বাস্তবজীবনের সঙ্গে ছোটো হৃদয়ের যাপন নিয়ো লেখালেখি করি।। শাহমুব জুয়েল

শাহমুব জুয়েল জন্ম ১৯৮৫ সালের ৯ জানুয়ারি,চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার হাঁসা গ্রামে। বর্তমান নিবাস চাঁদপুর সদরের ব্যাংক কলোনীতে। তাঁর সম্পাদিত লিটলম্যাগ বর্ণিল কবিতা গ্রন্থ: কাঁচা রোদের সন্ধানে (২০১৭)মুখোমুখি আহ্লাদি চিবুক (২০১৭),জলসিঁড়ি পেরিয়ে বালির সন্যাসে(২০১৯) গল্পগ্রন্থ : অথৈ সময়ের শ্বাস( ২০১৮) প্রবন্ধগ্রন্থ : কথাসাহিত্যে রাজনৈতিক দর্শন ও বিবিধ প্রবন্ধ( ২০২০) উপন্যাস: সবুজডানা, সমুদ্রগামিনী( ২০২০) গিরিকন্যা (২০২১) পেশায় শিক্ষকতা, বিচরণ সাহিত্যে। তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত লেখার পাশাপাশি টেলিভিশনে শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন। সম্মাননা ছায়াবানী মিডিয়া কমিউনিকেশন সম্মাননা-২০১৮ কাব্যকথা ভাষা শহিদ স্মৃতি সম্মাননা- ২০১৮ চাঁদপুর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্বরচিত কবিতা বিষয়ে বিজয়ী সম্মাননা -২০১৮ দৈনিক বাঙালির কণ্ঠ লেখক সম্মাননা- ২০১৯ বাঙালি কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সম্মাননা-২০১৯ সিলেট কবিতা উৎসব সম্মাননা-২০১৯ ১১ তম চতুরঙ্গ ইলিশ উৎসব সম্মাননা-২০১৯। লেখাখির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাব্যশীলনের সাথে কথা বলেছেন কথাসাহিত্যিক শাহমুব জুয়েল। সাথে ছিলো কবি ও সাংবাদিক শব্দনীল।

কাব্যশীলন: সাহিত্যচর্চার প্রথম গল্পটা জানতে চাই?

শাহমুব জুয়েল: কিশোর বয়স। ঠিক অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছি। একদিন সন্ধ্যাবেলা বড়ো বাড়ির উঠোনে চাঁদনী রাতে হারিকেনের আলোতে বিতর্কের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বাবা বক্তৃতার ভূমিকা লিখে দিলেন। মুখস্ত করলাম। বক্তৃতার সঙ্গে কবিতা যুক্ত হলে ভালো লাগে। শ্রোতা মুগ্ধ হয়। তাই নিজেই চার লাইয়ের কবিতা লিখলাম। তখন থেকে লেখালেখির হাতেখড়ি হয়েছিলো।

কাব্যশীলন: একজন কথাসাহিত্যিকের সমকালীন বিষয়-ভাবনা-উপস্থাপনে কতটুকু দক্ষ এবং যুক্তিশীল হতে হয় এবং কেনো-

শাহমুব জুয়েল: প্রজন্ম জাতীর তাজ, মুক্তি ও সম্ভবনাশ্রেণি। সাম্প্রতিককালে জাতীয় উন্নয়ন হলেও মানসিক বিপর্যয় অনেক বেদনাদায়ক। রন্দ্রে রন্দ্রে সমস্যা ও সংকট বিদ্যমান। প্রকৃতির ধ্বংসের হিড়িক রয়েছে। সে বিষয়ে আমার বড়ো কাজ হলো উপন্যাস সৃষ্টি গিরিকন্যা। মাদকের ভয়াবহতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। নুয়ে পড়ছে তারুণ্যশ্রেণি, ঘুনে ধরছে রাষ্ট্র সমাজ ও অর্থনীতির মূল কাঠামো। তাই সমকালীন দায়বদ্ধতা থেকে কথাসাহিত্যে সমকালীন বিষয় আশয় উপস্থাপনের চেষ্টা করছি। মানুষের জন্য লেখা। বর্তমানে মানুষ যুক্তিশীল। তাই নিখুত বুননের মাধ্যমে মানুষের কথা বলা শ্রেয় মনে করি। কেননা দিনশেষে সকল স্বয়ংসম্পূর্ণতার ক্রিয়ানক মানুষ ও প্রকৃতি।

কাব্যশীলন: বিষয়গুণে নতুন উপন্যাসের প্লট চিন্তার ক্ষেত্রে কোন কোনলোর প্রতি লক্ষ রাখেন আপনি-

শাহমুব জুয়েল: আমার মাথার চারপাশে ঘুরে জনজীবনের সমস্যা। যা লাগব হলে বুহৎ জনগোষ্ঠীর উপকার হবে। এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও নতুনত্ব পাবে। নান্দনিকতা পাবে পরিবেশ ও জনগোষ্ঠী। আমি ভাবি চারপাশের মানুষ ও প্রকৃতি। তাই মানবসৃষ্ট সমস্যা চোখে ধরা দেয়। আকৃষ্ট করে, লেখায় মনোনিবেশী হতে উদ্যত করে। এককথায় – সমকালীন সংকটের ওপর চোখরাখা আমার কাজ। এখন মনে হচ্ছে মাদকই ভয়াবহ সমস্যা ও প্রজন্ম বিকাশের অন্তরায়।

কাব্যশীলন: আপনার নতুন উপন্যাস “মেঘ বিদায়ের দিন” লিখেছেন সমকালীন সমস্যা মাদক নিয়ে। এই বিষয়টি কেনও বেছে নিয়েছে কারণটি বলুন-

শাহমুব জুয়েল: মাদক সামাজিক ব্যাধি। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের গ্রাস করছে। নুয়ে পড়ছে প্রজন্মশ্রেণি। সামাজিক বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি, অর্থনৈতিক ক্ষতিও হচ্ছে। তরুণ শ্রেণির মধ্যে বিকৃতরুচি তৈরি হচ্ছে। মহাপ্রলয় ধেয়ে আসছে। দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সম্ভবনাময়ী বাংলাদেশ দুমড়ে যাবে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে। যেহেতু আমি সমকালীন সমস্যা ও সংকটকে প্রাধান্য দিয়ে লিখি সেহেতু মাদকের ভয়াবহতা মনে গেঁথে গেল। এবং উপন্যাসের প্লটে সাজানোর অভিপ্রায় তৈরি হলো। তাই ’মেঘ বিদায়ের দিন ‘ লেখায় মনোনিবেশ করলাম।

কাব্যশীলন: কিশোর উপন্যাস এবং সমসাময়িক উপন্যাসের ভেতর কি ধরনের পার্থক্য দেখেন আপনি-

শাহমুব জুয়েল: সময়োপযুগী লেখার পাশাপাশি। শ্রেণি উপযোগী লেখা পাঠকমহলে গভীর প্রভাববিস্তার করে। কিশোর উপন্যাসে কিশোরশ্রেণির জীবনযাপন উঠতি সময়ের চিত্র ফুটে ওঠে। লেখকের মূল কাজ সাম্প্রতিক সময়কে ধারণ করে অনুষঙ্গ নিয়ে অতীত বর্তমান ও ভবিষৎ সুকুমার চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো। তাতে পাঠক ও লেখকের যোগসূত্র যুক্ত হয় এবং দায়বোধ প্রকাশ পায়। কিশোর উপন্যাস শ্রেণি দায়। সমসাময়িক উপন্যাস সামগ্রিক দায়বোধ। সর্বপরি দুটো পন্থাই শ্রেণিসচেতনতা ও সামাজিক সংকট উত্তরণের মহত্তম পন্থা। তবে সবকিছুই লেখকের উপস্থাপনের ওপর নির্ভর করে।

কাব্যশীলন: আপনার উপন্যাসে, গল্পে জীবনভিত্তিক এবং সমসাময়িক বাস্তবতা একটি মিশ্রণ রাখার চেষ্টা করেন। এই চেষ্টাটি কি আপনার ভেতরে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এসেছে-

শাহমুব জুয়েল: বাস্তব জীবনের সঙ্গে আমার যাতায়াত। যা দেখি তা লিখি। দেখা বিষয় আমার হৃদয়ে ছোট দেয়, দাগ বসায় এবং ঝড় তৈরি করে। তাতে লেখার ঢেউ তৈরি হয় এবং কখনো গল্প ও উপন্যাসে বিবৃত করতে চেষ্টা করছি।

কাব্যশীলন: ছোট কাগজ “বর্নিল” সম্পাদনা করছে। “বর্নিল” করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে তাই শুনতে চাই-

শাহমুব জুয়েল: লিটলম্যাগ তরুণদের ফ্লাটফর্ম। সম্পাদক হিসেবে চিন্তা ছিল তরুণদের ঠাঁই দেব। সে কাজটি করতে সক্ষম হয়েছি। তবে অভিজ্ঞতার কথা যদি বলি। তাহলে একটু সত্য এবং খোলামেলা বলতে হয়। প্রকাশের কথা জানান দিতেই নামকরণ নিয়ে কেউ কেউ বিদ্রুপ করেন। এবং পারবো কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ পোষণ করেন। এতদ্বসত্ত্বেও নিজ উদ্যোগ ও সহযোগী সম্পাদক সালমা ইয়াসমিন ও নির্বাহী সম্পাদক সাবিনা ইয়াসমিনের আর্থিক সহযোগিতা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছি। ধারাবাহিকতা রক্ষায় অনেকেই বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।

কাব্যশীলন: অনলাইন সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে নতুন কোনও ধারার প্রবর্তন হচ্ছে বলে মনে হয় আপনার নাকি আমরা ভুল পথে হাঁটছি….

শাহমুব জুয়েল: সময়োপযোগী ভার্সন হলো অনলাইন সাহিত্যচর্চা ও প্রকাশ। যা সহজেই পাঠক, লেখক ও সম্পাদকের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি হয়৷ দ্রুত পাঠকের মুখোমুখি হতে অনলাইন গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যেমন আপনি কাব্যনুশীলন নামে অনলাইন ম্যাগাজিনের কাজ করছেন। তাতে সহজ ও নান্দনিকভকবে পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। পড়া না পড়া পরের বিষয় জানান দেয়ার ক্ষেত্রে সময়োপযোগী মাধ্যম অনলাইন পত্রিকা। সম্প্রতি অনলাইন মাধ্যম দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বমুখী প্রসারেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ও সহায়ক মাধ্যম।

কাব্যশীলন: দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত আপনি। এই পথ চলায় নিজের ভেতরের যে বিবর্তন আসছে। সে সম্পর্কে বলুন-

শাহমুব জুয়েল: আমি মনের বেদনা ইচ্ছা আশা, কামনা ও সহজাত স্বভাব থেকে লেখালেখি করি। সাম্প্রতিক সময়ে লেখালেখি করে কারো সংসার নির্বাহ অসম্ভব। আমাদের দেশে সেধরণের পরিবেশ রাষ্ট্রীয় স্বদিচ্ছা ও পরিবেশও নেই। দৈনন্দিন জীবনে কত হাসি কান্না দেখি, জীবন যাপন দেখি, সমস্যা ও সংকট দেখি। এগুলো দেখে আমার ভেতরে বিপ্লব তৈরি হয়। তখন কলম ও কাগজে কথাগুলো সাহিত্য অনুষঙ্গ করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। কারণ খুব ভালোবাসি আমার দেশকে মাটি ও বাঙালিকে। আমার সত্ত্বার সঙ্গে এসব বেনীবদ্ধ। কাল যদি স্বীকার করে ভালো না করলেও আক্ষেপ ও হা-হুতাশ নেই। কাজ করবো কারণ লেখালেখি নেশা হয়ে গেছে। এখন না লিখলে ভালো লাগে না। অস্থিরতা কাজ করে। কেন মানুষের কথা, রাষ্ট্রের কথা, জীবনের

কথা শ্রেণিভেদের কথা বলছি না। ভেতরের লেখকসত্তা খুব তাড়না দেয়। দায়বোধ থেকে লেখা শুরু করি। লিখছি শুধু লিখছি..

কাব্যশীলন: আপনি কেন লেখেন?

শাহমুব জুয়েল: পূর্বে বলেছি কেন লিখি তবুও বলি। সিক্সথ সেন্স সারাক্ষণ তাড়া করে। চারপাশের আবহ শিকার করে মগজে চক্কর দিতে থাকে৷ মনে হচ্ছে – কেউ বলছে। লিখো না কেন। তোমাকেই লিখতে হবে। তখন মৃদু হেসে শুরু করি। শব্দ ভাব ভাষা অলংকার ও ইজমের মাধ্যমে কিছু লিখি। আপনাকে ধন্যবাদ কত সময় ব্যয় করে আপনি আমার সাক্ষাৎকার নিলেন। আমি ঋণী হয়ে গেলাম। দেবার কিছু নেই, হৃদয়ের ভালোবাসাটুক দিলাম। আপনার সৃজনশীল কর্ম জীবন সংসার এবং কাব্যশীলনের সফলতা কামনা করছি। জয়তু সৃজকর্ম জয়তু কাব্যশীলন ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.