কিশোর উপন্যাস।। কিডন্যাপ হলো চার গোয়েন্দা।। শামস সাইদ।। বারো পর্ব

১২

প্রচন্ড উত্তেজনায় হাত নাড়িয়ে সুন্দ্রাকাঠি বাজারে দাঁড়িয়ে অয়নের বাবা বলছেন, হা হা, ওসব আমাকে বুঝাতে হবে না। বহু দেখেছি। কাজের সময় পুলিশ পাবে না। কথায় আছে না চোর গেলে বুদ্ধি বের হয়, তেমনি ঘটনা ঘটে গেলে পুলিশ এসে সামনে দাঁড়ায়। তার কথার সঙ্গে কিছু যোগ করে মোমিন মোল্লা বলতে চাচ্ছিলেন একটা কিছু। কিন্তু বলতে পারলেন না। কথাটা আটকে গেল দরজার মুখে। চোখ-মুখ ঘোলা হয়ে গেল ভয়ে। রক্ষা হয়েছে, কথাটা বলেননি। কে জানি বলেছিল, মুখ থেকে কথা বেরিয়ে গেলে আর ধনুক থেকে তীর ছুটে গেলে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই দুটো জিনিস ব্যবহরে সতর্ক হতে হয়। ওসি কুতুবউদ্দিনের গাড়িটা থামল তখন বাজারে।

মোমিন মোল্লার ভয়ের কারণ ওটা। গাড়ি থেকে নামলেন না ওসি সাহেব। গ্লাস নামিয়ে চোখ বুলালেন। গম্ভীর হয়ে গেল অয়নের বাবার মুখ। কয়েক পা দূরে সরে দাঁড়ালেন। নাম নিতেই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যম। কাজের সময় ফোন করেও পাওয়া যায় না।
হাতের ইশারায় একজনকে ডাকলেন ওসি সাহেব।
জিজ্ঞেস করলেন, এখান থেকে একটা কালো গাড়ি যেতে দেখেছিস?
লোকটা কিছুক্ষণ ভেবে চেষ্টা করল মনে করতে। কিন্তু মনে পড়ছে না। এরপর মাথা নাড়ল। না, আজ কোনো কালো গাড়ি যায়নি অফিসার। তবে দিন তিনেক আগে একটা কালো গাড়ি এসেছিল। বাজারের ওপর দিয়ে গেছে অফিসার।
ভয়ঙ্কর রূপ ছিল। এখানে দাঁড়ায়নি। গাড়ির ভেতরে যারা ছিল তাদের মুখ দেখা যায়নি। কালো কাপড়ে বাঁধা ছিল।
মাথা ঘুরছে ওসি কুতুবউদ্দিনের। কিছুক্ষণ ভাবলেন। এ পথে যায়নি। তাহলে পথ পাল্টিয়েছে ওরা। শিয়ালের থেকেও চালাক।
খুঁজে পাওয়াটা খুব সহজ হবে না। চিহ্ন রেখে যায়নি পিছু নেওয়ার মতো। সময় নষ্ট করলেন না ওসি সাহেব। বাহুবলের দিকে চললেন।
হাঁপছেড়ে বাঁচলেন অয়নের বাবা। কেটে গেছে বিপদ।

কোথা থেকে আজরাইলের মতো এসে সামনে দাঁড়াল। কয়েক পা হেঁটে মোমিন মোল্লার সামনে গেলেন। দেখলেন তো নাম নেয়অর আগেই হাজির। এই সময় তার চোখ গেল দক্ষিণের রাস্তায়। স্কুলের ছাত্ররা আসছে দল বেধে। এই সময় স্কুল ছুটি দিল! ব্যাপারটা কী। ঘড়ির দিকে তাকালেন। বারোটা বেজে পাঁচ মিনিট। স্কুল ছুটির সময় না। অয়নও আছে নাকি ওদের ভেতর। বলছেন সাবধানে চলতে। ছেলেটা কথা শোনে না। চোখ অন্যদিকে ফেরাতে পারলেন না। স্রোতের মতো ছাত্রদের একটা দল চলে এসেছে সামনে। সবার চোখে-মুখে কেমন আতঙ্ক। বলছে চার গোয়েন্দাকে তুলে নেওয়ার কথা। অয়নের বাবা একজনকে

থামালেন। কী হয়েছে? স্কুল ছুটি দিল এই সময়।

অয়নের বাবাকে চেনে না সেই ছেলে। বলল, স্কুলে ঝামেলা হয়েছে। তাই ছুটি দিয়েছে। ঝামেলা হয়েছে! চিন্তায় পড়ে গেলেন বাবা। থেমে গেল তার সব ভাবনা। একটা অদৃশ্য ভয় শীতল করে দিল তার শরীর। তাকিয়ে আছেন ভাবুক মনে। জিজ্ঞেস করতে পারছেন না কী ঝামেলা হয়েছে? ছেলেটা আর দাঁড়াল না। বন্ধুদের সাথে হেঁটে গেল।
তখনো হুঁশ ফেরেনি বাবার। চেতনা হারিয়ে ফেলেছেন। খানিক পরেই দেখলেন কয়েকজন শিক্ষক যাচ্ছেন। দাঁড়ালেন তাদের সামনে। জানতে চাইলেন স্কুলে কী হয়েছে মাস্টার? ছেলেরা যে বলল ঝামেলা হয়েছে। আপনারাও চলে যাচ্ছেন।
ইংরেজি স্যার বললেন, স্কুলে হামলা করেছে সন্ত্রাসীরা।
চারজন ছাত্রকে তুলে নিয়েছে। ক্লাস সেভেন থেকে।

রাস্তায় বসে পড়লেন অয়নের বাবা। বুঝতে পারলেন অয়নকে তুলে নিয়েছে। ফিরবে না আর অয়ন। এই ভয়টা করেছিলেন তিনি। তবে স্কুল থেকে তুলে নেবে তা ভাবতে পারেননি। হঠাৎ বলে উঠলেন আমার অয়ন। কোথায় অয়ন? ঠিক আছে তো মাস্টার?
নিচু মুখে ইংরেজি স্যার বললেন , অয়নকে তুলে নিয়েছে। এসব হয়েছে রেজা স্যারের জন্য। তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন বাবা। কাঁপছে তার শরীর।
কোথায় রেজা স্যার? আমার ছেলের কিছু হলে ছাড়ব না। এরই মধ্যে সামির বাবা এসে পড়লেন। আবিরের চাচা। নিলয়ের মা।
কিডন্যাপের খবর ছাড়িয়ে পড়েছে গ্রামে। হামলা হয়েছে স্কুলে। ওদের তুলে নিয়েছে। সেই খবর শুনেই এসেছেন তারা।

অন্যরাও জড়ো হলো। সব দোষ চাপাচ্ছে রেজা স্যারের ওপর। মোমিন মোল্লা বললেন, সব নষ্টের মূল ওই মাস্টার। স্কুল থেকে তখন বিদায় করে দিলে ভালো হতো। প্রথমে খেলল মোতালেবকে নিয়ে। যারা তাকে ছাড়াল তাদের ঘুটি বানাল এবার। কোথায় নিয়ে গেছে ওদের? কীভাবে আছে কে জানে। পুলিশ ফোন করো। ওসি দেখি একটু আগে গেলেন। এখন দেখবা ফোন ধরবেন না।

বলবেন ব্যস্ত আছি। এর নাম পুলিশ।
অয়নের বাবা জানতে চাইলেন, কারা হামলা করেছে?
কোথায় তুলে নিয়েছে?

কাঁপা গলায় ইংরেজি স্যার বললেন, কারা হামলা করেছে জানি না। মুখোশ পরা ছিল। একটা কালো গাড়ি নিয়ে এসেছিল। তুলে নিয়ে গেছে। বোমা মেরে আতঙ্ক তৈরি করেছিল স্কুলে। কালো গাড়ি! থেমে গেলেন বাবা। মনে পড়ল সেদিনের কথা। সেই গাড়িটা! তার সন্দেহ ভুল ছিল না। ছেলেটা শুনল না কথা। এসব রেজা স্যারের জন্য হয়েছে। ইংরেজি স্যার ঠিকই বলেছেন। উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, রেজা স্যার। এসব আপনার জন্য হয়েছে। আমার ছেলের কিছু হলে আপনাকে ছাড়ব না। স্কুলের পথে দৌড় শুরু করলেন এরপর। তার পেছনে ছুটল অন্যরা।

রেজা স্যার বিরোধী গ্রুপ বেশ খুশি। আগুন লাগছ রাবনের চিতায়। কেউ থামাতে পারবে না। এবার স্কুল ছাড়তে হবে। লোকটা বেশি বাড়ছিল। উচিত শিক্ষা পাবে।
স্কুল পর্যন্ত যেতে হলো না অয়নের বাবার। পথেই দেখা পেলেন রেজা স্যারের। অগ্নিমূর্তি হয়ে দাঁড়ালেন তার সামনে। অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়েছেন। কাঁপছেন উত্তেজনায়। অস্থির গলায় বললেন, মাস্টার, আমার ছেলে কোথায়?

কথা নেই রেজা স্যারের মুখে। বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি খারাপ। তার কী করার আছে। তিনিও ব্যথিত। হয়তো সবাই ভাবছে তার জন্য কিডন্যাপ হয়েছে ওরা। রেজা স্যারকে ধরতে চাইলেন অয়নের বাবা। অন্য একজন এসে সামনে দাঁড়ালেন। চেষ্টা করলেন শান্ত করতে। মাস্টারের সাথে এমন করে কী হবে? মাস্টার তো কিডন্যাপ করেননি। ওই গুন্ডারা করেছে।

সবাই মিলে খুঁজতে হবে। ওদের উদ্ধারের চেষ্টা করো। এখন সময় না রাগ করার।
তবু সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন অয়নের বাবা।

না, মাস্টারের জন্য কিডন্যাপ হয়েছে আমার ছেলে। গোয়েন্দা স্কুল! কাল হয়েছে ওই স্কুল। কঙ্কাল বাড়ি খুঁজে বের করেছে ওরা। সেজন্য কিডন্যাপ করেছে। এখন ওদের কঙ্কাল বানাবে। ফিরবে না আমার ছেলে। কান্নায় ভেঙে পড়লেন বাবা। তাকে ধরল সবাই। বোঝাতে চেষ্টা করলেন রেজা স্যার। পুলিশ ওদের পিছু নিয়েছে। আমরাও বের হব। চিন্তা করবেন না। ওরা ফিরে আসবে। কিছু করতে পারবে না। কিন্তু তার কথা কেউ শুনছে না। রাস্তার মাঝে এমন পরিস্থিতিতে বিব্রত হলেন। কী করবেন এখন! জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন অয়নের বাবা। একজন বলল, মাস্টার, চলে যান আপনি। পরিবেশ ভালো না। পরিস্থিতি শান্ত হলে ওদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করব আমরা। আপনি থাকলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হবে।

কিছু বললেন না রেজা স্যার। মাথা নিচু করে বিমর্ষ মনে রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে সামনের দিকে এলেন। মনটা ভীষণ খারাপ। এখন আরও খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে একটা অন্ধকার ক‚পে পড়ে গেছেন। এর আগেও একবার পড়েছিলেন। তখন ওরা তুলেছিল।
এবার ওরা পড়েছে। তিনিও। এখন উঠতে হবে তার। উঠাতে হবে ওদের। কিনারা পাচ্ছেন না খাদের। দেখছেন অন্ধকার।
অয়নের বাবাকে ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে গেল বাজারের লোকেরা। এত মানুষ দেখে সামনের ঘরে এলেন মা। এই অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন। অস্থির কণ্ঠে জানতে চাইলেন, কী হয়েছে?
একজন বললেন, অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অয়নের বাবা। তখনো কেউ বলেনি অসুস্থতার কারণ। পানি নিয়ে এলেন মা। মুখে ছিটালেন। চেষ্টা করলেন খাওয়াতে। তা পারলেন না। চোখে মুখে পানির ছিটা দেওয়ার খানিক পরে চোখ খুললেন বাবা।
চিৎকার করে উঠলেন, অয়ন…আমার বাবা। কোথায় অয়ন? আবার জ্ঞান হারালেন।
থ হয়ে গেলেন মা। মুহ‚র্তেই করুণ হয়ে গেল তার মুখ।

ভেজা কণ্ঠে বললেন, এসব কী বলছে। কী হয়েছে অয়নের? ও তো স্কুলে। এরপর শুনলেন অয়ন-সহ চারজনকে তুলে নিয়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা। মনে পড়ল সে রাতের কথা। তাহলে অয়নের বাবার ভয়টা ভুল ছিল না। মায়ের অবস্থা প্রায় পাগলের মতো। ছুটছেন এ ঘর থেকে ও ঘরে। কী করবেন। কোথায় যাবেন। কোথায় তার অয়ন। কেন তুলে নিল। অয়ন বলে চিৎকার করছেন। তখন মনে হলো কঙ্কালের কথা। ভয়ে শুকিয়ে গেছে মুখ।

কঙ্কাল বানিয়ে ফেলবে না তো ওদের? লাফিয়ে উঠলেন। না, না, আমার অয়নের সাথে এমন কিছু যেন না হয়। ও যেন ফিরে আসে। এক গাল হেসে যেন বীরের বেশে মায়ের সামনে দাঁড়ায়।

Series Navigation<< কিশোর উপন্যাস।। কিডন্যাপ হলো চার গোয়েন্দা।। শামস সাইদ।। এগারো পর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published.