বিষয়ের বৈচিত্র্যে অভিনব ও নিরীক্ষাপ্রবণ ‘দশ দশমী’।। খালেদ উদ-দীন

নব্বই দশকে এসে বাংলা কবিতায় যে ব্যাপক নিরীক্ষা ও প্রথাভাঙার সচেতন প্রয়াস লক্ষ করা যায়, সে যাত্রায় যে কয়জন কবি বিশেষ ভূমিকা রাখেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম মামুন মুস্তাফা। তাঁর কবিতায় বৈচিত্র্য যেমন আছে, তেমনি কবি মাঝেমাঝে পাঠককে খুব চমকে দেন, তা কেবল ভাষা ব্যবহারে নয়, বিষয়ের চমৎকারিত্বেও।

নব্বইয়ের সময় থেকে জটিল দায়বদ্ধ ও গদ্যকবিতার সঙ্গে শিল্পগুণসমৃদ্ধ, পরিপার্শ্ববর্জিত সমাজনিরপেক্ষ ঐতিহ্যে অন্তর্মুখীন কবিতার ধারা লক্ষ করা যায়। এ-সময়পর্বের কবিগণ কবিতায় অধিক প্রাণচাঞ্চল্য, মননশীলতা এবং বাস্তবতার আলোকে ব্যাপক
আন্তর্জাতিকতাকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
কবি মামুন মুস্তাফার এ পর্যন্ত প্রকাশিত দশটি কবিতা-বইয়ের নির্বাচিত কবিতা নিয়ে ‘দশ দশমী’ নামের এই কবিতার সংকলন। মামুন মুস্তাফার সব কবিতাবই একসঙ্গে হাতে নিলে যে বৈশিষ্ট্য সবার আগে চোখে পড়বে, তা হলো— বৈচিত্র্যময়তা। প্রতিটি
কাব্যে ধারাবাহিকতা আছে অথচ নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এক দুর্গম পথ যেন পাড়ি
দিচ্ছেন কবি! কবির ভাষায়, “একজন কবির প্রতিনিয়ত নতুন কবিতা লেখার আকাক্সক্ষা থাকে, কিন্তু কবিতার পালাবদল ঘটবে অহরহ, ভাঙচুর করতে হবে, এমন কোনো প্রতিজ্ঞা থেকে আমি কবিতা লিখিনি। বরং এক সহজাত মনের খেয়ালে কবিতার শব্দ, বাক্য নিয়ে খেলা করেছি দিনরাত। এই সৃষ্টির ভেতরে ভাষা, গঠনশৈলীর ক্ষেত্রে যেটুকু পরিবর্তন লক্ষণীয় তা কেবল আধুনিকতা ও বর্তমান সময়কে ধরার প্রয়াস মাত্র।”
বস্তুত ‘দশ দশমী’ কবিতা সংকলনে সেই ভাঙাচুরার এক নান্দনিক ভ্রমণপাঠ করবে পাঠক। কাব্যবিচারে একজন কবির কাছে সেটাই পরম কাক্সক্ষা। মামুন মুস্তাফার কাব্যবয়ান এমন এক রেখা টানে যে, এখানের জমিন মিশে থাকে পরম যত্নে এবং আহ্লাদে। তাঁর
স্বাতন্ত্রিকতা ও কৌশল একেবারে নিজস্ব। আপনময়। তুলনাহীন।

প্রথম কবিতাবই ‘সাবিত্রীর জানালা খোলা’ (১৯৯৮) থেকে এই সংকলনে স্থান পেয়েছে মাত্র চারটি কবিতা। নাম কবিতায় ‘জোছনা তার সবটুকু শরীর/ঢেলেছে সাবিত্রীর বিছানায়।’ এমন এমন পঙ্ক্তিতে কলারাজ্যে কবির আগমনী গান শুনেছিল অপেক্ষমান বাঁকবদলের নব্বই দশক। তারপর ‘কুহকের প্রত্নলিপি’ (২০০১) থেকে এই সংকলে আছে
এগারোটি কবিতা। এ কবিতা-বইয়ে তাঁর অবস্থান যেন জানান দিচ্ছেন। প্রতিটি কবিতা পরিমিত এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময়। পাঠক এ কাব্যের কবিতা নিয়ে যখন মেতে
থাকবে তখনই সামনে আসবে ‘আদর্শলিপি : পুনর্লিখন’ (২০০৭) কবিতা-বইয়ের ভিন্ন স্বাদের কিছু কবিতা। টানাগদ্যে বর্ণক্রমিকে সাজানো কবিতাগুলোতে আবহমান বাংলার রূপ ও দর্শন এবং উপমা ব্যবহারে এখানে কবি শেকড়সন্ধানী। অনন্য, অসাধারণ একেকটি কবিতা।

‘এ আলোআঁধার আমার’ (২০০৮) কবিতার বইয়ের কবিতাগুলোও বৈচিত্র্যময়। আঙ্গিকগত বাঁকবদল চোখে পড়ার মতো। নিরীক্ষাধর্মী সব আয়েজনে কবি বেশ সফল। কবিতাগুলো পড়ে মনে হবে বাংলা কাব্যধারায় নতুন নির্মাণ কৌশলই শুধু তিনি সংযোজন করেননি, ঘরে ফেরার এক নতুন বার্তাও পাঠককে দিতে পেরেছেন, সর্বোপরি বাংলা কাবিতায় নতুন মাত্রাযোগসহ কাব্য নির্মাণে ঈর্ষণীয় বাঁকবদল ঘটিয়েছেন তাঁর কবিতায়। পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে একটি কবিতা তুলে দেওয়া গেল এখানে :

কবরের ঘাসে মুখ লুকোয় মেয়েটি
আধখানা মুখ তার অধখানা চাঁদ।
পৃথিবীর মুখ আঁচড়ানো নখে তার
আধখানা নখপালিশ। সমাধিমাটি
বুকে চেপে জেগে ওঠে ঈশ্বরের পুত্র
নির্মাণে। মাটি লেপা দাওয়ায় সংসার
ছিলো। হামাগুড়ি দিতো কাঁসার বাসন।
আমি জানু পেতে ভাঙা কবরে হাড় ও
করোটির সিথানের পাশে বসি। দেখি
পৃথিবীর যত সুন্দর জড়ো হয় ঐ
গ্রহণলাগা পিপাসার্ত বালিকামুখে। (বালিকামুখ/এ আলোআঁধার আমার)

বলা আবশ্যক, এই ব্যতিক্রমী কাব্যটি পশ্চিমবাংলার পাঠকের জন্যে কলকাতার অভিযান প্রকাশনী বের করে ২০১৪ সালে। ‘পিপাসার জলসত্র’ (২০১০) ঘর-গৃহস্থালি কেন্দ্রিক স্বভাষ্যের বয়ান। গল্পময় শব্দঝংকার।
অপরূপ সব পঙ্ক্তি। যেমন— ‘কার দখলে ছিলো চরের বউঝি?’। ‘শিখাসীমন্তিনী’
(২০১২) ভিন্ন স্বাদের গদ্যকবিতার বই। বাংলা কথাসাহিত্যের বিখ্যাত সব রচনার প্রধান নারী চরিত্রের সারবত্তা একেকটি কবিতা। কী সুনিপুণ বর্ণনায় তুলে এনেছেন দীর্ঘ কাহিনীর পাঠ। বাংলা কবিতায় এ এক বিরল সংযোজন।
‘একাত্তরের এলিজি’ও (২০১৩) এক ব্যতিক্রমী কাজ। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর যোদ্ধা কয়েকজনের ওই সময়ে লেখা চিঠি অবলম্বনে এক একটি কবিতা। যেন এক একটি আখ্যান। পাঠক চমকে যাবেন এবং সেই চমকে যাওয়া পাঠশেষে কাটবে বলে মনে হয় না!
‘শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি’ (২০১৫) গদ্যকবিতার আরেকটি অনন্য রচনা। কবি এখানে তাঁর ভাঙাচূরার খেলা খেলেছেন এবং চিরায়ত সংকটময় সময় এঁকেছেন, “সকালের প্রাতঃরাশ নিজেই সাজিয়েছি অনেক। ঘর ও বাহিরের দুঃসহ ক্লান্তিতে ঘুম যায় দয়িতা আমার। আর ওই মনোজলোকে নিবিড় বসতি শুধু মেঘবালিকার, চেয়ে দেখে ক্রমাগত পৃথিবীর প্রস্থান! তবু সেই আলোআঁধারিতে নিঃসঙ্গ গমন পথে জ্বেলেছিলো জীবনের সকল স্বপ্ন ও স্মারকচিহ্ন। এ মায়াখেলায় হেঁসেলের আগুনে ঝলসে ওঠে গার্হস্থ্যবেলা…গার্হস্থ্য দিবসের গান চুরি করে যাপনপ্রণালীর রাজব্যাধ…প্রভূত দহনের শেষে ভস্মীভূত হয় শুধু শনিবারের স্মৃতি…” (আদিপর্ব-এক/শনিবার ও হাওয়া ঘুড়ি) ‘ব্যক্তিগত মেঘ ও স্মৃতির জলসত্র’ (২০১৭) এই সময়ের কবিতার গঠনে পরিপূর্ণ এক অবয়ব। বলায় বৈচিত্র্য যেমন আছে, তেমনি ভাষার কারুকাজও চোখে লাগার ও মনে ধরার মতো
বিষয়। উল্লেখ্য, বইটি পশ্চিমবঙ্গের উত্তরশিলালিপি থেকে প্রকাশ এবং কবিবন্ধু, ওপার বাংলার নয়ের দশকেরই কবি শৌভিক দে সরকারের সঙ্গে যৌথ প্রয়াস। আর আপাতত কবির সবশেষ কবিতাগ্রন্থ ‘কফিনকাব্য’ (২০১৮) মুত্যুসখার মোহন বাঁশি যেন! এই বইয়ের যে ছোটো ছোটো কবিতাসমূহ ‘দশ দশমী’ কবিতা সংকলনে স্থান পেয়েছে, তার প্রত্যেকটিই বিষয়-বৈচিত্র্যে অনন্য। পড়তে পড়তে কখন যে পাঠ শেষ হয় তা টের না পেলেও তার রেশ থেকে যায়…।
কবি মামুন মুস্তাফার কবিতায় বর্ণনা আর ইমেজের সফল সমন্বয়ন লক্ষণীয়। এই কবির কবিতা শতত মননবোধে উজ্জীবিত। আর এ বিষয়গুলো কবির ‘দশ দশমী’র অন্তর্ভুক্ত কাব্যের কবিতাগুলোতে দেদীপ্যমান। আমাদের কবিতার জগতে কবিতার শরীরের নির্মাণকৌশল বদলে দেওয়া, অন্তর-জাগতিক কাব্যস্পর্শকে পাঠকের মনে স্পন্দিত করা, এবং নতুনভাবে বলা— এ সবই মামুন মুস্তাফাকে স্বার্থক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে নিঃসন্দেহে। কবি মামুন
মুস্তাফার কবিতায় যে প্রাণজস্বতঃস্ফূর্ততা তা আরও আরও বিস্তৃত হবে, এটাই প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.