অণুগল্প।। লজ্জা।। মির্জা গোলাম সারোয়ার

হকার সকালে কড়া নেড়ে দরজার ফাঁক দিয়ে খবরের কাগজ ফেলতেই আসিফের ঘুম ভেঙে যায়। ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকে ওঠে। ওহ্! আটটা বেজে গেছে। তাই আর দেরি না করে ওঠে পড়ে। কারণ, নয়টার মধ্যে তাকে অফিসে পৌঁছাতেই হবে। তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে দ্রুত বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে যেতেই দেখে বাস দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দেবে। আজিমপুর থেকে শান্তিবাগে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসে ওঠে ভেতরে দ্রুত প্রবেশ করার সময় ধাক্কা লেগে আসিফ দাঁড়িয়ে থাকা একজন মহিলা যাত্রীর গায়ে পড়ে। এসময় তাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আসিফ মেয়েটিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে। এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি সামলে ওঠে মেয়েটির সেকি রাগ। কোনো কথা না বলে সজোরে আসিফের গালে চড় মারে। ঘটনার আকস্মিকতায় এবং আচমকা চড় খেয়ে আসিফ হতভম্ব হয়ে যায়। কিছু বলার আগেই মেয়েটি অগ্নিমূর্তি ধারন করে ক্ষোভের সাথে বলে, ‘এসব অসভ্য আর নিচু মানসিকতাসম্পন্ন লোকের জন্য বাসে যাওয়াই মুশকিল। এরা যেকোনো অজুহাতে মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার সুযোগ খোঁজে। আর এই উদ্দেশ্য নিয়ে তারা বাসে চলাচল করে। ইচ্ছে করছে গালে আরেকটি চড় মেরে দিই, ছোটলোক কোথাকার!’

হঠাৎ এধরণের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সহজ-সরল নম্র স্বভাবের আসিফ মেয়েটিকে যতই বোঝানোর চেষ্টা করে যে, ধাক্কায় পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনিচ্ছাকৃতভাবে এ কাজটি হয়েছে। মেয়েটি ততই ক্ষিপ্ত হয়ে আসিফকে অনর্গল বকাবকি এবং অপমান করতে থাকে। এসময় আশেপাশের মহিলা এবং পুরুষ যাত্রীরাও মেয়েটিকে সমর্থন জানিয়ে দু’কথা শুনিয়ে দেয়। একজন তো বলেই ফেলে, ‘কী ব্যাপার মেয়ে মানুষ দেখলে মাথা ঠিক থাকে না, নাকি?’ আসিফ অসহায়ভাবে উত্তপ্ত বাক্যবাণ হজম করে অপমানে জর্জরিত হতে থাকে। লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে যায়। মেয়েটির প্রতি অতি উৎসাহ দেখিয়ে অনেকেই টিপ্পনী কাটে। কেউবা শিস বাজিয়ে টিটকারি এবং উপহাস করে। এসব শুনে আসিফের ইচ্ছে হয় মাটির সাথে মিশে যেতে। কারণ জীবনে সে কখনোই এধরণের অপমান আর উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েনি।

অপমানের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে আসিফ সারাক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। লজ্জায় কারও দিকে তাকাতেই পারে না। কী জানি আবার যদি সমালোচনা শুরু হয়। মনে মনে ভাবে, বাস থেকে নেমে যেতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু আজ যেন রাস্তা ফুরেতেই চায় না। অজান্তেই মাঝে মাঝে মেয়েটির সাথে আসিফের চোখাচোখি হয়। চেহারা দেখে মনে হয় তখনও রাগ কমেনি। অনিন্দ্য সুন্দর মুখখানি রেগে লাল হয়ে আছে। চোখে চোখ পড়তেই সে আসিফের দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকে। রাগ তো কমছে না বরং বেড়েই চলেছে। ভয়ে আসিফ দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়।

আজকের এই ঘটনায় আসিফের মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়— যা এর আগে জীবনে আর কখনোই ঘটেনি। ঘটনার জন্য তার বিন্দুমাত্র দোষ নেই। মেয়েটি কোনো কিছু না বুঝে অযথা তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়ে নাস্তানাবুদ করেছে। এসময় হঠাৎ বাসের কন্ডাকটর শান্তিবাগ, শান্তিবাগ বলে ডাকতেই আসিফ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। বাস স্টপেজে থামতেই সে দ্রুত নেমে বাস যাত্রী ও মেয়েটির শ্যেণদৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করে। বাসটি তখনও স্টপেজে থেমে আছে। আসিফ রাস্তা পার হয়ে নিমিষেই চোখের আড়াল হয়ে যায়।

আসিফ একটি সরকারি কলেজের প্রভাষক। ভদ্র এবং ভালো হিসেবে বেশ পরিচিত। মার্জিত ব্যবহার ও আচরণের জন্য এলাকায় তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। কিছুদিন পর পারিবারিকভাবে বিয়ের জন্য বাবা-মা তাকে নিয়ে একটি মেয়ে দেখতে যায়। মেয়েটি সেজেগুজে ঘরে প্রবেশ করতেই তাকে দেখে আসিফ চমকে ওঠে। আরে এ তো বাসের সেই মেয়েটি। ধাক্কার কারণে মাটিতে পড়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যাকে সে অনিচ্ছাকৃতভাবে জড়িয়ে ধরেছিল। আর এই কারণে মেয়েটি তার গালে সজোরে চপেটাঘাত করে যা ইচ্ছে তাই বলে অপমান করেছিল। মেয়েটিও হতবাক হয়ে আসিফের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে—

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *