স্বাধীনতা-দিবসের কবিতা


ধন্য মানি
ফারুক মাহমুদ 

দেখছি মুক্তির যুদ্ধ। যুক্তদের সৌভাগ্য অপার
স্মরণীয় সেই যুদ্ধে শত্রুপক্ষ পরাজিত হলো
ভোরের সূর্যের মতো সত্য হলো স্বাধীন স্বদেশ
যুদ্ধ শুধু রক্তভাষা নয়, এর ঔদার্য অঢেল

নীড়ে বসে পাখি যদি দেখে নেয় পর্যাপ্ত আকাশ
কাছে-দূরে ছত্রাকের স্থিরকষ্ট লুপ্ত হয়ে যায়…
দৃষ্টিতৃপ্তি হেসে ওঠে মানুষের থেমে-থাকা চোখে

ধন্য মানি। জীবনের পুণ্যপ্রাপ্তি আর কত চাই!

কোনো কোনো জন্মদিন হয়ে ওঠে উচ্ছলিত আলো
স্বচ্ছতোয়া, প্রীতিময়, ছায়াসূত্র—বনউপবন
জলের বিপুল ছন্দ, বাতসের কণ্ঠঝরা গান
রঙের সঞ্চয়শালা আরো পূর্ণ অভিনব রঙে

পরাস্ত অক্ষরে নয়, সুধাধূলো বর্ণমালা দিয়ে
যিনি লিখেগিয়েছেন বাঙালির ক্রমইতিহাস–
আমরা দেখেছি তাঁর শততম শুভজন্মদিন

ধন্য মানি। জীবনের পুণ্যপ্রাপ্তি আর কত চাই!

বনের শেষে ছোট্ট কুটির
ফারুক নওয়াজ

এই শহরে হেসেখেলে আমরা সবাই আনন্দে বেশ আছি
বুকের মাঝে স্বপ্ন পুষি তাড়িয়ে দিয়ে দুঃখ-শোকের মাছি
আকাশছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষাতে এগিয়ে চলি স্বাধীনতার সুখে…
কিন্তু বলো খোঁজ রাখি তার… দুঃখী মা যে; থাকেন মলিনমুখে?
আমার মতো, তোমার মতো তারও ছিল একটা সোনার ছেলে;
দেশের ডাকে ছুটলো রাজু মায়ের আদর, দুধমাখা ভাত ফেলে।
‘মাগো আমি যাচ্ছি, ফিরে আসবো তোমার স্বাধীনতা নিয়ে’…
এই বলে সে আর এলো না দেশটাকে তার স্বাধীন করে দিয়ে।
লাল-সবুজের জয়পতাকা উড়ছে আহা হাওয়ায় দুলে-দুলে…
স্বাধীন পাখি গান জুড়েছে, ফুটছে গোলাপ পাপড়ি খুলে-খুলে।
ফুললো নদী দুললো ঢেউয়ে পরানমাঝির পালতোলা নাও আহা…
স্বাধীন ভিটেয় আসলো ফিরে দেশছাড়া ওই দুর্গা, রথীশ, রাহা।
আসলো ফিরে বীরছেলেরা,যুদ্ধজয়ের সুর ভেসে যায় হাওয়ায়…
উঠলো মেতে অধীন জাতি সোনার হরিণ স্বাধীনতা পাওয়ায়।
সুখের স্রোতে ভাসলো সবাই; সেই ভাসাতে মত্ত আজো জাতি-
কিন্তু তাদের খোঁজ রাখি না জ্বাললো যারা আঁধার ঘরে বাতি।
তোমরা তো সব সুখেই আছো; যাও না দেখে আসো না সেই মাকে-
শহর ছেড়ে অনেক দূরে…, বটমূলে এক ফকির শুয়ে থাকে…
বাঁ দিকে এক রাস্তা গেছে, হাঁটতে থাকো পথটা বেয়ে-বেয়ে…
পথের দু’পাশ ঝোপছাপানো, হাঁটতে হবে এপাশ-ওপাশ চেয়ে।
পথ যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে এক তিরতিরানো নদী…
দেখবে ঘাটে নৌকা বাঁধা, মাঝির দেখা না পাও তুমি যদি…
ঘাটের খেয়া নিজেই বেয়ে ওপাড়ে যাও, হাঁটতে থাকো নেমে…
মাঠ পেরিয়ে, বন পেরিয়ে, বনের শেষে একটু যেয়ো থেমে…!
এবার সোজা ডান দিকে যাও; শর্ষেক্ষেতের আলটি বেয়ে, শেষে…
দেখতে পাবে ছোট্ট কুটির…,কুমড়োলতা উঠেছে ঘর ঘেঁষে…
ছনের চালা, চাঁচের বেড়া… ছোট্ট উঠোন, ডাকছে ঝিঁঝিঁপোকা…
আস্তে যেয়ো..! শব্দ পেলে ভাববে মা ঠিক আসছে বুঝি খোকা।
চাঁচের বেড়ার ফোঁকর দিয়ে দেখতে পাবে সাদা চুলের মাকে;
খোকার ছবি হাতে নিয়ে বলছে কিসব ছবির খোকনটাকে।
কানটি পাতো শুনতে পাবে; ‘খোকনরে তুই বড্ড পাজি ছেলে…
বলনা বাবা ক্যামনে আছিস দুঃখিনী এই মাকে একা ফেলে…
কতো দিন যে খাইনি আমি, তুই না এলে খাবো কেমন করে…
কেউ রাখে না খবর আমার, একমুঠো চাল নেই যে আমার ঘরে!’
পারলে তুমি খোকার মতো একটুখানিক জড়িয়ে নিয়ে মাকে-
বলো, হাজার খোকন আছে, কষ্ট পেতে হবে না আর তাকে।
পারো, পারো… তোমরা পারো এমন হাজার মায়ের খোকন হতে;
সে দিন আহা আসবে কবে…, দেশ তাকিয়ে ভবিষ্যতের পথে।


তিনি এবং তার বাংলা
ইলিয়াস ফারুকী


ঋজু ভঙ্গিতে দাড়ানো শান্তির পায়রা
চোখে মোটা ফ্রেমের মামুলি একটা চশমা,
দৃষ্টিতে স্বপ্নের মানচিত্র, হৃদয়ে মেহেদী রঙ,
খুবই কায়দা করে ধরা তামাক পাইপ
যেন তার ভেতরে জ্বলছে বিপ্লবের চুল্লি,
দুচোখে তীক্ষ্মতা যেন সার্চলাইটের আলো,
অন্তরের গভীরে আসন পাতা যেন সাধন চলছে
পাবলে নেরুদার ঝলসানো কবিতা
চেগুয়েভারার সিমান্তবিহীন বিপ্লব,
নজরুলের বিদ্রোহী রাগের গান
আর রবি ঠাকুরের “আমার সোনার বাংলা”।
মাঝে মাঝেই তাঁর মুঠো ধরা হাত পাইপে টোকা দিয়ে ছাই ঝাড়েন,
মনে হয়ে যেন মানচিত্রের উচ্ছিষ্ট ঝাড়ছেন
আর ভেতর থেকে ঝরে পড়ছে নূরুল আমীন,
মোনায়েম খান কিংবা ফ কা চৌধুরীরা।
যাদুকর ঝোলা থেকে যেমনটা বের করে
দর্শক চমকানো নানান বস্তু, তেমনি তাঁর
কন্ঠ থেকে বের হয়ে আসে ইতিহাস
জালেমদের কফিনে যেন শেষ পেরেক
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”
আর তখনই তর্জনীটা উঠে যায় আকাশ পানে
যেন বাঙ্গালীর স্বাধীনতার যাদুরকাঠি
এবং সাহসী বিস্ফোরণ ঘটে “জয় বাংলা” ধ্বনিতে।

স্বাধীনতা
মাহবুবা ফারুক

১.

বুকে ছটফট মুখে ভাষা নেই , তুমি পরাধীন,
শুধু ভয়, দুশ্চিন্তা খামচে ধরে তোমার দিন।

২.

মুক্ত দুটো ডানার নিচে স্বাধীনতার বাস,
দুপায়ে ভাঙো শৃঙ্খল , হবে ইতিহাস।
পাঁজর খুলে বের করে দাও অধীনস্থ ভয়,
সাহস করে লড়তে শিখো আসবেই বিজয়।

৩.

মুখে কথা রাশি রাশি বুকে তোলপাড়,
স্বাধীনতা ছাড়া এসব কথারা কী করে হতো কে কে কার ?

৪.

এই যে ভালোবাসাবাসি ডাকাডাকি প্রাণ ভরে,
পতাকা হাতে হেঁটে যাই মানচিত্র ধরে,
পৃথিবী ঘুরে এসে এইখানে থেমে যাই,
স্বাধীনতা আছে আর কিছু চাওয়া নাই।

৫.

এক টুকরো ভূমি আছে বুক ভরে নিই শ্বাস,
আপন ভাষা আছে, আমার মুক্ত আকাশ।
একটি পতাকা বলে আমার পরিচয়,
স্বাধীনতার চেয়ে দামি আর কিছু নয়।

ফিরে আসে আমার বাংলাদেশ
মামুন মুস্তাফা

(শামসুন নাহার (রেণু), মুক্তিযোদ্ধা ইমদাদুল হক (হীরা মিয়া)-র স্ত্রীর চিঠি অবলম্বনে)

খুব সন্তর্পণে তুমি পথ চলো। স্বাধীনতা কতদূর? মুক্তিযুদ্ধের আখরে লেখো সেই রণক্ষেত্র।
দারাপুত্রপরিবার আজ কোথায় ভেসে চলে? নিক্তির কাঁটায় মাপা জীবন, হায় জীবন!
এই আত্মা আজ স্রষ্টার কাছে সমর্পিত। অজানা পথে লুকাও নিজস্ব ঠিকানা…
চারদিকে তোমার গড়ে তোলো ক্যামোফ্লেজ। জেনে নিয়ো তোমারই ব্যুহপাশে হায়েনার নখ…
ওই দন্তশূলে গাঁথা বাংলার আকাশ…সেখানে তোমারই সহোদরের হাড় ও করোটি।
সেই শিথানের পাশে রোজ উঠে বসি, রক্তচোঁয়া পথে ছিঁড়ে যায় দেহের বসন।
তবু আশা নিয়ে থাকি- দ্রিমি দ্রিমি তোমার আঙুলের ট্রিগারে স্বপ্ন জাগে…ক্রাচে নয়,
মুঠোভরা শপথের অঙ্গীকারে ফিরে আসে আমার বাংলাদেশ।

পতাকা
আহমেদ শিপলু

পতাকা হাতে দৌড়াচ্ছো তুমি
উল্লাস করছো তুমি
হে তরুণ!
টিশার্টের বুকে লাল সবুজ এঁকে
মিছিলে হেঁটে যাওয়া যুবক
সবুজ জমিনে লালপেড়ে শাড়ি পরিহিতা চঞ্চল যুবতি
তুমি কি দেখো ওই সবুজে
ওই লাল বৃত্তের ভেতর
হাজার বছর সংগ্রামের ইতিহাস!
রক্তাক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ।
দেখতে কি পাও?
গাঢ় সবুজের মাঝে রক্তিম বৃত্ত
কখনো টগবগে লাল সূর্য
কখনো তাজা তরুণের রক্তের ছোপ!
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার!
এখানেই রয়েছে বায়ান্নো
একাত্তর
মার্চ এর কালরাত!
বিজয়ের ডিসেম্বর!
রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি!
তাকালেই দেখা যায় বিশাল গণমিছিলের ঢেউ কারফিউ ভেদ করে আছড়ে পড়েছে রাজপথে।
ওই লাল বৃত্তের দিকে তাকালেই দেখা যায়–
উত্তাল উনসত্তর!
আগরতলা ষড়যন্ত্র!
মাওলানা ভাসানি,
বঙ্গবন্ধু!
তর্জনী উঁচানো সাত-ই মার্চ!
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম!
এবারের সংগ্রাম আমদের স্বাধীনতার সংগ্রাম!”
ওই সবুজের মাঝেই রয়েছে মুজিব নগর
তাজউদ্দীন
আর ত্রিশ লাখ শহিদের বুকে গজিয়ে ওঠা
ঘাসের ঠিকানা।
বাঙালির মুক্তি আর মুক্তচিন্তার ঠিকানা ছিলো
যেই লালসবুজের খামে!
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিজয়ের সনদ ছিলো
যেই রক্তাক্ত চিঠিতে।
অশুভ পঁচাত্তর!
পঙ্কিল আগস্ট!
কেড়ে নিয়েছিলো সেই খাম!
ছিড়ে ফেলেছিলো সেই চিঠি!
প্রতারক বুলেটে ঝাঁজরা হয়েছিলো
শান্তির ডাকপিয়ন!
পতাকা হাতে দৌড়চ্ছ তুমি
উল্লাস করছো তুমি, হে তরুণ!
টিশার্টের বুকে লাল সবুজ এঁকে
মিছিলে হেঁটে যাওয়া যুবক
সবুজ শাড়িতে লাল পাড় পরিহিতা চঞ্চল যুবতি
তুমি কি দেখো ওই সবুজে
ওই লাল বৃত্তের ভেতর
হাজার বছর সংগ্রামের ইতিহাস!
রক্তাক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ।
দেখতে কি পাও?

মুক্তির এই গান
অদ্বৈত মারুত

হে মা, প্রিয় মাতৃভূমি, প্রিয় ভাইয়েরা আমার
নিরণ্ন বুকে চুকিয়ে দিতে চেয়েছিল ওরা
বুলেট; বেয়ােনেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারতে চেয়েছিল
আর তারা সঙ্গী করেছিল দেশীয় কিছু বিষধর সাপ

খুলে খুলে যেতে চেয়েছিল এই হৃদয়; মাংস—
জল জালি লাউপাতা; অনুতাপ
ছিল না— জন্মান্ধে; হোলি খেলতে চেয়েছিল
প্রিয় প্রজাপতি ও মধুর সাথে

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই তবে পাপমুক্ত
সকাল পেয়েছি— তীব্র সংঘাতে
প্রভূত মাঠের ফসলের মতাে; ঘোর
ধূলিতে ধূসর বৈকালিক বায়ু

আসা আর যাওয়ার মাঝে হঠাৎ হঠাৎ
পাগলা ঘােড়াটা মেয়ে ফেলে আয়ু—
নির্জলে তছনছ করে কাঙ্খিত মুক্তি;
অর্জনে নিহত শস্য-আবাদ, এই প্রাণ

আর আমরাই আমাদের নির্বাসনে দিই;
আরভিতে জমে ওঠে সান্ধ্য অভিমান
মুক্তির সনদে দাগহীন পরচা সবাই
শেকলবেষ্টন— আমার মুক্তি চা

স্বাধীনতা
ফারুক সুমন

মুক্ত হাওয়ায় সুপ্ত আছে
স্বাধীনতার সুখ
যুক্ত থেকে ভালবাসায়
চলবো অভিমুখ।
মায়ার ছায়ায় আমার স্বদেশ
স্বাধীন পতাকা
বিশ্ব বুকে উজাড় উড়াল
গর্ব মুখর থাকা।
ধান ছড়ানো উঠান জুড়ে
মনে তৃপ্তি বোধ
এই তো আমার স্বাধীনতা
এই তো স্বপ্ন সৌধ।
স্বাধীন সূতোয় উড়ছে ঘুড়ি
ফুসছে নদীর জল
স্বাধীন আকাশ স্বাধীন সাঁতার
শক্তিতে অটল।

সবুজ মানুষ
কানিজ পারিজাত

সবার একই প্রশ্ন তার কাছে-
তোমার চোখের তারায় কিসের ছায়া?
তোমার বুকপকেটে কার ছবি?
তোমার কন্ঠে কার গান?
কি তোমার নাম?
ছেলেটি নিরুত্তর;
যেনো এক শান্ত সমুদ্র,
শুধু বুকের ভেতর ফেনিয়ে ওঠে ঢেউ,
গর্জন তুলে আছড়ে পড়ে বারবার-
স্টেনগান, থ্রি নট থ্রি আর কার্তুজে।
ছেলেটি দৃঢ় অবিচল,
বন্ধুর গুলিবিদ্ধ নিথর শরীর-
প্রেয়সীর চুলের কাঁটা-
রুপালি রাতের মায়াচাঁদ-
খোলা জানালায় মায়ের প্রতীক্ষাজল-
কোনোকিছুই রুখতে পারেনা তার স্টেনগান-
ঝলসে ওঠে,গর্জে ওঠে বার বার-হাজার বার-
তারপর আসে সেই দিন-
লাল সবুজের বিজয় দিন!
ছেলেটির উত্তর:
আমি এক সবুজ মানুষ-
বুকপকেটে প্রিয় সবুজ স্বদেশ-
চোখের তারায় লাল সূর্যছায়া-
কন্ঠে আমার মায়ের গান-
স্বাধীনতার সোনালি সোপান।

আমার দেশ
নুসরাত সুলতানা

১৮,২৫০ টি স্বাধীন সূর্য উঠেছে স্বাধীন নীলাকাশে।
ত্রিশ লক্ষ বাঙালির রক্তে ভেজা মাটিতে
গজিয়ে উঠেছে
শিশু- সবুজ দূর্বাঘাস।
বাতাসে ঘ্রাণ বেলি,চামেলি আর চম্পার।
নদীতে ভেসে বেড়ায় পাল তোলা নৌকা।
ভালো কি আছে আমার বাংলা মায়ের কৃষক,
শ্রমিক, জনতা?
আজও যে বিশ্বজিৎ এর আত্মাকে
নগ্ন করে হনন করা হয়,
আজও যে মধ্যবয়স্ক নারী বিবস্ত্র হয়,
আজও ধর্মান্ধতার জয়জয়কার!
শহীদের আত্মা কি হাসে অমিয় হাসি?
ছেলেহারা মায়ের ছেলের আত্মা কি পেয়েছে শান্তির অন্বেষণ?
আমার মায়ের পরনে কি ওঠে নতুন কাপড়?
প্রজন্ম, শহীদের আত্মা দিয়েছে ভৌগলিক ম্যাপ
তোমরা দেবে সুশাসন, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আর সমুন্নত উন্ন

আগুন বুলেটে জাগি
খান মুহাম্মদ রুমেল

শাখাঁরিপট্টির কানু ডোম
ইকবাল হলের রশিদ মিয়া
দুজনের কতো অমিল
ধর্ম বর্ণে শ্রেণিতে গন্ধে
সরকারি দফতরের বড়কর্তা
ফুটপাথের ফেরিওয়ালা!
সব কেমন মিলে গেলো এক মোহনায়
সে অন্ধকার রাত আলোজ্বলা।
সবাই চেয়েছিল- জয় বাংলা
রাজপথে নেমেছিলো কেউ
কেউ নামেনি কখনোই
বুকের ভেতর আগুন ছিলো
সবারই সমান।
আগুনের মূল্য শুধতে হলো
আগুনের দামে।
২৫শে মার্চের রাতে
জ্বলেছিলো আগুন
পুরান ঢাকা ইকবাল হল জগন্নাথ হল
শহরের ইঞ্চি ইঞ্চি মাটিতে
পুড়েছে মানুষ ঝাঁঝরা হয়েছে গুলিতে
আগুন থেকে আগুন জ্বলেছে
বুলেট থেকে বুলেট!
বাঙালি ঠিক বুঝে নিয়েছে-
জয় বাংলা নিরেট!
টিক্কার মুখে থু থু ছিটিয়ে
জেগেছে বাঙালি আবার
যেমন জেগেছে বারবার।
২৫শে মার্চ শোকের নয়
ইতিহাস বাঙালির জাগার।

পতাকা আমাকে জানে
মনদীপ ঘরাই

পতাকা শিখবে?
দেখে নিও মন ভরে;
সবুজ ঘাসের নরম কপালে
লাল টিপ হাসিমাখা।
শিখবে স্বাধীনতা?
রোদ মাখা বাসি পান্তা-মরিচে
ক্ষুধাটা জিইয়ে রাখা।
শেখাই তোমায় দেশ?
আলসে দুপুরে
ঘুমন্ত জলে
প্রতিবিম্বই শেষ।
আমিই বাংলাদেশ…
ঘাসে ঘাসে আমি মুক্তি খুঁজি না কোনো।
একাত্তর আর স্বাধীনতা আমি;
আমার গল্প শোনো।
এই পতাকা আমায় টানে;
এই পতাকা আমার অতীত আলোর
-সবটুকু ভালো জানে।
সবটুকু ভালো জানে।


বিশ্বনিখিল
হোসনে আরা জেমী

তোমাকে ছেড়ে এসেছি হে স্বদেশ,
তাই ভালোও বেসেছি অনেক বেশি।
আমি মনেপ্রাণে তুমুল বাংলাদেশী।
প্রিয় দেশ, প্রিয় জন্মভূমি
ছেড়ে এসেছি দূরে,
তাই বন্দি স্বাধীনতায় ক্রমশ জড়িয়ে যাই,
ডুবে যাই স্বাধীনদেশের চেতনায়।
স্বাধীনতার চেতনার ডালপালা মেলে
দেশজ ভালোবাসার প্রত্যয়ে!
স্বাধীনতা সমুদ্রের চেয়েও গভী
স্বাধীনতা আকাশের চেয়েও বিশাল তোমার ব্যাপ্তি।
স্বাধীনতা জেগে আছে নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে,
তোমকে জড়িয়ে রাখি আষ্টেপৃষ্ঠে যাপনের ওঠানামায়!
স্বাধীনতা উন্মোচন করে মৃত্যুকবলিত দ্বার,
একটি কথার অব্যক্ত চেতনা,
মিলিত প্রাণের বিদ্রোহ,
শত পদধ্বনির গর্জে ওঠা মিছিল!
স্বাধীনতা আজ তাই দুর্বারগতির বিশ্বনিখিল।

শরণার্থী
বঙ্গ রাখাল


ইশকুল পালানো স্বাধীনও একদিন হারিয়ে যায়।
কে বা কারা আসামের ক্যাম্পে ঘুরতে দেখেছে।
শরণার্থীই বলি তাকে, বাবা খুলনার কোনো
এক নদীঘাটের মাঝি।
ছেলে বিধ্বস্ত স্বদেশে ফেরেনি।
উৎকট গন্ধ ঘরে।
পুড়ে গেছে ঘর-সংসার, সুখ নামের অসুখীরোগে।
স্বদেশের গল্পগুলো এমনি- এক সন্তান হারানো মা কিংবা বাবার…

কালরাত্রি
ফরিদা বেগম

সেদিন সূর্যটা সোনালি আলো ছড়িয়ে
আকাশের পেটে ডুবে যাবার পর
কালোরাত্রি নেমেছিল হামাগুড়ি দিয়ে,
সারাদিনে কর্মক্লান্ত অবসন্ন শহুরেরা
নিজেদের ডেরায় স্বপ্ননিয়ে পরেছিল ঘুমিয়ে।
মাঝরাতের ঠিক আগে ঘুমন্ত শহরটা
পাকিস্থানি হায়েনা শ্বাপদের নিষ্ঠুর দাপটে
কেঁপে উঠলো বন্দুক, কামান, গোলার আঘাতে,
ওদের অতর্কিত আক্রমনে ঘুমন্ত নগরবাসী লাশ হয়ে
নিজেদের দেখলো রক্তগংগায় ভেসে যেতে।
পিলখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন
ফার্মগেট, মতিঝিল, পুরান ঢাকা পাকিদের তান্ডবে
মুহুর্তে পরিণত হলো নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যুপুরিতে।
হতচকিত নগরবাসী আক্রমন প্রতিরোধে ব্যর্থ হলো
মানুষের আর্তনাদ আর আগুনের লেলিহান শিখা
বাংগালির মনে জ্বাল্লো স্বাধীনতার শিখা দৃঢ় শপথে।
পঁচিশে মার্চের কালরাত্রির নাম “অপারেশন সার্চলাইট”
নিরস্ত্র বাঙালী মৃত্যুপুরিতে উড়াল লাল সবুজ পতাকা,
গাইলো জয়বাংলা বাংলার জয় গান
বাংলার আকাশে বাতাসে বাজল যুদ্ধের দামামা
স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করলো বাঙালি হাতে নিয়ে প্রান।

আমার মা বাংলাদেশ
জুবায়ের দুখু

(২৫ মার্চ রাতের কল্পনা অবলম্বন)

কাল রাতে আমার মাকে খুন করেছে— আমার মাকে।
আমি-তুমি সে, কেউ দেখনি?
বাবা বন্ধু ভাই প্রতিবেশী দেশগুলোর স্তব্ধ অন্ধ চোখ।
আমার মাকে কে খুন করেছে?
ফুল তুমি জানো?
পাখি তুমি জানো?
সবুজ সতেজ বৃক্ষ তুমি জানো?
হে মাটি তুমি জানো অত্যন্তপক্ষে ঘাতকের পদধ্বনি?
তারা কিভাবে রাইফেল বের করে ঠাস ঠাসে ঝাঁ ঝাঁ করেছিল মায়ের বুক।
ঝড়ে পড়েছিল রক্ত শ্রাবণধারায় তোমারই কোলে?
চেনো ওসব রক্তখেকু পিশাচের মুখচ্ছবি?
ক্লান্তিতে আমি মায়ের মূল মানচিত্রে তাকাই
এবং দেখে— সারাটা শরীর ক্ষীণ হয়ে আসে।
সেই সোনালী রঙা মায়ের মুখ ভেসে ওঠে বারবার…
হাত থেকে চুড়ি, গলা থেকে মালা, নাক থেকে নোলক, কান থেকে দুল— সব নিয়ে গেছে হায়নার দল।
কিছুই রাখেনি অবশিষ্ট মা নামক বাংলাদেশে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *