জয় বাংলা শিশুসাহিত্য উৎসব।। একটি লাল রেডিও ও রাইফেল।। মনিরা মিতা

গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে আছে চারদিক। হ্যারিকেনের তেল প্রায় শেষ তাই আলোটাও টিমটিম করে জ্বলছে। লাল রঙের ছোট ওয়ান ব্র্যান্ডের রেডিওটা পিনপিন করে চলছে। এম.আর. মুকুলের চরমপত্র পাঠ মন দিয়ে শুনছি নিধুবাবু। পাশে বসে আছে তার স্ত্রী শুক্লা, ছেলে অজিত আর অলোক। কারো মুখে কোন কথা নেই।
অনুষ্ঠান শেষ হলে ১২ বছরের অজিত খুব উত্তেজিত হয়ে ওঠে। মুখ টিপে হাত উঁচু করে বলে ‘জয় বাংলা’।
চাপা গলায় বাবাকে বলে ‘বাপু আমি যুদ্ধে যাবো’।
ছেলের কথা শুনে বাবা ওর মুখ চেপে ধরে। ‘বাপু বলিস না। আব্বাজান বল। মনে রাখিস আমরা এখন মুসলমান’।
বাবার কথা শুনে চোয়াল শক্ত হয়ে যায় অজিতের। ওদের মুখটা লাল হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি জানোয়ারগুলোর উপর রেগে ফেটে পড়ে অজিত। কত সুন্দর সংসার ছিল ওদের! ওর বাবা পুলিশের চাকরি করেন। মা আদর্শ গৃহিনী। ওরা দুই ভাই স্কুলে পড়ে। বাবা মায়ের আদরে চমৎকার দিন কাটছিল ওদের। এমন সময় পাকিস্তানী দানবগুলো এ দেশের ওপর হামলে পড়ে। ওর বাবা পুলিশ ক্যাম্প থেকে জীবন নিয়ে কোনো মতে পালিয়ে আসে। তবে আসার সময় নিজের রাইফেলটা সাথে নিয়ে আসে।
ওদিকে অজিতদের এলাকায় পাকিস্তানিরা ঢুকে পড়েছে। হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। হিন্দু কাউকে সামনে পেলেই মেরে ফেলছে। নিধুবাবু এসব দেখে ভয় পেয়ে যায়। কোথায় যাবে কি করবে বুঝতে পারে না। এমন সময় তার পুরনো বন্ধুর কথা মনে পড়ে। যশোর জেলার ঝিকরগাছা গ্রামে থাকে তার সেই বন্ধু। দুই বন্ধু দুই ধর্মের ও দুই জেলার মানুষ হলেও উনাদের ভেতর গভীর বন্ধুত্ব। সুতরাং নিধুবাবু সিদ্ধান্ত নেয় বন্ধুর বাড়ি চলে যাবার।
কিন্তু পথের মধ্যে যদি হানাদারগুলো ধরে ফেলে! হিন্দু জানলে সাথে সাথে ফায়ার করবে। সুতরাং নিধুবাবু হয়ে গেল ‘গোলাম মাওলা’। স্ত্রী শুক্লা হয়ে গেল শিউলি। অজিত হল আনোয়ার আর অলোক হলো আকবর। নিধুবাবুর মুখভর্তি দাড়ি, হাতে তসবি, গায়ে জুব্বা আর মুখে কালেমা। স্ত্রীর সিঁথির সিঁদুর নিজ হাতে মুছতে গিয়ে গা কেঁপে উঠলেও নিরুপায় তিনি। বোরখার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল শুক্লা দেবী।
অনেক চড়াই-উতরাই পাড় হয়ে অবশেষে বন্ধুর বাড়িতে এসে উঠলো নিধুবাবু। রহমত আলী বন্ধুকে এ অবস্থা দেখে প্রথমে চমকে উঠলো। পরে ভাবলো ওরা মুসলমান সেজে থাকলে দু’পরিবারের জন্যই ভালো হবে। যদিও রহমত আলী এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। তাছাড়া সে মসজিদ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সুতরাং তার বাড়ি পাক বাহিনীর অত্যাচার হতে নিরাপদ।
মাঝেমাঝে নিধুবাবু নিজের রাইফেল হাতে নিয়ে কি যেন ভাবেন। তখন তাকে উদাস দেখায়। অজিত বাপুর গা ঘেষে বসে বায়না ধরে অস্ত্র চালানো শিখতে। ছেলের জেদের কাছে হেরে গিয়ে ছেলেকে অস্ত্র চালানো শেখায় তিনি। ওদিকে ছোট ছেলে মায়ের কাছে বায়না ধরে বাংলাদেশের পতাকার। মা সেলাই করে বানিয়ে দেয় লাল সবুজের পতাকা। আট বছরের অলোক সারাদিন পতাকাটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রাখে। মাঝেমধ্যে বুকের সাথে লেপ্টে রাখে।
রহমত আলীর বাড়ির ঠিক পেছনে মুসা মিয়ার বাড়ি। লোকটা হাড় বজ্জাত। তাড়ি বানায়। ক’দিন হলো পাকিস্তানি শয়তানগুলো মুসার বাড়ি তাড়ি খেতে আসে। সন্ধ্যার পর তাই নিধুবাবু আশঙ্কায় থাকে।
প্রতি সন্ধ্যার মতো আজও নিধুবাবু ওর পুরো পরিবার নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনছিল। হঠাৎ রেডিওটা ঘ্যারঘ্যার শব্দ শুরু করলে নিধুবাবু ঠিক করতে যায়। অমনি রেডিওতে জোরে বেজে ওঠে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটা। কয়েক মুহূর্তের ভেতর নিধুবাবু রেডিও বন্ধ করে দিলেও আতঙ্কে তার চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। কারণ একটু আগে মুসা মিয়ার বাড়ি তিনজন পাকসেনাকে সে যেতে দেখেছে। নিধুবাবুর বুকটা ধক্ ধক্ করে ওঠে। একটু পরে বাইরে বুটের আওয়াজ শুনে নিধুবাবুর নিশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম। এমন সময় বাহির থেকে চিৎকার ভেসে এলো ‘এ ঘরমে মুক্তি হেয়। শালা মুক্তিকা বাচ্চা বাহিরমে আ।
নিরুপায় নিধুবাবু হাতে তজবি নিয়ে আস্তে আস্তে দরজা খুলে বের হয়ে আসে।
‘হামলোক মুক্তি নেহি স্যার। ঘরমে দো বাচ্চা হে। ভুল করকে জয় বাংলা চ্যানেল চালু করতা হে। মাপ করকে দেন সাব।’
কিন্তু পাকিস্তানি শয়তানগুলো কথাগুলো বিশ্বাস করতে চায় না। একের পর এক সাওয়াল করতে থাকে।
উপায় না পেয়ে নিধুবাবু কুত্তাগুলোর পা জড়িয়ে ধরে।
ওদিকে ঘরের ভেতর থেকে সব দেখে অজিত। বাপুর অপমানে ওর মাথায় রক্ত উঠে যায়। হঠাৎ করে লুকিয়ে রাখা রাইফেলের দিকে চোখ যায় ওর। মুহুর্তে হাতে তুলে নেয় রাইফেল। কেউ কিছু বোঝার আগেই দরজা খুলে বাইরে আসে। ঠা,,,ঠা,,,ঠা গুলি চালায়। তিন শয়তানই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
হঠাৎ এমন ঘটনার সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল। নিধুবাবু থপ করে মাটিতে বসে পড়লো। শুধু অজিত হাত উঁচু করে গলা ছেড়ে বলল ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’। আর অলোক তার পকেট থেকে লাল-সবুজের পতাকা বের করে মেলে ধরল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.