উপন্যাস।। ভালোরাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব তিন

বিগত বছর খানেক ধরে বেলিখালার কাজ হচ্ছে সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ানাে। চুল কাটার দোকান থেকে কাওরান বাজারে পাইকারি দরে তরকারি কেনার জন্যে ঢুঁ মারা ইত্যাদি কাজে বেলিখালা প্রায় সর্বক্ষণ তৎপর। অষ্টআশির বন্যায় বন্যার্তদের জন্যে রুটি বেলে বেলিখালা এমন নাম করেছিলেন যে খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় তার নাম উঠেছিল। এখন অবশ্য বিএনপি’র আমল। বেলিখালার বিএনপি’র সাথেও খুব ভাব। যুবদলের বর্তমান নেতা তার ভাইপাে’র বন্ধু। পাড়ায় পাড়ায় মেয়েদের হাতের কাজ শেখানাের একটা প্রােজেক্ট শুরু করেছেন বেলিখালা। এই অজুহাতে সাধারণ মানুষের সাথে বেলিখালার বেশ হৃদ্যতা হচ্ছে। বেলিখালার বয়স পঁয়তাল্লিশের দিকে। দেখলে আরাে কম লাগে। মাথার চুল ছােট করে ছাঁটা। চেহারা স্লিম। হাতে, গলায়, কানে সােনার গহনা পরেন না, সর্বদাই ইমিটেশন, তবু তাতেই তাকে সুন্দর লাগে বেশ। তার ছেলেটি আমেরিকায় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেছে। স্বামী সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সেই সুবাদে বিদেশ ভ্রমণের প্রচুর সুযােগ আছে। ছােট্ট ছিমছাম একটা বাড়ির মালিক বেলিখালা নিজে। আর্থিক বা মানসিক নিরাপত্তা আছে বলে বা যে কোনাে কারণেই হােক বেলিখালা জীবন সম্পর্কে খুব আশাবাদী। সহজে ঘাবড়ে যান না কোনাে কিছুতে। এই বেলিখালা তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের জন্য একটি অ্যাসেট। কারাে বাড়িতে হঠাৎ চিকেনপক্স দেখা দিয়েছে, নিমপাতা দরকার, ফোন করাে বেলিখালাকে। কারাে বাড়ির ছােট মেয়ে পাড়ার বখাটে ছেলের প্রেমে পড়ে গেছে , এখন ঘর ছাড়ে তাে তখন ঘর ছাড়ে অবস্থা, ফোন করাে বেলিখালাকে। ঢাকা শহরের কোনাে বড় ডাক্তারকে রােগী দেখাতে হবে, সিরিয়াল পাওয়া যাচ্ছে না, ফোন করো বেলিখালাকে। বাসার কাজের লােক হঠাৎ কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে, গৃহিণীর নাভিশ্বাস, তাে ফোন করাে বেলিখালাকে। বেলিখালার ভেতরে একটা পরােপকারী মন আছে। আর সেই সাথে আছে মানুষের কাছে নিজকে অপরিহার্য করে তােলার তাগিদ। বেলিখালার কাছে দুপুরগুলাে খুব কাজের। দুপুরে বেলিখালা কখনােই ঘুমােন না। সে সময় তিনি টইটই করতে বেরােন। শব্দটা একটু রূঢ় মনে হলাে বটে, তবু এক্ষেত্রে টইটই-ই সবচেয়ে লাগসই শব্দ। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, এক দোকান থেকে আরেক দোকান, এক অফিস থেকে আরেক অফিস, এক পাড়া থেকে আরেক পাড়া একটি মাত্র দুপুরেই বেলিগালা রাউন্ড দিয়ে সারতে পারেন। ঘুরতে কোনাে ক্লান্তি নেই বেলিখলার। মানুষের বাড়ির ব্যাপারে বেলিখালার অভিজ্ঞতা এই যে সব বাড়ির গৃহিণীরা দুপুরে ঘুমােয়। কেউ কেউ টানা ঘুম দেয় দুপুর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত।

কোনো কোনাে বাড়ির গৃহিণীদের সাথে সাথে বাসার চাকর বাকরেরাও ঘুমোয়। যে বাড়ির গৃহিণীরা এবং চাকরেরা ঘুমােয় সে বাড়িগুলাে সযত্নে বেলিখালা পরিহার করেন। যদি কখনাে সে বাড়িতে যেতে হয় আদৌ, তাহলে তিনি আগে ভাগে ফোন করে সময় চেয়ে রাখেন। সারাদিনের ভেতরে ঠিক দুপুর বেলাটা বেলিখালার ঘুরতে কেন এত পছন্দ, তার কোনাে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। বেলিখালার গাড়ির ভেতরে এসি লাগানাে আছে। গাড়িতে বসলেই ড্রাইভার এসি ছেড়ে দেয়। ছােকরা মত একজন ড্রাইভার পেয়েছেন বেলিখালা। সে সর্বক্ষণ গাড়ি চালায় তার। এর জন্যে উপরিও পায় মাঝে মাঝে। সে কথা বলে কম। বিনীত এবং চেহারায় ছােটখাট। চেহারায় ছােটখাট ড্রাইভার পাওয়া গেলেও আজকাল বিনীত ড্রাইভার প্রায় আর দেখাই যায় না। দেশটা একটা পপ সভ্যতার ভেতর দিয়ে চলছে বেলিখালা জানেন। তবু ড্রাইভার ভেতরে বিনয় না থাকলে গাড়িতে বসে থাকা প্রায় অসম্ভব। আবার ড্রাইভারের চেহারা দশাশই হলেও গাড়ির ভেতরে বসে থাকা বেলিখালার জন্যে অসম্ভব। তাতে করে গাড়ির আরােহীর ব্যক্তিত্ব কমে যায় বলে বেলিখালার ধারণা। রাস্তায় আজকাল প্রায়ই স্মরণাতীত কালের যানজট। তাতে করে বাইরে ব্যয়িত সময়ের প্রায় অর্ধেকটা কেটে যায় গাড়ির ভেতর। বেলিখালু অর্থাৎ বেলিখালার স্বামী অফিসে চলে যাবার পর সর্বক্ষণই গাড়ি বেলিখালার হেফাজতে। বেলিখালুর অবশ্য নিজের অফিসের গাড়ি আছে। এমনিতে বাড়ির গাড়িতে বেলিখালু প্রায় চড়েনই না। শুধু কালে ভদ্রে। তবু বেলিখালা তার স্বামী অফিস না যাওয়া পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে বেরােন না। তার এথিকস্- এ বাধে। এই যে বেলিখালার এত স্বাধীনতা ও স্বচ্ছন্দ চলাফেরা, চাকরি না করেও টাকাপয়সার হাত টান না হওয়া এ সবই বেলিখালুর উদারতার জন্যেই তাে। ঢাকা শহরের দুপুরগুলাে বেলিখালার পছন্দ। নিজে থাকে পল্লবীতে। ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে সর্টকাট করে চলে আসেন মহাখালি, বনানী- বা পুরনাে এয়ারপাের্ট, সেখানে কিছু ঘুরেটুরে চলে যান শহরের আরাে ইনটিরিয়রে। অনেক ধরনের কাজ বেলিখালার। তারওপর মহিলা সমিতির মেম্বার তিনি। প্রায় মিটিং-টিটিং, সমাবেশ থাকে। লেখালেখির দিকেও বেলিখালার একটু ঝোঁক আছে। মেয়েদের পাতায় মাঝে মাঝে ত্বকের যত্ন সম্পর্কে তিনি লেখে। মেহেদি পাতার গুণ, করিরাজি চিকিৎসা, চুলের যত্ন, ভাপা পিঠা তৈরির কায়দা কানুন এসব সম্পর্কে লেখেন তিনি। রান্নাবান্নার দিকেও বেলিখালার প্রচুর উৎসাহ। তবে বর্তমানে ভাল একটা বাবুর্চি পাওয়ার পর থেকে বেশি রান্নাটান্না আর করেন না। তাছাড়া বয়সও হচ্ছে তাে। ভর্তা,ডাল আর ভাজি । সামান্য মাছ হলে তাে কথাই নেই। বেলিখালা নিজেও স্ট্রিক্ট ডায়েট কনট্রোল করেন। সেজন্যে এই বয়সেও তার ব্লাড প্রেসার নেই, হার্টের অ্যানজাইনা নেই, কিডনি একেবারে বাচ্চা ছেলের চোখের মত পরিষ্কার। দুপুরবেলাটা বেলিখালার ভীষণ পছন্দ। বেলিখালার ধারণা দুপুর বেলায় গনগনে রােদের ভেতরে ঢাকা শহরে পরীরা নেমে আসে। তার গাড়ির কালাে কাচের ভেতর দিয়ে বেলিখালা তাকিয়ে সেই পরীদের দেখেন। তার গাড়ির ভেতরটা তখন ভীষণ ঠাণ্ডা লাগে, চোখে নেমে আসে ঝিমুনি, বাইরের মানুষগুলােকে মনে হয় দূরের চলন্ত কিছু, কোলাহল কানে আসে না, গালাগালি, মুখ খিস্তি, রােদ সব কোথায় মিলিয়ে যায়। ঘর্মাক্ত মানুষের মুখগুলাে সরে গিয়ে শাদা জোব্বা পরা ফেরেশতারা যেন নেমে আসে রাস্তায়।আর পরীগুলাে প্যারাট্রুপারসদের মত মাথায় ছাতার ঝালর ঝুলিয়ে দুলতে দুলতে নেমে আসে আকাশ থেকে। তাদের গায়ের খুশবু বেলিখালার নাকে এসে লাগে। ঝুনঝুন, ঝুনঝুন করে শব্দ ওঠে।এই দৃশ্যটুকু চোখে দেখার জন্যে বেলিখালার জীবন সার্থক হয়ে যায়। দুপুর বেলাটা বাড়ি ছেড়ে বেরােনাে তাই বেলিখালার জন্যে ভীষণ অর্থবহ। আজ দুপুরবেলাটা একটা বিশেষ কাজে ব্যবহার করার জন্যে বেলিখালা বেরিয়েছেন। বেরিয়েছেন তার বান্ধবীর সাথে দেখা করে এক রহস্যের জট খােলার জন্যে। এই বান্ধবীটি তার প্রতিবেশীর মায়ের কাছ থেকে কাজের মেয়ে ফিরােজাকে জোগাড় করে দিয়েছিল। সে ছ’মাস আগের কথা। সালমার বাসার প্রথম কাজের মেয়েটা হঠাৎ চুরি করে পালালাে। ভাগ্যিস বিয়ের গয়নাগাঁটি রাখা ছিল ব্যাংকের লকারে। তা না হলে ফতুর হয়ে যেত তারা। থানায় ডায়েরি করেও সে বেটির খোঁজ খবর আর পাওয়া গেল না। উঠে পড়ে লাগলে অবশ্য খুঁজে বার করা যেত। কিন্তু তাতে লাভ কী? এত দৌড়াদৌড়ি, পুলিশের কাছে বারবার যাওয়া, তাদের ঘুষ দিয়ে খুঁজতে উৎসাহিত করা এসবের দিকে সময় ব্যয় করার মত সময় বা মানসিকতা সালমা বা হাসানের কারাে নেই। কিন্তু এদিকে তাদের সংসার চলে না। দু’জনে সকালে উঠে কাজে বেরিয়ে যায়। ফেরে সেই সন্ধ্যেবেলা। টেলিফোন বাজলেও ধরার লােক নেই। ঘরমােছা, কাপড় কাচার লােক নেই। কাপড় কাচার লন্ড্রি এত দূরে যে একমাত্র শাড়ি আর হাসানের শার্ট ট্রাউজার ছাড়া কোনােকিছু সেখানে দেয়া পােষায় না। খুঁটিনাটি কাপড়ের জন্যে লন্ড্রি পােষায় না। মাসে দু’বারের বেশি লন্ড্রিতে যাওয়াও পােষায় না বাসার কাজের মেয়েদের কোনােদিন তারা। দোকানে পাঠায় না। সুতরাং বাজারঘাটও নিজেদের করতে হয়। সালমা অবস্থা বুঝে বেলিখালাকে ফোন করল। বেলিখালা সেদিন আবার বেলিখালুর সাথে সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন। মাত্র পাঁচ দিনের জন্য। বেলিখালা বললেন, এই ক’দিন কষ্ট করে কাজ চালিয়ে নে। আমি ফিরে এসেই তাের ব্যবস্থা করব। ফিরে এসে বেলিখালা ফোন করলেন বিভিন্ন জায়গায়। তার কয়েকটা সাের্স আছে কাজের মেয়ে পাবার। কারণ যেখানে সেখানে বা রাস্তা থেকে কাজের মেয়ে ধরে নিয়ে এলেই তাে হলাে না। তারা চুরি চামারি করে নিয়ে পালাবে। সালমার আগের কাজের মেয়েটা ঐরকম একটা কুয়াশাচ্ছন্ন পরিচিতি নিয়ে কাজে ঢুকেছিল। পরে যা অবস্থা হলাে তা তাে চোখেই দেখা গেল। কয়েকটা জায়গায় ফোন করার পর তার বান্ধবী ফারজানার কাছে সংবাদ পাওয়া গেল। ফারজানা বললেন, আমার পাশের বাসায় এক মহিলা আছেন। নতুন ভাড়া নিয়েছেন বাসা। তিনি সেদিন বলছিলেন তার মায়ের কাছে একটা কিশােরী মেয়ে আছে। কোনাে ভাল বা ভদ্র ফ্যামিলি পেলে সেখানে কাজে দিতে চান। তুই যখন বলছিস আমি খােঁজ নিয়ে দেখতে পারি। আমার বাসায় বর্তমানে তিনটে কাজের মেয়ে, তা না হলে আমিই রেখে দিতাম। বেলিগালা একথা শােনার সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন। ভাল বা দ্র ফ্যামিলিতে যখন কাজের মেয়ে দেবার আগে খোঁজ খবর করে তখন বুঝতে হবে মেয়েটা ভাল ঘর থেকে এসেছে। বর্তমানে তাে গার্মেন্টস এর জন্যে ভাল কাজের মেয়ে পাওয়াই যায় না। বেলিগালা আর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে সালমার অফিসে ফোন করে দিলেন। বললেন, একটা ভাল কাজের মেয়ে পেয়েছি। দুটো দিন সবুর কর।

সত্যি বলতে কী ঠিক দুটো দিন পরেই ফারজানার টেলিফোন। কাজের মেয়েটি তার বাসায়। এসে বসে আছে। সঙ্গে আছে তার ফুপু। নদীর ওপার থেকে ফুপু এসেছে মেয়েকে কাজের জায়গায় রেখে যেতে। তখন ঠিক বেলা দশটা। গাড়ি ও ড্রাইভার নিয়ে বেশিখাল বেরিয়ে গেলেন। পবি থেকে লালবাগে যেতে লাগল প্রায় একঘন্টা। এতক্ষণ লাগার কারণ হল সেই সাত সকালেই কীসের মিছিল মানিক মিয়া এভিনিউ – এর কাছে জড়ো হয়েছে। এদিক ওদিক থেকে ঘুরেটুরে। যখন ফারজানার বাড়ির কাছে পৌঁছলেন তখন ঘড়িতে ঠিক এগারােটা। মাঝপথে একবার মনে হয়েছিল বটে যে ঘুরে বাড়ি ফিরে যাবেন। দুপুরে আবার বেরােবেন। কিন্তু ঐ যা হয়। ভাবতে ভাবতে চলে এলেন আজিমপুর। তারপর আর কতটুকুই বা রাস্তা। ফারজানার বাড়িতে ঢুকে মেয়েটিকে দেখলেন বেলিথালা। চৌদ্দ পনেরাে বছরের এক কিশােরী। দু’এক বছর এদিক ওদিক হতে পারে। তেলহীন রুক্ষ চুল, উচু উচু দাত, চোখগুলাে ভীষণ বড় বড়, প্রায় লাটুর মত বলা যায়। খুঁজলে শরীরের এখানে ওখানে খুঁজলি পাচড়াও দেখতে পাওয়া বিচিত্র নয়। মেয়েটির কুৎসিত চেহারা ও খের কাঠিন্য ধাক্কা দিল বেলিখালাকে। অল্পক্ষণের জন্য। মেয়ের চেয়ে বরং মেয়ের ফুপুকে বেশি সুন্দর মনে হল বেলিখালার। মেয়ের বদলে ফুপুকে কাজে নিতে পারলে কেমন হয়? প্রস্তাবটা ফুপুকে দিতে ফুপু সজোরে ঘাড় নাড়াল। ফুপুর বয়স চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হবে। জীবনে বাসা বাড়িতে কাজ করে নি। পছন্দও করে না। মানুষের বাসায় চেয়েচিন্তে কোনােরকমে দিন চালায়। তার নিজস্ব একটা চালাঘর আছে দেশে। একজনের জমির ওপরে সেটা। সেখানে সে থাকে। বেলিখালা তখন বাধ্য হয়ে নজর দিলেন কিশােরীর দিকে। তােমার নাম কী মেয়ে? মেয়েটি বড় বড় চোখে বেলিখালার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, ফিরু। মেয়েটার ফুপু সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ওর নাম ফিরােজা। ও আচ্ছা , এই বলে বেলিখালা ফিরােজার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তােমার বয়স কত? এই প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটা ফুপুর মুখের দিকে তাকাল চোখে রাগ। যেন বয়স জিজ্ঞেস করাটা পছন্দ হয় নি । ফুপু বলল , বয়স আর কত ! এই দশ এগারাে হবে। বেলিখালার চোখে ফুপুটাকে ভারি ধুরন্ধর প্রকৃতির মহিলা বলে মনে হল। মেয়ের বয়স দশ এগারাের চেয়ে বেশি। চোখেই দেখা যাচ্ছে। ভারি দুটো বুক। অথচ দিব্যি মহিলা মিথ্যে বলে যাচ্ছে। চ্যালেঞ্জ করলে বলবে, আমরা মুখ্য সুখ মানুষ। আমরা কি অতােসতে বুঝি? বেলিখালা ফিরােজার দিকে তাকিয়ে বললেন, এর আগে কোনাে বাসাবাড়িতে কাজ করেছ? উত্তরে ফিরােজা বলল, ক – ত – তাে। ফুপু সঙ্গে সঙ্গে বলল, বেশি না। এখন তাে অনেক দিন আমার কাছে আছিল। কাম আপনেরা শিখাইয়া লইবেন। ‘জালি বাচ্চা। বড়লােকগের মাইয়া এই বয়সে ইসকুলে যায়। ফুপুটাকে বেশ ডেঞ্জারাস মনে হলাে বেলিথালার। এইসান মহিলারা বড় হুনানি হয়।

নিজেরা কাজ করে না বটে, কিন্তু এদিকে কথায় একেবারে বিদ্বানের একশেষ। ফারজানা গােপনে বললেন, পাশের বাসার মিতুর মা বলল মেয়েটা নাকি কাজ কামে ভাল। বেশি কথাটথা বলে না। সেটা একদিকে ভাল। আর চেহারা যা দেখছিস তাতে বাসার চাকর বাকরদেরও নজরে কম পড়বে। ঝামেলা কম হবে। বেলিখালা চিন্তা করে দেখলেন ফারজানার কথাই ঠিক। তাছাড়া আজকাল বিশ্বস্ত কাজের মানুষ পাওয়া বড় কঠিন। বেলিখালা মেয়েটার ফুপুর দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কি মেয়ের সাথে যাবে? ফুপু মাথা নাড়িয়ে বলল, না। আমি আপনের হাতে সােপর্দ কইরা দিলাম। আপনি অরে দেখবেন। আর এই আপার বাসা তাে চিইন্যা গেলাম। আর মিতু খালার আম্মারে তাে চিনিই। মিতু হলাে ফারজানার পাশের বাড়ির ভাড়াটে মহিলার মেয়ে। বেলিখালা সেদিনই সন্ধ্যার পর পৌঁছে দিলেন ফিরােজাকে। যাবার আগে দেড়শাে টাকা দিয়ে নতুন একটা সালােয়ার কামিজ কিনে দিলেন। নইলে যে জামা পরে এসেছিল তাতে বাড়ির ভেতরে রাখা যায় না। ছেঁড়া ও দুর্গন্ধ। ফিরােজার চেহারা দেখে থমকে গেল সালমাও। এত রুক্ষ চেহারার মেয়ে সে এর আগে চোখে দেখে নি। সবচেয়ে বড় কথা হলাে এর বয়স বােঝা যায় না। রােগা হিলহিলে শরীরে বুকের গড়ন বেশ বাড়ন্ত। বারাে তেরাে বছরের মেয়ের এত বাড়ন্ত বুক এর আগে চোখে দেখে নি সালমা। তবু মন্দের ভাল। কিছুদিনের জন্যে থাক। রয়ে গেল ফিরােজা। এইভাবে আটমাস। এই আট মাসে ফিরােজা দু’চারদিন ছাড়া ভাল ব্যবহার প্রায় করেনি বললেই চলে। কিন্তু মন দিয়ে কাজ করলে সে ইউনিক তাতে সন্দেহ নেই। আলু কুটে যখন ভাজির জন্যে চাপায় তার হাতের কাজ দেখে সালমা মনে মনে অবাক হয়ে যায়। মুরগি ছিলতে পারে কী অনায়াস দক্ষতায়। এমনকি কেক করতে গেলে কী কী মেশাতে হয়, কীসে কতটুকু উপাদান লাগে, একচামচ না সিকি চামচ সব ওর মুখস্ত। এই ট্রেনিং তাে একদিনে হয় নি। বহু বাসাবাড়ির জল আবহাওয়া এই ট্রেনিং – এর পেছনে কাজ করেছে। আরাে কত কিছু কাজ করেছে কে জানে! ওকে দেখে এইসব ভাবতে ভাবতেই কোনদিন আটমাস কেটে গেল সালমা যেন টেরই পেল না।

Series Navigation<< উপন্যাস।। ভালোরাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব দুইউপন্যাস।। ভালোবাসার লাল পিঁপড়ে।। আনোয়ারা সৈয়দ হক।। পর্ব চার >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *