উপন্যাস।। মরুঝড়।। মোহিত কামাল ।। পর্ব সাত

This entry is part 7 of 18 in the series মরুঝড়, মোহিত কামাল

চার

পুকুরপাড়ে এসে থমকে দাঁড়াল কলি। দূর থেকে দেখল শৌর্যকে—কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে নিবিড়ভাবে তাকিয়ে আছে পুকুর থেকে তোলা একগুচ্ছ শাপলা ফুলের দিকে। পুকুরের এককোণে ফুটে থাকা অসংখ্য শাপলার চেয়েও ফুল হাতে দাঁড়ানো শৌর্যকেই বেশি সুন্দর লাগল, যেন একঝাঁক শাপলা ফুটেছে ওর বুকে।

দূর থেকে মনে হলো তার চোখের পাতা বন্ধ। চকচক করছে কৈশোরের লাবণ্য─ দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেল কলির।

সারি সারি খোলা ছাতার মতো ছড়ানো শাপলা পাতার ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে পুকুরের টলমলে পানি। নাম-না-জানা পোকারা পানির ওপর ছুটোছুটি করছে। শৈল্পিক ঢঙে পোকাগুলো জলে বুনছে চিকন সুতোর জাল। সেদিকে খেয়াল নেই—আপনমনে শৌর্য ডুবে আছে শাপলা ফুলে। ফুলের চারপাশে ছড়ানো সাদা পাপড়ির কেন্দ্রে ফুটে আছে হলুদ পরাগরেণু। সাদার মাঝে হলুদ রেণু দেখে দূর থেকেও মন জুড়িয়ে গেল কলির।

শৌর্যকে পুকুর থেকে উঠে আসতে দেখে গাছের আড়ালে সরে গেল। লুঙ্গিতে মালকোঁচা দেওয়া উদোম গায়ের সুঠাম কিশোরের ভেজা শরীর বেয়ে ঝরতে থাকা জলের ফোঁটা যেন নিটোল মুক্তোকণা—শরীর চুয়ে চুয়ে ঝরে পড়ছে। অপরূপ দৃশ্যটি দেখামাত্রই কেঁপে উঠল কলির দেহ। কেন কাঁপল, বুঝতে পারল না—দেবরের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য তাড়াহুড়ো করে ঢুকে গেল ঝোপে। সঙ্গে সঙ্গে কপালে বাড়ি খেলো গোলাকার কিছু একটা—বাধা পেয়ে চোখ তুলে দেখল কমলালেবুর মতো একজোড়া শরবতি লেবু। লেবুজোড়াকে ওপর থেকে ধাপে ধাপে ঢেকে রেখেছে দৃষ্টিনন্দন সবুজ পাতার ঢেউ। লেবুদুটোর রঙে কিছুটা হলুদ আভা দেখা গেলেও সবুজের আধিপত্য বিলীন হয়নি। এত যত্নে সবুজ পাতাগুলো ঘিরে রেখেছে একজোড়া শরবতি লেবু! প্রকৃতির চমৎকার আদর আর মমতা দেখে নিজের মমতার পুকুরেও ঢেউ উঠল। নিবিড় চোখে কিছুটা সময় তাকিয়ে রইল জোড়-লেবুর দিকে। প্রকৃতির জোড়া-সৃষ্টির সঙ্গে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পেল না। জোড় হওয়ার পরও রুস্তমকে থাকতে হচ্ছে মরুর বুকে। তবু ভাবতে ভালো লাগল, রুস্তম আর সে নিজে প্রকৃতির আদরে জোড় বেঁধে ঝুলে আছে ঘন বনে। শরবতি লেবু পাকলে দেখায় কমলালেবুর মতো। দেখতে একইরকম হলেও স্বাদ কমলার মতো নয়। তবে কমলার চেয়ে বেশি এই ফলের রস। রসে ভরা শরবতি লেবু মিষ্টি না হলেও টক নয়। শরবতি লেবু খেলে তৃষ্ণা জুড়ায়─ ফলটির গুণাগুণের কথা ভেবে নিজেকেও মনে  হলো টসটসে শরবতি লেবু। হতাশায় নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল বুকের পাঁজর ভেদ করে। স্বামী পড়ে আছে মরুতে। একদিন নিশ্চয়ই বৃন্তচ্যুত শরবতি লেবুর মতো নিজেও ঝরে যাবে, কেউ উঁকি দিয়েও দেখবে না। শুকিয়ে পচে যাবে একদিন! খুঁজে পাবে না নিজের মূল্য! আচমকা মনে হলো শরবতি লেবুর মতো প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে উঠছে বালক শৌর্য। প্রকৃতি রং দেয়, রস দেয় আবার শুষে নেয় সব। এসব ভাবনা নিয়ে পেছন ফিরে তাকাল কলি। দূর থেকে দেখল শাপলাগুচ্ছ পাড়ে রেখে আবার পুকুরে নামছে শৌর্য। এবার নামছে ঝাঁকিজাল নিয়ে। মাছ ধরবে। মাছ ধরা দেখার ইচ্ছায় দূরে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল। পুকুরের মালিক এ বাড়ির চার ঘরের সবাই। মাছ ধরা হলে সবাই ভাগ করে নেয়। সাধারণত মাছ ধরা হয় সবাইকে জানান দিয়ে। শৌর্য কি সবাইকে জানান দিয়েছে আজ মাছ ধরার কথা? দিতেও পারে। এ বাড়ির বউ হয়ে এলেও তার কথার কোনো মূল্য নেই। শাশুড়ির মতামতের ওপরই সব চলে। হয়তো শাশুড়ি জানেন মাছ ধরার বিষয়টি।

নানা জাতের মাছের চাষ হয় পুকুরে। কৃষিকাজের মতো মাছ চাষও লাভজনক। গা গতরে বড়ো হয়ে ওঠা শৌর্য এখন কেবল মাছ চাষই করে না, ধরেও। কোমরসমান পানিতে নেমে শৈল্পিক ঢঙে শূন্যে ছুড়ে দিলো জাল; বৃত্তাকারে ছড়িয়ে ঝুপ করে পড়ল শাপলাবিহীন টলমলে পানিতে। দড়ি টানতে গিয়ে পেছনের দিকে পিছিয়ে এলো।

জালে কী মাছ ওঠে দেখার কৌতূহলে নিজের অজান্তে পুকুরপাড়ে হেঁটে গেল কলি।

জালের দড়ি যতই কাছে টানছে, ততই লাফাচ্ছে জালে আটকা পড়া মাছ। জাল পাড়ে তুলে মুগ্ধচোখে মাছের দিকে তাকিয়ে রইল দুরন্ত বালক। তারপর আপনমনে জাল থেকে মাছ বের করে রাখতে লাগল বড়ো খালুইয়ে। পেছনে দাঁড়িয়ে দেখছে কলি। দূর থেকেও বুঝতে পারল বড়ো ধরনের তিনটি মৃগেল উঠেছে এক খ্যাপে। মৃগেল মাছের মতো লাফাচ্ছে কলির বুকও। শৌর্যের সঙ্গে মাছ ধরতে ইচ্ছা করছে তার। বুকের সমুদ্রে ঝড় ওঠায় দিশাহারা নৌকার মাঝির মতো উদ্ভান্ত মনে হলো নিজেকে। সমবয়সি শৌর্যের সঙ্গে মাছ ধরা এমন দোষের কিছু নয়। অথচ সমাজের চোখে দোষ হিসেবে ধরা হবে, শাশুড়ির চোখ বিষ ঢেলে দেবে এমন দৃশ্যে। স্বামীর বুকেও পৌঁছে যাবে বিষমাখানো খবর! মাছ ধরার ভাবনাকে মনে হলো পাহাড়সমান উঁচু। পাহাড় ডিঙানোর ইচ্ছাটা বেগবান হওয়ায় পা বাড়াল সামনে। এ কি! পা চলছে না কেন? শিকলে কি আটকে আছে পা, নাকি ভেঙে বা মচকে গেছে পায়ের গোড়ালি! কীভাবে ভাঙল! কোনো আঘাত তো পায়নি সে! চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বুঝল, সমাজ আর নৈতিকতার শিকল আটকে রেখেছে তাকে। এই বাধা অস্বীকার করার ক্ষমতা নেই তার। বুকের মধ্যে টের পেতে লাগল আটকে যাওয়া পাখির ডানা ঝাপটানি। ভাবল যতই ডানা ঝাপটাও, হে কোকিল! মুক্তি নেই তোমার! বাধা পড়ে গেছ তুমি শিকলে।

সামনে না গিয়ে আবার কলি ফিরে এলো ঝোপের আড়ালে। আশ্চর্য! বন্দি পাখিটার কথা ভাবার পর বাইরেও পাখির ডাক শুনল। ওপরের দিকে তাকিয়ে গাছের ডালে ঘন পাতার আড়ালে দেখল লাজুক প্রকৃতির এক কোকিল। মুক্ত পাখিটা কি অসুখী? মনে হলো রাগ নিয়ে চুপচাপ বসে আছে দুখী কোকিলটা। কীসের রাগ হে পাখি? কীসের দুঃখ? মনে মনে প্রশ্ন করল। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল কোকিলটার দিকে। পাখিটার ডানা লাল। মাথায় কালো ঝুঁটি। ঝুঁটি থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত কালোর টান। পিঠের রঙে কালো-বাদামির মিশ্রণ। শরীরের তুলনায় লেজ অনেকখানি লম্বা। ঘাড় ও পিঠের মিলনস্থানে রয়েছে গোলাকার সাদা মালার মতো বৃত্তবন্ধনী। লাজুক পাখিটাকে দুখী মনে  হলো কেন? নিজের ভেতরের অনুভূতিটাই কি তবে অনুভব করল একাকী পাখিটার মধ্যে? নিজেও তো সে লাজুক। তার মনেও তো লুকিয়ে আছে রাগ, দুঃখ। স্বামীর প্রতি রাগ থাকার কারণেই কি পাখিটার মধ্যেও রাগের প্রতিফলন দেখল সে? এমন নিরীহ পাখিটাকে রাগী ভেবে মন খারাপ হয়ে গেল।

মচমচ শব্দ পেয়ে আকস্মিক উড়াল দিলো কোকিল। উড়ালপাখি থেকে চোখ সরিয়ে মচমচ শব্দ অনুসরণ করে পেছনের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল কলিও। জাল কাঁধে, মাছের খালুই হাতে শৌর্য এসে দাঁড়িয়েছে। সে বলল, ‘ভাবি, জঙ্গলে কী করছ?’

চমকে উঠলেও প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, ‘কী মাছ পেলে?’

‘তিনটা মৃগেল আর দুটো রাজপুঁটি ধরেছি। একটি গ্রাসকার্পও আছে। তুমি কি আমার মাছ ধরা দেখেছ, ভাবি?’

মুখে শব্দ না করে মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ-বোধক উত্তর দিলো কলি।

‘শোনো, চুরি করে ধরিনি। কাকিমাকে বলেছি, আজ মাছ ধরার কথা। ভাগ পৌঁছে যাবে তোমাদের ঘরে।’

‘আমি কি বলেছি, চুরি করে মাছ ধরেছ তুমি?’

‘না। বলোনি। তবে লুকিয়ে মাছ ধরা দেখলে যে। এজন্যই বললাম।’

‘হ্যাঁ। ঠিক বলেছ। তুমি চুরি করোনি। আমিই বরং লুকিয়ে দেখেছি মাছ ধরা।’

‘লুকিয়ে দেখলে কেন? তুমি যেতে পুকুরে। দুজনে একসঙ্গে ধরতাম!’

শৌর্যের সহজসরল কথায় খুশি হয়ে কলি বলল, ‘আমারও ইচ্ছা হয়েছিল তোমার কাছে যেতে, মাছ ধরতে।’

‘কাছে গেলে না কেন? কেউ কি না করেছে তোমাকে?’

‘কেউ না করেনি। তবে বাধা আছে একটা। পায়ে শিকল বাঁধা আমার। সেই শিকল খুলে ইচ্ছামতো সব কাজ করা যায় না।’

অবাক হয়ে শৌর্য তাকাল কলির মুখের দিকে। তারপর বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘আমি তো কোনো শিকল দেখতে পাচ্ছি না তোমার পায়ে।’

‘তুমি দেখবে না এখন। সরল চোখে শিকল দেখা যাবে না। আরও বড়ো হও, তখন সব দেখতে পাবে।’

কথার অর্থ বুঝতে পারল না শৌর্য। প্রসঙ্গ পালটে সে প্রশ্ন করল, ‘এই মাছগুলোর মধ্যে তোমার পছন্দের মাছ কোনটি, ভাবি?’

‘আমার পছন্দের কথা শুনে কী হবে?’

‘সেটা পরে দেখো। উত্তর দাও আগে।’

হাসিমুখে কলি জবাব দিলো, ‘রাজপুঁটি। রাজপুঁটি জোড়ই আমার পছন্দ।’

‘ঠিক আছে, তোমার ঘরে পৌঁছে যাবে রাজপুঁটি। ভেবো না।’

কথা শেষ করে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল শৌর্য। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কলি। আবার তাকাল কোকিল-বসা শূন্য ডালের দিকে। পাতার আড়াল থেকে উড়ে গেছে পাখিটি। বুকের ভেতর আবার টের পেল ডানা ঝাপটানির। চোখের সামনে ভেসে উঠল রাজপুঁটির চকচকে শরীর। সামনে তাকিয়ে মনে হলো, রাজপুঁটির মতো চকচকে শরীর নিয়ে রাজদূতের মতো দৃপ্তপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে শৌর্য।

বিস্তৃত আকাশের দিকে তাকাল কলি। পাতার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে নীলাকাশ। শূন্য আকাশে কেবলই নীল আর সাদা মেঘের ভেলা ঢেউ তুলে উড়ে যাচ্ছে দূরে, বহুদূরে। মেঘের ভেলায় চড়ে ভেসে যেতে ইচ্ছা করছে মরুর বুকে। সেখানে কি প্রতীক্ষার প্রহর গোনে রুস্তম?

বৃষ্টি ডেকে আনেনি উড়াল কোনো মেঘ। আচমকা খেয়াল করল, চোখের জলে ভেসে গেছে বুক। এই জল থামবে কখন জানে না কলি।

পলিথিন ব্যাগে চারা বপন করে রসুইঘরের পাশে এঁটেল দো-আঁশ মাটিতে লাউগাছ বুনেছিলেন রুশনা বেগম। শক্ত দুটি মাচা তৈরি করে দিয়েছিলেন লতানো উদ্ভিদটি বেড়ে ওঠার জন্য। এখন মাচার ওপর সারিবদ্ধভাবে ঝুলে আছে ছোটো-বড়ো অনেকগুলো কচিলাউ। প্রতিটি মাচার জন্য বুনেছিলেন চারটি বীজ। চারটি বীজ থেকে দুই মাচাতে ঝুলে আছে আটটি লাউ। মাচার দিকে তাকালে মন জুড়িয়ে যায়। কিছুক্ষণ লাউয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে লাউগাছের গোড়ার মাটির চাটা ভেঙে বাউনি দিয়ে পানি সেচ দিতে বসলেন রুশনা বেগম। শাশুড়ির লাউপ্রীতি ভালোই লাগে কলির। পুকুরপাড় থেকে ফিরে রসুইঘরের পাশ দিয়ে ঘরে ঢোকার সময় রুশনা বেগম ডেকে বললেন, ‘বউমা, কোথায় গিয়েছিলে?’

কয়েকদিন আগের মান-অভিমানের কথা ভুলে গিয়ে শাশুড়ির মুখ থেকে উচ্চারিত সহজ-স্বাভাবিক প্রশ্ন শুনে কলি জবাব দিলো, ‘পুকুরপাড়ে গিয়েছিলাম, আম্মাজান।’

চট করে বসা থেকে উঠে রুশনা বেগম প্রশ্ন করলেন, ‘শৌর্যের মাছ ধরা দেখেছ ?’ আকস্মিক প্রশ্নটি তিরের মতো আঘাত করল কলিকে। কী উত্তর দেবে ভাবার সুযোগ পেল না। সত্যি কথা বেরিয়ে গেল মুখ থেকে— ‘হ্যাঁ। দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম।’

‘দূরে-কাছে বলে কথা নয়, শৌর্য যেখানে যায়, তুমিও সেখানে যাও। বিষয়টা কী?’

শাশুড়ির উত্তপ্ত কণ্ঠের জবাব ঠান্ডা মাথায় দিলো কলি। ‘বিষয় কিছু না। শৌর্য আজ মাছ ধরবে, জানতাম না আমি, কেউ আমাকে মাছ ধরার কথা বলেনি।’

বউয়ের গলার স্বাভাবিক স্বর শুনে মাথা ঘুরিয়ে ক্রূরচোখে শাশুড়ি তাকালেন কলির দিকে। এই তাকানোর ভঙ্গিটি জানান দিলো আরেক যুদ্ধের দামামা। বিষয়টি পাত্তা না দিয়ে ঢুকে গেল রসুইঘরে। দেখল ডেকচিতে রাখা একজোড়া চকচকে রাজপুঁটি মাছ। ছোটো সাইজের কাতলমাছের মতো দেখতে রাজপুঁটি দুটো দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল কলি। শাশুড়ির ঝোড়ো কথা উড়িয়ে দিয়ে বঁটি নিয়ে বসল মাছ কুটতে। দুহাতে ধরে মাছের আঁশ ছাড়াতে যেই না ধারালো বঁটিতে ঘষা দিতে যাবে, তখনই মনে পড়ল শৌর্যের কথা। মনে হলো সে খুলে নিচ্ছে শৌর্যের বুকের ত্বক! চিন্তাটা মাথায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে থরথর করে কেঁপে উঠল─ কেবল দেহই নয়, কেঁপে উঠল মনও। কোটা রেখে দাঁড়িয়ে অবাকচোখে তাকিয়ে রইল মাছের দিকে। ঠিক এই সময়ে রুশনা বেগম একটা কচিলাউ হাতে ঢুকলেন রসুইঘরে। ভীতচোখে বউমাকে মাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলেন, ‘এমনভাবে মাছের দিকে তাকিয়ে আছো কেন ? মাছ কি ভূত না পোকামাকড়?’

শাশুড়ির প্রশ্নের উত্তাপে নিজের মধ্যে কোনো লুকোচুরি খেলা না থাকলেও অতলে মর্মঘাতী মোচড় টের পেল। কী কারণে ব্যথা? বুঝল না। কেবলই মনে হলো, মনের আলোতেই রয়েছে গোপন আঁধার। অন্ধকারের গোপন রহস্য জানা নেই তার। শাশুড়ির প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। বরং প্রশ্ন করল, ‘লাউ দিয়ে রাজপুঁটি রান্না কি ঠিক হবে, আম্মাজান?’

‘ডাল-লাউ রাঁধব আজ। আর রাজপুঁটি ভাজা করব। আপত্তি আছে তোমার?’ বললেন রুশনা বেগম।

‘না, আম্মাজান, আপনার ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আপত্তি থাকার অধিকার নেই আমার। যেভাবে বলবেন, সেভাবেই হবে সব! তবে বাড়ির পাশে ফুলকপির চাষ দেখেছি। মাছের সঙ্গে ফুলকপি খেতে ইচ্ছা হচ্ছে।’

বউমার ইচ্ছাকে ফেলে দিতে পারতেন রুশনা বেগম। ফেললেন না। যেভাবে বলবেন, সেভাবেই হবে সব—বউমার এই কথায় আত্মসমর্পণের একটা ইঙ্গিত রয়েছে। বিদ্রোহী হয়ে উঠতে থাকা বউয়ের কণ্ঠের পরিবর্তন দেখে বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। কপি নিয়ে আসছি। তুমি মাছ কুটে ধুয়ে রেখো।’

বাড়ির পাশের খেতে শীতের আগাম সবজি চাষের ধুম লেগেছে, বিশেষত এই এলাকার বেলে দো-আঁশ মাটিতে সবজি চাষ খুবই উপযুক্ত। আগাম সবজি তুলতে পারলে লাভও বেশি। তাই অনেক কৃষক আমন চাষ না করে সবজি চাষে মেতে উঠেছে। বাড়ির সীমানার প্রান্তে এসে রুশনা বেগম দেখলেন চেনা-অচেনা চাষিরা বাঁধাকপির খেত পরিচর্যা করছে। গা বেয়ে ঘাম ঝরছে সবার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে কাজ। দম ফেলার সময় নেই কারো। কেউ কপিখেতে পানি দিচ্ছে, কেউ ¯প্রে করছে। কারও নজর কাড়তে পারছেন না।

এদিক-ওদিক তাকিয়ে বেশ খানিকটা দূরে দেখলেন শৌর্যের বাবাকে। রুশনা বেগমের দিকে চোখ পড়তেই উঠে এলেন তিনি সামনে। সালাম জানিয়ে বললেন, ‘কিছু বলবেন, ভাবি?’

‘ফুলকপি খেতে চেয়েছে বউমা। নিতে এসেছি। তোমরা কি বিক্রি করছ?’

‘না। এখনো বিক্রি করছি না। আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগবে।’

‘ওঃ! অন্য কেউ কি বিক্রি করবে?’

‘মনে হয় না। বউমাকে বলবেন আর এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে। এখন কপি না তোলাই ভালো।’

বাবার কথার শেষ অংশটুকু শুনেছে শৌর্য। ভেজা লুঙ্গি মালকোঁচা করে সে চলে এসেছে খেতের কাজে সাহায্য করতে।

বাবার অনুমতি না নিয়ে শৌর্য বলল, ‘কাকিমা, দাঁড়ান আপনি। ভাবি ফুলকপি খেতে চেয়েছে, আর খেতে এত কপি থাকতে দুটো কপি দেওয়া যাবে না?’ বলেই ঢুকে গেল নিজেদের খেতে। বড়ো সাইজের দুই ফুলকপি তুলে রুশনা বেগমের হাতে দিয়ে বলল, ‘রান্না ভালো হলে আমার জন্যও এক বাটি তরকারি পাঠিয়ে দেবেন, কাকিমা।’

ছেলের আচরণে অবাক হলেন না শৌর্যের বাবা। তিনি জানেন, তার ছেলে এমনই। অবাক হলেন রুশনা বেগম। নতুন ভাবির জন্য দেবরের এত টান! বাবার সিদ্ধান্তকে পাত্তা না দিয়ে নিজেই তুলে আনল ফুলকপি? রহস্য কী? ছিদ্রান্বেষণ করতে শুরু করলেন তিনি। কপি হাতে বাড়ি ফিরে বউমার উদ্দেশে বললেন, ‘তোমার জন্য ফুলকপি পাঠিয়ে দিয়েছে শৌর্য। রান্না ভালো হলে তার জন্যও পাঠাতে বলেছে এক বাটি।’

শাশুড়ির কণ্ঠের শীতলতা আগাম ঝড়ের সংকেত দিলো। সহজসরল শৌর্য সরল মনেই কাজটা করেছে, শাশুড়ি নিশ্চয়ই বাঁকাচোখে দেখছেন বিষয়টা। পাত্তা দিলো না কলি। লাউ কুটেছে সে। মাছ কোটেনি। হাতে পেয়ে কপি কাটতে বসে বলল, ‘মাছটা আপনি কুটে দেন। আপনার হাতের মাছ কোটা ভালো হয়।’

বউমার মুখে নিজের প্রশংসা শুনে মন গলে গেল রুশনা বেগমের। কোনো প্রশ্ন না করে মাছ কুটতে বসলেন। কোনো কথা বলেছেন না তিনি। চুপ করে কাজ করে যাচ্ছে কলিও। দুজনের দ্বন্দ্বের স্রোত চাপা পড়ে গেছে এই মুহূর্তে।

রান্নাশেষে খেতে বসে অন্যরকম স্বাদ পেল কলি। বুকের ভেতর ক্ষোভের কাঁটা গেঁথে থাকার কারণে অভিব্যক্তি প্রকাশ না করে মাথা নিচু করে খেতে লাগল। বুকে পাহাড়সমান দহন থাকায় কথা বেরোচ্ছিল না মুখ থেকে। শাশুড়ির জিভেও অন্যরকম স্বাদ লেগেছে। ওই স্বাদের কথাটা জানান দিচ্ছেন না। বউমার দিকটা বোঝার চেষ্টা করছেন। রান্না ভালো হলে শৌর্যের জন্য এক বাটি ফুলকপির তরকারি পাঠানোর কথা। বউমার দিক থেকে সেই প্রস্তাব আসে কি না বোঝার অপেক্ষায় আছেন। কলিও ভোলেনি শৌর্যের কথা। খেত থেকে যে ছেলে ফুলকপি তুলে দিতে পারে, পছন্দের মাছ পাঠিয়ে কৃতজ্ঞতাপাশে বাঁধতে পারে, তার জন্য এক বাটি তরকারি পাঠানো এমন কোনো গর্হিত কাজ নয়। বিষয়টি এসব টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে রইল। ক্ষোভের সাগরে ঢেউয়ের তালে ভাসতে থাকা ডিঙি নৌকাটা যেন সমুদ্রে পথ হারিয়ে ফেলেছে। চুপচাপ খেতে লাগল কলি।

নীরবতা ভেঙে রুশনা বেগম বললেন, ‘রান্না ভালোই হয়েছে, তাই না বউমা?’

প্রশ্নের আড়ালে নিশ্চয়ই কোনো কূটচাল আছে। বোঝার চেষ্টা করল কলি। নীরব না থেকে চট করে জবাব দিলো, ‘আপনি রাঁধলে আরও বেশি স্বাদ হতো।’

নিজের প্রশংসা এ মুহূর্তে কানে ঢুকল না রুশনা বেগমের। বললেন, ‘তোমার রান্নাও ভালো হয়েছে। শৌর্যের জন্য এক বাটি পাঠানো যায়, কী বলো?’

কলি বুঝল, তার মুখ দিয়ে তরকারি পাঠানোর কথাটা বের করতে চাইছেন শাশুড়ি। তাই বুঝে কলি জবাব দিলো, ‘আপনি বললে পাঠাতে পারি।’

ঘোরানো প্রস্তাবের বাঁকা উত্তর দিতে পারলেন না রুশনা বেগম, বউমার কথায় নিজেকে সমর্পণ করে বললেন, ‘রাজপুঁটির একটা পেটি আর তরকারি দিয়ে এসো শৌর্যকে।’

কলি প্রশ্ন করল, ‘আমি যাব?’

‘হ্যাঁ। তুমি যাও। তোমার জন্যই মাছ ধরেছে। তোমার জন্য খেতের আগাম চাষের ফুলকপি তুলে দিয়েছে। তুমিই দিয়ে এসো।’

শাশুড়ির কথার সুরে যদিও বাঁকা টান নেই কিন্তু নীরব অর্থে ঢুকে গেছে বিরাট বাঁক, টের পেল কলি। তবু দ্বিধা করল না, খাওয়া শেষ করে উঠে, হাত ধুয়ে সুন্দর একটা বাটিতে মাছ-তরকারি নিয়ে বেরিয়ে গেল শৌর্যদের ঘরের উদ্দেশে। যাওয়ার সময় ভাবতে থাকল, ‘কী আছে আমার? স্বামী থেকেও নেই। দীর্ঘদিন ফোন করছেন না।’ স্বামীকে মনে হচ্ছে অচিন দেশের অচিন মানুষ। কাছে আছেন শাশুড়ি। তাকেও আপন মনে হয় না। রুস্তমের মাকে প্রথমে নিজের মায়ের মতোই ভেবেছিল। শাশুড়ি কখনো মা হতে পারেন না, পারবেনও না─ বেশ বুঝে গেছে কলি। দখিন ঘরে যাওয়ার আগে ঘর থেকে উঠোনে নেমে আবার ভাবল, ‘কে আছে আমার? এ ঘর তো আমার ঘর নয়। এ বাড়ি আমার বাড়ি নয়। স্বামীও আমার একার নয়।
আরেক মায়ের সন্তান। মায়ের কথায় বিভোর থাকেন। ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। আমার সঙ্গে বলেন না।’ ভাবনার আড়াল থেকে মেঘের ছায়া পড়ল মুখে। মলিনমুখে পাশের ঘরে ঢোকার মুহূর্তে দেখা হলো শৌর্যের সঙ্গে। চিৎকার করে প্রশ্ন করল, ‘ভাবি, তুমি এসেছ!’

শৌর্যের আনন্দিত কণ্ঠ মুহূর্তে মুছে দিলো কলির মুখে চেপে বসা কালো ছায়া। ঝলমলে রোদ্দুর ফুটে উঠল মুখে। বাটি হাতে নিয়ে কলি ঢুকে গেল রান্নাঘরে চাচিশাশুড়ির কাছে।

‘বউমা, তুমি এসেছ ?’ প্রশ্ন করলেন চাচিশাশুড়ি। তার কণ্ঠ বিস্ময় আর  আনন্দে ভরা।

‘জি। আমিই এলাম।’

‘ভাবিজান ছাড়ল তোমাকে?’

‘জি। তিনিই বললেন শৌর্যের জন্য রান্না করা তরকারি পাঠাতে।’

ছেলের সমবয়সি কলির জন্য আলাদা মায়া টের পেলেন তিনি। জানেন, ভাবিজান যক্ষের ধনের মতো ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চান বউমাকে। ঘর থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক গেলে উদ্বিগ্ন হয়ে খোঁজেন। চাচিশাশুড়ি আবার বললেন, ‘তোমার শাশুড়ির দেখছি ভালোই উন্নতি হয়েছে।’

হাসল কলি। কোনো জবাব দিলো না।

শৌর্য রান্নাঘরে ঢুকে বলল, ‘আমাদের সঙ্গে খাবে, ভাবি?’

হেসে জবাব দিলো কলি, ‘আমাদের খাওয়া হয়ে গেছে।’

‘ওঃ! তাহলে বসো। এখনই যেয়ো না।’

শৌর্যের মাও যোগ করল, ‘হ্যাঁ। বসো বউমা। কখনো তো আসোনি এ ঘরে। একই বাড়ির দুই ঘর কি আর ভিন্ন ঘর? এ ঘরও তোমার ঘর। বসো।’

চাচিশাশুড়ির বলা কথাটা চট করে ঢুকে গেল মগজে। হৃৎপিণ্ডে নাড়া খেলো প্রতিটি শব্দ। মনের মধ্যে তৈরি হলো ভাবনার ঘূর্ণিস্রোত—‘আমার তো কোনো ঘরই নেই। ঘরের চাল নেই। বেড়া নেই। নিজের যে সিন্দুক রয়েছে, তার চাবিও নেই।’

মনের ভেতরের ঘূর্ণিটা যেন আর থামছে না। জোরালোই হচ্ছে কেবল। মাথা নিচু করে কলি বসল রান্নাঘরের চৌকিতে। মুখ ঢেকে গেল চুলে। ভেজা চুল এখনো শুকোয়নি। ভেজা চুলের কি ভেজা স্পর্শ পাচ্ছে মুখ? নাকি চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে কলি, টের পেল না। বসে দেখতে লাগল শৌর্যের খাওয়ার ভঙ্গি।

রিংটোন বাজার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে চৌকির ওপর থেকে মুঠোফোন হাতে তুলে নিয়ে রুশনা বেগম বললেন, ‘কেমন আছো, রুস্তম?’

রুস্তম জবাব দিলো, ‘অস্থির লাগছে। কাজের ফাঁকে রেস্ট পেয়েছি একটু। তাই তোমাদের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা হলো। তোমাদের কি দুপুরের খাওয়া শেষ? এখন তো দেশে প্রায় দুটো। এখানে দুপুর বারোটা।’

রুশনা বেগম বললেন, ‘হ্যাঁ, বাবা। খাওয়া শেষ।’

‘তোমার বউমা কি সামনে আছে? ওর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে।’

‘বউমা তো নেই। পাশের ঘরে গেছে। রাজপুঁটি আর ফুলকপি তরকারি নিয়ে গেছে শৌর্যের জন্য। সে আজ মাছ ধরেছে পুকুরে। নিজেদের খেত থেকে আগাম চাষের ফুলকপিও তুলে দিয়েছে।’

মায়ের কথা শুনে চিনচিনে একটা ব্যথা জেগে উঠল বুকে। ব্যথাটা বেরিয়ে এলো গোপন এক অগ্নিশিখা হয়ে। সে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে সব—পোড়া পাঁজর থেকে নিঃশ্বাস বেরোতে পারছে না। আটকে গেছে প্রশ্বাস। নিজেকে মনে হচ্ছে রাতজাগা আইসিইউ-এর রোগী। অচিনপুরের উদ্দেশে যাত্রার প্রহর গোনা ভোরের প্রতীক্ষারত শেষ যাত্রী। সে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে মাটি, পুড়ে যাচ্ছে স্বপ্ন। বিয়ের কাবিননামাও পুড়ছে মনে হলো। ধোঁয়া উড়ছে। নীল হয়ে উঠছে রুস্তমের রক্ত। মাথার ওপর রোদের দাপট বেড়ে গেছে কয়েকশো গুণ বেশি। পুড়ছে দেহ। পোড়া দেহে ব্যথা থাকে না। প্রাণহীন অস্তিত্বের শূন্যতার মধ্যেও ঘুরতে শুরু করেছে বালিঝড়। হাত কাঁপছে। কানের সঙ্গে ধরা মোবাইল ফোনও কাঁপছে থরথর করে। নৈঃশব্দ্যের স্তব্ধতা ফুঁড়ে আবার মায়ের কথা শুনতে পেল রুস্তম─ ‘কথা বলছ না কেন ? লাইন কি কেটে গেছে, বাবা?’

‘জি, লাইন কেটে গেছে, আম্মাজান।’

‘তোমার কথা শুনতে পাচ্ছি আমি! লাইন তো কাটেনি!’

‘লাইন ছাড়াও কথা শোনা যায়। প্রাণহীন শব্দ লাইন ছাড়াও তৈরি হতে পারে, আম্মাজান।’

‘তোমার কথার অর্থ বুঝতে পারছি না, শরীর ভালো আছে তো?’

নিজের হাতের দিকে তাকাল রুস্তম। হাতের অস্তিত্ব অনুভব করে বলল, ‘ভালো আছে শরীর।’

‘নিজের যত্ন নিয়ো। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া কোরো।’

‘যত্ন নেব। খাওয়াদাওয়া করব।’

‘তাহলে এখন রাখি?’

‘রাখুন।’

লাইন কেটে গেছে। রুস্তম ডানে তাকাল। দূরে আমিরবাড়ির সিঁড়িঘরের দিকে চোখ গেল। মনে হলো নিজের দেহের ওপর আচমকা ঝাঁপ দিয়েছে নববধূ কলি! নিজেকে চিনতে পারল না! যেন তার দেহকাঠামো দখল করে নিয়েছে শৌর্য।

রুস্তমের চোখে পড়ল লাল রুমাল। উড়ছে…লাল রুমাল উড়ছে…

দেশের কলিও কি এভাবে ওড়ায় লাল রুমাল? শৌর্যও কি দূর থেকে পায় তার প্রিয়তমা বধূর ওড়ানো রুমালের এমন আমন্ত্রণ? নাকি কাছে গিয়ে হাত ধরে? ঝাঁপ দেয় একে অপরের ওপর? অপ্রিয় প্রশ্নগুলো নিজের ভেতরটা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিতে থাকে। কেবল ভেতরটাই নয়, বাইরেটাও চিতার আগুনে জ্বলতে থাকে। দাউদাউ আগুন জ্বলছে। নিজে দগ্ধ হতে হতে ডানে তাকাল আবার। দেখল, লাল রুমাল উড়ছে। দেহপোড়া আগুনও এখন পতাকা ওড়াচ্ছে…লাল পতাকা…লাল রুমাল…

শৌর্যদের ঘর থেকে ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে ফিরে এলো কলি। ঘরে ঢুকেই শুনল রুশনা বেগমের গলা, ‘তরকারি দিয়ে আসতে এত সময় লাগে, বউমা?’

‘চাচিআম্মা বসতে বললেন, না বসে ওঠা যায়? বেয়াদব ভাববেন না আমাকে? এজন্যই কিছুটা সময় গল্প করে এলাম।’

যৌক্তিক উত্তর শুনে দমে গেলেও প্রশ্ন করা থামালেন না। রূঢ় স্বরে বললেন, ‘চাচিআম্মার সঙ্গে, নাকি শৌর্যকে কাছে পেয়ে গল্প করলে এতক্ষণ?’

নেতিবাচক সরাসরি প্রশ্নে ভেতর থেকে রোষ জাগলেও ঠান্ডা গলায় কলি সত্য কথাই বলল, ‘দুজনই ঘরে ছিল। দুজনের সঙ্গে কথা বলেছি।’

‘যাও। আরও কথা বলো। এদিকে রুস্তম ফোন করেছিল। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইল। তুমি নেই। দীর্ঘক্ষণ লাইনে থেকেও তোমাকে না পেয়ে লাইন কেটে দিয়েছে।’

রুস্তম কথা বলতে চেয়েছিল শুনে মুহূর্তের জন্য খুশি হলেও বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না খুশির ঢেউ। মনের অতলে ভয় ঢুকে গেল—শৌর্যকে ঘিরে নতুন কোনো কানকথা কুটনি মহিলা তুলে দেননি তো রুস্তমের কানে? আতঙ্কের তির এসে বিঁধল বুকে। ছটফট করে শাশুড়ির উদ্দেশে প্রশ্ন করল, ‘কী বলেছেন আপনি?’

‘যা তুমি করেছ, তাই বলেছি।’

‘কী বলেছেন সেটা শুনতে চাচ্ছি।’ ভারী গলায় বলল কলি।

কলির থমথমে গলা শুনে রুশনা বেগমও স্বর রূঢ় করে জবাব দিলেন, ‘বলেছি, বউমা শৌর্যের জন্য রান্না করা রাজপুঁটি মাছের তরকারি নিয়ে গেছে শৌর্যদের ঘরে।’

‘আমি তো যাইনি। আপনিই পাঠিয়েছেন আমাকে। সেকথা বলেননি?’

‘সেকথা বলার প্রয়োজন কী? তোমার গরজে গেছ তুমি। তোমার যাওয়ার দায়ভার আমার কাঁধে নেব কেন?’

‘দায়ভার নেবেন কেন? সত্য কথাটা বলতেন। তাহলে খুশি হতো আপনার ছেলে। আমার গরজে গেছি শুনলে কষ্ট পাবেন তিনি। তাকে কষ্ট দিয়ে কি সুখ পাবেন আপনি? এই সহজ কথাটা বোঝেন না কেন? আমাকে ছোটো করলে পুড়বে আপনার ছেলেই। আমাকে অবিশ্বাস করলে শেষ হয়ে যাবেন তিনি। বোঝেন না সহজ হিসাবটা?’ চিৎকার করে প্রশ্ন করল কলি।

কলির উদ্ধত কথায় টনক নড়ল রুশনা বেগমের। এমন করে তো ভেবে দেখেননি তিনি। ছেলের কষ্টের কথা শুনে শঙ্কিত হলেন। চুপচাপ বসে থাকলেন ঘরে।

কলি বলল, ফোনটা দেন। কল করব আমি।

বাধা দিলেন না রুশনা বেগম। হ্যাঁ-বোধক সাড়াও দিলেন না। খাটের ওপর থেকে কলিই হাতে তুলে নিল মোবাইল সেট। কল করল রুস্তমকে। ব্যালান্স নেই। ‘আউটগোয়িং সুবিধা বন্ধ আছে’— স্বয়ংক্রিয় মেসেজটি কানে ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গে হতাশার উত্তাল স্রোত হ্যাঁচকা টান দিলো ভাটির জলের মতো। হাহাকার করে উঠল বুকের ভেতরটা। ঝরনা হয়ে জেগে উঠতে চাইল। ঝরনার স্বচ্ছ ধারায় মুছে দিতে চাইল রুস্তমের কষ্ট। বসন্ত প্রহরের প্রকৃতির মতো বুলিয়ে দিতে চাইল আদর। সে সুযোগ না পেয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল কলি। কলির চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে কুঁকড়ে গেলেন রুশনা বেগম। বউমার চিৎকারের আড়ালে কষ্টটা বোঝার চেষ্টা করলেন। চিৎকারেও কষ্ট থাকে। সে কষ্টে কোনো খাদ নেই। নিখাদ কষ্টের ছাপ মুহূর্তেই বুকে ছাপ বসালেও, শৌর্যের প্রতি বউমার কৌতূহল মেনে নিতে পারলেন না। একবার বউমার অনুভব দিয়ে অনুভব করতে চাইলেন পুরো বিষয়টি। সামনে পা বাড়িয়ে আবার সরিয়ে নিচ্ছেন পা। যেন সামনে এগোলে পায়ে ছোবল বসাবে ঝোপের আড়ালে ওত পেতে থাকা বিষধর সাপ। উদ্ভাসিত হয়েও নিভে গেলেন তাই। বউমার উদ্দেশে বললেন, ‘স্বামীর সন্দেহ বাড়ুক, এমন কাজ না করলেই তো হয়।’

‘এমন কী কাজ করেছি, আম্মাজান?’ প্রায় গর্জে উঠল কলি।

‘কী করোনি, বলো?’

পালটা প্রশ্নের জোর দেখে হতবাক হয়ে গেল কলি। বুঝল, শাশুড়ির সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। মনে কাঁপন ধরা আগ্রাসি চিৎকারটি অবরুদ্ধ গোঙানিতে বদলে গেল মুহূর্তে। সামনে বহমান উত্তাল স্রোত কীভাবে পাড়ি দিতে হবে, জানা নেই তার। রুস্তমের জন্য বুকের মন্দিরে গড়ে তোলা স্বর্গসৌধ ভয়াল সুনামির আঘাতে ভেঙে তছনছ হতে লাগল। বুকের চিতায় পুড়তে লাগল এতদিন ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা স্বপ্নগুলো। দিশেহারা হয়ে কলি বলল, ‘মোবাইলে রিচার্জ করিয়ে আনুন। আমি কথা বলব আপনার ছেলের সঙ্গে।’

রুশনা বেগম বললেন, ‘চাওয়ামাত্রই তো রিচার্জ করা যায় না, টাকা ভরা যায় না মোবাইলেÑ রিচার্জ করার জন্য যেতে হবে বাজারে। তাছাড়া আমাদের টাকা খরচ করতে হবে কেন, রুস্তমই প্রয়োজনে কল করবে।’

‘এখন তিনি কল করবেন বলে মনে হচ্ছে না। নিশ্চয়ই কষ্টে আছেন। কল না করে অভিমানে ছটফট করছেন। দয়া করে মোবাইল ফোনে টাকা ভরে আনার ব্যবস্থা করুন। আপনার ছেলের সঙ্গে এখন কথা বলা জরুরি। আমার জন্য নয়। উনার জন্যই জরুরি, বুঝেছেন?’

প্রশ্নের জবাব পাওয়ার আগেই হঠাৎ কমে গেল বুকের চাপ। দেখল, বড়ো আকৃতির একটি রঙিন প্রজাপতি উড়ে এসে বসেছে ঘরের বেড়ার সঙ্গে ঝোলানো কাপড়ের ওপর। বাদামি রঙের পাখনার শেষপ্রান্তে রয়েছে সাদা রঙের দুই সারি গোলাকার কারুকাজ। এর আগে এতবড়ো প্রজাপতি দেখেনি সে। প্রজাপতিটির দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামান্য উড়ে সেটি বসল কলির ডান বাহুতে। সেই অবস্থাতেই নিজের রুমে ঢুকে গেল। ভাবল, রুস্তমের পোড়-খাওয়া মন প্রজাপতি হয়ে উড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে বাহুতে। আদর করার জন্য হাত বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চট করে উড়াল দিয়ে বসল মাথায়। এবার আর নড়তে ইচ্ছা হলো না কলির। মাথায় প্রজাপতি নিয়ে চুপচাপ বসে রইল কলি।

ঝোপঝাড় ছেড়ে, ফুল-পাতা ছেড়ে, প্রজাপতিটি হঠাৎ কেন ঢুকল ঘরে? কেন বসেছে মাথায়? এসব ভাবনায় বুঁদ হয়ে গেল, নড়তে চাইল না। মনে মনে বলল, ‘প্রজাপতি! বসে থাকো তুমি। এটা তোমার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রজাপতি! বলো তুমি, কেমন আছে আমার রুস্তম?’

প্রজাপতির মুখে ভাষা নেই। মনে মনে কথা বলে যাচ্ছে কলি—আমার হাতে জাদুদণ্ড নেই। মোহর নেই। কী দিয়ে খুশি করব তোমায়? কী দিয়ে বরণ করব? তুমি বসে থাকো। যতক্ষণ খুশি বসে থাকো। তোমার হয়ে বসে থাকব আমি। বসে থাকব জনম জনম…

Series Navigation<< উপন্যাস।। মরুঝড়।। মোহিত কামাল ।। পর্ব ছয়উপন্যাস।। মরুঝড়।। মোহিত কামাল।। পর্ব আট >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *