জেরিন মোসফেকা’র কবিতা

ছুটি চাই

কাফনের অন্তহীন কাফেলা
আমায় আর উদভ্রান্ত করে না।
জেনে গেছি এই শোক মিছিল নিয়েই বুকে
গলিঘুঁজি খুঁজে পার হতে হবে
শত শঙ্কার জীবন।
আরোপিত চড়াই-উৎরাই পার করে
বাঁচতে হবে জানি মুষ্ঠির আয়ূ।

অর্থহীন সবকিছু
এমনকি… মারি ফাঁকি দিয়ে
এই আপাতত ভালো থাকাটাও।

তবু বলি,
ভালো নেই কোনো কিছুতেই।
প্রশ্নবিদ্ধ নিশ্বাস ও
মরে যাওয়া বিশ্বাস,
ক্রমশ ক্ষয়ে যাওয়া পায়ের নিচের মাটি
জমা খরচের নিত্য খুটিনাটি
নিলামে উঠেছে যেন
শান্তি নামের শীতল অনুভব।

কিছুক্ষণ নিশ্চিন্ত ঘুমের বিনিময়ে
আমার পোড় খাওয়া রাজ্যটা
মুখ ব্যাদান করা আগামীটা
অনায়াসে ভেট দিতে পারি।
পথেঘাটে ভ্রুকুটি করা এ মারির মরণ…
কবে হবে? কবে ছুটি?

বন্দিকথন

কত চৈত্রসংক্রান্তি গেল
নৈঃশব্দ্যকে সঙ্গী করে…
দূরত্বের গাঁটছড়ায়
সময়ের নিরানন্দ ভ্রমণ।
দিন গড়িয়ে বোশেখ শুরু…
মনের ঘরে নিত্য শ্রাবণ।

এবার নাকি ইথারে বর্ষযাপন!
যোজন দূরত্বে দুজনেই বন্দি নিজ ঘরে
করোনার আঁচড়ে।
কবে তোমার স্পর্শ
ভুলিয়ে দেবে জাগতিক দুঃখ,
জানি না।
দীর্ঘ অদর্শন কোনো ছাপ ফেলেছে কি না
তোমার পাথর মনে, তা-ও জানি না!
কেন যেন মনে হয়,
প্রবাস জীবনের টানাপোড়েন
কাঠিন্যের বর্মে মুড়ে রেখেছ,
তুচ্ছ সব অনুভবের ঊর্ধ্বে বাঁচো তুমি।

সেদিনের সেই তরুণী দেহটায়
সময়ের দাগ পড়েছে,
ক্লান্তির ছাপ পড়েছে।
নেই ভালবাসায় খাদ…
জমেছে কিছু খেদ, অভিমানের মেদ।

করোনার কারাবাসটা
আমার ডানাভাঙা মনের মধ্যে হতো!
দেখতে ওর চারদেয়ালে শুধুই খোদাই
একছত্র তুমি।

হায় বৈশাখ

এমন বিপন্ন বিষণ্ন বৈশাখ দেখিনি কখনো।
যেমন বুঝিনি এমন দহন জর্জরিত মন,
অঙ্গার বুকে নিয়ে
গৎ বাঁধা যাপিত জীবন।

এমন বিপর্যস্ত বৈশাখ দেখিনি এ নগরে।
অসহায়তা গুমরে মরে বুকের কন্দরে।
নাগপাশে বন্দি বোধের লাগাম
আশঙ্কা বা আতঙ্কেও নির্বিকার।
স্বার্থান্ধ মানুষের ক্রীড়নক হয়ে
দেশজুড়ে আজ হাহাকার!

এমন নিস্পৃহতাও দেখিনি কখনো
ক্রমাগত সন্ত্রস্ত অস্তিত্ব ,
পায়ে পায়ে নিষেধের বন্ধনী।
মৃত্যুই যেথা একমাত্র ধ্রুব।

যে অঙ্ক মেলে না

অন্ধত্বের পাঠ নিচ্ছি প্রতিটা ক্ষণই।
মোড়ের ভিক্ষুক দেখি না
পথশিশুর শুকনো মুখ টানে না
শুনি না কারও অভাবের খতিয়ান।
উৎকণ্ঠা আর ক্ষুধার মিশেলে
জ্বলজ্বলে চোখ
কেঁপে ওঠে বুক।

লকডাউনের মন্ত্র
অথর্ব সত্তাকে যন্ত্র বানিয়েছে
অর্থহীন অর্থনীতির অঙ্কে।
আগামীর ভাবনায়
কাঠগড়ায় কাঁদছে আজকের সুখ।

নিষ্ঠা আর মমতায় ঘাটতি নেই
তবুও সময়ের যাঁতাকল
ছিনিয়ে নিয়েছে রোজগারের উপায়।
সঞ্চয় শেষ কবেই…
সন্তানের অভুক্ত মুখ দেখার শাস্তি
শূন্য পকেটেরও সহ্যের বাইরে।
এখন জানি,
কোনো কোনো বাবা কেন আত্মঘাতী হয়?
সন্তানের মুখে কেন নুন দেয় কোনো মা!

দুদণ্ড ঘুম হয়ত বলে দিতে পারে
সাধ্য আর সাধনার কাঙ্ক্ষিত সমীকরণ।
হায়! ঘুম!

আরও আলো চাই হৃদয় গহিনে

হৃদয়টা ছোটোবেলা থেকে ছোটো হয়ে ছিল
যন্ত্রণায় আর মন্ত্রণায়।
ধর্মের ধ্বজা বেঁধেছে বুকে বার বার।
পদে পদে পরেছে শেকল
দিয়ে ভদ্রতার আর নৈতিকতার দোহাই।
জানি না এত মতের ভেদ নিয়ে
মানুষ তৈরিতে লাভ কী হলো স্রষ্টার!

কেউ আল্লাহকে ডাকি,
কেউ ভগবান…
জোড়হাত প্রার্থনায়, আভূমি নতমস্তকে,
নির্ভেজাল সমর্পনে সবই অভিন্ন।
একই আকাশ বাতাস বরাদ্দ করে স্রষ্টাও নিশ্চিত ভীষণ।
আমাদের কাছে কেন
ধর্ম মানে অধর্মের আলোয়ান!

জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন চাই
উদারতার আকাশে।
শান্তি চাই বিশ্বাসের কোমল আলোয়
প্রশান্তি চাই সমুখে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের মিষ্টতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *