জয় বাংলা শিশুসাহিত্য উৎসব।। যুদ্ধশিশু ময়না ।। শাম্মী তুলতুল

ময়না নামের এক যুদ্ধ শিশু। সে  জানেনা  কী তার  পরিচয়, কে তার বাবা- মা। যুদ্ধের সময় অনেকে পরিবার হারা হয়ে  যায়। অনাথ হয়ে যায়। ময়না তাদের মধ্যে একজন। ভিবিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে এমন অনাথ শিশু ও নির্যাতিত মহিলাদের ঠাই হয়। একদিন ময়না চিৎকার করে কাঁদছিল। ময়নাকে কান্না করতে দেখে এডওর্য়াড নামক বিদেশী এক নাগরিকের খুব মায়া হয়। তিনি সব জানতে পেরে ময়নাকে পালক নেওয়ার  সিদ্ধান্ত নেন। তিনি  ওই আশ্রয়কেন্দ্রে চাকুরী করেন। তিনি ময়নাকে কোলে বসিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করেন। তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। একদিন  এডওয়ার্ড  আশ্রয়কেন্দ্রের  চাকরী ছেড়ে দেন। সব ফর্মালিটি  পালন করে ময়নাকে নিয়ে পাড়ি দেন তার দেশ সুদূর নেদারল্যান্ডে। এরপর  থেকে ময়না  জানতো তিনিই তার বাবা-মা। সবকিছু। তিনি ময়নাকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলেন। ময়নার যখন ৩২ বছর তখন ওই দেশের একটি কোম্পানিতে বড় কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পায়। একদিন এডওয়ার্ড কঠিন রোগে শয্যাশায়ী হন। ভাবলেন ময়নাকে সব বলে দেওয়া দরকার। তিনি তাই করলেন। বিস্তারিত খুলে বললেন ময়নাকে। সে বাঙ্গালী মায়ের গর্ভের সন্তান। একজন বাংলাদেশী এবং এও বললেন, বাংলাদেশের একটি পাখির নাম ময়না,তার নামেই তাকে তিনি এ নামটি দিয়েছেন। ময়না এবার বুঝতে পারল সে একজন যুদ্ধশিশু। সব শুনে ময়না কান্নায় ভেঙে পরে। সে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলো বাংলাদেশ যাবে। দেশকে দেখবে, নিজ মাকে দেখবে। অদম্য ইচ্ছে নিয়ে সে দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো। দেশের মাটিতে পা রেখে সোজা ছুটে গেলো সেই মতিলাল আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু দুঃখের বিষয় মতিলাল বহুবছর আগেই গত হয়েছেন। ময়না তার মাকে অনেক খোঁজাখোজি করলো, কিন্তু নাহ পেলো না। নিরাশ হয়ে গেলো। এক নজর মাকে দেখার তার কত আকুলতা, ব্যাকুলতা।

ময়না বাংলাদশেী গাইডের সাহায্যে পুরো বাংলাদেশ ট্যুর করার সিদ্ধান্ত নিলো। প্রথমে জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করলো। এরপর  গেলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে।

ময়না গেলো  রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে। সেখানকার ইতিহাস শুনে  চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না। কিভাবে নরপিশাচগুলো নিরীহ মানুষগুলোকে মেরে হাত পা বেঁধে এখানে ফেলে রেখেছিলো। গাইড থেকে আরও জানতে পায় আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। শেখ মুজিবের নাম শুনতেই  তার মনে পড়ে যায়, দ্যা ফাঁদার অফ দি নেশন শেখ মুজিবর রহমানের কথা। বিদেশী চ্যানেলগুলোতে বাংলাদেশের ভিবিন্ন দিবসে এই নাম বহুবার শুনেছে সে।

ময়না টুঙ্গিপাড়ায় যায় বঙ্গবন্ধুর কবরে শ্রদ্ধা্ জানতে। সেখানে যাবার সময় গাইডের থেকে জানতে পারে মুক্তিযুদ্ধের  ইতিহাস।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হত্যা করে লক্ষ্য লক্ষ মানুষকে। যুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার হন অসংখ্য মা-বোন। জন্ম নেয় অসংখ্য যুদ্ধ শিশু। ময়না তাদের মতোই একজন।

 শেখ মুজিবুর রহমান মূলত সাত মার্চ স্বাধীনতার ডাক দেন। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগেই স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে যান। ২৫ মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যুদ্ধ হয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে এই যুদ্ধের। ১৪ ডিসেম্বর পালিত হয় বুদ্ধিজীবী দিবস। এদিন দেশের সমস্ত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো পাকিস্তানিরা। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। এতো অল্প সময়ে ময়নার সব ঘুরে দেখা সম্ভব না তার ছুটিও শেষের দিকে। সে তার মাকেও খুঁজে পেলো না। কিন্তু ধরে নিলো এই দেশটাই তার মা। প্রতিটি নির্যাতিত বঙ্গনারীই তার মা।বুকে কষ্ট নিয়ে আরেকদিকে বাংলা মায়ের সন্তান এই গর্বে আবারও ফিরে আসার বাসনায় পারি দিলো বিদেশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.