ছোটগল্প।। ভাই, রাইফেল ও স্বাধীনতা।। ইলিয়াস ফারুকী

নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বে ও অপারেশন স্বার্থক ভাবে শেষ করল ফাহাদরা। বিজয়ী হওয়ার পরেও তার চেহারায় আষাঢ়ে মেঘ।
দুই চোখের পানি নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে অবিরত। উসকো খুসকো বাকরুদ্ধ চেহারা। তবু তার দৃঢ় এবং ঋজু ভঙ্গিমায় কোন
পরিবর্তণ নেই। সঙ্গি রাইফেলটা শক্ত করে বুকের সাথে ধরা। সহ-যোদ্ধাদের কাঁধে দুই দুটি লাশ। দলটি দৃঢ় পায়ে ক্যাম্পের
দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওদের বিজয়ে এবং আগমনের খবর পূর্বেই ক্যাম্পে পৌছে গেছে। ওরা যখন দুটো লাশ নিয়ে ক্যাম্পে
প্রবেশ করল, ক্যাম্পের অবস্থা তখন মিশ্র। আনন্দ এবং বেদনার সহ অবস্থান, যেন রোদ ও বৃষ্টির খেলা। বিজয়ীরা ক্যাম্পে
এলেও সবার চেহারা আষাঢ়ের মত থমথমে। ক্যাম্পের মাঝ বরাবর এসে দলটা থামলো।
ধীরে ধীরে লাশ দুটোকে মাটিতে শোয়ানো হলো। একজন ওদের সাথি, ওদের ভাই বিজয়ী বীর শহিদ খোকন। অন্যটা
রাজাকার কমান্ডারের লাশ। একজন দেশ প্রেমিক, অন্যজন দেশদ্রোহী। মিলটা শুধু এক জায়গায়, দুজনই লড়তে লড়তে
মরেছে।

গুলি যখন বন্দুকের নল ছেড়ে বেরিয়ে যায় তখন সে সম্মুখে অবস্থানরত কোন আত্মীয় স্বজন চেনে না। যুদ্ধ আপন রক্তকে
ভুলিয়ে দিয়ে শুধু রক্তের ফোয়ারা উৎসবে মেতে উঠে। জীবন অদ্ভুত এক জুয়া খেলার নাট্য মঞ্চ। ছোট বয়সে যে ভাই যুগল
আনন্দে মাতিয়ে রাখে তার সব দিগন্ত। এক ভাইয়ের উপর ফুলের টোকাও অন্য ভাই সহ্য করতে পারে না। এই নিষ্কলুষতা
ততদিন থাকে যতদিন নিজ স্বার্থ সত্ত্বা দূরে থাকে।

পৃথিবী ব্যাপি খুঁজলে রাইট ভাতৃদ্বয়ের মতন উদাহরণ আঙুলে গণনা করা যাবে। কিন্তু বিপরীতে উদাহরণের কোন অভাব নেই।
সাদ ও ফাহাদ দুই ভাইয়ের সখ্যকে সমীহ করত না এলাকায় এমন কাউকে পাওয়া ছিল দুস্কর। এই দুই ভাইয়ের একমত ও
একপথ তাদেরকে এই সমীহ অর্জনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। এতো মিল থাকার পরও, মানুষের সত্ত্বা, স্বপ্ন চিন্তা ভাবনার একটা
নিজস্ব ভূবণ থাকে। সাদ ও ফাহাদেরও তা ছিল। তবে একটা সময় পর্যন্ত তা ছিল তাচ্ছিল্যের।
ভাতৃ রক্তের টানই ছিল প্রধান।

ষোল/ সতেরো বছর বয়সে এসে সম্পর্কের রঙ্গে শুরু হলো ভিন্নতা। বিবাদ ও আপোষ নিজস্ব রুপে পরিবর্তিত হতে থাকলো।
বিশ্বাসের ভিন্ন মুখিতা দুই ভাইকে মেরুকরণে নিয়ে গেলো। দুই ভাইয়ের রাজহাঁসের মত গ্রীবা উঁচু করা ঐক্যের অহংকার যেন
ফসলবিহীন পতিত জমির মত হয়ে উঠল। প্রতিটি মানুষের স্বাতন্ত্রতে তার শ্রেষ্ঠত্বের ইচ্ছে বিরাজ করে। শুধুমাত্র প্রকাশ করার
দূরন্ত সাহস প্রয়োজন। কেউ আদর্শকে প্রধান্য দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। কেউ আদর্শ বিসর্জন দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বকেই প্রধান্য দেয়।
আদর্শ তার নিকট বাহুল্য মাত্র। সাদ ও ফাহাদও শ্রেষ্ঠত্ব চায়। কিন্তু এক স্থানে একটি আদর্শ নিয়ে শুধু একজনই শ্রেষ্ঠ হতে পারে।
দুইজন একসাথে কখনও না। এই জায়গায় এসেই দুজনের বিভক্তি এলো।

ওদের স্বাতন্ত্রের বিভাজন প্রকাশ্যে না এলেও নিজেদের মাঝে একটা অদৃশ্য ছায়ার প্রভাব ঠিকই বাড়তে থাকল। ফাহাদ তার
ইচ্ছাকে, তার আদর্শিক ভাবনা গুলোকে প্রবাহিত করতে চাইত। ফাহাদ চাইত ওর আগ্রহের বিষয়গুলোতে সাদের অনুমোদন এবং
সমর্থন থাকুক। কিন্তু সাদের বড় হবার অনুভব তার আমিত্বকে দ্বিধার পাহাড়ে চড়াতো। সাদ ভালোই বুঝতে পারতো ফাহাদকে।
সাদ ভালো ভাবেই জানে ফাহাদ ছোট হলেও অনেক বিষয়ই সে তার চাইতে ভালো বোঝে। কিন্তু সে তার নিজের আবেগের
জায়গাটা কোথায় তাও ভালো বুঝত। ফাহাদের স্বপ্নের শিকড় কোথায় তা সে জানে। এই দীর্ঘ দিনের ঐক্যের পথ চলাই তার ভবিষ্যৎ
শক্তি তাও সে ভালোই বোঝে। কিন্তু সাদের আমিত্ব তার নিজেকে বাধা দেয়। বড় হয় ছোটোর অনুসারী হতে হবে এ
কেমন সমাধান!
কিন্তু যা অনিবার্য তা রোধ করার শক্তি কারো নেই। যখন অন্ধকার উপর থেকে নেমে আসে, তখন সেই অন্ধকার তার কালো থাবা
শিশিরের মতন ছড়াতে থাকে। ঘটনাটা যেদিন ঘটল সেদিন পুরো শহর চমকে উঠলো। সম্ভবত হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনাও
এতোটা চমক দিতে পারেনি। উনসত্তুরে গন আন্দোলনে সারা দেশের সাথে যখন ছোট শহরটাও উত্তাল তখনই দৃশ্যমান হলো
সবচেয়ে বাজে বাস্তব দৃশ্য। দুই ভাই পরস্পরের মুখোমুখি। স্বাধীকার আন্দোলনে যখন ফাহাদ নেতৃত্বে। সাদ তখন শাসকদের
দক্ষিণ হস্ত। ফাহাদের যখন মুষ্টি উঠে শাসককে গুড়িয়ে দেবার জন্য। সাদের মুষ্টি তখন ফাহাদদের অস্তিত্বকে গুড়ো করতে
উদ্ধ্যত। অবস্থাটা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাড়ালো যে ভাইদের নিয়ে শহরে মিথ রচনা হয়েছিল, তারাই এখন মুখোমুখি। ওদের
পারস্পরিক সম্পর্কের নিষ্প্রভ হতে থাকা আলো যেন স্বাভাবিক বাতাসের প্রবাহেও ভাটার সৃষ্টি করল। শহরে সাদের কর্মকান্ড
যেন স্বাভাবিক শ্বাস নেবার পরিস্থিতিও রাখল না। ৭ই মার্চের ভাষণ বাতাসে ঢেউ খেলানো ফিতার মতন সারা দেশে স্বাধীনতার
প্রস্তুতিতে মেতে উঠল। অবস্থা এতোটাই মেঘাচ্ছন্ন হলো যে একই ঘরে শত্রু শিবিরে বিভক্ত হলো। পরিস্থিতি এতোটাই অন্ধকার
হলো যে যদি কোন ব্যক্তি প্রকাশ্যে রাস্তায় দাড়িয়ে প্রেমিকাকে চুমু খায়, তাহলে এক হাত দুরের পথচারিও তা দেখতে পায় না।
রক্ত ঝরতে শুরু করলো। লাশ পড়তে শুরু করলো। ধ্বংস জজ্ঞের এমন এক অবস্থা শুরু হলো যে চারিদিকে অন্ধত্ব দেখা দিল।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লো। জীবন্ত মানুষের চেয়ে শবের মিছিল বেড়ে চললো। সাদ হন্তারকের ভুমিকায় সফল ভাবে অংশ নিলো। অপর
দিকে ফাহাদ তখন স্বাধীনতার জন্য লড়ছে। যেমনি ভাবে লড়াই শুরু হলো দেশ মুক্তির জন্য। একই ভাবে লড়াই চলতে থাকলো
বিভীষণ মুক্ত প্রতিটি ঘরের প্রয়োজনে।

ফাহাদ খড়ের গাদায় শুয়ে থেকে বড় ভাইয়ের কথা ভাবছিল। জ্ঞ্যান হবার পর থেকে যে ভাইয়ের হাত ধরে তার বেড়ে উঠা। যে
ভাইদের জুটি ছিল অনন্ত জোড় সম। আজ সেই ভাই তার সাথে নেই। রাইফেল দুজনের কাঁধেই রয়েছে। তবে দুজনের বুলেটই
পরস্পরের জীবন ছিনিয়ে নিতে উদগ্রীব। নিজের ভেতরের একটি চিন্তা ফাহাদকে প্রায়ই মুষড়ে দেয়। এক এক সময় নিজের কাছেই
প্রশ্ন করে, জীবনের সব চেয়ে বড় সঙ্গী তার ভাই না রাইফেল। মাঝে মাঝে রাইফেলটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে সাদকে বুকে জড়িয়ে ধরতে
ইচ্ছে করে। পরক্ষণেই তার প্রশিক্ষণের সময় নেয়া ”সবার আগে দেশ মাতৃকা” এই শপথ বাক্যটি মনে পড়ে যায়।
পাশ থেকে রাইফেলটা নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। আলতোভাবে একটা হাত তার মাথা স্পর্শ করতেই ফাহাদ বাস্তবে ফিরে
আসে। কমান্ডার তার পানে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ফাহাদের চোখে পানি দেখে বললেন, ‘দেশের জন্য লড়ছো, তোমাকে এই
দূর্বলতা মানায় না। রাইফেল চুমু খেলে, মনে করো এখন এটাই তোমার ভাই। আর দেশতো মা। এই যে শুয়ে ছিলে, তা কার বুকে।
এটাও মা। মায়ের সংকটে অন্য কিছু ভাবনার কী অবসর থাকে?’ কমান্ডারের কথায় লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করেই প্রতি উত্তর করল,
‘জ্বি স্যার। আপনি ঠিক বলেছেন। তবে বাবাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায়
থাকি। কারণ সাদ। সে ভালো করেই জানে বাবার আদর্শ কী। সাদের যে
রকম হিংস্রতার কথা শুনছি, যদি সে বাবাকে কিছু করে বসে।’
‘ও নিয়ে চিন্তা করো না। বাবাকে কিছু বলবে না। এখন
ওসব চিন্তা বাদ দাও। তোমাকে দায়িত্ব দিয়ে একটা অপারেশনে
পাঠাবো। যাও নিজেকে তৈরী রেখো। তোমার সাথে রোকন, মনির,
বাবু ও খায়রুল থাকবে। এ ছাড়া তুমি যদি কাউকে নিতে চাও বলতে
পারো। বাকি অনান্য কৌশলগত আলাপ রাতে হবে।’
‘ স্যার, অনিরুদ্ধ হলে ভালো হয়।’
‘তোমার ভালোর ব্যখ্যা দাও।’
‘স্যার ওকে আমি খুব ভালো ভাবে জানি। ছোট বেলা
থেকেই ওর লক্ষ্য ভেদ খুবই ভালো। এয়ারগানে উড়ন্ত পাখিকে ফেলে দিতে
পারত। প্রশিক্ষণেও সে ভালো করেছে’।
‘দেখো ফাহাদ এয়ারগান আর রাইফেল এক না। তাছাড়া পাখি
মারতে মিস হলে বিপরিতে কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এখানে
মিস হওয়া মানে তোমার জীবন মিস হওয়া। কথাটা বুঝো।’
‘স্যার, আমার বিস্বাস ও পারবে।’
‘ঠিক আছে তুমি যখন বিস্বাস রাখছো তাহলে ও যাবে।
তাছাড়া আমি যেহেতু বলেছি তোমাকে বেছে নিতে, তুমি ওকে
নিতে পারো। কিন্তু মনিরকে ড্রপ করতে হবে।’
‘ও কে স্যার’ বলেই ফাহাদ স্যালুট করল কমান্ডারকে।
রাতেই কমান্ডারের সাথে পুরো দলের বৈঠক হলো । ফাহাদকে তার নিজ শহরেই অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হলো। পরিকল্পনা
মতন ওরা পাঁচজন তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো। একটি দলে ফাহাদ ও বাবু, দ্বিতীয় দলে খায়রুল ও খোকন। অনিরুদ্বের
দায়িত্ব ওদেরকে কাভারিং দেয়া। ফাহাদ ও বাবু থাকবে মূল আক্রমণে এবং খায়রুল ও খোকন রেকি করবে। খায়রুল ও
খোকনের রেকির ফলাফলের উপর ফাহাদ আক্রমণ পরিকল্পনা সাজাবে। রেকির ফলাফলের আগেই তারা শহরের আটটি স্থান
চিহ্নিত করল। সিদ্ধান্ত হলো, অনিরুদ্ধ ছাড়া অন্যরা কিছুক্ষণ পরপরই তাদের স্থান পরিবর্তন করতে থাকবে। ফাহাদ অন্যদের
জানিয়ে দিল এখন থেকে ঠিক এক ঘন্টা পর সবাই একটা নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হবে।
সময় মতন সবাই নির্দিষ্ট স্থানে চলে এলো। রেকির রিপোর্টে জানা গেল কোন পাক আর্মি আজ টহলে বের হবে না। শহরের নিয়ন্ত্রণ
পুরোটাই রাজাকারদের হাতে। তড়িৎ সিদ্ধান্ত বদলালো ফাহাদ। তারা পূর্ব অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন অবস্থানে চলে গেলো।
রাজাকারদের উপর আক্রমণ করবে ফাহাদ ও বাবু। খায়রুল ও খোকন আর্মি ক্যাম্প কাভার করবে।
একশনের কারণে রাজাকাররা পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলেই এ্যমবুশ করবে অনিরুদ্ধ।
আক্রমণ শুরু হবে ঠিক ফজরের আজানের দশ মিনিট পূর্বে। আজানের সঙ্গে সঙ্গেই অপারেশনের সমাপ্তি হবে। কথা শেষ করে
হাত ঘড়ি দেখল ফাহাদ। এখনো ঘন্টা দেড়েক বাকি। আরো আধা ঘণ্টা সবাইকে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশ এবং প্রয়োজনে প্ল্যান
বদলের নির্দেশনা দিয়ে সবাইকে যার যার পজিশনে চলে যেতে বললো। হঠাৎ করেই যেন চারিদিকে কবরের নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
এই সময় বাবা মার কথা মনে পড়ে গেল। সাদের কারণে ওদের সাথে দেখা হয় না অনেক দিন। মনে মনে চাইলো আজ যেন এই যুদ্ধে
সাদ না থাকে। মসজিদে সচলতা দেখে সচকিত হলো। রাজাকাররা নিশ্চিত মনে আড্ডা দিচ্ছে। নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকালো।
পনেরো / বিশ মিনিটের মধ্যেই ফজরের আজান হবে। ইশারায় সবাইকে তৈরী হতে বলে সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকল।
সময় হতেই আর একবার সবার পজিশন দেখে নিলো। বাম হাতটা মাথার উপর তুলে ধরলো। শেষ বারের মতন চারিদিকে দৃষ্টি ঘোরাল।
আক্রমণ শুরুর নির্দেশ দিয়ে হাতটা নামিয়ে নিল। একই সাথে গুলি শুরু করল। প্রথম আক্রমনেই নিশ্চিন্তে বসা চার রাজাকার ঢলে
পড়ল।

আশপাশের গাছ থেকে কাক ও বিভিন্ন পাখির চেঁচামেচি ও পাখা ঝাপটানোর শব্দ আসতে লাগলো। গুলির আওয়াজে পাখি গুলো তটস্থ
হয়ে উঠল। গুলি বন্ধ করে তড়িৎ স্থান পরিবর্তন করলো ফাহাদরা। দুই মিনিটের মধ্যেই শত্রুর হালকা মেশিন গান গর্জে উঠলো। তাদের
পূর্বের অবস্থান লক্ষ্য করে, কখনো থেমে থেমে আবার কখনো এক নাগাড়ে গুলি চললো। ওদিকে পাক ক্যাম্পে ইমিডিয়েট ফলো অন
শুরু হলো। পুরো এক কোম্পানি শহরের দিকে মার্চ করলো। প্ল্যান অনুযায়ী ওদের ঠেকাতে প্রস্তুত ছিল খায়রুল ও খোকন। রাস্তার দুই
পাশে পজিশন নিলো ওরা। পূর্ব পশ্চিম রাস্তার দক্ষিণপাশে গ্রেনেড নিয়ে খোকন, উত্তর পাশে এস এল আর নিয়ে খায়রুল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম গাড়িটা বেরিয়ে আসতেই পরপর দুটো গ্রেনেড চার্জ করলো খোকন। আক্রান্ত গাড়িটা আগুন লেগে থেমে
গেল। প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হলো। পেছনের গাড়ি গুলো দাড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলো। জ্বলন্ত গাড়ি থেকে আহত অবস্থায় দুজন বেরিয়ে
আসতেই খায়রুলের শিকারে পরিণত হলো। ততক্ষণে পেছনের গাড়ি থেকে বৃষ্টির মতো গুলি শুরু হয়ে গেছে। পিছনের গাড়ি লক্ষ্য
করে তৃতীয় ও শেষ গ্রেনেড চার্জ করলো খোকন। পরক্ষণেই তার ত্রি নট ত্রি রাইফেলটাও গর্জে উঠলো। খোলা জায়গা থেকে ওরা
অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত জায়গায় এসে প্রতিরোধ চালিয়ে গেলো। নির্দেশ অনুযায়ী আজান পর্যন্ত ওদেরকে এখানেই ঠেকিয়ে রাখতে হবে।
অন্যদিকে ফাহাদ ও বাবু তাদের পজিশন বদল করতে করতে হিট এন্ড রান পদ্ধতিতে যুদ্ধ করছিল। হঠাৎ রাজাকারদের এল এম জি থেমে
গেলো।

আর্মি ক্যাম্পের দিক থেকে কখনো থেমে থেমে, কখনো এক নাগাড়ে গুলি হচ্ছিল। ওদিকে পালাতে গিয়ে অনিরুদ্ধের এ্যম্বুশে দুটো ঘায়েল
হয়েছে। অপারেশনের সময় ঠিক করা ছিল। আজান শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই ফাহাদরা ব্যাক করবে। হঠাৎ আর্মিরা একটা ফ্লাশ গান ফায়ার
করলো। মনে মনে প্রমাদ গুনলো ফাহাদ। খায়রুলদের দিকে তেমন কোন আড়াল নেই। ওদের আড়াল ছিল শুধু রাতের অন্ধকার। ফ্লাশ
গানের আলোয় পাকিদের আর যেন উৎসব শুরু করলো। আলোর কারণে ফাহাদদের দিকেও বেশ অনেকটা আলোকিত হলো। ওই
আলোতেই ফাহাদের নজর পড়লো। এল এম জি চালক রাজাকারটা দ্রুত স্থান বদল কওে একটি বিল্ডিং এর উপর চড়ছে। টার্গেট স্পষ্ট এবং
তার আওতায়, তবু গুলি চালাতে পারলো না ফাহাদ। গুলি চালালেই সহজেই তাদের অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়বে। ক্যাম্পের দিক থেকে
গোলাগুলি বন্ধ হয়ে গেছে। তার কপালে খায়রুল ও খোকনকে নিয়ে চিন্তার রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠল। হাতেস বেশি সময়ে নেই। একটু পরেই
আজান হবে। কর্তব্য স্থির করে ফেললো ফাহাদ। বাবুকে নির্দেশ দিল অনিরুদ্ধকে নিয়ে খায়রুল ও খোকনকে ব্যাক করাতে। নিজে
রাজাকারটাকে অনুসরণ করে পাশের দালানে উঠে গেলো। ঠিক তখনই দ্বিতীয় ফ্লাশ গান ফায়ার করলো আর্মিরা। ফাহাদ নিজেকে
আড়াল করার আগেই রাজাকারটা তাকে দেখে ফেললো।

কার্ণিশ থেকেই পাকা ফ্লোরে লাফ দিলো সে। কনুই ও হাতে ব্যাথা পেলেও অল্পের জন্য বেঁচে গেল সে। ফ্লাশের আলোটা নিভতেই খুব
সাবধানে পাশের বিল্ডিং এ তাকাল। একটা ছায়া নড়তে দেখলো। শত্রু সম্ভবত তাকে মৃত ভাবেছে। পুরো অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা
করলো ফাহাদ। অন্ধকার হতেই খুব সাবধানে মাথা তুললো সে। শত্রুর হাতের রেডিয়াম ডায়াল ঘড়িটা ক্ষনিকের জন্য ঝলকে উঠলো।
ওই টুকুই ফাহাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। খুব সাবধানে নিজের এস এল আরের নল নিশানায় তাক করল। পরপর দুবার ট্রিগার টানলো। দশ
সেকেন্ডের মাথায় ভারি কিছু একটা পতনের আওয়াজ পেলো। দ্রুত নীচে নেমে গেল। সাবধানে এগিয়ে গেল যেখান থেকে সে পতনের
আওয়াজটা পেয়েছিল। আড়াল থেকে বের হবে তখনই তৃতীয় ফ্লাশ গান ফায়ার হলো। ফ্লাশ গানের আলোয় স্পষ্ট দেখলো গুলিবিদ্ধ
নিষ্প্রাণ কমান্ডার সাদের দেহ। এল এম জিটা তখনো হাতেই। বাকরুদ্ধ ফাহাদ এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো চীর চেনা মুখটার পানে। তার
অস্রের নলটা মাটির দিকে। বিড়বিড় অথচ কঠিন কন্ঠে বললো, মা, মাটি, মাতৃভুমি, এর চেয়ে বড় কিছু নেই। ওদিকে তখন মসজিদের
মাইক থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজান ধ্বনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *