পুরে কি আশা?’। আবার মাতৃভাষা আমাদের কাছে কত মূল্যবান সে কথা প্রকাশ করতে গিয়ে কবি বলেছেন, ‘মোদের গরব মোদের আশা আ-মরি বাংলা ভাষা’। যারা বাংলাভাষাকে পছন্দ করে না তাদের ধিক্কার দিয়ে কবি বলেছেন─‘যেসবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’ এসব কবিতা তোমরা অন্য ক্লাসে পড়তে পারবে। এ বিষয় নিয়ে আমরা পরে কথা বলবো। এই কবিতাতেও আছে, ‘স্বাধীনতা আমার যেমন খুশি লেখার কবিতার খা’ তুমি যখন তোমার মনের ভাব তোমার ইচ্ছে মতো প্রকাশ করতে পারো সেটা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। পাকিস্তানীরা আমাদের মায়ের ভাষায় লেখাপড়া করতে দিতে চায় নি। বাংলাভাষার বদলে উর্দু ভাষা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল। আমাদের দেশের সাহসী সন্তানরা ঐ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত গান পাকিস্তানী শাসকরা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। আমরা আমাদের দেশকে নিয়ে কবিতা লিখব আর গান করব

পাকিস্তানী শাসকরা তাও মেনে নিতে পারে নি। যা কিছু ভালো, যা আনন্দের, তুমি করতে চাও, যদি তা তোমাকে করতে না দেয়া হয়- সেটাই পরাধীনতা। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাতে এদিকটি তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমরা এই কবিতায় দেখতে পেয়েছি যে, কোনো কিশোরী ওর বাড়ির পুকুরে অবাধে সাঁতার কেটে যেমন অমলিন আনন্দ পায় কবির কাছে স্বাধীনতা তেমনই আনন্দের।

আসাদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মানুষের ত্যাগ আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মর্মকথা ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতায় কবি যে খুব পরিচিত উপমা এবং রূপকের মধ্যদিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন সেসব বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করল। এই কবিতায় আবহমান বাংলার যেসব পরিচিত চিত্র স্বাধীনতার উপমা হিসেবে কবি তুলে এনেছেন সেগুলো নিয়ে কথা বলল।
তোমরা বুঝেছো?

সবাই চুপ করে রইল। কেউ উত্তর না দেয়াতে আসাদ ক্লাসের দিকে তাকাল। তখন একটি ছাত্রী অন্যকারণে ওর মনযোগ আকর্ষণ করল। মেয়েটা স্কুলে ফিরে আসায় ওর ভালো লাগছে। কিন্তু মেয়েটা যেন চুপসে গেছে। আগের মতো উৎফুল্লতা আর নেই। চুপ করে ক্লাস করছে। আগে কোনো প্রশ্ন করলে মেয়েটি যেন লুফে নিয়ে উত্তর দিত। ওর নীরবতা দেখে ক্লাসের অন্য ছাত্রছাত্রীরা বেশ অবাক। অনেকে জানেই না যে ওর বিয়ে হয়েছে। যারা জানে তারা আড় চোখে ওর দিকে তাকাচ্ছে যেন সে ক্লাসে নতুন আর অপরিচিত। আসাদ মেয়েটাকে ঠিক চিনত না। তবে ক্লাসে চটপট প্রশ্নের উত্তর দেয় বলে ওর মুখটা মনে আছে।
তোমার নাম যেন কী?
আলেয়া।
তুমি বুঝেছো?

আলেয়া তবু চুপ করে রইল। আসাদ বুঝতে পারছে, বাল্যবিবাহের কারণে ভেতরে ভেতরে মেয়েটা ভেঙে পড়েছে। ওর উপর যে ধকল গেছে সেটা ক্লাসের কোনো ছাত্রছাত্রীর বুঝবার কথা নয়। সে স্কুলে ফিরে এসেছে বটে, কিন্তু এখানেও সে নতুন এক পরিচয়ে ফিরে এসেছে। এই বিব্রতকর পরিচয় নিয়ে সে অস্বস্তি বোধ করছে। অপমানিতও বোধ করতে পারে। ওর ধকল সামলে উঠতে সময় লাগবে।

Series Navigation<< উপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল।। নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর।। পর্ব আটউপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল ।। নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর।। পর্ব দশ >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *