কিশোর উপন্যাস ।। কিডন্যাপ হলো চার গোয়েন্দা ।। শামস সাইদ ।। পঞ্চম পর্ব

পঞ্চম পর্ব
কাঁপা গলায় বৃদ্ধা বললেন, রেজা স্যারকে চাই।
চমকে উঠলেন রেজা স্যার। এই বৃদ্ধা এসেছেন তার খোঁজে। কেন? কেমন বিস্মকর লাগছে ব্যাপারটা। বললেন, তাকে চিনেন আপনি?
মাথা নাড়লেন বৃদ্ধা। না, চিনেন না। তবে এই স্কুলে পড়ান। সবাই কইল। তাই এসেছি।
আমিই রেজা স্যার। তা কেন এসেছেন?
বৃদ্ধা চেপে ধরলেন রেজা স্যারের হাত। কেঁদে উঠলেন শব্দ করে। হতভম্ব হয়ে গেল সবাই। কেন কাঁদছেন বৃদ্ধা? কান্না থামালেন রেজা স্যার। বসেন। কি হয়েছে? কেন কাঁদছেন?
আঁচলে চোখ মুছলেন বৃদ্ধা। কান্না থামতে চায় না। ভেতর থেকে স্রোত হয়ে বেরিয়ে আসতে চায় জল। কিছুক্ষণ বসে রইলেন এক দৃষ্টিতে। ওসি কুতুবউদ্দিনকে চিনতে পারেননি। ইউনিফর্ম নেই পরনে। রেজা স্যার জানতে চাইলেন, কী হয়েছে? বলুন এবার।
আপনি নাকি গোয়েন্দা?
এই প্রশ্ন রেজা স্যারকে আরও অবাক করল। তিনি গোয়েন্দা তা এই বৃদ্ধা জানলেন কী করে? কেনই বা সে প্রশ্ন করতে স্কুল পর্যন্ত এসেছেন? কিছু সময় পরে বললেন, আমি না। আমার কয়েক ছাত্র গোয়েন্দা। তবে ভুল শোনেননি। ওদের জন্য আমিও গোয়েন্দা হয়ে উঠেছি। আমাকেও গোয়েন্দা বলে মানুষ। মাস্টার নামটা বিলুপ্তির পথে। তা হঠাৎ গোয়েন্দার খোঁজে আপনি!
আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন বৃদ্ধা। এক সময় রতন বলে বিলাপ করে উঠলেন। কথা বলতে পারছেন না। স্বরটা চেপে গেছে। কষ্টে জমে গেছে বুক। কিছুক্ষণ কাঁদলেন শব্দে করে। তারপর বললেন, আমার ছেলে রতনকে এনে দিন মাস্টার। আল্লাহ ভালো করবে আপনার। একটাই ছেলে আমার। ওর কিছু হলে বাঁচতে পারব না।
এ কথা শুনে কৌতুহল বাড়ল সবার। অফিসার ভাবলেন যে বয়স হয়েছে তাতে বেশিদিন এমনিও বাঁচবেন না। কী হয়েছে আপনার ছেলের? জানতে চাইলেন এরপর।
আমার ছেলে রতন। হবিগঞ্জ থাকত। ওখানে কী সব ব্যবসা করত জানি না। শুক্রবার এসেছিল বাড়িতে। বউকে বলল পোলাও রান্না করতে। দুপুরের খানিক আগে বাড়ি থেকে বের হলো। লুঙ্গি পরনে। বাজারে যাবে শসা আনতে। আমার চোখের সামনে দিয়ে গেল। বললাম দেরি করিস না রতন। নামাজে যাবি। আজান পড়বে একটু পরে।
না মা, দেরি করব না। কইয়া হাঁটল। দুপুর গড়িয়ে গেল। বিকেল নামল। ফিরছে না রতন। পোলাও পড়ে আছে। কেউ মুখে তুলছে না। রতন আসবে শসা নিয়ে। তারপর খাব। কেন ফিরছে না। মনটা ভলো লাগছে না আমার। ছটফট করছে। মন বলছে বিপদ হইছে রতনের। বাড়ির সামনে গেলাম। তখন পাশের বাড়ির একটা ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে কইল, রতন ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে চাচী।
চিৎকার করে উঠলাম আমি। কারা ধরে নিল রতনকে? কেন ধরে নিল? রতন কী করেছে? কোথায় আমার রতন?
ওই ছেলেটা বলল শসা আর কাঁচামরিচ কিনে বাড়ির পথে এগুতে ছিল রতন। বেশি দূর না বাড়ি। হাঁটা পথ। একটা গাড়ি এসে সামনে দাঁড়াল।
অয়ন বলল, গাড়িটা কী রঙের বলতে পারবেন?
কালো রঙের।
ঠোঁট কামড়াল অয়ন। সন্দেহ জড়ো হলো মনে। কঙ্কাল পার্টি না তো। হতে পারে। ওদের গাড়িও কালো। বৃদ্ধা আবার বলতে শুরু করলেন। গাড়ি থেকে কয়েকজন মানুষ নামল। কালো পোশাক পরা। মুখ বাঁধা। হাতে অস্ত্র। রতনকে ঘিরে দাঁড়াল। দু’জন হাত ধরল। রতন থ। এরা কারা! কেন তার হাত ধরছে? বাজারের মানুষ পালিয়ে গেছে ভয়ে। কেউ সামনে আসেনি রতনকে বাঁচাতে। সাহস পায়নি। একজন বলল, আমাদের সাথে যাইতে হবে।
ভয় পেয়ে গেল রতন। কাঁপা গলায় বলল, আপনারা কারা? চিনতে পারলাম না। কোথায় নিয়ে যাবেন আমায়?
একজন হাসল। গেলেই দেখতে পারবি কোথায় নিয়ে যাই। রতন যেতে চাইল না। মোড়ামুড়ি করছে। একজন থাপ্পড় মারল। বলল, আমরা আইনের লোক। তোর নামে মামলা আছে। বেঁধে ফেলল রতনের হাত।
মামলা ছিল আপনার ছেলের নামে? জানতে চাইলেন অফিসার।
না, মামলা ছিল না। তারপর জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে গেল। থানা পুলিশ কত জায়গা গেলাম, খোঁজ পাইলাম না। পুলিশ বলে ধরে নাই। তারপর খোঁজ পাইলাম মাস্টারের। একজন কইল রেজা স্যার গোয়েন্দা। তার কাছে যাও। তিনি খুঁজে বের করতে পারবেন। তাই এলাম বাপু অনেক কষ্ট করে। সেই শক্তি নাই শরীরে। চলতে পারি না। আমার ছেলেকে এনে দিন। রতনকে নিয়ে বাড়িতে যাব। শুরু হলো তার বিলাপ।
অফিসার কিছু বলছেন না। নতুন ভাবনা চাপল রেজা স্যারের মাথায়। পুলিশ নেয়নি। তাহলে নিশ্চয়ই কিডন্যাপ হয়েছে। কিছু বললেন না। আরও কিছুক্ষণ ভাবতে চাচ্ছেন। বৃদ্ধার সামনে দাঁড়াল অয়ন। কাঁধে হাত রেখে বলল, কাঁদবেন না। আমরা চেষ্টা করব আপনার ছেলেকে খুঁজে বের করতে। তা আপনার ছেলে কিসের ব্যবসা করত?
জানি না বাপু। হবিগঞ্জ থাকত। কিসের ব্যবসা করত কইতে পারব না।
আচ্ছা, আপনার ছেলের সাথে কারো শত্রুতা ছিল?
শত্রু-মিত্র জানি না। আমরা গরিব মানুষ। গরিব মানুষের শত্রু থাকে নাকি!
থাকে। শত্রু থাকতে গরিব ধনী হতে হয় না। অনেক তুচ্ছ কারণেও মানুষ শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।
বৃদ্ধার মুখে কথা নেই। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। অফিসার বললেন, কেসটা কঠিন। আমার মনে হচ্ছে কিডন্যাপ মামলা। আপনারা দেখুন মাস্টার। হেল্প লাগলে বলবেন। আমি যাচ্ছি। কাজ আছে।
অফিসার চলে গেলেন। রেজা স্যার বসে আছেন। কী বলবেন এই মাকে। স্বপ্ন নিয়ে এসেছে ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার। অয়ন বলল, আপনার ছেলের ছবি আছে? কীভাবে চিনব আপনার ছেলে।
মাথা নাড়লেন বৃদ্ধা। হ্যাঁ, ছবি আছে। ব্যাগের মধ্যে হাত দিয়ে বের করলেন রতনের ছবি। চোখের সামনে ধরে দেখলেন। আবার কাঁদলেন। তার হাত থেকে ছবিটা নিল অয়ন। ছবিতে চোখ পড়তেই স্থির হয়ে গেল। চেনা মনে হচ্ছে। কোথাও দেখেছে। কোথায় দেখেছে হঠাৎ মনে করতে পারছে না। ছবিটা রেজা স্যারের সামনে রাখল। অন্য বন্ধুরাও উঠে এলো ছবি দেখার জন্য। স্যার বসতে বললেন। স্যারের আরও কাছে এলো অয়ন। বলল, ছবিটা চেনা মনে হচ্ছে স্যার।
প্রথম দৃষ্টিতেই চিনতে পারলেন রেজা স্যার। কিন্তু প্রকাশ করলেন না। ছবিটা উল্টে রেখে তাকালেন বৃদ্ধার দিকে। বললেন, চিন্তা করবেন না। ছবি রেখে যান। আমরা চেষ্টা করব আপনার ছেলেকে খুঁজে বের করতে। কোনো খবর পেলে জানাব।
বৃদ্ধার সেই মরা মুখে হাসি ফুটল। আল্লাহ আপনার ভালো করবে মাস্টার। আমার একটাই ছেলে। এরপর অনেকক্ষণ দোয়া করলেন। সবটাই রেজা স্যারের জন্য।
তখনো অয়ন খুঁজে বেড়াচ্ছে ওই লোকটার মুখ। কোথায় দেখল। খুব চেনা মনে হচ্ছে। রেজা স্যারের মোবাইল নম্বর নিয়ে বৃদ্ধা চলে গেলেন। নিচু স্বরে স্যার বললেন, এত সময় লাগলে হবে না অয়ন। গোয়েন্দা মানে তীক্ষ্ম দৃষ্টি। যথেষ্ট মেধা। অসম্ভব কৌশল। মনে রাখতে হবে অতীত। উপস্থিত বুদ্ধির একটা খেলাও।
থেমে গেল অয়ন। বুঝতে পারল এই লোকটাকে চিনতে দেরি করছে সে। তাই এসব বলছেন স্যার। টেবিলের কাছে এলো ডানা। ছবিতে চোখ রেখেই বলল, স্যার, সেই লোকটা না?
স্যার তাকালেন ডানার দিকে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন স্থির দৃষ্টিতে। ডানা এতটা তীক্ষ্ম ভাবতে পারেননি। অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন, চিনতে পারছ অয়ন?
মাথা নাড়ল অয়ন। আগেই চিনতে পেরেছি স্যার। তবে নিশ্চিত হতে একটু সময় নিয়েছিলাম। তা বৃদ্ধাকে বললেন না কেন, তার ছেলেকে মেরে ফেলেছে। লাশ পড়ে আছে মর্গে।
ইচ্ছে করেই বলিনি।
আড়াল করতে চাচ্ছেন?
না, খুন আড়াল করা যায় না। খুব কঠিন।
তাহলে।
ভাবতে পারছ, এখন বললে বৃদ্ধার কী অবস্থা হতো? একটা স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘপথ ভেঙে বাড়ি যেতে পারবে। ছেলের ফেরার স্বপ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকবে। ছেলে আসবে। ওই স্বপ্নটা ওনাকে বাঁচিয়ে রাখবে। শক্তি জোগাবে। সত্যটা একদিন জানাতেই হবে। এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। লুকিয়েও রাখা যাবে না। তবে সেই সময়টা এখন ছিল না। বিষয়টা ওসি সাহেবকে জানাতে হবে। দেখি তিনি কী বলেন।
ওসি কুতুবউদ্দিনকে ফোন করলেন রেজা স্যার। বললেন, ওই লাশের পরিচয় পাওয়া গেছে অফিসার।
কোথায় পেলেন এত দ্রুত?
লাশটা ওই বৃদ্ধার ছেলের।
কী বলেন! শিউর আপনি?
হ্যাঁ, উনি একটা ছবি নিয়ে এসেছিলেন। সেই ছবি আর ওই লাশ একই ব্যক্তি।
তাহলে লাশের পরিচয় পেয়েছেন। খুনিকেও পাওয়া গেছে। যার লাশ সেই খুনি। এখন বের করতে হবে কারা তুলে এনেছিল। কেন ওখানে আটকে রেখেছিল। সেটা বের করার দায়িত্ব আপনার গোয়েন্দা বাহিনীর।
ফোন রাখলেন অফিসার। রেজা স্যার তাকালেন অয়নের দিকে। ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে নিজেকে খুন করেছেন উনি। নিজেই খুনি। বের করতে হবে কারা তুলে এনেছিল। কোথা থেকে ওই লোকের হাতে পিস্তল এলো। না ওনার কাছে পিস্তল ছিল। লোকটা কঙ্কাল ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল না তো! অসংখ্য প্রশ্ন আসবে সামনে। তার উত্তর খুঁজে পেলেই বেরিয়ে আসবে আসল রহস্য।
সামি বলল, রহস্য বের হবে স্যার। রহস্যের হাঁড়ি ভেঙে দেব। আমাদের থেকে কিছু গোপন করা সম্ভব না।
মাথা নাড়লেন স্যার। তার মনে চলছে অন্য খেলা। লোকটা কঙ্কাল ব্যবসার সাথে জড়িত থাকতে পারে। আচ্ছা অয়ন, ওরা নিজেদের অপকর্ম আড়াল করার চেষ্টা করেনি তো। ওই কক্ষে গোপন দরজা আছে?
কিছুক্ষণ ভাবল অয়ন। তারপর মাথা নেড়ে বলল, না স্যার, সেরকম কিছু নেই। আমার মনে হচ্ছে অন্য কেউ গুলি করেছে। তারপর পালিয়ে গেছে।
ভেতর থেকে দরজা আটকিয়ে পালাল কেমনে?
গুলি করার সাথে সাথে লোকটা মরেনি স্যার। হয়তো বলেছে ভেতর থেকে দরজা আটকিয়ে মরবি।
তাহলে যথেষ্ট সময় পেয়েছে ওরা। কেন ওকে নিয়ে পালাল না? সুযোগ তো ছিল। অন্য কোনো ফাঁদ থাকতে পারে।
থাকতে পারে স্যার।
মোতালেবের কাজ না তো? হয়তো ওর লোকেরা জানত ওই বাড়িতে যাব আমরা। একটা খুন করে রেখে দিল। আমাদের ফাঁসানোর চেষ্টা। বিষয়টা ক্রমশ জটিল হচ্ছে। এই রহস্য উদ্ধার করতে আবারো ওই বাড়িতে যেতে হবে আমাদের।
আপনার যেতে হবে না স্যার। আমরাই যাব। সব দেখে আপনাকে রিপোর্ট করব। বলল অয়ন।
আচ্ছা, তাই করো। তারপর মাঠে নামব। আমার বিশ্বাস তোমরা আসল খুনিকে খুঁজে বের করতে পারবে।

Series Navigation<< কিশোর উপন্যাস ।। কিডন্যাপ হলো চার গোয়েন্দা ।। শামস সাইদ ।। চতুর্থ পর্বকিশোর উপন্যাস ।। কিডন্যাপ হলো চার গোয়েন্দা ।। শামস সাইদ ।। ষষ্ঠ পর্ব >>

Leave a Reply

Your email address will not be published.