উপন্যাস।। অধ্যাপক কেন মানুষ হতে চায় না।। মনি হায়দার।। ৮ম পর্ব

ট্রেন কমলাপুর স্টেশন থেমেছে।

পিঁপড়ার মতো সারিবদ্ধ হয়ে মানুষ নামছে। ট্রেনের বগি থেকে মানুষ নয়, পিঁপড়া নামছে। অধ্যাপক আলী আসগর পিলপিল করে মানুষের আসা যাওয়া দেখছেন ট্রেনের ছাদে দাঁড়িয়ে। কোথায় যাবে এত মানুষ? অসহ্য! মানুষ হয়ে মানুষকে জবাই করে কাটলেট, ওমলেট বানিয়ে খাওয়ার দিন বুঝি আসছে! তিনি মানুষের আসা যাওয়া দেখছেন আর ভাবছেন- তিনি কোথায় যাবেন? এই যে ট্রেনের পেট থেকে অজস্র মানুষ নামছে, সবারই বাসা আছে, ঘর আছে, আছে আশ্রয়, সুশীতল ছায়া, অথচ, তিনি উদ্বাস্ত একজন মানুষ। তিনি কোথাও নেই। অনিকেত-প্রকৃত অর্থেই সর্বহারা একজন মানুষ তিনি। তাহলে এখন গন্তব্য কোথায় তাঁর? বাসায়? ঐ বাসায় যাবার কোনো প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন না। যাবেন না মাকসুদা বেগমের বাসায়। তার চেয়ে পাখি হয়েই যখন গেছেন, তখন গ্রামে একটু ঘুরেই আসি-ভাবেন তিনি। কিন্তু ঢাকা থেকে পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া থানার বোথলা গ্রামে যাবেন কি করে? পথ হারিয়ে ফেলবেন তিনি। কত নদী সাহর যে পার হতে হবে?

তাহলে কী করা যায়! ভাবতে ভাবতে মাথায় একটা আাইডিয়া আসে অধ্যাপক টুনটুনির। বিকেলে সদরঘাট থেকৈ লঞ্চ ছাড়ে, সেই লঞ্চে চড়ে যেতে পারেন। ছাদে চুপচাপ বসে থাকবেন, কেউ দেখবে না। আইডিয়াটা তাঁর ভালো লাগে। তিনি স্বস্তি অনুভব করেন। এখন বাজে বারোটা। বিকেল পর্যন্ত সময়টা কীভাবে কাটাবেন? আচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাকাটা একবার চক্কর দিয়ে আসি অথবা পুরো ঢাকা শহরটা পাখির ডানায় ভর করে দেখতে পারি- কেমন দেখায় আকাশ থেকে ঢাকা শহর?

তিনি আকাশে ডানা বিস্তার করলেন। উড়তে আরম্ভ করলেন। প্রথমে এসে পৌঁছুলেন রমনা পার্কে। পার্কটা তার খুব ভালো লাগে। অনেকদিন একা একা এই পার্কে তিনি বসে থাকতেন। সবুজ ঘাসের ঘ্রাণ, পত্রালির ছায়া, অজস্র মানুষের আনাগোনা তাঁর খুব ভালো লাগে। একানে মানুষ আসে মিলনের আশায়, স্পর্শের আশায়। তিনি, অধ্যাপক টুনটুনি একটি গাছের ডালে বসলেন চুপচাপ। গাছটাকে তিনি চিনতে পারছেন না। পাখি হলে কি স্মৃতি ভুলে যায়? তিনি জানেন না। কারণ-সমগ্র মানব চরাচরে অথবা মানব সভ্যতায় একমাত্র তিনিই পাখি মানব। পাখি মানব? না মানব পাখি? আগে অবশ্যই মানব। তিনি মানব থেকে পাখি হয়েছেন। তাঁর খুব তৃষ্ণা পেয়েছে সঙ্গে কিছুটা ক্ষুধাও। কিন্তু ক্ষুধা কীভাবে মেটাবেন-বুঝতে পারছেন না। পানি খেলে কি ক্ষুধা মিটবে? অবশ্য তাঁর এখন ইলিশ মাছের ভাজি দিয়ে গরম ভাত খেতে ইচ্ছে করছে। আপন মনে হাসেন তিনি-এখন কীভাবে এসব খাওয়া সম্ভব? যদিও টুনটুনি, ছোট্ট একরত্তি পাখি মাত্র-কিন্তু রসনা বিলাসের সুখ, সম্মোখন সবই আছে জিহবায়, অটুট।

সূর্য কিছুটা হেলে পড়েছে পশ্চিমে। তিনি উড়ে পার্কের মাছখানে বিশাল ঝিলের পারে নামলেন। পানিতে ঠোঁট ডুবিয়ে পানি পান করেলেন। পানি পান করার পর স্বস্তি পাচ্ছেন। খিদেটা পুরোপুরি মরে যায়নি। কি খাবেন তিনি? টুনটুনি পাখি কি খায়? পোকামাকড়? তাহলে জীবন ধারণের জন্য তাকে পোকামাকড় খেতে হবে? অসম্ভব! খেতেই যদি হয়- কীভাবে খাবেন বুঝতে পারছেন না? জানেন না। আচ্ছা-মুশকিলে পড়া গেলঝ। ঘটনাটা এত তাড়াতাড়ি এত আকস্মিকভাবে ঘটল যে কোনো কিছু ভাবার অবকাশ ছিল। চারপাশের বাতাসে নাচের ঘুঙুর চলছে- এরই মধ্যে বর প্রার্থনা  করা- পাখি হওয়া-হিসেবের একেবারে বাইরে। পানি পান শেষে তিনি আবার গাছের ডালে বসলেন। নিচে তাকালেন। দেখলেন একটা ছেলে একটা মেয়েকে বুকের সঙ্গে জাপটে ধরে বসেছে গাছটার সঙ্গে হেলান দিয়ে। অদ্ভুত সুখকর, মধূ মতো দৃশ্য। তিনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ওদের দিকে। এই তো মানুষ, এই তো কাচে আসা। এরই নাম ভালবাসা। দৃশ্যটার প্রতি তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ে যায়-গতরাতে দেখা তাঁর বাড়ির, তাঁর বিছানায়, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সাঈদ হোসেন দেলোয়ারের লুটোপুটির দৃশ্য। কী কুৎসিত কী ভয়ানক ভয়ংকর দৃশ্য-কাউকে বোঝানো যাবে না।

তিনি গাছটার ডাল ত্যাগ করলেন। উড়ে চললেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। উড়তে উড়তে নামলেন অপরাজেয় বাংলার মাথায়, বসলেন মেয়েটার এইড বক্সের উপর। কী আনন্দ। কী আনন্দ!! অপরাজেয় বাংলার চারপাশে জোয়াড় জোয়াড় বসে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। তারা কথা বলছে, হাসছে, খেলছে, জীবনের স্পন্দন ছড়িয়ে আছে সবখানে। অধ্যাপক টুনটুনি পাখির চারপাশটা খুব ভালোলাগে। তিনি উড়ে আবার এসে বসলেন ভিসি’র বাড়ির সামনে। হঠাৎ তাঁর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কয়েক বছর আগে- এই বাড়িতে এক পাষণ্ড ভিসি বাস করত। সে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের উপর রাতের অন্ধকারে পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছিল। সেই ভিসি এতটাই লোভনীয় ছিল যে- সে বঙ্গভবন থেকে ভিসি’র চিঠি নিয়ে এসে রাতের কালো অন্ধকারে চেয়ার দখল করেছিল তার কিঠিু অনুগত ছাত্রনামধারী রাখাল পরিবেষ্ঠিত হয়ে। ছিঃ! প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ! বুক দুমড়ানো মোচড়ানো একটা ব্যাথা তাকে গ্রাস করে। তাঁর খুব রাগ হয়। হঠাৎ ঢাকা শহরটার উপর তীব্র ঘৃণা উছলে ওঠে। তাঁর আর সহ্য হল না- আকাশে ডানা মেলে দিয়ে ভাবছেন- এই শহরে এখন যারা বাস করে দারা আর মানুষ নয়, একপাল মুরগি ভেড়া অথবা নিম্নমানের কালো ছাগল জাতীয় প্রজাতি। কেননা, এই শহরে মানুষেরা একদা প্রতিবাদ করতে জানত, তারা উনসত্তুর সৃষ্টি করেছিল, তারা সাতই মার্চ সৃষ্টি করেছিল, তারা একাত্তর সৃষ্টি করেছিল। এখন সেই তারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। কেবল অবুঝ বাচ্চাদের মতো লেবেনচুষ চোষে আর বলদের মতো সবকিছু দেখে। দেখা ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই।

তোমরা আমাকে আগে জানাওনি কেন? অনেকটা অভিভাবকসুলভ ভারী কন্ঠে প্রশ্ন করে পুত্র আলী আহসান।

তোকে জানিয়ে কি হবে? কি করতি তুই? পাল্টা আঘাত হানেন মাকসুদা বেগম।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আলী আহসান- কি করতাম মানে? বাবাকে খুঁজে বের করতাম। তোমার মতো বাসায় বসে ফেরার অপেক্ষা করতাম নাকি?

বেশ তো, বসে আছিস কেন? এখন যা, খুঁজে নিয়ে আয়।

গতকাল বেলা এগারোটায় একটা মানুষ-আমাদের বাবা, বাসা থেকে চলে গেছে- আর আমি জানতে পারলাম আজ? ড্রয়িংরুমে মা মাকসুদা আর বড় বোন মৌলির সঙ্গে কথা বলছে আর উত্তেজিতভাবে হাঁটছে আলী আহসান।

জেনে তুই করতিসটা কি? মা ও ছেলের মধ্যে ঢুকে পড়ে মৌলি-এখন তো শুনেছিস- যা করার, কর।

চেচিয়ে ওঠে আলী আহসান- যে মানুষটা কাল চলে গেছে, সে এখন কোথায় কতদূরে কীভাবে আছে আমি কেমন করে জানব? কোথায় খুঁজব এই বিশাল ঢাকা শহরে?

আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় খোঁজ নে-

হাসে আহসান-ঢাকা শহরে আমাদের কত আত্মীয়-স্বজন? তাছাড়া বাবা কি কারো বাসায় যায়?

যায় না, ঠিক আছে। কিন্তু এখন রাগ করে তো যেতে পারে- কথা বলে মাকসুদা। মানুষ রাগ করলে অনেক অকল্পনীয় কাজও করতে পারে- বুঝলি?

বুঝলা-আহসান দাঁড়ায় মায়ের মুখোমুখি- মা?

মাকসুদা বেগম মুখ তুলে তাকা- কি?

আসলে তুমি বাবার কাছে কি চাও?

মানে?

না, জন্ম থেকৈ দেখে আসছি বাবাকে তুমি দুই চক্ষে দেখতে পারো না। কারণে অকারণে ঝগড়া করো, বাপ মা তুলে গালি-গালাজ করো, ঘরের আসবাবপত্র ভাঙো-অথচ লোটা তোমাকে কিছু বলে না, মুখ বুঁজে সব অত্যাচার, অনাচার সহ্য করে যায়। কেন তাঁর সঙ্গে এমন করো? তাঁর অপরাধ কোথায়? তিনি তোমার কি অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন? বাবা তো তোমার বাবার বাসায় যায় না। তুমি কি কখনও ভেবে দেখেছো- তোমাদের সংসারে একটাও শিক্ষিত মানুষ নেই- কেবল তুমি ম্যাট্রিক পসা ছাড়া! অথচ বাবা! কত শিক্ষিত, জ্ঞানী মানুষ। হাজার হাজার তাঁর ছাত্র। রাস্তা-ঘাটে কতো মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে! আর ঘরে এসে কি পায়-

মাকসুদা বেগমের শরীরের মধ্যে কেউ তরল আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং সেই আগুন সারা দেহের শিরা-উপশিরায় মিহি স্রোতে ছড়িয়ে পড়ছে। শরীর অতিক্রম করে এই অদৃশ্য তরল আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করছে তার মন, আত্মা এবং অনুভূতিকে। মাকসুদা বেগম অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন তাঁর গর্ভজাত সন্তান আলী আহসানের দিকে। সন্তান আজ তার কন্ঠনালী চেপে ধরেছে। তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মাকসুদা বেগমের। একি অসহ্য অপমান!

কথা না বলে তাকিয়ে আছেঅ কেন? আবার প্রশ্ন করে আলী আহসান। আমাদের বাবা যদি হারিয়ে গিয়ে থাকেন-ইচ্ছে করে, তোমার জন্য। তিনি যদি আত্মহত্যা করে থাকেন সেটাও তোমার জন্য।

আলী? কি বলছিস তুই এসব?

উপহাসের হাসি আলী আহসানের ঠোঁটে- কি বলছি বুঝতে পারছো না? নিজেকে প্রশ্ন করো- উত্তর পেয়ে যাবে।

তুই আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস?

জ্ঞান? জ্ঞান খুব কঠিন সাধনার বিষয়। ওটা অর্জন করতে হয়। দিলেও নেয়া যায় না, যদি গ্রহণ করার ক্ষমতা না থাকে।

তাহলে সময় এবং চাবি এইভাবে পাল্টে যায়? যে ছেলে খুব সরল, অনেকটা বাবার মতো নিরীহ গোবেচারা, কলেজে যায় আর আসে সেই ছেলে কোথা থেকে এত কথা এত শক্তি অর্জন করল? দিনরাত বাসায় থাকে, সামান্য কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে যার মেলামেশা সেই ছেলে আলী আহসান এতটা তীব্র হয়ে উঠল কবে? ছেলের এই প্রতিবাদ মাকসুদার খারাপও লাগছে, আবার ভালোও লাগছে। ছেলে মুখের উপর সরাসরি বলতে পারে; বলতে শিখছে। ভীতু বেড়াল নয়। খারাপ লাগছে ছেলে এই অভ্যুত্থানটা শুরু করল তাকে দিয়েই।

নিজের দিকে তাকান মাকসুদা বেগম। সত্যি সারা জীবন মানুষটাকে নিরীহ পেয়ে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। নিজেকে দাঁড় করান নিজের প্রতিবিম্বের কাছে- তাকে বোঝার চেষ্টা করিনি, তাকে ভালবাসার মায়ার বাধিনি- কেবল অর্থহীন প্রতারণঅ আর প্রবঞ্চনার প্রবঞ্চিত করেছি। এক হু হু হাহাকার তাকে গ্রাস করে আপাদমস্তক নীরবে, নিঃশব্দে।

মা?

আলী আহসানের ডাকে ফিরে আসে ভাবনার জগৎ থেকে মাকসুদা- কি?

আমার মনে হয় বাবার নিখোঁজের ব্যাপার থানায় জানানো দরকার।

কেন? আমূল জমকে ওঠেন মাকসুদা বেগম।

আহসান ঠিকই বলেছে মা, সমর্থন করে মৌলি।

ঠিক আছে তোরা যা ভালো মনে করিস কর- এই প্রথম সংসারের হাল কিছুটা হলেও ছেড়ে দিলেন মাকসুদা বেগম।

আমার সঙ্গে তুমিও যাবে।

আমি? থানায় যাব? চমকে ওঠেন মাকসুদা।

হ্যাঁ, মা। তুমি যাও- সমর্থন করে মৌলি।

কেন?

Series Navigation<< অধ্যাপক কোনো মানুষ হতে চায় না ।। মনি হায়দার ।। ৭ম- পর্বউপন্যাস।। অধ্যাপক কেন মানুষ হতে চায় না ।। মনি হায়দার ।। ৯ম- পর্ব >>

Leave a Reply

Your email address will not be published.