অদ্বৈত মারুতের ‘জলমাতালের মুখ: বহুমাত্রিক ভাবনার শৈল্পিক বুনন।। পারভেজ আহসান

কবি অদ্বৈত মারুতের কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠে পরিমিত আবেগ, পরিশীলিত শব্দের ব্যবহার, প্রাতিস্বিক ভাবনা, ঐতিহ্য সচেতনতা এবং প্রতীকধর্মী স্বতন্ত্র চিত্রকল্পের উপস্থিতি। তাঁর কাব্যযাত্রার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রকাশিত হয়েছে তিনটি কাব্যগ্রন্থ । গ্রন্থগুলো হচ্ছে- ‘নিস্তরঙ্গের বীতস্বরে’, ‘স্বরভাঙার গান’ এবং‘জলমাতালের মুখ’। কিন্তু এ কবির একটি ভিন্ন কাব্য সত্তা উন্মিষিত হয়েছে ‘জলমাতালের মুখ’ শীর্ষক তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে। পুথিনিলয় থেকে প্রকাশিত এ কাব্যগ্রন্থটিতে ঠাঁই পেয়েছে পঞ্চান্নটি কবিতা।

গভীর জীবন দর্শন এবং শৈল্পিক সৌকর্যে ঋদ্ধ প্রতিটি কবিতা পাঠকচৈতন্যে ভিন্ন রুচি ও বোধের সঞ্চার করে।

‘জলমাতালের মুখ’ কাব্যগ্রন্থটির সূচনা হয়েছে─

‘একা’ শীর্ষক কবিতার মাধ্যমে। এ কবিতায় নান্দনিক দৃশ্যকল্পের মধ্যদিয়ে নাগরিক জীবনের তীব্র যন্ত্রণা ও দহন, জীবনের অনিঃশেষ জটিলতা, আশা-নিরাশার দোলায়মানতা শৈল্পিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে । শুধু তা-ই নয়, কঠিন জীবন সংগ্রাম, বহমান জীবনে নির্মল ভালোবাসার অপ্রাপ্তিবোধ জেগে ওঠে এ পঙক্তিগুলোয়─

‘প্রগাঢ় রোদ্দুর ঠেলে ছুটে এলে নাগরিক বিষধর সাপ-

দহনের প্রজ্ঞাপনে মরে ফের জেগে উঠি কারো আশ্বাসে
অন্তঃপুর─ জটিলতায় তবু হয় না মাছ-সংলাপ
অথচ নদীর পাশে থাকি আঁকাআঁকি করি

সবজিতে; ঘাসে…। ’

কবি হৃদয়ে লালন করেন সৌন্দর্যের দ্যুতিতে আলোকময় সমাজ, কুহেলিকা ভাঙা উজ্জ্বল ভোর। কিন্তু বৈরী সময়ে দীর্ঘ প্রচ্ছায়ার অবাধ বিচরণ, মানুষের ভেতরে প্রেতচ্ছায়ার কালো আঙুল ও কদর্য রূপ দেখে কল্পলোকে জেগে ওঠে বিষাদ। তাই ব্যথিত চিত্তে ‘অচলায়তন’

কবিতায় তার উচ্চারণ─

‘চোখে দেখি না বাতাসে ভাসতে থাকা রৌদ্র-মিছিল
কেবল কুয়াশা এসে ঢেকে দেয় নদী; দেবতা মুখ─
সদরে-অন্দরে সংক্ষুব্ধ দুচোখে কোনো সুষমা নেই
কেবল বলকানো উদগিরণ, ধূলিপ্রসর-সান্ধ্য-অসুখ’।

কাব্যগ্রন্থের নামাকরণের কবিতা, ‘জলমাতালের মুখ’-এ একই স্বরের প্রতিধ্বনি বেজে ওঠে কবিতার প্রারম্ভেই─

‘অন্ধাকার হয়ে আছে আজ দিবসের আলো
ঘরে, ঘরের বাইরে, বনাঞ্চলে তুমুল হাহাকার
সুশোভিত চিত্রকুটির, হলঘর, প্রসূন রেস্তোরাঁ
ঠান্ডা বাতাবিলেবু, ভিজতে থাকা বর্ণিল গম্বুজ
তুলতুলে শিশুর নরম দুচোখও ঘন অন্ধকারে─’।

চৈত্রের দাবদাহে পোড়া মাটি যেমন আকাক্সক্ষার বৃষ্টিতে ভিজে কাদামাটি হয়ে যায়, ঠিক তেমনি প্রেমহীন, ছায়াহীন কবির দেহ ও মন ভালোবাসার জলে স্নাত হওয়ার তীব্র আর্তি ফুটে উঠেছে ‘গা ছুঁয়ে যাও বর্ষা যত’ শিরোনামের কবিতায়─

‘বাইরে এখন বৃষ্টি নামার ধুম, খুনসুটি─ ভীষণ প্রপঞ্চনা
ভেতর-বাহির উত্তাপিত লাজুক জ্বরে; আগুনও গনগণা
গা ছুঁয়ে যাও অবিরত বর্ষা যত; হোক না বনিবনা।’

কবির হৃদয়ে প্রোথিত বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন। তিনি বিশ্বাস করেন, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছিন্ন সত্তা। কেবল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার কারণেই বাঙালী জাতি স্বাদ পেয়েছে স্বাধীনতার। তার ‘হে পিতা’ শীর্ষক কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে জাতির পিতার প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা─

‘হে পিতা,
এই যে রক্ত রাঙা ভোর অর্গল ঠেলে রোদ আসে
এই যে মেঘেরা ছুটে বেড়ায় নিজেরই ইচ্ছেমতো
এই যে সোঁদা মাটির গন্ধ ভাসে বাতাসে বাতাসে
তোমারই শিরের কাছে নত হে পিতা, প্রতিনিয়ত─’।

‘জলমাতালের মুখ, কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি কবিতায় ফুটে উঠেছে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং কবির বিষ্ময়কর অর্ন্তদৃষ্টি। মানুষের মধ্যে ক্ষমতার লোভ সবসময় কাজ করে। অনুকূল পরিবেশে অবচেতন মনের গভীরে ক্ষমতা লাভের স্বপ্ন বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়। এ কবির ‘বাঘবন্দি খেলা’কবিতায় এ সত্যটি অভিনব উৎপ্রেক্ষার ব্যবহারের মধ্যদিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। এ কবিতায় ‘চারপাশে─

বনের বাঘ মনে এনে আমরা কথায় কথায় বাঘ সাজি; হুঙ্কার দিই আজানু কম্পনে’। এ উক্তিতে ক্ষমতা লাভের জন্য মানুষের তীব্র মোহ ও আকর্ষণের বিষয়টি রূপাকাশ্রিত আবহে সুন্দরভাবে বিম্বিত হয়েছে। কালের প্রবাহে মানুষের দেহ থেকে লাবণ্য ঝরে পরে, ত্বকের

ওপর অসংখ্য ভাঁজ পরে কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে লালিত প্রেম চির সবুজ ও অমলিন হয়ে থাকে। প্রিয় মুখে লেগে থাকে স্নিগ্ধতা ও তারুণ্যের আবির। এ কথাগুলো অধিক শ্রুত হলেও মারুতের ‘নীল খাম’ কবিতায় শেষের দুটো পঙক্তিতে নতুন রূপে বাঙময় হয়েছে─

‘তবু বাহারি কচুখেতে, তার ভেতরে লতায় জড়ানো ডালিম মুখ
আজও মুগ্ধ করে রাখে
নীল খামে ভরে পাঠিয়ে উড়ো ডাকে সেই

দিয়েছিল প্রথম সুখ’।

রূপকের আশ্রয় নিয়ে পাঠককে ভাবনায় নিমজ্জিত করে রহস্যের ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন করার একটি অসাধারণ শক্তি

আছে এ কবির। তার ‘বৃষ্টি আসুক’ কবিতার উদ্ধৃত পঙক্তিগুলোয় এ কথার স্বাক্ষর বহন করে─

‘বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে ক্ষত নাক ফুল;
হ্যাঙারে ঝোলানো মন ভিজে যাচ্ছে

কপালের ভাঁজ─ চৌকি কেঁপে উঠছে মুহুর্মুহু
করতালিমুখর এই গভীর রাত কলকলিয়ে নেমে যাচ্ছে খাদে
অচেনা বন্দরে নোঙর ফেলে এক চিতল মাছ!’

আমার বিশ্বাস, অদ্বৈত মারুতের ‘জলমাতালের মুখ’কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা পাঠকচিত্তে ভিন্ন অনুভূতির আবেশ ছড়ায়। ভাবনার অতলান্তে নিয়ে যায় পাঠককে। যদিও কয়েকটি কবিতায় মেটাফোরের ব্যবহারে সামান্য ধূসরতা রয়েছে কিন্তু দৃশ্যকল্প ব্যবহারে নিজস্বতা, শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সচেতনতাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নতুন কাব্যশক্তি হিসেবে অবির্ভূত হওয়ার অমিত সম্ভাবনা রয়েছে অদ্বৈত মারুতের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.