উপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল।। নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর।। চৌদ্দ

১৭

‘সূর্য ক্রমেই রক্তবর্ণ হয়ে একেবারে পৃথিবীর শেষ রেখার অন্তরালে অন্তর্হিত হয়ে গেল।…বহু দূরে একেবারে দিগন্তের শেষ প্রান্তে একটু গাছপালার ঘের দেওয়া ছিল, সেখানটা এমন মায়াময় হয়ে উঠলনীলেতে লালেতে মিশে এমন আবছায়া হয়ে এল- মনে হল ঐখেনে যেন সন্ধ্যার বাড়ী, ঐখেনে সে আপনার রাঙা আঁচলটি শিথিল ভাবে এলিয়ে দেয়, আপনার সন্ধ্যাতারাটি যত্ন করে জ্বালিয়ে তোলে, আপন নিভৃত নির্জনতার মধ্যে সিঁদুর পরে বধূর মতো কার প্রতীক্ষায় বসে থাকে, এবং বসে বসে পা দুটি মেলে তারার মালা গাঁথে এবং গুন গুন স্বরে স্বপ্ন রচনা করে। সমস্ত অপার মাঠের উপর একটা ছায়া পড়েছে একটি কোমল বিষাদ ঠিক অশ্রুজল নয়─একটি নির্নিমেষ চোখের বড়ো বড়ো পল্লবের নীচে গভীর ছলছলে ভাবের মতো।’

রবীন্দ্রনাথের দেখা সেদিনের সন্ধ্যা আর আজকের সন্ধ্যায় কোনো তফাৎ নেই। আসাদ করিমের কেবলই রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ছে। কদিন ধরে ছিন্নপত্র পড়তে পড়তে ওর মনে হচ্ছে, সেদিন কবি এই মাঠের ধারে হেঁটেছেন, এই নদীর বুকে বজরায় বসে কবিতা, গান আর গল্পভাবনায় মশগুল ছিলেন, আর নদীপথে যেতে যেতে এইসব গাঁয়ের দরিদ্র মানুষদের নিয়ে ভেবেছেন। এখানকার মানুষগুলো কবির ভালোবাসার ধন ছিল। তিনি তাদের সঙ্গে গল্পে মেতেছেন, তাদের আবেদন নিবেদন শুনেছেন, বিচার-শালিস করেছেন, এইসব গ্রামের মানুষের দুঃখ কী করে দূর করা যায় সেটা ভেবেছেন। অনেক উদ্যোগও তাঁর ছিল। রবীন্দ্রনাথের এই ভালোবাসার দিকগুলো এখানকার মানুষগুলোকে জানানো গেলে তারা উদ্বুদ্ধ হবে। রবীন্দ্রনাথের স্কুলে রবীন্দ্রচর্চাও নেই। এটা কি শুরু করা যায়?

এই ভাবনাটা পরদিন আসাদ প্রধান শিক্ষকের কাছে তুলে ধরল।
সামনে ২৫ বৈশাখ। স্কুলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনটা কি পালন করা যায় না?

প্রধান শিক্ষক গ্রীষ্মের ছুটির নোটিশ লিখছিলেন। তিনি আসাদ করিমের প্রস্তাব শুনে মুখ তুলে তাকালেন। কিন্তু জবাব দিলেন না। কলমটা কাগজ থেকে তুলে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন একটা চমৎকার কবিতার ভাব তার মাথায় খেলছে কিন্তু ছন্দোবদ্ধ হচ্ছে না।

পালন করা যায়। কিন্তু কীভাবে পালন করবেন?
আলোচনা, রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি আর কবির কোনো নাটকের অংশবিশেষ যদি ছাত্রছাত্রীরা অভিনয় করে দেখায় তাহলেই তো হয়।
বেশ তো। তাহলে উদ্যোগটা তো আপনাকেই নিতে হবে।
আমি তো থাকবোই। অন্য শিক্ষকগণের সহযোগিতাও যে লাগবে।

সহযোগিতা কতটা পাবেন সেটাই দেখার বিষয়। তবে ছাত্রছাত্রীরা আপনাকে ভালোবাসে। ওদেরকে যা বলবেন তাই করবে। শিক্ষকদের কেউ কেউ এগিয়ে আসবে নিশ্চয়। ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতির জন্য রিহার্সাল করাতে হবে। ক্লাসে একটা নোটিশ জারি করালে ভালো হতো। ঠিক আছে। সেটা করা যাবে। কিন্তু স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে ছেলেমেয়েদের পাবেন তো। ক্লাসেই নিয়মিত উপস্থিত হতে চায় না। সেটা আমি ওদের বোঝাবার চেষ্টা করব। আর নতুন কিছু করতে ছাত্রছাত্রীরা আগ্রহী হবে, মজাও পাবে। আগ্রহী হলেই ভালো। দেখুন চেষ্টা করে। আর ওরা আগ্রহী হলেই তো হবে না, ওদের বাপ-চাচারা কীভাবে নেবে সেটাও বিবেচনার বিষয়। তবু চেষ্টা করুন। আমি আছি আপনার সঙ্গে।

ধন্যবাদ, স্যার।
প্রধান শিক্ষক ক্লাসে ছুটির নোটিশের সঙ্গে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনের নোটিশটাও জারি করিয়ে দিলেন।
ষষ্ঠ পিরিয়ডে নবম শ্রেণীর বাংলা দ্বিতীয় পত্রের ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা ঠিকই আসাদকে ছেঁকে ধরল। একসঙ্গে যেন পুরো ক্লাস উল্লাসে মেতে উঠল। দেখে আসাদ করিমের মন ভরে যায়।

তোমরা শান্ত হও।
স্যার কখন রিহার্সাল হবে? আমরা কী নাটক করব?
সে তো হবে। কিন্তু তোমরা কে কে নাটকে অভিনয় করতে চাও? হাত তোল।
চারপাঁচ জন ছাত্র হাত তুলল। কোনো ছাত্রী হাত তুলল না।
ছাত্রীরা কেউ অভিনয় করবে না?

সকলেই চুপ। আসাদ আন্দাজ করল কোথাও কোনো সমস্যা আছে। সে পরিবেশটা হালকা করার জন্য প্রসঙ্গটা একটু বদলে নিল।

মেয়েদের মধ্যে কে কে কবিতা আবৃত্তি করতে চাও? হাত তোল।
এবার কয়েকজন হাত তুলল।
তুমি কোন কবিতাটা আবৃত্তি করতে চাও?
আমাদের ছোটো নদী।

তখন ক্লাস আবার হেসে উঠল। এটা যে একটা ছড়া এবং নবম শ্রেণীর ছাত্রী হিসেবে যে আরো অর্থবহ একটি কবিতা আবৃত্তি করা দরকার সেটা ওরা বোঝে।
ঠিক আছে। এটা নাহয় নীচের ক্লাসের কেউ করবে। তুমি কি আর কোনো কবিতা পড় নি?

পড়েছি। আত্মত্রাণ।
বেশ। এটা আবৃত্তি করা যায়।
আর তোমরা?
স্যার, আপনি ঠিক করে দেন। আমরা শিখে নিব।

ঠিক করে দেন নয়, দিন। আর শিখে ‘নিব’ না বলে বলবে শিখে ‘নেবো’। লেখা যখন কথায় প্রকাশ করা হয় তখন কিছুটা বদলে যায়। আবৃত্তি করতে হলে আমাদের শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতেও শিখতে হবে। আমি তোমাদের সঠিক উচ্চারণ শিখতে সহযোগিতা করবো। তোমরা কি রিহার্সালে সময় মতো আসবে?

জী, স্যার। কোন সময় আসব।
‘আসব নয়’, আসবো। তোমরা আগামী রবিবার থেকে সকাল দশটায় স্কুলে আসবে। দু ঘণ্টা রিহার্সাল করে ছুটি।

আসাদ করিমের মনে পড়ল, প্রধান শিক্ষক নোটিশে সময় উল্লেখ করেন নি। হয়তো ভুলে গিয়ে থাকবেন। সে ক্লাস শেষ করে প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানাল। প্রধান শিক্ষক ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন।

আপনি বসুন। আমি নিজেই ক্লাসে গিয়ে সময়টা জানিয়ে দিচ্ছি।
স্যার, আপনি যাবেন কেন? আমিই জানিয়ে দিতে পারব।
আমিই যাচ্ছি। আপনিও আমার সঙ্গে আসতে পারেন।

বের হতে হতে প্রধান শিক্ষক বললেন, আপনি তো গ্রামের লোকজনকে চেনেন না। চিনলে এতটা সাহস দেখাতেন না। তবে এটাও ঠিক আমাদের সাহসী মানুষের বড় অভাব। আমরা ভয়ে ভয়ে শেয়ালকেও বাঘ বানিয়ে ফেলছি। এদিকটা কেউ খেয়ালও করছি না। আসাদ ইঙ্গিতটা ধরতে পারল। কিন্তু এরকম কোনো অভিজ্ঞতা হয় নি। প্রধান শিক্ষক ক্লাসে ঢুকে প্রতিটি ক্লাসে নিজে জানিয়ে দিয়ে এলেন আগ্রহী ছাত্রছাত্রীরা যেন মহড়ায় উপস্থিত হয়।

১৮

ডাকঘরের একটি অঙ্ক ‘ইচ্ছে’ নাম দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্য বই-এ সংকলিত আছে। আসাদ এই ‘ইচ্ছে’কে ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে অভিনয় করানোর কথা ভাবছে। আর ছিন্নপত্রে রবীন্দ্রনাথের দেখা পতিসর নিয়ে আলোচনা করা গেলে তখনকার পতিসর কেমন ছিল মানুষ জানতে পারবে। পতিসর নিয়ে রবীন্দ্রনাথের তখনকার অনুভূতি কেমন ছিল সেটাও তাদের জানা হবে। তাছাড়া সোনারতরী, দুই বিঘা জমি, এবার ফিরাও মোরে, ঐকতান এসব কবিতা ছাত্রছাত্রীরা ভালো করে রিহার্সাল করে আবৃত্তি করলে একটা সুন্দর অনুষ্ঠান হতে পারে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া কি অনুষ্ঠান পূর্ণ হয়?

আসাদ আগেই এসে সেমিনার কক্ষে বসে ছিল। ছাত্রছাত্রীরা আসবে কিনা ভাবছিল। ছুটির দিন, দশটা এখনো বাজে নি। দশটার পর কয়েকটি ছেলে বইখাতা নিয়ে উপস্থিত হলো। দেখে মনে হলো সত্যি সত্যি ক্লাস করতে এসেছে।

তোমরা কি কোথাও পড়তে গিয়েছিলে?
না, স্যার।
তাহলে বইখাতা কেন এনেছো?
বাড়ীতে বলেছি, স্কুলে বাড়তি ক্লাস হবে।
কেন?
একথা না বললে আসতেই দিত না।

আব্বা ত টিভি দেখতেই নিষেধ করে। বলে, টিভি দেখলে পড়ালেখা হবে না। আর নাটক করব শুনলে তো মেরে হাড্ডি গুড়া করে দেবে।

তাই তোমরা মিথ্যে কথা বলে এসেছো?
মিথ্যা কথা বলিনি। এটাও তো ক্লাসই। আর কী করব। এ কথা না বললে তো আসতেই পারতাম না।
তোমরা সকলেই একই কথা বলেছো?
আমি বলেছি স্যার আমাদের পরীক্ষার পড়া বুঝিয়ে দেবেন।

আসাদ বুঝল সে যতটা সহজ মনে করেছিল আসলে ব্যাপারটা সেরকম সহজ নয়। সে বুঝতে পারছে, এখন গ্রামে ধান কাটার সময়। এসময় গ্রামের বাড়ীতে কাজের শেষ নেই। তবুও একটা ঘণ্টা সময় দিয়ে ওদের কিছু শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে পারলে একটা অনুষ্ঠান করা যায়। ততক্ষণে আরো কয়েকজন উপস্থিত হলে সে কিছুটা হলেও আশাবাদী হয়ে ওঠে।

আসাদ ছড়া আর কবিতা শুনল। কারো উচ্চারণই সঠিক নয়। আঞ্চলিকতার টান তো আছেই। তবুও সে সবাইকেই উৎসাহিত করতে হাততালি দিল। তার হাততালি দেখে ছাত্রছাত্রীরাও হাততালি দিচ্ছিল। একসময় দেখল কক্ষে অনেক ছাত্রছাত্রী। তাদের পেছনে আশপাশে বসবাসকারী কয়েকজনকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। আসাদ তাদের বসতে বলল। তারা কোনো সঙ্কোচ না করেই পেছনের উঁচু টুলে বসে উপভোগ করতে লাগল। কে কে অভিনয় করবে আসাদ দেখতে চায়। সে ঠিক করেছে, ডাকঘর নাটকের দ্বিতীয় অঙ্ক ছাত্রছাত্রীরা অভিনয় করে দেখাবে। এই অঙ্কে পাঁচটি ছেলে আর একটি মেয়ে অভিনয় করতে পারবে। ডাকঘরের এই অংশে কিশোর মনের ইচ্ছেগুলো স্বপ্নের মতো পাখা মেলেছে। এই দুটি দৃশ্য নিশ্চয় ওদের ভালো লাগবে। আর গ্রামের পুরো পরিবেশটা এতে এমন চমৎকার ফুটে উঠেছে যে সেটা হৃদয় স্পর্শ করে যায়।

দইওয়ালা কে হতে চাও?
স্যার, আমি।
আরো দুজন একই সঙ্গে হাত তুলল, ‘স্যার আমি, স্যার আমি।’ দেখা গেল আরো কয়েকজন আগ্রহী।

ঠিক আছে। কে অমল হতে চাও?
স্যার, আমি হব।
নবম শ্রেণীর একজন হাত তুলল। কিন্তু চরিত্রটি আরো ছোটো এক কিশোরের।
আর কেউ অমল হতে চাও না?
আমি স্যার।

ষষ্ঠ শ্রেণীর একটি ছাত্র দাঁড়িয়ে হাত তুলল। ছেলেটিকে দেখলে মনে হয় না ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। মনে হয় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু সে ওর সুন্দর আর মিষ্টিমুখ নিয়ে সকল শিক্ষকের প্রিয়পাত্র হয়ে আছে। আর আসাদ মনে রেখেছে ক্লাসে সে অমল হয়ে অভিনয় করে ওকে মুগ্ধ করেছিল।
আর সুধা কে হতে চাও?

এখন আর কেউ সাড়া দিল না, হাতও তুলল না। আসাদ দেখল কক্ষে তিনটি কিশোরী। ওদের একটি হলো সেই আলেয়া। সে চুপচাপ বসে দেখছে। মাথায় একটুখানি ওড়না দিয়ে মুখটাকে আড়াল করবার প্রয়াসও আছে। কিন্তু তাতে চোখের আলো ঢেকে যায় নি।

কেউ সুধা হতে চাও না?
স্যার, আমি সুধা হতে চাই।

আসাদ দেখল আলেয়া দাঁড়িয়ে আছে। সে ভাবনায় পড়ে গেল। তার আগের ঘটনাটা মনে পড়ল। সে অন্য দুজন মেয়ের মুখের দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো আগ্রহ লক্ষ্য করল না।

স্যার, আমি পারব।
তুমি নাটকটা আগে পড়েছো?
জ্বী না।
মেয়েদের মধ্যে আর কেউ অভিনয় করতে চাও না?

সকলেই চুপ। আসাদ আলেয়াকে নেবে কিনা তখনো ভাবছে। ক্ষণে ক্ষণে তার মৌলানা সাহেবের কথা মনে পড়ছে। এরই মাঝখানে আবার কনকচাঁপাকেও মনে পড়ছে। আর তখনই কনকচাঁপার গলা শোনা গেল।

কি, স্যার, আলেয়াকে দিয়ে সুধা হবে না?
হবে না কেন?

তা হলে আর দ্বিধা কেন? আমি ওকে দেখিয়ে দেবো। বাকীটা আপনি গড়ে নেবেন।
আপনি দেখিয়ে দিলে আমার আর কিছু করতে হবে না। আসুন। দেখুন ওরা কেমন আবৃত্তি আর অভিনয় করে। তোমরা এক এক করে কবিতা নিয়ে আসো।
ছেলেরা ওদের ক্লাসে পঠিত রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে পড়ে শোনাল। মেয়েরা কেউ এগিয়ে আসছে না দেখে কনকচাঁপা তাগাদা দিল।
তোমরা কবিতা আবৃত্তি করবে না? চলে আসো।

দীপালি নামের একটি মেয়ে উঠে এল। সে বিপদে মোরে রক্ষা কর বলতে গিয়ে মাঝখানে থেমে গেল। যেন সত্যি সত্যি বিপদে পড়ে গেল। ছাত্ররা হেসে উঠল।

তোমরা একটু চুপ করো। আমরা একে অন্যকে সহযোগিতা করবো। আমরা প্রত্যেকেই কি সব কিছু ঠিকঠাক মতো করতে পারি? আমাদের সবারই কি কোথাও না কোথাও ভুল হয় না? ভুল তো হবেই। এখানে যারা এসেছো তোমরা কেউ আগে অভিনয় কর নি। তোমরা যা করবে সেটাই ভালো হবে। আর দেখব আমরা, তোমাদের শিক্ষকরা দেখবেন, অভিভাবকরা দেখবেন। এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আজকে আমরা এখানেই শেষ করবো। তোমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের কবিতাটা মুখস্থ করে আসবে। আর আমি কাল তোমাদের ডাকঘরের অংশটুকু ফটোকপি করিয়ে এনে দেবো।

ছাত্রছাত্রী আর যে কয়েকজন পাড়ার লোক এসেছিল তারা চলে গেলেও ঘর তালাবদ্ধ করতে করতে আসাদ দেখতে পেল কনকচাঁপা ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে এগিয়ে কাছে যেতেই মন্তব্য করল।
মনে হচ্ছে রবীন্দ্রজয়ন্তী বেশ ভালো হবে।

চেষ্টা করে দেখা যাক যতটুকু পারা যায়। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা যতটুকু মজা পাবে তাতেই চলবে। আসল লক্ষ্য তো রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করা। ছাত্রছাত্রীদের মাঝে রাবীন্দ্রিক চেতনা জাগ্রত করা। কিন্তু একটা দিক অপূর্ণই থেকে যাবে মনে হচ্ছে।

কোন দিক?
রবীন্দ্রনাথের গান যদি না গাওয়া হয় তাহলে কী রবীন্দ্রজয়ন্তী হয়?
গান হবে না কেন?
কে গাইবে? আছে কেউ?
আমি অবশ্য চেষ্টা করে দেখতে পারি।
আপনি! তাহলে তো খুব ভালো হয়।
আমার কথা এই আয়োজনে একবারও আপনার মনে পড়ে নি?
সরি, আসলে─

থাক, আর কৈফিয়ত দিতে হবে না। আমাকে না ডাকতেই এসেছি। আপনি যা কিছু ভালো কাজ করবেন, আমাকে পাশে পাবেন।

আপনাকে ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ পাওয়ার জন্য পাশে থাকতে চাই না।
তা হলে?
সেটা এই অবেলায় শোনা খুব প্রয়োজন?
না, না। সময় হলেই বলবেন। আমি প্রতীক্ষায় রইলাম।
আপনি আপনার ঘরে গিয়ে প্রতীক্ষা করুন। আমি আমার ঘরে যাই। দেখা হবে।
শুনুন, কবিতা কি শোনা হবে না? আসাদ পেছন থেকে ডাকল।
তাহলে শুনুন─

আমি খুঁজে ফিরি তারে দূর-দূরান্তরে
অথচ সে বসে আছে আমার অন্তরে
কেমন করে আমি তারে খুঁজে পাই
যদি বা সে বাহির হতে না-ই চায় ?

আসাদ কবিতাটা নিয়ে ভাবতে থাকে। কনকচাঁপা এক মুঠো সৌরভের মতো ওর কবিতাটা আসাদের কাছে রেখে চলে গেল। সে কি ভুল করে অথবা ইচ্ছে করে রেখে গেছে? কবিতাটার সৌরভ তার মন ছুঁয়ে যাচ্ছে।

১৯

‘পৃথিবী যে বাস্তবিক কী আশ্চর্য সুন্দরী তা কলকাতায় থাকলে ভুলে যেতে হয়। এই-যে ছোটো নদীর ধারে শান্তিময় গাছপালার মধ্যে সূর্য প্রতিদিন অস্ত যাচ্ছে, এবং এই অনন্ত ধূসর নির্জন নিঃশব্দ চরের উপরে প্রতিরাত্রে শত সহস্র নক্ষত্রের নিঃশব্দ অভ্যুদয় হচ্ছে, জগৎ সংসারে এ-যে কী একটা আশ্চর্য মহৎ ঘটনা তা এখানে থাকলে তবে বোঝা যায়। সূর্য আস্তে আস্তে ভোরের বেলা পূর্ব দিক থেকে কী এক প্রকান্ড গ্রন্থের পাতা খুলে দিচ্ছে এবং সন্ধ্যা পশ্চিম থেকে ধীরে ধীরে আকাশের উপরে যে-এক প্রকান্ড পাতা উল্টে দিচ্ছে সেই বা কী আশ্চর্য লিখন─আর, এই ক্ষীণপরিসর নদী আর এই দিগন্তবিস্তৃত চর আর ওই ছবির মতন পরপার─ধরণীর এই উপেক্ষিত একটি প্রান্তভাগ─এই বা কী বৃহৎ নিস্তব্ধ নিভৃত পাঠশালা!’

আসাদ করিম এই প্রকৃতি দেখতে দেখতে ভাবে, পতিসর হাই স্কুল নয়, আসলে রবীন্দ্রনাথের দেখা সেই প্রকৃতির পাঠশালায় এসে হাজির হয়েছে। যতই দিন যাচ্ছে, যতই দেখছে জায়গাটা ওর এত ভালো লাগছে যে এখন আর প্রতিদিন বিকেলে সে বের না হয়ে পারে না। কে যেন প্রতিটা বিকেলে ওকে ঘরের বাইরে ডেকে নিয়ে যায়। বেড়াতে বেড়াতে আসাদের সেই গানটা মনে পড়ছে, ‘সে যে আমায় ঘরের বাহির করে…।’

আসাদ করিম নদীর পাড় ধরে হাঁটছিল। নদীর এপারে শস্যশূন্য মাঠে রাখাল শিশুর রাখালিতে নদীর ঢালু তটে কয়েকটি গরু ঘাস খাচ্ছে। অপর পারে গ্রাম। খড়ের ঘর, চালশূন্য মাটির দেয়াল, খড়ের স্ত‚প। বাঁশের ঝাড়, গোটাতিনেক ছাগল। তারপর দূরে বটগাছ। নদী পর্যন্ত একটি গড়ানে কাঁচা ঘাট। সেখানে কেউ কাপড় কাচছে, কেউ নাইছে, কেউ বাসন মাজছে। কোনো কোনো ঘোমটা ঈষৎ ফাঁক করে কলসী কাঁখে যেতে যেতে আসাদকে সকৌতুকে দেখছে। একটা পরিত্যক্ত নৌকা জলে অর্ধনিমগ্ন। আবার শস্যশূন্য-মাঠ আর দুই-একজন কৃষক কিছু একটা করছে।

এই ছবিটাও আসাদ করিমের খুব চেনা মনে হচ্ছে। কোথাও যেন দেখেছে। অথচ গ্রামের এদিকটায় সে আগে আর আসে নি। এমন কি এখানে আসার পর পতিসরের বাইরে সে আর অন্য গাঁয়ে যায় নি। আশেপাশের আর কোনো গ্রাম সে চেনে না। এখানকার শিক্ষকদের কেউ তাকে অন্য কোনো গ্রামে তাঁদের বাড়ীতে নিয়ে যেতে আগ্রহ দেখায় নি। প্রকৃত পক্ষে শশাঙ্ক বাবু ছাড়া আর কারো সঙ্গে তার তেমন কথাও হয় না। কখনো সময় পেলে তিনি তার খোঁজ-খবর করেন। তাঁর বাড়ীতে যেতে বলেন। আজ এদিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের আকাশ, বাংলাদেশের মাঠ সত্যি দেখার মতো। দেখতে দেখতে এগিয়ে যেতে যেতে গ্রামগুলোকে চেনা মনে হচ্ছে। কেন এমন মনে হচ্ছে আসাদ হাঁটতে হাঁটতে আবার সেকথাই ভাবছে। আর দেখতে দেখতে সহসাই দমকা হাওয়ার মতো রবীন্দ্রনাথকে ওর আবারও মনে পড়ল।

ছিন্নপত্রে তো কবি গ্রামের এই ছবিটাই ধরে রেখেছেন। ছিন্নপত্রের ছবিটা মনে পড়তেই আসাদ বটগাছের তলে স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে পড়ল। কবি লিখেছেন, ‘আমি এখন বাংলাদেশের এক প্রান্তে বাস করিতেছি এখানে কাছাকাছি কোথাও পুলিসের থানা, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছারি নাই। রোলোয়ে স্টেশন অনেকটা দূরে। যে পৃথিবী কেনাবেচা বাদানুবাদ মামলা-মকদ্দমা এবং আত্মগরিমার বিজ্ঞাপন প্রচার করে, কোনো একটা

প্রস্তরকঠিন পাকা বড়ো রাস্তার দ্বারা তাহার সহিত এই লোকালয়গুলির যোগস্থাপন হয় নাই। কেবল একটা ছোটো নদী আছে। সে কেবল এই কয়খানি গ্রামেরই ঘরের ছেলেমেয়েদের নদী।’ আসাদ এখন রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়েই পতিসর দেখছে। ওর আরো মনে পড়ছে, ‘এখানে আমি দলছাড়া, এবং এখানকার প্রত্যেক দিন আমার নিজের দিননিত্য-নিয়মিত-দম-দেওয়া কলের সংগে কোনো যোগ নেই। আমি আমার ‘ভাবনাগুলি এবং অখন্ড অবসরটিকে হাতে করে নিয়ে মাঠের মধ্যে বেড়াতে যাইÑ সময় কিম্বা স্থানের মধ্যে কোনো বাধা নেই। সন্ধ্যেটা জলে স্থলে আকাশে ঘনিয়ে আসতে থাকে, আমি মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বেড়াতে থাকি।’

আসাদ বেড়াতে বেড়াতে ভাবছে, রবীন্দ্রনাথ এখানে প্রকৃতই নতুন এক রবি হয়ে উদিত হয়েছিলেন, আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

আসাদ দেখছে ছিন্নপত্রাবলীর সব রং নিয়ে প্রকৃতি তারও সামনে উপস্থিত হয়েছে। মাঠের অপর পারে একটি কোমল বিষাদ একটি নির্নিমেষ চোখের বড়ো বড়ো পল্লবের নীচে গভীর ছলছল ভাবের মতো ছায়া নেমে এলে ভাবতে ভাবতে আসাদ সামনে তাকিয়ে দেখতে পায়, রবীন্দ্রনাথের সেই জ্যোৎস্না তার পেছনে অল্প অল্প করে ফুটে উঠছে। নদীর এ পারের মাঠে কোথাও কিছু সীমাচিহ্ন নেই, গাছপালা নেই চষা মাঠে একটা ঘাসও নেই, কেবল নদীর ধারের ঘাসগুলো প্রখর রৌদ্রে শুকিয়ে হলদে হয়ে এসেছে। জ্যোৎস্নায় এই ধূ ধূ শূন্য মাঠ ভারী অপূর্ব দেখাচ্ছে। বহুদূরের মাঠের শেষে দূর অস্পষ্ট গাঁয়ে কোনো কোনো বাড়ীতে উনুনে রান্না হচ্ছে। মাঝে মাঝে সেই আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে। একটা প্রকান্ড মাঠের উপর অস্পষ্ট চাঁদের আলো পড়ে একটা বিচ্ছেদশোকের ভাব এনে দিয়েছে।

আসাদ করিম আজ এখানে নাগরতীরে দাঁড়িয়ে রাবীন্দ্রিকবোধে আবিষ্ট। সে কতবছর আগের কথা! শতবর্ষ আগের সেই গ্রাম রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ বাণী সত্য প্রমাণিত করে আজো একই রকম রয়ে গেছে। ওর মনে পড়ছে যে, জমিদারি সূত্রে রবীন্দ্রনাথ এখানে এসেছিলেন, ইতিহাসের আবর্তে সে হারিয়ে গেছে। জমিদার হিসেবে আহরিত অর্থ নয়, সম্পদ নয়, এখানকার প্রকৃতি আর মানুষের ভালোবাসাই সাহিত্যের পাতায় পাতায় অক্ষয় হয়ে আছে। হয়তো ঠিক এরকম একটা বিকেলে রবীন্দ্রনাথ এখানে দাঁড়িয়ে এই অপরূপ মাঠ, এই অসীম নীলাকাশ আর এই অনুপম সন্ধ্যা অবলোকন করে ভেবেছিলেন, ‘এই প্রাচীন পৃথিবীতে কেবল সৌন্দর্য এবং মানুষের হৃদয়ের জিনিষগুলো কোনোকালেই কিছুতেই পুরোনো হয় না, তাই পৃথিবীটা তাজা রয়েছে এবং কবির কবিতা কোনোকালেই একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায় না।’

আসাদ ভাবে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আর কারো তুলনা চলে না, ওর মতো এই ক্ষুদ্র আসাদ করিম তো রবীন্দ্রনাথের বিন্দুসম আলো দানের যোগ্যতাও রাখে না। তবু এখানে এসে যে অচেনাকে চিনবার, অজানা রবিকে জানবার সুযোগ সে পেয়েছে তারও তুলনা হয় না। সেও এখানে প্রতিদিন আকাশ দেখছে, মাঠ দেখছে সবুজ দেখছে। আর মানুষও দেখছে। এইসব মানুষ হাসিকান্নার জীবন নিয়ে সবুজ আর কাদামাটির সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে। প্রকৃতি থেকে তাদের আলাদা করে ভাবাই যায় না।

Series Navigation<< উপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল সে কহিল ।। নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর।।পর্ব তেরোউপন্যাস।। মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল।। নূরদ্দিন জাহাঙ্গীর।। পর্ব পনরো >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *