উপন্যাস।। মরুঝড়।। মোহিত কামাল ।। পর্ব ছয়

তিন

এই মরুপ্রান্তরে আকাশে মেঘ দেখা যায় না বললেই চলে। মরুঝড়ের কারণে বালির উড়ালনৃত্য মেঘের মতো ঘূর্ণি তুললেও রোদ ছাড়া আসল মেঘের দেখা পাওয়া দুষ্কর। রোদ্দুরের তাপে পুড়তে পুড়তে আপনমনে মসজিদের পাশে বাগানে কাজ করছিল রুস্তম। হঠাৎ টের পেল আকাশে মেঘ জমেছে। নিজেকে মেঘের ছায়ার নিচে আবিষ্কার করে অবাক হলো। বাইরের রোদের চেয়েও শরীরের ভেতরের তাপ বেশি। সেই তাপে যেন পুড়ে যাচ্ছিল শরীর। মেঘের ছায়ায় শীতল পরশ পেল। মায়ের অভিযোগ শোনার পর থেকে মনের ভেতরে জ্বলছিল তুষের আগুন। হঠাৎ মনে হলো ভেতরে জ্বলতে থাকা ঘুষুটে আগুনটা যেন নিভে গেছে। কীভাবে নিভল! চোখ বুলিয়ে দেখে নিল বাইরে চারপাশ। অসাধারণ কিছুই নজরে এলো না। পৃথিবী চলছে আপন নিয়মেই। অথচ ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল কেন? বাইরের মেঘও কি তবে থামিয়ে দিতে পারে তুষের আগুন? মেঘের ডানায় ভর করে কি সুদূর বাংলাদেশ থেকে উড়ে এসেছে কলি? শৌর্যের সঙ্গে সম্পর্কের কথা কি তবে মিথ্যে? এত ছোটো কিশোর-দেবরের সঙ্গে আদৌ কি হতে পারে কোনো সম্পর্ক? মনের মধ্যে উদয় হওয়া চিন্তা নিয়ে আকাশে তাকিয়ে দেখল, মেঘপুঞ্জ ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে নারীমূর্তি ধারণ করেছে। কে এই নারী?
কলি! হ্যাঁ কলিই তো!
এটা কি স্বপ্ন?
স্বপ্ন ভেবে চারপাশ দেখতে লাগল। উত্তরে মসজিদের অনন্য সুন্দর মিনার, দক্ষিণে মালিকের বাড়ির সুউচ্চ সিঁড়িঘর। ওই বাড়িতে একবার কাজ করতে ঢুকেছিল রুস্তম। মসজিদ প্রাঙ্গণে দুবাই-কলি হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘মাঝে মাঝে আমি উঠি সিঁড়িঘরে। মসজিদের দিকে তাকাই। কখন আপনাকে দেখা যাবে, জানি। যখন মনে খুশি থাকবে, সিঁড়িঘরে দাঁড়িয়ে দেখে নেব আপনাকে। সেদিকে তাকালেই দেখতে পাবেন আমাকে। আমার হাতে থাকবে লাল রুমাল। লাল রুমাল উড়লে বুঝবেন দাঁড়িয়ে দেখছি আপনাকেই।’ মুহূর্তে ওই বাড়ির দিকে তাকিয়ে লাল রুমাল দেখার চেষ্টা করল। দেখা গেল না। লাল রুমাল দেখার সুযোগ তার এখনো হয়নি। তবু আকাক্সক্ষার ঘরে কখনো কখনো গোপনে ওড়ে। ভাবনায় লাল রুমাল উড়ে এসে জুড়ে বসার পর তুষের আগুনের দাপট একটু একটু বাড়তে লাগল। ভেতরের দহন টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের দিকে তাকাল রুস্তম। আশ্চর্য! আকাশের নারীমূর্তিও উধাও হয়ে গেছে। উড়ন্ত মেঘের জমাট ছায়া হালকা হয়ে মিলিয়ে গেছে রোদে!

শরীরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এ মুহূর্তে গলা ভেজানোর ইচ্ছা হলো। বাগানের একপাশে খেজুরগাছের আড়ালে রাখা পানির ব্যাগের দিকে চোখ যাওয়ার পর বুঝল স্বপ্নে নয়, বাস্তবের মাঠে কাজে ব্যস্ত সে। পানি খেয়ে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে উড়ন্ত মেঘে ভেসে আসা নারীমূর্তির মধ্যে আসল কলিকে আবিষ্কারের চেষ্টা করল। আসল কলির মেঘমূর্তি উড়ে গেলেও কলির তীব্র কামনামাখা কথাগুলো বারবার আঘাত করতে লাগল গোপন দরজায়—‘আপনাকে লাগবে। আপনিই বড়ো ওষুধ। ওই ওষুধ ছাড়া পড়ে থাকলে কলি আর কলি থাকবে না। পাপড়ি খুলে ঝরে যাবে। ঝরা কলি দেখে কি মন জুড়াবে আপনার?’

মিরাকল! বাংলাদেশের কলির স্খলন হয়েছে—ভাবনাটি উড়ে গেল। মনে হলো স্বামীর জন্য মনপ্রাণ ঢেলে দেওয়া কলি অনেক বেশি ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন। মনের জোর অনেক বেশি। ওর টানে ঘাটতি নেই। উড়াল মেঘের ভেলায় ভেসে ছায়া দিয়ে গেছে। কমিয়ে দিয়ে গেছে মনের আগুন। মেঘ হয়ে এসে মন তৃপ্ত করে চলে গেলেও, মনের পর্দায় আবার ভেসে উঠল লাল রুমালের কথা। লাল রুমালের ভাবনার পরই মেঘখণ্ড উড়ে গেল কেন? তবে কি বাংলাদেশের কলি টের পেয়ে গেছে স্বামীর মনের দূষণের খবর ? সবই কি টের পেয়ে যায় সে? এমন মেয়ে কি কোনো পাপ করতে পারে? স্খলিত হতে পারে শৌর্যের মতো ছোটো ছেলের হাত ধরে? ক্ষিপ্রগতিতে উত্তর বেরিয়ে এলো মনের গহন থেকে— ‘না।’

সঙ্গে সঙ্গে পকেটের মুঠোফোন বেজে উঠল। চোখের সামনে তুলে ধরামাত্রই কেঁপে উঠল রুস্তম। কন্ট্রোল রুম থেকে কল করেছেন চিফ অফিসার। কল ধরার সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রুস্তম, এমন লাগছে কেন তোমাকে? মনিটরে দেখতে পাচ্ছি তোমার অদ্ভুত আচরণ। মন খারাপ হয়েছে? অসুস্থ মনে করছ নিজেকে?’

কাজে অমনোযোগী হলে মনিটরিং সেলের চিফ অফিসার সবাইকে চমকে দিয়ে এভাবে কথা বলেন, সজাগ করে দেন, জানে রুস্তম। এই কলে ভয়ের কিছু নেই। সচেতন হয়ে জবাব দিলো, ‘প্রবল তৃষ্ণা পেয়েছিল। অস্থির লাগছিল। পানি খাওয়ার পর ভালো লাগছে এখন।’

‘ঠিক আছে। খারাপ লাগলে গাছের ছায়ায় বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নাও। প্রয়োজনে ছুটিও নিতে পারো। তোমার কর্মক্ষেত্র তো বন্দিশালা নয়। বুঝলে?’

চিফ অফিসারের কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ চোখ গেল মালিকের বাড়ির সিঁড়িঘরের দিকে— লাল রুমাল উড়ছে। কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে মাথা নিচু করে রইল। এই মুহূর্তে মনিটরিং সেলের স্ক্রিনে নিজের প্রতিটি অভিব্যক্তি ভেসে উঠছে, বুঝতে অসুবিধা হলো না। ভেতর থেকে বাধা পেয়ে ঘুরে বসল বাঁয়ে। বিশ্রাম নিচ্ছে সে। আচমকা আবার বেজে উঠল রিংটোন। ভেবেছিল চিফ অফিসার কল করেছেন আবার। মনিটরের দিকে না তাকিয়ে ইয়েস বাটনে চাপ দিয়ে কানের সঙ্গে মুঠোফোন লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এলো খিলখিল হাসির শব্দ…
‘কে!’
‘চিনলেন না? আমি কলি।’
‘কলি ?’

‘হ্যাঁ। কলি।’ ডানে ঘুরে বসুন। দেখুন লাল রুমাল উড়ছে। চট করে বাঁয়ে ঘুরে গেলেন কেন ? লাল রুমাল তো প্রথমে দেখেছিলেন। উড়ন্ত লাল রুমাল কি দেখার ইচ্ছা নেই? কলিকে কি…’ কথা শেষ না করে আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল কিশোরীটি।

আরেকবার ডানে তাকালে নিশ্চিত চিফ অফিসারের চোখে ধরা পড়ে যাবে। ভেবে বলল, ‘এখন আর তাকানো যাবে না। চিফ অফিসারের মনিটরিং পর্দায় সব ধরা পড়ে। আমার চোখ অনুসরণ করে আপনাকে দেখে ফেলবেন তিনি। তখন বিপদ হয়ে যাবে। চাকরি খোয়ানো তো আছেই। গর্দান কাটা যাওয়ার ভয়ও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

‘আমার দিকে তাকালে গর্দান কাটা যাবে। না তাকালেও কাটা যাবে।’
‘কী বলছেন আপনি?’

‘সত্যি বলছি। আমার দিকে তাকালে চিফ অফিসার আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। আর না তাকালে আমি অপমানবোধ করব। কষ্ট পাব। আরেকটু বাড়িয়ে বাবাকে বলব, আপনি আমার সঙ্গে…করার চেষ্টা করেছেন। কিংবা বলেই বসতে পারি, জোর করে…করেছেন। বুঝলেন?’

‘সে কি! এমন কিছু তো করিনি আমি। নিরাপরাধীকে কেন বিপদে ফেলবেন ?’
হো-হো করে হেসে দুবাই-কলি বলল, ‘এটাই তো মজা! নিরপরাধীকে অপরাধী বানিয়ে শাস্তি দিতে মজা বেশি। আমি কুড়িয়ে নেব সেই মজা।’
‘প্লিজ! আমাকে সাজা দেওয়ার কথা বলবেন না! বলতে পারেন না আপনি।’
‘প্রমিজ করছি, বলব না। তবে শর্ত আছে দুটি—পালন করতে হবে।’
ভয়ে ভয়ে রুস্তম প্রশ্ন করল, ‘শর্তদুটি কী?’
‘আমার রুমের ইলেকট্রিক সার্কিট নষ্ট হয়ে যাবে। সেটা ঠিক করতে আসবেন আপনি। অন্য কাউকে পাঠাতে পারবেন না। এটি প্রথম শর্ত।’
‘এই শর্ত পালনের এক্তিয়ার আমার হাতে নেই। সার্কিট ঠিক করতে কে যাবে—বাছাই করেন চিফ অফিসার।’
‘চিফ অফিসার যেন আপনাকে পাঠান, সে ব্যবস্থা আমি করব। এরই মধ্যে এ বাড়ির অনেক কাজ করেছেন আপনি। গুণগান গেয়ে আপনার নামে প্রপোজাল পাঠালে চিফ অফিসার আপনাকেই পাঠাবেন, নিশ্চিত।’
‘সন্দেহ করবেন না তো তিনি?’
‘কী সন্দেহ করবেন? কিছু কি চুরি করেছেন?’ হাসতে হাসতে প্রশ্ন করল দুবাই-কলি।

প্রশ্ন শুনেই বোকা বনে গেল রুস্তম। মেয়েটির কথার ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে, বুঝতে পারল। ফাঁদ থেকে পা তুলে নেওয়ার চেষ্টা না করে বলল, ‘যেভাবে বলবেন, সেভাবে হবে। আমি নিরীহ মানুষ। আমাকে ঝামেলায় ফেলবেন না। এবার লাইন কেটে দেন প্লিজ।’
খিলখিল করে হাসতে হাসতে লাইন কেটে দিলো দুবাই-কলি।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও উদ্বেগের চাকায় সেঁটে গেল রুস্তম। উৎকণ্ঠাভরা চোখে নির্ভরতার জন্য তাকাল আকাশের দিকে। উদ্বেগের আগুনে যেন শীতল জলের ঝাপটা খেলো। বিস্ময় নিয়ে দেখল নারীমূর্তি ধারণ করে আবার উড়ে আসছে মেঘ। মেঘের ছায়া পেয়ে শীতল হতে লাগল উত্তপ্ত দেহ, বিপর্যস্ত মন।

দুবাই-কলির সঙ্গে কি অলৌকিক সংযোগ রয়েছে তার বউ কলির? সে কি টের পেয়ে যায় স্বামীর মনের খবর? কল্পনার রথে চড়েই কি তখন কোনো না কোনোভাবে হাজির হয় সামনে? এখন আবার উড়ে এসেছে মেঘের ভেলায় চড়ে। দুবাই-কলির কথা ভাবলেই কি দেশের কলি নীলাকাশে মিলিয়ে যাবে? এই মুহূর্তে মনে হলো দুবাই-কলির কথা। নিরপরাধীকে অপরাধী বানিয়ে নাকি শাস্তি দিতে মজা বেশি। সেই মজা কুড়িয়ে নেবে সে। আচমকা বিশ্বাসের পাহাড়চূড়ায় উড়তে শুরু করল সবুজ পতাকা। ভোরের ফুলের পাপড়ি খোলার মতো কেঁপে কেঁপে খুলতে লাগল বিশ্বাসের লাল পাপড়ি। মা কি তবে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন কলির বিরুদ্ধে? কলির নির্মল উল্লাসকে কি ঈর্ষায় বিকৃত করে তুলে ধরেছেন ছেলের সামনে? নিরপরাধী কলিকে সাজা দিয়ে কি আম্মাজান মজা কুড়িয়ে নিতে চেয়েছেন দুবাই-কলির মতো? ফোনে এত জোরালো প্রতিবাদ করল কেন কলি ? অপরাধীর গলা তো এত আত্মবিশ্বাসী হতে পারে না! চিৎকার করে কলি বলেছিল, ‘শুনেছেন তো আপনার মায়ের কথা? আপনার মাকে কি আমি অপমান করলাম নাকি তিনি নিজেকেই নিজে অপমান করছেন? আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে তিক্ত করে তোলার জন্যই তাঁর মনে গোপন ঈর্ষা কাজ করে। সেই ঈর্ষার আগুনে কেবল আমাকে নয়, আপনাকেও পোড়াবেন তিনি, বুঝতে পারছেন?’ কলির কথার জোর ভাসিয়ে নিয়ে গেল নৈরাশ্যের গোপন স্রোত। বিশ্বাসের হুহু বাতাসের দাপটে ভেঙে পড়ল সংশয় ও শঙ্কার দেয়াল। নিজেকে আবিষ্কার করল খসে পড়া পাহাড়-চূড়ায়। এই চূড়ায় বসে আছে আসল কলি। বুকের ভেতর থেকে ছিটকে বেরোতে লাগল বহুকৌণিক আলোকমালা। কিন্তু মাকেও যে অবিশ্বাস করা যায় না। দোষ দিতে পারল না মাকেও। মা কি অবিশ্বাসী হতে পারে? পারে না। কোনো মা কি দোষী হতে পারে সন্তানের কাছে? প্রশ্ন আর উত্তরের বুননে গেঁথে উঠছে নতুন মালা। এই মালা নববধূ কলির জন্যই। এই মালা মায়ের জন্য। এসব ভাবতে ভাবতে আবার তাকাল আকাশে ভাসমান মেঘখণ্ডে লুকোনো নারীমূর্তির দিকে।

একবার ইচ্ছা হলো দেশে ফোন করার। ইচ্ছার নাটাইটা থেমে গেল এই ভেবে যে কাজের সময় অনেকক্ষণ কথা বলেছে দুবাই-কলির সঙ্গে। বারবার ফোন হাতে নিলে চিফ অফিসার খেপে যেতে পারেন। নেগেটিভ মার্কিং পেলে চাকরির সুযোগসুবিধা কমে যাবে ভেবে গাছের ছায়া থেকে সরে কাজে মনোযোগ দেওয়ার জন্য এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে শুনল পেছন থেকে ভেসে আসা প্রশ্ন, ‘কী রুস্তম? কেমন আছো?’

মাথা ঘুরিয়ে দেখল সহকর্মী তন্ময়কে। সমবয়সি তন্ময়ের বাড়ি কলকাতা হলেও তাকে আলাদা চোখে দেখে না রুস্তম। বাংলা বলার কারণে বিদেশবিভুঁইয়ে ওকে আপনজনই মনে হয়। সুখদুঃখের কথা একে অপরকে শেয়ার করে। প্রথমে ভেবেছিল, তন্ময় হিন্দু ধর্মাবলম্বী। মসজিদের ক্যাম্পাসে কয়েকজন বাঙালি হিন্দু ছেলেও কাজ করে। বাংলা ভাষাভাষী সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে। এখানে এখন তার সবচেয়ে বড়ো সুহৃদ তন্ময়। একবার ভাবল, সব ঘটনা তন্ময়কে জানাবে। পরক্ষণেই গুটিয়ে নিল নিজেকে। এগিয়ে এসে তন্ময় বলল, ‘তোমাকে নিয়ে কন্ট্রোল রুমে কথা হচ্ছে। কেউ কেউ হাসাহাসিও করছে। কী হয়েছে তোমার? কী উদ্ভট আচরণ করছিলে?’

রুস্তম বলল, ‘কিছু হয়নি তো! হাসাহাসি করবে কেন? রোদের প্রচণ্ড তাপে পুড়ে তৃষ্ণা পেয়েছিল। গাছের ছায়ায় এসে পানি খেলাম।’

‘তুমি নাকি মোবাইল ফোনে কথা বলছিলে, আর চোরের মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলে? কখনো তাকিয়ে থেকেছ আকাশের দিকে! কোনো সমস্যা হয়েছে? আমাকে বলতে পারো।’

আকাশের দিকে তাকানোর কথা তন্ময়ের মুখে উচ্চারিত হওয়ামাত্রই রুস্তম বলল, ‘দেখো, আকাশে একখণ্ড মেঘ উড়ে এসে ছায়া দিচ্ছে আমাকে। মেঘখণ্ডের মধ্যে ফুটে আছে একটা নারীমূর্তি। মনে হয়েছে বাংলাদেশ থেকে মেঘে চড়ে উড়ে এসেছে আমার বউ। ক্লান্ত আমাকে ছায়া দিচ্ছে, আদর দিচ্ছে।’

আকাশের দিকে না তকিয়ে তন্ময় বলল, ‘মেঘখণ্ড কোথায় দেখলে? মাথার ওপর কড়া রোদ নিয়ে কাজ করি আমরা। পায়ের তলে উত্তপ্ত বেলেমাটি। শীতল পরশ কে দেবে তোমায় ? কোথায় দেখলে মেঘের ভেতর নারীমূর্তি ? আকাশ থেকে আসা রোদের তাপ পুড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের। আর তুমি বলছ মাথার ওপরে মেঘ?’

‘দেখো, ওপরের দিকে তাকাও। না তাকিয়ে বলছ কেন?’

রুস্তমের দৃঢ় কণ্ঠস্বর শুনে ওপরের দিকে তাকাল তন্ময়। চোখ ফিরিয়ে বলল, ‘তুমি ডুবে আছো মায়ামেঘে। মায়ার ছায়ায় বসে অনুভব করছ শীতলতা, বুঝেছ? আকাশে মেঘ নেই। আছে শুধু খাঁখাঁ রোদ্দুর! আর রোদ্দুর গিলে ফেলছে আমাদের। মায়ার ছায়াবৃষ্টিতে ভিজে নিজের কষ্ট লুকোনোর বৃথা চেষ্টা করছ। দেখো, বাস্তবতার চোখ তুলে তাকাও—মেঘ নেই কোথাও।’

তন্ময়ের জোরালো কথায় কেঁপে উঠে আকাঙ্খা শূন্যতা অনুভব করল রুস্তম। বুকে টেনে চলা শামুকের মতো নিঃশব্দে মন-মন্দির থেকে বেরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল বালুময় মরুর বুক চিরে। কোথায় রওনা হয়েছে? লাল রুমালের দিকে? নাকি বাংলাদেশের কলির টানে? বুঝে ওঠার আগেই তন্ময় বলল, ‘আশেপাশে কোথাও মায়ার বীজ বপনের সুযোগ নেই, সম্ভাবনা নেই। তবু জীবনের তলানির শেষ রক্তবিন্দুর সঙ্গে ঝুলে থাকে মায়া…মায়া। সেই মায়াময় বালুচরে তুমি ডুবে আছো রুস্তম। তৃষ্ণা মেটাও রোদের জলে। রোদের মেঘ দেখো তুমি। আসলে মেঘ নেই কোথাও, বোঝার চেষ্টা করো। দূরে ওই দখিনে দেখা যাচ্ছে একটা লাল কাপড়, উড়ছে। দেখো, লালেও মায়া আছে। শূন্যতায় ডুবে থেকো না। রোদেও ছায়া আছে, খুঁজে নাও।’

তন্ময়ের কথায় আকস্মিক চমকে উঠে ডানে তাকাল রুস্তম। হ্যাঁ, তন্ময় ঠিকই দেখেছে। লাল রুমাল উড়ছে। দুবাই-কলি আবার ফিরে এসেছে সিঁড়িঘরে—ওড়াচ্ছে লাল রুমাল।

শুকনো মুখের তৃষ্ণা মিটিয়েছিল জলে। লাল রুমাল দেখে আবার শুকিয়ে গেল গলা। মায়ার বীজ কি বপন করে ফেলবে সে লাল রুমালের ছায়ায়? আতঙ্কে চিৎকার করে উচ্চারণ করল, ‘না।’ জোরে উচ্চারিত ‘না’ শুনে চমকে উঠল তন্ময়। তবে কি আলোকিত হয়ে উঠছে রোদে পোড়া ছায়া ভস্মময় রুস্তমের অন্তর্জীবন? রোদের মাঝেও কি তবে আছে করুণার বর্ষণ? করুণায় ধুয়ে কি পরিশুদ্ধ হয়ে উঠছে ধূলিমাখা মরুমন? বাইরে থেকে সুখী-পরিতৃপ্ত মনে হলেও তবে কি রুস্তম অসুখী? নানা প্রশ্ন নিয়ে তন্ময় বন্ধুসুলভ গলায় বলল, ‘পরে তোমার সব কথা শুনব, বিভ্রান্তি ছেড়ে কাজে লেগে যাও। মনোবিলাসের সময় নেই, আমাদের প্রতিটি মিনিট থেকে রক্ত শুষে নেবে রক্তচোষার দল—আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সি কিংবা দালালপক্ষ। ফাঁকি দিলে বিপদ, নৈরাশ্যে ভাসলে ফাঁকি দিয়ে ফেলবে কাজে, টের পাবে না। তখন সামনে এসে দাঁড়াবে দানবীয় বিপদ।’

অসহায়ভাবে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে থেকে রুস্তম প্রশ্ন করল, ‘আমি কি বিভ্রান্ত ছিলাম? চোরাস্রোতের টানে ডুবে যাচ্ছিলাম বালিঝড়ের ঘূর্ণিতে?’

‘বাইরে ঝড় নেই। ভেতরে ঝড় বইছিল, টের পাওনি তুমি। টের পেয়েছে বাইরের সবাই। ভেতরের ঝড় যেন কেউ টের না পায়। বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে শেয়ার করতে পারো আমাকে। অন্যরা তোমাকে বুঝবে না, আমাকেও না। না বুঝে হাসাহাসি করবে আমাদের নিয়ে।’

তন্ময়ের কথায় মনের জোর ফিরে পেল রুস্তম। লাল রুমালের রহস্য উন্মোচনের নেশা মুহূর্তের মধ্যেই টের পেল ভেতরে। মনের ভেতরের স্বাভাবিক সংলাপ মুখে এলো না তার। গোপন বাধায় থেমে গেল গুমরে ওঠা কথামালা। ফ্যালফ্যাল করে তাকাল লাল রুমালের দিকে। তখনই মনে পড়ল দুবাই-কলির বলা কথা—তার এক কাজিন বাংলাদেশের এক ছেলেকে বিয়ে করেছে জোর করে। ছেলেটির নাম রুস্তম। বিয়ের পর বাংলাদেশে চলে গেছে। এখন আর ফিরে আসছে না।

সেই কথাগুলো শোনাটাও কি বিভ্রম ছিল ? আবার বধূ কলিকে ফোন করার পর খিলখিল হাসিরত দুবাই-কলির ডায়ালগ ভেসে এসেছিল—‘আমি দুবাইয়ের কিশোরী কলি। ইচ্ছা করছে বাংলাদেশের রুস্তমের সঙ্গে ভেগে যাই। নেবেন আমাকে? আপনার ঘরে নেবেন?’

ওই সংলাপ এসেছিল কোত্থেকে! কানে শোনার মধ্যেও কি বিভ্রম ছিল?

একই কলে লাইন কানেক্ট থাকা অবস্থায় অনেকটা শূন্যে উড়ে গিয়েছিল ফোনসেট। শূন্য থেকে লুফে নিয়ে কানে ধরার সঙ্গে সঙ্গে আবার শুনেছিল স্ত্রীর ব্যাকুল স্বর, ‘কথা বলছেন না কেন? কবে দেশে আসবেন?’

একই কলে একবার শুনেছিল দুবাইয়ের কিশোরী কলির কথা, আবার শুনেছিল দেশে রেখে আসা নববধূ কলির কথা! তখনো কি অলীক বিভ্রমে ডুবে গিয়েছিল?

দুটি ঘটনার মধ্যে সংযোগ পেয়ে ঘাবড়ে গেল রুস্তম। তন্ময়ের কথা উড়িয়ে দিতে পারল না। কৃতজ্ঞচোখে তাকাল তন্ময়ের দিকে। মৃদু হেসে তন্ময় বলল, ‘সামনের ছুটির দিনে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার বুর্জে খলিফায় বেড়াতে যাব। মাঝে মাঝে আমাদের একটু রিল্যাক্স করা উচিত, কী বলো, যাবে?’

‘রুস্তম বলল, ‘যাব।’

জবাব দিয়ে ডানে তাকাল আবার। সিঁড়িঘরে এখনো উড়ছে লাল রুমাল। রহস্য কী? এত ধৈর্য পেল কোত্থেকে কিশোরী। অস্থির চঞ্চলা হরিণী কীভাবে এতক্ষণ টিকে আছে ধৈর্য নিয়ে, এটাও কি চোখের বিভ্রম? নিজেকে যাচাই করার জন্য শরীরে ঝাঁকি দিয়ে তন্ময়ের উদ্দেশে প্রশ্ন করল, ‘ওই যে দূরে, বিত্তবৈভবে ডুবে থাকা মালিকদের বাড়ির সিঁড়িঘরে কি লাল কাপড় উড়ছে সত্যি সত্যি?’

তন্ময় তাকাল সেদিকে। তারপর বলল, ‘লাল কাপড়ের প্রতি মায়া জাগছে?’

রুস্তম বলল, ‘হেঁয়ালি রাখো। সত্যি করে জবাব দাও, লাল কাপড় উড়ছে কি না।’

‘উড়ছে।’ ছোটো করে জবাব দিলো তন্ময়।

Series Navigation<< উপন্যাস ।। মরুঝড়।। মোহিত কামাল ।। পর্ব পাঁচউপন্যাস।। মরুঝড়।। মোহিত কামাল ।। পর্ব সাত >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *