অণুগল্প।। মরা নদীর ধারে একসারি বক।। মাহাবুবা লাভীন
প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনার জন্য পুরো শহর লকডাউন। বিশ্ববিদ্যালয় গেটের সামনে চা বিক্রি করা সাইফুলের একমাত্র উপার্জনের এই দোকানটা বন্ধ থাকায় পেটটাও রীতিমতো লকডাউনে যাওয়ার উপক্রম। একলা মানুষ হলে হয়তো লকডাউনে থাকতে থাকতেই মরে ভূত হয়ে ত্রাণের চাল চোর আর টিসিবির তেলচোরের ঘাড়ে ঘুরেই কাটাতো পারতো। কিন্তু ঘরে পোয়াতি বউ, তারে তো আর এমন কষ্ট দেয়া যায় না, তাই লজ্জা শরম সব ভেঙে কাউন্সিলরকে বলেকয়ে একটা ত্রাণের টিকিটের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। কিন্তু কাউন্সিলরের চ্যালারে যে একশত টাকা পকেটে গুঁজে দিয়েছে একথা মরে গেলেও কেউ জানতে পারবে না বলে কথাও দিয়েছে। পরদিন ত্রাণের চাল, ডাল আর তেল পাবার জন্য দীর্ঘ লাইন, সামনের দিকে সেনাবাহিনীর ঠ্যালায় তিনফিট দূরে দূরে চাতক পাখিগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও পিছনের দিকে গিজগিজ করছে ঢুলঢুলু চোখে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারখানেক মাথা। সাইফুলের পেটে তখন খিদেটা প্যাকপ্যাক করছে, মাথার উপর তপ্ত একখান সূর্য, পাশে গা ঘেঁষা মানুষগুলোর মুখে ফেনাতোলা গল্পের জোরে ছিটছিটানি থুথু, নিচে তো পা দুটো মনে হয় কেউ মনে টেনে ধরে আছে। তবুও সাইফুলের চোখে ত্রাণের প্যাকেটের ছবি চিকচিক করছে, তার মধ্যে রোদটা এসে যেন এই চিকচিকভাবটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, আর নাকে ভাসছে মসুর ডালের গন্ধ। সাইফুল দাঁড়িয়েই আছে, লাইন আর ছোট হয় না। এদিকে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা, এখনো শ’চারেক মানুষের দীর্ঘ লাইন সাইফুলের সামনে। খবর এলো আজকের মতো ত্রাণ শেষ, কাল দেয়া হবে কিনা তার নিশ্চিত খবর এলো না। এখন ফিরতে হবে ঘরে। বিষন্ন মনে সাইফুল তাকালো পশ্চিমের আকাশে। গনগনে লাল সূর্যটার উপরে একটা খাপছাড়া কালো মেঘ, বৈশাখী ঝড়ের আভাস নিয়ে সূর্যটার গায়ে পড়ে আছে আর তাতে ফালা ফালা হয়ে আছে সন্ধ্যার আলোটা। এই কেটে যাওয়া আলোয় সাইফুল দেখতে পেল মরা নদীর ধারে সারাদিন মাছ খুঁজে ক্লান্ত হওয়া একসারি সাদা বক দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটগুলোতে সেই ক্ষিপ্রতা নেই। বৈশাখী ঝড়ের যে আভাস তাতে গাছের মগডালে থাকা বাসাগুলোও আর টিকবে কিনা এই ভাবনায় দাঁড়িয়েই থাকলো একসারি সাদা বক। কিন্তু সাইফুলের উপায় নেই তাই খিদের পেটটা একহাতে চেপে ধরেই ছুটতে হলো পোয়াতি বউটার কাছে।