উপন্যাস।। ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব পাঁচ
- উপন্যাস।। ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব এক
- উপন্যাস।। ভালোরাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব দুই
- উপন্যাস।। ভালোরাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব তিন
- উপন্যাস।। ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব চার
- উপন্যাস।। ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব পাঁচ
- উপন্যাস।। ভালবাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব ছয়
- উপন্যান।। ভালবাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব সাত
বেল বাজতে চাকর দরজা খুলে দিল। বেলিখালা কাজের ছেলেমেয়েদের চাকর বা চাকরানি বলে
এখনাে ডাকেন। বেলিখালার মতে দেশ যত সভ্যতার ভান করছে ততই ড্রেনের ভেতরে ডুবে
যাচ্ছে। কাজের ছেলেকে যতই কাজের ছেলে বলি নে কেন সে চাকরই থেকে যাচ্ছে আদতে। বা
কাজের মেয়েকে যতই কাজের মেয়ে বলে ডাকি নে কেন সে চাকরানি বই, এক চুল উপরে নয়।
এখন পর্যন্ত চাকর বা চাকরানিরা আমাদের সাথে বসে খায় না, আমাদের সাথে একবিছানায়
ঘুমোয় না, এমনকী এখন পর্যন্ত আমরা যে সব আসনে বসি সেসব আসনে তারা বসতে পর্যন্ত
পারে। তারা যে বয়সের হােক আমরা তাদের স্কুলে পাঠাই না, নিজের বাড়ি বসে থেকেও তাদের
হাতে হাতখড়ি দিই না। নিজের মেয়ে সেখানে স্কুলে যায় ব্যাগ ঝুলিয়ে সেখানে কাজের মেয়ে
রান্নাঘরে ছেঁড়া জামাপ্যান্ট পরে মশলা পেশে। ভণিতা বেলিখালা ঘৃণা করেন। এই সমাজ
ভণিতার ওপরে চললেও এবং সে সমাজের একজন সভ্য হওয়া সত্ত্বেও বেলিগালা নিজের
জন্যে একটা আলাদা কোড অব এথিকস জোগাড় করে নিয়েছেন। তিনি নিজে কোনাে
রাজনীতি করেন না এবং রাজনীতি বিশ্বাসও করেন না। শুধু তাই না, গরিব দেশের
ডেমােক্রেসিতেও বেলিখলার বিশ্বাস নেই। অবশ্য বেলিখালা কী যে চান, তা নিজেও জানেন না।
ফারজানা দুপুরে ঘুমান। কিন্তু বেলিখালা আগে থেকে ফোন করে দিয়েছিলেন বলে জেগে
আছেন। বেলিখালাকে দেখে কাজের মেয়ে এসে লম্বা গেলাসে লেবুর সরবত এনে টেবিলে রাখল।
সরবতের গেলাসে চুমুক দিতে ফারজানা বললেন, দুপুরে ভাত খাবেন? চুমুক দেয়া থামিয়ে চোখ
বড় করলেন বেলিখালা। মাথা নাড়িয়ে বললেন, আমি দুপুরে ভাত খাই নে তুই জানিস না? তবে
স্যান্ডউইচ খাবো দিতে পারিস। তুই ভাত খেয়েছিস? উত্তরে ফারজানা হেসে বললেন, না, আমি
স্যুপ খেয়েছি একটা প্যাকেটের। আর শশা। তুমি শশা খাবে? খাবাে। শশা দিয়ে স্যান্ডউইচ করে
দিতে বল্। আচ্ছা। বলে ফারজানা উঠে গিয়ে বাবুর্চিকে বলে এলেন। ফারজানা জিজ্ঞেস
করলেন, তােমার ছেলের খবর কী? বেলিখালাকে ছেলের কথা কেউ জিজ্ঞেস করলে খুব
খুশি হন। এই একটিই সন্তান বেলিখালার। বেলিখালা বললেন, লিটন খুব ভাল করছে
পরীক্ষায়। এবার ডি লিস্টে নাম তুলেছে। আমাদের কাছে ওর ইউনিভারসিটি থেকে ডিনের চিঠি
এসেছে। বাঃ খুব ভাল তাে। মাশাল্লা একখানা ছেলে হয়েছে বটে তােমার। ফারজানা উচ্ছ্বসিত
প্রশংসা করে উঠল। ফারজানার নিজের ছেলে এবার বিএ অনার্স পড়ে। ছেলেটি অসম্ভব বাবা
মায়ের ভক্ত। আর খুব বাইরের বই পড়ে। তার নিজের একটা ছােট খাটো লাইব্রেরি আছে।
এই বয়সেই চোখে মােটা মাইনাস পাওয়ারের চশমা। পাশ করে বড় কোনাে এনজিওতে চাকরি
করবে বলে এখন থেকেই প্রস্তুত হচ্ছে। ফারজানার মেয়েটি মেডিকেলে পড়ে। স্বামী বিদেশী
ফার্মে ভাল চাকরি করেন। সুখের সংসার ফারজানার। বেলিখালার চোখে ফারজানার সংসারের
শুধু একটিই দোষ। তা হল একগাদা কাজের লােক রাখে সংসারে। ফারজানার সমস্ত এনার্জি নষ্ট
হয় এইসব কাজের মানুষদের ডিসিপ্লিন করার কাজে। ফারজানার একটা আছে যুক্তি এ ব্যাপারে।
তা হলো যে, তিনি লেখাপড়া শিখেও চাকরি বাকরি করেন না, বাইরে যান না, সােস্যাল ওয়ার্ক
করেন না, সংসার ছাড়া তার অন্য কোনাে অকুপেশন নেই, অথচ তিনি মানুষজন ভালবাসেন।
মানুষের উপকারে লাগতে চান এই মনােভাব কিছুটা তার ছেলের ভেতরেও এসেছে। কাজের
মানুষ রাখলে একটা গরিব পরিবারের সাহায্য হয়। তারা গ্রামে টাকা পাঠায়। ফারজানা তার
বাড়ির সবচেয়ে ছােট কাজের ছেলেটাকে পাড়ার স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। সে এখন সব বাংলা
অক্ষর চেনে। মাকে বাংলায় চিঠি লেখার চেষ্টা করে। স্যান্ডউইচ আর চা একসাথে এল। এ বাড়ির
বাবুর্চি জানে বেলিখালা যে কোনাে খাবারের সাথে চা খান। এটা তার অভ্যাস। স্যান্ডউইচ শেষ
করে চায়ে চুমুক দিয়ে চারদিকে তাকিয়ে বেলিখালা বললেন, তাের এই বসার ঘর গোপন কথা
বলার জন্যে কতখানি নিরাপদ? বেলিখালার সাথে সাথে ফারজানাও তার বসার ঘরের চারদিকে
তাকালেন। মস্তবড় একটা রুম। চারপাশে কাচের দরজা, জানালা। ঘরে এসি রাখার জন্যে
চারপাশ বন্ধ থাকলেও ততটা নিরাপদ নয়, বিশেষ করে যে বাড়িতে অসংখ্য চাকরবাকর।
ফারজানা উঠে দাড়িয়ে বললেন, চল আমরা শােবার ঘরে যাই। দুজনে শোবার ঘরে এলেন।
ছেলেমেয়ে দু’জনেই বাড়ির বাইরে। স্বামী কর্মস্থলে। বেলিখালা শােবার ঘরে রাখা একমাত্র
সােফাটায় গা এলিয়ে বসলেন। জানালার পর্দা টেনে ফারজানা ঘরের এসি চালিয়ে দিলেন।
বেলিখালা চুপ করে অনেকক্ষণ ধরে চা খেলেন। তারপর কাপটা টিপয়ের ওপর নামিয়ে রেখে
বললেন, ভারী একটা ঝামেলায় পড়ে গিয়েছি, ফারজানা। কী রকম? তাের মনে আছে, তাের
এখান থেকে মাস আটেক আগে ফিরােজা বলে কাজের একটা মেয়েকে নিয়ে গেলাম? বাঃ,
মনে থাকবে না কেন? এই তাে সেদিনের কথা। সেই মেয়েটি, তাের মনে আছে, দেখতে
কীরকম কুৎসিত ছিল? আর তুই বলেছিলি কুৎসিত কাজের মেয়ে বাড়িতে রাখা সেই।
চাকর বাকরদের চোখে কম পড়বে। বলেছিলাম না কি? হি – হি। ফারজানা হাসলেন।
হ্যা, বলেছিলি। আর যেটা বলিস নি, সেটা আমি মনে মনে বলেছিলাম, তা হলাে, শুধু বাসার
চাকর নয়, অন্যদেরও চোখে কম পড়বে। তাই? বলেছিলি নাকি মনে মনে? এবার আর
ফারজানা হাসলেন না। তার গলার স্বরে এক ধরনের উদ্বিগ্নতা বরং ধরা পড়ল। বেলিখালা
গম্ভীর হয়ে বললেন, এই মেয়েটি শুধু যে কুৎসিত তাই না, এর স্বভাব চরিত্রও কুৎসিত।
খারাপ অর্থে বলছি না। তার ব্যবহারের কথা চিন্তা করে বলছি। সে হাসে না, বেশি। বলা
বলে না, নিজের মেজাজ মঞ্জি নিয়ে চলে। ইচ্ছে হলে অনেক কাজ করে, ইচ্ছে না হলে
কিছুই করে না। আবার প্রায় কখনােই এক ডাকে কথার জবাব দেয় না। দু’তিন ডাকে
জবাব দিলেও ভ্রুকুঁচকে রাখে। একে বড় বড় মাছ তাকারি খেতে দিলেও কোনােরকম
কৃতজ্ঞতা না দেখিয়েই গবগ করে খায়। চুরিটুরি অবশ্য করে না। মানে এখনাে সেসব কিছু
ধরা পড়ে নি। আর এজন্যেই হাজার অসুবিধা হওয়া সত্ত্বেও আমার বােনঝি আর বােনঝির
জামাই তাকে সহ্য করে চলছিল। আমার বােনঝি জামাই হাসানকে তুই চোখে দেখিস নি।
বাইরে থেকে যতটুকু ভাল দেখা যায় আমার ধারণা সে তার চেয়েও ভাল। সে ভদ্র, নম্র ও
মার্জিত। বিয়ের আগে আমার বােনঝির ক্লাসফ্রেন্ড ছিল। তবু সালমা তাকে অত্যন্ত সমীহ
করে চলে। হাসানও সালমাকে। আমার দেখে মনে হত বিবাহিত জীবনে হাসান সুখী ও
গর্বিত একজন স্বামী। কথাগুলাে বলে বেলিখালা থামলেন। ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবলেন।
তারপর মুখ তুলে বললেন, কিন্তু তুই তাে জানিস। আমার আর তাের এই বয়সে কত ভাল
ভাল মানুষকে নর্দমায় গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কত পরহেজগার মানুষের রাতের মশারির
নিচে কত বিশ্বস্ত কাজের মেয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে। সুতরাং বাইরের দিক থেকে মানুষকে,
মানে পুরুষ মানুষকে আমরা কতটুকু চিনি? আমার এক চাচাকে ছেলেবেলায় দেখেছি পাড়ায়
পাড়ায় চাঁদা তুলে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করতে। রাতে শােবার সময় একটি কাজের মেয়ে তার পা
টিপে দিত। আর চাচা নাক ডেকে ঘুমােতেন। একদিন তার নাক ডাকা বন্ধ হল, যেদিন সেই
কাজের মেয়ের পেট ধামার মত বড় হয়ে উঠল। শেষে সেই কাজের মেয়েকে বাড়ির একজন
অধস্তন কর্মচারীর সঙ্গে কলঙ্কে জড়িয়ে বাড়ি থেকে পিটিয়ে বের করা হল। কথা বলতে গিয়ে
মুখ নিচু হয়ে এল বেলিখালার। নিজের বংশের এই কালিমালিপ্ত কাহিনী বলতে গিয়ে হয়ত হঠাৎ
লজ্জা এসে গেল মনে। ফারজানা শুকনাে গলায় বললেন, এসব কথা থাক। এখন কী সমস্যা
হয়েছে আমাকে খুলে বল্। বেলিখালা মুখ তুলে ফারজানার দিকে তাকালেন। ফারজানা তার
ছেলেবেলার বন্ধু। এক সংগে স্কুল কলেজ – এ গেছেন। ফারজানার অনেক গােপন কথার সাক্ষী
বেলিখালা। যেমন বেলিখালার ফারজানা। এই বন্ধুটিকে বেলিখালা বিশ্বাস করতে পারেন।
বেলিখালা বললেন, সালমা আর হাসানের ভেতরে এখন সাংঘাতিক মনােমালিন্য যাচ্ছে। কেন?
এমন সাংঘাতিক মনােমালিন্য যে প্রমাণ হলে সালমা হাসানকে পরিত্যাগ করে চলে আসবে।
সে-কী? তাহলে আর বলছি কী! এত কষ্ট করে আমি এই দুপুরবেলা ছুটে এসেছি কেন বুঝতে
পারছিস নে? ফারজানা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। বেলিখালা বললেন, ফিরু মেয়েটার
অতীত জানা ভীষণ জরুরিরে। মেয়েটা এর আগে কার বাসায় কাজ করেছে? সে বাসায় কে কে
ছিল? এর আগের বাসাগুলােতে কোনাে ঝামেলা করেছে কী না। বা তাকে নিয়ে কোনাে ঝামেলা
হয়েছে কী না। তাকে কি আগের বাসাগুলাে থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে নাকি সে ইচ্ছে করেই
চাকরি ছেড়ে দিয়েছে? তার কি মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস আছে? তাকে কি কেউ শারীরিকভাবে
অপমান করেছে? তাকে কি কেউ যৌন হয়রানি করেছে? এগুলাে জানা দরকার। খুব দরকার।
কীসের জন্যে? ফারজানার গলার স্বর থেকে অবাক হওয়া তখনাে কমে নি। কারণ মেয়েটাকে
আমরা আর রাখবাে না। তাকে আমরা ছেড়ে দিতে চাই, পারলে এই মুহর্তে। সম্ভব হলে তাকে
গায়ে পাঠিয়ে দিতে চাই। কিন্তু এখন এমন অবস্থা যে তাকে ছাড়া যাবে না। তুলকালাম কাণ্ড
হয়ে যাবে। সেই ধুরন্ধর ফুপুটা চলে আসবে। সালিশ বসাবে সে গ্রামে। চাইকী সেখানকার
চেয়ারম্যান কাগজে নিজের বেনেভােলেন্ট নাম তােলার জলে ব্যাপারটাতে জড়িয়ে পড়তে
পারে। পুলিশও ঢুকে পড়তে পারে এই সুযােগে। সর্বনাশ হয়ে যাবে। বলিস কীরে বেলি? হ্যাঁ।
মেয়েটা তােকে বলি অত্যন্ত এ্যারােগেন্ট। সর্বক্ষণই ওকে নিয়ে ওদের সমস্যা হচ্ছিল। কিন্তু ঐ
যা হয়, সবসময়ই ভাবে একে ছেড়ে দিতে হবে, কিন্তু ছাড়া আর হয় না। অন্তত আমাকেও যদি
বলত তাে আমি একটা ব্যবস্থা করতাম। কাজের লােকের প্রতি এই নির্ভরশীল মনােভাব, এটাকে
আমাদের সমাজের একটা ব্যাধি বলতে পারিস। অবশ্য তাের কথা আলাদা। তােকে বাদ রেখে
বলছি। তাের বাড়ির কাজের লােকেরা হচ্ছে নিজের হাতে গড়ে তােলা এক ধরনের এনজিও।
আমি অনেক বাড়ির মহিলাদের চিনি, বাড়িতে কাজের মানুষ না থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
রাতে ঘুম হয় না, মুখে রুচি থাকে না, কেঁদে কেটে অস্থির হয়। বিশেষ করে পুরনাে কাজের
লােক চলে গেলে তাে কথাই নেই। পুরনাে কাজের লােক যে বাড়ির মানুষের মত দাবি রাখতে
পারে একথা ভুলে যায়। বেলিখালা একটু থেমে ফারজানার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমাকে
আরাে এক কাপ চা দিতে বল। আবার এক কাপ চা এল। এবার চা নিয়ে এল ফুটফুটে দশ
বছরের এক কাজের মেয়ে। তার মাথার দুপাশে বিনুনি করা। চোখে কাজল। এর মা
ফারজানার বাসায় কাজ করে বহুদিন। বেলিখালা তার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে একটু
হেসে সখ করে তার গাল টিপে দিলেন। তারপর মেয়েটি চলে যেতে টিস্যু পেপারে হাতটা মুছে
নিলেন। কাণ্ড দেখে ফারজানা বললেন, ও পরিষ্কার। ওর মা ওকে সাবান দিয়ে রােজ গােসল
করায়। বেলিখালা বললেন, তা জানি। এটা একটা অভ্যাস। চলে যেতে সময় লাগবে। তারপর
শােন কী হলাে, একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে সালমা দেখে ফিরু সংসারের কাজ একটাও
করে না বাথরুম থেকে বেরিয়ে ফিরুকে নাস্তা দিতে বলল। নাস্তা মানে চা আর একটা জ্যাম
টোস্ট। কিন্তু দেখে ফিরু সবেমাত্র কেতলি চুলােয় দিয়েছে চায়ের পানি গরম করার জন্যে।
পাউরুটি টোস্ট হয় নি, দুপুরের লাঞ্চ এর রুটি ভাজি ডিম হয় নি, কিছু হয় নি। দেখে আমার
বােনঝির হয়ে গেল রাগ। আপিসে কাজের চাপ ছিল। দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছিল, সব
মিলিয়ে সে মাথা ঠিক রাখতে পারল না। বসিয়ে দিল নি। গালে এক চড়। সেদিন সালমার
তাড়াহুড়া। তারপর না খেয়েই বাসা থেকে বেরিয়ে গেল সালমা । ফিরােজ অবশ্য বেশ ভােরেই
বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। একজনের সাথে পূর্বাণীতে ব্রেকফাস্ট করার কথা ছিল তার।
বাড়িতে যে এত কাণ্ড হল জানত না সে। সালমা বাসা থেকে বেরিয়ে যাবার সময় দরজা বাইরে
থেকে তালাবন্ধ করে রেখে গেল। বাসায় একবার চুরি হবার পর থেকে বাধ্য হয়ে এই ব্যবস্থা
করতে হয়েছিল। অনেক বাসাতেই আজকাল কাজের মেয়ে বা ছেলেমেয়েদের বাইরে থেকে
তালাবন্ধ করে রেখে যায়। এই ব্যবস্থা ভাল কী মন্দ বলতে পারব না। এটা সােসিওলজিস্টদের
কাজ। তবে কাজের মেয়ে চুরি না করলেও অল্প বয়সী মেয়ে পাশের বাসার চাকরের সাথে
মিলমহব্বত ষড়যন্ত্র খুন খারাপি সবই করতে পারে। যা হােক, সালমা না খেয়ে, আফিসে
নাস্তা না নিয়ে, বাইরে থেকে ফিরুকে তালাবন্ধ করে রেখে যাবার একটু পরেই ফিরু আমার
বাসায় ফোন করল। বলিস কী? হ্যা, তারপর শােন। আমি তখন বাসায় ছিলাম। তবে বাইরে
বেরােবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কর্তাসাহেব সরকারি কাজে ব্যাংকক গিয়েছিলেন। এমন সময়
ফোন। প্রথমে তাে গলাই চিনতে পারি নে। কে বলছে, কোথা থেকে বলছে, কী বলছে, কী চাই।
তারপর আস্তে আস্তে বুঝলাম ফিরু বলছে। ওর নাম যে ফিরােজা, ডাক নাম যে ফিরু, আমিই
তা ভুলে গিয়েছিলাম। আমি বিস্ময় সামলে উঠে বললাম, কী রে ফিরু, তুই ফোন করছিস যে?
তাের বেগম সাহেব কোথায়? উত্তরে ফিরু বলল, তেনারা সব কাম করতে গেছে গা। আমি
এখুন আপনার লগে কথা কইতে চাই। শুনে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী কথা কইতে চাস?
আগে বল তুই আমার টেলিফোন নম্বর জানলি ক্যামনে? সে বলল, আমি বাংলা নম্বর পড়তে
পারি। ফোন বই – এ বাংলা নম্বর লিইখ্যা রাখছে আফায়। আমি এটু এটু বাংলা পড়তে পারি।
গ্রামের ইসকুলে কেলাশ থ্রি পড়ছি। আমি আপনারে কইতে চাই, আমি আর এ বাসায় কাম
করুম না। আপনে আমারে আনছিলেন, আপনে আমারে আবার ফুপুর কাছে ফিরাইয়া দ্যান।
আমি তাে তার কথা শুনে থ। টেলিফোন বই – এ নম্বর খুঁজে দেখে আমাকে ফোন করেছে এ
তাে সহজ মেয়ে না। আমি মনে মনে একটু ঘাবড়ে গেলাম। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে।
জিজ্ঞেস করলাম, কেন, কী হয়েছে? হঠাৎ করে থাকতে চাস নে কেন? আমার কথার উত্তরে
ফিরু বলল, ভাইয়া গত পরশু রাইতের বেলা আমার গা হাতাইছে। আমার কামিজ খুইল্যা
আমার গা হাতাইছে। আর বলছে, একথা কাউরে কইলে সে আমারে মাইরা ফালাইবে।