ঈদ সংখ্যা ২০২১- এর ছোটগল্প।। নদী ও মানুষের গল্প।। ইউসুফ শরীফ

এক.

[ লোকটার অস্বাভাবিক দীর্ঘছায়া কাত হয়ে পড়ছে বালির চরে। চাঁদটা তার হাঁটার ভঙ্গিতে অসম্ভব তাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢেউ ভাঙছে যেন ভরাবর্ষার এক নদী। নদীর উত্তাল ঢেউভাঙার শব্দ বুকের ভেতর ধারণ করে নির্জন বালির চরে লম্বা পা ফেলে সে এগোচ্ছে─ না দৌঁড়াচ্ছে? দৌঁড়াবার একটা ছন্দ থাকে─ একেকটা মানুষের জোর পদক্ষেপে মনের আর পায়ের মিলে সেই ছন্দ তৈরি হয়। লোকটা সেই বালককাল থেকে যখনই শুধু দৌঁড় নয়─ হেঁটেছে-ও এ রকম এক ছন্দই তাতে লীলায়িত হয়ে ওঠেছে। একটা লক্ষ্য স্থির করে হাঁটা বা দৌঁড়ানো─ যাই বলা হোক অভ্যাসটা তার আজ প্রথম প্রহর অতিক্রান্ত এই জ্যোৎস্না-তরঙ্গঢালা রাতে এলোমেলো হয়ে পড়ছে─ ছন্দপতন ঘটছে। দৌঁড়ের দৃশ্যটি ধারণ করলে স্পষ্ট হবে তার মন কতটা লক্ষ্যহীন। যত এগিয়ে যাচ্ছে দৌঁড়াবার আগ্রহটাই বড় হয়ে ওঠছে মাত্র─ দৌঁড়ানো নয়। দৃশ্যগ্রাহ্য সীমা-সরহদ্দ পার হয়ে যাওয়ার মত হলে দৌঁড় ওই ছন্দ পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না─ দেহ ও মন একই সমতলে স্থিত হতে পারে না।

[ একাকী লোকটা যাচ্ছে কোথায়─ নির্জন এই বালির চরে থরে থরে কুঁচানো শুকনো বালি ভেঙে এবং এক সময় এ প্রশ্নও জাগবে─ এই লোক যাবেই বা কতদূর? তার দৃষ্টি কড়কড়ে বালিতে─ না বালি ছাড়িয়ে অন্য কোথাও! নদীচরের মোটা সাদা বালি মরা জ্যেৎস্নার আলোয় চিক চিক করে মরীচিকার মত─ চৈতন্যে দুলে উঠে নিথর পানি সেই পানিতে নৌকার গলুই তীরের মত বিদ্ধ করে নিস্তরঙ্গ নদীর যৌবন-সম্পদ। লোকটার ভেতর থেকে একটা শ্বাস থেতলে থেতলে বেরিয়ে আসতে গিয়েও আটকে যায়─ বুকটা আইঢাই করে ওঠে। দৌঁড়াবার শ্রমসিক্ত শ্বাস-প্রশ্বাস যে রকমটা হয়─ এ তা নয়। কড়কড়ে বালিতে তার দ্রুততর দৃষ্টি এই মরা আলোয় আদৌ কিছু খুঁজছে কি? জোছনার মরাটে আলোয় দিগন্ত বিস্তৃত বালিচরের চারদিক ছাইরঙের স্বচ্ছতায় অনেকটাই ঝরঝরে। বহুদূর পর্যন্ত সচল বস্তু বা প্রাণী ছায়ার মত হলেও স্পষ্ট চোখে পড়ে─

[ নাউভাঙা আর ভোলারচর যেখানটায় মিশেছে সেখানে নিঃসঙ্গ বটগাছের সবুজ পত্র-পল্লব মরা আলোয় কালশিটে হয়ে আছে আকাশের গায়ে। আকাশটা হতবুদ্ধি আর লোকটার পায়ের তলায় ছড়ে যাওয়া বালির চারপাশের রঙ ঘোলা কাঁচের মত ঈষৎ বাদামি। জোছনার ওই আলোটুকু বিছিয়ে না থাকলে বালির কুচানো হাজারও তরঙ্গ হত কৃষ্ণগহ্বরের উপর-কাঠামোর মত। কৃষ্ণগহ্বর শব্দটি নেতিবাচক অনেক কিছুরই ইঙ্গিত বহন করে─ আমরা তাতে যাচ্ছি না। সাধারণভাবে সর্বাধিক আলোচিত ইঙ্গিতটি মৃত্যুর─ ঘের-ঘের শব্দটি তাকে নিয়ে যাবে ঘেরজাল টানায় বালকবয়স থেকে তার হাতের কব্জির জোর আর পানি ভাঙার প্রশংসনীয় ক্ষিপ্রতার স্মৃতিতে। কৃষ্ণগহ্বরের কোন ব্যাখ্যা হয়ত জানা নেই লোকটার─ জানা থাকলে জোছনায় তার হাড্ডিসার ছায়া তালগাছের মত দীর্ঘ হয়ে ধূ ধূ এই বালির চরটা খামছে ধরার জন্য কী অতটা উদগ্রীব হত! এই চরের লাখ লাখ টন বালি-হিমালয়ের প্রাত্যহিক বর্জ্য সরিয়ে ফেললেই বরফগলা উত্তাল পানি অপ্রতিহত স্রোতে সমুদ্রমুখী হত─ হতে পারত?

[ বালিতে দেবে যাচ্ছে তার শিথিল পা─ এক পা তোলে আরেক পা দেবে যায়। বালিচরে হাঁটতে গিয়ে এরকম বেকায়দা দশা যে কারও হতে পারে─ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা একটু লক্ষ্য করলে দেখব─ লোকটার [জন্মের পর যার একটা নাম রাখা হয়েছিল─ অর্থবোধক নাম─ কেষ্টর আড়ালে সেই শৈশবেই হারিয়ে গেছে ওই পোষাকি নাম─ যাহোক আমরা নদীজীবি কতজনের নাম উল্লেখ করব?] দু’পা দেবে যাওয়ার ভঙ্গি অন্যরকম─ এ যেন আকাশের ঠিক মধ্যখানে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে তার আর বালিচরের এই নির্জন শূন্যতায় যুগলযাত্রা─ যে যাত্রার শেষ কোথায় জানে না─ তবে অগম্য নয় কৃষ্ণগহবর।

[ নামাখিলার পূবে গিরিধারি গ্রাম থেকে বিকালে হাঁটা শুরু─ পায়ে হেঁটে চলায় কোন অসম্মান নেই─ যাকে নিয়ে যাচ্ছে তাকে হাঁটিয়ে নেয়ার চল না থাকলেও উপস্থিত বাস্তবতায় কেউ কিছু মনে করেনি। ছোট সরকারের ছেলের বিয়ের খ্যাপে চার বেহারার পালকি নিয়ে বলাসপুরে চলে গেছে এলাকার বেহারা দাওরা আর তিন পোলা। দুই বেহারার মাপা বাড়ির উঠান ছাড়িয়ে গাঙপাড়ের হিজল গাছে কাত হয়ে পড়ে থাকলেও দাওরার ভাতিজা গনু জরের বাহানা ধরে কোনভাবেই সওয়ারি বইতে রাজি হয়নি─ বিয়ের সওয়ারি বইতে তার যত বিরক্তি─ নিজের বিয়ে নিয়ে তার বাবা-মা স্বজনরা কেউ এখনও ভাবছেই না কেন─ এ প্রশ্নে তার দেহ-মন উথাল-পাতাল এবং ক্ষুব্ধ। 

[ লোকটা তখন ঠিক ছিপছিপে এই লোক নয় গাট্টাগোট্টা তরুণ─ আলকাতরা মাখা নায়ের তলার মত চিতান বুক─ হাত-পায়ের মাংসপেশি যেন ষাড়ের গ্রীবা─ তার গা ঘেঁষে চারখানা খতের লাল মুর্শিদাবাদি সিল্কের শাড়িমোড়ান [এই শাড়ি আরও অন্তত পাঁচ নয়া বউর শ্বশুরবাড়ি আগমনের একইসঙ্গে আনন্দ-সংশয়ের সুবাসমাখা] টসটসে এক পোটলা। এই পোটলা শব্দটা মহার্ঘ কোন বস্তু বহনের জন্যই যুতসই─ যেমন কাবুলিওয়ালার থাকে─ তার কাছে সেটা নিছক বস্তু ছিল না─ ছিল জীবনের অপরিহার্য খুঁটিস্বরূপ। এখনকার মত প্রশস্ত  না হলেও নদীর পূবপাড়ে বালিরচর ছিলই─ পা দেবে গিয়ে তুলতে না পেরে আচমকা সেই পোটলার ভেতরকার বস্তুটি গড়িয়ে পড়ে তার বুকের ওপর─ দু’হাত বাড়িয়ে ঝাপটে ধরে─ অদ্ভুত কোমলতায় গেঁথে বসে তার সটান শরীর-মাংসপেশি আর মোটা নাকের ছিদ্রপথে সুবাসিত তেলসিক্ত চুলের ভেজা ঘ্রাণ ঢুকে পড়ে─ নরম আরাম আর পরিবেশ ভুলান ঘ্রাণে তলিয়ে যেতে যেতে সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেও জীবনে এই প্রথম পাওয়া কোমল স্পর্শজাত অজানা আবেশ তাকে আচ্ছন্ন করে তোলে─ কোমলতার এই আবেশ প্রতি ভোররাতে তার নদীফেরত শরীরের সব ক্লান্তি-অবসাদ নিঃশেষে চূঁষে নিত─ কী গোপন-মোহন যাদুময় সেইসব ভোর─ এখন মনে হয় এই আকাশের ওপারে যদি কোন আকাশ থেকে থাকে─ সেখানে কোন এক কোণে মিশে আছে তার সেই সুখদ সময়কাল─ বস্ত্রের বন্ধনমুক্ত দুটি শরীর যখন নিজেদের ভাষায় মুখর হয়ে ওঠত সে স্পষ্ট দেখতে পেত─ মানবজীবনের পবিত্র এক স্রোতধারায়  ডুবছে-ভাসছে-নিমজ্জিত হচ্ছে তারা─

[ লোকটার ছায়া পশ্চিমে দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে─ মনে হচ্ছে এই নির্জন চরে নৈঃশব্দের মাঝখানে তার ওই ছায়ার ভেতর অসম্ভব এক শক্তি ঘুরপাক খাচ্ছে। ছোটবেলায় শোনা ব্রহ্মদৈত্যর কথা মনে পড়ে─ যার এক পা থাকত স্কুল-বোর্ডিংয়ের রান্নাঘরে─ আরেক পা পাঁচ মাইল পূবে ভোলারচরের বুড়া বটগাছে। রাতে মাছ ধরতে ধরতে ওর বাবা ওই বুড়া বটগাছটাকে সব সময় খেয়ালে রাখতেন─ কৈশোর-উত্তীর্ণ হওয়ার পর ওকেও খেয়াল রাখার কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন─ বর্ষার বিশাল নদীর এরকম কিছু ঘনছায়া আর ছোট-বড় বাঁক ছাড়া দিক ঠিক রেখে জাল-বাওয়া-মাছধরা সত্যই কঠিন ছিল। ওই বটগাছের কাছাকাছি গিয়ে আচমকা বিপদেপড়ার গল্পও শুনিয়েছেন ওর বাবা।

দক্ষিণে ফুলপুরের ডোবা আর উত্তরে নলগড়ের ডোবার ঠিক মাঝখানে ঝিনুকের পানির আকারে একটুখানি পানি─ স্নান সেই পানির হাহাকারে চারপাশে বালি উড়ে─ মৃদু সেই বালির উড়াউড়িতে আত্মীয়-পরিজনহীন এই প্রৌঢ় পানি বড় অসহায়─ দুঃখী-স্থির-অচল পানি তো আর নদীর জ্যান্ত পানি নয়─ নদীর পানি সব সময় চলমান─ উৎস থেকে সাগরে প্রবহমান না হলে সে তো বদ্ধ জলাশয়। একরাতে লোকটা সেই বদ্ধ পানি থেকে এক আজলা তুলে গায়ে মাখতে গিয়ে থেমে যায়। তখনই চিকন সুরে অবিচ্ছিন্ন কান্না ভেসে আসে─ কোথা থেকে আসছে কান্নাটা! সে ওইটুকু পানির উপর কান পাতে─ গভীর কান্না উথলে ওঠছে পানি এবং বালির সংযোগস্থল থেকে─ মৃতপ্রায় নদী থেকে উত্থিত কান্না তার ভেতর জমেওঠা হাহাকার প্রসারিত করছে ।

[ আজলার পানিটুকু আস্তে করে নামিয়ে রাখে─ এতটাই আস্তে যেন ওই পানিটুকুও টের না পায়। তারপর অনেকক্ষণ বসে থাকে─ তার দীর্ঘশ্বাসেও কী বালি উড়ে! হয়ত উড়ে কিংবা উড়ে না। তার বুকের ভেতর কড়কড়ে বালির কঁকিয়ে ওঠা এবং পানি আর বালির মিলনস্থলের গভীর কান্নার মৃদু প্রবাহের শব্দ সারা চরজুড়ে স্তব্ধ শূন্যতায় কুচান তরঙ্গের মত ছড়িয়ে পড়ছে। নদীর এই ক্রন্দনধ্বনি জগৎ-সংসারে কোনই বিচলন সৃষ্টি করতে পারছে না─ লোকটা তা ভেবে হতভম্ব। বর্ষায় তিন/চার মাইল [ওর বাবা দেখেছেন পাঁচ/ছ’মাইল] দীর্ঘ পাড়ি─ সেই নদীর সাগরের মত ঢেউ ভেঙে─ ঘূর্ণিঝড়ের মত রাতে ডিঙিয়ে রূপালি ফসল তুলে আনা─ ফসলের ছটফটানি─ ছলকানো জলে চোখ-মুখ-বুক ভিজে যাওয়ার সেই হিরন্ময় সময়─ সেই স্মৃতি আর তা থেকে লাফিয়ে ওঠা রুই-কাতলা-মৃগেল-বোয়াল-চিতল-কালি বাউস-গইন্যা-সরপুঁটি-আইড়-গুজি-গলদা চিংড়ি─ কত কত মাছ─ সুস্বাদু মাছ─ রূপালি জলের মাছেদের শরীরে একদিন হাত না পড়লে তার মনে হত─ সে নেই─ পানি নেই─ নদী নেই এবং কোথাও কিছু নেই─ যা তার অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত─

[ উত্তাল তরঙ্গ-তীব্র রাতে-ঘূর্ণিবায়ূ- কত বৈরিতার সঙ্গে জেলে-ডিঙ্গি নৌকা আর বৈঠার লড়াই─ বিভিন্ন বাঁকে-ডোবায় মাছধরার বিচিত্র সব স্মৃতির টুকরা─ যেসব কিছুদিন আগেও এতটা মনে পড়ত না─ এখন জ্বলজ্বল করছে ছায়াবাণী-অলকা হলে উত্তম-সুচিত্রা আর দিলীপ-বৈজয়ন্তীমালার বায়োস্কোপের মত। ম্যাটিনি শো-তে অনেক বায়োস্কোপ দেখেছে─ বহু গান তার কণ্ঠস্থ ছিল-সেই সময় সুর ছিল তার গলায়─ শরীরে আর হৃদয়ের ভেতরও।

[ আমরা এই লোকটার আরও অনেক কথাই বলতে পারি─ মালোজীবনে নেমেআসা স্তব্ধতা─ আর্থিকদৈন্য─ জীবন ধারণের সংকট─ স্ত্রী-পুত্র-কন্যার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন এবং পাড়া-প্রতিবেশীর তুচ্ছতাচ্ছিল্য─ নানা অপমান-গ্লানি-পীড়ন─ কিন্তু হবে কী সেসব বলে! ব্যক্তি মানুষের হাহাকার-আর্তির কথা─ পরিবার-গোষ্ঠির বেদনাভারের কথা কতই তো লেখা হয়েছে─ হচ্ছে! তীব্র রাতোবতী গায়ে-পায়ে বড় একটা নদীই যেখানে মরে পড়ে আছে সেখানে নিম্নবর্গীয় কিছু মানুষের কথা কে আর গুরুত্ব দিয়ে ভাববে─ কেন ভাববে!

[ ব্যর্থতার হাহাকারে ধূসর কষ্টে ডুবে যাওয়া কেষ্ট নামের লোকটার লম্বা পা ফেলে দক্ষিণ থেকে উত্তর─ আবার উত্তর থেকে দক্ষিণে হেঁটে যাওয়া─ শূন্য উদরে ক্ষুধার বাতাস চেপে রাখা ছাড়া আর কিইবা করার আছে! নির্জন রাতে জনমানবহীন নদীর এই বালির চর তার পাশ ঘেঁষে অতি ক্ষীণ চিকন জলের রেখা কোথাও আছে─ কোথাও প্রায় নেই─ রাত্রিকালে এইটুকুই যেন তার একান্ত আপন। নদীর উদ্দাম তরঙ্গ রাতে আর রূপালি শস্যের মাঝখানে তার তারুণ্য ছিল খরসূর্যের মত উজ্জ্বল আর নদীজলে মাছেদের মত স্বচ্ছন্দ। দিনের বেলা সে কখনও নামে না বালির চরে বা যায় না ক্ষীণকায় রাতের ধারেকাছেও─ জ্যোৎস্না রাতে মরাগাঙে অলৌকিক তরঙ্গ দেখে─ তরঙ্গে তরঙ্গে প্রসারিত দেখে তার জীবনের ছটফটে অতীত অধ্যায়─

[ বালি গিলে খেয়েছে জলদ কোরাসের গীতল লহর যা জেগে ওঠত ঘেরজাল-ছুটাজালে-বৈঠায় প্রাণবন্ত নদীর যৌবন-জলে। সুরেলা সেই ধ্বনিপুঞ্জ রাতের নির্জনতায় জলের প্রবাহের মত আকাশে উঠে যেতে দেখেছে সে─ দূরে কাশবনের তুলার মত সাদা ফুল আর আকাশ সে রাতে একাকার হয়ে গেছিল। ওর মেজোকাকার বড় ছেলে নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে যে মুহূর্তে জাল ছুঁড়ে মারছিল ঘোলা জলে ঠিক তখনই তার মাথা আর জাল ছুঁই ছুঁই করে নদীর গীতল কথামালার উর্ধগমনের ওই দৃশ্যটি সে দেখে─ তার বৈঠা থেমে গিয়েছিল। দাদা ধমকে ওঠে, ওই কেষ্টা─ ঘুমাইতাছস নাহি? সচকিত কেষ্ট আবার বৈঠা মারে─ দাদাকে কিছু বলে না। কৈশোরে আরও কত অবিশ্বাস্য দৃশ্যই না সে দেখেছে এই বিশাল নদী-জলে-রাতে-ফসলে। টিপ টিপ বৃষ্টিতে জাল ছুঁড়তে গিয়ে জালের ওপর দিয়ে মৎস্যকন্যাকে গড়িয়ে পড়তে দেখেছে─ যতই মনে পড়–ক─ [সরকারবাড়ির ছোট সরকারের মেয়ের আচমকা কন্ঠস্বর : ওই তুমি গতা জেলের পোলা না─ ড্যাব ড্যাব কইরা দেখ কী─] ‘সেদিন নদীর রূপালি ফসলের ভারে জাল ভরে ওঠেছে─ আঙুলে পেচান রশিতে আকাক্সিক্ষত টান─ দুই হাতে জাল গুটাবার তীব্রতা─ কৈশোর ও প্রথম যৌবনের সেইসব মুহূর্ত ধূসর এই বালির তলায় চাপা পড়ে গেছে─ কোনদিন সামনে এসে দাঁড়াবে না─ জলজীবি মানুষ আর কোনদিনও জালভরা জলের ফসল তুলে নিতে পারবে না─ শুধু থাকবে শূন্যতা-কষ্ট-হাহাকার হাজার হাজার বছরের পেশা তামাদি হয়ে যাওয়ার অন্তহীন কান্না─

[ ডিঙ্গি নৌকার ছোট্ট ছইয়ের তলায় লম্বা হাতলযুক্ত পাটকাটা দা’ গুঁজে রাখা হত─ নদীতে তখন কোন দস্যু-তস্কর ছিল না─ তারপরও এই দা’ কেন─ প্রশ্নটা কৈশোরে তাকে বেশ আলোড়িত করত। অমাবস্যার পরের রাত মধ্যভাগের ঠিক আগ মুহূর্তে জালে আটকে গেল একটা কুমীর─ বাবা দ্রুতই ওই লম্বা হাতলের দা দিয়ে জালটা কেটে দিলেন। কুমীরও হাঁফ ছেড়ে বেঁচে সাপের মত সোজা-সাঁতারে ভাটিতে ভেসে গেল। রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ল─ নদীতে কুমীর এসেছে। কিশোর কেষ্ট জাল কেটে দেয়ার মূহূর্তে অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছে─ জালখান কাটলা ক্যান বাবা─ বাবা নিরুত্তর। অনেকদিন পর বাবার কাছে জানতে পারে জাল কেটে না দিলে একটানে নৌকা ডুবিয়ে কাউকে না কাউকে গিলে ফেলত ওই কুমীর। এ-ও জানতে পেল─ কুমীর বিপদে না পড়লে সাধারণত সোজা চলে না আর সাপ ডাঙ্গায় এঁকেবেঁকে চললেও নদীতে রাতের চাপে চলে একদম সোজা─

[লোকটা তার নিজের ভাষায় নিজের মত করে ভাবে─ সত্যই কী আর কোন উপায় নেই জলজীবি মানুষের জলে বিচরণের─ জলের রূপালি ফসল আহরণের অধিকার কী একদম গায়েব হয়ে যাবে? এরপর আর কিছু ভাবতে পারে না সে─ তার ভাবনার জালে গেঁরো লাগার মত দশা─ যা না কেটে কিছুতে ছাড়ান যায় না─ শেষ পর্যন্ত বালিচরে উবু হয়ে বসে পড়ে─ নিঃশব্দ চিৎকারে আকাশ-বাতাস ফাটায়, ভগবান তুমি এই গাঙের পানি কুথায় নিলা─ কোথায় গেল জলের ফসল─ আমগর ফসল?

[ আপনাদের মনেও কি এই প্রশ্ন জাগছে না─ লোকটার এইসব কথা যদি দৈবক্রমে প্রকাশিতই হয়ে পড়ে আর গোটা দেশ তোলপাড় হয়ে যায়─ তাতেই কি নদী জলে টইটম্বুর হয়ে যাবে─ তাদের জাল ভরে ওঠবে জলের ফসলে?

দুই


[ মুর্শিদাবাদি শাড়ি পরে নরম পোটলার মত তার ঘরেআসা বউ সাবিত্রী এখন মাঝেমধ্যে কথা বলে আপন মনে─ কার সঙ্গে বলে তা যারা শোনে সবাই বোঝে─ বোঝে না শুধু যার উদ্দেশে এসব ঘোরানো-প্যাঁচানো কথা সেই লোকটা─

[ বউ বলে, মানুষ যে হারারাইত গাঙে থাকে─ গাঙ তো নাই বালুরচরে কার লগে কুস্তাকুস্তি করে─ এইদিকে মাইয়াডার কী দশা─ ছোট পোলাডায় করে কী─ হেই খবর কেডায় রাখে─ বড় মাইয়া দুইডা মইরা না গেলে অহন কী হইতে কেডায় জানে─ বাচনের লাগি মানুষে কতকিছু করতাছে─ একটা কিছু তো করন যায়─ কেডায় হুনে কার কতা─

[ লোকটা চুপ করে থাকে─ তার বাবা বলতেন─ বোবার শত্রু নাই─ সে বোবা-কালা-অন্ধ-স্থবির হয়ে গেছে─ এই মরা গাঙের মত হয়ে গেছে─ গাঙের মত হওয়া ছাড়া তার তো আর কিছু হওয়ার সুযোগ নেই─ সে তো গাঙ ছাড়া─ গাঙের রকমসকম ছাড়া জীবনে আর কিছু জানতেও চায়নি। লোকটা বোবা হয়ে থাকলেও এখন আর বউ থামে না─ সংসারের কার্নিশে দাঁড়িয়ে কেউ কী থেমে থাকতে পারে?

[ লোকটার তারুণ্যের মাঝামাঝি সময়েই নদীতে মাছের আকাল দেখা দেয়─ এখন প্রৌঢ়ত্বে রোজগারের দুর্বলতা ঘরে থাকতে দেয় না কিংবা সে পালিয়ে থাকতে চায়। নদীকে সে ভালবেসেছে─ ভেবেছে নদী কখনও মুখ ফিরিয়ে নেবে না─ নিতে পারবে না─ কারণ তাকে বইতে হবে─ প্রবহমানতাই নদীর জীবন─ সেই নদীই তার চোখের সামনে মরে গেছে─ পানিই যদি না থাকবে তো সে আর নদী হবে কী করে! বিশাল এই নদীরই যৌবন যেখানে শেষ সেখানে তার যৌবন? অসম্ভব নরম আর ভেজা ভেজা ঘ্রাণের শরীর নিয়ে অভ্যাসমত ভোররাতের দিকে তার বউয়ের ভেতরটা এখনও কী রকম তোলপাড় করে সে কী জানে!

[ জিতেন্দ্র মাস্টার বলতেন, জানস─ প্রায় শ’দেড়েক বছর আগে আসামে যে বড় ভূমিকম্প হয় তাতে এই নদীর মূল স্রোতের মুখ সংকুচিত হয়ে যায়─ বেশির ভাগ পানি বইতে থাকে আরেক নদী দিয়া। সেই যে শুরু মূল স্রোতের মরণদশা তার আর শেষ নাই। বিশাল এ নদীর জীবনবৃত্তান্ত- পর্বতমালার নিষ্কাশন খাল- সর্বাধিক পলি বহন- উপত্যকায় উর্বর জমিন- কৃষিতে অবদান─ বাণিজ্যে সৃষ্ট সভ্যতা এখনও ধূসর ইতিহাসের তলে হাঁসফাঁস করছে─ আর এই সবই কিছু কিছু শুনেছে মাস্টারের কাছে। স্কুলের দক্ষিণে খোলা মাঠে ওরা জাল সেলাই-মেরামত করত─ সেখানে এসে মাস্টার ওদের খোঁজ-খবর নিতেন─ কথাবার্তা বলতেন─ ছেলেপিলেদের লেখাপড়া করাবার তাগিদ দিতেন। কেষ্টই বাবাকে উৎসাহিত করে ছোটভাইটিকে জিতেন্দ্র মাস্টারের হাতে তুলে দিয়েছিল─ মেট্রিক পাসের পর উড়ু-উড়ু মন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়─ একদিন বলে বসে─ মধুপুরে এক মেয়েকে বিয়ে না করালে গলায় দড়ি দেবে─ বৃদ্ধ বাবা কেষ্টকে বলেন, দেখছস বিদ্যাশিক্ষার ফল কী! এই বয়সে তুই কি বিয়ার নাম নিছস? সেই ভাইটি বিয়ের পর শ^শুরের শলা-পরামর্শে কুচবিহার চলে যায়─ একটা মাত্র ধানীজমি তাও খোরাকি দিয়ে ওকে টাকা দিতে হয়─ সেই ক্ষেত আর ছাড়ানো যায়নি─ আয়-উপার্জন নেই─ আর কোন সম্বল নেই─ শেষ পর্যন্ত ওই ক্ষেত সাফ-কাবলা করে দিতে হয় নবে বেপারির সুদখোর ছেলেকে─

[ একদা বিশাল এই নদী আজকাল বর্ষায় ফাঁক-ফোঁকর গলিয়ে কিছু পানি ঢুকে পড়লেও বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই ভাঁটির টান লাগে─ পানি নেই─ মাছ নেই। অঢেল মাছের জন্য সারা এলাকায় খ্যাত নলগড়ের ডোবা─ স্রোতহীন শুষ্কপ্রায়-ভরাট পায়ের পাতা ভেজাবার মত পানি থাকলেও মাছ নেই। আর যে ক’টা বদ্ধ ডোবা-নালায় কিছু কিছু মাছ থেকে যায়─ সে সব জাল দিয়ে আটকে ডালপালা ফেলে রাখা হয়─ যার নাম মাছচাষ। লাঠির জোর আর ক্ষমতা যাদের─ নদীর অল্প পরিমাণ জলটুকু এখন তাদের কব্জায়─ সেখানে নামতে পারে না জেলেরা─ জেলেদের হাত খুব শক্ত─ উড়াজাল ফেলে আর ঘেরজাল টেনে হাত শক্ত হলেও লম্বা নয়─ লম্বা প্রভাবশালীদের হাত─ শহরে বসে থেকে তারা যতটুকু জল আছে হোক সে বদ্ধ তা-ও নিজেদের মধ্যে ভাগ করেÑ এইসব কথাবার্তা লোকটার মাথায় তার ভাষায় তার মত করে ঘুরপাক খায়─ তবে একটা শব্দও উচ্চারিত হয় না─ নিঃশব্দ এই কথাবার্তা মৃতপ্রায় নদীর বুকে কোনই আঁচড় কাটতে পারে না।

[ লোকটার কাকা নরু বলে─ জাউল্যারা অহন মাছমারা ছাইড়াই দিছে। ভদ্দরলোকেরা যহন মাছচাষে নামছে─ নিজেরাই মাছ ধরে─বেচে তহন জাউল্যাগর আর উপায় কী!

[ এই প্রশ্নের জবাব নেই─ তবু এই লোকটা বুঝতে চায় না সে নিঃশব্দে গলা ফাটায়─ ভগবানে গাঙ দিছে-খাল-বিল দিছে-হেইসবে পানি দিছে-জোয়ার-ভাঁটা দিছে-মাছ দিছে─ পানির আরও নানান জীব দিছে─ এই সব জায়গায় মাছ ধইরা খাইয়া-পইরা বাচবে কৈবর্তরা─ অহন অতগুলান মানুষ বাঁচবে ক্যামনে─ কেডায় দিব এর জবাব?

[ একদিকে দু’পাশে উঁচু বাঁধ দিয়ে ডিপ-টিউবওয়েলের পানিতে জলাশয় বানিয়ে মাছচাষ চলছে─আরেকদিকে যেখানে অল্প পানি অবশিষ্ট আছে সেখানেও বানা দিয়ে আটকে মাছচাষ হচ্ছে─নদের চ্যাপচ্যপে পানি আর উর্বর মাটিতে মাখামাখি দশায় মাছ বাড়ে দ্রুত─ চাষের মাছেও নদীর আগেকার মাছের স্বাদ অনেকটাই পাওয়া যায়─ বেশি দামে বিক্রি হয়─ রাজধানী ছাড়াও বড় শহরগুলোতে নদীনালা-খালবিলের মাছের কদর আর দামও বেশি। লোকে বলে─ অমুক অমুকে ইজারা নিয়েছে প্রশাসনের কাছ থেকে─ লোকটার মনে বরাবরের প্রশ্ন- নদী তো সবার জন্য উন্মুক্ত─ জেলে-চাষী-বিত্তবানে কোন ভেদাভেদ নাই─ এই কথাটা কেউ জোরেসোরে বলে না কেন? এ প্রশ্নের কোন জবাব খুঁজে পায় না আরও অনেকের মত কর্মহীন অসহায় লোকটা। ছোটবেলায় শুনত : গাঙের মালিক নাই─ গাঙের মালিক দেশ─ দেশের বেবাক মানুষ─ কেষ্টা জেলের দীর্ঘশ্বাস বেরোয়─ হায়! আগেরকালের মানুষ কতই না অবুঝ আছিল─

টানে পশ্চিমদিকে মাইল দুয়েক দূরে একটা বিল ছিল- প্রচুর জিয়লমাছের ওই বিল এখন কিছু দিয়ে- কিছু না দিয়ে মোড়লবাড়ির প্রভাবশালীরা পুরাটা দখলে নিয়েছে- বিলে লাইন বেধে ফিশারির পুকুর─ মাছচাষ হয়─ চারদিকে পাহারাদার─ জেলেদের জাল নিয়ে নামবার জায়গা কোথায়?

[ মাঝখানে স্কুলের মাঠের পূব কিনার ঘেঁষে যেখানটায় কদমগাছ ছিল ওই বরাবর সাদা বালিতে কৃষ্ণকায় রোগাটে দীর্ঘাঙ্গ লোকটা উত্তরমুখী হাঁটু গেড়ে বসে। আচমকা সামনে কুয়াশার আড়ালে ওর বাবা গতা জেলে─

[ : অত ভাবতাছিস ক্যান? অতি ভাবনা মানুষরে অস্থির কইরা তুলে─ কুনুদিকে স্থির হইবার দেয় না। বুঝলি কৃষ্ণ─ আমরা জলদাস─ জলই নাইতো কার দাস আমরা─ ভগবান আমগর দাসগিরির যামানা শেষ কইরা দিলে কার কী করবার আছে! নাই─ কিছু করবার নাই─ এই সত্যখান যে যত আগে বুঝবার পারবে সে-ই বাঁচবার পারবে বুঝলে─ বাঁচবার হইলে নাও-বৈঠা আর জাল বালির তলে ঢুকাইয়া রাইখা অন্য কামে লাগন লাগবে যে কামে কিছু ট্যাকা আইবে─ চাইরটা ভাত খাইয়া বাচন যাইবে─

[ লোকটা বলে, তাইলে মাছের কী অইবে─ মাছে-ভাতে বাঙালি কী পাঞ্জাবি হইয়া যাইবে─ গোস-রুটি খাইবে?

[ বাবা বলে, দূর বেক্কল এইডা কলিকাল বেবাক কিছু উল্টাইয়া যাইতাছে─ বাবুরা অহন মাছ পালতাছে-ধরতাছে ওই যে কি কয় ফিশারি─ মাছ ধরা নয়─ মাছ চাষ অহন তাইনেগর জীবিকা─ এই লাগি নদীর দখল চাই─ পুকুর-দীঘির মালিক হওন চাই─ জলে-নদীতে-জমিতে কুরু-পান্ডবের লড়াই হইবে─

[ কেষ্ট বিস্ময়ে থ‘ বাবা তুমি লেখাপড়াজানা মানুষের লাহান কতা কইলা!

[ বাবা হাসে, আরে বেডা মরনের পরে সবেই সমান─ কারও অজানা কিছু নাই─ কারও কোনকিছুতে বাধা নাইÑ সব দেখা যায় সব বোঝা যায় এইখানে─

[ আচমকা কুয়াশা পাতলা হতে হতে স্কুলের মাঠ-কদমগাছ-হিজলগাছ সব স্পষ্ট হয়ে ওঠে─ কোথাও আর কেউ নেই─ চারদিকে ধূ ধূ শূন্যতা─ অপরিসীম শূন্যতা─ বাবার কণ্ঠ-ওইসব কথাবার্তা সত্যই কী বাবার নাকি শোনার ভুল সহসা বুঝতে পারে না মালোপাড়ার কেষ্টা জেলে। তখনই মনে পড়ে মালোপাড়ার শত বছরের নেইন্যাবুড়ার কথা─ ভাঙাঘরের আরও নুয়েপড়া উসারায় বসে থাকে বুড়া─ যার পায়ের শব্দ পায় তাকেই ডেকে বসিয়ে বলে, চক্ষে দেখি না─ প্রভাত ডাক্তরে কয় ছানি পড়ছে─ কিন্তুক মগজটায় ছানি পড়ে নাই গো─ গোটা জেলেপাড়া বিরাণ হইয়া যাইতাছে─ গাঙে জল নাই─ জলের ফসল নাই─ গাঙে জলের আশায় কতকাল নিষ্কর্মা থাকবে জেলেপাড়ার বেটাছেলেরা─

[ এই পর্যন্ত বলে ঝিম মেরে থাকে নেইন্যাবুড়ো। অনেকক্ষণ পর তার অস্পষ্ট স্বর বাতাসে কাঁপে, কিন্তুক জলদাস─ কলিকালে এই জলদাসের কি হইবে ফয়সালা─ গাঙে জল নাই─ জলদাস আছে নিত্য উপবাস─ এ কোন্ ফয়সালা ভগবান তুমিই ভালা জানো!

[ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে─ বয়সের ভারে শরীর চলে না─ মাথাটা অবিরত কাঁপে─ গলাও কাঁপে, আজকাইল কালিবাউস আর কমলা রঙের ডিমওয়ালা ছটকা ইচামাছ কি আগের মতনই আছে রে?

[ ছটকা চিংড়ি আর কালিবাউসের কথাটা নির্দিষ্টভাবে কারও কাছে বা সবার কাছে বলে না─ বলার ভঙ্গিটাও সরল নয়─ তা সবাই না হলেও কেউ কেউ বোঝে─ অসহায় এই লোকটা বোঝে। এই দুই প্রকারের মাছ ছাড়াও কত সুস্বাদু মাছ এক সময় প্রতিদিনই প্রচুর পরিমাণে শতায়ূ এই মানুষটির জালে ধরা পড়েছে─ অতি সাধারণ মাছের জন্য এই বৃদ্ধের কতটা আকুলতা তা বোঝেও কিছুই করার নেই লোকটার─

[ প্রবহমান নদী নেই─ তার জীবনও নদীর মত বয়ে যায় না─ নদী নেই তো তার জীবন কোথায়? গাঙের পানি কমতে থাকে─ মাছ কমতে থাকে─ কোথায় যায় পানি আর মাছ সে জানে না─ সে দেখছে আয়-উপার্জন নেই─ দিনে আধপেটাও খাবারের যোগাড় নেই─ এসবের সঙ্গে সঙ্গে তার অজান্তেই যৌনক্ষুধা কমতে থাকে─ বউ নানাভাবে আভাসে ক্ষুধার কথা জানালেও তার কোন সাড়া নেই─ সে বুঝতে পারেনি এভাবে তার দেহযন্ত্রও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে─ সে ভেবেছে অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠে সেই প্রথম যৌবনের মত মুক্তমনে আদর-সোহাগের কথা ভাববে।

[ আমরা একটু খেয়াল করলেই দেখব─ আকাশে চাঁদ থাকুক বা না থাকুক লোকটা মাতার চায়ের দোকানের পেছন থেকে বের হবেই─ বিকাল থেকে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত ওখানেই থাকে─ মাতার পোলা এখনও চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয়, নেও কিনুকাহা চা খাও─

[ লোকটার হৃদয়ের ভেতর যে চোখ সেই চোখ ছাপিয়ে অঝোরে জল নামে─

[ গোপাট পেরিয়ে ডিস্ট্রিক বোর্ডের সড়ক─ পূর্ণচন্দ্রের মরিচ ক্ষেত─ ডানদিকে চাউগাছ-তালগাছ-বাঁশঝাড় ছাড়িয়ে কাজিবাড়ির গোরস্তান বাদিকে সরকারদের খালি ভিটা─ একাত্তরে পাঞ্জাবিরা যেদিন কামানের গোলা আর মর্টার শেল মারতে মারতে ময়মনসিংহ প্রবেশ করে সেদিন সেই যে সদ্য জোয়ারআসা ব্রহ্মপুত্র পাড় হয়ে ঈশ্বরগঞ্জের দিকে গেল আর ফিরল না হেমাঙ্গ সরকারের ছেলেরা─ বড় ছেলে অনন্ত সরকার বাহাত্তরের শেষদিকে এসে আধাদামে সব জমিজমা বিক্রি করে চৌদ্দ পুরুষের সমুদয় স্মৃতিচিহ্ন অন্ধকারে উলটপালট বাতাসের তলায় লুকিয়ে রেখে একদিন খুব ভোরে ময়মনসিংহ স্টেশন থেকে মেল ট্রেন ধরে লালমনিরহাট গিয়ে একবারও কী পেছন ফিরে তাকিয়েছিল নাকি বুড়িমারি বর্ডার পার হয়ে নতুন দিগন্তে পৌঁছে গেছে─ লোকটা জানে না। কিন্তু এই ছেড়ে যাওয়ার কথাটা মনে হতেই তার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়─ দ্রুত ভাবনার পাতা উল্টে ফেলে চেপে ধরে। এভাবে রাতভর হাঁটতে হাঁটতে কত যে পাতা উল্টায় আর চেপে ধরে তার সীমা-সংখ্যা নেই।

[ সরকারদের ভিটায় এখন ঘুঘুও চড়ে না─ পাখিদেরও আকাল তা নাহলে কোথায় চলে যাবে তারা─ কেন যাবেÑ ভিটার দক্ষিণের আইল ধরে নদীর কাছাড়ে গর্তটায় নামতে নামতে পাকাচুল খোঁচাখোঁচা দাড়িসমতে হেমাঙ্গ সরকারের কথা মনে পড়ে─ শৈশবে বাবার সঙ্গে এই ঘাটে নৌকায় উঠত। হেমাঙ্গ সরকার বাংলাঘরের বারান্দা থেকে বলত, গতা বিহানবেলা আমারে না দেখায়া মাছ কিন্তুক বাজারে নিবা না─ ডাক্তার জামাই আইবে সে তো ব্রহ্মপুত্রের গুড়ামাছ খুব পছন্দ করে─ ওই জামাইয়ের লাশটা তার কালিবাড়ি রোডের বাসার সামনে পড়ে থাকতে দেখেছে মুরগির পাইকার মজিদ─ সে দাড়ি রেখেছিল ছোটবেলা থেকে─ বলত তার দাদি বলেছে দাড়ি না কামালে লইলি-মজনুর বিয়ের দাওয়াত খেতে পারবে। লোকটা এখন মাঝেমধ্যেই মজিদকে জিজ্ঞেস করে, মইজ্জাভাই হেম সরহারের ডাক্তার জামাইয়ের লাশখান কি পথের মধ্যি ছিল নাকি ঘরের ভিত্রে? মজিদ বলে, আস্তে আস্তে বুইলা যাইতাছি─ তয় লাশ দেখছি─ এইডা ঠিক─ পাঞ্জাবিগর দাবড়ানির লাগি এক লহমায় যা দেখনের তা দেখছি─ ধবধবা ফরসা সাবের বাচ্চার লাহান আছিল হেম সরহারের জামাইডা─

[ প্রথমদিকে লোকটার বউ বাগড়া দিত─ রাত-বিরাতে বাড়ি থেকে বের হতে দিত না─ রাগ করত আর এই নিয়ে দু’জনের ঝগড়াঝাটিও হত। বলত, পুরানা গাঙ─ দুই পাড়ে গাছগাছালি আর জঙ্গলে ভুতপেত্নি আর বদ জিনিসের বসত─ মানুষের আত্মায় ডর-ভয় থাকন লাগে─ হে মরলে মরুক গা কিন্তু গোষ্ঠির কী অইবে─ এই চিন্তাখান যার নাই হেরে কেডায় মানুষ কইবে!

[ এখন বউ আকাশের দিতে তাকিয়ে একরকম উদাস কণ্ঠে বলে, বাইরে গেলে যাওক─ তয় তাড়াতাড়ি আইতে অইবে─ রাইত-বিরাতে মরাগাঙে ঘুরন আর গাঙের পাড়ে আজইরা গাছের ডাইলে শুইয়া থাকনডা ভালা না─

[ বউ যা-ই বলুক যে উদ্দেশেই বলুক গভীর রাতে মরা-নদী সামনে নিয়ে ওই গাছে চিৎ হয়ে-থাকা বড় ডালটায় পিঠ লাগাবার পর এত শান্তি যা প্রকাশ করতে পারে না লোকটা। একাত্তরে যুদ্ধের সময় কান সজাগ রেখে এভাবেই শুয়ে থাকত- পানিতে বৈঠা মারত শব্দ হত না- প্রায় প্রতি রাতেই মুক্তিযোদ্ধাদের পার করেছে─ কেউ জানে না কত মুক্তিযোদ্ধা পার হয়েছে─ এই হিসাব লোকটাও রাখতে পারেনি। এই গাছের ডালে শোয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের নিঃশব্দ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ক্লান্তিহীন চাহনির কথা মনে পড়ে─ আজকাল কষ্ট হয়─ খালি কষ্ট─

লোকটার এই যে এখন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে─ বাবাকেও দেখতে পাচ্ছে এখন─ তার অন্তিম সময় সে দেখেছে─ কিভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস মৃদু হতে হতে এক বিরল মুহূর্তে চরাচরে মিশে গেল─ মরিচারচরে একগোছা ঝাউ গাছে চাঁদ সে রাতে অসম্ভব জোছনা ঢেলেছিল─ চারদিকে জোছনার করতালিতে রাতটাই ফেটে পড়ছিল─ বাবার অন্তিম সময়ে জোয়ার ছিল─ জোয়ারে মাছ ছিল। বাবা বলতেন ফসল-জেলেদের নদী-জমির সেই ফসল─ বাবা ছিলেন ভাগ্যবান নদীর জোয়ারকালে─ ফসলের সুদিনকালে চলে গেছেন─ বাবার চিতা-ছাইভষ্ম চলমান জলের ছলছলাৎতে মিশে সাগরে শয্যা ─ই অনন্তশয্যার কথা বাবা বলতেন─ হাতে ব্রহ্মপুত্রের জল তুলে ধীরে ধীরে সেই জল স্রোতে মিশিয়ে দিতে দিতে বলতেন─ আমার যেন মরণ হয় ক্ষেতে─ রূপালি শস্যের এই ক্ষেতে─ তাই হয়েছিল─ সেদিন ছিল আষাঢ়ী পূর্ণিমা─ বাবা অহিংস নীতিতে বিশ্বাস করতেন- গৌতম বুদ্ধ বা মহাবীর নিয়ে তার কোন পড়াশোনা ছিল না─ সুরেশ পন্ডিতের টোলে মাত্র ছ‘মাস হাজিরা দিয়েছিলেন─ তবে তার হস্তাক্ষর ছিল গোল গোল নিটোল যাকে বলা হয় মুক্তার মত─ বাবার এই মুক্তার মত হস্তাক্ষরের কথা মনে পড়তেই লোকটা নিঃশব্দে হেসে ওঠে─ তার বড় সখ ছিল বিয়ের পর বউকে দিনু পোদ্দারের কাছ থেকে একটা মুক্তার লকেট বানিয়ে দেবে─

তিন

[ দক্ষিণে যেখানে শেষ মাথা ছিল সেটা এখন আর শেষ মাথা নয় আরও দক্ষিণে বহুদূর বিস্তৃত হয়ে গেছে বালিচর। ছোটবেলাকার বালিচরের একেবারে শেষ মাথায় ফুলপুর ঘাটের উল্টোদিকে এখনও তিরতির করে কিছু পানি বইছে। সংকীর্ণ নালায় কোথাও একহাত কোথাও আধহাত পানির প্রবাহে হঠাৎ হঠাৎ কিছু দারকিনা মাছ উজান ঠেলে এগোবার চেষ্টা করছে। লোকটা ভেজা বালিতে হাঁটু মুড়ে বসে দারকিনা মাছের চলাচলের চেষ্টা লক্ষ্য করছ─ তার দৃষ্টিতে দারকিনার চোখ বড় হয়ে ওঠে। আরও বড় হয়ে ওঠে ওদের চোখের ভেতর জমে থাকা কষ্ট─ নদীজীবি মানুষের মত।

[ এখানটাতেই তার দেখা হয় লতু ডুবুরির সঙ্গে─ নদী শুকিয়ে যাওয়ায় তারও আর কোন কাজ নেই। আগে ভাঙতিরবাজার ঘাট থেকে ফুলপুর ঈদগাঁ মাঠ হয়ে ভাবখালির বাজারঘাটে শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত রিঠামাছ ধরত─ ঈদগাঁ মাঠে বসে মাছ বিক্রি শেষে কানাইয়ের দোকান থেকে চাল-ডাল কিনে কখনও কখনও বাড়তি একটা রিঠামাছ কাঠিতে ঝুলিয়ে ঘরে ফিরত। এখন গভীর পানি নেই রিঠামাছও নেই─ নির্বাক কেষ্ট আর লতু শেখ। অলস পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বালিচরের উত্তরপ্রান্তে সদু বেপারির কদমগাছ তলে যায় যেখানে মরাগাঙে শূন্যদৃষ্টি মেলে বালিতে বসে আছে ডেউকি। তিনজনের কথা মানে দুয়েকটা ভাঙা ভাঙা বাক্য─ যাতে প্রশ্ন থাকলে জবাব নেই আর জবাব থাকলেও প্রশ্ন নেই। অর্থাৎ প্রশ্ন ও জবাব─ কোনটাই তাদের নেই─ অনেকটা নিজের সঙ্গে নিজেরই কথা বলার মত। তারপরও তিনজনের এসব নিঃশব্দ-সশব্দ কথাবার্তা প্রতিক্রিয়াহীন বিক্ষিপ্ত শব্দ মাত্র নয়। নৈরাশ্য-হাহাকার-অস্তিত্বের অন্তহীন সংকটে কান্নার রেশ নদীর ক্ষীণ রেখায় বিশাল পশ্চিম প্রান্তজুড়ে বিস্তীর্ণ বালুকারাশিতে প্রবাহিত হয়। জ্যোৎস্নায় ঝিকমিকিয়েওঠা বালিতে মাজা ডুবিয়ে বসে থাকা তিনটি নিথর ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে মৃত নদীর শরীরের ওপর কালসিটে দাগের মত সেঁটে থাকে।

[ কেষ্টর চোখে ভেসে ওঠে ওজানের কথাÑ সাবিত্রীর পোক্ত নরম শরীরের ছটফটানি। সে কতদিন-কতকাল─ মনে হয় সময়টা আকাশ পার হয়ে কোথাও গায়েব হয়ে গেছে─ সেই সময় কী আর ফিরে আসবে! এরকম গোপন যন্ত্রণা কি ডেউকির-লতুরও আছে? কেষ্ট ভাবে জীবনধারণ ছাড়াও দুঃসহ এরকম যন্ত্রণায় তারাও হয়ত কাতর। ডেউকির বউ তাকে ছেড়ে চলে গেছে─ যুবতী বউ লছমি সম্পর্কে প্রৌঢ় ডেউকির সুখদ উচ্চারণ─ হামার বহু কইতরের ছানা─

[ ডেউকির সুদিনের এসব কথা কেষ্টর যখনই মনে পড়ে নিঃশব্দে বলে─ আহা বেচারা ডেউকি! ডুবুরি লতু কানার বউ শহরে বাসায় ঝিয়ের কাজ নিয়েছে। স্বাস্থ্যবতী ঝিদের কি দশা কে জানে! লতু কানা যখন বলত─আমার বউয়ের শরীর-স্বাস্থ্য মাশাল্লাহ। একটুখানি পরপর পান খায়─ থাকি থাকি হাইসা ভাইঙ্গা পড়ে। খোদায় তো আমারে দেখনের লাগি চক্ষু দেয় নাই─ ভাবিছাবরা কয়। বউয়ের এই রূপের বিবরণ দিতে গিয়ে লতু কানার অট্টহাসি ব্রহ্মপুত্রের উত্তাল ঢেউয়ে গড়িয়ে পড়ত।

[ ব্রিটিশ আমলে ছত্তিশগড় থেকে আসা গুদারা নায়ের মাঝি ডেউকি আর গভীর পানিতে ডুবিয়ে ডুবিয়ে পাড়ের গর্ত থেকে সুস্বাদু রিঠামাছ তুলে নিয়ে আসা লতু কানার আত্মতৃপ্তির সেসব উথালপাতাল স্রোত আর প্রবাহিত হয় না বুকভরা বালির চাপে আধমরা এই নদীতে।

[ প্রতিরাতে মরা নদীর বালুচরে তাদের নিঃশব্দ অবস্থান। কেউ কারও দিকে না তাকিয়েও পরস্পরকে সঙ্গ দেয়─ তাদের চোখেমুখে ফুটেওঠা কষ্ট-যন্ত্রণার রক্তক্ষরণ কেষ্টজেলে পাঠ করতে চায় অন্ধকারে বা মেটে জ্যোৎস্নায় কিংবা পূর্ণিমার মখমলের মত আলোয়। কিন্তু পাঠ শেষ করার আগেই ওই ভোরের দৃশ্যটি তাকে বিব্রত করে তোলে। তার কী আর অধিকার আছে অন্যের মনের ভেতরের ভাষা পাঠের? ওদের সঙ্গে দেখা হয়─ কথা বিশেষ হয় না। কী কথা হবে সবই তো সবার জানা। শুধু হতাশা আর যন্ত্রণার জ্বালা বড় হয়ে উঠছে আর তার ভেতরে এই তিন নদী-মানুষ প্রতিদিন খর্ব থেকে আরও খর্ব হচ্ছে─ এই নৈশবিচরণ এলাকার সবাই জানে এবং এদের প্রসঙ্গ দূর-আধপাগল─ বলে দূরে সরিয়ে রাখে।

[ ডেউকি এবং লতুর কষ্ট-হাহাকার-নিপীড়নের কথাও আরও বাড়ান যেত─ তাদেরও এমন অনেক জরুরি-গোপন গল্প-কথা আছে যা শোনার জন্য পাঠকের আগ্রহ থাকতে পারে। তবে সেসব কথার ধরন কমবেশি একই─ বিশেষ বৈচিত্র নেই। কারণ যখন উপার্জন থাকে না─ পেটে ভাত থাকে না তখন অদ্ভুত সব অঘটন একই প্রক্রিয়ায় ঘটতে থাকে। অসহায়ের মত সেসব বহন করা─ হজম করা এবং দলিত-মথিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না এই সব প্রান্তিক মানুষের। কেষ্টজেলে-ডেউকি মাঝি-লতু ডুবুরিরা এ সত্যটা বেশ ভাল করেই বুঝতে পারছে।

[ লোকটা নিজের ভাষায় এখন নিঃশব্দ উচ্চারণে যা বলছে তা তারই নিজের আবেগে-আকুলতায় তুলে ধরা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু নিশাকালীন বিশাল বালিচরের আরও বিশাল শূন্যতা থেকে তার কিঞ্চিৎ ইঙ্গিতই আমি তুলে আনতে পারি─ এর বেশি কিছু নয়।

চৌদ্দ পুরুষের পেশা ছেড়ে দেব কেন? হাজার বছরের এই পেশার প্রয়োজনীয়তা কী সমাজে ফুরিয়ে গেছে? এই পেশা আমার অধিকার─ আমার বাঁচার অধিকার। ভগবান যে জীবন দিয়েছেন তা রক্ষা করা আমার দায়িত্ব─ কেন এই দায়িত্ব পালন করা যাবে না? কেন বাধাগ্রস্ত করা হবে? তার সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে খচিত এসব নিঃশব্দ প্রশ্নের কোন জবাবই আমি দিতে পারব না─ পারা সম্ভবও নয়।

[ বউ বালিতে পা ফসকে সেই যে গড়িয়ে পড়ার সময় বুকে তুলে নিয়ে জীবনের নতুন আস্বাদ ও মানে খুঁজে পায় তা তার কর্ম-উদ্দীপনা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। রাতভর নৌকা বাওয়া বা জালফেলা-জালটানার পর সবাই যখন পরিশ্রান্ত-ক্লান্ত  লোকটা তখন সবার অলক্ষ্যে শরীরে মধুর এক তেজ ও উদ্যামতা নিয়ে বাড়ি ফিরত। তার কাছে ভোর ছিল প্রাণবন্ত সময়─ গোপন-মোহন উপভোগ্য সময়। সাবিত্রীও কী ঘুমের ঘোরে তারই মত আকুলতায় দেহমন এক করে অপেক্ষায় থাকত না!

[ সারা জনপদ যখন ঘুমের প্রান্তিক আমেজে নিমজ্জিত ভোরের স্বচ্ছ নিষ্কলুষ আলো-বাতাসে পবিত্র অনুভূতিমাখা সেই মুহূর্তে ঘরের দরজা টান দিতেই এক বীভৎস দৃশ্য উন্মোচিত হল। সেই সুবাসিত শরীরের অদ্ভুত কোমলতা ওই পোংটা লোকটার শরীরের তলায় দলিত-মথিত হয়ে সুখদ শব্দে থরথর কাঁপিয়ে তুলছে তার ছোট্ট ঘর… 

[ নারীর বিশ্বাসভঙ্গের চিত্র তার হৃদয়ের গোপন-মোহন সব স্বপ্ন─ ব্রহ্মপুত্রে আষাঢ়ি বানের মত পৌরুষ─ কষ্টকর জীবন─ এই সবই এক মুহূর্তে পচিয়ে-গলিয়ে বিকট গন্ধ ছড়িয়ে দিল। লোকটা বুঝে ফেলল এর চেয়ে মৃত্যু ঢের ভাল তার মত এক পুরুষের।

[ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে জাল কাঁধে ঘুরে মানুষের পুকুরে মাছ ধরে দিয়ে উচ্ছিষ্ট কিছু মাছ নিয়ে শেষ মোড়ের এক কোণে বসে বিক্রি করে এক কেজি চাল-আধপোয়া ডাল আর একমুঠো পুঁইয়ের ডাঁটা নিয়ে ঘরে ফেরায় কোন গ্লানি ছিল না─ মৃত্যুর মত অশেষ কষ্টও ছিল না।

[ মরে বেঁচে থাকার কষ্ট নিয়ে এখন রোজ রাতে এই নদীর বিস্তীর্ণ বালিচর জীবনের সমান আক্রোশে খামচে বেড়ায় এই লোক। তার অভিমান-তার ক্ষোভ-তার আক্রোশ সবকিছু গলার কাছে হাড্ডি হয়ে আটকে আছে। তার ওপর পেন্ডুলামের মত ঝুলছে ওই দৃশ্য─ যে কারণে সে তার ক্ষোভ-আক্রোশও প্রকাশ করতে পারে না।

[ মিষ্টি কোমল সাবিত্রী বালার সুবাসিত নরম শরীরটাকে পচে-গলে যেতে দেখেছে সে নিজের চোখে। দু’জনের সম্পর্কের পচা-গলা লাশের মত গন্ধ এখনও তার নাকে সেঁটে রয়েছে। পবিত্র এই নদীর সীমিত জলে অসংখ্যবার নাক ডুবিয়েছে। দু’হাতে ডলেছে─ ডলতে ডলতে চামড়া ছড়ে গেছে─ দূর করা যায়নি ওই বীভৎস গন্ধ।

[ এখন মেনে নিয়েছে এই গন্ধ একবার নাকে লাগলে বুকের ভেতরে ঢোকে এবং চিতায় জ্বলার আগ-পর্যন্তমরনের মত এই গন্ধ থেকে আর বেরিয়ে আসার উপায় নেই। তবে গন্ধটা যে শবদেহের এটা এখনও ঠিক ঠিক মনে করছে না লোকটা। তার কৈশোরকালে মরিচারচরে গলুইভাঙা ডোবায় মাছ মারতে গিয়ে সন্ধ্যারাতে ভাটিতে নৌকা বেঁধে ঘুমিয়েছিল তারা। শেষ নৌকায় তার পাশে শুয়েছিল সত্তর বছরের সুরুজ্যাঠা। পূবদিক থেকে বড় তারাটা যখন কাত হয়ে দক্ষিণে সরে যায় তখনই জাল ফেলা শুরু হয়। সময় মত জ্যাঠাকে তুলতে গিয়ে দেখে তার শরীর ঠান্ডা। অজানা এক ভীতি তার কণ্ঠে চিৎকার হয়ে ফেটে পড়ে ঘোলা নদীজল-ছাইরঙা আকাশ আর ঠান্ডা বাতাসে। চারপাশের নৌকা থেকে লাফিয়ে নেমে আসে অন্যরা।

[ সে জানাল─ জ্যাঠা উঠতাছে না─ জ্যাঠার শরীর ঠান্ডা-শীতল। সবাই বুঝতে পারল শোয়ার পরপরই মৃত্যু হয়েছে তার। মরা মানুষের পাশে প্রায় আধারাত শুয়ে থেকেও কিশোর বয়সে লোকটা তা বোঝেনি─ এখনও কী বোঝে! তার তো মনে হয় বাঁচা-মরার মধ্যে পার্থক্যটা সুঁইয়ের মাথার মত এত সরু যে শুরুতে এটা ঠাহরই করা যায় না।

[ স্ত্রীর সঙ্গে পরপুরুষের সম্ভোগ এক সময় তাকে নির্বিকার করে তোলে। সে বাঁচবে─ না বেঁচে থাকবে না এমন দোটানার মাঝখানে তার ভাবনাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। সাবিত্রীকে মেরে নিজে মরার ভাবনাও তাকে আচ্ছন্ন করেছে এবং এই ভাবনা আরও এগিয়ে নিতেও একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছে। এখন লোকটার মত আমাদেরও সঙ্গত প্রশ্ন জাগে─ ভগবান তাহলে তার কোন উদ্দেশ্য পূরণের কারণে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়! তাহলে কী আবার নদীতে পানি আসবে মরা গাঙে উদ্দাম তরঙ্গ জাগবে আর তার পরতে পরতে জলের রুপালি ফসল স্বচ্ছন্দে খেলে বেড়াবে? জেলেদের জাল ভরে উঠবে সেই ফসলে এবং দুবেলা দুমুঠো ডাল-ভাত খেয়ে ও মোটা কাপড় পরে বাঁচবে বংশ পরম্পরায় নদীজীবী এসব হতভাগ্য মানুষ! এর জবাব যে লোকটার কাছে স্বপ্নের মত─ এতক্ষণ ধরে তাকে দেখার পর আমাদের এটা মনে হতেই পারে।

[ স্ত্রীর সঙ্গে পরপুরুষের দৈহিক সম্পর্ক─ অন্যের প্রতি স্ত্রীর দুর্বলতা সবই সে জেনে ফেলেছিল। না জানলে কী হত─ সম্পর্ক কি জটিল হয়ে উঠত? বহু মানুষের জীবনে স্ত্রী বা স্বামীর গোপন একান্ত দুর্বলতা বা স্খলন-পতনের ঘটনা বা কর্ম কিংবা নিষিদ্ধ সম্পর্ক কোন কারণে অজানা থেকে গেলে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা থেকে যায়Ñ তা অনৈতিক হলেও কোন জটিলতা কি দাম্পত্য জীবন বিচলিত করে? নদীর নির্জন বালুচরে নিঃসঙ্গ কেষ্টজেলেকে নিজেরই এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে─ এই জানাটা তার ক্ষেত্রে যদি না-ই ঘটত তাহলে জগৎ-সংসারে সত্য প্রকাশে কী এমন ঘাটতি পড়ে যেত যা দিবারাত্রি চক্রে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারত?

[ নারী-পুরুষের স্খলন-পতনের কথা ভাবতে ভাবতে সে পাড়ের দিকে হাঁটতে লাগল। অন্য রাতের মত বটগাছ তলে এসে নদীর বিস্তীর্ণ বালুচরের শূন্যতায় চোখ মেলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গত কয়েক বছর যা করে না তাই করল─ সরকার বাড়ির মরিচ ক্ষেতের পাশের গোপাট ধরে দ্রুত বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তার পাশে ব্রিটিশ আমলের বিরাট জামগাছের ছায়াচ্ছন্ন জায়গাটা পার হয়ে মেটে জ্যোৎস্নায় নিজের বামন ছায়া দেখল। মাথার ওপর ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ তার ছায়াটাকে ক্ষীণ করে তুলেছে। সড়ক ধরে ধীরলয়ে প্রবাহিত মৃদু বাতাসের ছোঁয়ায় দূরাগত ভোরের পরশ টের পেল। জীবনের বহু রাত এই সময়টায় সে বাড়ি ফিরেছে। রাতের-তরঙ্গের উল্লাসধ্বনি যত দূরে সরেছে তত চরাচর-জনপদের নিস্তব্ধতা তার দেহমনে স্নিগ্ধ প্রশান্তি বিস্তার করেছে─ বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোণে হামা দিয়ে থাকা তার ঘরে বাঁশের দরজা আলগোছে ছোঁয়া মাত্র দরজার আড়কাঠি খুলে সরে দাঁড়িয়েছে সাবিত্রী। জালের ছেঁড়া ন্যাকড়ায় বাঁধা দুয়েকটা বেলে বা অন্য কোন মাছ বউয়ের হাতে ধরিয়ে দিত। বউ বরাবর বলত গুঁড়ামাছ আনতে। দাম কম─ লোকসানটা কম হয়। ছোট মাছ যাকে বাজারে লোকে বলে গুঁড়ামাছ সে জাল থেকে নৌকায় নয় জলে ফেলে দেয়ার মত নয়─ জলে আলগোছে নামিয়ে রাখার মত ছেড়ে দেয়। না─ দেয় বলাটা ঠিক হবে না─ ছেড়ে দিত─ দিতটাই সঠিক। বউ খাবার সামনে দিয়ে তালপাতার পাখা নেড়ে বাতাস করেছে। শোয়ার পর মেটে তেলের শিশি নিয়ে পাশে বসে মালিশ করে হাতে─ পায়ের সাদাটে হয়ে ওঠা রঙ স্বাভাবিক করে তুলেছে। তারপর সাবিত্রীর নরম শরীর নিয়ে লোকটা আদরে মেতে উঠেছে─ শরীরের ঝড় থেমে যাওয়ার পর কেষ্ট নাক ডাকতে শুরু করেছে।

[ তার শরীরে মাছের আঁশটে গন্ধ শুঁকে শুঁকে সাবিত্রীরও চোখ লেগে এসেছে। সাবিত্রী বিয়ের পর থেকে তার সঙ্গে সংসার চালাবার লড়াইয়ে তাল মিলিয়ে হাত-পা চালিয়েছে। সকাল সকাল ঘরের কাজ সেরে সাহাবাড়িতে ধান ভেনেছে। সন্তানের জন্ম দিয়েছে─ লালন-পালন করেছে। মুহূর্তের স্খলন জীবনের পুরো কর্মক্রিয়া বিনষ্ট করে দিলে পূর্ণজীবন আর থাকে কোথায়!

[ লোকটার দিক থেকে আমরা যদি তার স্ত্রীর দিকে দৃষ্টি দিই─ কান পাতি তাহলে শুনব সাবিত্রী নিঃশব্দে কতবার উচ্চারণ করেছে─ মনুরবাপ আমি শরীরের ক্ষুধার বশ হইয়া গেছিলাম─ মুহূর্তের হতবুদ্ধিদশায় ওই পোংটা লোকটা আমার শিথিল শরীর জাগাইয়া দিছে। অনেক চেষ্টা কইরাও ওর কব্জা থাইকা ছাড়া পাই নাই। ওই অবস্থাটাই তুমি দেখলা─ ওই হারামিরে ঠেকাইবার লাগি আমার যুদ্ধখান দেখ নাই…

[ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাইটগার্ডের চাকরির কথা বলেছে মালোপাড়ার ওই লোক। চাকরি করে পয়সা-কড়ি করেছে─ এখন সুযোগ পেলেই পাড়ার বউ-ঝিদের পেছনে ঘুর ঘুর করে। কেউ জোর দিয়ে কিছু বলতে পারে নাÑ কারণ ঠেকা-বেঠেকায় ওর কাছে ধারের জন্য হাত পাততে হয়। কেষ্টরও ধার আছে যা শোধ করা কী করে সম্ভব তা সে জানে না। ধার শোধের প্রসঙ্গ তুলেই সে ওই চাকরির কথা বলেছে। লোকটা বাপ-ঠাকুর্দার পেশা ছাড়তে চায়নি। রাতের ডিউটিতে যাবে আর ওই বেজন্মা এসে তার বিছানায় শোবে─

[ আজ প্রশ্ন জাগছে─ নদীকে অভিসম্পাত করে─ সমাজের সুবিধাবাদীদের গালিগালাজ করে আর কতকাল অপেক্ষা করবে? কে তাদের দু’মুঠো ডাল-ভাতের সুযোগ করে দেবে? কেষ্টজেলের ভাল নামটা কাজে লাগে পাঁচ বছর পরপর। জলজীবি মানুষ দেখে তারপরও নদীতে পানি আসে না। পানি না থাকলে মাছেরা ঘর-বসতি বাঁধতে পারে না─ তাদের সংসার হয় না─ দল বেঁধে সাঁতরাতে পারে না। যেটুকু পানি আছে তা সবার জন্য। পানিনির্ভর জীবিকাধারীদেরটুকু রক্ষা করবে কে!

[ মালোপাড়া-জেলেপাড়া বলে আর কিছু নেই─ পাড়াটা দেখলে মনে হবে হাজার বছর আগের কোন জনপদের ধ্বংসাবশেষ─ এখন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিলেই হয়। এ পাড়ার ভাগ্যবান কেউ কেউ অন্য কোন পেশা আঁকড়ে ধরার সুযোগ পেয়ে ধুকপুক করে বাঁচছে─ অন্যরা নানাভাবে মরে বেঁচে আছে।

[ তার মেয়েটা নাম লিখিয়েছে নাটকে─ বিকালে শহরে চলে যায় ফেরে গভীররাতে─ কোন কোন রাতে আবার ফেরেও না। ছেলেটার কোন খবর নেই গত ছ’মাস─ ওর শরীর-স্বাস্থ্য লোকটার যৌবনের ফটোকপি। সর্বশেষ যে খবর তাতে সে নিশ্চিত─ ম্যাসলম্যানদের পাল্লায় পড়েছে। এসব সে দেখে না─ সে তো বলতে গেলে বাড়িতে ফেরেই না─ গাঙপাড়ে ওই বুড়ো বটগাছের কাত হয়ে থাকা ডালটায় ভোররাতের দিকে চর থেকে এসে শোয়। বটগাছে অজগর থাকে- ব্রহ্মদৈত্যের পা থাকে ছোটবেলায় শোনা আরও অনেক কথার মত এসব কথাও ডাহা মিথ্যা বলেই সে সাপের কামড়ে মরছে না─ অজগরের পেটে যাচ্ছে নাÑ ব্রহ্মদৈত্যের কবলেও পড়ছে না। সে তো মরতেও চেয়েছে─ কিন্তু নিজে নিজের জীবন নিতে চায়নি─ ওটা পারবেও না। ভগবান এ রকম মৃত্যুর জন্য মানুষ তৈরি করেননি─ সময় হলে ভগবানই তুলে নেবেন। সর্বোপরি তার কাজে হাত দেয়া মানুষের কাজ নয়। এই বোধ সে নিজের মত অনুভব করেছে কৈশোরকালেই─ যখন বউ চলে যাওয়ায় উজানবাড়ির কাশীরাম গলায় দড়ি দিয়েছিল।

[ দড়ি দিয়েও বেঁচে যাওয়া ওই মানুষটাকে কৌতূহল বশে সে জিজ্ঞেস করেছিল, কাকু মরণের আগখানে ঠিক ক্যামুন লাগে?

[ সেই বর্ষণমুখর দিনে কাশীর ভাইপোর জ্বর থাকায় কেষ্টকে তার নৌকা বাইতে হয়। মুষল বৃষ্টির মধ্যে মাথায় ভেন্নাপাতা বেঁধে বৈঠা মেরে এপার থেকে ওপারে যায়। ছনক্ষেতের কাছে গিয়ে কাশীরাম নৌকা ভেড়াতে বলে─ ছনে নৌকা প্যাঁচ দিয়ে বসেছিল যুতসই ক্ষেপ মারার জন্য তখন কেষ্টর ওই প্রশ্ন তার একাগ্রতা নষ্ট করে দেয়।

[ সে বলে─ ক্যামুন লাগছিল এই কতাখান হুনবি না─ হুনলে বেআক্কেলের লাহান কামখান কইরা ফালানির জোশ আইবার পারে!

[ ওই কথাটা মনে পড়ে আত্মহত্যার কথা মনে হলেই। তার মনে হয় যতদিন ওই কথাটা মনে পড়বে ততদিন সে আর আত্মহত্যা কিংবা বউকে হত্যা─ কোনটাই করতে পারবে না। তাহলে করবে কী?

[ বউয়ের বিলাপধ্বনি অনেক দূর থেকে ভেসে আসে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়─ কালাচান পুংটায় কইছে চাকরিখান অহনো বলে হইবার পারে। সব মিইলা তিন হাজার ট্যাকা মাইনা─ পাকা হইলে আরও হাজারখানেক ট্যাকা বাড়বে। দুইডা পেট চলবে ডাইল-ভাত খাইয়া। পোলা গেছে─ মাইয়া নষ্ট হইছে কি না কইবার পারি না তয় বুঝি হে-ও যাইবার পথে─ হারাদিন মোবাইলে কতা কয়─ হি-হি-হি কইরা হাসে─ শরীল নাচাইয়া ফুরফুর কইরা ওড়ে। মনে কয় কুনু খেয়ালে আছে─ ঘরে তিনদিন এককণা চাউল নাই─ শহর থাইক্যা ফল কিইনা আনে মাইয়া। কেডায় মুখে দিবে─ কেন দিবে?

[ কেষ্ট ভাঙা দরজায় হাত রাখে─ সাবিত্রী দরজা খুলে সামনে দাঁড়ায়। কেষ্ট সাবিত্রীর চোখে চোখ রাখে─সাবিত্রী চোখ নামায় না। সংসারের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে সে-ও কেষ্টর ভেতরটা দেখতে চায়। কেষ্ট সাবিত্রীর ভেতর কোন রাখঢাক দেখে না। তার এই স্খলন-পতন তো কেষ্টর জন্য নয়─ সাবিত্রীর জন্যও নয়─ এ তো অভাবের জন্য আর অভাব কেষ্টজেলের কর্মহীনতার জন্য─ আর তা নদীতে জল এবং জলের ফসল না থাকার জন্য। নদী মরে যাওয়ার দায় কার ওপর চাপাবে কর্মহীন কেষ্টজেলে?

[ মরাগাঙের বিশাল বালিচর─ বিশাল শূন্যতায় হেঁটে হেঁটে অবসন্ন অসহায় কেষ্ট ধীরে অস্পষ্ট কণ্ঠে বলে ওঠে, করবাম─ চাকরি করবাম─ তরে শরীলের সুখ দিবার পারি বা না পারি পেটে চাইরটা ভাত দেওনের ব্যবস্থা করন লাগে। বাপ-ঠাকুর্দার পেশা─ গাঙে জল নাই─ জলের ফসল নাই─ তরে লইয়া কানাঘুষা হয়─ মেয়েটা বানে ভাইস্যা যাইতাছে─ ছেলেটা অপকর্মে জড়াইয়া পড়ছে─ হেই নিয়া কতা হুনতে অয়। তারপরেও পেট তো আছে─ পেটের জ্বালা আছে। অনেক চেষ্টা কইরাও মরবার পারি নাই─ তরে মাইরা মরবার চাইছি তা-ও পারি নাই। কইয়া দে ওই পোংটারে─ আমি রাজি…

১০ thoughts on “ঈদ সংখ্যা ২০২১- এর ছোটগল্প।। নদী ও মানুষের গল্প।। ইউসুফ শরীফ

  • মে ১২, ২০২১ at ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ
    Permalink

    নদীর প্রবহমান নেই, নেই জলজ জীবিকা- লেখকের ক্ষুরধার লেখনীতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এমন চিত্রায়নের প্রবহমান চলুক অবিরতভাবে- শুভ কামনা রইল।

    Reply
    • মে ২৩, ২০২১ at ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ
      Permalink

      ‘নদী ও মানুষের গল্প’ পাঠ করে সুন্দর
      মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

      Reply
  • মে ১২, ২০২১ at ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
    Permalink

    একজন শক্তিমান কথিাসাহিত্যিকের গল্প প্রকাশে কা্ব্যশীলন ঋদ্ধ হলো বলে মনে করি।

    Reply
    • মে ২৩, ২০২১ at ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ
      Permalink

      দীর্ঘ গল্পটি পাঠ করার জন্য আপনাকে
      অশেষ ধন্যবাদ।

      Reply
  • মে ১৭, ২০২১ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
    Permalink

    চমৎকার ভাষার বুনন ও বর্ণনার মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের পিতৃ পেশা হারানোর ফলে দৈন্যদশার চাপা আর্তনাদ ফুটে উঠেছে। নিশ্চিত ভাবেই ‘নদী ও মানুষের গল্প’ টিকে থাকবে যুগ যুগ ধরে।

    Reply
    • মে ২৩, ২০২১ at ৭:০৪ পূর্বাহ্ণ
      Permalink

      ‘নদী ও মানুষের গল্প’এর মত দীর্ঘ গল্প পাঠ করে চমৎকার মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

      Reply
  • জুন ১৩, ২০২১ at ১২:০৮ অপরাহ্ণ
    Permalink

    দীর্ঘ একটি গল্প, পাঠে ক্লান্তি আসে না। ভাষার মাধুর্য, বয়ানশৈলী এবং ক্ষয়িষ্ণু নদীর জলজীবী মানুষের পেশা হারানোর করুণ চিত্র অসাধারণ চিত্রকল্প, উপমা এবং সুক্ষ্ণ প্রতীকের সমাহারে গল্পটিকে আধুনিক করে তুলেছে। ভাষায় অনুপম দখল ছাড়া এমন সরস গল্প লেখা সম্ভব না। এখানেই শক্তিমান কথাসাহিত্যিক ইউসুফ শরীফের বিশেষত্ব। বাংলা সাহিত্যে এই ভাষাশক্তি কম কথাকোবিদেরই আছে। আমরা জানি ছোটগল্পে জীনের খণ্ডাংশের অসাধারণ চিত্র উঠে আসে। চেতনা প্রবাহ রীতিতে লেখা এ গল্পের কেন্দ্রীয চরিত্র কেষ্ট’র জীবনের খণ্ডাংশের গভীরে পূর্ণ জীবনের হাতছানি যেমন ভাষিক চিত্র পেয়েছে, তেমনি তার জেলে জীবনের হাহাকার পাঠকের মনে আঁচড় কাটে। ‘নদী ও মানুষের গল্প’ নামের গল্পটি নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের নদীবিষয়ক গল্পসমূহে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সৃষ্টি।

    Reply
    • জুন ১৪, ২০২১ at ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ
      Permalink

      দীর্ঘ গল্প ‘নদী ও মানুষের গল্প’ সময় নিয়ে পাঠ করার জন্য অনেক ধন্যবাদ কথাসাহিত্যিক-কবি। অল্প কথায় গল্পটির গদ্যভাষা, বয়ান-ভঙ্গি, প্রান্তিক-জীবনের মর্মমূলস্পর্শী বিষয় ইত্যাদির গভীর বিশ্লেষণাত্মক এবং গল্পটির চারিত্র-বৈশিষ্ট্যজনিত সুন্দর মন্তব্যের জন্য আপনাকে আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ।

      Reply
  • জুন ১৩, ২০২১ at ১:০১ অপরাহ্ণ
    Permalink

    দীর্ঘ একটি গল্প, পাঠে ক্লান্তি আসে না। ভাষার মাধুর্য, বয়ানশৈলী এবং ক্ষয়িষ্ণু নদীর জলজীবী মানুষের পেশা হারানোর করুণ চিত্র অসাধারণ চিত্রকল্প, উপমা এবং সুক্ষ্ণ প্রতীকের সমাহারে গল্পটিকে আধুনিক করে তুলেছে। ভাষায় অনুপম দখল ছাড়া এমন সরস গল্প লেখা সম্ভব না। এখানেই শক্তিমান কথাসাহিত্যিক ইউসুফ শরীফের বিশেষত্ব। বাংলা সাহিত্যে এই ভাষাশক্তি কম কথাকোবিদেরই আছে। আমরা জানি ছোটগল্পে জীনের খণ্ডাংশের অসাধারণ চিত্র উঠে আসে। চেতনা প্রবাহ রীতিতে লেখা এ গল্পের কেন্দ্রীয চরিত্র কেষ্ট’র জীবনের খণ্ডাংশের গভীরে পূর্ণ জীবনের হাতছানি যেমন ভাষিক চিত্র পেয়েছে, তেমনি তার জেলে জীবনের হাহাকার পাঠকের মনে আঁচড় কাটে। ‘নদী ও মানুষের গল্প’ নামের গল্পটি নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের নদীবিষয়ক গল্পসমূহে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সৃষ্টি।

    Reply
    • জুন ১৪, ২০২১ at ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
      Permalink

      বিশ্লেষণমূলক মন্তব্যের জন্য আপনাকে অনেক- অনেক ধন্যবাদ।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *