জেসমিন সুলতানা চৌধুরী’র কবিতা

নারীর জীবন খাতা

মেয়েদের জীবন কেন এমন
যাদের নেই কোন নিজস্ব পরিচয়।
শুরুটা বাবার পরিচয়ে
এরপর পরগাছার মতো বেড়ে ওঠে লতিয়ে,
কোন একসময় যেতে হয় নতুন গাছের পরগাছা হয়ে।
দূর দূর করে যদি ছুঁড়ে ফেলে দেয় বেরিয়ে যেতে হয় মাথা নুয়ে।
কোথাও নেই কোন অধিকার,
জন্মই যেন আজন্ম মাথা নোয়াবার।
দামী গহনার মতো কেউ রাখে সাজিয়ে অতি যতন করে,
কেউ ভেঙ্গে খান খান করে আনন্দ খোঁজে পৈশাচিক জীবনে,
কেউ আবার সাইনবোর্ড সদৃশ পরিচয়ে তৃপ্ত রেখে শান্তি খুঁজে,
সুখ খুঁজে ফুল থেকে ফুলে,
আবার কেউ যখন খুশি ভাঙ্গে, রাখে না কোন বন্ধনে।
সব ব্যথা লুকিয়ে মনের গহীন অরণ্যে যদি জীবন করে উৎসর্গ
মৃত্যুকে করে আলিঙ্গন,
আ—হা, কী মমতায় না তখন ঝরে পড়ে!
আত্মনির্ভরশীলমনা নারী যখন অধিকার বঞ্চিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়
কথার তীরে বিদ্ধ করে অতি আপনজনও,
সমাজ তো লেগেই থাকে পাছে।
এ সমাজ আজও পুরুষের
এ সমাজ আজও নয় নারীর!
নারী সৃষ্টির রূপকার,
নারী সৃষ্টির আদি স্রষ্টার,
তবে কেন তারা আজো ঘরে ঘরে নির্মমতার শিকার?
অন্ধকার যুগ পেরিয়ে গেছে বহু আগে
আধুনিকতার ছোঁয়ায় সজ্জিত আজকের এ সমাজ
তবে নারী কেনো পদদলিত প্রতিটি পদে পদে?
পুরুষের সয্যাসঙ্গিনী, ধন-দৌলত
এসবে তারা পরিপূর্ণ সুখী কখনো নয়।
নারী চায়, আপনজনের কাছে একটু স্বীকৃতি,একটু স্বকীয়তা, একটু সম্মান।
নারী চায় তার প্রাপ্য অধিকার
নারী চায় তার যথাযথ মূল্যায়ন।

স্মৃতিতে অমলিন

আমার স্মৃতিতে আজও তুমি অমলিন
তোমার মুখখানি যখনি ভাসে মনের পর্দায়,
জাগে আজো শিহরণ,
যদিও হয়েছে যুগের অবসান
তবুও যায়নি মোছা হৃদয়ের অংকন।
এতো কথা এতো ব‍্যথা হৃদয়ে গাঁথা
জড়িয়ে রয়েছে আষ্টেপৃষ্ঠে হয়ে শীতের কাঁথা।
কতো অপমান কতো দিনমান হৃদয়ে বিরাজমান,
সেসব পড়েছে ঢাকা ধুলো বালির আস্তরণ।
জানিনা তুমি কোথায়, আছো কেমন,
ভালো থাকতেই তো ভেঙ্গেছ হৃদয় খান খান করে।
দ্বার আমার খোলা চিরদিন
যদি কখনো ফিরতে চায় তোমার আকুল মন
এসো তবে,শূন্য এ বুকে
দুহাতে করবো তোমায় আলিঙ্গন।

লাল গোলাপ

অনেক সাধনায় লাল গোলাপের গাছ লাগালো এক মালি,
মাত্র কয়েক দিনে মন পাল্টালো মালির।
সব সময় উড়ু উড়ু মন
আরো কিছু চায় বাগানের শোভা বর্ধনে।
লাল গোলাপ মালির কিছুটা প্রিয় ছিল
কদাচিৎ পানি দিত,
মাঝে মাঝে দেখাশোনা করতো।
একদিন মালি গোলাপি গোলাপ লাগালো
লাল গোলাপের আর যত্ন করেনা।
এরপর নীল গোলাপ লাগালো
আরো বিভিন্ন রংয়ের গোলাপে বাগান পূর্ণ হলো।
লাল গোলাপ জানে তার আর কদর নেই।
একদিন পুষ্পরাজি সৌরভ ছড়াতো
সৌন্দর্য বাগানের শোভা বর্ধন করতো,
এখন শুধু নীরব অশ্রু বিসর্জন।
সবুজ পাতা রুক্ষ, শুষ্ক লালচে,
ডালগুলো চিকন লিকলিকে
পাপড়িগুলো ঝরে ঝরে পড়ছে।
ফুলেরা ঘ্রাণ ছড়ায় না
মালি ও ফিরে তাকায় না।
কোনভাবে বেঁচে থাকা।
শাখা প্রশাখার ভারে নুয়ে পড়ে না প্রচণ্ড ঝড়ে,
যেন সে যুদ্ধে জয়ী হবেই।
পুরানো গাছ এককোণে থাকুক না
কিছুটা করুণায় জঞ্জাল মনে হলেও উপড়ায় না।
ধীরে ধীরে শুকিয়ে জীর্ণশীর্ণ হলো
জীবন প্রদীপ ও থেমে গেল।
বাগানের এতো এতো গাছ
একটা মরলে কি’বা শোক আর লাজ!

স্বর্ণালী চাঁদ

মেয়ে তুমি সুন্দরী ও সুশিক্ষিতা
রূপে, গুণে গুণান্বিতা,
স্বর্ণশিখরে উচ্চতার সিঁড়ি বেয়ে
পথ দেখালে দীপান্বিতা।
স্বর্ণকেশী আর তেজস্বী, নও তো কালো
যেন একটা স্বর্ণালী চাঁদ,
আলোর পথের মহীয়সী যাত্রী তুমি
করো আজ সব কুসংস্কার বরবাদ।
সুহাসিনী, তোমার দেখানো পথ নতুনদের
চলার পথে হোক প্রেরণা,
তুমি অগ্রজ ভাঙ্গবে, গড়বে হবে সুন্দর
নতুন ভোরের সুচনা।
কালো সেই, নিকষকালোতে ঢাকা যার মন
ছুতো খুঁজে রয় সারাক্ষণ,
হোক না আপনজন কটাক্ষের তীরে বিঁধে,
পরম শান্তনা আহরণ।
হিতৈষী, ঘন আঁধারের কালো মুছে
জ্বালাও প্রদীপ দীপ্ত আলোর ,
ভালোবাসা, প্রেম, প্রীতিতে যাবে গুছে
সব কালো তিমিরের।

নদীর মৃত্যু

বর্ষার ভরা নদী উপচে পড়ে জল,
সে জল সাগরে মেশে হয় না একাকার।
প্রচণ্ড কড়া রোদ
রোদের তীব্রতায় ধীরে ধীরে সে জল শুকিয়ে যায়,
মাটি ফেটে চৌচির হয়,
মাটির কান্না কেউ শুনতে পায় না,
কেউ না, কেউ না।
হাহাকারের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি কারো কান পর্যন্ত পৌঁছে না।
সে মরা নদীতে আসেনা আর জোয়ার,
যদিও আসে লোকলজ্জায় কুঁকড়ে যায়।
একটা সময় ভরাট হয়ে যায়
পথিক হেঁটে যায় তার আপন মনে,
গরু, ছাগলও পায়ে মাড়িয়ে যায় ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.