মন ছোঁয়া গল্পের ‘সাতরঙা আইসক্রিম’ মিজানুর রহমান মিথুন

ইমরুল ইউসুফের লেখা বরাবরই আমাকে আকৃষ্ট করে। মুগ্ধ করে। এক কথায় বলা চলে আমি তার গুণমুগ্ধ পাঠক। আমার মনে হয় ইমরুল ইউসুফের লেখায় একটা জাদুকরি বিষয় রয়েছে। তার লেখা ছড়া, কবিতা, গল্প কিংবা প্রবন্ধ যে কোনো বয়সী পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে বলে আমি খুব সচেতনভাবেই বলতে পারি। কারণ তার ভাষা চয়ন, বাক্যে বাক্যে শব্দের মনোলোভা গাঁথুনি খুব সহজেই পাঠককে মোহাচ্ছন্ন করে রাখার মতো। তিনি নিয়মিত দারুণ দারুণ লেখা লিখে চলেছেন। এই সময়ে যে কজন শিশুসাহিত্যিক বাংলা শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন তাদের মধ্যে ইমরুল ইউসুফ অন্যতম। ছড়া, কবিতা প্রবন্ধের পাশাপাশি তার গল্পের হাতও চমৎকার। বইমেলা ২০২২- এ প্রকাশিত তার লেখা ‘সাতরঙা আইসক্রিম’ গল্পের বইটি আমি নিবিড়ভাবে পাঠ করেছি। চারটি গল্প নিয়ে প্রকাশিত বইটি এক কথায় অসাধারণ। চমৎকার গল্পের পাশাপাশি বইটির পাতায় পাতায় অলংকরণ দেখলে যে কারো চোখ আটকে যাবে। মন জুড়িয়ে যাবে। ‘সাতরঙা আইসক্রিম’ বইটি প্রকাশের জন্য প্রকাশক নিলুফা ইয়াসমিন এবং নজরকাড়া প্রচ্ছদ ও অলংকরণের জন্য শিল্পী নাসিম আহমেদকে শুরুতেই ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ‘সাতরঙা আইসক্রিম’ বইয়ের গল্পগুলো কেমন লেগেছে এবার আসছি সেই কথায়। এ বইটির শুরুতেই রয়েছে ‘সাতরঙা আইসক্রিম’ শিরোনামের একটি গল্প। কী সুন্দর সহজ, সাবলীল ভাষায় গল্পে গল্পে রংধনুর সাতটি রং চেনা যায় তা এ গল্প পাঠে জানা যাবে। এই গল্প পড়ে জানা যাবে সামি রঙিন আইসক্রিম আঁকতে গিয়ে মেঘের দেশ কিভাবে ঘুরে এসেছে। সামির এ ভ্রমণ সত্যিই আকর্ষণীয় ও মনোরম। ‘শিয়াল ও দুষ্টু ছেলের দল’-গল্পটিও ভীষণ চমৎকার। এ গল্পটি মজার ও দারুণ শিক্ষণীয়। এ গল্পে দীপুর আড়ভাঙা কথা সবাইকে মুগ্ধ করবে। যেমন, গল্পের শুরুই হয়েছে এভাবে,- ‘ছাল ছাল আমাদেল গেলামে দুত্ত একটা তিয়াল দুকেছে। তিয়ালটা আমি দেখিতি ছাল। আমার বালতু ভাইয়াও দেখেতে ছাল।’ গল্পকার ইমরুল ইউসুফ সুনিপুণভাবে দীপুর আড়ভাঙা কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। শিয়াল ও দুষ্টু ছেলের দল গল্পটিতে একদল দুষ্টু ছেলেরা তাদের বাড়ির খাবার ও হাঁস মুগরি খেয়ে ফেলার অপরাধে শিয়ালটি কৌশলে ধরে ফেলে। কিন্তু শেয়াটিকে প্রাণে মারতে চাইলো না তারা। কারণ তারা জানে পশু-পাখি মারা অন্যায়। তাই শেয়ালটিকে অন্যভাবে শাস্তি দিয়েছে। শাস্তির ধরনটিও মজার। এ গল্পটি শিশুদের অনেক মানবিক হতে শেখাবে বলে আমার বিশ্বাস। বইটির তৃতীয় গল্পটি মনকেড়ে নেওয়ার মতো। এই গল্পটির নাম হচ্ছে ‘টবের গাছের দুঃখ’। এ বইটিতে একটি টবের গাছের জীবন কাহিনির কথা বলা হয়েছে। গাছও যে মানুষের মতো মুক্ত ও স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায় এই গল্প না পড়লে আমি হয়তো কখনো ভাবতেই পারতাম না। টবের গাছের টব থেকে মুক্ত মাটির গভীরে শিকড় প্রসারিত করে বাঁচার আকুতি সত্যিই আমার মন ছুঁয়ে গেছে। গল্পটিতে ইমুর গাছের প্রতি সুগভীর অনুরাগও পাঠকের মনে রেখাপাত করবে। ঈদের গিফট বা উপহারের পোশাক নিয়ে লেখা হয়েছে ‘প্রিয়তির স্মার্ট পোশাক’ নামের গল্পটি ভিন্ন স্বাদের। গল্পটির শুরুটা পড়ে মনে হবে প্রিয়তি বুঝি ঈদে জাদুর জামা উপহার পেয়েছে! কারণ তার জামাটি সত্যি সত্যিই অন্যরকম। প্রিয়তির খালামনি ইংল্যান্ড থেকে পাঠিয়েছেন এই জামাটি। জামাটির ভাঁজ খুলতেই জ্বলে ওঠে। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ কমলা আলোয় আলোকিত হয়ে উঠে চারপাশ। গল্পটির শুরুটা এমনভাবে করেছেন ইমরুল ইউসুফ যে এটি শেষ না করে আর ওঠা যাবে না। গল্পকার ইমরুল ইউসুফ তার ‘সাতরঙা আইসক্রিম’ বইয়ের প্রতিটি গল্প সুন্দর করে সাজিয়েছেন। যা শুধু শিশুদেরই নয় সব শ্রেণির পাঠকেরই মন জয় করবে। গল্পে গল্পে শিশুরা শুধু আনন্দ পাবে তাই নয়, শিশুদের মানসিক বিকাশের উপাদানও রয়েছে প্রতিটি গল্পে। বর্তমান সময়ের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া শিশুদের বইমুখি করতে এমন ধরনের গল্পের বই তাদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। এতে করে তাদের মনোজগতে আরও একটি বিস্তৃত স্বপ্নময় পৃথিবী তৈরি হবে। যে পৃথিবীতে শিশুরা গড়ে উঠবে মানবিক ও সোনার মানুষ হিসেবে। যে মানুষ আগামীর বিশ্ব নির্মাণের জন্য ভীষণ জরুরি। এমন একটি চৎকার বই পাঠকে উপহার দেওয়ার জন্য লেখক ইমরুল ইউসুফকে ধন্যাবাদ। এমন সহজ, সরল ভাষায় শিশুমনের কথাগুলো তুলে ধরার জন্য তাকে অভিনন্দন। আমরা তার কাছ থেকে এমন আরও গল্পের বই আশা করছি। ‘সাতরঙা আইসক্রিম’ বইটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা সাত ভাই চম্পা প্রকাশনী। বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে বলে আমি আশা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.