কিশোর অনু-উপন্যাস ।। উদোম বুড়োর গবেষণা রহস্য।। আশিক মুস্তাফা।। পর্ব দুই

পর্ব : ০২

উদোম বুড়োর গবেষণাগার

এই উদোম বুড়ো যে পাড়াগাঁয়ের লোক, তা বুঝতেই পেরেছো। পাড়াগাঁয়ের হলেও তার কাজকর্ম দুনিয়া চমকে দেওয়ার মতো! বাড়িতে নিজের যে বিশাল গবেষণাগার তা নিয়ে দেশি-বিদেশি গবেষকদের রাজ্যের কৌতূহল। সেই দলে এবার এসে যোগ দিয়েছে রতেভু ভূতের দল। যে করেই হোক উদোম বুড়োকে তাদের চাই। উদোম বুড়ো দিনমান খালি গায়ে তার গবেষণাগারে গবেষণা করেন। শীত-বসন্ত আসে যায়। কিছুই টানে না তাকে। জামাও পরতে পারেন না কোনো ঋতুতে। তাকে নিয়ে গ্রামের লোকের মুখে কত কথা ছড়ানো! হয়তো এ জন্যই ছোটদের খুব আগ্রহ তাকে ঘিরে। বড়দের কাছে তারা প্রায়ই জানতে চায় উদোম বুড়ো সম্পর্কে। কিন্তু বড়রা তার সম্পর্কে কিছুই বলতে চায় না। একটার বেশি দুটো প্রশ্ন করলেই চোখ রাঙিয়ে দেয়।

অর্ক তার বাবার কাছ থেকে শুনেছে- উদোম বুড়ো ঠাফ্ফা-গরম জয় করার কী এক উপায় গবেষণা করে বের করেছেন। সেই উপায় পরীক্ষামহৃলক তা নিজের মধ্যে খাটাতে গিয়েই ধরাটা খেয়েছেন! কী ধরা? একেবারে বড় ধরা। এখন নিজেই গায়ে জামাকাপড় রাখতে পারেন না। ঠাফ্ফা-গরম কিছুই বুঝতে পারেন না তিনি। ফলে তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন যে, ঠাফ্ফা-গরম জয় করার উপায় তিনি জনসাধারণকে জানাবেন না। এতে মানুষ ঋতুর পার্থক্য বুঝবে না। ঋতুর পার্থক্য না বুঝলে ঋতু আর প্রকৃতিও ভালোবাসতে পারবে না। আর এসব ভালোবাসতে না পারলে মানুষ নিজেকেও ভালোবাসতে পারবে না।

ঠাফ্ফা-গরম বুঝতে না পারলেও উদোম বুড়ো বর্ষায় টিনের চালের ঝুম বৃষ্টি উপভোগ করেন। এখনো। খুব আয়েশ-আয়োজন করে। ঘরের আলো নিভিয়ে চেয়ারে বসে টেবিলে পা তুলে বৃষ্টির শব্দ শোনেন। আর গুনগুনিয়ে গান ধরেন।

কী গান? ওই যে-

‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে

জানি নে, জানি নে

কিছুতেই কেন যে মন লাগে না…।’

বৃষ্টির শব্দ শোনর পর তার অন্য কিছুতেই আর মন লাগে না। এই শব্দ শোনার জন্যই গবেষণাগারের চাল বানিয়েছেন টিন দিয়ে। বৃষ্টির শব্দ তাকে উতলা করে দেয়। তিনি নিজেও বৃষ্টি নিয়ে গান লিখেছেন। সেই গান আর তার সুর নিয়েও চলছে বিস্তর গবেষণা। অন্যান্য গবেষণা তো আছেই। এই এত্তো এত্তো বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নিজের দিকে তাকানোর সময়ও পান না। দিনমান গবেষণাগারেই তার যত ব্যস্ততা।

তবু নিয়ম করে দিনে তিনবার বের হন। এই সময়টায় খাবারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাজও সেরে নেন। সেদিন বিকালে বেরিয়েছিলেন গবেষণাগার খোলা রেখে। আর সেদিনই ঘটল অঘটন।

কার?

তার।

একই সঙ্গে অর্কেরও।

সেদিনই হারিয়েছে অর্কের আদুরে ছাগল ধলি। পুরো গ্রাম চষে বেড়িয়ে মন খারাপ করে বাড়িতে ঢুকতে যাবে, তখনই দেখে উদোম বুড়োর গবেষণাগারের দরজা খোলা। অমনি ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। এ কী, ভেতরে কেমন বেহাল দশা! উৎকট গন্ধ। পেট গুলিয়ে বমি আসে অর্কের। কোনো রকম পেট চেপে কৌতূহলী চোখে পুরো গবেষণাগার দেখতে থাকে।

এক জায়গায় এসে দৃষ্টি থমকে দাঁড়ায়। কালো পিঁপড়ার আখড়া যেন। ডিবির মতো দেখা যাচ্ছে। অর্ক চুপচাপ সেদিকে এগোতে থাকে। দেখে, মাটির ডিবিতে কিছু মুড়ি ছিটানো। তবে পুরো ডিবিটা গ্লাস দিয়ে ঘেরা। নিচেও। বলা যায়, গ্লাসের বক্সের মধ্যে মাটির ডিবি। আর তাতে পিঁপড়াদের আখড়া। পাশের একটা টেবিলে সাজানো কয়েকটা বয়াম। সেই বয়ামেও কিছু পিঁপড়া বন্দি করে রাখা হয়েছে। বয়ামের মুখ নেটে মোড়ানো। ভেতরে দেখা যাচ্ছে কিছু চিনির দানা। একটা বয়ামের গায়ে লেখা- গিু চোর!

অর্ক আরও অবাক হয়। চোখ ঝাপসা হয় না। তবু হাতের পিঠ দিয়ে চোখ ঘষে আর গায়ে একটা চিমটি কেটে আরেকটা বয়ামের গায়ে চোখ রাখে। তাতে লেখা- বয়স্ক চোর।
আরেকটায়- গিু পিঁপড়া।

এভাবে সাত-আটটা বয়াম সাজানো। শেষের বয়ামটার নিচে দেখা যাচ্ছে কয়েকটা রঙিন কাগজ। কাগজগুলো হাতে নিয়ে পড়তে থাকে অর্ক। পড়ে বুঝতে পারে, গ্লাসে বন্দি এসব পিঁপড়া নিয়ে গবেষণা করছেন উদোম বুড়ো। রঙিন কাগজগুলো আরও মন দিয়ে পড়ে অর্ক। একটা কাগজে পিঁপড়াদের নাম লেখা- পলিয়েরগাস রুফেসেন্স ও ফরমিকা স্যাংগুইনিয়া। এদের বৈজ্ঞানিক নাম- ডায়াকামা ইন্ডিকাম। এই পিঁপড়ারা আসলে গিু চুরি করে। মানুষের না, পিঁপড়াদেরই।

অর্ক বইয়ে পড়েছে, বৃশ্চিক মাছিরা খাবারের লোভে মাকড়সার জালের আশপাশে ঘুরঘুর করে। সুযোগ পেলেই মাকড়সার জালে আটকানো পোকা চুরি করে দেয় উড়াল! পড়েছে উপকূলের জলদস্যু শঙ্খচিলের কথাও। শঙ্খচিলরা অন্যের কাছ থেকে খাবার কেড়ে নিতে ওস্তাদ।

আর এমন আচরণের জন্য তাদের উপক‚লের জলদস্যু নামে ডাকা হয়। তবে এই গিু চোর পিঁপড়াদের কথা কোথাও পড়েনি সে। রঙিন কাগজগুলো আরও মন দিয় পড়ে। এক জায়াগায়া লেখা- এই পিঁপড়রিা অন্য বসতি থেকে গিু পিঁপড়াদের চুরি করে নিয়ে আসে।

তার পরের ঘটনা আরও ভয়াবহ। চুরি করে আনা গিু পিঁপড়াদের তারা ক্রীতদাস বানিয়ে রাখে। আর ইচ্ছেমতো নিজেদের কাজ করায়। কী ভয়াবহ কাফ্ফ! পায়ের ওপর পা তুলে খায় এই চোরগুলো। আর সব কাজ করায় চুরি করা পিঁপড়াদের দিয়ে।

 গিুশ্রম?

পিঁপড়াদের গিু অধিকার পালনের জন্য কোনো সংস্থা নেই?

কোনো দিবস নেই গিুশ্রমিকদের পক্ষে কথা বলার?

সে যাক, অর্ক জানে, পিঁপড়াদের শরীর থেকে ফেরোমন নামের একটা পদার্থ বের হয়। এই ফেরোমনের মাধ্যমে খুব সহজেই এক পিঁপড়ার উপস্থিতি টের পায় অন্য পিঁপড়া। তবে ভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়াদের মধ্যে এই গন্ধের কিছুটা ভিন্নতা থাকে। ফলে সহজেই ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে চোরদের। তাই চুরির কাজটা তাদের খুব দ্রুতই সেরে নিতে হয়। তবে বেশিরভাগ চোর পিঁপড়াই ধরা পড়ে যায়। এমনটাই লেখা আছে একটা রঙিন কাগজে। এর ভেতর কখন উদোম বুড়ো অর্কের পেছনে এসে দাঁড়ায়, সে বুঝতেই পারে না। অর্কও চোর পিঁপড়ার মতো ধরা খেয়ে ইতিউতি করতে থাকে। গবেষক তার কাঁধে হাত দিয়ে টেবিলের দিকে নিয়ে যায়। তার পর ইলেকট্রিক কেতলি থেকে ধোঁয়া ওঠা এক গ্লাস গরম পানি নিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। অর্ক পানির দিকে তাকিয়ে থাকে।

গবেষক বলেন- চট করে খেয়ে নে। একটু পরে তোর ছাগল খুঁজতে বের হব। উদোম বুড়োকে ঈদে চাঁদে দেখা যায় গ্রামের পথে ঘাটে। ছোটরা কথা বলতে চাইলেও কারো সঙ্গে তেমন কথা বলেন না। অর্কও কয়েকবার চেয়েছিল কথা বলতে। কিন্তু পারেনি। আজ তাকে সামনে পেয়ে অর্কের খুবই ভালো লাগছে। তার ওপর অর্কের নামও জানে লোকটা। তার ওপর তার ছাগল খুঁজতেও বের হবে উদোম বুড়ো। গ্রামের দস্যিগুলো অর্ককে এতদিন কিছুই পারে না।

বলে ক্ষেপাত। বলতো-

যার নাই কোনো গতি

সে হয় ছাগলপতি!

অর্ক ছাগল পোষে তাই তাদের এমন কটাক্ষ। আজ সে দেখিয়ে দেবে। উদোম বুড়ো তার গুরুত্ব বুঝে তার ছাগল খুঁজতে বেরিয়েছে। অর্ক এসব ভাবতে ভাবতে ঢকঢক পানি খেতে গিয়ে জিভ পুড়িয়ে ফেলে। গলাও। ড্রয়ার থেকে রঙিন কাগজে মোড়া একটা ট্যাবলেট বের করে অর্কের দিকে বাড়িয়ে দেন উদোম বুড়ো। বলেন, এটা খেয়ে নে। অর্ক ট্যাবলেটটা মুখে দিতেই আচমকা পেটে চলে যায়। ওমা, এতে জিভ-গলা দুটোই যেন সেরে গেছে। একটু আগের পোড়া কষ্ট আর অনুভব হচ্ছে না। এই ট্যাবলেটের কী ক্ষমতা তা বুঝে ওঠার আগেই অর্কের হাত ধরে বাইরে চলে আসেন উদোম বুড়ো। বলেন, এই ট্যাবলেটের নাম ডিএ-১০। মানে ডাইরেক্ট অ্যাকশন। ছোটদের টেন এমজি খেলেই চলে। তাই তোকে টেন এমজিই দিলাম। অর্ক অবাক হয়। আর মনে মনে ভাবে, উদোম বুড়ো যদি তার হাতটা ধরে হাঁটত। আর অমনি উদোম বুড়ো তার হাত ধরে হাঁটা শুরু করল।

রাস্তায় একটা চক্কর দিয়েই অর্কের ছাগল ধলিকে খুঁজে বের করে ফেললেন। তবে রাস্তা থেকে নয়, তার গবেষণাগারে এসে একটা আরডুইনোর সাহায্যে ছাগলটা খুঁজে বের করে ফেললেন। অর্ক অবাক হয়। উদোম বুড়ো বলেন, আরডুইনো হচ্ছে মাইক্রোকন্ট্রোলারভিত্তিক ওপেন সোর্স ডেভেলপমেন্ট বোর্ড। একে অনেকে খুদে কম্পিউটারও বলে। সেই কম্পিউটারকে নিজের মতো কাজে লাগিয়ে হারানো জিনিস খুঁজে বের করার একটা উপায় গবেষণা করে বের করেছি আমি। আজ তোর ছাগল খুঁজে বের করে সেই পদ্ধতিটার উদ্বোধন করলাম। প্রিয় ছাগল ধলিকে পেয়ে অর্কের যতটা ভালো লাগছে, তার চেয়ে বেশি ভালো লাগছে উদোম বুড়োর সঙ্গে কথা বলতে পেরে।

সে মনে মনে আরডুইনোর গল্প শুনতে চাচ্ছে উদোম বুড়োর কাছে। কিন্তু উদোম বুড়ো অর্ককে লেক্সিকোগ্রাফির গল্প শোনালেন। একটা পুরনো পেপার কাটিংও ধরিয়ে দেন তাকে। কী লেখা তাতে?

[চলবে…]

Series Navigation<< কিশোর অনু-উপন্যাস।। উদোম বুড়োর গবেষণা রহস্য।। আশিক মুস্তাফা।। পর্ব এক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *