উপন্যাস।। ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব চার

সত্যি বলতে কী ঠিক দুটো দিন পরেই ফারজানার টেলিফোন। কাজের মেয়েটি তার বাসায় এসে বসে আছে। সঙ্গে আছে তার ফুপু। নদীর ওপার থেকে ফুপু এসেছে মেয়েকে কাজের জায়গায় রেখে যেতে।

তখন ঠিক বেলা দশটা। গাড়ি ও ড্রাইভার নিয়ে বেলিখালা বেরিয়ে গেলেন। পল্লবি থেকে লালবাগে যেতে লাগল প্রায় একঘণ্টা। এতক্ষণ লাগার কারণ হল সেই সাত সকালেই কীসের মিছিল মানিক মিয়া এভিনিউ-এর কাছে জড়ো হয়েছে। এদিক ওদিক থেকে ঘুরেটুরে যখন ফারজানার বাড়ির কাছে পৌছলেন তখন ঘড়িতে ঠিক এগারােটা। মাঝপথে একবার মনে হয়েছিল বটে যে ঘুরে বাড়ি ফিরে যাবেন। দুপুরে আবার বেরােবেন। কিন্তু ঐ যা হয়। ভাবতে ভাবতে চলে এলেন আজিমপুর। তারপর আর কতটুকুই বা রাস্তা।

ফারজানার বাড়িতে ঢুকে মেয়েটিকে দেখলেন বেলিখালা। চৌদ্দ পনেরাে বছরের এক কিশােরী। দু’এক বছর এদিক ওদিক হতে পারে। তেলহীন রুক্ষ চুল, উচু উঁচু দাত, চোখগুলাে ভীষণ বড় বড়, প্রায় লাট্টুর মত বলা যায়। খুঁজলে শরীরের এখানে ওখানে খুঁজলি পাচড়াও দেখতে পাওয়া বিচিত্র নয়। মেয়েটির কুৎসিত চেহারা ও মুখের কাঠিন্য ধাক্কা দিল বেলিখালাকে। অল্পক্ষণের জন্য। মেয়ের চেয়ে বরং মেয়ের ফুপুকে বেশি সুন্দর মনে হল বেলিখালার। মেয়ের বদলে ফুপুকে কাজে নিতে পারলে কেমন হয়? প্রস্তাবটা ফুপুকে দিতে ফুপু সজোরে ঘাড় নাড়াল। ফুপুর বয়স চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হবে। জীবনে বাসা বাড়িতে কাজ করে নি। পছন্দও করে না। মানুষের বাসায় চেয়েচিন্তে কোনােরকমে দিন চালায়। তার নিজস্ব একটা চালাঘর আছে দেশে। একজনের জমির ওপরে সেটা। সেখানে সে থাকে। বেলিখালা তখন বাধ্য হয়ে নজর দিলেন কিশােরীর দিকে। তােমার নাম কী মেয়ে? মেয়েটি বড় বড় চোখে বেলিখালার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, ফিরু। মেয়েটার ফুপু সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ওর নাম ফিরােজা। ও আচ্ছা, এই বলে বেলিখালা ফিরােজার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তােমার বয়স কত? এই প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটা ফুপুর মুখের দিকে তাকাল। চোখে রাগ। যেন বয়স জিজ্ঞেস করাটা পছন্দ হয় নি। ফুপু বলল, বয়স আর কত! এই দশ এগারাে হবে। বেলিখালার চোখে ফুপুটাকে ভারি ধুরন্ধর প্রকৃতির মহিলা বলে মনে হল। মেয়ের বয়স দশ এগারাের চেয়ে বেশি। চোখেই দেখা যাচ্ছে। ভারি দুটো বুক অথচ দিব্যি মহিলা মিথ্যে বলে যাচ্ছে। চ্যালেঞ্জ করলে বলবে, আমরা মুখ্য সুস্থ মানুষ। আমরা কি অতােসততা বুঝি? বেলিখালা ফিরােজার দিকে তাকিয়ে বললেন, এর আগে কোনাে বাসাবাড়িতে কাজ করেছ? উত্তরে ফিরােজা বলল, কত-তাে। ফুপু সঙ্গে সঙ্গে বলল, বেশি না। এখন তাে অনেক দিন আমার কাছে আছিল। কাম আপনেরা শিখাইয়া লইবেন জালি বাচ্চা । বড়লােকগের মাইয়া এই বয়সে ইসকুলে যায়। ফুপুটাকে বেশ ডেঞ্জারাস মনে হলাে বেলিখালার। এইসব মহিলারা বড় হুনারি হয়। নিজেরা কাজ করে না বটে, কিন্তু এদিকে কথায় একেবারে বিদ্বানের একশেষ। ফারজানা গােপনে বললেন, পাশের বাসার মিতুর মা বলল মেয়েটা নাকি কাজ কামে ভাল। বেশি কথাটথা বলে না। সেটা একদিকে ভাল। আর চেহারা যা দেখছিস তাতে বাসার চাকর বাকরদেরও নজরে কম পড়বে। ঝামেলা কম হবে। বেলিখালা চিন্তা করে দেখলেন ফারজানার কথাই ঠিক। তাছাড়া আজকাল বিশ্বস্ত কাজের মানুষ পাওয়া বড় কঠিন। বেলিখালা মেয়েটার ফুপুর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি মেয়ের সাথে যাবে? ফুপু মাথা নাড়িয়ে বলল, না। আমি আপনের হাতে সােপর্দ কইরা দিলাম। আপনি অরে দেখবেন। আর এই আপার বাসা তাে চিইন্যা গেলাম। আর মিতু খালার আমারে তাে চিনিই। মিতু হলাে ফারজানার পাশের বাড়ির ভাড়াটে মহিলার মেয়ে। বেলিখালা সেদিনই সন্ধ্যার পর পৌছে দিলেন ফিরােজাকে। যাবার আগে দেড়শাে টাকা। দিয়ে নতুন একটা সালােয়ার কামিজ কিনে দিলেন। নইলে যে জামা পরে এসেছিল তাতে। বাড়ির ভেতরে রাখা যায় না। হেঁড়া ও দুর্গন্ধ। ফিরােজার চেহারা দেখে থমকে গেল সালমাও। এত রুক্ষ চেহারার মেয়ে সে এর আগে চোখে দেখে নি। সবচেয়ে বড় কথা হলাে এর বয়স বােঝা যায় না। রােগা হিলহিলে শরীরে বুকের গড়ন বেশ বাড়ন্ত। বারাে তেরাে বছরের মেয়ের এত বাড়ন্ত বুক এর আগে চোখে দেখে নি সালমা। তবু মন্দের ভাল। কিছুদিনের জন্যে থাক রয়ে গেল ফিরােজা। এইভাবে আটমাস। এই আট মাসে ফিরােজা দু’চারদিন ছাড়া ভাল ব্যবহার প্রায় করেনি বললেই চলে। কিন্তু মন দিয়ে কাজ করলে সে ইউনিক তাতে সন্দেহ নেই। আলু কুটে যখন ভাজির জন্যে চাপায় তার হাতের কাজ দেখে সালমা মনে মনে অবাক হয়ে যায়। মুরগি ছিলতে পারে কী অনায়াস দক্ষতায়। এমনকি কেক করতে গেলে কী কী মেশাতে হয়, কীসে কতটুকু উপাদান লাগে, একচামচ না সিকি চামচ সব ওর মুখস্ত। এই ট্রেনিং তাে একদিনে হয় নি। বহু বাসাবাড়ির জল আবহাওয়া এই ট্রেনিং-এর পেছনে কাজ করেছে। আরাে কত কিছু কাজ করেছে কে জানে। ওকে দেখে এইসব ভাবতে ভাবতেই কোনদিন আটমাস কেটে গেল সালমা যেন টেরই পেল না।

Series Navigation<< উপন্যাস।। ভালোরাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব তিনউপন্যাস।। ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব পাঁচ >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *