নিভৃতিকে আত্মস্থ করতে পারাটাই আগামি সাহিত্যের জন্য মঙ্গলজনক : সাজ্জাদ সাঈফ

সাজ্জাদ সাঈফ। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, অনুবাদক ও মনোরোগ চিকিৎসক। তিনি রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী ১৯৮৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য এবং রংতুলির সঙ্গে সঙ্খতা গড়ে ওঠে তার। তিনি রম্য পত্রিকা ‘নিহারীকা’ সম্পাদনা করেন ২০০২ সালে। এছাড়া ২০০৭ সালে ‘ঈক্ষণ’ সম্পাদনা করেন। ক্ষেপচুরিয়াস ওয়েবম্যাগের সহ-সম্পাদকও ছিলেন তিনি।

সাজ্জাদ সাঈফের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা’ প্রকাশ পায় ২০১৭ সালে। ২০১৯ সালে কাব্যগ্রন্থ ‘মায়ার মলাট’ ও কাব্যগ্রন্থ ‘ভাষার সি-বিচে’ প্রকাশ পায়। এবং ২০২০ সালে কাব্যগ্রন্থ ‘বহুদিন ব্যাকফুটে এসে’ ও ২০২১ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমপত্রের মেঘ’।
সম্পাদনা- নিহারীকা(রম্য পত্রিকা, ২০০২), ঈক্ষণ(২০০৭), ক্ষেপচুরিয়াস ওয়েবম্যাগ(সহ-সম্পাদনা, ২০১১)

তিনি প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা’র জন্য বঙ্গভূমি বর্ষসেরা কবি(২০১৯) অর্জন করেন। সাহিত্য চর্চার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন ওয়েবম্যাগ কাব্যশীলনের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছে জুবায়ের দুখু।

কাব্যশীলন : কবিতা লেখার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হলো কেমন করে? এবং কবে কখন থেকে?

সাজ্জাদ সাঈফ : প্রথম শুরুটা আউটবুক পড়া দিয়ে। বাবার বইয়ের একটা ছোট্ট কালেকশন শৈশবে হস্তগত হবার পর থেকে আউটবুক পড়বার নেশা চাপে। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে বই কেনা শুরু। আর কমিকসের ছবি অনুকরণ করে ছবি আঁকা। ক্লাস ফাইভে পড়তেই সহপাঠীদের লেখা জোগাড় করে আম্মার অফিস হতে টাইপ করিয়ে এনে শিশুতোষ পত্রিকা করেছিলাম আর তা সারা স্কুলে খুব প্রশংসিত হয়। এভাবেই লেখার আনন্দ পেয়ে বসেছিলো। সে সময় কাজিনদের নিয়ে বিছানাকে স্টেজ বানিয়ে মঞ্চ নাটক করতাম খেলাচ্ছলে আর সে সব নাটকের স্ক্রিপ্টও আমিই লিখে দিতাম। এভাবেই লেখালেখি আর সময়বিশেষে কবিতা লেখার শুরু।

কাব্যশীলন : আপনার পাঠপ্রতিক্রিয়াতে এই সময়ের কবিতার আলোচনা করতে গেলে আপনি কোন কোন কবিকে আলোচনায় মুখ্য হিসেবে রাখবেন?

সাজ্জাদ সাঈফ : এটা খুবই রিস্কি প্রশ্ন। তবুও একটা আইডিয়া দিতে বললে যেমন তুমি লিখছো, কবির হোসেন লিখছে, মোহাম্মদ জসিম, অনুপম মণ্ডল, হোসাইন মাইকেল, সালেহীন শিপ্রা, তানজিন তামান্না, শুভ্র সরকার, আবু তাহের ছাড়াও আরো অনেকের নাম আসবে যারা আগামীর বাংলা কবিতায় রাজ করবে।

কাব্যশীলন : আপনার সময়টাকে কবিতায় কেমন ভাবে দেখছেন? মানে সমাজতন্ত্র, ধর্ম, রাজনীতি, প্রকৃতি, প্রেম, রোমাঞ্চকর, অশ্লীলতা, কবিতায় কেমন প্রভাব ফেলছে?

সাজ্জাদ সাঈফ : এসব কিছুই শিল্পের উপজীব্য হিসেবে অনাদিকাল হতে কবিতারও প্রভাবক হয়ে আসছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সমকালকে কবিতার জন্য উপযুক্ত সময়কাল ভাবি। অন্যেরা অন্যভাবে ভাবতেই পারে।

কাব্যশীলন : অনেক সময় দেখি পুরস্কার নিয়ে নানা কথা প্রচলিত হয় বা আছে, আমাদের সাহিত্য সমাজে। আপনি এইসব বিভিন্ন সাহিত্য পুরস্কারকে কোন নজরে দেখেন?

সাজ্জাদ সাঈফ : সাহিত্যপুরস্কার তো বিগত কয়েক দশক যাবৎ বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধই। মাছের বাজার বা তেলের বাজারের মতই এখানেও সিণ্ডিকেট সক্রিয় আর তা চালায় সাহিত্য মাফিয়ারা যারা মূলত সাহিত্যের নামে আধিপত্যবাদী আর এলিটিজমের গোঁড়ামিতে আক্রান্ত। এসবের ভিড়েও একশ জনে এক দুইজন উপযুক্ত লেখককে পুরস্কার দিয়ে এরা কালো টাকা সাদা করবার মত তাদের সিণ্ডিকেটকে বৈধ করে থাকে। এইসব সিণ্ডিকেট যতদিন থাকবে ততদিন সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্যের প্রকৃত মূল্যায়নে অক্ষম।

কাব্যশীলন : বর্তমান সময়ে কবি আল মাহমুদকে সাহিত্যের নানান বিষয় থেকে সম্পৃক্তা করে কেউ কেউ। আসলে সাহিত্যে দলাদলি বিষয়টি কতটুকু জরুরী?

সাজ্জাদ সাঈফ : আল মাহমুদ কিংবদন্তি। কিন্তু তিনি নিজেই দলবদ্ধ হয়ে সাহিত্যের রাজনীতি করে গেছেন শেষ জীবনে যেটা খুব জরুরি ছিলো না তার সাহিত্যের জন্য।

কাব্যশীলন : অগ্রজদের যে অনুজদের প্রতি একটা দায়িত্ব আছে এটা নিয়ে আপনার মন্তব্য কি?

সাজ্জাদ সাঈফ : সিণ্ডিকেটের বলির পাঠা বানিয়ে অনুজদেরকেও আধিপত্য বাদী করে নিজেদের মার্কেট তরতাজা রাখার প্রবণতার যুগে অগ্রজদের দায়িত্ববোধ নিয়ে আমি সন্দিহান। বরঞ্চ অনুজেরা যারা নিজ দায়িত্বে এইসব সাহিত্য রাজনীতির বাইরে এসে শিল্পের সাধনা করে যাচ্ছে তার জন্য অগ্রজদের গঠনমূলক কোনো অবদানই নেই। যে অগ্রজগণ রাইট ওয়েতে আছেন তারা এতটাই নিভৃতচারী যে অনুজরাও তাদের এই নিভৃতিকে আত্মস্থ করতে পারাটাই আগামী সাহিত্যের জন্য মঙ্গলজনক।

কাব্যশীলন : আপনিতো দীর্ঘদিন ধরেই কবিতা লিখছেন। একটা কবিতা ভালো লিখতে গেলে অনেকের লেখাই পাঠ করেছেন। আসলে বলতে চাইছি একটি সার্থক কবিতা লেখার জন্য কি কি বৈশিষ্ট্য থাকা উচিৎ বলে মনে করেন?

সাজ্জাদ সাঈফ : অনেকদিন ধরেই লিখলেও নিজের কোনো লেখাকেই সার্থক বলবার দুঃসাহস এখনো আমার হয়নি। হ্যাঁ সার্থক কবিতার বহুমুখী কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে যার মধ্যে মূল হচ্ছে নতুন উপস্থাপনা। সমাজ রাষ্ট্র পরিবেশ সব মিলিয়ে অপরিহার্য সমস্ত অনুভূতির জন্যই সকলের কিছু কমন দৃষ্টিভঙ্গি থাকে কিন্তু সবার উপস্থাপনা একই হলে তো আর নতুনত্ব থাকে না, পুরনো বিষয়ের নব নব উপস্থাপনার যোগ্যতাও সার্থকতা।

কাব্যশীলন : ‘কবি নেবে যিশুর যন্ত্রণা’ বইটি প্রকাশের পর পাঠক কেমন ভাবে নিয়েছিল?

সাজ্জাদ সাঈফ : বইটি আমাকে অসাধারণ ফিডব্যাক দিয়েছিলো। অগ্রজ-অনুজ সতীর্থ ছাড়াও সাধারণ পাঠকমহল বইটিকে সাদরে গ্রহণ করেছেন, করছেন এখনো।

কাব্যশীলন : সাহিত্যে দশকের অংকটা আপনি কীভাবে দেখছেন? মানে কবিদের কি দশকে আবদ্ধ করা উচিৎ?

সাজ্জাদ সাঈফ : দশক যখন প্রথা হয়ে গেছে তখন এই প্রথায় সাহিত্যের মত দশকভুক্ত লেখকেরাও পণ্য ছাড়া কিছুই নয় যা সাহিত্যের ক্রমবিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে ফেলছে প্রায়ই।

কাব্যশীলন : প্রথম বই প্রকাশ নিয়ে কেমন উৎসাহিত ছিলেন? কবে প্রথম বই প্রকাশ হয়?

সাজ্জাদ সাঈফ : ২০০০ সালে জাতীয় পর্যায়ে ক্ষীণ পরিচিত দিয়ে শুরু হলেও আমার প্রথম বইটি করতে ২০১৭ সাল অব্দি সময় নিয়েছিলাম আমি। এক ধরনের উন্মাদনা তো ছিলোই তার চেয়ে বেশি ছিলো খুঁতখুঁতে ভাব।

কাব্যশীলন : আমাদের তরুণরা কবিতায় কেমন নতুনত্ব আনছে বলে মনে করেন?

সাজ্জাদ সাঈফ : আমাদের বেশ কিছু তরুণই উপস্থাপনা-টেক্সট-বাক্যশৈলির দিক থেকে প্রচুর নিরীক্ষাধর্মী কাজ করে যাচ্ছেন। এর ভিতরকার নতুনত্ব উজ্জ্বল হয়ে ধরা দেবে আরো কিছুকাল পর৷ তবে এটি বলতে পারি বাংলা কবিতায় ত্রিশ বা চল্লিশ বা পঞ্চাশ ষাট দশকের চেয়ে বহুমাত্রিক নিরীক্ষা এখন দৃশ্যমান।

কাব্যশীলন : আপনি দৈনিক সাহিত্য সাময়িকীগুলোতে লেখেন না কেন?

সাজ্জাদ সাঈফ : ২০১৭ অব্দি দৈনিকে অনুরোধপূর্বক কিছু লিখেছি এবং তারপর ঘোষণা দিয়েই সমস্ত দৈনিক হতে সরে এসেছিলাম। লিটলম্যাগাজিনই শিল্পচর্চার উপযুক্ত জায়গা। এখানে খ্যাতি বা সুপারিশের রমরমা নেই।

কাব্যশীলন : কী নিয়ে এখন ব্যস্ত আছেন? কবিতার ছাড়া অন্য কিছু কী লিখেছেন? উপন্যাস, গল্প, কিংবা ছোটদের নিয়ে?

সাজ্জাদ সাঈফ : কবিতা নিয়েই আছি। এছাড়া কিছু অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছি।

কাব্যশীলন : ফেসবুক কিংবা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে যে সাহিত্য প্রকাশ হচ্ছে তা আপনি কেমন নজরে দেখবেন বা দেখছেন?

সাজ্জাদ সাঈফ : প্রকাশের সব মাধ্যমেরই ভালোমন্দ আছে। যেভাবেই প্রকাশিত হোক না কেন কবিতা যেন শিল্প হয়ে ওঠে।

কাব্যশীলন : ডাক্তার না কবি কোনটায় নিজের পরিচিতি দিতে ভালো লাগে?

সাজ্জাদ সাঈফ : কবিতা লেখার জন্য ডাক্তারমহলে আমাকে বিব্রত হতে হয়। তবে দুই পরিচয়ই অর্জন করতে হয়েছে শ্রমসাপেক্ষে। দুটিতেই আমার নিজস্বতা রেখে যেতে চাই।

কাব্যশীল : এ মেলায় আপনার নতুন কোনো বই প্রকাশ হয়নি আগামী মেলায় নতুন কোনো কাজ কি প্রকাশ পাবে?

সাজ্জাদ সাঈফ : আগামী বইমেলার আগে একটা ট্রিলজি কাব্যগ্রন্থ আনার ব্যপারে প্রকাশক মহলে কথা হয়ে আছে। বাকিটা সময়ের হাতে।
ধন্যবাদ কবি জুবায়ের দুখু।

Leave a Reply

Your email address will not be published.