আরও গভীরে; ঢালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক প্রকৃত সত্য ।। সৈয়দা শর্মিলী জাহান

আরও গভীরে; উপন্যাসের নামটি থেকে অনুমেয়, কোনও একটি বিষয়ের আদ্যোপান্ত বুঝতে অন্তর্চক্ষু মেলে গভীর ভাবনায় ডুবে যেতে হবে। চলতে পথে আমরা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যা দেখি, তা দিয়ে সব সময় সত্যের নাগাল পাওয়া যায় না। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে যাকে সত্য বলে মনে হয় তা আসলে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করার ঢাল। ঢালের আড়ালে লুকিয়ে থাকে প্রকৃত সত্য। যা জানে কেবল ভুক্তভোগী জন। সত্যকে জানতে, অন্তর্চক্ষু দিয়ে ভেদ করতে হবে সেই শক্ত ঢাল। এ দৃষ্টিকোণ থেকে নামকরণ ঠিক আছে।

উপন্যাসের প্রচ্ছদে একটি নারীমুখ। সে মুখের একপাশে রহস্যময় আঁধারকালো। অন্যপাশে তারুণ্যদীপ্ত লাল। ডাগর দুটি চোখ অপূর্ব সুন্দর। আঁধার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তারুণ্যদীপ্ত লালের দিকে অশ্রুসিক্ত বিষণ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে চোখ জোড়া। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুনিয়ার সার্থক চিত্রণ। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রীতম ও মুনিয়া। নিজ নিজ পথে যারা জীবন সংগ্রামে রত । হঠাৎই পরিচয় হয়েছিল দুজনের। তারপর একে অপরের কাছে চলে আসা। দেখা হলে দু’জনই দু’জনের সঙ্গ উপভোগ করে দারুণভাবে; কিন্তু তবু সম্পর্কের মাঝে কোথায় যেন একটি অদৃশ্য দেয়াল ছিল। দেয়ালের এপাশ ওপাশ মুনিয়ার জানা থাকলেও, প্রীতম তা অনুধাবন করেনি। ভালোবাসায় শারীরিক একটা আকর্ষণ থাকলেও, মনের ষোলো আনা দখল প্রয়োজন তার থেকে অনেক অনেক গুন বেশি। বিশেষ করে মুনিয়ার মতো মেয়ের প্রেমে পড়লে। প্রীতম যখন তা বুঝেছে ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে অনেক। মুনিয়ার হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা ক্ষতের নাগাল পায়নি প্রীতম। সে ক্ষত স্পর্শ করতে যে অন্তর্দৃষ্টি ও হৃদয়ের গভীরতা প্রয়োজন তা ছিল না প্রীতমের; ফলে মুনিয়া তার কাছে রহস্যময় ছিল কখনো কখনো। সে রহস্যের কুল-কিনারা করতে না পেরে , মুনিয়া ওকে ভালোবাসে কি না এ দ্বন্দ্ব ভুগিয়েছে প্রীতমকে বার বার। এমনি গল্পকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে উপন্যাসটির কাহিনী।

উপরোল্লিখিত মূল গল্পটি এগিয়ে নেবার পথে, লেখক আরও কিছু চরিত্র চিত্রণ করেছেন। যেমন – আলম মামা, জামিল সাহেব, বন্ধু পরমাণু, সফিকুল সাহেব, ইশতিয়াক সাহেব, হরিপদবাবু, ছোটো চাচা, রোমেনা চাচি ইত্যাদি। চরিত্রগুলো ঘিরে স্বল্প পরিসরে আলাদা আলাদা গল্প রচনা করেছেন লেখক। সে গল্পগুলো মূল গল্পের সাথে মানিয়ে গেছে চমৎকারভাবে। এসব গল্পের মাধ্যমে মানব চরিত্রের বিভিন্ন দিক তুলে এনেছেন লেখক। এই অল্প কিছু চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমে লেখক যেভাবে কাহিনীটিতে গতিশীলতা এনেছেন তা প্রশংসার দাবীদার। প্রশংসার দাবীদার মেদহীনতাও।

আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে চরিত্র চিত্রণ ও ঘটনা সৃষ্টিতে লেখকের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা, মননশীলতা ও সৃষ্টিশীলতাকে। একেকটি ঘটনার সৃষ্টি ইউনিক একদম। বইটিতে লেখক নিজের আলাদা লেখক সত্তাকে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। উপন্যাসটিতে, কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে প্রীতমের নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক দিক যতটা বিস্তারিত লিখেছেন লেখক, মুনিয়ার দিকটি ততটাই অন্তরালে রেখেছেন। মুনিয়ার মনের ক্ষতটি সম্পর্কে কেবল অবগত করেছেন তিনি। সে ক্ষত একটি নারীকে কতখানি নিঃশেষ করে তা ভাবার ভারটি ছুঁড়ে দিয়েছেন পাঠকের দিকে। লেখকের উদ্দেশ্য সার্থক। উপন্যাস পড়া শেষ হলে মুনিয়াকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবে পাঠক।

প্রীতম মুনিয়াকে ভালোবেসেছে ওর সরলতার জন্য। প্রীতমের ধারণা, পৃথিবীর সরলতম নারী হলো মুনিয়া। কিন্তু উপন্যাসের অনেক জায়গায় মুনিয়াকে প্রীতম রহস্যময় নারী বলেছে, মুনিয়ার আচরণ বুঝে উঠতে পারে না বলে। তো এত রহস্যময়তা থাকলে মুনিয়া প্রীতমের কাছে সরলতম হয় কি করে? সাংঘর্ষিক হয়ে গেল না ব্যাপারটা? এত বছর প্রেম করার পরও মুনিয়া সম্পর্কে প্রীতম প্রায় কিছুই জানেনি। প্রীতমের প্রতি রহস্যময় আচরণ ছিল মুনিয়ার। এত দূর্বোধ্যতা নিয়ে এত বছর প্রেম গড়াল কী করে? মুনিয়ার জীবনে যা ঘটে গেছে, তাতে প্রীতমের মতো শরীর ভোগ করতে চাওয়া ছেলেকে ওর পছন্দ হবার কথা নয়। মুনিয়ার প্রয়োজন ভীষণভাবে মানসিক সাপোর্ট দেয়া একজন প্রেমিক মানুষ। ভালোবাসা হয়ত বলে কয়ে আসে না। তবু প্রশ্নটি থেকে যায়।

মুনিয়া ছাতা মাথায় দিলে বৃষ্টি নামবে-মুনিয়ার এমন একটি কাল্পনিক কিন্তু শক্ত ধারণার অজানা ব্যাপারটি দু’জায়গায় রিপিট হয়েছে। প্রথমবার সাঁইত্রিশ পৃষ্ঠায়, দ্বিতীয়বার একান্ন পৃষ্ঠায়। তিরাশি পৃষ্ঠার শুরুতে প্রীতমের স্থলে রূপক নাম এসেছে। প্রীতমকে নিয়ে মুনিয়া তিন দিনের জন্য চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যায়। সেখানে গিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠে যায় সাবলীলভাবে। গলব্লাডারে শেষ পর্যায়ের ক্যান্সার নিয়ে মুনিয়ার এভাবে পাহাড় বেয়ে ওঠাটা অবাস্তব লেগেছে। এমনতর ছোটোখাট কিছু অসামঞ্জস্য থাকলেও পুরো উপন্যাসটা উপভোগ্য। একটানেই পড়া গেছে । লেখকের গল্প বলার ধরন চমৎকার। চেনাজানা চরিত্র ও গল্পকে তিনি উপস্থাপন করেছেন নিজস্ব সৃষ্টিশীলতায়, এটা পাঠককে মুগ্ধ করবেই। কঠিন একটি ক্ষত নিয়ে জীবন যাপন করলেও মুনিয়ার মানবীয় গুণগুলো চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। শেষ পর্যায়ে এসে মুনিয়ার প্রতি প্রীতমের আত্মপলদ্ধিটা জরুরি ছিল, লেখক তা করেছেন। নয়তো উপন্যাসটা অসম্পূর্ণ থেকে যেত। নিজস্ব সৃষ্টিশীলতার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে, লেখক ভবিষ্যতে সাহিত্য জগতে নিজের একটি অবস্থান তৈরি করতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

উপন্যাস – আরও গভীরে
লেখক – রাসেল রায়হান
প্রকাশনী – জ্ঞানকোষ
মলাটমূল্য – ২০০ টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published.