নির্বাচিতবিশেষ সংখ্যা

বিজয় দিবস সংখ্যা ‘মুক্ত বাতাসে বিজয়োল্লাসে- ২০২৫

সম্পাদকীয় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্ব, মর্যাদা ও মানবিক স্বাধীনতার পথে এক অদম্য যাত্রা। নয় মাসের রক্তঝরা যুদ্ধ, লাখো শহীদের ত্যাগ, নির্যাতিত মায়েদের অশ্রু, আর সীমাহীন সাহসের যে গাঁথা—সেটিই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি। তাই মহান বিজয় দিবসে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই কাব্যশীলন আয়োজন করেছে গল্পের বিশেষ সংখ্যা । এই সংখ্যায় যে গল্পগুলো স্থান পেয়েছে, সেগুলো কোনো কাল্পনিক আখ্যান নয়; এগুলো সেইসব বীর-নারী-পুরুষের জীবন থেকে উৎসারিত, যারা অকাতরে নিজের সবকিছু উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্য। কারো হাতে রাইফেল ছিল, কারো হাতে বই, কারো মনে ছিল শুধু দৃঢ় বিশ্বাস—বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে। কখনো নদীর ওপারে শত্রুর অবস্থান দেখে বালুচরে লুকিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি; কখনো মাটির ঘরে আহত যোদ্ধাকে লুকিয়ে রাখা এক মা’র নিঃশব্দ সাহস; আবার কখনো সীমান্ত পাড়ি দেওয়া এক ছাত্রের অনিশ্চিত পথচলা—এইসব গল্প আমাদের ইতিহাসকে গভীর করে, মানবিক করে, বাস্তব করে তুলে। মুক্তিযুদ্ধের এই বিশেষ গল্প সংখ্যার উদ্দেশ্য শুধু ইতিহাস বলা নয়; বরং সেই অনুভূতিগুলো পাঠকের হৃদয়ে জাগিয়ে দেওয়া, যে অনুভূতি মানুষকে স্বাধীনতার মূল্য বুঝতে শেখায়। আমরা বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের গল্প যত বেশি বলা হবে, তত বেশি দৃঢ় হবে আমাদের জাতির মূল্যবোধ, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনা। স্বাধীনতার গল্পগুলি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকুক—ঠিক এই আকাঙ্ক্ষাতেই আমাদের এই প্রকাশনা । সকল লেখক ও পাঠককে বিজয়ের শুভেচ্ছা।

১। বীরাঙ্গনা : আব্দুর রউফ চৌধুরী ২। মুন্নী : তানভীর মোকাম্মেল ৩। জয়ার চন্দ্রাভিযান : র ফি কু র  র শী  দ ৪। ধর্মাধর্মবিনিশ্চয়: জাকির তালুকদার ৫। বাবার মাথা: ঝর্না রহমান ৬। মুক্তিযুদ্ধ ও একজন আনা: আমেনা আফতাব ৭। নভেম্বর ৭১: নাসিমা আনিস ৮। কবিয়াল: মোজাম্মেল হক নিয়োগী ৯। রাত যখন খান খান হয়ে যায়…: মনি হায়দার ১০। ভিটামাটি উপাখ্যান: সমীর আহমেদ ১১। কুয়াশার দেওয়ালে যে সূর্য : তাহমিনা কোরাইশী ১২। রুটি ও মাতৃভূমির কুরসিনামা: আলমগীর রেজা চৌধুরী ১৩। মোল্লা প্যালেসের ইতিকথা: আবুল কালাম আজাদ ১৪। প্রেসিডেন্ট : নুসরাত সুলতানা ১৫। অন্ত:শীলের পালা : ইসরাত জাহান ১৬। সবুজ পাঞ্জাবী: রাশেদ রেহমান

ভাদ্রমাস।
কুশিয়ারার দুকূল ছাপিয়ে জল ছলাৎ ছলাৎ করছে। প্রতিবছর পলি জমতে জমতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, বান ডাকার আগেই বন্যা দেখা দেয় তাই। ইংরেজের রাজত্বকালে ড্রেজার দিয়ে নদীর বুক গভীর করা হতো; তখন মাঝারি আকৃতির জাহাজকে বুকে নিয়ে নদী নৃত্য করতে পারত, আর তার সৈকতে ঊর্মিবালারা কলহাস্যে ঢলে পড়ত একে অন্যের গায়ে; কিন্তু আজ, একাত্তর সনে, মটরলঞ্চ চলতেই হোঁচট খায় মাইলে তিনবার, লগি দিয়ে জল মেপে এগুতে হয়। সাতচল্লিশ থেকে নদীর তলদেশের কর্দম উত্তোলন করার কাজ ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকলে একদিন নদীর বাঁকে, পলি ভরাট বুকে, ড্রেজারগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে যায়, আজ তার খোঁজ আর কেউই রাখে না; এমনকি গতবছরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশের বন্যার ব্যাপকতা কীরকম হতে পারে তা বোঝার চেষ্টা করেনি, ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতাও না; তাইতো পঁচিশে মার্চের পর থেকে বর্বর হানাদার বাহিনী হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। বাঙালি তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী জলে ডুবিয়ে মারছে শত শত পাঞ্জাবি-পাঠান জওয়ানকে, তারা এসেছিল গ্রামবাংলায় হালাকু খানের বংশধর বলে নিজেদের পরিচয় রক্ষার্থে, বাঙালি মুসলমানদের হাজামের কাজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে।

অজস্র স্রোতস্বিনীর দেশে বর্ষাকালে প্রত্যন্তাঞ্চলে চলাচল করার জন্য নৌকার ব্যবহার অপরিহার্য, এসময় পাঞ্জাবি-পাঠান জওয়ানদের নাজেহাল করার সুযোগ বাঙালির সামনে এসে দাঁড়ায় সহজেই। খেয়ানৌকায় উঠলে তাদের হাঁটু কাঁপে। তারা কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। ছাতুভোজী কি না তাই হয়তো! তাদের নড়নেচড়নে নৌকা দুলতে থাকে অকারণেই– এমনি এমনিই। এমন অবস্থায় মাঝি দুজন আড়চোখে তাকায় একে অন্যের প্রতি। শত্রু দেখে তাদের অন্তরজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। চোখে জেগে উঠেছে প্রতিশোধের রুক্ষতীক্ষ্নস্তব্ধ হিংসা, পেশিতেও। তাদের চিন্তায় আশ্রয় নিয়েছে স্বাধীন দেশ-নদী-আকাশ-নৌকা। তাদের মনে শত্রুনিধনের প্রতিজ্ঞায় ঝড় চলছে। তাদের কাছে যাত্রীরা তুচ্ছ, দৃষ্টি চলে যায় নদীর জল ভেদ করে আরও গভীরে। একসময় উভয় মাঝি সুকৌশলে তরণির দোলন বৃদ্ধি করে দেয় কয়েকগুণ, প্রতি কাতেই নৌকায় জল সহজে প্রবেশ করতে থাকে। সিপাইদেরও ভয় বাড়ে, সেইসঙ্গে তরণিতে জল বৃদ্ধি পায় তরতর করে; অবশেষে উভয় গলুইয়ে বসা মাঝির বৈঠা চালানোর নিপুণতায় খেয়াতরি চলে যায় পাতালপুরি, জলপরির দেশের অতলে। পাকসেনাদের তরণ আর হয় না, হয় মরণ, সোজা জাহান্নামে গমন, জাঁহাবাজদজ্জালের স্থায়ী বাসস্থানে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পিত এমনই এক ঘটনায় আহমেদপুর ঘাটে স্বজাতির চল্লিশজন জওয়ানসহ চারজন অফিসারের সলিলসমাধির সংবাদে বিচলিত হয় কর্নেল জাবেদ। সে তার নায়েব ইমরান ও সিপাই আসলামকে নিয়ে, স্পিডবোটে চড়ে শেরপুর ঘাটে। এই স্থানের বিশেষ গুরুত্ব থাকার কয়েকটি কারণ; প্রথমত, এ হচ্ছে নবীগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের ত্রিবেণি; দ্বিতীয়ত, এখানে নদী-পারাপার হওয়ার জন্য ফেরিনৌকা ব্যবহার করা ছাড়া অন্যকোনো উপায় নেই; তৃতীয়ত, শেরপুর ঘাটের আধমাইল ব্যবধানে সাদিপুর ফেরিঘাট অবস্থিত, ফলে এই আধমাইল জায়গা অতিক্রম করতে যানবাহনের সময় লাগে অনেক; চতুর্থত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টে হাজার হাজার ব্রিটিশ সৈন্য প্রেরণের উদ্দেশ্যে শত শত গাড়ি কয়েকদিনের জন্য আটকা পড়ায় এই স্থান একটি স্বাভাবিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এসব অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করে মুক্তিযোদ্ধারা শেরপুর থেকে সাদিপুর পর্যন্ত এই অঞ্চলকে মুক্ত রাখার জন্য হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের অনেক বাঙালি কৃষক সাধারণ। বন্দুক, লাঠি– যার যা অস্ত্র আছে– নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে বঙ্গমাতার ইজ্জত রক্ষার্থে; আজাজিল বাহিনীর বিরুদ্ধে যেন আবাবিল ঝাঁকসমূহ। বেগতিক দেখে পাকিস্তান বিমানবাহিনী রকেট হামলা চালিয়ে, নির্বিচারে হত্যা করে চলেছে আবালবৃদ্ধবনিতাকে। নাৎসিবাহিনীর সদৃশ হত্যাযজ্ঞের সম্মুখে মুক্তিবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সম্মুখসমরে অযথা লোকক্ষয়ের চেয়ে গেরিলাযুদ্ধই শ্রেয়। এই সিদ্ধান্তের সার্থক বাস্তবায়ন চলছে সারাদেশে। আহমেদপুরের ঘটনা তারই একটি, বিচ্ছিন্ন কিছুই নয়। এই ঘটনার তদন্ত কাজ করতে কর্নেল জাবেদ এনাথগঞ্জ বাজার পৌঁছবে। সেখানে পৌঁছে রাজাকার ও পাকসেনাদের কর্মতৎপরতার তদারক করবে; কারণ, সদর দপ্তর থেকে জেনারেল নিয়াজি নির্দেশ দিয়েছে ।

প্রথমত, রাজাকার নিয়ন্ত্রণ করা অত্যাবশ্যক। তারা অস্ত্র পেয়ে অপব্যবহার করছে বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের স্বার্থ সামনে না রেখে ব্যক্তিস্বার্থ সাধনে তৎপর হয়ে উঠেছে রাজাকাররা। এদের সঙ্গে কিছু আলেমশ্রেণির রাজাকাররাও অমুসলিম লাস্যময়ী রমণীর সহবাসে ভুলে যাচ্ছে পাকজমিন পাকিস্তানের আদর্শ বেদিনকে দিনে আনো, নয়তো-বা নিধন করো।
দ্বিতীয়ত, হিন্দুস্থানের দালাল আওয়ামী লীগ ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী লোকদের নিধন করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, ধর্ষণে নিযুক্ত জওয়ানদের ফিরিস্তি লিপিবদ্ধ করা আবশ্যক।
চতুর্থত, অফিসার ও জওয়ানদের মধ্য থেকে সর্বাধিক পটু পাঁচজনকে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ খেতাব হিল্লালে পাকিস্তান প্রদান করে পুরস্কৃত করবেন।
কর্নেল জাবেদকে, এক সপ্তাহের মধ্যে, এসব অফিসার ও জওয়ানদের নাম, সার্ভিস নম্বর ও কৃতিত্বের বিবরণসহ পেশ করতে হবে। কাক্সিক্ষত উপযোগী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা কি তার পক্ষে সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না কর্নেল জাবেদ, তাই সে তাকিয়ে আছে দূরে, যেখানে মিতালি পেতেছে পুঞ্জীভূত সাদানীল মেঘ আর দিগন্তপ্রসারিত কুশিয়ারার স্তব্ধতা। তখনই তার অসহায় ক্ষুদ্র অসচ্চরিত্র মন ভাবতে লাগল, একজন রাজাকার তার সঙ্গে থাকলে ভালোই হয়। সঙ্গে সঙ্গেই সে বোটের চালককে ইঙ্গিত করল, বাঁ-তীর ঘেঁষে অগ্রসর হতে। মাস্তুলহীন বোটে উলটো হাওয়া ধাক্কা খেলো। গতিপথ ঘুরে গেল। পালহীন বোটটি জলকে ছেদ করে এগিয়ে চলল তীরের দিকে, আর তখনই কর্নেল জাবেদ দেখতে পেল নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালেব আলিকে। দূর থেকে সে ঠিকই দেখতে পাচ্ছে, তালেব আলি মুখ খুলে পান চিবুচ্ছে। পাঞ্জাবি প্রীতিতে আপ্লুত হয়ে পাকসেনাদের পদলেহনে অন্য যেকোনো রাজাকার থেকে তালেব আলি কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই, বরং তাকে অন্যূন পদলেহনকারী বলা যায়, গত মাসের এক ঘটনাই এর প্রমাণ– পূর্ণিমার রাত।

তালেব আলির বাড়িতে ভূরিভোজনের পর কর্নেল জাবেদ বলল, তোর স্ত্রী কত যত্নসহকারে রান্না করে মায়া মাখিয়ে আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য খাওয়াল। প্রতিদানে তার তুষ্টির জন্য আমার কিছু করা উচিত। কী বলো তুমি?
আপনার মেহেরবানি।
তাকে আমার সঙ্গে দ্যাও। একরাতের জন্য শুধু সে আমার মেহমান হবে। আমি তাকে প্রাণভরে আদর করব। কথাগুলো শেষ করে কর্নেল জাবেদ নিজেকে বোঝাতে লাগল, আমি অবশ্য এমন আবদার করতাম না, যদি-না তালেব আলির স্ত্রী আমাকে মুচকি হাসিতে, আহ্লাদের আঘাতে আহত না করত। মনে হচ্ছিল, কতক্ষণে তাকে আমার ঊরুদ্বয়ের মধ্যখানে স্থিত করি। পাঞ্জাবি নারীরা বাঙালি রমণীদের চেয়ে ফর্সা হওয়া সত্ত্বেও অমসৃণ ত্বক ও অশ্লীল কথা তাদের করেছে খেঁকশিয়ালি; অন্যদিকে পাঞ্জাবি পুরুষগুলো যেন খরগোশ। তালেব আলির স্ত্রীর মতো সুন্দরী বঙ্গললনার মুচকি হাসি বিশ্বের যেকোনো পুরুষের জন্য বিস্ময়াবহ, আঁধার রাতের জোনাকি যেন! পৃথিবী বিষণ্ন হয়ে যেত, বাগান জঙ্গলে পরিণত হতো, পুরুষরা সন্ন্যাসী হয়ে যেত যদি বাঙালি নারীর মুচকি হাসি এই ধরায় না থাকত। এজন্যেই বোধ হয় ইরানে সুফিবাদের উৎপত্তি হয়েছিল আর উত্তর-পশ্চিম ভারতবর্ষে সন্ন্যাসীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু বাংলার বাউলের ধারেকাছে কেউ পৌঁছতে পারেনি।

তালেব আলি ঘরের আবদ্ধ হাওয়ায় দাড়িগুচ্ছ সামান্য দুলিয়ে, মাথার টুপি নাড়তে লাগল। মনে মনে বিড়বিড় করলেও প্রকাশ্যে কিছু বলল না। কর্নেল জাবেদের প্রস্তাবে আপত্তিও করতে পারল না, বরং একগাল ধোঁয়া ছেড়ে হুঁকো রাখতে রাখতে, বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে নির্বোধের মতো তাকিয়ে রইল উঠোনের অন্যপ্রান্তে, নিঃসঙ্গ নিরুপায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা গাভির ওলানের দিকে। তার সজাগ অনুভূতি একেবারে লোপ পেল, তবুও তার ঠোঁটের কোণের হাসিটি যতই করুণ হোক-না কেন মিলিয়ে গেল না; কারণ, সে তার পরস্ত্রীরমণমত্ত রাজপুরুষকে নারাজ করতে পারে না।
তালেব আলি বোটের কাছে এগিয়ে এসে আবৃত্তির সুরে বলল, আস্সালামু আলাইকুম।
কর্নেল জাবেদ সেকথা শুনতে পেল না; তার মাথায় নানারকম চিন্তা, একথা স্বীকার করতে হয় পূর্ব-বাংলায় রাজাকার না থাকলে আমাদের পাত্তাই পাওয়া যেত না; ইতিহাসই তো সাক্ষী, মিরজাফর না থাকলে বাংলাকে ক্লাইভ কব্জাগত করতে পারত না। কর্নেল জাবেদ ভেবেই চলল, কিন্তু সালামের উত্তর দিলো না।
বেঁটে তালেব আলি উত্তরের অপেক্ষা না করেই বোটে ওঠার জন্য অগ্রসর হলো; কিন্তু তার সামনে এক সমস্যা এসে হাজির হলো– কী করে বুট দ্বারা সুরক্ষিত দীর্ঘবপু কর্নেল জাবেদের পদযুগল স্পর্শ করবে! লোকটি তো দাঁড়িয়ে আছে একটি পা নৌকার তলদেশে ও অন্যটি পাটাতনে স্থাপন করে। তালেব আলির মন, এ কাজ করতে না পারলে আচুদা১ হয়ে থাকবে, আত্মায় অতৃপ্তি আসবে। কর্তব্যে অবহেলা করা মন তার খুঁতখুঁত করতে লাগল, তাই হয়তো সে হাসির সাহায্যে একপ্রকার মানিয়ে নিতে চাইল; তবুও কোনো উত্তর এলো না কর্নেল জাবেদের কাছ থেকে।
ব্যর্থ মনে সে নায়েব ইমরান ও সিপাই আসলামকে সালাম জানিয়ে নৌকায় উঠে এলো, তবে বসল না, কর্নেল জাবেদের ইঙ্গিতের আশায় দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু কর্নেল জাবেদ নিশ্চুপ, তার প্রশস্ত কপালে দুশ্চিন্তার রেখাগুলো সুস্পষ্টভাবেই ফুটে আছে, কুশিয়ারার জলে তাকে অত্যন্ত অসহায় ও ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে, হয়তো সে মনে করছে পাকশক্তি এই নদীর কাছে বিন্দুবৎ; সে বাংলার কত নদী, কত বিল পাড়ি দিয়েছে, ভয় পায়নি, কিন্তু আজ, হঠাৎ, ভীত হয়ে উঠল। সে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকাল নায়েব ইমরান ও সিপাই আসলামের দিকে, তাদের চোখেও চিন্তার ছায়া, কিন্তু রাজাকারের দিকে ভুলেও তাকাল না। অসহায় তালেব আলি নিশ্চুপে বসে পড়ল, তবে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে জলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গের ওপর, এই তরঙ্গগুলো ভেঙে একটি খেয়াতরণি পাড়ি জমিয়েছে পূর্ব থেকে পশ্চিম তীরে। জোড়াতালি দেওয়া পালের মতো কর্নেল জাবেদের দৃষ্টি, যদিও তিরবেগে ছুটে চলেছে তার বোটটি। খেয়াতরণিটির দিকে চোখ পড়তেই কর্নেল জাবেদের দৃষ্টি গিয়ে বিঁধল হাল ধরে থাকা মাঝিটির ওপর। এই প্রথম সে উপলব্ধি করল যে, মাঝির পায়ের নাচনের সঙ্গে সঙ্গে, তালে তালে নৌকাও দুলছে এদিক-ওদিক; এইরকম দোলনই হয়তো আহমেদপুর ঘাটে নৌকাডুবির কারণ হয়ে উঠেছিল। চিন্তিত কর্নেল জাবেদ মাঝিটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে, তালেব আলিকে জিজ্ঞেস করল, এই ব্যাটা কেন পা’কে একবার সামনে নিচ্ছে আবার পেছনে আনছে?
এ হচ্ছে হাল চালানোর কায়দা স্যার।
মনোমতো উত্তর না-পাওয়ায় কর্নেল জাবেদ রেগে বলল, কায়দা কিয়া বাচ্চে, সে তো বৈঠা ঠেলছে না, শুধু এপাশ-ওপাশ করছে। এতে নৌকা কাত হচ্ছে একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে।
স্যার, তালেব আলি কাঁচুমাচুভাবে বলল, হাল ধরার এইতো নিয়ম। প্রশস্ত নদীতে হাল এমনভাবে ধরলে নৌকা দুলে দুলে অগ্রসর হয়। ভালোভাবে নজর করলে আমার কথার সত্যতার প্রমাণ পাবেন স্যার।

কর্নেল জাবেদ তীক্ষ্ন অনুসন্ধানী দৃষ্টি স্থাপন করল তালেব আলির ওপর। সেও কর্নেল জাবেদের দিকে তাকিয়ে আছে। কর্নেল জাবেদের দৃষ্টির তেজ সামলাতে না পেরে তালেব আলি চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হলো। দুজনই বোঝে, এই দৃষ্টির অর্থ কী! কর্নেলের সমস্ত অন্তরজুড়ে নিদারুণ বিপদের আশঙ্কা, তাই তার আক্কেল গুড়–ম। কথা বাড়াল না সে, তার দুর্বলতা প্রকাশ করতে চায় না, যেটুকু করেছে এতেই লজ্জাবোধ করছে। অস্বাভাবিক নির্লিপ্ত কর্নেল জাবেদ তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল তালেব আলির ওপর থেকে, অতঃপর স্থাপন করল নৌকাগুলোর দিকে। চোখে অস্থিরতা প্রকাশ না পেলেও অন্তরে ঠিকই চলছে কুশিয়ারার তরঙ্গভাঙা। শত্রু ধরার কেমন ফন্দি এঁটেছে বাঙালি জনগোষ্ঠী। সে অবাক! তারা হয়তো এমনই ফাঁদ পেতেছে সারা দেশজুড়ে। কোনদিন যে আমি শিকার হব তা কে জানে! আমি আমার অসহায় যুবতি স্ত্রীকে দেশে ফেলে এসেছি। তার জন্য ভাবনা হয়। কিন্তু ভেবে লাভ কী! এতদিনে হয়তো সে তার দেবরের সঙ্গে পুরোদমে প্রেম জমিয়ে ফেলেছে। এই রীতি অবশ্য পাঞ্জাবি মুসলমান নারীরা শিখেছে পাঞ্জাবি শিখ নারীদের কাছ থেকে। শিখরা সাতচল্লিশে পূর্ব-পাঞ্জাবে চলে যায় ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছে তাদের তমদ্দুন। এ নাকি পারিবারিক সম্প্রীতি রক্ষার্থে প্রয়োজন। তাদের নিয়ে অনেক রসালো গল্প আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে; অধিকাংশই যৌনসংক্রান্ত, পর্নোগ্রাফির অন্তর্গত। এগুলোর কতটা সত্য কে জানে?

কর্নেল জাবেদের বিক্ষিপ্ত ভাবনার ইতি ঘটল যখন সে দেখতে পেল– আহমেদপুর বাজারের ঘাটে এক লোক তার ডানহাত দিয়ে লুঙ্গিকে হাঁটুর সঙ্গে লেপটে ধরে এগিয়ে আসছে। সে তার বাঁ-হাতে কী যেন উভয় ঊরুর মাঝখানে লুকিয়ে রাখার তদবিরে তৎপর। বোটের দিকে তাকিয়ে আছে লোকটি। মুখ দেখে মালুম করা যাচ্ছে না তার আসল মতলব কী! কালোঘন দাড়িগুলো আড়াল করে রেখেছে তার মনের আরশিকে। গ্রেনেড গোপন করে রেখেছে নিশ্চয়! কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। তার দেহে কেমন কেমন এক ছায়া যেন বিরাজ করছে। নিশ্চিত সে একজন মুক্তিযোদ্ধা। সকল বাঙালিই, রাজাকার তো আর বাঙালি নয়, বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। প্রকৃতিও অপ্রাকৃতিক। নদীর ঢেউ উলটে ফেলে দেয় সিপাইবাহী নৌকাগুলো। কত বীর মুজাহিদকে যে সলিল-সমাধি দেওয়া হচ্ছে তার হিসাব যদি পত্রপত্রিকায় ছাপানো হতো তাহলে পাকিস্তানিরা খেপে যেত। ভীত হয়ে যেত যদি জানত কাঁঠালের ভেতর মালেকুলমউত গুম হয়ে বসে আছে। এই ধরনের ভাবনা কর্নেল জাবেদকে ব্যাকুল করে তুলছে। অস্থিরতাই প্রকাশ পাচ্ছে তার আচরণে। তালেব আলির দিকে তাকিয়ে অস্থির কর্নেল জাবেদ প্রশ্ন করল, লোকটি কী করছে?
তালেব আলি একটু ইতস্তত করে, লোকটির কা-কারখানা ভালোভাবে দেখে নিয়ে, মুচকি হেসে উত্তর দিল, পেশাব করে কুলুখ নিচ্ছে স্যার।
এমনভাবে বলল যেন সে এই বিষয়ে নিশ্চিত নয়।
বিপদের চিন্তায় কর্নেল জাবেদের সন্দেহ বেড়ে গেল। বলল, বাঁ-হাত বের করছে না কেন?
তালেব আলি জবাব দিলো, এভাবে চল্লিশ কদম হাঁটতে হয়, মোল্লামৌলোভী তা-ই বলেন।
এমন আজব কথা কর্নেল জাবেদ কোনোদিনই শোনেনি। সে ধমক দিয়ে বলল, ছাই! বেয়াকুফ! সে নিশ্চয়ই হিন্দুস্তানের দালাল।
এই হিন্দুস্তান শব্দের একটি মারাত্মক প্রভাব আছে। এই শব্দ কানের ভেতর দিয়ে কোনো পাঞ্জাবি-পাঠান সামরিক জওয়ানের মরমে প্রবেশ করলে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে শূকরে পরিণত করে। অদৃশ্য হিন্দুস্তানির উদ্দেশে তেরি মা কি ফুদ্দি বলে অকারণে গালি দিতে তাদের বাধে না। যাকে সামনে পায় তাকেই খোদাদি কসম বলে গুঁতা মারে। আর্মির অধিকাংশ লোক গোঁয়ারগোবিন্দ শ্রেণির, জ্ঞানালোকবঞ্চিত, মওদুদি-মৌলোভী২ দ্বারা পরিচালিত, তাই তারা জানে না যে, মুহম্মদ আলি জিন্নাহ ও লিয়াকত আলি খানসহ তাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের জন্মস্থান ছিল বর্তমান হিন্দুস্তানে। এমনকি বাঙালি-হত্যাযজ্ঞের দুই মহানায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া ও জুলফিকার আলি ভুট্টো হিন্দুস্তানের আলোবাতাসে মানুষ হলেও ধর্মীয় রাষ্ট্র পাকিস্তানের আবহাওয়া তাদের আস্ত হায়ওয়ান বানিয়েছে, তারাই মিথ্যা প্রচারে লিপ্ত। তারা বলছে যে, পূর্ব-বাংলার অধিকাংশ মানুষ অমুসলমান, তাদের হত্যা করা জায়েজ।
আজকাল বন্দুক জিনিসটি পাঞ্জাবি-পাঠান সামরিক অফিসার বা জওয়ানদের বেপরোয়া করে তুলেছে; অজান্তে ট্রিগারে তাদের আঙুল বাঁকা হয়ে যায়। পাঞ্জাব ও সীমান্তপ্রদেশে সংস্কৃতিবান মানুষ থাকতে পারে বলে আশা করা যায় না। তাদের জিনে জননীর প্রতি জনকের নিষ্ঠুরতা সংক্রামিত হয়েছে, তাইতো পিতার আক্রমণাত্মক মনোবৃত্তি নিয়ে পাঞ্জাবি-পাঠান শিশু জন্মগ্রহণ করে। একমাত্র সুশিক্ষাই পারে পশুর স্তর থেকে মানবোচিত গুণাবলি অর্জনে সাহায্য করতে। যেখানে শিক্ষার পরিবেশ মানুষ গড়নের উপযোগী নয়, সেখানে বর্ধিত সন্তান বন্যপশুর মতো হত্যায় আনন্দ পাবে না তো কী! তাইতো লোড করা রাইফেল নিয়ে ইয়াহিয়াবাহিনীর সৈন্যরা সবসময় প্রস্তুত থাকে। পিশাচপ্রবৃত্তি মনের কোণে মানুষহত্যার আনন্দ উঁকি দিলে শুধু তাক করে গুড়–ম গুড়–ম করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। শূকরস্বরূপ কর্নেল জাবেদ তা-ই করল। শুধু অভিশপ্ত হারামি মুখে উচ্চারণ করল, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। সঙ্গে সঙ্গেই সুন্নতে পাবন্দ লোকটি নদীতীরে ধরাশায়ী হলো, লুঙ্গি তোলা অবস্থায়ই।
তান্বী খড়খড়ি খুলে স্বামীর অপেক্ষা করছিল। তার স্বামী ঢ্যাঁড়শ ভাজি দিয়ে আটার তৈরি পাতলা রুটি খাবে। ভাজি তৈরি করার সময় অবশ্য তান্বীরের পাশে বসে তার স্বামী যুদ্ধের গল্প করছিল। সাহসী যুবক। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী। সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে তান্বী প্রশ্ন করলে তার স্বামী শুনিয়ে দিয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতারের একটি ঘোষণা– স্বাধীনতার বৃক্ষমূলে দেশপ্রেমিক ও দেশদ্রোহী-অত্যাচারী-আগ্রাসীর রক্ত প্রয়োজন, অশ্বত্থের সজীবতা সংরক্ষণ হেতু।
হঠাৎ বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনে তান্বী তাকিয়ে যা দেখল তাতে তার প্রাণপাখি উড়ে যায়-যায় অবস্থা। আলুথালু তান্বী দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল জলেস্থলে পতিত তার স্বামীর দেহটিকে। তখনও প্রাণান্তিক বেদনা চলছে। তার ডানহাতটি তান্বীর চুলের খোঁপায় এসে একটু নড়েচড়ে স্থির হয়ে গেল। পাগলিনী তান্বী তার স্বামীর কপালে চুমু খেলো, পরক্ষণে সে তার কপাল ঠেকাল তার স্বামীর বুকে, তারপর নাড়াচাড়া করতে লাগল, ঘুমন্ত শিশুকে জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা যেন। বাজারের দোকানিরা জানালার ফাঁকে দেখে নিল এই নৃশংস হত্যাকা-টি, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসার সাহস পেল না। আতঙ্কিত গ্রামগঞ্জের মানুষের দৃষ্টিতে সশস্ত্র পাকসেনারা যেন আল্লাহর আইন-বহির্ভূত আজরাইল। একমাত্র মুক্তিযোদ্ধারাই নির্ভীক, তারা স্বকীয় সত্তার চেয়ে স্বদেশ বড়–এরকম ধারণায় উদ্বুদ্ধ। এই ধরনের কত কথা বলত তান্বীর স্বামীও। সেসব কথার অর্থ কি সে বুঝেছিল!

কর্নেল জাবেদের স্পিডবোটটি নদীর পাড়ে এসে ভিড়ল, সঙ্গে সঙ্গেই ঢেউয়ের ধাক্কায় তান্বীরের শাড়ি হাঁটুর ওপর উঠে এলো। বৃষ্টিভেজা, বোরকা-ঢাকা, মুলতানি মুখশ্রীর মতো আকর্ষণীয় কুঁচকি ও ঊরু দেখে নায়েব ইমরান লাফিয়ে পড়ল নৌকা থেকে; যুবতির নিতম্বের পাশে এসে থমকে দাঁড়াল চিত্তাকর্ষক তির্যকযোনি দেখার কু-আশায়। বন্দুকের নালা দিয়ে নাড়া দিলো তান্বীর ঊরু। বাহ্যজ্ঞানহীন উবুড় হওয়া তান্বী এসবে খেয়াল রাখার কথা নয়; সে যেন কারবালা প্রান্তরে, ফোরাত নদীর তীরে, এজিদসৈন্য দ্বারা শরবিদ্ধ স্বামীর মৃতদেহ বুকে নিয়ে বেহুঁশ-বেহুলা-বিলাপরত হযরত ইমাম হোসেনের দুহিতা সখিনাসতী। বর্বর পাকিস্তানি সিপাই আসলামের আর অপেক্ষা করা সহ্য হলো না; সে হয়তো পাঞ্জাবি-পাঠান সেনাদের মতো জঘন্য-লেহনে অভ্যস্ত, তাই সে ত্বরিতবেগে তান্বীরের শাড়ি তুলে নিল তার কোমরের ওপর। নৌকা থেকে কর্নেল জাবেদ দূরবিন দিয়ে দেখতে লাগল, নিতম্ব-উন্মুক্ত জেল্লাবতীর পাছাদ্বারের কপাটটি। নরাধমের খুঁটিয়ে দেখার নির্লজ্জ লোলুপতা দৃষ্টে গৃহশত্রু বিভীষণ তালেব আলি অবাক! পাঞ্জাবির পোষাকুকুর রাজাকার তালেব আলি ভাবতে লাগল, কেমন বিকৃত মনোবৃত্তির উলঙ্গ প্রকাশ! মনিবের কোনো কাজে নাখোশ হওয়ার ইঙ্গিত প্রকাশ করা নাদানের কর্ম, তাই প্রভুর কর্মকা- সে শিরোধার্য করে রা শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করল না; যে জোকার সে-ই তো রাজাকার।

হা হা করে হেসে উঠল গর্দভকণ্ঠে কর্নেল জাবেদ, হয়তো-বা পায়ুকামী মনোবৃত্তির পরিতৃপ্তিতে। কামাতুরের অট্টহাসির বিকট শব্দে জ্ঞান ফিরে পেল যুবতি তান্বী। উভয়পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন বেজাতি সশস্ত্র সৈনিক তার নয়নভোলানো লাবণ্যচঞ্চল দেহসুষমাকে হাভাতের মতো গিলে খাচ্ছে দেখে সতীসীতা সতর্ক হলো। বসন সংযত করে উঠে বসল। নদীর জলে ভিজে যাওয়া শাড়িতে লেপটে থাকা ঊরুর ওপর নরাধম সিপাই আসলাম বন্দুকের বাঁট স্থাপন করে দেহের মনোহর-চিত্তমোহন-স্নিগ্ধ-কোমলতাকে পরখ করছে দেখে শোকাতুর যুবতির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তার পিঠে বর্বর নায়েব ইমরান হাঁটু স্থাপন করল তখন। সঙ্গে সঙ্গেই সে উঠে দাঁড়াল। ভাবান্তর ঘটল তার মধ্যে। মনে হলো স্বামীর স্বদেশপ্রেমের কথাগুলো। বীরবালার দৃষ্টিতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ প্রকাশ পেল। শত গুলিবর্ষণেও এই অগ্নিবিজলি নি®প্রভ হওয়ার কথা নয়। তার অন্তরে একের-পর- এক প্রতিজ্ঞার দানার জন্ম নিল– স্বাধীন দেশে, সমাজতান্ত্রিক পরিবেশে, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজে সধবা হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে বিধবা হয়ে থাকা অনেক শ্রেয়; অবশ্যই তা অনেক স্বস্তিকর। তান্বী অনুভব করল– সে যেন অমিততেজা কালাপাহাড়ের কন্যা, বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়ে সে ধন্যা। তার বাহুতে অত্যাচারবিধ্বংসী অগ্নিশক্তি। যৌবনমদমত্তায় উন্মাদ। যমের টুঁটি চেপে ধরতে ভয় পাচ্ছে না। তার স্বামীর হত্যার কৈফিয়ত তলব করতে সে বদ্ধপরিকর। তান্বীর এই কঠিন মূর্তির সৌন্দর্যশিখা দেখে কর্নেল জাবেদের দানবান্তরে দাবাদাহ শুরু হয়ে গেল। কামাতুর কর্নেল জাবেদের মন তান্বীর টসটসে আঙুল নিজের ওষ্ঠাধরে ধারণ করার জন্য নেশায় মত্ত হয়ে উঠল। তার চোখদুটো তান্বীর জলভেজা ব্লাউজ ভেদ করে, বেরিয়ে আসা চুচুকদুটো চুষে খেতে চাচ্ছে। সে টলতে টলতে অগ্রসর হলো। অগ্রসর হতে লাগল হিংস্র জন্তুর অঙ্গভঙ্গিতে, কামোদ্দীপক প্রলাপ বকতে বকতে, বাহু প্রসারিত করে। তান্বী এসব লক্ষ করে, তার স্বামীর স্মৃতিমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে এবং হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্পে সশস্ত্র মস্তানের মোকাবিলায় হাতে শক্তিসঞ্চয় করল। কর্নেল জাবেদের মাথা যখন তার উন্নত বক্ষে নত হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই সে তার দক্ষিণহস্তে সর্বশক্তি একত্রিত করে শত্রুর বাঁ-গালে ঠাস করে চড় বসিয়ে দিলো। কর্নেল জাবেদ একেবারে থ হয়ে গেল, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ থামাতে অপারগ শ্রীকৃষ্ণ যেন। বন্দুক উঁচিয়ে নায়েব ইমরান এগিয়ে আসতে চাইলে কর্নেল জাবেদ হাতের ইশারায় বারণ করল। তান্বীর স্বামীর লাশের মতো প্রকৃতিও নীরব হয়ে গেল, সবকিছু স্তব্ধ। কর্নেল জাবেদ নীরবতা ভেঙে, চাপা কণ্ঠে বলল, শীঘ্র গিয়ে নৌকায় ওঠো, সব্বাই। আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। নায়েব ইমরান ও সিপাই আসলাম এগিয়ে চলল। ছড়ি দিয়ে স্বীয় ঊরুতে আঘাত করতে করতে কর্নেল জাবেদ বলল, না, আজ আর নয়। চলো শেরপুর ঘাঁটিতে ফিরে যাই। নদীর পাড়েই দাঁড়িয়ে রইল ভয়ের অতীত তান্বী; তারই পদতলে কুশিয়ারা কলতানে বলে যেতে লাগল– ভয়ের শেষ যেখানে, নির্ভয়ের জন্মই সেখানে।

সাতচল্লিশের দেশভাগের পর ভারতের উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ থেকে দিনাজপুরে এসেছিল উর্দুভাষী আরিফ হাশমীর পরিবার। পরে দিনাজপুর শহর ছেড়ে পরিবারটি ঠাকুরগাঁওয়ে চলে আসে। উনিশশো একাত্তর সালে ওরা ঠাকুরগাঁওয়েই থাকত। হাশমী সাহেবের হার্ডওয়্যারের দোকান ছিল রেলস্টেশনের পাশে বাজারে। ঠাকুরগাঁও শহর ছাড়াও পঞ্চগড়, দেবীগঞ্জ এসব জায়গায় ওর পাইকারি দোকানের মাল চালান যেত। তাই ব্যবসাটা বেশ জমজমাটই ছিল হাশমী সাহেবের। উত্তরপ্রদেশ থেকে এলেও যেহেতু পরিবারটি উর্দুতে কথা বলত, বাঙালিরা তাই ওদেরকে বলত ‘বিহারি’। অবশ্য বাঙালিরা সব উর্দুভাষীকেই ‘বিহারি’ মনে করে থাকে। তা মানুষটা বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, কলকাতা, এমনকি বিহার রাজ্য থেকে বা বহুদূরের সুদূর দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদ থেকে এলেও।

ঠাকুরগাঁও শহরের পেশকারপাড়ার একতলা বাড়িটা হাশমী সাহেব ১৯৪৭ সালে কিনেছিলেন এক হিন্দু উকিলের কাছ থেকে। বেশ সস্তাতেই পেয়েছিলেন। কারণ উকিল ভদ্রলোক বাড়িটা দ্রম্নত বেচে যেটুকু যা অর্থ পাওয়া যায় তা নিয়ে ভারতের জলপাইগুড়িতে চলে যেতে চেয়েছিলেন। হিন্দুদের জন্যে তখন কেবল সম্পত্তি নয়, জীবন বাঁচানোটাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন ঢাকা-রংপুর-সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা করতে শুরু করল, বাঙালিরাও তার বিরুদ্ধে হিংসায় মেতে উঠল। কোনো অবাঙালিকে, বাঙালিদের ভাষায় ‘মাউরা’কে অরক্ষিত ধরতে পারলে, তার রক্ষা পাওয়া তখন কঠিন ছিল।

দিনাজপুর শহর থেকে ভয়াবহ সব খবর পাচ্ছিলেন হাশমী সাহেব। ইপিআর বাহিনী শহরে ঢুকে খাসিয়াপাড়ার অনেক বিহারি পুরুষকে ট্রাকে চাপিয়ে কোথায় যে নিয়ে গেছে তা কেউ জানে না। তবে কাঞ্চন নদীর পারে অনেক লাশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যদিও সে-সময়ে ভয়ে কেউ আর নদীর পারে দেখতে যায়নি এগুলো কাদের লাশ।

ঠাকুরগাঁওয়ের খবরও ভালো নয়। সীমান্ত চৌকিগুলোতে যেসব অবাঙালি ইপিআর সদস্য ছিল তাদের অনেককে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। আবার কাউকে কাউকে বন্দি করে এনে স্টেডিয়াম চত্বরে বেঁধে রাখা হয়েছে। বেশকিছু বেসামরিক উর্দুভাষী নারী-পুরুষকেও ধরে এনে এখানে বেঁধে রাখা হয়েছে। স্টেডিয়ামের ফুটবলের গোলপোস্টের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে এক অবাঙালি নারীকে। দলে দলে বাঙালি এসে এসব বন্দিকে দেখছে, যেন তারা খাঁচায় রাখা কোনো প্রাণী। ঠাকুরগাঁও কলেজের নিরীহ এক বাঙালি অধ্যাপক এ-ব্যাপারে ক্ষীণ প্রতিবাদ জানালে এক ইপিআর সৈনিক মহাক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠেছিল : ‘বেশি কথা বলবেন না। বন্দুক কিন্তু ঘুরে যাবে!’ সৈনিকটির রক্তচক্ষু দেখে ভদ্রলোক চুপ করে গিয়েছিলেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের অনেক উর্দুভাষী পরিবারই বিপদের আঁচ পেয়ে সৈয়দপুরে চলে গিয়েছিল। সৈয়দপুরে রয়েছে বিহারিদের বিশাল কলোনি। তাই সৈয়দপুর উর্দুভাষীদের জন্যে নিরাপদ। সৈয়দপুরে বিহারিরা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সেখান থেকে দলবেঁধে সশস্ত্র বিহারিরা আশপাশের বাঙালি গ্রামগুলোতে আক্রমণ, হত্যা, লুণ্ঠন এসবও করছিল। হাশমী সাহেবও সপরিবারে সৈয়দপুরে চলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দোকানের ব্যবসাপাতি গুটিয়ে ফেলা আর পুরনো কিছু পাওনা টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তিনি বেশি দেরি করে ফেললেন। আর এখন তো দু-তিনদিন ধরে কোনো অবাঙালির পথে বের হওয়াই মহাবিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। বাঙালিরা তাদের দেখলেই মারতে ছুটে আসে। শহরের অধিকাংশ অবাঙালির বাড়িঘর-দোকান আক্রান্ত হয়েছে। অনেক ভয়াবহ কাহিনি এরই মধ্যে শুনে ফেলেছেন হাশমী সাহেব। তিনি জানেন তাদের এ-বাড়িটিও যে-কোনো সময় আক্রান্ত হতে পারে।

এ-পাড়ায় উর্দুভাষী বলতে বর্তমানে একমাত্র হাশমী সাহেবের পরিবারই। তাদের পাড়ার মানুষজনের, যাদের কারো কারো সঙ্গে হাশমী সাহেবের প্রায় বিশ বছরের বেশি সম্পর্ক, তারাও ইদানীং কেমন যেন অন্যরকম আচরণ করছে। আরো সমস্যা হচ্ছে, শহরে খুনোখুনি শুরু হলে পাড়ার পরিচিত প্রায় অধিকাংশ বাঙালি পরিবারই বউ-বাচ্চা নিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে গেছে। কিন্তু হাশমী সাহেবদের তো কোনো গ্রাম নেই। তারপরও দু-একজন বিপদে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। যেমন তাদের পাশের বাড়ির বদিউর রহমান সাহেবের পরিবারটি, যে-বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হাশমী সাহেবের পরিবারের ছেলেমেয়েদের রয়েছে বহুদিনের বন্ধুত্ব। হাশমী সাহেবের বড় মেয়ে ইয়াসমিন বদিউর সাহেবের মেয়ে রোকেয়ার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ে। দুজনে স্কুলেও যায় একসঙ্গে।

ছেলেমেয়েদের ভাগ ভাগ করে ছড়িয়ে দেওয়ার কথাটা হাশমী সাহেবের স্ত্রী রওশন বিবিই প্রথম বললেন। হাশমী সাহেবেরও পরে মনে হলো, এই ভয়ংকর এক সময়ে সেটাই হয়তো শ্রেয় হবে। চারদিকে খুনোখুনির এই চরম দুঃসময়ে সবাই একসঙ্গে মারা পড়ার চেয়ে ছেলেমেয়েদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখলে কেউ কেউ হয়তো প্রাণে বেঁচেও যেতে পারে।

বড় মেয়ে ইয়াসমিনকে তাই পরশু রাতে পাঁচিল টপকে পাশের বাড়ির বদিউর সাহেবের বাসায় রেখে আসা হয়েছে। আশা যে, বদিউর সাহেবের বাড়ির মেয়েদের মাঝে লুকিয়ে থেকে মেয়েটা হয়তো বাঁচতে পারবে। আর গতকাল বেশ গভীর রাতে হাশমী সাহেবের দোকানের পুরনো বাঙালি কর্মচারী সিদ্দিক মিয়া তাদের বাড়ির পেছনের পাঁচিলের কাছে এসে ডাক দিয়েছিল – ‘হাশমী সাহেব! ও হাশমী সাহেব!’ হাশমী সাহেবের বাড়ির পেছনটা কিছুটা জঙ্গলের মতো। তার পেছনে নদী। ফলে লোকজন
এদিকটায় তেমন আসে না। গ্রামে চলে যাওয়ার আগে সিদ্দিক শেষবারের মতো তার দোকানের মালিকের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। তখন সবার সঙ্গে কিছুক্ষণ শলাপরামর্শ করে বড় ছেলে জাভেদকে দিয়ে দেওয়া হলো সিদ্দিকের সঙ্গে। জাভেদকে সিদ্দিক ওর বোনের বাড়ি নীলফামারীর দিকে নিয়ে যাবে। ওদিকটা এখনো কিছুটা নিরাপদ।

এখন শুধু ছোট দুটি ছেলেমেয়ে রইল হাশমী সাহেবদের সঙ্গে। বছর এগারোর মুন্নী ও পাঁচ বছরের আলী নওয়াজ। এদিকে শহর থেকে মাঝে মাঝেই মানুষের চিৎকার ভেসে আসছে। দু-চারটে গুলির আওয়াজও। আর ভেসে আসছে কুকুরের, কেমন জানি, কান্নার মতো ডাক। সন্ধ্যাটা কোনো রকমে কাটল। তারা পুরো বাড়ি অন্ধকার করে বসে আছেন। আজ রাতে সবাই যেন খাওয়ার কথাও ভুলে গেছেন। যে-কোনো আওয়াজেই চমকে চমকে উঠছেন সবাই।

রাত তখন বেশ গভীর হয়ে গেছে। একটু তন্দ্রামতো ভাব এসেছিল হাশমী সাহেবের। এমন সময় মনে হলো কে যেন গেটে খটখট করে আওয়াজ করছে। হাশমী সাহেব ও রওশন বিবি ভয়ে মুখ-চাওয়াচাওয়ি করলেন। আতঙ্কে মনের ভেতরটা শূন্য হয়ে গেলেও, হয়তো নিজেকে ভরসা দিতেই, বউয়ের দিকে তাকিয়ে হাশমী সাহেব বললেন : ‘ডর কা কোই বাত নেহি।’ কথাটা বলে কিছুটা অসংলগ্ন পায়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার খটখট আওয়াজটা যেন এবার আরো একটু বেড়ে উঠল।
অন্ধকারের মধ্যে দরজার পাশে এসে হাশমী সাহেব ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন : ‘কৌন?’
আমি জয়নাল মাস্টার। মুন্নী-নওয়াজদের টিচার।
এ দুঃসময়ে কাউকেই ঠিক বিশ্বাস করা যায় না। হাশমী সাহেব এবার তাই জিজ্ঞেস করলেন :
আপ কো সাথ কোই হ্যায়?
না। আমি একাই।
জয়নাল মাস্টারের মুখে এ-কথা শুনে হাশমী সাহেব ধীরে ধীরে গেটটা খুললেন। দেখলেন সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বছর তিরিশের রোগা চশমাপরা জয়নাল মাস্টার, যিনি মুন্নী আর নওয়াজকে অঙ্ক আর ইংরেজি পড়ান। সময়ের বিপদটা জয়নাল মাস্টারও ভালো বোঝেন বোঝা গেল। সাইকেলটা নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকেই দ্রম্নত গেটটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলেন।

জয়নাল মাস্টারকে দেখে আর তার কথা শুনে একটা ক্ষীণ আশা জেগে উঠল হাশমী সাহেব ও রওশন বিবির মনে। তবে শহরের ও চারপাশের গ্রামগুলোর যে অগ্নিগর্ভ অবস্থা তাতে চারজনের একটা বিহারি পরিবারকে নিরাপদে দূরে কোথাও নিয়ে যাওয়া জয়নাল মাস্টারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে জয়নাল মাস্টার বললেন, তারা চাইলে বাচ্চাদুটোকে সাইকেলে চাপিয়ে জয়নাল মাস্টার ঠাকুরগাঁও শহর থেকে মাইল সাতেক দূরে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। একবার নিজের বাড়িতে পৌঁছতে পারলে নিজের ভাই-বেরাদরদের সহায়তায় বাচ্চাদুটোকে হয়তো বাঁচানো যেতে পারে, বললেন জয়নাল মাস্টার।

কিন্তু রওশন বিবি শিশু নওয়াজকে ছাড়তে চাইলেন না। যা ঘটে ঘটুক, নিজের কোলের ছোট ছেলেটাকে নিজেদের সঙ্গেই রাখতে চাইলেন। জয়নাল মাস্টার বরং মুন্নীকে নিয়ে যাক। মেয়েটা তাতে বেঁচে গেলেও যেতে পারে।

সেভাবেই সব ঠিক হলো। রওশন বিবি কাঁপা-হাতে খুব দ্রম্নত একটা ছোট কাপড়ের পোঁটলা তৈরি করে মুন্নীর হাতে তুলে দিলেন। আর পোশাকের ভেতরে গুঁজে দিলেন কিছু টাকা ও দুটো সোনার গহনা। তবে বাইরের গেট দিয়ে নয়, জয়নাল মাস্টারকে বলা হলো ঘুরে বাড়ির পেছনের অন্ধকার জায়গাটায় আসতে। ছোট মেয়েটি যেন ঠিক বুঝতে পারছিল না কী ঘটছে। বাবা-মা যা বলছে যন্ত্রচালিতের মতো তা করে যাচ্ছিল। পেছনের পাঁচিল টপকে মুন্নীকে জয়নাল মাস্টারের হাতে তুলে দেওয়া হলো। মুন্নী ওর হাতের পোঁটলাটা নিয়ে জয়নাল মাস্টারের সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে উঠে বসল। পাঁচিলের ওপাশ থেকে রওশন বিবি শুধু একবার শুনেছিলেন মুন্নী ডুকরে কেঁদে উঠেছিল – ‘আম্মি !’ তারপর জয়নাল মাস্টারের সাইকেলটা টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দটা ধীরে ধীরে দূরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

মুন্নীরা যখন জয়নাল মাস্টারের গ্রামে পৌঁছল তখন গভীর রাত। ঘন অন্ধকারে নীরব গ্রামটা। দূরে দূরে কিছু শেয়াল ও কুকুরের ডাক ছাড়া এই দুঃসময়ে প্রকৃতিও যেন নিস্তব্ধ। মুন্নীকে ওর স্ত্রী ও বৃদ্ধ মায়ের জিম্মায় রেখে ওই রাতেই জয়নাল মাস্টার চলে গেলেন ওদের গ্রামের ভেতরেই, তবে আরেক পাড়ায়, ওর দূরসম্পর্কের এক ফুফুর বাড়িতে। এ-বাড়ির দুই ছেলে মুশফেক ও কালাম আনসার বাহিনীর সদস্য এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী দিনাজপুরে আক্রমণ শুরু করার পর থেকেই এ- এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার ব্যাপারে এ দুজন খুবই তৎপর। দু-ভাইয়েরই আছে আনসার বাহিনী থেকে পাওয়া থ্রিনটথ্রি রাইফেল। জয়নাল মাস্টারের মুখে সব কথা শুনে দুজনেই কিছুটা চিমত্মামগ্ন হলো। দুই ভাইয়ের মধ্যে বয়স্ক কালাম বলল : ‘মেয়েডারে তো বাঁচায় রাহন লাগব। কিন্তু কথা হচ্ছে গ্রামের মানুষদের বোঝাবা কেমনে? বিহারিদের উপর মাইনষে যে ঘ্যাপা ঘ্যাপে আছে! আজ সকালেও তো এ-গ্রাম থিকা দলবেঁধে কিছু মানুষ শহরে গেছে বিহারি কাটতে।’ কথাটা সত্য। এবং শুধু আজই নয়, তিন-চারদিন ধরেই লোকজন সশস্ত্র হয়ে এ-উদ্দেশে ঠাকুরগাঁও শহরে যাচ্ছে। যদি ওরা টের পায় জ্বলজ্যান্ত একটা বিহারি মেয়ে ওদের গ্রামেই এসে উঠেছে, ওরা কি ছাড়বে! আর মেয়েটা যে ওদের গ্রামে লুকিয়ে আছে এ-কথাটাও তো দু- চারদিনের বেশি লুকিয়ে রাখা যাবে না। পাশাপাশি লাগোয়া ঘরবাড়ি মানুষজনের। এক বাড়ির মেয়েরা যখন-তখন আরেক
বাড়িতে যাতায়াত করে থাকে। মেয়েটাকে কদিন-ই বা লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে? তিনজন মিলে অনেক আলোচনা ও শলাপরামর্শ করে। বলতে গেলে প্রায় সারারাত ধরে। তারপর তারা ঠিক করে গ্রামবাসীকে মেয়েটার কথা জানাবে ওরা।

পরদিন দুপুরে জয়নাল মাস্টারের বাড়ির উঠোন লোকে লোকারণ্য। ওদের গ্রাম ছাড়াও আশেপাশের দু-চারটা গ্রাম থেকেও চলে এসেছে বেশ কিছু উৎসাহী মানুষ। গ্রামের বউ-ঝিরাও সব আগ্রহ নিয়ে এসেছে ওদের গ্রামে আসা বিহারি মেয়েটাকে দেখতে। নারীরা মূলত বারান্দায় বসা বা খুঁটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো। পুরুষরা উঠোনে। চারদিকে গিজগিজ করছে লোকজন। মুন্নীকে দেখা যায় বাড়ির ভেতরের দিকে একটা আধো অন্ধকার ঘরে ওর পুঁটলিটা নিয়ে চুপচাপ একলা বসে রয়েছে। ওকে নিয়ে গ্রামবাসীর যে এত উত্তেজনা, এত কৌতূহল, এত কথাবার্তা, এসব কিছুই যেন ওকে তেমন স্পর্শ করছে না। কেমন ভাবলেশহীন মুখে চেয়ে রয়েছে মেয়েটি। জয়নাল মাস্টারের বউ সকালে মেয়েটাকে কিছু খাবার দিয়েছিল। খেয়েও ছিল। কিন্তু দুপুর থেকে বারবার সাধাসাধি করলেও মেয়েটা আর কিছুই খায়নি। ওভাবেই তাকিয়ে চুপচাপ বসে রয়েছে। কারো সঙ্গে কোনো কথা বলছে না।

এদিকে বাইরে মিটিং ক্রমশ উত্তেজনায় ভরে উঠছে। বাক্যবাণও হয়ে উঠছে উত্তপ্ত। সবাই জানাচ্ছে কীভাবে বিভিন্ন জায়গায় বিহারিরা বাঙালিদের পৈশাচিকভাবে মেরেছে। এখনো মারছে। কেউ বলল, একটা বিহারির বাচ্চা মানে একটা সাপের বাচ্চা। ওকে বাঁচিয়ে রাখা খুবই বিপজ্জনক। ঘটনাটি আরো উত্তপ্ত হলো কারণ সৈয়দপুরের রেলওয়ে কারখানায় কাজ করে ওদের গ্রামের এমন দুজন আজ দুপুরেই সৈয়দপুর থেকে পালিয়ে গ্রামে এসেছে। তারা জানাল কীভাবে সৈয়দপুর রেল জংশনে বাঙালি পেলেই কেটে ফেলা হচ্ছে। মিটিংয়ে উত্তেজনা ক্রমশ চড়ছে। সবাই-ই কথা বলতে চায়। অনেকেই এ-ব্যাপারে খুব তীব্রভাবে জয়নাল মাস্টারকে দোষারোপ করে চলল। কোন বুদ্ধিতে সে ওই বাচ্চা বিহারি মেয়েটিকে ওদের গ্রামে নিয়ে এসেছে! ও কী দেশের স্বাধীনতা চায় না? জয়নাল মাস্টার ‘বিহারিদের দালাল’ হয়ে গেছে, এ-কথাও বলল উত্তেজিত জনতার কেউ কেউ। কিন্তু কেন জানি না জয়নাল মাস্টার, কালাম ও মুশফেক সভায় তেমন কথা বলল না। অনেক বাকবিতন্ডার পর ঠিক হলো বিহারি মেয়েটাকে মেরে ফেলা হবে। কালাম সভায় দাঁড়িয়ে বলল যে, কাজটা তারা দু-ভাই করবে। কথাটা সবার বেশ যুক্তিসংগত মনে হলো, কারণ গ্রামের মধ্যে এ দুজনেরই কেবল রাইফেল আছে। তবে কালাম বলল, কাজটা করা হবে দিনের বেলায় নয়, গভীর রাতে এবং সেটা করা হবে কাঞ্চন নদীর চরে। গ্রামের তিন-চারজনকে পাঠানো হলো নদীর পারে ছোট একটা কবর খুঁড়ে রাখার জন্যে।

মুন্নীর মৃত্যুদ- ঘোষিত হওয়ার পর প্রথমে দলে দলে গ্রামের বউ-ঝি ও পরে পুরুষের দলও এক নতুন বিস্ময়ে এই বিহারি বালিকাটিকে দেখতে থাকল। যেন জীবনে এই প্রথম তারা কোনো বিহারি মানুষকে দেখছে! তবে এটাও ঠিক যে, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত কোনো মানুষকে তো তারা এর আগে কখনো দেখেনি। বিশেষ করে সে যদি হয়ে থাকে ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে নিশ্চুপ বসে থাকা বছর এগারোর কোনো বালিকা।

বেশ গভীর রাতে রাইফেল হাতে মুশফেক ও কালাম মুন্নীকে নিতে এলো। ওদের মুখচোখ গম্ভীর। মুন্নী ওদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য নীরবে দাঁড়িয়ে পড়ল। আজ বিকেলের সভায় কী আলোচনা হয়েছে, কী ঘটেছে, সেটা হয়তো ওর অজানা থাকার কথা নয়। তবে মুন্নী চুপচাপই ছিল। কেবল বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় জয়নালের বউকে একবার শুধু জিজ্ঞেস করল : ‘মামি, মুঝে কাহা লে যা রাহা হ্যায়?’ জয়নাল মাস্টারের বউ শুষ্ককণ্ঠে শুধু বলতে পারলেন : ‘তোমার মামাগো লগে যাও।’ ওরা বেরিয়ে গেলে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে জয়নালের বউ রুদ্ধকণ্ঠে কেঁদে উঠলেন। আশপাশের অনেকের চোখেই জল এসে পড়ল। বিশেষ করে বাড়ির বউ-ঝিদের।

সামনে দুপাশে রাইফেল হাতে মুশফেক ও কালাম। মাঝে মুন্নী। ওর হাতে ওর কাপড়ের পুঁটলিটা ধরা। পেছনে বেশ বড় এক কৌতূহলী জনতা। তবে তারা সবাই এখন কেন জানি বেশ চুপচাপ। এমনকি বিকেলের সভায় যে-মানুষরা খুবই উচ্চকিত ছিল, মেয়েটিকে মৃত্যুদ- দেওয়ার ব্যাপারে ছিল সবচেয়ে সোচ্চার, তারাও কেমন যেন নীরব হয়ে গেছে। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে তারা যেন মেয়েটির পেছন পেছন হাঁটছে।

গ্রামের শেষ প্রামেত্ম এসে মুশফেক ও কালাম ঘুরে দাঁড়াল। সমবেত জনতার উদ্দেশে মুশফেক বলল, কাজটা তারা দুজনেই করতে পারবে। তাদের সঙ্গে কারো আসার দরকার নেই। সবাই যেন গ্রামে ফিরে যায়। কথাটার যুক্তির দিকটা সবাই বুঝতে পারছিল। তাছাড়া মুশফেক ও কালাম আজ বিকেল থেকে যেরকম গম্ভীর হয়ে রয়েছে, তাতে ওদের কথার প্রতিবাদ করার তাগিদও কেউ তেমন বোধ করল না। আর রাইফেল হাতে ধরা মানুষদের কেই-বা সহজে ঘাঁটাতে চায়!

মুন্নীকে নিয়ে শুধু মুশফেক ও কালাম কাঞ্চন নদীর চরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। ধীরে ধীরে তিনজনের ছায়ামূর্তি দূর- অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। গ্রামের মানুষজনও আসেত্ম আসেত্ম সব গ্রামে ফিরে গেল। পরে ওরা রাইফেলের গুলির দুটো শব্দ শুনতে পেয়েছিল। মুন্নীর আর্তনাদ কী ওরা শুনতে পেয়েছিল? কেউ কেউ বলল, তারা শুনতে পায়নি। কেউ কেউ বলল, তারা শুনেছে। তবে সে-শব্দটা নদীর দিক থেকে ভেসে আসা বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দও হতে পারে। পরদিন ভোরে উৎসাহী কিছু মানুষ গিয়ে দেখে এলো কাঞ্চন নদীর চড়ায় সদ্য খোঁড়া কবরটার ওপর নতুন কিছু মাটি দিয়ে লেপা।

জয়নাল মাস্টার বৃথাই রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেননি, বৃথাই এতদিন শিক্ষকতা করেননি। গতকাল সন্ধ্যাবেলাতেই তিনি ওর ছোটভাইকে দিয়ে জরুরি এক চিঠি পাঠিয়েছিলেন নদীর ওপারের গ্রামে ওর কলেজজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নুরুর রহমান নুরুর কাছে, যে-নুরু ছিল স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর কমান্ডার। আজ এত বছর পরে কেউ যদি নুরু কমান্ডারের গ্রামে যান, দেখবেন ফর্সা রঙের প্রৌঢ়া এক মহিলা সাংসারিক নানা কাজের ব্যস্ততার মধ্যেই মাঝে মাঝে দূরে কাঞ্চন নদীর দিকে তাকিয়ে কেমন জানি বিষণ্ণ হয়ে যান। নারীটি হচ্ছেন নুরু কমান্ডারের ছোটভাই স্কুলশিক্ষক আহাদ মাস্টারের বউ, যিনি এখন তিন সমত্মানের জননী ও একটা পরিপূর্ণ সংসারের ব্যস্ত এক গৃহিণী। নদীর দিকে তাকিয়ে মহিলাটি হয়তো ভাবেন, ভাগ্যিস সে-রাতে ওর বাবা-মা ওকে জয়নাল মাস্টারের হাতে তুলে দিয়েছিল। কারণ, হাশমী পরিবারের কেউই আর বাঁচেননি।

বনপোড়া হরিণের কি পুব-পশ্চিম বা উত্তর-দক্ষিণ জ্ঞান থাকে! আত্মরক্ষার জন্যে সে কেবলই দৌড়োয়, ডান থেকে বামে, আবার বাম থেকে ডানে। বাঁচাটাই মুখ্য। বাঁচার জন্যেই দৌড়নো। জোড়পুকুরের গণহত্যার শিকার সেদিনের তাড়া খাওয়া অসহায় মানুষগুলো চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে, বাগান-পুকুর জমিজিরেত সবকিছু পেছনে ফেলে ছুটে চলেছিল পশ্চিমে। হ্যাঁ, পশ্চিমেই প্রাণের নিরাপত্তা। হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে গত দেড় মাস ধরে কত মানুষ যে খালবিল নদীনালা তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে পশ্চিমে গেল, দূর দূরান্তের সেই সব বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিসংখ্যান কে রাখে! তবে তাদের গন্তব্য ঠিক পশ্চিমে। কী আছে পশ্চিমে! পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বাঙালির বাস। তারাও মাকে মা বলে, বাবাকে বাবা। একই মাটি মাঠের সবুজ, বনবনানী পশুপাখি, একই রকম জীবনধারা। তবু পৃথক দুই রাষ্ট্রের বাসিন্দা দুই রকমের পরিচয়। তবু মরা নদীর ধারার মতো শুষ্কপ্রায় সম্পর্কও আছে দু’পারের মধ্যে। সবার না থাকুক, সীমান্তঘেঁষা এ অঞ্চলের সব গ্রামেরই কারো না কারো আত্মীয় স্বজনও আছে পশ্চিমবঙ্গে। যুদ্ধের উত্তাপ এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সেই তাড়া খাওয়া দুঃসময়ে আত্মীয় অনাত্মীয়ের ভেদরেখা সহজেই আড়াল হয়ে যায়। আত্মীয়ের ভরসায় নয়, স্রেফ প্রাণের তাগিদে বহু দূর দূরান্তের এই সব ভিটেমাটিহারা মানুষেরা প্রতিদিনই দুর্গম কাদাপাঁকের পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে চলেছে পশ্চিমে।

পশ্চিমে কোথায়, কোন গ্রামে? না তারও কোনো ঠিক ঠিকানা জানা নেই। সীমান্তবর্তী গাংনী থানার একেবারে পশ্চিমের যে কোনো গ্রামের মধ্য দিয়ে অনায়াসে পৌঁছুনো যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, শুধু এইটুকু তথ্য জানে পিঁপড়ের সারির মতো চলমান দেশত্যাগী মানুষেরা। সামান্য এই জানাটুকুর উপরে ভরসা করে অজানা- অচেনা গন্তব্যে পা বাড়িয়েছে শত শত নারী পুরুষ। অক্ষম বৃদ্ধ, অসহায় শিশু, গর্ভবতী মা — কারো ক্ষমা নেই ;যতক্ষণ পারো নিরুদ্দিষ্ট এই মানবমিছিলে চলতে থাকো, পিছিয়ে পড়লেই হারিয়ে যাওয়া। পেছনে তাকাবার সময় কারো নেই।

এ এক বিচিত্র মানবপ্রবাহ। খুব যে সুসংগঠিত এবং সুসংবদ্ধ, তাও বলা যাবে না। হিন্দুপ্রধান এলাকার বিভিন্ন গ্রামের গুচ্ছ গুচ্ছ মানুষ। পাকিস্তানি আর্মি এবং তাদের এ দেশীয় দোসরেরা আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে সারা গ্রামে, পলায়নপর মানুষকে সামনে পেলেই হত্যা করেছে নির্বিচারে, লুট করেছে সোনাদানা সহায় সম্পদ ; তারপরও মানুষ বাঁচতে চায়, শুধু প্রাণ নিয়ে বাঁচতে চায়। জন্মভিটে ছেড়ে মানুষ বাঁচে কী করে সে বিদ্যে কারো জানা ছিল না। সদ্যমৃত বাবার মরদেহ ফেলে রেখে, হায়েনার হাতে সম্ভ্রমহারা বোনকে ছেড়ে, সংজ্ঞাহারা বৃদ্ধা মাকে ঝুড়িতে বসিয়ে গ্রাম-গ্রামান্তরে টেনে টেনে পাড়ি দিয়ে হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে এ কোন বাঁচা, কে জানে!

মৃত্যুর চোখ রাঙানিকে পিছে ফেলে মানুষ তবু ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটে চলে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে। পথে পথে কত দুর্বিপাক, কত না বিড়ম্বনা, তবু বেঁচে থাকার কী যে এক দুর্নিবার মোহ!

সারাদিন হেঁটে হেঁটে পায়ের পাতা ফুলে ঢোল, ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ক্লান্তিতে সারা শরীর অবসন্ন, তবু যেতে হবে পশ্চিমে । দিনের শেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে অন্ধকার দৈত্য এসে পথ আগলে দাঁড়ায়। তখন কী করে ঘরছাড়া মানুষের দল! পথের পাশে কোনো খড়ের চালা অথবা কারো খোলা বৈঠকখানায় রাত্রিযাপনের জন্যে মাথা গোঁজে। কেউবা আরও কয়েক পা এগিয়ে প্রাইমারি স্কুলে আশ্রয় নেয়। কোথাও দু’হাত জায়গা খালি নেই, মানুষে মানুষে ঠাসাঠাসি, গাদাগাদি। আলমডাঙার গোবিন্দপুর থেকে আসা দলটি আগেভাগে স্কুলঘরের দখল নিয়েছে। ফলে পরে আসা লোকজনের পক্ষে স্থান সংকুলান কঠিন হয়ে ওঠে। কিন্তু ফরিদপুরের পাংশা থেকে আসা দলের সদস্য মধ্যবয়সী এক গর্ভবতী নারী আর কিছুতেই ভার বইতে পারছে না। কখন কী ঘটে যায়, বলা মুশকিল। তার জন্যে স্কুলঘরের এক বারান্দায় কাপড় টানিয়ে তাৎক্ষণিক এক আঁতুড়ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। সেই ঘেরা স্থানে প্রসূতি ঢোকার পরপরই নবজাতকের ট্যাঁ ধ্বনি শোনা যায়। বাইরে তখন বারোয়ারি খিঁচুড়ি বিতরণ শুরু হয়েছে। এ গ্রামেরই কতিপয়
স্বেচ্ছাসেবক সপ্তাহ খানেক থেকে এ উদ্যোগ নিয়েছে। তার পেছনেও বিশেষ এক কারণ আছে। দুঃসময়ে মানুষের পাশে মানুষই দাঁড়ায়, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় ; আবার এই দুঃসময়কে পুঁজি করে দুর্গত মানুষের সর্বনাশ করার মতো অমানুষেরও তো অভাব নেই। দূরাঞ্চলের অসংখ্য মানুষ প্রায় প্রতিদিনই মাথায় টিনের সুটকেস,
কাপড়ের পোটলা, শেষ সম্বল সোনাদানা হাতের মুঠোয় নিয়ে এ গ্রাম্য কাদাপাঁকের রাস্তা ধরে পশ্চিমে যাচ্ছে, পথিমধ্যে কোথাও রাত্রি যাপন করে ভোরের আলো ফোটার আগেই আবারও রওনা হচ্ছে দুরু দুরু বুকে; কোনো রকমে বর্ডার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেই তারা বাঁচে। কিন্তু বাঁচা ব্যাপারটা কি এতই সহজ! গ্রাম্য কিছু দুর্বৃত্ত এসে পথ আগলে দাঁড়ায়, কেড়ে নেয় দেশত্যাগী অসহায় মানুষের সর্বস্ব। আর্মি ক্যাম্পে খবর দেবে বলে তারা ভয় দেখায়। এভাবে পরপর কয়েক দফা লুটপাটের ঘটনা ঘটলে ষোলোদাগের বেশকিছু সাহসী মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে, রাতের আশ্রিত ক্ষুধার্ত মানুষের জন্যে খিচুড়ির ব্যবস্থাও করে দেয়। এরই মধ্যে নবজাতকের আগমন নতুন মাত্রা যোগ করে। কয়েকজন আমুদে স্বেচ্ছাসেবক শামু ময়রার ঘুম ভাঙিয়ে গুড়ের তৈরি মিঠাই এনে মিষ্টিমুখেরও আয়োজন করে বসে। নবজাতকের নাম রাখা হয় জয়া। ক্ষুদ্র মানবপিন্ড জয়া সে রাতে আশ্রয়কেন্দ্রের ক্লান্ত শ্রান্ত উৎকণ্ঠিত মানুষ গুলোর মধ্যে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। নানা জায়গা থেকে প্রাণভয়ে ছুটে আসা এতগুলো অচেনা মানুষ জয়াকে ঘিরেই পরস্পরের আত্মীয় হয়ে ওঠে সহসা।
সেদিন সন্ধ্যা থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি।
আকাশ নুয়ে আছে মাথার উপরে। জয়াকে নিয়ে প্রাথমিক উচ্ছ্বাস স্তিমিত হয়ে এলে স্বেচ্ছাসেবকদের অনেকে বাড়ি ফেরার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ততক্ষণে বৃষ্টির ধারা ঘন হয়ে এসেছে। এরই মাঝে আঁতুড়- ঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে এক মহিলা ঘোষণা করে — প্রসূতির অবস্থা সুবিধার নয়, রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। সর্বনাশ! এই বৃষ্টিভেজা রাতে কী উপায় হবে!

ডাক্তার বলতে সারা গ্রামে আছে এক হোমিওপ্যাথ সাইফুল হাজী। এত রাতে বাদলা মাথায় সেই হাজী সাহেব কি স্কুল পর্যন্ত আসবেন! রাশভারি প্রকৃতির মানুষ, তাকে ডাকতেই বা কে যাবে! কেউ কেউ মন্তব্য করে — হোমিও ডাক্তার দিয়ে কী কাজ হবে! এ সব ক্ষেত্রে আম্বিয়ার মায়ের হাতযশ অনেক। তাকে দেখাতে পারলে ভালো
হয়। তা বটে। পুরানো দাই হিসেবে এ তল্লাটে ঢের ডাক-নাম আছে তার। অন্তত শতাধিক বাচ্চা জন্ম নিয়েছে তার হাতে। তার অভিজ্ঞতার বিষয়ে কারো কোনো সংশয় নেই। তবু প্রশ্ন ওঠে, এই বেসামাল রক্তপাত কি সে রুখতে পারবে? শেষ পর্যন্ত স্কুলপাড়ার রুস্তম শেখের গরুগাড়িতে ছই লাগিয়ে নবজাতক এবং প্রসূতিকে পাঠানো হয়
আম্বিয়ার মায়ের কাছে। সঙ্গে যাবে কে? জয়ার বাপ আরও মাসখানেক আগেই ভারতে গেছে মুক্তিযোদ্ধা হবার জন্যে। দুই পুত্রসহ গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে গেছে বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ির কাছে। এখন শেকড়বাকড় সব উপড়ে সবাই চলেছে নিরুদ্দেশের পথে। মেয়ের ঘরের নাতিনাতনি শুধু নয়, সঙ্গে আছে দুই ছেলে, দুই বৌমা এবং তাদের গন্ডাখানেক বাচ্চাকাচ্চা।এ সব ফেলে কে যাবে জয়ার মায়ের সঙ্গে!

দুই.

কুষ্টিয়া-মেহেরপুর প্রধান সড়কে পাকিস্তানি আর্মির চলাচল বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে মাত্র তিনদিন আগে মুক্তিবাহিনীর একটা গ্রুপ এসে জোড়পুকুরের পাশের গ্রাম তেরাইলের কাঠের পুল উড়িয়ে দিয়ে যায়। তার জন্যে খেসারত দিতে হয় তেরাইলের সাধারণ মানুষকে। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেবার সন্দেহে বামুন্দি ক্যাম্পের আর্মি
এসে সারা গ্রামে তান্ডব চালায়, রাস্তার দু’পাশের বাড়িঘরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করে, বেশ কজন গৃহবধূকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে ; তারপর বিপর্যস্ত কাঠের পুল মেরামতে হাত দেয়। এ ঘটনার পর তেরাইল এবং জোড়পুকুরের অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে ভারতে পাড়ি দিতে শুরু করে। দূর- দূরান্তের দেশত্যাগী মানুষের মিছিলে স্থানীয় মানুষজনও যুক্ত হয়। তারা একেবারে রাতের শেষ প্রহরে, ভোরের আজানের পরপরই জোড়পুকুরে প্রধান সড়কের পাশে খাদের মধ্যে জড়ো হয়, পাকারাস্তা ফাঁকা পেলেই দলে দলে রাস্তা পেরিয়ে চলে যায় গ্রম্যপথ ধরে ভোমরদহ- ভরাট- দুর্লভপুর, মাত্র মাইল চার-পাঁচেক পেরোলেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। মানুষ তাই ছুটে চলে পশ্চিমে। পশ্চিমেই খুঁজে ফেরে বাঁচার ঠিকানা। সেদিন সারারাত টিপটিপ বৃষ্টি ঝরিয়ে ভোরের আকাশ আঁচল গুটিয়ে নিলে দিগন্তে উঁকি দেয় বেশকিছু রাতজাগা তারা। ভোরের আলো ফোটার আগেই ষোলোদাগ প্রাইমারি স্কুলে গাদাগাদি করে থাকা আশ্রিতজনেরা পোটলাপুটলি গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ে ত্রস্তপায়ে। যাবে তারা পশ্চিমে। হাতে সময় নেই। আরও মাইলখানেক হেঁটে জোড়পুকুরে গিয়ে পাকারাস্তা পেরোলে তবেই স্বস্তি। সারা গ্রামের এ-বাড়ি ও-বাড়ির বৈঠকে দহলিজে রাত কাটানো লোকজনেরাও পথে এসে যুক্ত হয় মানবপ্রবাহে। তাদের মধ্যেই কে একজন ঘোষণা করে — জয়ার মা যাবে না এই দলে। অপ্রতিরোধ্য রক্ত ক্ষরণে সে মারা গেছে ভোরের পোয়াতি তারা ফোটার আগেই। আম্বিয়ার মা চেষ্টা কম কিছু করেনি। তার জ্ঞান-বুদ্ধি- অভিজ্ঞতা সব ব্যর্থ করে দিয়ে যে যাবার সে চলে গেছে। আর সদ্যোজাত জয়া? তার কী হলো?

না, সেই হুলুস্থুল দুঃসময়ে জয়ার সঠিক সংবাদ কেউ জানাতে পারে না। কেউ বলে বেঁচে আছে, কেউ বলে মায়ের রক্তস্রোতে সেই অবাগীও ভেসে গেছে। তখন সবাই সামনে যেতে চায়। এক পাড়া পিছিয়ে এসে আম্বিয়ার মায়ের কাছে খোঁজ নেবার অবকাশ কারো নেই। ভোরের আলো ফুটে যাবে, চলো, পা মেলাও, সামনে বাড়ো। হঠাৎ জয়ার নানি বুক চাপড়ে কেঁদে ওঠে, তারপরই কাফেলার ছন্দপতন ঘটে, মুখে দাঁতি লেগে বেহুঁশ হয়ে যায় বৃদ্ধা। প্রভাতবেলায় এ কোন গেরো! তার পেটের ছেলেরাও মহাবিরক্ত — এটা কি জ্ঞান হারাবার সময় হলো! শেষে কি মাকেও ফেলে যেতে হবে স্কুলমাঠের এই বিরান প্রান্তরে! ছোটছেলে রতন আঁজলা ভরে পানি এনে চোখে মুখে ঝাপটা দিতেই জ্ঞান ফিরে আসে বৃদ্ধার। তখন তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে পা বাড়ায় জোড়পুকুরের পথে। তেরাইলের কাঠের পুল পুননির্মাণের পর মেহেরপুর থেকে বামুন্দি হয়ে কুষ্টিয়া- যশোর পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর সড়ক যোগাযোগ নির্বিঘ্ন হয়ে যায়। ফলে খাদ্য রসদ অস্ত্র গোলাবারুদ সরবরাহ নিশ্চিত এবং নিরাপদ হয়। কিন্তু একেবারে নিশ্চিত হতে পারে না— বাঙালি বিচ্ছু বলে কথা! তেরাইল ব্রিজের দু’পারে তাৎক্ষণিকভাবে পাহারা-চৌকি বসানো হয়েছে রাজাকার এবং মিলিশিয়া দিয়ে। তারা ব্রিজের এপারে ওপারে পালা করে টহল দেয়। কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে বেশ লেফট রাইট করে, মুসলিমলীগ নেতা গণি বিশ্বাস বুকে থাবা দিয়ে সাহস যোগায়, তবু তারা রাত গভীর হলে ওই কাঠের ব্রিজে উঠতে চায় না, পা কাঁপে। মধ্যরাতে গেরিলা যোদ্ধারা যদি আবার ব্রিজ উড়িয়ে দিতে আসে! বলা তো যায় না! নিজেদের ভয় ঢাকতে তারা বামুন্দি ক্যাম্পের পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে দুদিন পরেই খবর দেয় — ভোররাতের দিকে দুষ্কৃতিকারীদের আনাগোনা টের পেয়েছে। ইন্ডিয়া থেকে সশস্ত্র অবস্থায় এসে জোড়পুকুরে পাকা রাস্তা পার হয়ে মেঠোপথ ধরে ছড়িয়ে পড়ে আলমডাঙা, হালসা, পোড়াদহ এবং সারা দেশে। ব্যাস, জায়গামতো একটুখানি টোকা দিতেই আঁচলাগা এঁড়ে গরুর মতো লাফিয়ে ওঠে পাকিস্তানি সৈন্যরা। গ্রামে গ্রামে হানা দিয়ে মুক্তিফৌজ ধরার চেয়ে জোড়পুকুরে একত্রে ওদের গুছিয়ে পাওয়া যাবে, এ তো বড়ই ভালো খবর। রাজাকাররা অতি উৎসাহে আরেক কাঠি এগিয়ে যায়, জোড়পুকুরের ওই পথ ধরে বিভিন্ন জায়গার শরণার্থীরাও ভারতে পাড়ি দেয় — সে কথাও সগৌরবে জানিয়ে আসে।

সেদিন প্রভাতবেলা নতুন দিনের সূর্য এসে বৃষ্টিধোয়া আকাশের গায়ে রক্তিম আবীর মাখিয়ে দেবার আগেই রক্তের হোলিখেলা শুরু হয়ে যায় জোড়পুকুরে। প্রধান সড়কের দু’পাশের গর্তে খানাখন্দে দেশত্যাগে উদ্যত নরনারীর রক্ত জমে ওঠে। আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জন ছাপিয়ে মুমূর্ষু মানুষের আহাজারি আর শেষ আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাকুল শিকার যখন হাতের কাছে প্রস্তুত, শিকারী বিলম্ব করবে কেন? বামন্দি ক্যাম্প থেকে গাড়ি ভর্তি হয়ে যমদূতেরা জোড়পুকুরের নির্দিষ্ট অবস্থানের দিকে বেপরোয়া গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে আসে, তারপর ব্রাশফায়ার। প্রথম দ্বিতীয় এবং তৃতীয় গ্রুপের জনা তিরিশেক মানুষ প্রধান সড়ক পেরিয়ে ঢালুতে নামতে না নামতেই শুরু হয় বিরামহীন গুলি বর্ষণ। জল্লাদেরা কোথাও প্রাণের স্পন্দন অবশিষ্ট রাখতে চায়নি। সত্যিকারের কথায় সেদিনের এ গণহত্যায় ঠিক কতজন শহিদ হয়, সে হিসেব আদৌ কোনোদিন করা হয়ে ওঠেনি, হয়তো আর হবেও না কখনো। তবে এই বাংলার মাঠঘাট সবুজ প্রান্তর খুব জানে, ভালোই জানে– তারা সবাই বাঁচতে চেয়েছিল।

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের পরের আশ্চর্যটি হচ্ছে এই যে এমন ভয়াবহ মৃত্যু প্রবাহ কিন্তু সে রাতে ভূমিষ্ঠ জয়াকে গ্রাস করতে পারেনি। অভিজ্ঞ ধাত্রী আম্বিয়ার মা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দিয়েও যখন রক্তক্ষরণের রুগি বাঁচাতে পারেনি, তখন সদ্যোজাত শিশুটির কচি কোমল কণ্ঠের চিৎকারধ্বনি তাকে আকুল করে তোলে। জয়ার মায়ের সিঁদুর রাঙা মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে রেখে তখন সে জয়াকেই পরমমমতায় কোলে তুলে নেয়। ওইটুকু শিশু কী ভেবে কান্না থামিয়ে তার রক্তাভ চোখের পাতা পিটপিট করে ওঠে। বৃষ্টি ধোয়া আকাশের এক কোনে তখন দ্বিতীয়া কিংবা তৃতীয়ার স্বল্পায়ু চাঁদ ম্লান ঠোঁটে দিব্যি হেসে ওঠে অম্লান।

ছোট্ট শহরকে দু’ফাঁক করে বয়ে যাওয়া নারদ নদীর লিয়াকত ব্রিজের নিচে হ্যাপি, আতা এবং অবিনাশকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে মেরে ফেলার পরে লাশ তিনটিকে নারদেরই পাঁকে পুঁতে ফেলে চলে যাওয়ার আগে সেই কবরের ওপর ছর ছর শব্দে পেচ্ছাপ করে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন জমসেদ। ঘটনা একাত্তরের মার্চ মাসের ত্রিশ তারিখের। সম্পূর্ণ হত্যাকা-, ক্যাপ্টেনের পেচ্ছাপ করাসহ, ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে বসে দেখে পোস্ট অফিসের মোসলেম পিয়ন। সারা শরীরে ভীতিজনিত কম্পণ এবং গলার কাছে উঠে আসা হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি নিয়ে পাকবাহিনী চলে যাওয়ার পরেও অনেকক্ষণ বসে থাকে মোসলেম সেই ঝোপের ভেতরেই। অনেকটা সময় কেটে
যাওয়ার পরে যখন তার মনে হয় যে পাকবাহিনীর আর এই পথে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই, একমাত্র তখনই সে ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারে। এখন তার একমাত্র চিন্তা, বাড়িতে ফিরে পরিজনদের মুখ দেখা। কিন্তু বাড়ির দিকে ত্রস্ত পা বাড়াতে গিয়েও সে কী মনে করে থমকে দাঁড়ায়। একে তো এই ছোট্ট শহরের প্রায় সকল প্রাপ্তবয়ষ্ক একে অপরকে চেনে, তদুপরি মোসলেম নিজে পিয়ন হওয়ার সুবাদে নামে নামে চিঠি পৌঁছে দেবার কারণে সবার সঙ্গেই তার নিদেনপক্ষে বাক্যালাপের সম্পর্ক তো অবশ্যই রয়েছে। আজ, হঠাৎ-ই সবগুলি সম্পর্ক তার কাছে বড় নিকটের বলে মনে হতে থাকে। সে বাড়ি যাওয়া কিছুক্ষণের জন্য স্থগিত রেখে পায়ে পায়ে নেমে আসে সদ্য তৈরি হওয়া গণকবরটির কাছে। পাঞ্জাবি শুয়োরটার পেচ্ছাপের দুর্গন্ধ তখনো পাওয়া যাচ্ছে একটু একটু। মোসলেম বড় দেখে একটা কচুর পাতা ছিঁড়ে আনে। তাতে করে নদীর পানি বারকয়েক এনে ঢেলে দেয় কবরটার ওপর। দুর্গন্ধ পুরোটা যায় না। কিন্তু আর কিছু করার মতো অবস্থায় এখন মোসলেম নেই। যদি সুযোগ পায়, তবে একসময় সে লোবান এনে জ্বালিয়ে দেবে এই কবরে। পীরের কবরে মানত করার মতো করে নিজেকে বলে সে। আপাতত দোয়া পড়ে– ‘ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হে রাজেউন!’ তারপরে মনে আসে যে মৃতদের মধ্যে একজন তো হিন্দুও আছে। মোসলেম ছোটবেলায় আর সব মুসলমান ছেলেদের মতো মক্তবে পড়ার সময় শিখেছিল যে বিধর্মী কারো মৃত্যুর খবর শুনলে বলতে হয়Ñ ‘ফি নারে জাহান্নামা খালেদিনা ফিহা’। তার তাহলে সেই দোয়াটাও পাঠ করা উচিত। কিন্তু এই ওলোট-পালোট সময়ে তার মাথার মধ্যেও কিছুটা ওলোট-পালোট ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে। হিন্দু-মুসলমানের অনেক শোনা তারতম্যের হিসাব এখন আর তার মাথায় বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট আছে বলে আর মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে এই দোয়াটির মধ্যে বিধর্মীদের সম্পর্কে খারাপ কিছু বোধহয় বলা হয়েছে। বস্তুত এই মূহুর্তে তার কাছে মৃত অবিনাশকে মোটেই বিধর্মী বলে মনে হচ্ছে না।

আতঙ্ক এখন অনেকটা কমে এসেছে। ভয়ের তীব্রতায় শরীরের ভেতরের কল-কব্জাগুলি এতক্ষণ থমকে গিয়েছিল। এখন ধীরে ধীরে নিজের অনুভূতি ফিরে পাচ্ছে সেগুলি। যেমন, এই এতক্ষণ পরে বুক ফেটে কান্না উঠে আসতে চাইছে তার। সে কাঁদছেও। কিন্তু চিৎকার করে কেঁদে শত্রু-মিত্র কারো দৃষ্টিই যে এখন আকর্ষণ করা চলবে না, সেটুকু হুঁশ তার ইতোমধ্যে ফিরে এসেছে। সে তাই নিঃশব্দে কাঁদে। গণকবর থেকে মাত্র হাতদশেক দূরে দাঁড়িয়ে থেকেও সে নিজেকে রক্ষা করার কথাটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে পারে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়। বউ-বাচ্চা নিয়ে আজই তাকে শহর ছাড়তে হবে। সম্ভব হলে এক্ষুনি। সরকারের চাকরি করে সে। চাকরির কথা ভুলে যেতে হবে এই মুহূর্তে। জীবন বাঁচলে তবে না চাকরি। সে বাড়ির দিকে পা বাড়াতে গিয়েও আর একবারের জন্য ফিরে আসে। একটা জিগার ডাল ভেঙে নিয়ে ফের নারদের পাঁকে নামে। যেখানে পুঁতে রাখা হয়েছে তিনটি মৃতদেহ, তার পাশে পুঁতে দেয় জিগার ডালটি। একটা চিহ্ন অন্তত থাকুক।

০২.

বুড়ির এক হাতে সোমত্ত নাতনির হাত। আরেক হাতে ছাগলের দড়ি। মানুষের স্রোতে মিশে তারা চলেছে ইন্ডিয়ায়। জীবন বাঁচাতে ছুটে চলেছে মানুষের ঢল। ঢলের পর ঢল। বুড়ির চলার গতি ধীর। পায়ে বাত, কোমরে বাত। সঙ্গে বেশি হাঁটতে অনিচ্ছুক ছাগল। ঘাস-পাতা দেখলেই মুখ বাড়ায় সেদিকে। তাই তারা বারবার পিছিয়ে পড়ে। সঙ্গের
মানবঢল তাদের পেছনে রেখে চলে যায়। তাদের ধরে ফেলে পেছনের ঢল। একসময় সেটিও তাদের পেছনে ফেলে অগ্রবর্তী হয়ে পড়ে। তখন আরেক দল এসে তাদের সঙ্গ নেয়।

পঁচাত্তর পেরিয়ে যাওয়া বুড়ি প্রাণপণে হাঁটে। জীবনের প্রায় পুরো পথ পেরিয়ে এসেও জীবন বাঁচাতে হাঁটে। তার ঘোলাটে চোখ সামনের দিকে তাকিয়ে ইন্ডিয়া খুঁজে পায় না। বরং তার চোখের সামনে শুধু আগুয়ান মানুষের পিঠ। মাঝে মাঝে দূরের মাঠের তাপ-তরঙ্গ নাচে তার চোখে। একটু পর পর বুড়ির চোখে লাল-নীল-হলুদ রঙের নাচুনি,
আর মাথা ঘুরে ওঠা। বুড়ি তবু হাঁটে। সোমত্ত নাতনির হাত চেপে ধরে হাঁটে। অনিচ্ছুক ছাগলের দড়ি ধরে টানতে টানতে হাঁটে।

মানুষের দল হাঁটছে না, যেন ছুটে চলেছে। সবার মুখে সাঁটা আতঙ্কের মুখোশ। ভীতি ছাড়া আর কোনো অনুভূতির সঙ্গে যেন তাদের পরিচয় ছিল না কোনোকালে। তারা পেছনে দেখে এসেছে মৃত্যুর ভয়াবহতা, দেখে এসেছে পৈশাচিকতার চরমতম রূপ।

আর সেই সদ্য আতঙ্কের স্মৃতি তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে তাদের। নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে বাঁচানোর বাইরে আর কিছু ভাবতে পারছে না তারা এখন। তারা হাঁটছে তো হাঁটছেই। দিনের আলোয় যতক্ষণ পথ দেখা যাচ্ছে, ততক্ষণ হেঁটে চলেছে তারা। পথের পাশে ছড়ানো ছিটানো গ্রাম পড়ছে মাঝে মাঝে। কোনো গ্রামকেই তারা তাদের সবুজ বিশ্রামের হাতছানি ভাবতে পারছে না। কিছুক্ষণের জন্য থামছে হয়তো কোনো কুয়োর পাশে। শুকনো খাবার খেয়ে মুখে পানি ঢেলে নিচ্ছে দু’ঢোক। তারপরেই হাঁটা শুরু করছে। পথপাশের সেই গ্রামগুলিতে ফেলে-ছড়িয়ে যারা রয়ে গেছে এখনো, তাদের মনে বাড়তি ত্রাস ছড়িয়ে দিচ্ছে এই ইন্ডিয়ামুখী কাফেলাগুলি। ওরে পালা পালা! মেলেটারি এলেই কিন্তু সর্বনাশ! তখন সেই গ্রাম ছেড়েও অধিবাসীদের কেউ কেউ বেরিয়ে আসছে। পোটলা-পুটলি নিয়ে ছুটছে বর্ডারের দিকে।

বুড়ির দুশ্চিন্তা নিজের পৌণে একশো বছরের পুরনো জীবনকে নিয়ে, লকলকে তরুণী নাতনিকে নিয়ে, সংসারের সম্পত্তি বলতে থাকা একমাত্র ছাগলকে নিয়ে। বুড়ি তাই পরিবার এবং সম্পত্তিকে টেনে হিঁচড়ে যতটা পারে জোরে পথ পেরুতে চায়। কিন্তু বাংলাভূমিতে নিরবচ্ছিন্ন পথ বলতে তো কিছু নেই। একটু পর পর আর কিছু না থাকুক,
খালের কমতি নেই। আর খাল পড়ল তো ছাগলের চরম অসহযোগিতা। কিছুতেই ছাগল নামতে চায় না পানিতে। আর বুড়ি তখন ফেটে পড়ে ক্রোধে– ‘এখন পানিত নামিস না ক্যারে হারামজাদি? তখন ভোটের সময় তো তুই-ও কইছিলি নৌকা মার্কাত ভোট দ্যাও, মজিবরের মার্কাত ভোট দ্যাও!’ ছাগল বুড়ির গালাগালিতে কান দেয় না। সে পানির সমান্তরালে ছুটতে থাকে খালপাড় ধরে। একবার ডানদিকে, একবার বামদিকে। বুড়ি এখন নাতনিকে সামলায় না ছাগল সামলায়! দৃশ্য দেখে এই দুঃসময়ের মধ্যেও হই হই করে হেসে ওঠে পলায়নপর মানুষের দঙ্গল। মানুষের সম্মিলিত হাসির হল্লায় ছাগল আরো ভড়কে যায়। ছাগলের টানে বুড়ির হাতের দড়ি হাতছাড়া হয় হয়। একসময় ছুটেও যায়। ছাগল এবার ছুট লাগায় উল্টোমুখে। যেন বাড়ি ফিরে যেতে চায়। বুড়ির মুখে শাপশাপান্ত– ‘হারামজাদি বকরি! বাড়িত যাওয়ার খায়েশ। তখন তো তুইও কইছিলি নৌকা
মার্কাত ভোট দিতে।’

দলের মানুষ মজা দেখে বটে, কিন্তু তাদের জন্য অপেক্ষা করে না। আসলে এই দল তো সৃষ্টি হয়েছে পালানোর পথে। পলায়নপর মানুষ বেশিক্ষণ দলবদ্ধ থাকতে পারে না।

০৩.

সাত বছরের মেয়ে, চার বছরের ছেলে, আর যুবতী বউকে নিয়ে পথে নামে মোসলেম পিয়ন। বউ কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না বাড়ি ছাড়তে। হোক না মোটে দু’টো টিনের চালার মেটে ঘর, তবু তো নিজের সংসার। তকতকে নিকানো উঠোন-মেঝে-বারান্দা। উঠোনে ছেলে-মেয়ে দু’টি ছুটোছুটি খেলে। লাউ- কুমড়া-সিমের উঁচু করে বাঁধানো মাচানের
ছায়ায় দানা খুঁটে খায় ঘরের পোষা মোরগ-মুরগি। গলাছেলা চীনা জাতের মুরগিটা তো মাসে পাঁচ-ছয়দিন মাত্র পালির বিরাম দিয়ে সারাবছরই ডিম পেড়ে চলে। বাগডাশ-শিয়াল-চিল-প্রতিবেশদের লোভী চোখ থেকে কত কষ্ট করেই না ওগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে সে। ফেলে রেখে চলে গেলে কে দেখাশোনা করবে ওদের! তার এই সকরুণ অনুযোগ স্বামীর কানের ওপর দিয়ে উড়ে চলে যায়। রাখো তোমার মুরগি! এখন জান বাঁচান হচ্ছে আসল কাম।

সঙ্গে কি কি নেয়া যাবে? শুধু নগদ টাকা, সামান্য যা আছে সোনা-দানা, আর কাপড়-চোপড়। ব্যাস! তাহলে তিন মাস ধরে স্বপ্নের ফোঁড় তুলে তুলে বোনা নকশিকাঁথা তিনটি? কুলা থেকে মুষ্টি সরিয়ে মাজারে শিন্নি চড়ানোর নিয়তে জমানো আধমণটাক চাল? ছেলে-মেয়েদের জন্য বারুহাসের মেলা থেকে কিনে আনা শোলা আর মাটির খেলনাগুলো? মেয়ের নাক ফোঁড়ানোর সময় নানির দেওয়া জামবাটি। পুরনো কাপড়ের বিনিময়ে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কেনা ছেলের দুধ খাওয়ার চীনামাটির মগ? পেতলের সেই বগি থালা, যাতে ভাত-তরকারি বেড়ে স্বামীর সামনে তুলে ধরার সময় নিজেকে সত্যিকারের আদর্শ স্ত্রী মনে হয়?

‘ওইসব লিয়্যা বোঝা বাড়ান যাবি না!’ স্ত্রীকে বোঝায় মোসলেম– ‘মেলেটারি পাখির মতোন মানুষ মারতিছে। আমি নিজের চোখে তিন জনাক মারতে দেখিছি। যুবতী মিয়্যামানুষ দেকলেই তুল্যা লিয়্যা যাচ্ছে। এখন আমার নিজের জীবন, ছাওয়াল-মিয়্যার জীবন, তোমার ইজ্জত বাঁচাতে হলে পালান লাগবি। আল্লা যদি ফের সুদিন দেয়,
তখন আবার নতুন কর‌্যা সব শুরু করা যাবি।’
‘আমরা কই যাব?’
এই প্রশ্নে থমকে যেতে হয় তাকে। ইন্ডিয়া ! একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় এখন সেটাই। কিন্তু সেখানে তারা কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে?
ঝটপট সিদ্ধান্ত নেয় মোসলেম– ‘প্রথমে বড় বুবুর বাড়িতে। বর্ডারের কাছে বাড়ি। সুযোগমতো চলে যাওয়া যাবে সেখান থেকে।’
খানিকটা পথ বাসে।
তারপর রিকশায়।
তারপর আবার বাস।
তারপর নদীপথে নৌকায় অনেকখানি পথ।
তারপর আর কোনো বাহন নেই। গরুর গাড়ি পর্যন্ত পাওয়া যায় না। তখন থেকে শুধু হাঁটা
বড় বুবুর বাড়ি এখন অনেক দূরের পথ বলে মনে হচ্ছে।
বিয়ের পরে সপরিবারে অন্তত বারতিনেক গেছে সে। তিনঘণ্টার বাসযাত্রা। তারপরে ঐ ঘণ্টাতিনেকই হাল-বওয়া
নৌকা। গঞ্জে নেমে বড়জোর আধা ক্রোশ হাঁটা। কিন্তু এখন কোনো বাস বা মোটর তার গন্তব্যে যেতে পারছে না।
নৌকা নিয়ে মাঝিরা কোনো সদরের গঞ্জে যেতে ভয় পায়। তাই তাদের পথের মধ্যেই নামিয়ে দেওয়া হয়।
অবস্থা দেখে মুষড়ে পড়ে মোসলেম।
বউ মিনমিন করে শেষ চেষ্টা করে– ‘ফিরত গেলে হয় না!’
‘পাগল!’
ছোট ছেলেটাকে কোলে তুলে নেয় মোসলেম। বাক্সটা তুলে নেয় আরেক হাতে। মেয়ে আর বউকে পাশে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে।
কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায়, তারা একা নয়। শত শত। হাজার হাজারও বোধহয় বলা যায়।
কিন্তু বুবুর বাড়ি যেন ক্রমশ-ই আরো দূরে সরে যাচ্ছে। তারা হাঁটছে তো হাঁটছেই! সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই সময়ে এসে পৌঁছায়
নন্দকুঁজা নদীর ধারে। কোনো নৌকা নেই।
এখন উপায়!

কেউ কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। তাকায় পরস্পরের দিকে। একজন বুদ্ধি দেয়, পাশের গ্রামে গিয়ে নৌকার মাঝিকে খুঁজলে কেমন হয়? বুদ্ধিটা মনে ধরে মোসলেমের। তিনজন যায় গ্রামের দিকে। নৌকা এবং মাঝির খোঁজে। বাকিরা নদীপাড়ের ঘাসে বসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। যতখানি বিশ্রাম নিয়ে নেয়া যায়। কেউ কেউ শুয়েও পড়ে। মোসলেমও তাদের দলে। মাথার নিচে টিনের বাক্সটা বালিশ হিসাবে ব্যবহার করে। শক্ত এবং উঁচু। কিন্তু তাতেও তার শরীরে বেশ আরাম বোধ হয়। উল্লম্ব থেকে আনুভূমিক হতে পারাটাই শরীরকে যথেষ্ট আয়েশ এনে দিতে সক্ষম হয়। ছোট ছেলেটা এসে তার কোল ঘেঁসে শুয়ে পড়ে। বালিশ হিসাবে ছেলের মাথার নিচে নিজের বাহু বিছিয়ে দেয়
সে। রাতে এই নদী পার হওয়ার কোনো আশা বোধহয় নেই।

কিন্তু প্রায় অলৌকিকভাবেই সাহায্য পাওয়া যায়। যে তিনজন নৌকা ও মাঝির খোঁজে গ্রামে গিয়েছিল তারা ফিরে আসে সুখবর এবং সঙ্গে আরো তিনজন যুবককে সঙ্গে নিয়ে। তাদের দেখে উঠে দাঁড়ায় বিশ্রামরত মানুষেরা। এরাই কি নৌকার মাঝি? না। কথায় কথায় পরিচয় পাওয়া যায়। তারা আশ-পাশের গ্রামেরই সন্তান। শহরে লেখাপড়া
করে। তারা এখন শহর থেকে চলে এসেছে। সঙ্গীদের নিয়ে পরিকল্পনা করছে কীভাবে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।

মোসলেমের চোখে, পলায়নপর মানুষগুলোর চোখে, মুহূর্তে দেবদূতে পরিণত হয় তিন যুবক। আর তাদের নিজেদেরকে মনে হয় কাপুরুষের দল। তিন যুবক হেসে সান্ত¦না দেয়– প্রয়োজনে পিছু হটতে হয়। পিছু হটা মানেই পালানো নয়। প্রথমে তো নিজেকে রক্ষা করতে হবে। পরিজনদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। তারপরে দেখা যাবে, যার যাওয়ার সে ঠিকই যুদ্ধে চলে গেছে।
তিন যুবক আরো জানায় যে, পাকবাহিনী খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই রাতের মধ্যেই পানি পার হয়ে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই গ্রামের প্রায় সমস্ত লোকই পানি পার হয়ে চলে গেছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। মাঝির খোঁজে লোক পাঠানো হয়েছে একটু দূরের গ্রামে। তারা এসে পড়বে শিগগিরই।

বলতে বলতেই দেখা যায়, আরো আট-নয়জন লোক চলে এসেছে। পাঁচজন মাঝি। অন্যেরা এই যুবকদের সঙ্গী। তারাও যুবক। তারা নৌকায় উঠতে সাহায্য করে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরছাড়া মানুষগুলোকে। নৌকা ছাড়বে। এমন সময় এক হাতে নাতনির হাত, আরেক হাতে ছাগলের দড়ি ধরে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে হাজির হয় বুড়ি। তাদেরও জায়গা হয় মোসলেমদের নৌকায়। নৌকা ভাসানোর মুহূর্তে দেবদূতের মতো যুবকদের কাছে বিদায় নেয় আরোহীরা। দোয়া করে তাদের জন্য। সাবধানে থাকতে বলে। যুবকরা হাসিমুখে দোয়া গ্রহণ করে। জানায়, তারা নিশ্চয়ই সাবধানে থাকবে।

নদী পার হতে হতেই আঁধার জেঁকে বসে। এই অন্ধকারে তারা কোথায় যাবে!
নদীর লম্বা এবং উঁচু পাড় বেয়ে ওপরে উঠলেই করিম শাহের মাজার। বিরাট চত্বর। মোসলেমদের দলটিকে বাধ্য হয়ে খুব কুণ্ঠার সঙ্গে আশ্রয় চাইতে হয় সেই মাজারেই। কিন্তু এমন সাদর অভ্যর্থনা পাওয়া যায় যে কুণ্ঠিত ভাবটি মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায় তাদের মন থেকে।

এমনিতে মাজারে মেয়েদের রাত কাটানো বারণ কিন্তু এখন সব নিয়ম শিথিল করে দেন খাদেম সাহেব। শুধুমাত্র পীরের কবর-ঘর বাদ দিয়ে যে যেখানে ইচ্ছা আশ্রয় নিতে পারে বলে জানিয়ে দেন তিনি। সেই সঙ্গে অন্য খাদেমদের সঙ্গে নিয়ে খাবারেরও বন্দোবস্ত করতে শুরু করেন।
সারাদিনের অবিরাম হাঁটা এবং উৎকণ্ঠা প্রতিটি মানুষকে নির্জীব করে ফেলেছে। তবুও কেউ কেউ খাদেমদের সঙ্গে হাত লাগায় রান্নার কাজে।
লাল মোটা চালের ধোঁয়াওঠা ভাতের সাথে মসুরের ডাল আর আলুর তরকারি। খাদেম সাহেব কুণ্ঠার সাথে নিজেদের অক্ষমতা স্বীকার করেন। দেশ-দুনিয়ার পরিস্থিতি ভালো না। কারো মনেই শান্তি নাই। তাই মেহমানদারির যথার্থ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। অতিথিরা এই ত্রুটি মার্জনা করবেন।

যেচে আশ্রয় নেয়া মানুষও মহান অতিথির মর্যাদা পেয়ে যায় মাজারের খাদেমদের কাছে। এমনটি সম্ভব শুধু এই বাংলাতেই। আশ্রিত অতিথিদের কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। তারা সবাই তৃপ্তির অধিক ভালোলাগা নিয়ে খাবার খায়। টিনের বাক্স থেকে বড় কাঁথাটা বের করে মোসলেমের বউ। পিঠের নিচে বিছানা হিসাবে পাতার জন্য চট বিছিয়ে দিয়েছেন খাদেমরা। কিন্তু এত লোককে বালিশ কোত্থেকে দেবেন তারা। তাছাড়া মাজারে যারা আসে, এবং রাত কাটায়, তারা বালিশজাতীয় বিলাসিতার ধার তেমন একটা ধারে না। কিন্তু বালিশ ছাড়া তো গৃহীদের ঘুম প্রায় অসম্ভব। কাঁথা ভাঁজ দিয়ে নিজেদের জন্য বালিশ তৈরি করে মোসলেম। শুয়ে পড়ে সপরিবারে।
ছাগলের দড়িটা একটা খুঁটার সাথে বেঁধে তার সামনে কিছু ঘাস-পাতা কুড়িয়ে এনে রাখে নাতনি। কেননা ছাগলজাতি রাতে ঘুমের ঘোরেও খাবার খোঁজে। না পেলেই ভ্যা ভ্যা করে জ্বালাবে সারা রাত।

চটের ওপর সারি সারি শুয়ে থাকা মানুষগুলোর ওপর দিয়ে নন্দকুজা থেকে আসা বাতাস মাঝে মাঝে আছড়ে পড়ে। মাঝে মাঝে সেই বাতাস মাজারভিটের পাকুর গাছের পাতার গায়ে পড়ে পিছলে যেতে যেতে দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ তোলে। রোজ রাতের অভ্যাসবশত নাতনি নানিবুড়ির বুকের মধ্যে নাক ডুবিয়ে দেয়। এখন তার কেচ্ছা শোনার
সময়। রোজকার অভ্যেসমতো দিনযাপনের ছকে বাঁধা বুড়ি নিজের অজান্তেই নিজের শিশুকাল থেকে মুখস্ত হয়ে থাকা কাসাসোল আম্বিয়ার পাতা উল্টে বসেÑ মুছা নবীর হাত আছিল এক আ’সা। কুদরতি লাঠি। আল্লাহর কাছ থাক্যা সেই আ’সা আন্যা দিছিল জিবরাইল ফেরেস্তা। নাকি আজরাইল ফেরেস্তা? না না জিবরাইল ফেরেস্তাই হবি।
আজরাইল ফেরেস্তার কাম তো খালি মানুষের জান কবজ করা। সব নবীর কাছে আল্লা তো জিবরাইলরেই পাঠাচ্ছিল। যেমন হিন্দুরে নারদ। মুসলমানের সেই রকম জিবরাইল। তো মুছা নবী বার বার বিপদে পড়ে। ফেরাউনের হাতে, হামানের হাতে। সেই জন্যে আল্লাহ পাঠায় দিল সেই আ’সা। কেরামতি লাঠি। লাঠি মাটিত ফেললেই আজদাহা সাপ। সেই আজদাহা গিল্যা খায় যত জাদু-টোনা, বান-মুন্তর, তুক-তাক, মন্দ মানুষের ধড়-কল্লা। কিন্তু যে-ই মুছা নবী আজদাহার গায়ে হাত ছোঁয়ায়, অমনি আজদাহা আবার সেই আ’সা। যে কে সে-ই।

তো মুছা নবীর উপর, তার গুষ্টির মানুষের উপর ফেরাউনের খুব অত্যাচার। ফেরাউন তো রাজা। তার সিপাই- শান্ত্রি. সেনাপতি-মন্ত্রী, তীর-ধনুক, লাঠি-তলোয়ার অগুন্তি। খুব অত্যাচার মুছা নবীর উপর।
নাতনি প্রশ্নের মতো মন্তব্য করে– যেই রকম অত্যাচার করতিছে পাঞ্জাবি রাজা আমারে উপর!
তার চায়েও বেশি। বুড়ি খেই ধরে– সেই অত্যাচারের কুনো সীমা-সরহদ্দ নাই। তখন বাঁচার একটাই উপায়। ফেরাউনের দ্যাশ ছাড়্যা দল-বল লিয়্যা পলায় যাওয়া।
“প্রত্যাদেশ আসে– হে মুছা! তুমি তোমার স্বজাতি বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্রকে সঙ্গে লইয়া ফেরাউনের রাজ্য মিশর ছাড়িয়া হিজরত করো। নৃশংস ফেরাউনের ক্রোধের নাগালের বাহিরে লইয়া যাও তাহাদের। আমি তোমাদের প্রতিপালক, প্রতিজ্ঞাপূর্বক বলিতেছি যে, বনি ইসরাইলের জন্য মিশর অপেক্ষা অনেক উন্নতমানের জমিন আমি তোমাদের জন্য বরাদ্দ করিব।’

ইশ্বরের এমত প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দেশত্যাগের প্রশ্নে বনি ইসরাইলগণ ইতস্তত করে। তাদের দ্বিধা কাটে না। তারা অশ্রুসজল কণ্ঠে বলে– হে ইশ্বরের নবী মুছা ! যত অত্যাচারই হউক, এই ভূমি আমাদের নিজস্ব ভূমি। এই ভূমিতে আমাদিগের পিতা-পিতামহ এবং তদূর্ধ্ব পুরুষগণ জন্মিয়াছিলেন, এবং এই ভূমিতেই মৃত্যুবরণ করিয়াছিলেন। এই দেশ হইতে চিরতরে প্রস্থান করিলে আমরা হইব বাস্তুত্যাগী, উদ্বাস্তু। যাহার দেশ নাই, তাহার কোনো পরিচয় নাই। যাহার নিজস্ব জমিনের ভূ-ভাগ নাই, তাহার কোনো নাড়ির টান নাই। আপনি কি আমাদিগকে চির উদ্বাস্তু হইতে বলিতেছেন? মুছা বলিলেন– আমার ইশ্বর বনি ইসরাইলদের জন্য মিশর অপেক্ষা উন্নততর সুফলা, সুজলা, চিরস্থায়ী নিরাপত্তাসম্বলিত একটি দেশ প্রদানের অঙ্গীকার করিয়াছেন। আর ইশ্বর কখনোই ভঙ্গ করেন না অঙ্গীকার। তাই হে বনি ইসরাইলগণ, আইস, আমরা ইশ্বরের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস স্থাপন করি।

লোকজন তখন বলিল– তথাস্তু! আমরা ইশ্বরের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস স্থাপন করিলাম।
অনন্তর তাহারা মুছা নবীকে অনুসরণ করিল। এই সংবাদ গুপ্তচর মারফত পৌঁছিল ফেরাউনের নিকট। সেই দূরাচার তৎক্ষণাৎ নিযুত সেনাদল লইয়া বনি ইসরাইলের পশ্চাদ্ধাবন করিল।

নূতন আশায় বুক বাঁধিয়া বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্র মুছা নবী এবং তদীয় ভ্রাতা হারুনের নেতৃত্বে চলিয়াছে নূতন দেশের সন্ধানে, সম্মানের দেশের সন্ধানে, অভয়ের দেশের সন্ধানে। সারাদিন পথ চলিয়া তাহারা আসিয়া দাঁড়াইল সমূদ্র-সমতূল্য নীলনদের পাড়ে। এখন এই নীলনদ পাড়ি দিবার জন্য প্রয়োজন বিশালায়তন জাহাজের। কিন্তু পোতাশ্রয়ে বড় জাহাজ তো দূরের কথা, ছোট কোনো জলযান পর্যন্ত নাই। হঠাৎ পেছনে শোরগোল। সচকিত হইয়া সভয়ে পিছনে ফিরিয়া আর্তনাদ শুরু হইল– হায় হায়, কী কুক্ষণেই না মুছার কথা মানিয়া লইয়াছিলাম! তাহার ফলস্বরূপ এখন ধনে-প্রাণে-পরিজনে মরিতে হইবে। পিছনে যে আসিয়া পড়িয়াছে ফেরাউন এবং রক্তলোলুপ সেনাদল।

হযরত মুছাও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ইশ্বরকে ডাকিয়া বলিলেনÑ হায় ইশ্বর, সম্মুখে অকুল তরঙ্গবিক্ষুদ্ধ সমুদ্রোপম নীলনদ, পশ্চাতে ভীষণ শত্রু, এখন আমাদিগের প্রাণ রক্ষার কী উপায়!
ইশ্বর তৎক্ষণাৎ মুছা নবীর নিকট প্রেরণ করিলেন তাঁহার দেবদূত জিবরাইলকে। জিবরাইল বলিল– হে মুছা কোনো চিন্তা করিয়ো না। নিশ্চয় ইশ্বর তোমাদিগকে রক্ষা করিবেন। তুমি তোমার হস্তস্থিত আ’সা দ্বারা নীলনদের পানিতে আঘাত করো।
মুছা নবী হস্তস্থিত আ’সা দ্বারা আঘাত করিলেন নীল নদের পানিতে।
ইশ্বরের কী অপার মহিমা! সঙ্গে সঙ্গে নীলনদের বুক বিদীর্ণ হইল বারোটি খ-ে। নীলনদের বুকের উপর দিয়া তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত হইয়া গেল বারোটি রাজপথ। নিজের পানিকে স্তম্ভে স্তম্ভে বিভক্ত করিয়া নীলনদ যেন বনি ইসরাইলিদের জন্য প্রস্তুত করিয়া দিল মুক্তির রাজপথ।

বনি ইসরাইলের এক একটি গোত্র এক একটি পথ দিয়া নির্বিঘেণ্ন পার হইয়া গেল নীলনদ। এদিকে ফেরাউন ততক্ষণে সসৈন্যে পৌঁছিয়াছে নীলনদের তীরে। সেই দূরাচার ইশ্বরের কুদরতের প্রতি ভ্রƒক্ষেপমাত্র করিল না। তদুপরি তাহার মন্ত্রী হামান তাহাকে এই বলিয়া আরো উসকাইয়া দিল যে ফেরাউনের ভয়েই নীলনদের বুক দ্বাদশ খ-ে খ-
িত হইয়া পড়িয়াছে। ইহা শুনিয়া ফেরাউন ঘোড়া হাঁকাইয়া নামিয়া পড়িল নীলনদের বুকে। সঙ্গে তাহার সৈন্যরাও। সেই মূহুর্তেই নীলনদের পানি পূর্বের মতো হইয়া গেল। নিশ্চিহ্ন হইয়া গেল বারোটি পথ। আর নীলনদের অগাধ জলে সলিলসমাধি লাভ করিল ফেরাউন, মন্ত্রী হামান এবং তাহার দুর্ধর্ষ সৈন্যদল।”

০৪.

কিন্তু এখানে রাত পোয়ানোর আগেই হাজির ফেরাউনের বাহিনী। প্রায় কালিরঙা অন্ধকারের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিল মাজার-ভিটেতে আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো। একটামাত্র বাতি জ্বলছিল পীর সাহেবের কবরগাহে। কেরোসিন শেষ হওয়াতে সেটি-ও নিভে গেছে মাঝরাতের শেয়াল ডাকার আগেই। কাজেই কেউ ঘুম ভাঙলে দেখার মধ্যে দেখতে পেয়েছে কেবল অন্ধকারই। হঠাৎ-ই দাউ দাউ আলোর জেল্লা। সেই হঠাৎ আলো ঘুম ভাঙিয়ে দেয় মোসলেমের, এবং আরো দুই-চারজনের। তারা সচকিত হয়ে এপাশ-ওপাশ তাকায়। কই, এখানে তো কোনো আলোর উৎস চোখে পড়ছে না! তখন চোখ যায় নদীর ঐ পারে। দাউ দাউ করে জ্বলছে যেন অতিকায় এক মশাল। চোখ রগড়ে তাকালে
বোঝা যায়, মশাল নয়। এক সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে আসলে। তৎক্ষণাৎ বোঝা যায়, ওপারে পৌঁছে গেছে পাকবাহিনী। পুড়িয়ে দিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম।

এত কাছে ঘাতক বাহিনীর উপস্থিতি অনেককেই বিমূঢ় করে দেয়। কিন্তু মোসলেম ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। চিৎকার করে বলে– পালাও পালাও! ঐ পারে পাক বাহিনী আস্যা পড়িছে!
কিন্তু কাঁচাঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠা পথক্লান্ত দুশ্চিন্তাকাতর মেয়ে-মদ্দ নিজেদের দ্রুত গুছিয়ে নেবার বদলে আরো আউলা-ঝাউলা হয়ে পড়ে। তাদের তৈরি হবার তাড়া দিয়ে মোসলেম নদীর দিকে হেঁটে যায়। বড় আমগাছের গুড়ির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে তাকিয়ে থাকে নদীর ঐপারের দিকে। সেই একই দৃশ্য। যেমনটি সে দেখেছিল নারদ নদীর ধারে, গ্রাম থেকে ধরে আনা মানুষগুলোকে সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে মেরে চলেছে পাকিস্তানি মিলিটারি। তবে কয়েকজনকে না মেরে রেখে দিয়েছে এক পাশে। ওদের মারছে না কেন?
একটু পরেই উত্তর খুঁজে পায় মোসলেম। আর তখন তার বুকের রক্ত আবার হিম হয়ে আসে।
লোকগুলোকে নিয়ে নৌকায় উঠছে পাকবাহিনী। মোসলেম শুনেছে, পশ্চিম পাকিস্তানে খাল-নদী নাই তেমন একটা। ওদেশের লোকেরা সাঁতার জানে না তেমন। নৌকা চালানো তো দূরের কথা। নৌকা চালানোর জন্যই ওরা বাঁচিয়ে রেখেছে জনাকয়েক গ্রামবাসীকে।

এই পাড়ের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে আসছে নৌকাগুলো। যেন ঘোড়ায় চেপে দলবলসহ ছুটে আসা ফেরাউন। মোসলেম বুঝে নেয়, তাদের মৃত্যু এখন আর অল্প কিছু সময়ের ব্যাপার। যে নদীকে তার কাছে কাল রাতে নীলনদের মতো বিশাল মনে হচ্ছিল, এখন মনে হচ্ছে সেই নদী আসলে তেমন বড় নয়। তাছাড়া তাদের দলের মধ্যে তো মুছা নবী নাই। নাই তার হাতের তেলেসমাতি ক্ষমতার আ’সা। ফেরাউনের দল তর তর করে চলে আসছে আজরাইলের কাঁধে চড়ে এই পাড়ের দিকে। ঐ তো, প্রথম নৌকা প্রায় পৌঁছে গেছে মাঝনদীতে! চোখ বোঁজে মোসলেম। অনিবার্য পরিণতিকে মেনে নেবার জন্য নিজেকে যেন প্রস্তুত করতে চায়। তাদের দলে মুছা নবী নেই, তার হাতের অলৌকিক আ’সা নেই, তাদের আর বাঁচার আশা নেই।

এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ আসে।
ওরা তাহলে পৌঁছে গেছে। চোখ না খুলেই ভাবে মোসলেম।
আবার গুলির শব্দ। অচেনা ভাষায় চিৎকার। কিন্তু গুলির শব্দ কেমন যেন এলোমেলো মনে হচ্ছে।

চোখ খোলে মোসলেম। সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় অলৌকিক কিছু একটা ঘটে গেছে। নৌকাগুলো মাঝনদীতে চড়কির মতো পাক খাচ্ছে। তার মানে, পাকবাহিনীকে কায়দামতো মাঝনদীতে এনে নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে পানিতে পড়েছে বাঙালি মাঝির দল। পানির দিকে তাক করে গুলি ছুঁড়ছে পাকবাহিনীর লোকেরা। কিন্তু নৌকা নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে
দুলছে বলে ভারসাম্য থাকছে না কারো। টাল খেয়ে একজন-দুইজন করে পানিতে পড়ে যাচ্ছে সাঁতার না জানা কসাইগুলো। টুপ টুপ করে তলিয়ে যাচ্ছে নন্দকুজার চোরা স্রোতের টানে। মোসলেম ছোটবেলা থেকে শিখে এসেছে, মুসলমানের মৃত্যু দেখলে বা মৃত্যুর খবর শুনলে দোওয়া পড়তে হয়– ‘ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন’।
আর বিধর্মীর মৃত্যু দেখলে বা মৃত্যুর খবর শুনলে পড়তে হয়– ‘ফি নারে জাহান্নামা খালেদিনা ফিহা।’ মোসলেম শুনেছে পাঞ্জাবিরা নাকি মুসলমান। তবু তাদের মৃত্যু দেখতে দেখতে সজোরে উচ্চারণ করে সে- ‘ফি নারে জাহান্নামা খালেদিনা ফিহা’।

নান্নু মিয়ার দোকানে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। দোকানের ঠিক কাছে নয়। কারণ, আশপাশটা এবড়োথেবড়ো আর আগাছার জঙ্গলে ভরা খানিকটা দূরে ইট বিছানো রাস্তার সমতল চত্বরে চেয়ারটাকে রাখা হয়েছে। তবে নান্নু মিয়ার দৃষ্টিসীমার মধ্যে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে যাতে সে দু-একবার বৃদ্ধের দিকে নজর রাখতে পারে। এই নজর রাখার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নান্নু মিয়ার বিরক্তও লাগে। এত কামের মইদ্যে বুইড়ার ক্যান এই আকামের শখ? তারপর নিজেকে ধমকায় — হালার কাউট্টা দিলের নাউন্না, তুই আর জীবনে মানুষ অইবি না। বুড়া হাজার হইলেও তর বাপ!
নান্নু জানে, সে ওই বুড়োর ফরজন্দের সন্তান নয়। নান্নুর কোনো মা-ও নেই। ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পাওয়া শিশু নান্নু। তখন বাহাত্তর সাল। সবেমাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশের সবকিছু ভাঙ্গাচুরা নয়তো আগুনে পোড়া।
ক্ষ্যাতে ফসল নাই। দোকানে মালসামানা নাই। সবকিছুর আকাল লেগেছে। খাবারদাবারের দাম আকাশচুম্বী। নান্নুর বাপ মইত্যা মাঝি। সে যুদ্ধের সময় মূলত নদীপথে গ্রামের মানুষদের নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যেতে সাহায্য করতো। রাতের আঁধারে হিন্দু পরিবারগুলোকে নিরাপদে সীমান্তগামী বহরের কাছে পার করে দিয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলে মতি মিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত সেবাকেন্দ্রে গৃহহারা সহায়সম্পদহারা মানুষদের জন্য এক বেলা খাওয়াদাওয়ার কাজে লেগে পড়ে। বাড়ি ফেরার পথে বাপ ও ছোট ভাই দুটোর জন্য একটা হাঁড়িতে খিচুড়ি বেঁধে নিয়ে যায়। সে-সময় একদিন খাবারের পোটলার বদলে আর একটা মানুষের বাচ্চার পোটলা নিয়ে বাড়িতে পা দিলে মতি মিয়ার বাপ ছক্কা মাঝি দাওয়ার কোনায় রাখা পুরোনো বৈঠাটা তুলে ছুঁড়ে মেরেছিল। বলেছিল, কার না কার পাপ তুই কোছড়ে কইরা ঘরে লইয়া আইলি! নিজেগো প্যাটে কেইছায় মাডি তোলে। গুয়ের গাইরায় টোকাইয়া পাওয়া এই বাচ্চারে বাইত্যে ক্যান লইয়া আইলি? তাও যদি নিজের ফরজন্দের অইত। হেই বেডি তো প্যাটেরডা লইয়া মইরা বাঁচছে। এই পাপের ড্যালা ক্যাডায় পালব, ক্যাডায় খাওন দিব?। মতি মাঝি ঝাঁকা মাথায় ঝাঁকি দিয়ে বলেছিল, আমি দিমু। আমি পালুম। মতি নিজের বউয়ের কথা মনে করতে চায় না। ছয় মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা বউটা কালি সাঁঝে ঘাটে গিয়ে পুকুরে পিছলে পড়ে বাঁইচা বনে পা পেঁচিয়ে মারা যায়। লোকে বলে ফিরোজাকে জিনে মারছে।

আব্দুল্লাহপুরের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে চেয়েছিল। ঢাকা শহরে কোনো এতিমখানায় দিয়ে দেবে। তখন অনেক ধর্ষিতা নারী তার শিশুকে হাসপাতালে বা এতিমখানায় ফেলে গেছে। কিন্তু নান্নুকে মতিমিয়া ছাড়েনি। কী ঢুকেছিল তাগড়া যুবক মতি মিয়ার মাথায় কে জানে। নান্নুকে রেখে দিল নিজের কাছে! পাখির বাচ্চার মতো মুখে
খাবার দিয়ে দিয়ে বাঁচিয়ে তোলে। মতি মিয়ার ঝাঁকড়া চুলের গোছা খামচে ধরে ফোঁকলা মুখে লোল ছিটিয়ে শিশু নান্নু প্রথম বোল ফোটায়, বাব্বা…!
নারীর আগের ঘরের সন্তানসহ বিয়ে হলে সেই সন্তানকে বলে ‘হাউত্যা পোলা’ বা মাইয়া। মতি মিয়া পুরুষ হয়ে চার বছরের হাউত্যা পোলা নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলো জয়নব আরাকে। ছেলেকে যে মেনে নিবে সে-ই হবে তার বউ। তা জয়নব আরা নান্নুকে নিজের ছেলের মতই দেখতো। আরও বড় হওয়ার পর, জয়নবের আদর দেখে নান্নু ভাবতো, জয়নবও মা, আর তার গর্ভধারিণীও মা! কোন ইবলিশ তার বেশ্যা মায়ের গর্ভে নান্নুর বীজ ঢুকিয়েছিল আল্লা জানে। তার মা বেশ্যা না ধর্ষিতা সে জানে না। তবু মনে মনে অদেখা মাকে সে বেশ্যাই ভাবতো। বেশ্যা ভেবে সুখ পেতো। বেশ্যা! নটি! হারামজাদি বেবুশ্যে বেটি, সদ্য বিয়ানো ছেলেকে লোকলজ্জার ভয়ে ত্যানা পেঁচিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল! নাড়িও কাটা ছিল না। নাকি মরাই জন্মেছিল নান্নু, কে জানে!
মতি মিয়া তাকে পেয়েছিল আধমরা অবস্থায়। লোকে বলে, মতি মিয়া কামেল পুরুষ। নইলে মরা বাচ্চা জিন্দা হয় কেমনে? ঐ বয়সে এসব শুনে মাথাটা মাঝে মাঝে আউলা লাগতো। হয়তো ঠিকই। নইলে বাহান্ন বছরের নান্নুকে এখনও এমন গাট্টাগোট্টা জোয়ান লাগে কীভাবে?
নান্নুর বউ, পুরান ঢাকার লাল্লু গুলগুলাওয়ালার মাইয়া চামেলিবদন বলে, তুমি তো আমার জওয়ানকি খিলাইছ, তাই জুয়ান আছো। আমি না দেইখা রাখলে তোমার জীবন যৌবন কবে ঝুরঝুরা তেজপাতা হইয়া যাইত!
চামেলিবদনের কথাকেও সত্য মানে নান্নু।
সঙ্গী সাথীরা কাইজ্যা ঝগড়া লাগলেই তাকে জাউরা বলে গালি দিত। চান্দিতে রক্ত উঠে যেতো। কারো নাক ফাটানো, থোতা ভাঙা, মাথা ফাটানো চলতেই থাকলো। বাড়ি এলে বাপও তাকে আচ্ছাসে পিটাতো। এত ত্যাজ ক্যান তর! পরের পোলার রক্ত বাইর করছ। তর নিজের রক্ত কী জানছ হারামজাদা! মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে!
মোটে পনর বছর বয়স তখন। রক্ত! নিজের রক্ত নান্নুকে পাগল করে ফেলে!
ক্যান আনছিলা? ক্যান? বৈঠার এক বাড়িতে বাপের মাথাটা ফাটিয়ে দিয়ে একটা গোত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো নান্নু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।
নানা জায়গায় ভেসে বেড়িয়েছে নান্নু। একসময় চলে এসেছে ঢাকায়। সদরঘাটের কুলিগিরি করেছে। পকেট কেটেছে। গ্যারেজে কাজ করেছে। ফেনসিডিল আর হেরোইন সাপ্লাই করেছে। মাদকের কাজে জড়িয়ে পড়া সূত্রে পরিচয় হয়েছে মোহাম্মদপুরের বিহারি পট্টির চোখকানা কুলসুমর বেওয়ার সঙ্গে। কুলসুম বেওয়ার মেয়ে মর্জিনা।

মর্জিনা গাজার সুখা পুরিয়া আর পাইপ বানিয়ে পুরান ঢাকার দোকানে সাপ্লাই দিত। মর্জিনার সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে পেয়ে গিয়েছিল লাল্লু গুলগুল্লাওয়ালার বউ গুলবদনের মেয়ে চামেলিবদনকে। চামেলির ভালো লেগে যায় নান্নুকে। চামেলিবদনকে নিয়েই সংসার জীবন শুরু করে। ধুমাদ্ধুম দুটো ছেলেমেয়ে জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে চামেলিবদনের মতিগতিরও পরিবর্তন হয়েছে। তলপেটে চিনির পুরিয়া আর ডাইলের বোতল লুকিয়ে দোকানে দোকানে সাপ্লাই দেওয়ার কাম খতম। তার জিন্নতআরা আর শাহজাহান বেটিবেটাদের বস্তির জীবনে কুৎসিতভাবে বড় হতে দিতে চায় না। কষ্ট করে টাকা জমিয়ে নান্নুকে একটা পানবিড়ির ছোট দোকান করে দেয়। চামেলি নিজে একটা ফুলের দোকানে তোড়া বাঁধার কাজ নেয়। এই করতে করতে কখন আরও দুবার পনর বছর পেরিয়ে গেল। মতি মিয়ার অশিতীপর দেহটা কুঁকড়ে গেছে। তাঁর পিঠ কুজো হয়ে পড়েছে। চোখেও বলতে গেলে দেখে না। দুধের সরের মত মোটা হয়ে ছানি পড়েছে। মাথাটা প্রায় বুকের কাছে নুয়ে পড়েছে। মাথার টুপিটাও কপালে নেমে এসেছে। ওখানটায় একটা সাজনা গাছের ছায়া আছে। নইলে মার্চের তেজি রোদে বুড়োর মগজ গলে গলে পড়বে। তিনি দুর্বল গলায় ডাকেন নান্নু, নান্নু রে। এমিহি আয় তো বাপজান। অ নান্নু। নান্নু মিয়া বৃদ্ধের গলা শুনতে পায় না। অথবা পায় তবে তাতে কান দেয় না। দোকানে কাস্টমার এসেছে। কয়েকজন তরুণ তরুণী। ফ্রিজ খুলে কাপ আইসক্রিম দিচ্ছে। কেউ চাইছে চিপস, কেউ বা সবুজ শাটিন ফিতেয় লাল অক্ষরে এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম লেখা ব্যান্ড। ব্যান্ডই বেশি বিক্রি হচ্ছে। কপালে বেঁধে নিচ্ছে। তারপর দল বেঁধে চত্বরে নেমে যাচ্ছে। নানা পোজে ছবি তুলছে। মেয়েরা তুলছে সেলফি। তবে কিশোরী তরুণী মেয়েরা মোবাইল ক্যামেরা মাথার ওপরে নিয়ে নিজের মুখটাকে কেন ছাগলের মতো চোখা করে সেলফি তোলে তা নান্নু মিয়া আজও বুঝতে পারে না। নাতি আলামিনকে নিয়ে আসার কথা মেয়ে জোনাকি বেগমের। এখনো আসছে না।আজকের দিনটাতে দোকানে ব্যস্ততা বেশি। ব্যবসা তো বলতে গেলে বছরের এই দু তিনটে দিনই। আগে ছিল খালি ছাব্বিশ আর ষোল এখন সাতও যুক্ত হয়েছে! অন্যান্য দিন খালি চা-পানি পান-সিগারেট!

মেয়েকে মোবাইলে কল দেয় নান্নু মিয়া। রক্ত যখন দিয়েছি…। প্রতিবারই কান থেকে ছিটকে যায় মোবাইলখানা। আরে বাপ! গলা তো না য্যান বাঘের হুংকার! কানে তালা লেগে যায়! জয় বাংলা পর্যন্ত আগে কান পেতে শুনতে হবে তারপরে রিং হবে! ভাষণ শুনবি না? তোর বাপ শুনবে! কয়েকবছর ধরে এই যন্তন্না শুরু হয়েছে। ধুশ্শালার রক্ত! রক্ত কথাটা শুনলেই নান্নুর মাথায় আগুন ধরে যায়। রিং টোন আসার আগেই মোবাইল বন্ধ করে কাস্টমারের দিকে মন দেয়। গাছতলায় চেয়ারের দিকে একটা নজর দেয়। বুড়ো তো এই ভাষণ শোনার জন্যই বসে আছে! ভাষণ তো বাজার কথা! গাছে গাছে পাতায় পাতায় রৌদ্রে ছায়ায় ভাষণের শব্দগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। ওই কাচের মিনারে রোদের আগুন লাগা ঝকমকানিতে ভাষণটা দাপটের সঙ্গে কুচকাওয়াজ করতে করতে নেচে যাবে। কিন্তু আজ কেন যেন কিছুই হচ্ছে না। কেন কে জানে! মতি বুড়া তো বাতাসে কান পেতে জমিনে চোখ পেতে সেই থেকে বসে আছে! থাকুক!
ক বছর হলো দিবসটাকে সরকারিভাবে পালন করা হচ্ছে। সাতই মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে এখন স্কুল কলেজেও বাধ্যতামূলকভাবে এ দিনটাকে পালন করার নির্দেশ আছে। ফলে এই চত্বরে স্কুলের ছেলেমেয়েদেরও ভিড় জমে। চারপাশে মাইকে সেই ঐতিহাসিক ভাষণ বাজানো হয়। পাশাপাশি চলে
স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের গান। পরিবেশটা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু দিনে দিনে কেমন যেন সব কৃত্রিম হয়ে গেছে। মানুষ আসে ঘুরতে আর ছবি তুলতে। ছবি তোলার খপ্পরে পড়ে গেছে সবকিছু। তা পড়–ক। নান্নু মিয়ার দরকার মানুষ। দোকানের জিনিসপত্রও সেসব ভেবেই রাখে। বাচ্চাদের জন্য কিছু রঙিন বেলুন গোছা বেঁধে রেখেছে। যে-রঙের বেলুন সে-রঙের সুতো। শিশুরা যে-যে বেলুন কিনতে চাচ্ছে, নান্নু মিয়া এক নজর দেখেই ওই রঙের সুতোটি গোড়া থেকে একটা ভাঙা ব্লেডের টুকরো দিয়ে কেটে হাতে তুলে দিচ্ছে।

বেলুনগুলো মুখ বাড়িয়ে দিয়েছে বাইরে। বাতাসে এদিক সেদিক দুলছে। খুব চেষ্টা করছে ওপরে উড়ে যেতে। তবে ওদের সুতোর লেজটি বাঁধা আছে নান্নু মিয়ার হাতের কাছেই। নান্নু মিয়া মুচকি হাসে। মনে মনে বলে, রঙ্গিলা ফড়িং তুমি বান্ধা পড়ছো ল্যাঞ্জার বান্ধনে! ছোটবেলায় ফড়িং ধরে লেজে সুতো বেঁধে পাটখড়ির আগায় বা আঙুলের ডগায় বেঁধে রাখতো সুতো। ফড়িং উড়তে চাইতো, তবে সুতোর টানে এক জায়গাতেই রয়ে যেতো।
বেলুনগুলোর অবস্থা দেখে নান্নু যেন ছোটবেলার সেই মজাটা অনুভব করে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এই খোলা মাঠটার একপাশে নান্নু মিয়া আজ পনের বছর ধরে এই দোকান চালাচ্ছে।
রমনার এই মাঠটায় নাকি আগে বৃটিশরা ঘোড়া দিয়ে রেস খেলতো। তাই নাম ছিল রমনা রেসকোর্স ময়দান।
স্বাধীনের পরে ঘোড়া দৌড়ানি খেলা সরকার বন্ধ করে দেয়। তারও বহু পরে পার্কের একপাশে এই ছোট দোকানটা বসায় নান্নু। এই দোকানই নান্নু মিয়ার প্রধান অবলম্বন। দোকান চালাতে চালাতে বড় মেয়েটার বিয়ে হলো, তার সংসার হলো। মেয়ের ঘরের নাতি আলামিনও আজ দশ বছরেরটি হয়ে উঠলো। উৎসবের দিনে নানাকে সাহায্য করতে দোকানে বসে। তবে নান্নুর বউ চামেলি নাতিকে দোকানে বসতে দিতে চায় না। মায়ের পরামর্শে জোনাকি বেগম ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। দোকানদারি করলে বাচ্চা-মানুষের মন আর পড়ায় বসবে না। উড়–ম-বাইড়–ম করবে। নান্নু মিয়া তবু দেশের বিশেষ দিবসগুলোতে নাতিকে নিয়ে আসে।
বউর কথা শুনলে পুরুষ মানুষের চলে? একদিন দোকানে বসলেই দোকানদার হয়ে যাবে? দোকানদার হওয়ার জন্য দোকানদারের পোলা হওয়া লাগে না। নান্নু মিয়া কি দোকানদারের পোলা? সেতো ওই মানুষটার ছেলে।
পেটের ভেতর থেকে গুড়গুড় করে ওঠে, বেশ্যার পোলা হে তুমি!

মনকে চোখ ঠারে নান্নু। ওই বাপের পোলা নান্নু! ওই যে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে। মাথাটা পেটের কাছে নুয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে ঘাড় তুলে ফটিকের মিনারটার দিকে চোখ কুঁচকে চেয়ে আছে। ওই মানুষটা তো দোকানদারি করেনি। যুদ্ধ করেছে। মিছিল করেছে। সর্বহারা মানুষদের নদী পার করে পৌঁছে দিয়েছে নিরাপদ সীমান্তে। কত দূর দূরান্ত থেকে নাও বেয়ে, রেলে চড়ে পায়ে হেঁটে নেতার ভাষণ শুনতে এসেছে। গাঁয়ে গিয়ে সেই নেতার কথাগুলো সমবয়সীদের শুনিয়েছে।
ছাতার ডাঁটির মতো মাথা বাঁকানো লাঠিটা দিয়ে খটাস খটাস শব্দ তুলে হেঁটে দোকানের সামনে চলে এসেছেন বৃদ্ধ।
নান্নু মিয়া চেঁচিয়ে ওঠে। কী করছো বাবজান? একলা একলা কেমনে আইলা। আন্ধা মানুষ, যদি পইড়া যাইতা। ইহানে মাডি উচা নিচা ভাঙ্গাচুরা কী অবস্থা দ্যাকছো?
দুর্বল গলায় কিছু বলেন বৃদ্ধ। শুনতে পায় না নান্নু মিয়া। কী কও বাবা, শুনি না তো!
আমিও তো শুনি না? বৃদ্ধের গলায় রাগ ঝরে পড়ে।
কী শোন না!
যা শোনতে আইছি।
নান্নু মিয়া বাতাসে একটু কান পাতে।
হইব নে বাবা। তুমি বস। প্লাস্টিকের চেয়ারটা তুলে এনে দোকানের আর একটু কাছে এনে স্থাপন করে। বাপকে ধরে বসায়।
আবার কাস্টমার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
কুনসুম হইব? কোনো কিছু তো হওয়ার লক্ষণ নাই! খালি মাইনসের ক্যাঞ্জাল। অ নান্নু, হেই সময়ের গাছগাছালি কি একটাও নাই? জাগাটা ঠাওর করতে পারতাসি না।
কেমনে পারবা বাবা? পঞ্চাশ বচ্ছরের বেশি সময় পার হইয়া গেছে। বাড়িত্থনে পলায়া যাওয়ার প্রায় তিন যুগ পরে আমারে দেইখা পয়লা চিনতে পারছিলা? বদলায়া গেছিলাম না? মানুষই চিনন যায় না, জাগা চিনবা কেমনে? কত পরিবর্তন অইয়া গেছে দ্যাশের সব কিছু। ঢাকা শহর ভইরা গেছে উঁচা উঁচা দালানকোঠা আর উড়াল সাপের মত বিরাট বিরাট ফেলাইওভারে, আর গাছ থাকবো! দ্যাহ না চারপাশে সব কিছু নতুন কইরা তৈরি করা হইছে! সবুর কর, দোকান বন্ধ করি। হের বাদে তোমারে স্বাধীনতা জাদুঘরে লইয়া যামুনে। মাটির তলায়। দেখবা, কত কিছু নমুনা আছে সেইখানে! অ, দ্যাখবা ক্যামনে, তুমি তো চৌখ্যেই দেহ না!
মতি মিয়া ছানি পড়া চোখ থেকে লিচুর মত ঘোলা রস মুছে মুছে চারপাশটা দেখার চেষ্টা করেছেন।
হালকা একটা সবুজ আলোর মত উঁচা লম্বা জিনিস অবশ্য ঠাওর করতে পেরেছেন। মতি মিয়ার মনে হয়েছে আসমান থেকে নেমে আসা আগুনের জিনের ডানা। ওইটাই নাকি গ্লাস টাওয়ার। স্বাধীনতা স্তম্ভ! মনের চোখে দেখেছে মতি মিয়া। তবে সেই একাত্তরের কাঁচা ঘাসে ছাওয়া মাঠ, কিছু মাঝারি আমগাছ আর দূরে দূরে শহরের কয়েকটা ভবন, হাসপাতালের বিল্ডিং, এসব দিয়ে ঘেরা মাঠটার চেহারা মনের মধ্যে খোদাই হয়ে আছে। ওটা দেখার জন্য চোখ লাগে না। চোখের পাতা খোলা বোজা যে-কোনোভাবেই দেখতে পান মতি মিয়া। পত্রিকার একটা ছবির কাটিং সযতেœ সংরক্ষণও করে রেখেছেন তিনি। যেখানে মাঠের দক্ষিণ সীমায় রমনার কালী মন্দিরের চূড়াটা দেখা যাচ্ছে। তার ফলে সেদিনের সমাবেশে তার বসার জায়গাটা নির্ধারণ করতে পারেন মতি মিয়া। লাখো মানুষের ভিড়ে একটা অস্পষ্ট কালো বিন্দু দেখিয়ে বলেন, এই যে একটা কালা বড় গোল্লা দ্যাকতাছো, মাইনসের মাতা, এই মাতাডাই আমি! আমি এইখানেই বসা আছিলাম। তহন আমার চুল আছিলো আজান মাঝির লাহান ঝাকুর তোলা ইয়া কালা বাবরিওয়ালা। জয়বাংলা স্লোগান দিয়া গলা ফাডাইয়া হালাইছিলাম। রক্ত ভাতের ডেগের লাহান উথলাইতেছিল।
কালী মন্দিরটা বলে এখনও আছে। তবে তার চূড়া আর দূর থেকে দেখা যায় না। সামনে পিছে আশেপাশে গড়ে ওঠা উঁচু উঁচু ভবন আর উদ্যানের গাছপালার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে।
নান্নু বলেছে, দোকানদারি শেষ হয়ে তাকে কালী মন্দিরটা ঘুরিয়ে আনবে। জবর সুন্দর কইরা আবার বানানো হইছে মন্দির। তবে মন্দির দেখতে যেতে হবে লুকিয়ে। এ কথা গ্রামে জানাজানি হলে বুড়ার ওপর নানারকম গজব নাজিল হবে। দেশগ্রাম এখন বদলে গেছে। সেখানে মন্দির পুজা অর্চনা এইসব চলে না।
দিন সাতেক হলো মতিমিয়া গ্রাম থেকে শহরে ছেলের বাসায় এসে উঠেছে। চোখের ছানি কাটাতে হবে।
চোখে প্রায় কিছুই দেখে না মতি মিয়া। আসমানের চন্দ্রসূর্য আলো অন্ধকার সব এক ঘোলাটে পর্দা দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দৃষ্টিশক্তির হ্রাস ঘটার পাশাপাশি শ্রবণশক্তি ক্রমশ সজাগ হয়ে উঠেছে। তাই আজ মতি মিয়া দুই কানকে তীব্র প্রখর করে বসেছিল সেই শরীর শিউরে ওঠা ভাষণটি শোনার জন্য। মতি মিয়ার বহুদিনে ইচ্ছে স্বাধীনতা চত্বরে দাঁড়িয়ে সেই ভাষণকে দুই কান ভরে শুনে বাহান্ন বছর আগের সেই দিনটিকে চোখের সামনে মূর্ত করে তুলবেন। কিন্তু এত বছরেও সেই ঘটনাটি ঘটানো সম্ভব হয়নি। জীবনটা তার লড়াই করেই কেটে গেছে।

তোবড়ানো গাল হাড্ডিসার দেহ ল্যাকপেকে দুবলা একজোড়া পায়ের মতি মিয়াকে দেখে আজ আর চেনার উপায় নেই একাত্তরে এই লোক মজিবরের মিছিলে গলা ফুলিয়ে স্লোগান দিয়েছে। বহুকাল তো লোকটাকে নান্নু ঘেন্নাই করেছে! এখন কেন যেন বুকের ভেতর থেকে বলক ওঠা ভাতের মতো একটা ধোঁয়ার ইঞ্জিন ঠেলা দিয়ে ওঠে। বাপের জন্য নান্নু মিয়ার দিলটা টলে। নান্নু সত্যি নিজের মনের এই চলনবলন দেখে সতিই বড় অবাক হয়।
বয়স হতে হতে মানুষের মনে কি মরার ভয় আসে, পরকালের ভয়ে সে কি ভালো মন্দ নিয়ে ভাবনা করতে থাকে তাই এমন হয়? না-কী?
বছরের পর বছর পেরিয়ে গেছে নান্নু মতি মিয়ার খবর নেয়নি। ভুলে যায়নি, কিন্তু ঝাল মরিচের মত চিড়চড়ে রাগ ছিল তার ওপর। একটা জাউরা পোলার টিকা লাগিয়ে দিয়েছে ওই বালের মহামানব বাপটা। মহামানবের মোখে মুতি।

বউ চামেলি বলেছে অত দেমাগ দেখাইও না। দেমাগ বইট্টা থুইয়া দিল দিয়া ওই মুক্তি মিয়ারে দেখো ভালা। তার বোকটার ভেতরে একটা দরিয়ার লাহান দিল আছিল বইলা তোমারে ডাস্টবিন থনে বোকে ত্ইুলা লইছে। তার প্রতিদান তুমি দিবা না তো দিবা না সালা, আবার তার নামে তুমি কুত্তারে এক লোকমা ভাত দেও? তোমারে তো জাহান্নামের আগুনেও ধরবো না। খোদা ব্যাটারে নতুন দোজকের চুলা বানানইতে হইবো তোমার লাহান পাপীরে পুড়ানোর জন্য। সসুর আব্বারে দেহ! মজিবরের লাহান তার বোক। পুরা দ্যাশটাই তার বোকটা।
সালা, নাইলে তুমি যাইতা হিয়াল কুত্তার প্যাটে। আমার তো সালা বাপ-হারামি মায়ের গতরে লাঙ্গলের গুতা মাইরাই কোন বেবুশ্যের কাছে গিয়া মরছে তার কোনো খোঁজ নাই! তো কী হইছে? আমি কি মিছা হইয়া গেছি?
নান্নু জানে চামেলির কথা। চামেলিকে গর্ভে রেখেই গুলবদন বেগমের টাকা আর গহনা সব কেড়ে নিয়ে পান্নু দালালের গলির পায়েলা বেগমকে নিয়ে ঘর বেঁধেছিলো। পরে লিভার সিরোসিস হয়ে সেখানেই মরে চামেলিবদনের বাপ। চামেলিও বাপের নামে নামে থুক দেয়। তবে নান্নুকে তার মাকে বেবুশ্যে বলতে দেয় না। কে জানে, নান্নু হয়তো কোনো মুক্তিযোদ্ধা মায়েরই ছেলে। হয়তো নান্নুর জননী কোনো সদ্য যুবতি বা গ্রাম্য কিশোরী কিংবা কোনো নববধূ। যাকে পাকি শয়তানের চ্যালারা ক্যাম্পে আটক রেখে নির্যাতন চালিয়েছে। স্বাধীনতার পরে হয়তো সেই নির্যাতিত মা অসহ্য যন্ত্রণা আর অসম্মানের স্মৃতিকে চোখ খুলে চেয়ে দেখতে চায়নি। ডাস্টবিনে রেখে গেছে। তার পরিবার পরিজনও লোকলজ্জার ভয়ে বাচ্চাটাকে গোপনে ডাস্টবিনে ফেলে রেখে যেতে পারে।

একাত্তরের এই যুদ্ধশিশুদের জন্মদানের পেছনে প্রতিটি মায়ের কত দুঃখ আর ত্যাগ তিতিক্ষার গল্প আছে তার কি আজও কোনো পূর্ণাঙ্গ শুমার হয়েছে না কি হয়েছে কোনো তথ্যপূর্ণ গবেষণা? এসব কথা পরবর্তী সময়ে নান্নু মিয়ার মাথায় এসেছে। নান্নু ততদিনে চামেলি আর আর নিজের ছেলেপুলে নিয়ে একজন বদলে যাওয়া মানুষ। এই নগরীতে নান্নুর মত চালচুলোহীন মানুষের জন্মপরিচয় নিয়ে পান্তাভাতের মতো কচলানোর সময় কার আছে! বরঞ্চ চামেলিবদন সিনা টান করে বলেছে আমার সসুর সাহেব মুক্তি আছিলেন। শ্যাক মজিবরের সাতই মার্চের ভাসনের সুমায় মিটিংয়ে উপস্থিত আছিলেন। ছামন থিকা তারে ভি দ্যাকছেন। হুঁ হুঁ! এটা ঠিক চামেলিই তাকে জন্মপরিচয়ের যাতনা থেকে বের করে এনে সত্যিকারের মানুষ করে তুলেছে। সেই অর্থে চামেলি নান্নু মিয়ার মা-ও বটে। চামেলিবদনের তাড়নায়ই নান্নু বহু বছর আগে ফেলে আসা পদ্মাপারের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষয়িষ্ণু গ্রামের মাঝি ছক্কা নাইয়ার ব্যাটা মতি মিয়াকে খুঁজে বের করেছিল। মতি মিয়া তখন প্রায় অন্ধ, কুঁজো বৃদ্ধ, অচল, এক আঁটি বাঁকাচোরা কুঁচকানো হাড়ের দেহ ছাড়া আর কিছুই না। ঘর নাই বাড়ি নেই। আপনজন কেউ নেই। বাজারের একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের বারন্দায় বসে ইটের চুলোয় কেটলিতে চা বানিয়ে বিক্রি করে। সঙ্গে খটখটা লাঠি বিশকুট। লাঠি বিশকুটের সঙ্গে আর একটা লাঠিও থাকে। সেটা মতি মিয়ার অন্ধের নড়ি একটা বাঁশের লাঠি। লাঠি পেতেই বসে, লাঠি তুলে ভর দিয়ে হাঁটে, কুজো পিঠের ভারটা লাঠিতেই ঠেকা দেয়। রাতের শয্যায় ছেঁড়া চাটাইয়েও মাথার নিচের উপাধান ওই লাঠিই। তবে বহুকাল বাদে কাঁচাপাকা চুলের গাট্টাগোট্টা এক প্রৌঢ় যুবক তাকে বাবা বলে ডাক দেওয়ার পর মতি মিয়া চোখের ছানিতে রাম ডলা দিয়ে ভালোভাবে দুপাঁচবার নজর করে ওই লাঠি দিয়েই লোকটার পিঠে বেশ ক ঘা দিয়ে বলে উঠেছিল, বাবজান? ক্যাডায় তর বাবজান? হগল বাবজান পদ্মায় ভাইস্যা গ্যাছে, গাঙ্গে যা। গাঙ্গে যাইয়া ডুইব্যা মর গা। বাপও পাবি পাপও ধুবি!

নান্নু লাঠির বাড়ি খাওয়ার জন্য পিঠ পেতেই রেখেছিল। জড়িয়ে ধরে রেখেছিল মতি মিয়ার মোটা হাড়ের দুটো লাঠির মতো শুকনো চামড়ামোড়া পা। তার বাবজানের পা।
একসময় মতি মিয়ার কুঁজো ঘাড় থেকে মাথাটা নেমে এসেছিল নান্নুর কাঁধে। নান্নু আর-এক হাতে জড়িয়ে ধরেছিল মতি মিয়ার সাদা ছোবড়াঢাকা মাথা। বাবার মাথা!
রোদটা চড়চড় করে চড়ে যায়। মানুষের ভিড়টাও কমে যায়। কেমন যেন চারপাশ নীরব নিঝুম। নান্নু মিয়ার হঠাৎ খেয়াল হয় বাপ-বুড়োটা চেয়ারে নেই। আন্ধা লুলা ল্যাংড়া মানুষটা গেল কোথায়? বাবজান, অ বাবজান? এই বদলে যাওয়া শহরের কিছুই চেনে না বাবজান। হারিয়ে গেলে কোথায় খুঁজবে?
আলামিন? আলামিন গেল কই? আলামিনকে বলে রেখেছিল নজর রাখতে।
আলামিন নানার দোকান থেকে একটা লাল কালির মার্কার পেন এস্তেমাল করে মহা খুশিতে বাঁ হাতে আলপনা আঁকায় ব্যস্ত ছিল। গালেও একটা আঁকাবাকা পতাকা। সে ঘাড় কাত করে একটা মধুর হাসি দিয়েছিল।

মার্চের উত্তপ্ত হাওয়ায় বাঁধানো চত্বরে গাছের পাতা ঝরে পড়ছে। মানুষের ফেলে যাওয়া পলিথিন ব্যাগ, চিপসের প্যাকেট এদিক সেদিক উড়ছে। চোঙা ড্রিংকসের প্যাকেট আর চকলেটের কাগজগুলো মতিমিয়ার দোকানেরই। বিশাল একটা আবর্জনার স্তূপ। একটা পুরোনা প্যাকিং বাকসো অবশ্য রাখা আছে। কিন্তু কে আবার দু কদম কষ্ট করে সেই বাক্সে বর্জ্য ফেলবে। সারা চত্বরে বর্জ্য উড়ছে। কাগজের পতাকাও খোলা বাতাসে আপনমনে উড়ে বেড়াচ্ছে।
একটু দূরেই একটু ছোট্ট বাওকুড়ানির ভেতরে শুকনো ময়লার সাথে একটা কাগজের পতাকা ঘুরতে ঘুরতে যেন সার্কাস দেখাচ্ছে। নান্নু মিয়া এগিয়ে গিয়ে কী মনে করে বাউকুড়ানির ভেতর থেকে কাগজের পতাকাটা তুলে নেয়। তারই দোকানের পতাকা। আজ সাতই মার্চ বলে পতাকার চেয়ে ব্যান্ডই বেশি বিক্রি হয়েছে। একদল ইশকুলের ছাত্র এসেছিল। ওদের কাছে নান্নুর আজকের আনা পতাকার গোছাটা বিক্রি হয়ে গেছে। সেই দল কখন চলে গেছে। সেই দলে একজন শিক্ষক ছিলেন। ছাত্রছাত্রীদের কাছে সাতই মার্চের ইতিহাস বলছিলেন তিনি।
ষোলোই ডিসেম্বরের ইতিহাস। ওইখানে, ওই যে গ্লাস টাওয়ার, স্বাধীনতা স্তম্ভ ওখানে পাকিস্তানবাহিনী ষোলই ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণ করেছিল। রমনা রেসকোর্স ময়দান কেমন করে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান হলো। একাত্তরের সাতই মার্চে নেতা কেথায় ভাষণ দিয়েছিলেন। মানুষের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। সেদিন দেখা গেছে শুধু মানুষের মাথা আর মাথা। নান্নু কথাগুলো শুনতে শুনতে একটু মুচকি হেসে দূরে বসে থাকা বাবজানকে দেখেছিল। বলতে ইচ্ছে করে, ওই মানুষটার মাথাও আছিল সেইদিন। বলে না।
নান্নু মিয়া বাবজানকে ফোন করে।
ফোনে মার্চের প্রথম থেকেই কল সাউন্ড হিসেবে ভাষণের একটা দীর্ঘ লাইন সেট করা হয়েছে। প্রায় দশ সেকেন্ড সেটা বাজার পরে রিং টোন বাজবে। ভাষণ বাজতে থাকে। নান্নু ফোন বন্ধ না করেই লম্বা লম্বা পা ফেলে শিখা চিরন্তনের দিকে হাঁটা দেয়। এখানেও অনেক মানুষ। তবে কি আলামিন বাবজানকে নিয়ে এখানে চলে এসেছে? নান্নুমিয়া ভিড়ের মধ্যে একটা সাদা ছোবড়াঢাকা সাদা মাথা খুঁজে বেড়ায়।

আনার বাবা টাটা কোম্পানিতে চাকরি করতেন। ও এবং ওর চার ভাই বোনের জন্ম তাই পশ্চিম বঙ্গে। এক সময় টাটার আর্থিক মন্দা শুরু হলে স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে হয় আনার বাবাকে। তখন ছেলে মেয়ে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন তিনি। আনারা তখন মোটামুটি বড় হয়েছে। দু’ভাই দু’বোনের মধ্যে আনা সবার ছোট। আনার বাবা টাকাকড়ি ভালোই কামাই করতেন। আর্থিক দিক দিয়ে স্বচ্ছলতা থাকা সত্বেও শৈশবটা তাদের সুখকর ছিলো না। ছোট বেলাতেই মা মারা যান। ভাই বোন আনার চেয়ে খুব বড় নয়। আনাকে কে সামলাবে। বাবা আবার বিয়ে করলেন মার ছোট বোনকে। বাবা ভেবেছিলেন নিজের খালা মায়ের অভাব পূরণ করতে পারবেন। সৎ মা না হয়ে একজন মমতাময়ী মা হবেন। বাস্তবে হলো তার ঠিক উল্টো। অত্যন্ত জেদী আর রুক্ষ্ম স্বভাবের খালা সব সময় কড়া শাসনে রাখতেন আনাদেরকে। একটু ছুতো পেলেই মারধর করতেন। আনার উপরেই বেশি মার পড়তো। ভয়ে কুকড়ে থাকতো চার ভাই বোন কখন যে কার উপর সৎ মার ডান্ডা পড়ে। বাবা অনেক চেষ্টা করলেন তার স্বভাব পরিবর্তন করাতে। বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে ছেলে মেয়ের দরদী করতে চাইলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। তিনি স্বামীর খেদমত করতে চান কিন্তু ছেলে মেয়ের ঝামেলা সহ্য করতে নারাজ। তার অত্যাচারের মাত্রা দিনদিন বাড়তে থাকলে বাবা নিরুপায় হয়ে একদিন তালাক দিলেন দ্বিতীয় স্ত্রীকে। নিজেই তুলে নিলেন সন্তানদের দায়িত্বভার। এজন্য তাকে কঠিন পরিশ্রম করতে হতো। ভাই বোনদের মাঝে আনা ছিলো একেবারে নিরীহ। না ছিলো তার কোনো চাহিদা, না রাগ, না জেদ। কিছুই না। তাকে যেভাবে চালানো যেতো সে চলতো। পূর্ব পাকিস্তানে আসার পর আনার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেলো। বড় ভাই উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করে বিলেতে গিয়ে পড়তে চান। বাবা তাতে অমত না করে টাকা পয়সা দিয়ে পাঠিয়ে দেন। থাকলো ছোট ভাই আর আনা। দু’জনে খুব হৃদ্যতা। হঠাৎ একদিন বাবা মারা গেলেন। সংসারটা কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেলো। বড় বোন ছোট ভাই আর আনাকে নিয়ে চিন্তায় পড়লেন। বড় বোনই একটা ছেলে দেখলেন আনার জন্য। খোঁজ খবর নিয়ে ভাই বোন মিলে তাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন।

বিয়ের পর সুখে পড়লো আনা। ভালো মানুষ তার স্বামী। রোজগার ভালো। আনাকে কিছুই চাইতে হয় না। না চাইতেই সব এনে হাজির করে। আনার প্রয়োজনটা কী করে যেনো বুঝে নেয়। আনার কাছে এটা একটা ম্যাজিকের মতো মনে হয়।

আনার চার ভাইবোন খুব সুন্দর ছিলো তবে আনা ছিলো বেশি সুন্দর। ফর্সা মুখে গোলাপী আঁচ, মাথাভর্তি কালো চুল, নাকমুখ খাড়া, সুন্দর হওয়ার জন্য যতোটা লম্বা হওয়া দরকার ঠিক ততোটাই লম্বা শরীর স্বাস্থ্যও সে রকম। আনার মেয়েরাও ঠিক তারই মতোন। পরপর চার কন্যা সন্তানের মা হলো আনা। আনার সংসারে শ্বশুর শাশুড়ি ছিলেন না। কিন্তু একজন অবিবাহিত ভাসুর ছিলেন। তাকে পরিবারের সদস্য না বলে প্রধান বলা চলে। তিনিও রোজগারপাতি ভালো করতেন। ট্রাকের ব্যবসা ছিলো। অনেকগুলো ট্রাকের মালিক। সীমান্তে মাল আনা নেয়ার কাজে ব্যবহার হতো ট্রাকগুলো। আনার স্বামী তাকে অভিভাবক হিসেবেই দেখতেন। তিনি যেটা আদেশ করেন তা পালন করতে সব সময় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। সংসার এক রকম তার নির্দেশেই চলতো। আনার জন্য সেটা অহিতকর কিছু ছিলো না। কিন্তু অহিতকর যেটা ছিলো সেটা লজ্জায় এবং ভয়ে স্বামীকে কোনদিন বলতে পারেনি আনা। তার মনে হতো স্বামী তার বড় ভাইকে কিছুতেই অবিশ্বাস করবে না। বরঞ্চ আনাকেই সন্দেহ করবে। সেটা হলো আনার প্রতি কু-দৃষ্টি। আনা সেটাকে সহজভাবে দেখার খুব চেষ্টা করে। সে ভাবতে চায়, তার মুসল্লী ভাসুর বিয়ে করেননি বলে মেয়ে মানুষদের প্রতি কিছুটা কৌতূহলী। কী কারণে যে তিনি বিয়ে করেননি তা নিয়ে আনা কোনো কৌতূহল দেখায় না। জানতেও চায় না কারো কাছে।

আনার বাবা টাটা ছেড়ে আসার সময় টাকা পয়সা ভালোই এনেছিলেন সঙ্গে করে। বড় ছেলেকে বিদেশ যেতে তার অংশের টাকা দিলেন বড় বোনেরটা দিলেন বিয়ের সময়। আবার আনার জন্য রাখা টাকা সেও পেলো বিয়ের সময়। আর বাবার করা শহরের বাড়িটা দিলেন ছোট ছেলেকে। বাবা এভাবেই পরিষ্কার ভাগ বাটোয়ারা করে রেখে যান তার সম্পদ।

আনার বড় ভাই পড়াশুনা শেষ করে আর দেশে ফিরেন না, খবর পাওয়া যায় তিনি মেম সাহেব বিয়ে করে ওখানেই স্থায়ী হয়েছেন। সেই মেম সাহেবের নাকি অনেক টাকা পয়সা কিন্তু বয়সে নাকি আনার ভাইয়ার চেয়ে অনেক বড়। লোকজন শুনে বলে, বুড়ি বিয়ে করেছেন। ঐ দেশে বুড়িরা এ রকম সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে যুবকদের বিয়ে করে। বিয়ের পর থেকে ভাইবোনের সাথে আর যোগাযোগ রাখেন না আনার ভাইয়া। সেই বুড়ি মেম সাহেব নাকি দেশের কোনো লোক গেলে ভাইয়ার সাথে দেখা করতে দিতো না। তার ভয় ছিলো তারা যদি শিখিয়ে পড়িয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ভাইয়াকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। তাই দরজার বাইরে সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছিলো- ঘড় বহঃৎু ভড়ৎ হধঃরাব. বড় ভাইয়ের ব্যাপারটা আনার ছোট ভাইর মনে খুব এ্যাফেক্ট করে। ছোট ভাই বলতো বাবার টাকা পয়সাগুলো একেবারে জলে গেলো। মানুষ না হয়ে অমানুষ হয়ে গেলো আমাদের ভাইয়া। সেই থেকে ছোট ভাই বাউন্ডুলে স্বভাবের হয়ে গেলো। পড়াশুনায় মনোযোগ নেই। কিন্তু পরোপকার করে বেড়াতো। রাজনীতি করাও শুরু করলো। এক সময় পড়াশুনা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে ছোটো খাটো একটা চাকটি নিলো। ট্রেড ইউনিয়নের নেতাও হলো।

আনার ছোট ভাইকে আর ঘর সংসারী করা গেলো না। এসবে বিমুখ সে। আনা আর তার বোন মিলে তাকে বন্ধনে জড়াবার জন্য অনেক করে বোঝালো। সে রাজি হয় না। ট্রেড ইউনিয়নের নেতার অনেক কাজ। সে সেই কাজ নিয়েই থাকতে চায়। কিন্তু যে কোনো ব্যাপারে আনার ডাক সে উপেক্ষা করতে পারে না। আনার স্বামী দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। এ কথা শুনামাত্র সে ছুটে যায়। গিয়ে দেখে আনার ভাসুর তার মতো করে চিকিৎসা পত্রের ব্যবস্থা করেছেন। আনার ভাসুরকে সে মিয়াসাব ডাকে। মিয়াসাবের কবিরাজি ব্যবস্থা তার মনপুত হয় না। সে আনাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসে তার শহরের বাসায়। মিয়াসাব আপত্তি তুলেন। সে শোনে না। আনাদের বাড়ি নদীর ওপারে। ওখানে চিকিৎসার সুব্যবস্থা নাই। মিয়াসাব বলেন-

কবিরাজ তো আছে।
সে বলে-
কবিরাজে এ রোগ সারবে না।
মিয়াসাব একটু আস্তে করে বলেন-
বেয়াদব …
সে না শোনার ভান করে চলে আসে।
ভালো ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা শুরু হয় আনার স্বামীর। রোগের নাম ক্যান্সার। যকৃতে ক্যান্সার। আনা হতবিহবল হয়ে পড়ে।
ভাই তাকে শান্তনা দেয়-
আমি আছি না, তোর কোনো চিন্তা নেই। সব সেরে যাবে। আনা তার সতের ভরি সোনা, স্বামীর সঞ্চিত অর্থ ভাইর হাতে তোলে দিতে চায়। ভাই বলে-এখন রাখ। দরকার লাগলে নেব। আমার কাছে যা আছে আগে তাই দিয়ে চলুক।
আনা তো জানে তার ভাইয়ের সঞ্চয় তেমন কিছু নেই। এই বাড়িটা ছাড়া। কিন্তু মনের দিক থেকে তার ভাইটা অনেক বড়।

ভাইর বাসায় এসে আনা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ভাসুরের কুদৃষ্টিটা এখানে তো তার উপর পড়বে না আর। স্বামীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে বেশ বাড়াবাড়ি শুরু করেছিলো লোকটা। ভাইয়ের কাছে ইশারা ইঙ্গিতে কিছু বলতে চায় আনা।
বারেবারে লজ্জায় তার সব তালগোল পাকিয়ে যায়। সে শুধু বলে-
তার ভাসুরের স্বভাব চরিত্র ভালো নয়।
ভাই যেনো অশুভ কিছুর আভাস পেয়ে সচকিত হয়ে উঠে। বারবার বলে-
তোকে কোনো অপমান করেছে?
আনা ইতস্তত করে, বলে-
না করেনি, তবে …
তবে কী? কিছু করলে জানে রাখবো না মিয়াসাবকে। খুলে বল।
আনা শুধু বলে-
আমার ভয় করে।
কিসের ভয় ! আমি তোর পাশে। সব সময় আছি। তুই নির্ভয়ে থাক এখানে। ওখানে আর ফিরে যাওয়ার দরকার নেই।

এমন এক সময় যুদ্ধ বাঁধে। স্বাধীনতার যুদ্ধ। আনার ভাসুরেরই যেনো সুযোগ করে দিলো যুদ্ধ। তার ভাইটাকে জানে মারার সুযোগ। শুরুতেই আমার ভাইকে ধরতে মিলিটারি ঢুকলো তাদের ঘরে। দরজায় কড়া নাড়লো মধ্য রাতে। আনার মন বললো- ‘মিলিটারি এসেছে। এতো রাতে আর কেউ আসার নেই। চারদিকে ধরপাকড়, ভাই ট্রেড ইউনিয়নের নেতা। ভাইকে ধরানোর পেছনে তার ভাসুরেরই হাত থাকবে’। আনা দরজা খোলার আগে ভাইকে সাবধান করতে যায়। দেখে ভাই ঘরে নাই। ছাদের কার্নিশ দিয়েই বোধহয় নেমে পেছনের জঙ্গলে আত্মগোপন করেছে। আনার বুক থেকে একটা ভারী বোঝা নামে।

মিলিটারি দরজায় লাথি মারছে। সে মাথায় কাপড় তোলে। প্রায় পুরো মুখটাই ঢেকে দরজা খোলে। একজন সৈন্য জানতে চায়-
দৌলা কোন হ্যায়?
আনা আস্তে বলে-
বাড়িতে নেই।
বন্দুকের বাট দিয়ে আনার মুখের কাপড় সরায় একজন। আরেকজন বলে-খুবসুরত আওরত হ্যায়।
আনা চোখ নামিয়ে খতমে ইউনুস পড়তে থাকে। ততক্ষণে তার চার মেয়ের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। তারা মিলিটারি, বন্দুক ঘরের ভেতরে এগুলো দেখে কাঁদতে শুরু করেছে। আনার মুখের সামনে বন্দুক ধরে রেখে একই ব্যক্তি এবার বলে-সাচ বাত।
আনার সামনে আজরাইল। ভয় পেয়ে লাভ কী? সে আবার বলে-
ভাই ঘরে নাই।

বন্দুক সরিয়ে নেয় সৈন্যটা। বাড়িটা তন্ন তন্ন করে খোঁজে দেখে। স্টিলের আলমারির চাবি টেবিলের উপরেই ফেলে রেখেছিলো আনা। আলমিরা খুলে খুশি হয়ে উঠে মিলিটারিরা। আনার সতের ভরি স্বর্ণ আর টাকা পয়সা কিছুই রাখে না। সব তুলে নেয়। নিজেদের মধ্যে স্ফূর্তি করে কী সব বলাবলি করে। আনার স্বামী বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন সব দেখে। হঠাৎ গোঙানি শোনা যায়। মুখটা এক পাশে বাঁকা হয়ে যায়। ‘হার্টফেল’ বলে উঠে একজন সৈন্য। ঠিক যেনো মজা করার মতো। কী মনে করে একে একে বেরিয়ে যায় তারা।

আনা ছুটে গিয়ে স্বামীর মাথায় হাত দেয়। নাম ধরে ডাকতে থাকে। কোনো সাড়া নেই। পায়ে হাত দেয়। ঠান্ডা হতে শুরু করেছে পা। মৃত্যুর শীতল ছোঁয়া এখন তার স্বামীর নিথর দেহে। দুঃসময়ে ছেড়ে গেলো তাকে। সে কাছে থেকেও কলমা শুনাতে পারলো না। মাফ নিতে পারলো না স্বামীর কাছ থেকে। কী হতভাগ্য আনা। একটু আলোর মুখ দেখেছিলো। আবার আঁধার নেমে এলো তার জীবনে। সবদিকে নিঃস্ব হয়ে গেলো সে। স্বর্ণ, অর্থ গেলো, স্বামী গেলেন।
আর ভাই-ভাইটা বেঁচে থাকতে পারবে কিনা পাঞ্জাবি সৈন্যদের হাত থেকে সে জানে না। স্বামীর লাশের পাশে বসে আনা কাঁদছে। তার সন্তানেরা কাঁদছে। আর ঠিক তখনই পরম শুভাকাক্সক্ষী হয়ে তার ভাসুর ঢুকলেন ঘরে। কে তাকে খবর দিলো। এতো রাতে তিনি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। এবার আনা পুরোপুরি বিশ্বাস করলো তার মুসলিম লীগার ভাসুরই মিলিটারি ঢুকিয়েছিলো তাদের ঘরে। তার ভাইকে শেষ করতে। বুঝলেও তার আর করার কিছুই নেই।

কিছুক্ষণ ভাইয়ের লাশ ছুঁয়ে মায়াকান্না কাঁদলেন ভাসুর। আনার ভাইয়ের নাম ধরে গালাগালি করলেন। তার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য তাকেই দায়ী করলেন। আনার মেয়েদের মাথায় হাত দিয়ে শপথ করলেন, এদের ভালোর জন্য যা যা করার দরকার সব করবেন। লাশ দাফন হলো গ্রামের বাড়ীতে। আনাও সাদা থান পড়লো। লাশের সাথেই আনাদের চলে আসতে হলো তার ভাইয়ের বাসা ছেড়ে। ভাসুর রসিয়ে রসিয়ে বললেন-তোমার ভাই ভেজাল মানুষ। দেশের শত্রু। ছোড়া জয়বাংলা বলে পাকিস্তানকে ডুবাতে চায়। মিলিটারিরা একবার তাকে ধরতে পারেনি। ভেবো না ছেড়ে দেবে। আমার ভাস্তিদেরকে নিয়ে ওখানে থাকা আর নিরাপদ নয় তোমার। আনা যেনো একটা শুকনো লেবুর খোসা। নিজের কোনো মতামত জানায় না। দিন দুনিয়ার মালিক যিনি তিনিই তো তার ডানা ছেটে দিয়েছেন। তার আর মুক্তির উপায় নেই। সে বুঝতে পারছে। মনে মনে শুধু ভাইটার জন্য প্রার্থনা করে সে যেনো ভালো থাকে, বেঁচে থাকে। যুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত করতে পারে। যুদ্ধ চলছে। মুক্তিসেনা ধরা পড়েছে। শুনলে আনার ভাসুর দাঁত বের করে হাসে। বলে-

যাই দেখে আসি তোমার ভাই ধরা পড়লো কিনা। বেয়াদব ছোড়াটাকে কিছু উত্তম মাধ্যম দিয়ে আসি। আমি এখন শান্তি কমিটির সভাপতি। ছোড়া কোনো সাহায্য চাইলে করতে পারি। তোমার খবরটাও জানিয়ে আসবো, তুমি যে এখন আমার পিঞ্জিরার পাখি।
আনার কোনো ভাবান্তর হয় না। ভেতরটা ছ্যাত করে উঠে। শুধু তার ভাই নয়। সকল মুক্তিযোদ্ধার জন্য দোয়া করে সে। জমির মিয়া একদিন নতুন শাড়ি কিনে আনে আনার জন্য। তাকে ডেকে বলে-
এভাবে আর তোমাকে দেখতে পারছি না। চল নিকাটা সেরে নেই।
আনা চুপসে যায়।
আমি আপনাকে বড় ভাই জানি। আমি আপনার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী।

হুঁ ! জানতে, আমিও জানতাম। কিন্তু এখন আর জানার কাজ নাই। তুমি আমার ময়না পাখি। তোমাকে খাঁচায় নিয়ে নাচাবো, খুদ কুড়ে খাওয়াবো।
আনা কেঁদে ফেলে−
আমি বিধবা। আমাকে পাপিষ্ঠা করবেন না। আমার স্বামীর স্মৃতিটুকু নিয়ে বাঁচতে দেন। আমার মেয়েদেরকে বুকে নিয়ে বাঁচতে দেন। আনার ভাসুর জমির মিয়া পান খাওয়া দাঁত বের করে হাসে। শয়তান কখনো ভালো কথায় বশ হয় না। আনা মনে মনে বলে-

মালিক তুমি কাফেরকে এতো শক্তি দিয়েছো।
মাঝরাতে আনার ঘরের দরজায় নাড়া দেয় তার ভাসুর। আনা ভয়ে গুটিয়ে থাকে। দরজা খোলে না। পরদিন সকালে আনাকে শাসিয়ে বলে-
চার মেয়ে সহ তোমাকে মিলিটারির হাতে তুলে দিবো। তোমার ঐ ফুলের শরীর ছিঁড়েকুড়ে শেষ করবে একপাল শকুন। সাথে সাথে ঐ বাচ্চা মেয়েদেরকেও। ভালোয় ভালোয় যদি রাজি না হও …

আনার সামনে বাঁচার কোনো পথই খোলা নেই। বড় বোনেরও একটা খোঁজ পায় না সে। কোথায় কোথায় যে পালিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। কতদিনে যে যুদ্ধ শেষ হবে। দেশ স্বাধীন হবে তো! আনার ভাই আসবে তো তাকে বাঁচাতে। আরো শত শত মুক্তিযোদ্ধা আসবে। ঐ শয়তানটার দাঁত ভাঙ্গবে। আনা অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু জমির মিয়া আর অপেক্ষা করতে পারে না। সে দিনদুপুরে আনার শ্লীলতাহানি ঘটায়। আনা বাধা দেয়ার নিষ্ফল চেষ্টা করে। বিধবার শ্লীলতাহানি। খোদার আরশ কি কেঁপে উঠেনি। লজ্জায় ঘৃণায় আনার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। তার সামনে একটাই রাস্তা খোলা আছে। এই অপমানের গ্লানি থেকে সে মুক্তি পেতে পারে আত্মহত্যা করে। কিন্তু তার সন্তানেরা ! তাদের কী হবে ! তারা কী নিয়ে বাঁচবে? কোন পরিচয়ে, আত্মঘাতি মা’র পরিচয়ে !

আনা মরতে পারে না তার নিষ্পাপ শিশুদের কথা ভেবে। বারে বারে গোসল করে সে। তার শরীর যেনো তাতেও পাপমুক্ত হয় না। এর মাঝে নয় মাসের যুদ্ধও শেষ হয়ে আসে। গাঁয়ে মুক্তি ঢুকেছে। জয়বাংলা বলে দলে দলে ঢুকছে তারা। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে। দৌড়ে পালাতে চাচ্ছে শান্তি কমিটির লোকজন। রাজাকার আলবদরেরা।

পালাচ্ছিলো জমির মিয়া। গাঁয়ের লোকজন তাকে পিছু ধাওয়া করে ধরে ফেলে আর পিটিয়ে মারে। সে খবর শুনে আনার বুকের উপর থেকে জগদ্দল পাথর নেমে যায়। কিন্তু আনা তার শরীরকে আর পাপমুক্ত ভাবতে পারে না। আনার ছোট ভাই এসেছে। বড় বোন ফিরেছেন। ছোট ভাই বারেবারে জানতে চেয়েছে-
ওই শয়তান তোর কোনো অমর্যাদা করেছিলো।
আনা শুধু চোখের জলে ভেসেছে। ছোট ভাই কী বুঝেছে কে জানে।
বলেছে-

তোর কিছু হয়নি। তুই ঠিক আছিস। এই স্বাধীনতার জন্য শত শত মা-বোনের ইজ্জত গেছে। তাই বলে তারা অপবিত্র হয়ে গেছে? তোর চোখে আর জল দেখতে চাই না আমি। আনা তবুও বারে বারে গোসল করে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে সময়ে অসময়ে গোসল করে আনা। এটা তার রোগ হয়ে গেছে। ছোট ভাই বলে-
চল তোকে ডাক্তার দেখাই। তুমি মানসিক রোগী হয়ে গেছিস।

আনা বলে- না, আমি ভালো আছি। একটা সাপ আমাকে কামড় দিয়েছিলো। ঐ বিষটা কোনোদিন সারবে না। অষুধ পত্রে কাজ হয় না এ বিষের। ছোট ভাই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয় বড় মূল্যবান একটা কিছু হারিয়ে ফেলেছে তার বোন। আর বুঝি এটা ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

আনার মেয়েরা বড় হয়েছে মামার আদর ভালোবাসা পেয়ে। বিয়ে হয়েছে। সংসার করছে। ভালো আছে তারা সবাই। আনার এখন অনেক বয়েস। চলে যাওয়ার সময়। ভাই বোন দু’জনই চলে গেছে। নাতি পুতির মাঝে আনার সময় কেটে যায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের কথা সে কখনো বিস্মৃত হতে পারে না। যখনই বেশি করে মনে পড়ে সেই বিদগ্ধ স্মৃতির কথা সে গোসল করে আসে। ওই অপরিচ্ছন্ন লোকটার ময়লা যেনো তার শরীরে লেগেই আছে। কিছুতেই যেতে চায় না। ও যে রাজাকার। ওর মতো ঘৃণিত স্বাধীন বাংলাদেশে আর কেই হতে পারে না।

আবুল হোসেন বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল, শোন, পুঁটিমাছগুলো আজকেই শেষ করে ফেল না, কালকেও যেন চলে। আর ঘনডাল আমি খেতে পারি না, কত বলব!
তা বটে বাজারে মাছের দাম অনেক। আটআনায় কেনা এক ভাগা পুঁটিমাছ একদিনেই খেয়ে ফেলা কাজের কথা নয়। মমতাজের মা’কে ডেকে বলে দিলাম অর্ধেক মাছ জ্বাল দিয়ে রেখো কালকের জন্য। জ্বাল দেয়ার সময় একটু তেল দিও কিন্তু। আর ডাল পাতলা হবে আরো।

আমার সেলাইর ক্লাস খোলা থাকলে মাঝে মাঝে লুকিয়ে আধা সের মুসুর ডাল এনে রেখে দেই কৌটায়, এ অঞ্চল তার নিবিড় তদারকির বাইরে। এ পয়সা আমার রিকশা ভাড়া বাঁচানো, সে-ই বেরুনোর মুখে গুনে গুনে আট আনা দিত। নীলক্ষেত থেকে আজিমপুর লেডিস ক্লাব চার আনা করে আট আনা, কি আর এমন রাস্তা! এইটুকু হাঁটলে চার আনা বেঁচে যায়। এখন তো এ সব হওয়ার জো নাই− অবরুদ্ধ সব, সবাই। মানে বাইরে আর যাওয়া নাই।

মিনিট পনের পরেই দরোজায় কড়ার শব্দ; মৃদু, মোলায়েম। এই শব্দ নতুন, কয়েকদিন ধরে শুনি। আমিই দরোজা খুলি। তপন সাহেব, চাবিটা হাতে দিয়ে মৃদু হাসেন, ধীর পায়ে চলে যান। আবার বিকালের মরা আলোয় এসে কড়া নাড়লে চেষ্টা করি আমিই খুলে দিতে, ছিটেফোঁটা আলো কোথাও কোথাও ঝিলমিল করে ওঠে কি! আমি ঠিক জানি না। মাঝে মাঝে হেরফের হয় অবিশ্যি, একটু অবষাদ একটু বিরক্ত।

বিকালে বেশিরভাগ সময় আবুল হোসেন বাগানে পানি দিতে যায় পাইপ দিয়ে। পাইপে পানি দেয়া, বেশ সময় লাগে তিনতলা থেকে পাইপ নামিয়ে গাছে পানি দিতে। ফেরার সময় কতকগুলো ডাটা, ঢেঁড়শ আর পেঁপেঁ তুলে আনে পাঁজাকোলে; একই জিনিস রোজ রোজ! হ্যাঁ কখনও কখনও এক থোকা রোদ লাগা মেহেদি ফুল থাকে আবুল হোসেনের হাতে, যা কিনা একবোঝা পাইপের চাপে কুঁ কুঁ করে বটে! রাতে কোনাভাঙা গ্লাসের পানিতে ডুবে মাদকতা ছড়ায়ে তাকে প্রেমময় করে তোলে। কিন্তু আমার উদ্বেগ এই কামসর্বস্ব প্রেমকে গ্রাহ্য করতে পারে না। এখন একই মানসিক উদ্বেগ রোজ রোজ প্রতিক্ষণ আমাদের সবারই তো হওয়ার কথা!

বেশির ভাগ সকালে আমার উলের মেশিনটা সামনে নিয়ে অপেক্ষা চলে মোলায়েম মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ শোনার, মনে হবে অপেক্ষা করছি, আসলে অপেক্ষা নিজের দুশ্চিন্তার ধুকপুক, ভিতরে জ¦লে জ¦লে ওঠা অন্তর আত্মাকে ক্ষণকালের জন্য রেহাই দেয়ার অপেক্ষা। মেশিন খুলি আবুল হেসেনের জন্য, সে খুশি মনে বের হয় দৃশ্যটা চোখে গেঁথে, বউ তার আন্ডারে আছে, কাজে আছে। যাওয়ার আগে ডান্ডিকার্ডটা গলায় ঝুলাতে ঝুলাতে বলে, বেশ মালা, তাই না! বলা হয়নি, আমার দুই মেয়ে আর এক ছেলে। কলেজে পড়া বড়ো মেয়ে খুব কবিতা লেখে আজকাল, বুয়েটের একটা ছেলের সাথে তার প্রেম হয়েছে গতবছর। আর ছোট মেয়েটা নিতান্তই ছোট, ওয়ানে পড়ে, এখনো কোনো কোনো রাতে বিছানা ভিজায়, আহা ও যে খুব ছোট! আর একমাত্র ছেলে ঢাকা কলেজে প্রথমবর্ষ, এপ্রিলে না বলে চলে গেছে যুদ্ধে, খোঁজ নাই বহুদিন।

অনেক অপেক্ষা প্রতীক্ষার পর পরশু একটা চিঠি পেয়েছি ছেলের, মানিকের হাতে পাঠানো, আফসার সাহেবের ছেলে মানিক, এক সঙ্গেই গেছে ওরা। মাত্র দু’লাইন, মা, চিন্তা করো না, আমি ভালো আছি। বাঁচলে দেখা হবে, লড়াই চলছে মা। জুয়েল চিঠিটায় আমার কোনো স্বস্তি হয়নি, হাতের লেখাটা পরিচিত লাগে না। লীলা বলে, মা ভাইয়া অনেকদিন ধরে লেখে না, তাই এমন অথবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হয়ত লিখে দিয়েছে, বোঝ না কি সময়! কিন্তু আমাকে টলাতে পারে না। আমার অবিশ্বাস ওদের কষ্ট দেয় অথচ ওরাও জানে এটা ওদের ভাইয়ার হাতের লেখা নয়! আমার ছেলের হাতের লেখা আমি চিনি। যেমন সে ভালো ছাত্র তেমনি অপূর্ব তার হাতের লেখা। এ লেখা তার নয়, হতে পারে না।

আমার উলবোনার মেশিন এখন প্রায় অলস। গত বছরের কিছু কাজ পড়েছিল সেগুলোই একটু একটু করে করি, আবার ফেলে রাখি। কখনো নতুন নতুন ডিজাইন বানাই, অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি, আবার খুলে নতুন ডিজাইন তৈরি করি…এসব চলে। আগে নতুন ডিজাইন তৈরি করে মেয়েকে কিংবা আবুল হোসেনকে দেখাতাম, এখন দেখাতে ভালো লাগে না।

আবুল হোসেনকে আমি দোষ দেই না। ছেলের চিন্তায় অস্থির। সে সব সময় বলতে চায় ছেলেটা নাকি আমার মত স্বাধীন আর একটু ত্যাড়া। বিয়ের পর আমি রজস¦লা হয়েছি, কাপড় সেই বেঁধে নিতে শিখিয়েছে, তাহলে ত্যাড়া হওয়ার হাত থেকে সে কেনো রক্ষা করল না! সে আজও বিশ^াস করে ছেলে আমায় অন্তত বলে গেছে, ছেলের যুদ্ধে যাওয়ার পুরোটা আমার জানা।

আজকাল আমি এ সব অভিযোগ গিলে ফেলা শিখেছি, শীতল চোখে তাকিয়ে থেকে বলতে শিখেছি, কী যে বলেন! তারপর দুর্দান্ত অভিমান বুকে জমিয়ে রেখে মমতাজের মাকে শেখাই একভাগা পুঁটি ইচ্ছা করলে কতদিন খাওয়া যায় জানো! ডাল কত পাতলা রান্না করেও মজা করা যায় জিড়া রসুন ফোড়নে! আর যুদ্ধের বাজরে কম খরচ করে একটা লোককে কিছুটা স্বস্তিও দেয়া যায়! আর এভাবে নিজেকে নির্বিকার জীবনের পাঠ দিতে উঠেপড়ে লাগি। কাজ কিন্তু হয় না, মানে উলের কাজ আগায় না।

নিজেকে বোঝাই মানিকের দেয়া চিঠিটা আসলে মানিকের লেখা, চিঠি আনতে ভুলে গেছে বলে বাড়িতে এসে নিজেই লিখেছে মানিক! খারাপ কিছু হলে অন্য কিছু বলত, কিংবা দেখাই করত না!
আজকাল চাবিটা দিতে আসলে তপন সাহেব একটু বেশিই হাসে, তারপর বলে, ছেলের খবর পেলেন!
আমি সবাইকে যেমন বলি, ছেলের ঠিক খবর পাইনি, কার একটা চিঠি…। তপন সাহেবকে তা বলি না। বলি, হ্যাঁ, ছেলে ভালো আছে, পাক সেনাদের সাথে খুব লড়াই করছে। দেশ স্বাধীন হলো বলে! সে তখনো হাসিটা মুখে অমলিন রাখে, চাবিটা হাতে দিয়ে চলে যায়।

আবুল হোসেন সেদিন একটা মৃগেল মাছ এনেছে, আধা সের ওজন হবে, দরোজাটা আমিই খুলি। দেখি দুজনেই দরোজায়। তপন সাহেব চাবিটা দেব দেব করছে কিন্তু দিচ্ছে না। আবুল হোসেন ঘরে না ঢুকেই বলতে লাগল, ছোট ছোট টুকরা করবে, মানুষ তো মোটে চারজন, দু’দিন চালাবে। আমি তাকে ঘরে ঢুকাতে চাই, মানে যা বলার ঘরে ঢুকেই বলতে পারে, দরোজায় কেন! সিঁড়ির ভাঙা মাথাগুলো ধুলোয় ভরা, মাথার উপর ঝুল মরা মাকড়সা সহ ঝুলছে, সুইপার শুভরানী কতদিন আসে না!

শিববাড়িতে আর কেই-ই বা ঝুঁকি নিয়ে থাকে যে ভোর হতেই ছুটে আসবে কাজে! সাতাশে মার্চে সবাই পালিয়েছি, আমরা তিনদিন জিনজিরা থেকে ফিরে এসেছি। তপন সাহেবের উপর খুব রাগ হলো, আমাদের পারিবারিক এই সব প্রাত্যহিকতা তার শুনবার দরকার কী! চাবি দিয়েই সিঁড়িতে পা রাখুক সে! আবুল হোসেন ঘরে ঢুকে গেল মাছ ঝুলাতে ঝুলাতে আর আমি চাবির জন্য অপেক্ষা করেই রইলাম। সে চাবিটা দেয়ার সময় আজকে আর হাসি হাসি মুখ করে কিছু জানতে চাইল না।

ঘরে ঢুকে হুলুস্থুল, মাছটা ঘিরেই সব। তার আশা আকাক্সক্ষা কীভাবে আমি উপেক্ষা করতে পারি তা যেন সে বুঝতেই পারে না! যুদ্ধের বাজরেও সে দিব্যি মৃগেল মাছ কিনে এনেছে, সে কেবল আমার কথা ভেবে অথচ আমি মোটেই উৎফুল্ল নই!
মানিকের কাছ থেকে পাওয়া চিঠিটার বয়স দেড় মাস, সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকের চিঠি। ডান্ডিকার্ড বুকে ঝুলিয়ে আবুল হোসেন অফিসে চলে গেলে চিঠিটা নিয়ে বসি। জুয়েলের বাংলা খাতার সাথে হাতের লেখা মেলাই, একমাত্র ‘দেখা’ শব্দের ‘খ’টা মেলে আর কিছুই না। জুয়েলের মাত্রা খুব ঢেউ খেলানো, এখানে টানা।
অক্টোবরের শেষের দিকে একটু একটু ঠান্ডা পড়ে। আবুল হোসেন তাড়া দেয় গত বছরের কাজগুলো শেষ করতে কিন্তু আমি রোজ বসি আর নতুন নতুন ডিজাইন আবিষ্কার করি, মূল কাজের ধার দিয়েও হাঁটি না। উলের বলগুলো মাথার ভিতর জট পাকাতে থাকে, বুকের ভিতর পুত্রের জন্য হাহাকার।

একদিন তপন সাহেব এলেন সন্ধ্যার ঠিক আগে। দরোজা আমিই খুললাম। আমার পিছনে আবুল হোসেন। দেখি তপন সাহেবের হাতে একটা বড় কাতলা মাছ চারপাঁচ সের তো হবেই। আমার হাতে দিয়ে বলে, আমার বন্ধু এনেছে গ্রাম থেকে, তার বউবাচ্চা দেশে, সে খায় মেসে। তাই আমাকে দিয়েছে।

কথাটা অবাক করার মতো। বউবাচ্চা দেশে তো ঢাকায় মাছ আনবে কেনো! এত বড়ো মাছ! আমি কিছু বলার আগেই আবুল হোসেন হাস্যমুখে বলে, কি আশ্চর্য, এত বড়ো মাছ! ঠিক আছে, আজ কিন্তু আপনি এখানে রাতে খাবেন। তপন সাহেব লজ্জিত মুখ করে বলে, না না, আমায় দু’টুকরা ভাজি করে দেবেন, আমি ভাত রেধে খেয়ে নেব। আবুল হোসেন যেন লজ্জা পেল। ছিঃ ছিঃ আমরা থাকতে আপনি কেনো ভাত রান্না করে খাবেন! আমার তো রান্নার লোক আছে, মমতাজের মা সব রান্না করে দিয়ে যায়, আপনার ভাবি সেলাই টেলাই নিয়ে ব্যস্ত থাকে!
ব্যাস, হয়ে গেল। বড়ো বড়ো মাছ মুরগি আসতে লাগল। তিন বেলা খেতে আসে তপন সাহেব, আমাদের একজন এখন।

তপন সাহেব একা থাকে পাশের বাসাটায়। বাসার আসল মালিক তরফদার সাহেব যে কিনা বাসার সামনে ট্রেন্স কেটেছিল কলোনির কয়েকজনকে নিয়ে। আর সাইরেন বাজলে তিনতলা থেকে হড়মুড়িয়ে নেমে আসত গর্ভবতী বউ সমেত। কিছুদিন হলো বউবাচ্চাসহ গ্রামে চলে গেছেন চাকরির মায়া ছেড়ে! সাবলেট গ্রহীতা হিসেবে নয় আসলে বাসা পাহারাদার এখন তপন সাহেব! এই অসময়ে কর্তৃপক্ষও তেমন কিছু বলছে না, ভাবছে হয়ত যুদ্ধ থামলে ফিরবেন তরফদার সাহেব। ফিরতে পারার সম্ভবনা জিইয়ে রাখে তপন সাহেব রোজ চাবি এখানে রেখে।
আমার মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে; লোকটা সুযোগ পেলেই ছেলের খবর জানতে চায়, যেন এটা জানতে চাওয়া তার নৈতিক দায়িত্ব, না হলে তার খুব অন্যায় হয়ে যাবে। আমি তার উপস্থিতিতে ভয়ে ভয়ে থাকি, এই বুঝি জানতে চায়- ছেলের খবর ভালো!

ঢাকা শহরের ছোট ছোট প্রতিরোধ গড়ে তুলছে মুক্তিবাহিনী, সে সব খবর পাই বাইরের মানুষের কাছ থেকে, আশায় বুক বাঁধি। আবুল হোসেন কি তপন সাহেব কেনো খবর রাখে না, নাকি এ সব খবর রাখা বেআইনি!
রাত হলে এক ধরনের আরষ্টতা আমাকে কাবু করে ফেলে। আবুল হোসেন রাতবিরাত, কখনো ভোরে উপগত হতে এলে মাথায় খুন চেপে যায়, ঘৃণায় গা রি রি করে। আমি প্রায়ই চেষ্টা করি মেয়েদের ঘরে ঘুমিয়ে পড়তে কিন্তু অর্ধেক রাতে আবুল হোসেন ধরেবেঁধে নিয়ে আসে – মেয়েরা কী একটু শান্তিমত ঘুমাবে না!

মানিকের বাসায় যেতে যেতে ওদের বিরক্ত করে ফেলেছি, কিংবা কি জানি হয়ত বিরক্ত হয়নি। বাউন্ডারির ভিতর দিয়ে পাঁচসাত মিনিটের পথ, নীলক্ষেত এপাড়া ওপাড়া!
বলা ভালো তপন সাহেব এখন নিয়মিত বাজার করে দেয়, আবুল হোসেন বেজায় খুশি কিন্তু সুযোগ পেলেই কেমন যেন একটা শ্লেষ দিয়ে আমায় কী বোঝাতে চায়। আমি বোঝার মতো অবস্থায় সব সময় থাকি না, কিংবা বুঝেও না বোঝার ভান করি, তপন সাহেবের খাওয়ার সুবাদে বেশ দু’বেলা ভালোমন্দ চলছে, তাতে আমার স্বস্তিই বলা চলা।
কিন্তু তপন সাহেবর প্রতি আমার ভালো লাগাটা একটা নিদারুণ প্রহসনে রুপ নেয়! কেমন একটা ভয় তাড়িয়ে বেড়ায়।
ভয়টা আমার ছেলে সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে। আমি তার মধ্যে আবিষ্কার করি সে আমার ছেলের যুদ্ধে যাওয়াটা পছন্দ করছে না।

সোজাসুজি নয়, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে। আবুল হোসেনের সাথে প্রায়ই সঙ্গত দেয় – তাই তো আবুল হোসেন সাহেব, জুয়েলের মত ছেলে, জুয়েল সে, তাকে কেনো যুদ্ধে যেতে হবে, ওর মতো ছেলের দরকার আছে না দেশের, দেশ গঠনে! চাষাভুষারা যাক, কী মূল্য আছে তাদের জীবনের! আবুল হোসেন গাড়লের মত সায় দেয় বড় মাছের মুড়োয় কবজি ডুবিয়ে খেতে খেতে, কুৎসিত দৃশ্য!

এখন প্রতি রাতে লড়াই চলে, ধর্ষকের ভূমিকায় চলে যেতে চায় সে কিন্তু আমার চিৎকারে নিরস্ত্র হয়, প্রতিরাতে একই ঘটনা।
বড় মেয়ে কী টের পায় জানি না। একদিন বলেই ফেলে, রাতবিরাতে চেঁচাও কেনো মা!
তারপর একদিন আবুল হোসেন বলেই ফেলে, তুমি তপন সাহেবের প্রেমে মজে আছ, আমাকে আর চাই না তাই তো!

রাতের পর রাত একই কথা। আমি বলি তাকে বলেন আর এ বাসায় না আসতে। তাতেও সে রাজি নয়, নোলা ডুবিয়ে খেয়ে খেয়ে নাকি আমারই খুব লোভ হয়েছে, অথচ সে তাকে যেতে বলতে পারবে না। আমি বলি কাল তবে আমিই বলব। আবুল হোসেন ধমকায়, খবরদার এ কথা বললে খারাপ হবে!
তপন আমার ছেলের শত্রু, তাকে আমি ভাত বেড়ে খাওয়াই। এই যন্ত্রণা কাউকে বোঝাতে পারি না। বড় মেয়ে তো প্রথম থেকেই বিরক্ত, নাম দিয়েছে রাজাকার। বাবার লোভের কথা সে জানে, কখনো মুখোমুখি হয় না তপন সাহেবের।

তারপর নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আফসার সাহেব আসেন। কী যেন বলেন আবুল হোসেনকে, কিছুই বুঝি না; বোঝার ক্ষমতা আমার লুপ্ত হয়েছে। একটা কথা কানের কাছে বাজতে থাকে, মানিক বলে গেছে স্বাধীনতা না নিয়ে ফিরবে না।
আর তপন সাহেব হারিয়ে গেছে। মানে সে বাসা ছেড়ে চলে গেছে অথবা পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে। তপন মাহমুদের ভূয়া ডান্ডিকার্ড কোনো কাজে লাগেনি, কেউ জানিয়ে দিয়েছে আসলে সে তপন সাহা, মালাউন। যুদ্ধকালিন এ পাড়ায় সাবলেট নিয়ে চাকরিটা চালিয়ে যেতে চেয়েছিল, বেচারা। আমার মনে পড়ে সে আমার মোকসেদুল মোমেনীন বইটা চেয়ে নিয়েছিল।

কলেমা বল, নামাজ কয় ওয়াক্ত, অজুর ফরজ কয়টা… তারপর প্যান্ট খুলে সারা মাঠ দৌড় করিয়ে এনে প্রভোস্টের বাড়ির পিছনে ডোবাটার ধারে শুধু একটা শব্দ, ব্যাস! এ গল্প করিম করেছে, বিহারি করিম, জোড়া তেঁতুল গাছের নীচে যার দুগ্ধ খামার ছিল বিশ বছর।
আচ্ছা গুলি খাওয়ার আগে কী একবার ওর মনে হয়েছিল সত্যিটা বলে গেল না আমাদের! মোটেই সে স্বাধীনতার বিপরীত মানুষ নয়!
প্রতিদিন ছেলের হাতের লেখা মিলাই, প্রতিদিন দেখি কত মিল ‘দেখা’ শব্দের ‘খ’ এর সাথে, নভেম্বর মাসটা সারাজীবন ধরে চলতে থাকে, বছরের পর বছর যুগের পর যুগ। অর্ধশতাব্দী!
মানিকের কথা না বললে চলে না, সেও স্বাধীনতা হাতে নিয়ে ফিরেনি, মানসিক ভারসাম্য হারাতে বসা মানিকের মা সেতারা বেগম আর বাবা আফসার সাহেবের হাতে নাটক সিনেমার ম্যানাসক্রিপ্ট, নাটক সিনেমায় তাঁদের দেখি, অভিনয়ে বেঁচে আছি আমরা!

পঞ্চম শ্রেণি পাস হারুন মিয়া কোনো অলৌকিক শক্তির মহিমায় ভাটকবিতা লিখতে শুরু করেনি। তবে অলৌকিক শক্তি ছাড়া হঠাৎ করে ভাটকবিতা লেখায় সিদ্ধহস্ত হওয়া যে সম্ভব নয় তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। এই জনপদে আব্দুল হালিমের ভাটকবিতার ভক্ত হারুন প্রায় সময়ই মনে মনে গুনগুন করত আর পদ্য আওড়াত। এভাবে ভাটকবিতার প্রতি তার ঝোঁক তৈরি হলেও কোনো দিন লিখবে বা তার পক্ষে লেখা সম্ভব এই চিন্তা তার মাথায় কখনো আসেওনি। ছিষট্টি সালে ছয় দফার দাবি নিয়ে হিজলতলীর মাঠে হাজার হাজার মানুষের সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানের (তখন তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি পাননি) ভাষণ যেদিন শুনেছিল সেদিনই, সেই মাঠেই দাঁড়িয়ে এক অলৌকিক শক্তি যেন তার মনে ভর করেছিল এবং সেখান থেকেই গুনগুন করে সে কবিতার কয়েকটা লাইন আওড়াতে শুরু করে।

প্রথমে বন্দনা করি আল্লাহ নবীর নামে
তারপরেতে বন্দনা করি পির আউলিয়ার নামে
উত্তরেতে বন্দনা করি হিমালয় পর্বতের
দক্ষিণেতে বন্দনা করি বঙ্গোপসাগরে…
বাঁচার লড়াই (২) করতে বলল নেতা মুজিবুর
ছয় দফাতেই দুখী বাংলার শত্রু হইবে দূর॥

শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শেষ হওয়ার আগেই এক রহস্যময় অজানা উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে ছুটকো দৌড়ে বেপরোয়ভাবে ছুটতে ছুটতে জালতির বাজার থেকে একটি টিপ কলম, একটি রোলটানা খাতা আর এক প্যাকেট রমনা সিগারেট কিনে সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরেই বাড়ি গিয়ে পৌঁছে। হারুন বিয়ে-থা করেনি, বাবা গত হারুনের বয়স যখন চার বছর। সংসারে মা ছাড়া হারুনের আর আপন বলতে আর কেউ নেই। সামান্য চাষের জমি থেকে বছরের খোরাক কোনো মতে হয়। আর বাউন্ডেলে প্রকৃতির হারুন গানবাজনা আর পালাগানের দলের পার্ট করেই বেশির ভাগ সময় কাটায়। আজ হঠাৎ করেই তার মনে ভাবের উদয় হয় এবং নিজের ঘরে কুপি জ্বালিয়ে “ছয় দফা: আমাদের বাঁচার দাবি” নামে একটি ভাটকবিতার খসড়া কাঠামো দাঁড়িয়ে করে ফেলে। রাত যখন দশটা বাজে তখন হারুনের মা চেঁচিয়ে হারুনকে ডাকে, ওরে হারুইন্যা, রাইত শ্যাষ অইলে ভাত খাইবি? কেরাচি তেল ফুইর‌্যা অত রাইতে কিতা করোস? তাতাড়ি খাইতে আয়। আমি অহন ঘুমাইবাম।
ভাত বাড়ো। আমি আইতাছি।
কুপিটা নিভিয়ে কোটাঘর থেকে হারুন রুশিঘরে যায় ভাত খেতে। আজকের খাওয়ার আয়োজন বেশ ভালো থাকলেও হারুনের মনের অস্থিরতার জন্য খাওয়ায় মনোযোগ নেই, অতি দ্রুত খেতে শুরু করলে হারুনের মা জিজ্ঞেস করে, তর কী অইছে? অত তাতাড়ি করতাছোস ক্যারে?
একটা কাম করতাছি মা। তুমি বুঝবা না?
তুমি বুঝবা না? আমি তো তর ফেডেত্তো অইছি? ক্যামনে বুঝবাম? গান বানতাছস?
না। কবিতা বানতাছি।
কবিতা। এইডা কী জিনিস রে বাপ?
গানের মতোই।
আমারে একবার হুনাইবি?
আগে লেইক্যা শ্যাষ করি। ফরে হুনাইবাম।

খুব দ্রুত খাবার শেষ করে হারুন মিয়া আবার কোটাঘরে ঢুকে একটা সিগারেট জ¦ালিয়ে আবার লিখতে বসে। সে ভাবে, এত জোস কীভাবে এল? সারা রাত লিখে ভাটকবিতাটি শেষ করে। চারদিকে ভোরের আলো ফুটলে হারুন কোটাঘর থেকে বের হয়ে দেখে মা সকালের নাশতা তৈরি করছে। রাতের ঘোর কাটানোর জন্য সে বাড়ি থেকে বের হয়ে পুকুরপারে কতক্ষণ ঘোরাঘুরি করে আবার ফিরে আসে।
পান্তার সঙ্গে শুঁটকির ভর্তা দিয়ে মা-ছেলে সকালের নাশতা করে। খাওয়ার পর মুখে এক খিলি পান গুঁজে দিয়ে মা বারান্দায় বসলে হারুন পাশে বসে বলে, মা কবিতা হুনবা না?
ক’ হুনি।

সুরেলা কণ্ঠে হারুন ভাটকবিতায় সুর করে পড়তে থাকে। পাড়াতুত বোন লতিফা কলস নিয়ে পানি আনতে যাচ্ছিল পাশের বাড়ির টিউবওয়েল থেকে; হারুনের কণ্ঠ শুনে সে হারুনদের বাড়িতে ঢুকে পাশে দাঁড়িয়ে মগ্ন হয়ে শুনে। ভাটকবিতা আগে অনেকবার শুনেছে যেখানে প্রেমকাহিনি থাকত, রাজার কাহিনি থাকত কিন্তু এই কবিতায় শেখ সাব আর ছয় দফার কথা। হারুনের মা ও লতিফার মাথায় কিছুই ঢুকেনি। শুধু মধুর কণ্ঠটাই মা ও লতিফাকে আকৃষ্ট করে রেখেছে। তারা দুজনই মোহাচ্ছন্নের মতো শোনে। হারুনের সুরে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে যে, মনে হয় আজ লতিফা হারুনকে নতুন করে দেখেছে। এমন সুরেলা কণ্ঠ আবার কবি মানুষ দুটি মিলিয়ে সে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। হারুনের মা বলল, খুব সোন্দর অইছে রে ফুত। লতিফাও অস্ফুট উচ্চারণে বলল, খুব সোন্দর অইছো গো হারুন ভাই। এমন সোন্দর কবিতা জীবনেও হুনি নাই। লতিফার প্রশংসা শুনে হারুন হাসে এবং মনে মনের মতোই কবিতটি নির্মাণ করতে পেরেছে। লতিফা আর বিলম্ব না করে আস্তে আস্তে পানি আনার জন্য পাশের বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

লতিফা চলে গেলে হারুন বলল, মা, এক মণ ধান দ্যাও।
এক মণ ধান দিয়া কী করবি?
কবিতটা ছাপাইয়া বাজারে বেচবাম।
হ, তোরে এক মণ ধান দিয়া আমরা উবাস থাকতাম! এক ছটাক ধানও দিতাম না। কবিতা মাইনসে না কিনলে কি
করবি?
হারুণ মাকে বুঝাতে ব্যর্থ হয়ে অভিমান ও রাগ দেখিয়ে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে পুকুর পারে কদম গাছের নিচে বিষণ্ন মনে বসে ভাবছে কোথায় টাকা পাবে। এই কবিতা ছাপাতে না পারলে জীবনই বরবাদ হয়ে যাবে। দেশের বড়ো ক্ষতি হয়ে যাবে।

পানি নিয়ে নিজের বাড়ি ফেরার সময় যাতে লতিফার সঙ্গে দেখা হয় সেজন্য হারুনের মা দেউড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। লতিফা কলসি নিয়ে কাছে আসতেই ইশারায় ডেকে বাড়ির উঠোনের কোণে জাম্বুরা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে বলল, তুমি একটা কাম কইরা দ্যাও মা।
লতিফা জানতে চাইল, কী কাম চাচি?
হারুনের মা লতিফাকে বুঝিয়ে বলল, তোমার কলসটা নামায়া লও। আলাফের জুইত পাইতাছি না। লতিফা কাঁখের কলসি মাটিতে নামিয়ে রেখে হারুনের মায়ের দিকে গভীর আগ্রহে তাকিয়ে বলে, কন চাচি কী করন লাগব?

হারুনের মা লতিফার হাতে চারটি পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বলে, অ্যাই ট্যাহাডা হারুনরে দিয়া কইবা কবিতা ছাপানোর লাইগ্যা তুমি কুড়ি ট্যাহা করজা দিছ। ফরে কবিতা বেইচ্যা যেন তোমার ট্যাহা শোধ করে দ্যায়। জেরে বাদে তুমি আমারে ট্যাহা ফিরত দিও। কথাডা কি বুঝছো মা? হে যেন বুঝতে না পারে যে আমি তোমারে ট্যাহা দিছি। কায়দাকৌশল কইর‌্যা কইব। কথাডা কি বুঝছো মা?
জি চাচি, বুঝছি। আমি ঠিকই কায়দাকৌশল কইরা কইয়াম।
লতিফার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে এবং হারুনের মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আঁচলে গিঁট দিয়ে বেঁধে বাড়ির অভিমুখে রওনা হয়। পানির কলসি বাড়িতে রেখে হারুনেদের কদমগাছের তলায় ওকে মনমরা বসে থাকতে দেখে লতিফা জিজ্ঞেস করে, মন খারাপ কইরা বইস্যা আছো ক্যান?
লতিফার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হয়নি তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে পরে লতিফার দিকে ফিরে তাকিয়ে চাঁদের মতো সুন্দর মুখখানি দেখে হারুনের মন বিগলতি হয় এবং বলে, মায়েরে কইলাম এক মণ ধান দিতো কবিতা ছাপানোর লাইগ্যা। মা না করছে। অহন কী করি ক’ছে হুনি?
কয় ট্যাহা লাগব?
আমি তো আর কবিতা কোনো দিন ছাপাইনা। ঠিক কইরা ক্যামনে কই?
একটা অনুমান কইরা কও।
দশ পনর ট্যাহা তো লাগবই। এর কম কী ছাপানো যাইবো? বেশিও লাগতে পারে।
আমি তোমার ট্যাহা কর্জা দিলে তুমি নিবা?
হারুনের মুখেও হাসি ফুটে এবং লতিফার দিকে তাকিয়ে বলে, তুই ট্যাহা কর্জা দিবি?
হ। দিমু।
তালি দ্যায়। আমি কবিতা বেইচ্যা তোর ট্যাহা শোধ কইরা দিমুনে।
যদি কবিতা মাইনষে না কিনে তালি ক্যামনে দিবা?
তালি ধান কাডার ফরেই দ্যাওন লাগব।
আচ্ছা। কথাডা মনে থাহে যেন।
আঁচলের গাঁট খুলে কুড়ি টাকা গুনে দিলে হারুনের হাতে দিলে সে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে এবং আনন্দে তার চোখ দুটি ছলছল করতে শুরু করে। লতিফাও বুঝতে পারে হারুনের আবেগের বিষয়টি। তাই সে বলল, এখন একটু হাসো।
হারুন হাসে এবং বলে, তালি আমি যাই।
টাকা নিয়ে সত্ত্বর বাড়িতে ঢুকে তৈরি হয়ে তখনই গঞ্জে রওনা হয়।
দুই দিন পর পাঁচশ’কপি হাফ ফর্মার ভাটকবিতা ভাঁজ করে পুস্তিকার মতো বানিয়ে গঞ্জ থেকে বাড়ির পথে পা বাড়ায় হারুন। দূর তো কম নয়? ছয় ক্রোশ দূর তারপর মাঝে দুটি নদীও পার হতে হয়। সকালে রওনা হয়ে দুপুরের আগেই মাথায় ভাটকবিতা নিয়ে রওনা হয়। গঞ্জ থেকে হারুনের বাড়ি ফিরতে লতিফাদের বাড়ির আঙিনা মাড়াতে হয়। হারুনের বাড়ি ফেরার পথে লতিফার সঙ্গে দেখা হবে সেই প্রত্যাশায় চঞ্চলা কিশোরী ওদের বাড়ির আঙিনার পেয়ারা গাছের ডালে বসে আছে। গতকালও এই সময় বসেছিল। হঠাৎ হারুনকে দেখে বুকের ভেতরে ধক করে ওঠে লতিফার। হারুনের মাথায় কবিতার প্যাকেটের গাঁট। লতিফা একটা পেয়ারা হারুনের সামনে টুক করে ফেলে দিয়ে গাছের ডালে মুখ আড়াল করে রাখে। হারুনের মাথায় বোঝা থাকার কারণে পেয়ারাটা তুলে নিতে না পেরে লতিফার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ইড্ডা মাইরা দিলে খাওন যায়? আমার আতো (হাতে) দিয়া যা।
লতিফা মুখ মোচড় দিয়ে বলল, আমার বয়েই গ্যাছে।
আচ্ছা, বলে হারুন হাঁটতে থাকে।
লতিফা বলল, খাইয়া দ্যাহো, গৈয়বডা মধুর লাগান মিষ্টি।
হারুনের মনে এখন অন্য উত্তেজনা। লতিফার সঙ্গে প্রেম-পিরিতি খেলার সময় এটা নয়। তাছাড়া আগে কখনো লতিফার সঙ্গে ঠাট্টমশকারিও করেনি। কবিতার সূত্র ধরেই দুজনের সম্পর্কে নতুন মাত্রা পেয়েছে। দুপুরে খেয়েই যেতে হবে মড়াইলের হাটে। সে সোজা নাক বরাবর হেঁটে যেতে থাকলে লাফ দিয়ে গাছ থেকে নেমে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে লতিফা বলে, গৈয়ব খাইবা না?
অহন যা লতিফা। আমার ম্যালা কাম।
কাম তো থাকবই। তয় তোমার কবিতা হুনাইবা না?
আগে বাজার তো আইয়া লই। তারফরে।
লতিফা কিছুক্ষণের জন্য ভাবিত হয় এবং পথে ছেড়ে পাশে দাঁড়িয়ে বলে, তুমি বড়ো কবিয়াল অইলে আমার কথা মনে থাকবো হারুন ভাই?
লতিফার করুণ আর্জিতে হারুনের মন বিগলতি হয় এবং লতিফার চোখে চোখ রেখে বলে, তুই তো আমারে
কবিয়াল বানাইলি। তুই ট্যাহা না দিলে কি আমি কবিতা ছাপাইতে পারতাম?
যদিও লতিফার বুক ফাটা হাসি আসছে তবু চেপে যায়। অভিমানে ঘাড় কাৎ করে বলে, তালি আমার থাইক্যা
তোমার ট্যাহাডা বড়ো অইলো, তাই না?
হেই হুনো কথা! মাইয়া মাইনষের এই একটা দোষ। বাতাসের মধ্যে গিরা বানদে।
তালি কও তুমি বড়ো কবিয়াল অইলে আমারে ভুলবা না। কথা দ্যাও।
তোরে আমি কখনো ভুলতাম না রে লতিফা। আমি অহন যাই। হাটের সময় বইয়া যাইতাছে।
গৈয়ব খাইব না?
এইডা আমার পক্ষে তুই খাইস। আমি যাই।
হারুন দ্রুত পদক্ষেপে সামনের দিকে হেঁটে গেলে লতিফা চেয়ে থাকে।
ভাটকবিতার এক কপি মায়ের হাতে তুলে দিয়ে হারুন বলে, দ্যাখো মা, তোমার পোলা কবিয়াল অইয়া গ্যাছে।
লোকেরা অহন আমারে ডাকব কবিয়াল হারুন। তাড়াতাড়ি ভাত বাড়ো আমি গোসল কইরা আইতাছি। খাইয়াই রওনা দিমু মরাইল হাটে।
মা যদিও লেখাপড়া বুঝে না তবু ছেলে কবিয়াল হয়ে যাচ্ছে এই ভাবনায় পুলকিত হয় এবং ভাটকবিতার এক কপি হাতে দেওয়াতে তার চোখ ভরে যায় জলে। হারুন গোসল করতে পুকুরের দিকে গেলে মা দ্রুতই খাবারের ব্যবস্থা করে। খেতে বসে হারুন বলে, একটা কবিতার দাম দুই আনা বুঝলাম মা। লতিফা আমারে কুড়ি ট্যাহা কর্জা দিছে। নইলে কি আর কবিতা ছাপাইতে পারতাম। তুমি তো আমারে ধান দিতে না করলা। সবটি কবিতা যদি বেচতে পারি তয় লাভ অইবো ম্যালা। লতিফার ট্যাহা দিয়াও আমার লাভ থাকব। তারপরে আরও কবিতা লেখবাম। আরও ছাপাইবাম। হারুনের কথা মনে মনে হাসে আর ছেলের জন্য মঙ্গল কামনা করে। তারপর বলল, ফরের ট্যাহা দিয়া কবিতা ছাপাইছোস। সময় মতো ট্যাহাডা দিয়া দিস বাজান। নইলে মাইয়াডা মনে কষ্ট ফাইবো।
তা তো দিমুই। হ্যার ট্যাহা কি খাইয়া বইয়া থাকুম।
আনন্দে বিহ্বল আর রহস্যময় উত্তেজনায় হারুন কোনো মতে খেয়েই দুই শত ভাটকবিতা নিয়ে মরাইল হাটের দিকে ছুটকো দৌড়ে ছুটতে থাকে। দুই ঘণ্টার পথ এক ঘণ্টায় শেষ করে হাটের মাঝখানে শতবর্ষী বটগাছের নিচে গিয়ে বসে। হাটে এখনো মানুষ আসতে শুরু করেনি। দু-একজন করে আসতে শুরু করেছে যারা বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করবে। গাছের তলায় একটি সিগারেট জ্বালিয়ে ধীরে সুস্থে দম দিয়ে শেষ করে। এর মধ্যে হাটে বেশ কিছু মানুষ এসেছে। হারুনের যেন বিলম্ব সহ্য হচ্ছে না। এক সময় একটি ভাটকবিতা বান্ডেল থেকে বের করে দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করে আর মুহূর্তের মধ্যে পঞ্চাশ ষাটজন মানুষ তাকে ঘিরে ধরে। সন্ধ্যা নাগাদ তার সব কপি বিক্রি হয়ে যায়। কবিতা বিক্রির টাকায় মা ও লতিফার জন্য দুটি ‘বাসের সাবান’ কিনে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। লতিফার সাবানটি লুকিয়ে নেয় এবং সুযোগ মতো দিতে হবে ভেবে বাড়ি পৌঁছে খড়ের চালে গুঁজে রাখে।
কয়েক হাটেই সব কপি বিক্রি হয়ে যাওয়াতে সে গঞ্জে গিয়ে আরও এক ইমপ্রেশন ছেপে আনে। এবারও পাঁচশ’ কপি।
এগুলোও বিক্রি হয়ে যায় আরও কয়েক হাটেই। হারুনের খ্যাতিও ছড়িয়ে পড়ে, নাম পড়ে যায় ‘কবিয়াল হারুন’।

কবিয়াল হারুনের ব্যস্ততার যেন আর শেষ নেই। কোথায় অবসর? লতিফাদের বাড়ির আঙিনায় কিংবা কখনো হারুনদের বাড়িতে কখনো বা হারুনের সঙ্গে দেখা হলে শুধু দৃষ্টি বিনিময়ের বদৌলতে অবাচনিক বার্তায় দুজনের সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে উষ্ণতার দিকে গড়াতে থাকে। ছয় দফার কবিতা শেষ করে, পাকিস্তানিদের দুঃশাসন, আগরতলার মিথ্যা মামলা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে বঙ্গবন্ধু হলো, শ্রমিক হত্যা এ-রকম নতুন ইস্যু পেলেই কবিতা লিখে ফেলে। কতিবায় তার হাতও পাকা হয়েছে বেশ। কবিতা লেখা, ছাপানো, হাটে হাটে সুর করে পড়ে বিক্রি করে গণজাগরণ তৈরি করেছে। কিছু দিনের মধ্যেই হারুন খালি কণ্ঠে কবিতা না পড়ে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার শুরু করে। গ্রামীণ জনপদে হ্যান্ডমাইক ওর জনপ্রিয়তার আরও একটি কারণও বটে। বাজারের শত শত মানুষ তার কবিতা শুনতে উদগ্রীব হয়ে থাকে। কবিদের অন্তর্দৃষ্টি অত্যন্ত শাণিত হলেও পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মূল্যও কম নয়। ভাটকবিতা মূলত কাহিনিধর্মী বলে কাহিনি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানলে কবিতা লিখতে বেশি সময় ব্যয় করতে হয় না। কবিতাও হয় মনের মতো। এজন্য হারুন কয়েক বার ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেছে, বত্রিশের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছে, পল্টনের জনসভা শুনেছে। একটি কবিতা বিক্রি শেষ হলে এবং চিন্তার রসদ শেষ হলেও আওয়ামী লীগের বড়ো নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছে এবং ঢাকায় চলে এসেছে। একদিন স্থানীয় একজন নেতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে কবিতাও শুনিয়েছল এবং বঙ্গবন্ধু তাকে পিঠ ছাপড়ে বলেছিলেন, তুই কবিতা দিয়েই মানুষকে জাগিয়ে তুলবি। কবিতা লিখে যা। এরপর স্থানীয় এমপি প্রার্থী একদিন হারুন ডেকে বললেন, নির্বাচনের জন্য কবিতা লেখার জন্য। হারুন বলল, দুইটা কবিতা লিখেছি। এখন ছাপা হলেই বাজারে বিক্রি শুরু করে দিব।

বেশ কবিয়াল। তোকের উপহার স্বরূপ আমি একশ’ টাকা দিলাম।
কী বলেন স্যার? আমি পুরস্কার নিমু না। আমি কবিতা লেখি বঙ্গবন্ধুর জন্য। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমি মরতেও পারি।
আপনার ট্যাহা আপনের কাছে থাকুক।
নেতা হাসতে হাসতে বললেন, নেতার জন্য সারা দেশের মানুষ এখন মুখিয়ে আছে। নির্বাচনে বিপুল ভোটে আমরা পাস করব দেখিস। ঠিক আছে আমি টাকা রেখে দিলাম। তুই কাজ চালিয়ে যা। কোনো দরকার হলে আমারে জানাবি।
হারুন নেতার বাসা থেকে বের হয়ে আসার জন্য পা বাড়াতেই নেতা ডাক দিয়ে বললেন, হারুন, নেতার সাথে আমার নামটা কি রাখা যায় না? অত্র এলাকায় তো আমি নির্বাচন করছি।
আপনের নাম আছে স্যার। এই এলাকায় কাকে ভোট দিতে হবে আমি লিখেছি।
সাব্বাস কবিয়াল।

ইতিহাসের কসম যে, সত্তর সালে প্রাদেশিক ও জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে পাকিস্তানের সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন লাভ করলেও সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা না দিয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা দেওয়ার পায়তারা শুরু করেন, দফায় দফায় মিটিং করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়া খানের ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের দশ লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে সাতই মার্চের ভাষণে তৎকালীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইঙ্গিতময় ইশতেহার বর্ণনা করেন যা কালের ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম সেরা ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সেই সাতই মার্চে কবিয়াল হারুনও ভাষণ শুনতে উপস্থিত হয় এবং বাড়িতে গিয়েই ৭ই মার্চের কবিতা লিখে ফেলে এবং ছাপিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে গণ জাগরণের জন্য ভাটকবিতা হাটে হাটে বিক্রি করে।

একদিন এক সন্ধ্যায় বাজার থেকে ফেরার পথে নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা কুদরত আলী কবিয়াল হারুনকে শাসিয়ে দিয়ে বলে, হিন্দুদের পক্ষে যেভাবে লাগছিস পিঠের ছাল কি থাকবে?
হারুনও হেরে যাওয়ার পাত্র নয়। সেও সাফ সাফ বলে দিয়েছে কার পিঠের ছাল থাকে আর কার থাকবো না দ্যাখা যাইবো। সময়ই সব বোঝা যাইবে।
কুদরত আলীর কথাটা শোনার পর হারুনের শরীরের শক্তি কিছুটা হ্রাস পায়। একপ্রকার বিবসতা ভর করে এবং বাড়ি পর্যন্ত মনে তার কথাটাই কানে বাজতে থাকে, ‘পিঠের ছাল কি থাকবে’? ৭ই মার্চের ভাষণের পর গ্রামে গঞ্জে মানুষ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। যেকোনো দিনই যুদ্ধ লেগে যেতে পারে এই বার্তা দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে।

হারুনের যেন নিশ্বাস নেওয়ার সময় নেই। ভাটকবিতা লিখছে, ছুটছে ছাপাখানায়, ছুটছে হাট থেকে হাটে—কোথায় ফুরসত? শীতের সকালে বারান্দায় এক ফালি মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে আর সেই রোদে পিঠ ফিরিয়ে ‘বুইত্যা’ কলার পিঠা খেতে বসেছে হারুন এবং সেই সময় লতিফা এসে পাশে বসে হারুনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, তালি ভুইল্যা গ্যাছো?
লতিফা নিঃশব্দে এসে পাশে এমনভাবে বসেছিল যে, হারুন টের পায়নি। ওর কথা শুনে হকচকিয়ে যায় এবং চোখে চোখ রেখে স্মিত হেসে হারুন বলে, ভুলি নাই রে লতিফা। তোর লাইগ্যা মন খুব পোড়ে। কিন্তু আগে দ্যাশের কাজ কইরা লই।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিছে। দ্যাশের স্বাধীনতা ছাড়া মাথায় আর কোনো চিন্তাই আইয়ে না। তারপর দ্যাশ স্বাধীন অইলে তরে আমি ঘরে তুলবাম। তুই আমার বউ হবি। হবি না?
ইশশি রে! মুখের কথা! তুমি কইলা আর আমি তোমার বউ অইয়া গেলাম। শখ কত!
হারুন হাসতে হাসতে বলে, তর মনের কথা আমি বুঝি। যতই ঢঙিলা করিস না ক্যান আমার বউ অওয়ার বাস্না তর মনে আছে।
হ এক কবিয়াল কইছে আর লতিফা রাজি অইয়্যা গেছে! অত লালি আজ্জের না।
হারুন স্মিত হেসে বলে, আজ্জের না অইলেও এক পোয়া অইলেও তো অইবো।
চাচি আইতাছে আমি যাই, বলে লতিফা একটু সরে বসে। এই সময় পুকুর থেকে পানির কলস নিয়ে ফিরে হারুনের মা। উঠোনের মাঝখান থেকেই বলে, কী গো তুমি কই থাহো? একেবারে দ্যাহাই যায় না।
এই তো আইলাম চাচি।
বও। ফিডা (পিঠা) খাইয়া যাইবা। আমি থাল আনতাছি।
হারুনের মায়ের সঙ্গে লতিফার সখ্য হারুনের চেয়ে কম না। এজন্য তার আবদারকে অমান্য করার কোনো উপায় নেই। কাঁখের কলস রেখে হারুনের মা একটি থালা নিয়ে এসে হারুনের সামনের গামলা থেকে থালা ভরে পিঠা দিলে সেও হাত ধুয়ে খেতে শুরু করে। দুবার মুখে দিয়েই লতিফা বলে, চাচি আফনেও বইয়া ফরেন আমরার লগে।
আচ্ছা। খাড়াও। আরেকটা থাল লইয়া আই।
হারুনের মা রুশিঘর থেকে আর একটি থালা এনে ওদের পাসে বসে খেতে শুরু করে। খাওয়ার ফাঁকে একবার হারুনকে জিজ্ঞেস করে, যুদ্ধু কি লাইগ্যা যাইবো?
যাইবো মানে কী? লাইগ্যা তো গ্যাছে। গেরামে গঞ্জে শহরে মানুষ ট্রেনিং দিতাছে। মিছিল করতাছে। এইবার দ্যাশ স্বাধীন অইয়া যাইবো।
লতিফা বলে, যুদ্ধ লাগলে কি তুমিও যুদ্ধে যাইবা?
তয় ঘরে কুইচ্চা মুরগির মতো হুইত্যা হুইত্যা ঝিমাইবাম? বঙ্গবন্ধু পরিষ্কার কইয়্যা দিছে এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। স্বাধীনতার কথা তো তিনি কইয়াই দিছেন।
হারুনের কথার আর কেউ উত্তর দেয়নি। কিছুক্ষণ নীরবতায় কেটে যাওয়ার পর লতিফা বলে, কুদরত আলীরা নাকি দ্যাশ স্বাধীন অইতো দিবো না।
হারুন তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে, এইসব মশামাছির কথা বাদ দ্যায়। কিছু বদমাইশরা দ্যাশের স্বাধীনতার কিছু করতে ফারবো না।

বাজান কইছে গঞ্জের বিহারিরাও ট্রেনিং দিতাছে। তারাও অস্ত্র লইয়্যা ঘুইরা বেড়ায়।
সারা দ্যাশে কয়ডা বিহারি আছে! পিঁপড়াডলা খাইয়া ঠিক অইয়া যাইবো।
তালি কি তোমার কবিতা লেহা বন্ধ হয়ে যাইবো?
আমার কবিতা তো দ্যাশের স্বাধীনতার লাইগ্যাই। এইডা কি যুদ্ধ না? কেউ অস্ত্র লইয়া যুদ্ধ করব, কেউ কলম দিয়া যুদ্ধ করব। কলমের যুদ্ধ কম শক্তিশালী না রে লতিফা। যুদ্ধের সময় বন্দুক লইয়া যুদ্ধ করলেই যুদ্ধ হয় না। কত কাম এর হিসাব আছে? সৈনিকদের কে খাওয়াইবো? কে কাফড়চোফড় দিবো? কে অস্ত্র দিবো? ক্যালা খবর ছাপাইবো? কারা পথ চিনাইবো? কারা নাও চালাইবো? ট্যাহা ফয়সা কইত্তে আইবো? এর কোনো হিসাব আছে? একটা যুদ্ধে সবার কামই মূইল্যবান।
তুমি এত সব জানলাম ক্যামনে?
ক্যান? আমি অহন আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে চলি না। তারাই বলেন। আমারে বঙ্গবন্ধু কইছে তুই কবিতা লেখবি। কবিতার শক্তিও কম না?
তুমি বঙ্গবন্ধুরে দ্যাখছো?
হারুন হাসে। তর কি মনে হয় আমি খালি খালি বত্রিশ নম্বর গিয়া ফইর‌্যা থাহি। আমার নেতারে দ্যাহনের লাইগ্যা, তানার দুই কথা হুননের লাইগ্যাই তো যাই। সবদিন দ্যাহ ফাই নাই। তিনি কত ব্যস্ত। মাঝে মাঝে দ্যাহা ফাইছি। আহা! এমুন নেতা দুনিয়াতে আর একজনও নাই। তার কথা হুনলে শরীরের রক্ত আগুন অইয়া যায়। মনে কয় তক্ষণই পাকিস্তানিদের দ্যাশ ছাড়া করি।
লতিফা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে হারুনের চোখের দিকে। এই দৃষ্টি বড়ো মায়াবী, বড়ো আকর্ষণীয়, গভীর অনুভূতির হাতছানি। হঠাৎ হারুনের চোখ লতিফার চোখে পড়াতে ব্রীড়া ও উত্তেজনায় তার মুখম-লে রক্তিমাভা ফুটে ওঠে।
হারুন বিগলিত কণ্ঠে লতিফাকে জিজ্ঞেস করে, কী দ্যাখাতাছোস লতিফা?
তুমি যুদ্ধে যাইব আর আমি একলা ক্যামনে থাকবাম? তোমার লাইগ্যা মন বড়ো পোড়ে। ঘরের মধ্যে মন টিকে না।
আয় কাছে আয়। তরে একটু আদর করি।
থাউক। অত আদর লাগব না। যেদিন তুমি আমারে বউ বানায় ঘরে নিবা হেদিন আদর করবা।
দ্যাশ স্বাধীন কইর‌্যাই তোরে বিয়া করুম। খোদার কসম লতিফা। তর লাইগ্যা আমার মনও খুব পোড়ে। আমার মনে কয়, তুই আমার বোহালে বইয়া থাকবি আর আমি কবিতা লেখবাম। দুনিয়ার সেরা কবিতা।
বিয়ার পরে কিন্তু আমারে তুই তুখারি করতে পারবা না।
হারুন হাসে। ধুর পাগলি! অহন তুই আমার প্রতিবেশি বইন। তখন তো অইবি আমার বউ। তাই না?
লতিফা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে হারুনের দিকে এবং হারুন যেখন লতিফার বিস্ফারিত দৃষ্টি দেখে তখন মনে হয় ওর হৃদয় এ-ফোঁড় ও- ফোঁড় হয়ে যাচ্ছে। কী যে মায়া! কী যে আকর্ষণ! এ কীসের আহ্বান!
লতিফা মৃদু হেসে বলে, একটা কথা কই হারুন ভাই।
কী কথা?
তোমারে যে আমি ট্যাহা কর্জা দিছিলাম কবিতা ছাপানো লাইগ্যা মনে আছে?
মরার পরে যদি ভুলি। আর আগে ভোলার কোনো সম্ভাবনা নাই।
আসলে এই ট্যাহা আমি দেই নাই। দিছিল চাচি। চাচি আমারে সব শিখায়া দিছিল আর আমি তোমার ট্যাহা দিছিলাম।

হঠাৎ মনের রোমান্স ধপ করে যেন নিভে যায় এবং হারুণের কৃতজ্ঞতা বোধ এতদিন ছিল লতিফার দিকে আজ সেই কৃতজ্ঞতা বোধ মায়ের প্রতি সৃষ্টি হলো। তবু লতিফাকে সে খাটো করে দেখবে কেমন করে? হারুন বলে, আচ্ছা। মা দিলেও সমস্যা নাই। তাই বইল্যা কি তোরে আমি ভালোবাসি না? স্বাধীনতার পরে আমি সত্যি সত্যি তোরে বিয়া করবাম। তুই যদি রাজি থাহিস? কি, রাজি আছোস না?
লতিফা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলে হারুন থুতনিতে ছুঁয়ে একটু আদর করে সেখানে থেকে সটকে পড়লেও দুজনের দেহমনেই যেন শিহরন অনুভূত হয়। এতটুকু স্পর্শই এমন ভালোবাসার এমন প্রগাঢ় উষ্ণতা এর আগে তারা কখনো অনুভব করেনি। লতিফাও ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় এবং নিজের থুতনিতে বারবার হাত বুলিয়ে যেন প্রেমাস্পদকে উপলব্ধি করে।
হারুনের মা অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছে। দেশের পরিস্থিতি প্রতিটি মিনিটে খারাপের দিকে যাচ্ছে। কী হয় কে জানে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে হারুনের মা বলে, সাবদানে থাহিস রে ফুত। তর কিছু অইলে আমি বাচতাম না। হারুন মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমার কিছু অইবো না মা। তুমি চিন্তা করবা না। তয় দ্যাশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত এই দ্যাশের মানুষের মুক্তি নাই, শান্তি নাই।

দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর কলম ফেলে দিয়ে হারুন মিয়া ৩০৩ রাইফেল হাতে নিয়ে ছুটছে গ্রাম থেকে গ্রামে, শহর থেকে শহরে, গঞ্জ থেকে গঞ্জে এবং ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসের বিশ তারিখে সীমান্ত এলাকা পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়ে যখন বাড়িতে দুপুরের দিকে এসে দাঁড়ায় তখন নিজের বাড়িটি আর চিনতে পারেনি। কোনো ঘর নেই। গাছগাছালি নেই। আছে কেবল বাড়ির সামনের পুকুরটা আর বসত ঘরের ভিটায় তিন চারটি পোড়া মাটির সঙ্গে মিশে থাকা গজারি কাঠের খুঁটি।

স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে হারুন। চুলদাড়িতে একাকার। চেনার উপায় নেই। গ্রামের মানুষ এসে ভিড় করেছে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে দেখার জন্য। হারুন কারো দিকে তাকাতে পারে না। তার চোখ পাথরের মতো নিশ্চল। শুকনো। অশ্রুহীন।
ক্রন্দন হীন। পাশে বাড়ির এক বৃদ্ধ চাচা হাউমাউ করে কেঁদে বলল, সব শ্যাষ বাজান। তোর মায়েরা ওরা এইহানে, এইহানে কুদরত আলি গুলি করল। ওই যে ওইহানে তিন দিন পর আমরা কব্বর দিলাম। লতিফার বাপেরও মাইরা ঠ্যাং ভাইঙ্গা দিছে।

লতিফারে ক্যাম্পে ধইরা নিছিল। গ্রামের আরও মানুষ বিভিন্ন বার্তা দেওয়ার প্রাক্কালে কবিয়াল পাথরের মূর্তি, নির্বাক, স্থবির কেবল গ্রামের মানুষের কথা শুনেছে।
গ্রামের মানুষের কাছে, এমনকি লতিফার বাবার কাছেও সে নিগৃহীত হলেও হারুন তার প্রেমকে ভুলতে পারেনি।
গ্রামের অনেক মানুষের মতামতকে উপক্ষো করে লতিফাকে বিয়ে করে। পুরোনো শূন্য ভিটায় ঘর বেঁধে ওদের জীবন শুরু করে। স্বাধীন দেশে যেন সবকিছুই নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। আগে টিনের ঘর থাকলেও এখন খড়ের চালা দিয়ে কোনোক্রমে ঘরে তৈরি করে ওরা থাকতে শুরু করে।
হারুন এবং তার সহযোদ্ধারা কুদরত আলীকে খুঁজলেও তার হদিস কোথাও পায়নি। কোথায় লুকিয়েছে কে জানে? এবার রাজাকারদের নিয়ে ভাটকবিতা লিখে কবিয়াল হারুন বাজারে বাজারে ঘুরলেও কবিতা আগের মতো আর বিক্রি হয় না। দুজনের সংসারের জন্য পৈতৃক সম্পত্তি চাষাবাদ করে যে সময় পায় সে সময়ে কবিতা লিখে। লতিফা খুব আপত্তি করে যাতে কৃষি কাজ না করে কবিতা নিয়েই হারুন থাকে।

হারুন রাজনীতির কবিতা ছাড়াও প্রেমকাহিনি দিয়ে ভাটকবিতা লিখে বাজারে বাজারে বিক্রি করে নিজের অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন করেছে। কবিতার মধ্যেই আকণ্ঠ ডুবে থাকে সর্বক্ষণ। মানুষ প্রেমের কবিতার দিকে বেশ ঝুঁকছে। তবে প্রেমের কবিতার পাশাপাশি রাজাকার, আল-বদর আর আল-শামসদের দু-একটা কবিতাও লিখে, ছাপায় এবং হাটে বিক্রির জন্যও নিয়ে যায়।

ক্যান্টমেন্টের গভীর ষড়যন্ত্রে এক হাজার তিনশত ছত্রিশ দিনের মাথায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায় দেশের মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংস নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশের নয় পৃথিবীর ইতিহাসে কালো অধ্যায়ের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। ক্যান্টমেন্টের যারা ক্ষমতা দখল করেছে তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ও মদদে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তির উত্থান ঘটে এবং রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের লোকবল যারা এতদিন গর্তে লুকিয়ে থাকা শিয়ালের মতো ছিল তারা সিংহের মতো কেশর ফুলিয়ে দুলিয়ে যুদ্ধের সময়ে যে-রকম দাপুটে ও দুর্দ- প্রতাপ দেখাত ঠিক সেই রূপ ধারণ করে ফিরে এসেছে। চীনপন্থী অর্থাৎ ভাসানীর অনুসারী বামপন্থীরা সরাসরি সামরিক জান্তার দলে ভিড়ে এবং ক্ষমতার ভাগাভাগিতে সিংহভাগ গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের বিশ্বাসঘাতক সদস্যরাও তলানির ভাগ পায়। ক্ষমতা দখলের লোভে স্বাধীনতার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিল জাসদপন্থী গণবাহিনীর নেতৃবৃন্দ, শুরু হয়েছিল আন্ডাগ্রাউন্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতার তা-ব, সর্বহারা পার্টিও সসস্ত্র বিপ্লবের নামে দেশকে অস্থিতিশীল করার ভীবিষিকাময় পরিস্থিতি। তবে ক্ষমতা দখলের দৌড়ে অন্য দলগুলোকে পেছনে ফেলে ক্যান্টমেন্টের ষড়যন্ত্রই সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে লক্ষ্যে পৌঁছায়।

বদরবাহিনীর কমান্ডার কুদরত আলী ধরাকে সরা জ্ঞান করে। সে আগের চেয়ে আরও কয়েক গুণ শক্তি সঞ্চয় করে এলাকায় প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করেছে। যুদ্ধের সময় যেসব হিন্দুদের বাড়িঘর জমিজমা দখল করেছিল সেগুলো ভুয়াদলিলপত্র বানিয়ে এলাকায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতাপশালী জমিদারের মতো রূপ ধারণ করে। ক্রমে তার দৌরাত্ম আর টাকার খেলায় এলাকার সব মানুষ যেন ইঁদুরে পরিণত হয়েছে। ‘মানি ইজ নো প্রোবলেম’ এই কথা সাধারণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য না হলেও কুদরত আলী মতো স্বাধীনতা বিপক্ষের মানুষগুলোর সর্বাংশে অমোঘ বাণীতে পরিণত হয়েছে।

দুতিন বছরের মধ্যে কুদরত আলী যেন এলাকার ঈশ^র বনে গেছে। বিশ একরের একটি খাস জলাশয় নিজের নামে করে নিয়েছে যে জলাশয় এবং জলাশয় সংলগ্ন আরও কিছু খালবিলনদীকে কেন্দ্র করে জেলেপল্লি গড়ে উঠেছিল এবং তাদের জীবিকার একমাত্র উপায় ছিল সে জলাশয়ে মাছ ধরে বিক্রি করা এখন সেই জলাশয়ে জেলেপল্লির জেলেদের গতায়ত নিষেধ।
এখন এই উন্মুক্ত জলাশয়ে কুদরত আলী মাছ চাষের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা মাছ বিক্রি করে জেলেদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে। তারই পাশে গড়ে তুলেছে ইটভাটা। অনেক হিন্দুর জমিভিটা জোর করে লিখে নিয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্তের ওপারে যেতে বাধ্য করেছে। না গেলে হয়তো লাশ হয়ে কোথাও গুম হয়ে যেত। সবচেয়ে বড়ো ব্যবসা গড়ে তুলেছে স্মাগলিংয়ের যে ব্যবসা থেকে লক্ষ কোটি টাকা রাতারাতি মুনাফা করে।
কুদরত আলী এখন শুধু নেতাই নয়। শিল্পপতি এবং বৈধ-অবৈধ সম্পদের পাহারের মালিক। দুধের গেলাসে মাছি আসবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষের সম্পদ হলে পাচাটাদের দল ভিড়তে তা বলার অপেক্ষা থাকে না। কুদরত আলীরও মোসাহেবদের অভাব হয়নি। অল্প দিনেই তার অতিশয় স্ফীত প্রভাবপত্তির পর কয়েকজন তাকে বলেছে, স্যার এবার মানুষ কিনেন, সম্পদ তো অনেক হলো।
কুদরত আলী স্মিত হাসি দিয়ে বলে, মানুষ আবার কিনে কীভাবে? মানুষ কি কেনা যায়?

কিসমত আলী বলে, স্যার, মানুষ কেনার মতো সোজা জিনিসটা বুঝলেন না স্যার? কিছু মানুষ এমন কাজ দিবেন যারা শুধু আপনার প্রশংসা করে বেড়াবে। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করবে তার মানে আমার খেদমতে তারা কাজ করবে কলমের মাধ্যমে। আজকাল হলো কলমের জোর।
কুদরত আলী হাসতে হাসতে বলল, বুদ্ধিটা তো খারাপ নয়। ভালো বুদ্ধি বটে। তাহলে তো মানুষ কিনতে হবে। কিসমত আলী বলল, স্যার একটা পত্রিকা বের করেন। এই পত্রিকায় তাদেরই মোটা বেতনে চাকরি দেবেন যারা আপনার বিরোধিতা করত। দেখবেন আপনার পথের কাঁটা বলতে আর কিছু থাকবে না। একদিকে চাকরির মায়া, পত্রিকায় কাজ করার লোভ সব মিলিয়ে এসব মানুষকে কিনে ফেলেন।
তারা কি আসবে?
কী যে বলেন স্যার? টাকা দিলে কে আসবে না? এই জগতটাই হলো মানুষ কেনার হাট।
অতিশয় বুদ্ধি তোমার। যাবতীয় ব্যবস্থা করো এবং বেছে বেছে আমাকে যারা বদর আর রাজাকার বলে কটাক্ষ করত তাদের চাকরি দাও। পত্রিকার রেজিস্ট্রেশন বের করো এবং কোথায় কী করতে হয় সব করো। ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’।
শুধু এলাকার বললে ভুল হবে, বরং বলা যায় সারা দেশেই তার প্রভাব প্রতিপত্তি আর দাপটের কথা ছড়িয়ে পড়েছে।
মানুষ এতটা নতি স্বীকার করতে পারে ভেবেও লজ্জাবনত হয় কবিয়াল হারুন। এক রাতে মদের আসরে কিসমত আলীকে কুদরত আলী বলল, কবিয়ালকে তো এখনও বসে আনা গেল না। সে নাকি রাজাকারদের নিয়া এখনো কবিতা লেখে?
হা। লেখে। এই কবিয়ালরেও কিনতে হবে যাতে রাজাকার শব্দটা ভুলে যায়।
কিন্তু তা কি সম্ভব? কবিয়ালের স্ত্রী লতিফারে যুদ্ধের সময় তো আমিই প্রথম ইয়ে… মানে বুঝলে না… সে কথা কি ভুলতে পারবে?
হা হা হা…। স্যার বুঝলাম। আমিও তো আপনার পরেই… ইয়ে করলাম।
তুমি একটা ব্যবস্থা করো। সে রাজাকারের কবিতা না লিখে আমার গুণকীর্তণ করে কবিতা লিখবে। ‘মানি ইজ নোম প্রবলেম।’
এটা স্যার ওয়ান-টুর ব্যাপার। কালই আমি ওকে ধরে আনানোর ব্যবস্থা করছি।
বিদেশি দামি মদের আসর শেষ হতে হতে অনেক রাত হয়ে যায়। কিসমত আলী কিছুটা এলেমেলো হয়ে গেলেও কুদরত আলী ঠিকঠাক মতোই আছে। আসর ভাঙার সময় কুদরত আলী মনে করিয়ে দেয়, কবিয়ালকে বশে আনতে ভুলবে না। ওরে আমার চাই। লতিফার শরীরটা আগের মতোই আছে? নাকি অভাবের তাড়নায় ভেঙেচুরে গেছে? অসুবিধা নেই।
প্রোটিনের সাপ্লাই বাড়িয়ে দিলে আবার সেই সৌষ্ঠব লাবণ্য ফিরে আসবে।
স্যার আমি থাকতে আপনার কোনো চিন্তা নাই। ওর ঘাড় সোজা করতে ওয়ানটুর ব্যাপার।

কিসমত আলীর নির্দেশে কবিয়াল হারুকে সসম্মানে কুদরত আলীর বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। কুদরত আলীর বিলাশবহুল দরবার হলের সোফায় বসতে দিয়েছে হারুনকে। সোফায় বসবে কি বসবে না বেশ দ্বিধাগ্রস্ত ছিল; শেষ পর্যন্ত বসে। এত দামি সোফা জীবনে কখনো দেখেনিহারুন, বাসার ভেতরে এত চমৎকার আসবাবপত্র দেখে সে প্রথমে ভড়কেই গিয়েছিল। তারপরও কিসমত আলী রাজাকারের বাড়িতে বসবে কিনা ভাবতে গিয়েও দ্বিধায় পড়েছিল। কিসমত আলীর অনুরোধে শেষাবধি বসে এবং কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কিসতম আলী এসে অনেকটা দূরের সামনের সোফায় এসে বসে।
বিশাল ট্রেতে করে কয়েক পদের নাশতা দেখে হারুন আবর ভড়কে যায়। এই খাবার সে জীবনেও চোখে দেখেনি। কী এলাহি কা-, মনে মনে বলে হারুন।
কুদরত আলী বলল, নেন কবিয়াল সাব গরিবের বাড়িতে একটু নাশতাপানি খান।
হারুন কিছু না বলে নির্বাক চেয়ে থাকে এবং বুঝতে চেষ্টা করছে তাকে কেন ডেকে আনা হয়েছে। সোফায় বসেছে বটে তে এই রাজাকারের বাড়িতে কিছু যে খাবে না মনে মনে প্রতিজ্ঞাই করে আছে।

কুদরত আলীই কথাটা বলতে শুরু করে, আপনি কবিয়াল মানুষ। সবাইতে আর কবি হতে পারে না। আপনি যুদ্ধের আগে সারা এলাকার মানুষকে জাগিয়ে তুলছেন দেখেই না আমরা আজকে স্বাধীন দেশের মানুষ। তাই না? আপনার এই ঋণ জাতি শোধ করতে পারবে না।
হারুন অনুচ্চারে বলে, হারামজাদার মতলব কী? এত তেল মাইরা কথা কইতাছে ক্যারে?
কুতরত আলী বলে, আপনি গরিবের জন্য একটু কাজ করেন কবিয়াল সাব। মানি ইজ নো প্রবলেম। আপনি আমার নামে একটা কবিতা লিখে বাজারে বিক্রি করবেন। এজন্য আমি অবশ্যই আপনাকে পঞ্চাশ হাজার টাকাও দিব।
হারুনের মাথায় যেন রক্ত ওঠে যায় এবং বলে, আপনে ট্যাহা দিয়া আমার কিনতে চান?
কুদরত আলী হাসতে হাসতে বলে, রাজকবিদের কি রাজারা সম্মানী দিত না। আমার তরফ থেকে সামান্য নজরানা কবিয়াল সাহেব! কিননের কথা বলছেন কেন?
আমি নজরানা চাই না। কবিতাও লেখতাম না। আফনের নামে কবিতা লেহা আমার পক্ষে সম্ভব না।
কুদরত আলী অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় শান্ত স্বরে বলল, নাশতা পানি খান। তারপর ভেবে চিন্তে বলেন। ভুল মানুষেরা কিন্তু হুটহাট সিদ্ধান্ত নেয়।
হারুন বলল, আমি হুটহাট সিদ্ধান্ত নেই নাই। আফনের লাইগ্যা আমি কবিতা লেখতাম না।
এবার কুদরত আলী একটু কড়া মেজাজে বলল, কবিতা তাহলে খিলবেন না?
না।
কিন্তু এর ফল কী হইতে পারে তা কি জানেন?
জানি। আফনে আমারে মাইরা ফালাইবেন। তবু লিখতাম না।
কুদরত আলী ভেবেছিল আরও কিছু দিন সময় দিলে হয়তো সে বশে আসতে পারে। কিন্তু অযথা কেন সময় দেওয়া? এর মতো কবিয়াল কবিতা লিখলেই কি আর না লিখলেই কী আসে যায়? হঠাৎ খুব শান্ত কণ্ঠে কুদরত আলী বলে, কবিয়াল বেশি কথা বলার সময় আমার নাই। আমার কাছে টাইম ইজ মানি। কিসমত আলী এদিকে আয়। কিসমত আলী পাশের রুমে কুদরত আলীর কুদরতি হুকুমের অপেক্ষা করছিল। ডাক পেয়ে পেয়াদার মতো অর্ধ-অবনত শিরে কুদরত আলীর সামনে দাঁড়ালে কুদরত আলী বলে, মেহমানখানায় নিয়ে ভালো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কর।
তাকে নিয়ে যা।
কিসমত আলী সসম্মানে হারুনকে বলল, একটু চা নাশতা না খেয়ে গেলে মালিক অসন্তোষ হবেন। আপনি দয়া করে আমার সঙ্গে আসুন। আমার অনুরোধটুকু আপনি রাখুন কবিয়াল সাব।
হারুন কিছু না ভেবেই কিসমত আলীর সঙ্গে পাশের রুমে ঢুকে তারপর একটি লম্বা করিডোর পার হয়ে মাটির নিচে আরেকটি ঘরে ঢোকে। রুমটিতে সামান্য আলো এবং দুতিনটি চেয়ার। বসার মতো আর তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এই রুমে ঢুকেই হারুনের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে এবং ভাবে হয়তো এখানেই তার জীবনের খেলা শেষ হতে চলেছে এবং এজন্যই ভুলিয়ে-ভালিয়ে এখানে আনা হয়েছে।

কিসমত আলী একটি চেয়ারে বসতে বললে হারুন ইতস্তত করে এবং ততক্ষণে ষ-ার মতো চারজন লোক এসে তার হাত বেঁধে ফেলে। একজন একটা ঘুসি মারলে সাথে সাথে হারুন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এরপর চারজন পালাক্রমে ইচ্ছেমতো উত্তম-মধ্যম দেওয়ার পর কিসমত আলী জিজ্ঞেস করে, কবিয়াল, আরও খাওয়ার সাধ আছে নাকি আমার মালিকের নামে পদ্য লিখবি? বল। কসম খেয়ে বল হারামজাদা।
হারুন কিসমতের মুখে থুথু ছিটিয়ে বলে, একটা রাজাকারের নামে আমার জীবন থাকতে কবিতা লেখতাম না।
হা হা হা করে হাসতে হাসতে কিসমত বাইরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর কুদরত আলীকে নিয়ে ফিরে এসে বলে, স্যার সে পদ্য লিখবে না। আপনিই এখন শেষ রায় দেন।

তাহলে মহাভারতের সেই একলব্যের শাস্তিটাই দিতে হয়। ওর বৃদ্ধাঙ্গুলি কর্তনের ব্যবস্থা করো যাতে আর কোনোদিন পদ্য লিখতে না পারে।
সব ব্যবস্থা এই গোপন কুঠুরিতে আগে থেকেই পাকা করা আছে। একটি ধারালো বড়ো চাকু নিয়ে আসে এক লোক।
পূর্বের চারজন তাকে শক্ত করে ধরে রাখে। ডান হাতটি এক খ- কাঠের তক্তার ওপর রাখে এবং ধারালো চাকুটি দিয়ে বৃদ্ধাঙুলি কর্তন করে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়, হারুন বেহুঁশ হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকে। অনেক ক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে কিসমত হারুনের দিকে তাকিয়ে বলে, সরাসরি বলতে চাই কবিয়াল সাব। তোর সামনে দুটি পথ খোলা আছে। একটি তোরা স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে মৃত্যু অন্যটি তোরা এই এলাকায় ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবে। কোন পথ বেছে নেবে তোর সিদ্ধান্ত। এখন আপাতত তোর মুক্তি।
হাঁটতে গিয়ে যেন মাথাটা ঝিমঝিম করছে। মাথা ঘুরে পড়ে যাবে কিনা বুঝতে পারে না হারুন। এই কুদরত আলী লতিফাকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করেছে। লতিফা এখনও পূর্ণ সুস্থ হতে পারেনি। গভীর রাতে বিড়বিড় করে কী যেন বলে।
মাঝে মাঝে আঁৎকে ওঠে। কাঁপতে থাকে। সে কখনো স্বভাবিক হবে কিনা কে জানে? এখন লতিফা সন্তানসম্ভবা। কুদরত আলী মুখ দিয়ে যখন বের করেছে তাহলে এলাকা না ছাড়লে নির্ঘাৎ মৃত্যু। এখানে মরতেও আপত্তি ছিল না। কিন্তু লতিফা ও ভবিষ্যতে তার সন্তানকে বাঁচানোর জন্য হলেও তাকে এলাকা ছাড়াতে হবে। হারুনের শরীর থেকে দরদরিয়ে ঘাম ঝরতে থাকে। একটা সুন্দর সংসারের স্বপ্ন ভয়ঙ্কর ঝড়োবাতাসে যেন হঠাৎ করে বিধ্বস্ত হয়ে গেল!

রায়বাজারের পাশে বস্তিতে বসবাস শুরু করে কবিয়াল হারুন। হারুনের ছেলের নাম রাখা হয়েছে মুজিবুর রহমান। ছেলেটিকে যখনই হারুন নাম ধরে ঢাকে মনে মনে উচ্চারিত হয় আমাদের বঙ্গবন্ধুকে কোন দানবরা হত্যা করল? কিন্তু কত মুজিবকে মারবে? ঘরে ঘরে লক্ষ কোটি মুজিব জন্মাবে। বার বার জন্মাবে।
ভাটকবিতার যুগ শেষ হয়ে গেছে। শেষ হয়ে গেছে রাজ্জাক কবরী শাবানা ববিতার যুগ। গ্রামেই শুনে না ভাটকবিতা এখন শহরে আর কে শুনবে? চার আঙুলে লেখার শক্তিও না থাকলেও হারুন মিয়া এখন বাম হাতেই লেখা শিখছে। আগের চেয়ে লেখার গতি কম হলেও লিখতে অসুবিধা হয় না। ঢাকায় এখন কবিয়াল হারুন বাদাম, সিমের বিচি, বুট বিক্রি করে সংসার চালায়। ছেলে মুজিবুর রহমানকে স্কলে ভর্তি করে দিয়েছে। তাঁর সব স্বপ্ন এখন ছেলেকে নিয়ে।

হারুন মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মন নিঃশব্দে কাঁদে। এক সময়ের সাত কোটি মানুষের ঠিকানা ছিল যে বাড়িটি সেটি এখন কারবালা। কারবালার হাহাকার। কখনো মনে মনে বলে, বঙ্গবন্ধু একদিন বলেছিলেন, তুই কবিতা লিখে মানুষকে জাগিয়ে তোল। কিন্তু আজ কাকে জাগিয়ে তুলবে কবিয়াল হারুন? আজ কি ঘুমন্ত নেতাকে জাগিয়ে তোলা যাবে? বুকের ভেতর হুহু করতে থাকে। মনে মনে ভাবে, বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা তো জীবিত আছে। তারা কি কখনো আসবে না? আহা কখনো যদি আসত!
হারুনের মনের বাসনা পূরণ হতে বেশি দিন লাগেনি। উনিশ’ একাশি সালের সতেরোই মে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে হারুনও গিয়েছিল বঙ্গবন্ধু কন্যাকে দেখতে। আকাশ যেভাবে অঝোর ধারায় কেঁদেছিল হারুন আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেভাবে অঝোরধারায় কেঁদেছিল।
বাবার সুযোগ্য কন্যাই শেখ হাসিনা খ–বিখ- আওয়ামী লীগকে এক ছাতার নিচে এনে দলের হাল ধরেন। প্রকৃতির নিয়ম অত্যন্ত সূক্ষ্ম। রাজনীতির পালা বদল শুরু হয়। উনিশশ’ নব্বই সালে সামরিক জান্তাদের শাসনের অবসান হয়। তারপর আরও দশকের পর দশক অতিক্রান্ত হয় রাজনৈতিক পালা বদলের মাধ্যমে।

উনিশশ’ একাত্তরে সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অবরাধ ট্রাইবুন্যালে সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমেই সাজা হয় জামায়েত ইসলামীর দাপটে নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার এবং তাঁর বিচারে যাবৎজীবন সাজার রায় ঘোষণা দেওয়ার তিনি ‘ভি’ প্রতীক দেখিয়ে আদালত চত্বর ত্যাগ করেন। আর সেদিন বিকেলেই শাহবাগ চত্বর কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে একটি জলন্ত অগ্নিকূপে পরিণত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন মিয়া মাথায় লাল সবুজের পতাকা বেঁধে প্রতিদিন মিছিলে আসতে শুরু করেন। বয়সের ভারে বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন হেরে যাননি। শুধু হারুন নয়, হারুনের ছেলে ও স্ত্রী লতিফাও শাহবাগ চত্বরে লক্ষ লক্ষ জনতার আন্দোলনের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। এই আন্দোলনের মুখে সরকার রায়ের আপীল করে এবং বিচারপতিগণ তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তির রায় দেন। রায় কার্যকরীও হয়। পরের বছর কুদরত আলীর বিচার কার্যক্রম শুরু হলে প্রধান সাক্ষী হয় লতিফা বেগম। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কুদরত আলী আর কিসমত আলীর অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদেরও ট্রাইবুন্যাল মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। আসামীর কাঠগড়ায় বিমর্ষ দাঁড়িয়ে আছে কুদরত আলী। বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন মিয়া ধীরে ধীরে কুদরত আলীর সামনে গিয়ে বলেন, আমার সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। এখন তোর সামনে একটি মাত্র পথই খোলা আর সেটি হলো ফাঁসির মঞ্চ থেকে কবরের দিকে যাওয়া। আমি অহন হিরেবার কবিতা লেকবাম। বঙ্গবন্ধুর কবিতা আর খুনি রাজাকারের কবিতা। বীর মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গনা স্ত্রী লতিফার হাত ধরে বীরদর্পে উন্নত শিরে ধীরে ধীরে কোর্টের আঙিনা থেকে বের হয়ে আসেন।

চোখ মেলে তাকায় সোহেল হাসান। প্রথম দৃষ্টিতে সবকিছু অচেনা লাগে। কোথায় এলাম আমি? উঠে বসতেই মনে পড়ে গতরাতে অনেক ঝক্কি আর ঝামেলার মধ্যে নমিতাদের উজানগাও গ্রামে এসেছে। এসেই ঘুম। হাত বাড়িয়ে ঘড়িটা হাতে নেয় সোহেল। সকাল সাড়ে সাতটা । আড়মোড়া ভেঙ্গে বিছনা থেকে নামে। বিশাল লম্বা বারান্দা। কাউকে দেখছে না । দরজা ঠেলে উঠোনে নামে। সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত ভালোলাগায় চোখ মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। বিশাল নিকানো উঠোন। উঠানোর সীমানার পরে আম আর কাঠাল গাছ। ওইসব গাছের পরে ঝাঁকরা বাঁশঝাড়। হালকা ঝিরেঝিরে বাতাস। উঠোনে মোরগ মুরগীর দঙ্গল। উঠোনের একবারে পূর্ব দিকে গোয়াল ঘর। গোয়াল ঘরে কয়েকটা গরু ডাকছে হাম্বা..। জীবন একটা আশ্চার্য লাটিম। কাল সকালে ছিল ঢাকা শহরের বিদঘুটে বাস রিকশা ট্রাক লড়ির জ্যামে। আর এখন? দাঁড়িয়ে লৌকিক গ্রামীণ এক সুরভিত বাড়ির উঠোনে।

নমিতাদের বাড়িটা বেশ বড়। উত্তর মুখি। ওদের থাকার ঘরটাও বেশ বড়। পাখির কিচির মিচির ডাকে সোহেলের হৃদ স্পন্দন বেড়ে যায়। গ্রামে আসাই হয় না। সেই কবে শৈশবে একবার গিয়েছিল.. আর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে এলো নমিতা হালদারের বাড়ি। নমিতা আর সোহেল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের ছাত্র। পড়–তে পড়তে পরিচয়। আড্ডা। কথায় কথায় যখন শুনলো গ্রামীণ জীবনের বিন্দু পরিমান অভিজ্ঞতা নেই- গা জালানো বিখ্যাত খিক খিক হাসি ওর মুখে।

তুই হাসিস কেনো?
তুই বাংলাদেশের ছেলে। যে বাংলাদেশের রাজধানীতো থাকো, সেই রাজধানীর চারপাশে গ্রাম আর গ্রাম। ফুটানি করো, গ্রাম চেনো না? মারবো এক থাপ্পর।
বিশ্বfস কর, নমিতাকে বোঝানোর চেষ্টা করে সোহেল। আমার জন্মেরই আগে বাবা ঢাকায় জমি কিনে বাড়ি করেছে। দাদা দাদিও নেই। ছোট চাচা বাড়িতে। সেই সব খায় বা দেখাশুনা করে- যাওয়া হয় না রে..।
নমিতা হালদার একটু গম্ভীর হয়ে যায়, বুঝলাম। কিন্তু এইটা কোনো কাজের কথা নয়। তুই এই দেশের মানুষ। পড়িস নৃবিজ্ঞানে। অথচ দেশের গ্রামের সঙ্গে তোর যোগাযোগ নেই। লোকে শুনলে হাসবে।
আমার দোষ কোথায়? দাদাবাড়ির দাদাদাদি নেই অনেক কাল থেকেই। বাবা বিয়ে করেছেন ঢাকায়। আমার মামারা থাকেন ঢাকায়, অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায়। সবেচেয়ে ছ্টো মামা থাকেন মালয়েশিয়ায়। আমি ঢাকা শহরটা যেমন চিনি তেমন চিনি ক্যানবেরা সিডনি কুয়ালালামপুর।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে নমিতা, একেই বলে আলোর নীচে অন্ধকার। তুই দুনিয়া চিনিস কিন্তু বাংলাদেশের গ্রাম চিনিস না। এটা হত পারে না। হতে দেয়া উচিৎ নয়। সোহেল, তুই আমার গ্রামে চল।
তোর গ্রামে?
হ্যাঁ আমার গ্রামে। আমার গ্রাম একেবারে গ্রাম। বাড়ির কাছে প্রবলভাবে বয়ে যাচ্ছে বিরাট নদী কচা। আমাদের বাড়িতে গরু আছে। মোরগ মুরগী আছে। বাড়ির কাছে বিশাল দিঘী আছে। তোর ভালোই লাগবে। যাবি?
যাবো। তুই কবে যাবি তোর গামের বাড়ি?
এইতো সামনের ছুটিতে। গেলে তোর বাপ মাকে বলে রাখিস।
বাবা মাকে বলতে হবে কেনো?
আহারে সোনার চান পিতলার ঘুঘু! আমি জানি না- তোমারে তোমার বাপ মায়ে মুরগীর ছানার মতো পালে। চোখের আড়ালে গেলে কেঁদে কুব ভাসায়। বাংলাদেশের পোলা জানো না সাঁতার। আবার যাইতে চাও বরিশালে। বরিশালের আসল নাম জানো?
নমিতার বরিশালের আঞ্চলিক বাক্যে হাস্যরসের বাণে বিভ্রান্ত সোহেল হাসান, বরিশালের আবার আসল নাম কি?
ও মনু, শেরে বাংলার নাম হনোচো? হেই শেরে বাংলার কাল হইতে বরিশালের আর এক নাম- ধান নদী খাল, এই দিনে বরিশাল। তুমি হেই নদী খালের দ্যাশে যাইবা- হাতর তো জানো না। তোমর বাপ মায় না কইলে মুই তোমারে নেতে পারমু না।
ওদের এই আড্ডায় ছিল রনজয়, শিমুল, তাহের, আদুরী সহ আরও কয়েকজন। নমিতার কথায় হাসতে হাসতে লুটিয়ে পরে সবাই। শিমুল এগিয়ে আসে নমিতার কাছে, খালা যা কইছোসরে…।

যদিও এসব হয়েছিল ¯্রফে আড্ডায়। কিন্তু সোহেলের করোটিতে গেঁথে যায় নমিতার ওই বাক্য- ‘তুই এই দেশের মানুষ। পড়িস নৃবিজ্ঞানে। অথচ দেশের গ্রামের সঙ্গে তোর যোগাযোগ নেই। লোকে শুনলে হাসবে।’ সোহেল সিদ্ধান্ত নেয়, যাবে নমিতাদের উজানগাও, গ্রামের বাড়ি। দেখেবে বাংলাদেশের গ্রাম। আর গ্রাম দেখতে বরিশালেই যাওয়া উচিৎ। খালে নদীতে বিদৌত বাংলাদেশ দেখার সাধও মিটবে। বাবা মায়ের সঙ্গে কথা বললে, শুরুতে রাজি হয় না দু’জনার কেউ ই। ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে পরে সোহেলÑ কোথায় আমার অধিবাস? আমি অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ইউরোপ যেতে চাইলে বাবা মা কোনো আপত্তি করে না। অথচ..। কিন্ত না, আমাকে এই শিকল ভাঙ্গতে হবে। কৌশলে প্রথমে রাজি করায় বাবাকে। বাবাই রাজি করায় মাকে। ফলে, আজকে এই ¯স্নিগ্ধ নির্মল সকালে নমিতাদেও বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে।

পাশের বাড়ি কয়েকটা ছেলেমেয়ে দৌড়ে উঠোন পার হয়ে যায়। যেতে যেতে সোহেলকে দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে। সোহেল তাকিয়ে ছেলেমেয়েদের দুরন্ত শৈশব দেখছে। মনে পরে না, কোনোদিন এমন করে শৈশবে দৌড়ানোর সুযোগ হয়েছে। শহরের জীবনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক বুক ঝিম ভালোবাসায় বুকটা ভরে যায়..।
ক্যামন আছো পোলা? চমকে তাকায় সোহেল। সামনে দাঁড়ানো বৃদ্ধা। সারা শরীর জুড়ে সদ্য ¯স্নানের জল। মাথায় ঘোমটা। সিঁথির উপর সিঁদুর জ¦লছে। মুখে অনন্যমন্ডিত মাখা লাবণ্য। পবিত্র সকালটা আরও পবিত্র হয়ে উঠলো সোহলের কাছে সামনে দাঁড়ানো এই নারীকে দেখে, তুমি আমারে চেনো নাই? মুই নমিতার ঠাকুর মা।

ঠাকুর মা! মানে মানে দাদী, পায়ে হাত রাখে সোহেল, কেমন আছেন ঠাকুর মা?

ভালো। তুমি একলা ক্যা? নমিতা ওডে নাই? এই করে মাইয়া- বাড়িতে আইলে খালি ঘুমায় আর ঘুমায়। তুমি খারাও। মুই গরুর বাচ্চাডারে লইয়া আই। নমিতার ঠাকুরমা সোহলেকে অতিক্রম করে সামনের দিকে যায়। সোহেল হতবাক তাকিয়ে, ঠাকুরমা চোখে দেখতে পান না? ঠাকুরমা অনুমানের উপর ভর করে হাঁটছে। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে যখন কথা বলছিলেন,

মনে হয়নিতো!
তুই কখন উঠলি? হাই তুলতে তুলতে সামনে আসে নমিতা।
এইতো উঠলাম। ঠাকুরমাকে দেখিয়ে, উনি দেখতে পান না?
নাহ।
কি হয়েছে ঠাকুর মার?
সক্কাল বেলা ওই বোলকুমরা মহিলাকে নিয়ে তোর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
বোলকুমরা মহিলা মানে?
আমাদের এই এলাকায় বোলকুমরা নামে একটা ফল আাছে। অনেকটা বেলে মতো। উপরের রঙ সবুজ। যখন পাকে তখন হয় সিঁদুরের মতো বাইরের খোসাটা। ছেলেমেয়েরা ভুল করে সেই ফল পারে। পারার পর দেখে, ভিতরে কালো এক ধরনের ভর্তা।

আর গন্ধ। উপরেরট সিঁদুরের রঙ দেখেই ভুল করো না। মহিলা আমাকে বেশ জ্বালাতনে রাখে।
তুই ঠাকুরমাকে একটা খারাপ ফলের সঙ্গে তুলনা দিলি?
এক দেখাতেই প্রেম? ঠিক আছে যাবার সময়ে ঠাকুরমাকে তোর সঙ্গে দিয়ে দেবো। যদিও তার জামাই বহাল তবিয়তে আছে।
নমিতা হাত ধরে সোহলের, তুই তো নবাবের পোলা। আইচো আমাগো পচা নোংরা গাঁও গেরামে। ব্রাশ আনচো? না আনলে ক, আম গাছের ডাল ভাইঙ্গা মেচক বানাইয়া দি। আর বাধরুমের অবস্থা কিন্তু করুন। বদনা লইয়া যাইতে অইবে মনু…।

সোহেল হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না।
আগে আমার লগে আয়− হাতে টান দেয় নমিতা।
ও নমি, পোলাডারে ঘাডলাডা দেহাইয়া দে। মুখ ধুইবে না?

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় সোহেল, ঠাকুরমা গোয়াল ঘর থেকে বাছুর হাতে বের হয়ে আসছে। অবাক, কি নির্ভার আর স্বাভাবিক গতিতে বাছুরটা নিয়ে উঠোনের পাশে একটা কাউফলা গাছের সঙ্গে বাঁধে। বাছুরটা ছটফট করছে আর ম্যা ম্যা ডাকছে।
ঠাকুর মা আবার গোয়াল ঘরে ঢোকে। নমিতা হাত টানে। বিরক্ত সোহেল, একটু দাড়া। দেখি ঠাকুরমা কি করে? করবে ঘোড়ার আন্ডা। তুই আয়-কথার মধ্যে ঠাকুরমা গোয়ালঘর থেকে গাই গরুর দড়ি হাতে বের হয়ে আসছে। পেছনে গাই গরু- হাম্বা।

নমিতার টানাটানিতে সোহেল যেতে বাধ্য হয়। উঠোন পার হয়ে সামান্য একটা বাগানের মতো। বাগানের পরেই বড় একটা বিরাট পুকুর। পুকুরের পারে এসে দেখে, অনেক মানুষ। ছেলে বুড়ো নানা বয়সের। পুকুরের দুই পারে কয়েকটা খেজুর গাছ ফেলে ঘাটলা বানানো। সেই ঘাটলার উপর বসে কেউ মুখ ধুচ্ছে, কেউ গোছল করছে। দাঁত মাজছে মেচওয়াক দিয়ে। দুই একজনার হাতে ব্রাশও দেখতে পায় সোহেল। নমিতার সঙ্গে সোহেল দেখে সবাই তাকায়।

নমিতা হাত ছেড়ে দিয়ে বলে, এইডা ঢাহা শহর না। পুহুইরের এই ঘাটলায় বইয়া মুথ ধুইতে অইবে। পারিব না? ঘাড় কাৎ করে সোহেল, ঠিক আছে। চ্যালেঞ্জ নেয়, তুই কি মনে করছিস আমি ওই ঘাটলায় বসে মুখ ধুতে পারবো না? আমি যাচ্ছি, তুই দ্যাখ। সোহেল হন হন হাঁটে ঘাটলার দিকে। ঘাটলার উপর দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যে বয়স্ক একজনকে ডাকে, ও বিজন কাকা?
বিজন কুলি করতে তাকায়, কি?
ও আমার ইউনিভারসিটির বন্ধু সোহেল হাসান। আমার লগে আইচে গ্রাম দেখতে। পুহুরের পানিতে জীবনে হাত মুখ ধোয় নাই। অরে ঘাটলায় একটু জায়গা দাও-ঘাটলার উপর চার পাঁচ জনে বসে বসে হাত মুখ পা ধুচ্ছিল। নমিতার কথায় তিন চারজন দ্রুত কাজ সেরে উঠে যায়।

ঘাটলার কাছে গিয়ে জুতো পায়ে নামতে গিয়ে বুঝতে পারে সোহেল জুতো পায়ে নামা যাবে না। অতি ব্যবহারে ব্যবহারে খেজুর গাছের ঘাটলার উপরের ছালবাকল উঠে গিয়ে স্যাতস্যাতে পরিস্থিতি তৈরী করেছে। যেকোনো সময়ে পা পিছলে…।
আপনে জোতা খুইল্লা নামেন, বলে বিজন কাকা।

জুতো খুলে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে সোহেল। দুটো থাপ নামার পরই পা এলোমেলো। পুরো শরীর টলমল কাঁপছে। দ্রুত হাত ধরে বিজন কাকা, এহন নামেন।
আরও দু ধাপ নামার পর পানির নাগাল পায় সোহেল।
হাসে বিজন, ভয় পাইয়েন না। এহন বসেন।

ঘাটলার উপর হাঁটু মুড়ে বসার সঙ্গে সঙ্গে পানি হাতের নাগালে চলে আসে। পানিতে হাত নাড়াচারা করতে করতে সোাহেল ভাবে, গ্রাম আর শহরের মানুষের মধ্যে প্রতিদিনের জীবনাচারে কতো পার্থক্য! শহরের নাগরিক একজন সোহেল হাসানের সঙ্গে গ্রামীণ লোকায়ত জীবনের পরিচয়ের প্রথম সকাল শুরু হয় এইভাবে। মুখ ধুয়ে বাড়িতে এসে দেখে নাস্তা প্রস্তুত। ঘরের সামনে বিরাট বারান্দায় পাটি বিছিয়ে বাড়ির ছেলেবুড়োরা খেতে বসেছে।

নমিতা একে একে দাদামশাই, ছোট কাকার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সবার সঙ্গে পাটির উপর বসে। ছোট কাকী গরম ভাত নিয়ে গামলা থেকে সবার থালায় দিচ্ছে। ভাত দেয়া শেষ হতে না হতেই ঠাকুরমা তরকারি নিয়ে আসে। এবং বাটি থেকে চামচে করে সবার পাতে তরকারি দিয়ে যায় অবলীলায়। সোহেল ভেবে পায়নাÑ কিভাবে সম্ভব? গরম ভাত আর গরম তরকারি মুখে দিতেই অন্যরকম স্বাদে মুখটা ভরে যায়।

ও পোলা, রান্দন ভালো অইচে? ঠাকুরমা জিজ্ঞেস করে সোহলেকে।

বারান্দার অদূরে একটা খুটির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নমিতা । মুখে হাসি। সোহেলের ভাবনার জগৎ ওলট পালট- সামনে দাঁড়ানো হালকা পাতলা গড়নের আটপৌরের এই নমিতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে চেনাই যায় না। কি তরুণ তরতাজা চোখমুখ- মুখে চব্বিশ ঘন্টা খই ফোটে। আর গ্রামে, নিজের বাড়িতে? বাড়ির মেয়ে!
সবাই তাকিয়ে সোহলের মুখের দিকে, গরম খাবার এবং ঝাল। একটু হাপায়। সামনে রাখা গ্লাস থেকে পানি খেয়ে তাকায় ঠাকুরমার দিকে, ঠাকুরমা জীবনে প্রথম গ্রামের কোনো বাড়িতে খাচ্ছি। বললে বিশ্বাস করবেন কি না- জানি না। খুব সুস্বাদু হয়েছে। মনে হচ্ছে এতো মজার খাবার অনেক দিন খাইনি−ঠাকুরমায়ের মুখে হাসি ও প্রশান্তি ছড়িয়ে পরে।

বরিশালের উজানগাওয়ে সেই দিন থেকে পরের দুটি দিন রাত এক মায়ায় জালে কেটে যায় সোহলের। অগনিত মানুষের সঙ্গে পরিচয়, কতো বাড়িতে যাওয়া, পুকুরে কোমর পানি নেমে সাঁতার কাটা, ডাব নারকেল পেড়ে খাওয়া, পুকুরে মাছ ধরা, কচা নদীতে পা ডুবিয়ে বসে থাকা, নৌকায় কচানদী চরা, গ্রামীণ রাস্তায় ঘন্টার পর খালি পায়ে হাঁটা, রাখালদের সঙ্গে মাঠে গরু চরানো, বাঁশি বাজানো চেষ্টা, গ্রামীণ বাজার দেখা, হালচাল করার চেষ্টা- ইত্যাকার কাজে বা খেলার মধ্যে দিন রাতগুলো চলচ্চিত্রের দৃশ্যর গতিতে কেটে গেছে সোহেলের। আগামীকাল সকাল সাড়ে আটটায় বাস। ব্যাগ প্রস্তুত। একটু আগেই খেয়ে ঘুমিয়ে গেছে সোহেল। আর শরীরও ক্লান্ত। হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গে সোহেলের-বিষণ্ন শোকান্ন করুণ খান খান কান্নার বিলম্বিত তালের শব্দে। ঘুম ভেঙ্গে গেলে বিছানার উপর বসে সোহেল। এবং বুঝতে পারে, বাড়ির সবাই জেগে ওই কান্না শুনছে। ঘরের মধ্যে হেরিকেন জ¦লছে। আধো আলো আধো অন্ধকারের মধ্যে কান্নাটা বেহালার করুণ সুরের মতো প্রত্যেকের অস্তিত্বের গভীর কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করছে। কে কাঁদছে? কেনো কাঁদছে? কেউ কিছু বলছে না কেনো? সবাই চুপ করে এই ভারাক্রান্ত কান্নাকে গ্রহণ করছে কেনো? কে দেবে সোহলের এইসব প্রশ্নের উত্তর?

গ্রামীণ রাতে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটে, শুনেছে সোহেল হাসান। ঢাকায় ফিরে যাবার আগের রাতেÑনা, তেমন কিছু ভাবতে সায় দিচ্ছে না অন্তরজামী। এই ক’দিনরাতে উজানগাও গ্রামের মানুষ আর নমিতাদের বাড়ির মানুষদের সঙ্গে মিশে কথা বলে, এক অসাধারণ মানবিকবোধ নিয়ে ফিরে যাবার আগের রাতে এইসব কিছু ঘটতে পারে না। কিন্তু কাঁদছে কে?
কেনো কাঁদছে? ঘোর লাগা ভাবনার মধ্যে বিছানা থেকে নামে সোহেল হাসান। সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায় নমিতা। ধরে হাত, মুখের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ভয় পেয়েছিস?
কাঁদছে কে? পাল্টা প্রশ্ন করে সোহেল।

আমার সঙ্গে আয়, হাত ধরে দরজা খুলে উঠোনে নামে নমিতা। সোহেল ভেবে পায় না, কেনো নমিতা এমন কোমলগান্ধার স্বরে কথা বলছে! মনে হচ্ছে এই কান্না ও অনুভব করে, এই রাতের নিস্তব্দতা খান খান করে ভেঙ্গে দেয়া কান্নাকে ও ধারণ করে। কেনো? উঠোনে নেমে একেবারে বাড়ির শেষ প্রান্তে, ঝাকড়া আমগাছের আড়ালে নিয়ে যায় সোহেলকে।
কে কাঁদছে বুঝতে পারছিস? জিজ্ঞেস করে নমিতা হালদার।
না। কিন্ত কে কাঁদছে? কেনো কাঁদছে?
আমার ঠাকুরমা কাঁদছে।
ঠাকুরমা কাঁদছে? কেনো?

মুখরা নমিতা হালদার কেমন বিষন্নতায় আক্রান্ত। উপরের আকাশে ঝলমলে চাঁদ। আম পাতার ফাঁক গলে সেই রুপালী আলোর প্রপাত নমিতার গোলাপী গালে, ওষ্ঠে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। ঠাকুরমার কান্নার শব্দ এখান থেকে খুব কম ভলিউমে শোনা যায়−ছিন্ন এ¯্রাসের সুরে। নমিতা কি কিছু গোপন করতে চাইছে আমার কাছেÑ ভাবছে সোহেল।

আমার বাপ কাকারা তিন ভাই। সব চেয়ে বড় কাকা প্রশান্ত হালদার ছিলেন উজানগাও হাইস্কুলের অংকের শিক্ষক।

মানুষের মুখে শুনেছি− প্রশান্ত কাকাকে বলা হতো অংকের জাহাজ। এমন কোনো অংক নাই তিনি পারতেন না। দূর দূরান্ত থেকে কাকার কাছে অংক শেখার জন্য লোক আসতো। প্রশান্ত কাকা স্কুলে বা বাড়িতে বসে সেইসব মানুষদের গণিত শেখাতেন। এই মানুষটার দুনিয়াতে একটাই প্রিয় জায়গা ছিল, ঠাকুরমায়ের কোল। সেই সময়ে ঠাকুরমার কি একটা রোগে চোখ থেকে পানি ঝরতো। পিরোজপুরে নিয়ে ডাক্তার দেখানোও হয়েছে। আজ থেকে বিশ বাইশ বছর আগে এই অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসার জন্য মহকুমা শহর পিরোজপুরের বাইরে যাওয়ার সাহস করতো না। সুতরাং ঠাকুরমার চোখ আর ভালো হয়নি। আরও খারাপ খবর হলোÑ কোনো এক কবিরাজ দিয়ে চিকিৎসা করেছিলেন ঠাকুরদা। সেটা আরও খারাপ হয়েছিল।

চোখের জন্য কাঁদছে ঠাকুরমা? প্রশ্ন করে সোহেল।
না, ঠাকুরমা কাঁদছেন বড় ছেলে প্রশান্ত কাকার জন্য।
মানে? তিনি কোথায়?
একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মেঝো কাকা যুদ্ধে চলে যায়। আমার বাবা ছোট। তখন বাবার বয়স ছিল ষোলো বছর।
আমার বাবা ছিল অসুস্থ। তাই দূরের গ্রাম পিসিদেও বাড়িতে ছিল লুকিয়ে। আর প্রশান্ত কাকাকে ঠাকুরমা নিজেই যুদ্ধে যেতে দেননি।

কেনো? ওনার তো সবার আগে যাওয়ার কথা। বড় ভাই-হ্যাঁ তোর কথাই ঠিক। প্রশান্ত কাকা যেতেও চেয়েছিলেন কিন্তু ঠাকুরমা যেতে দেন নি। আগেই বলেছি তোকে প্রশান্ত কাকা মা ছাড়া দুনিয়ায় কিছু বুঝতো না। বিয়ে করেছেন। একটা বাচ্ছাও হয়েছেÑকিন্তু মায়ের পাশে না ঘুমুলে তার ঘুম আসতো না।
খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে প্রশান্ত কাকার সব কাজ করে দিতেন ঠাকুরমা। তো যুদ্ধের সময়ে ঠাকুরমা বললেন, প্রশান্ত যুদ্ধে গেলে না খেয়েই মারা যাবে। যুদ্ধ করবে কখন? আর আমার মনে হয় কাকা যুদ্ধ রক্ত এসব ভয় পেতেন। সুতরাং মায়ের প্রশয় পেয়ে তিনি যুদ্ধে গেলেন না। বাড়ি থেকে গেলেন। কিন্তু প্রলয় শুরু হলে দেবালয়ও রেহাই পায় না। তুইতো জানিস আর সবার মতো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গোটা বাংলাদেশটাইতো ল-ভ- করে দিয়েছিল হায়েনা পাকিস্তানী আর্মী আর এ দেশের রাজাকাররা।

প্রশান্ত কাকা কি রাজাকারদের হাতে ধরা পরেছিলেন?

আমাদের বাড়ির পূর্ব দিকে যে পাড়াটা, ওটা ব্যাপরী পাড়া। ওই ব্যাপারী বাড়ির সাত্তার ব্যাপারী ছিল এই এলাকার রাজাকার কমান্ডার। শুনেছি- তার ছেলেমেয়েরা প্রশান্ত কাকার কাছে গণিত শিখতো। ওরাতো সব খবর রাখতো। যে কোনোভাবেই হোক রাজাকাররা জেনে গিয়েছিল আমাদের মেঝো কাকা উমেশ হালদার যুদ্ধে গেছেন। তো একরাতে আমাদের বাড়ি ওরা আক্রমন করে। তখন কাকা ভাত খেতে বসেছিলেন। ভাত দিচ্ছেলেন ঠাকুরমা। ঠিক সময়ে এসে রাজাকার আর বর্বর পাকিস্তানী মিলিটারীরা প্রশান্ত কাকাকে তুলে নিয়ে যায়। ঠাকুরমা দুহাতে ঝাপটে ধরেছিলেন প্রশান্ত কাকাকে। বলেছিলেনÑআমারে মাইরা হালান। আমার পোলাডারে মাইরেন না। কে শোনে কার কথা! যখন ঠাকুরমা ছাড়ছিলেন না প্রশান্ত কাকাকে তখন লাথি দিয়ে সরিয়ে দিয়ে কাকাকে নিয়ে যায় রাজাকারেরা।

বাড়ির আর কেউ তখন কোথায় ছিল?

বাড়ির সবাইতো ভয়ে তটস্থ। দিনের বেলায় রাজাকাররা এসে আমাদের ক্ষেতের ফসল, গোয়ালের গরু ছাগল হাস মুরগী নিয়ে যেতো। আর হুমকি দিতো। দিনের বেলা যেমন তেমন রাত হলে সবাই গোয়াল ঘরের মাচায় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতো। কেউ কেউ জঙ্গলে চলে যেতোÑ সে এক বিভীষিকার দিনরাত গেছে রে। ভাগ্যিস আমরা একাত্তরের পরে জন্ম নিয়েছি-

প্রশান্ত কাকার কি হলো? সোহেলের গলা বিষন্ন।

নিয়ে যাবার পর আর ফিরে আসেননি তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুনেছি প্রশান্ত কাকাকে কচানদীর পারে দাঁড় করিয়ে গুলি করে লাশ ¯রাতে ভাসিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান আমী আর রাজাকারেরা মিলে। সেই রাত থেকে ঠাকুরমার কান্না শুরু।
ঠাকুরমা ইনিযে বিনিয়ে কাঁদতেন আর বলতেন- প্রশান্তকে আমি মেরেছি।
মানে?

প্রশান্ত কাকা যুদ্ধে গেলে তো বেঁচে যেতেন। তিনি যেতে দেন নি. দায় তাঁর। মেঝ কাকা তো এখনও বেঁচে আছেন। যুদ্ধের পরে তিনি খেতাব পেয়েছেন বীরবিক্রম। প্রশান্ত কাকাকে যদি ঠাকুরমা যেতে দিতেন..
উজানগাওয়ের রাতটা সোহেলের চওড়া কাঁধের উপর ভারী হয়ে আসে। বিপন্ন আর অস্থির মনে হয় নিজেকে। এই দেশটার স্বাধীনতার জন্য কতো মানুষ কতোভাবে জীবন দিয়েছে, সবটা কি ইতিহাসে লেখা হয়েছে? লেখা সম্ভব? ঠাকুরমায়ের বুক ভরা রোদনের ভাগ কেউ নিয়েছে? নিশ্চয়ই না। সোহেল প্রশ্ন করে নমিতাকে, এখন কেনো কাঁদছেন ঠাকুরমা?

সেই সময়েতো বাড়ির বা গোটা দেশের মানুষের অস্তি¡ত নিয়েই টানাটানি ছিল। কে কাকে শান্তনা দেবে? প্রশান্ত কাকাকে হত্যার পরের দিন এই বাড়িতে আর কোনো পুরুষ ছিল না। একা একা গোটা বাড়ি সামলেছেন ঠাকুরমা। তো কাকাকে রাজাকারেরা নিয়ে যাওয়ার দিন তারিখ ঠিক নিদির্ষ্ট করে কারো মনে নেই। ঠাকুরমা একা একা প্রশান্ত কাকার জন্য দিনরনাত কান্নাকাটি করতেন। কাঁদতে কাঁদতে চোখ দুটোর যে সামান্য আলো ছিল চিরকালের জন্য নিভিয়ে দিয়েছেন। এবং তিনি নি:অক্ষর। কোনোদিন স্কুলে যাননি। নিজের নাম লিখতে পারেন না। কিন্তু বছরের এই একটা রাত তিনি কেমন করে বুকের ভেতরে পুষে রেখেছেন, কি চিহ্নে ধারণ করেছেন, আমরা জানি না।

মানে? সোহেল হাসানের শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। কী বলতে চাস তুই?
একুশ বছর ধরে ঠাকুরমা ঠিক এই রাতে প্রশান্ত কাকাকে মনে করে কাঁদেন… সারা বাড়ি হাঁটেন আর খুঁজে ফেরেন প্রিয় পুত্রকে।
আজতো নভেম্বরের এগারো তারিখ-
কোন শক্তিতে, কোন পূন্যতে ঠাকুরমা ছেলের হারিয়ে যাওয়ার রাতকে হিসেবে রাখেন আমরা জানি না। কিন্ত যে রাতেই তিনি করুণ সুরে রোদন করেন এই বাড়ি ও আশাপাশের সবাই বোঝে.. ঠাকুরমা কেনো কাঁদছেন!

জায়গাটা এখন আর চেনার কোনো উপায় নেই, চারপাশে এতো নতুন নতুন বাড়িঘর উঠে গেছে যে, এককালে এটা যে একটা বিরাট বিল ছিল তা এখন আর বোঝাই যায় না। বিলের প্রকৃত শুরু যেখান থেকে হবার কথা, সেখানে এখন একতলা, দোতলা…পাঁচতলা ভবন দাঁড়িয়ে, আর এসব ভবনের পাশ ঘেঁষে সাপের মতো এঁকেবেঁকে গেছে পাকা রাস্তা। এই রাস্তার আশপাশে কিংবা একটু দূরে ইটের বাউন্ডারি ঘেরা যেসব টুকরো টাকরা জমি এখনো খালি পড়ে আছে, তার কোনো কোনোটিতে চলছে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ, ইটভাঙা মেশিনের অনবরত খটখটর আওয়াজ, রড কাটা, হাতুড়ির উঠানামার ঠং ঠং শব্দ, ব্যস্ত শ্রমিকদের ঘামের গন্ধে বাতাসও কেমন ভারি হয়ে আছে; এরপর বিলের যেটুকু খালি জায়গা চোখে পড়ে, একেবারে সেই তলানি পর্যন্ত, যেখানে এখনো এই চৈতবোশেখে একটু আধটু জল জমে থাকে, তার প্রায় সবটুকুই টুকরোটাকরা বাউন্ডারি ঘেরা। কতো যে ভাগ হয়ে গেছে জমি! হিসাব কষতে গেলেও মনে হয়, ভুল হয়ে যাবে। আর জলটুকুর ও-পাশে শক্ত করে আসন গেঁড়ে বসেছে তিনচারটি হাউজিং কোম্পানির সাইন বোর্ড− বসুন্ধরা, যমুনা, সবুজ ছায়া, আরেকটা যেন কী − অনেক দূরে বলে সাইন বোর্ডের লেখাগুলোর দিকে অনেকক্ষণ নিরিখ করেও চোখ তা উদ্ধার করতে পারে না। বিলের ও-পাশে ধলেশ্বরী নদী থেকে মেশিনে বালি তুলে মোটা মোটা পাইপের মাধ্যমে তা চালান করে দিচ্ছে বিলের এদিকে। হরদম চলছে বিল ভরাট করার কাজ। দেখে মনে হয়, অজগরের মতো মোটা মোটা লোহার পাইপগুলো গিলছে পুরো বিলটাকে।

দেশের জনসংখ্যা যে কী পরিমাণ বেড়েছে, আবাসন সংকট যে কতো তীব্র, হাউজিং কোম্পানিগুলোর রমরমা ব্যবসা এবং এই বিলাঞ্চলেও তাদের ঝকমকে সাইনবোর্ডগুলো দেখেই তা বোঝা যায়, আর মনে হয়, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার যতো কলাকৌশল আর অত্যাধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করার জন্য জনগণকে উৎসাহিত করুক না কেন, সব প্রচেষ্টাই ভেস্তে যাচ্ছে। ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসন থাবার রাহুগ্রাসে রাতারাতি বদলে যাচ্ছে গ্রামগঞ্জের চেহারা। চেনাজানা জায়গাই কতো অচেনা লাগে এখন। আর এখানে তো আবুল হাশেম কোনোদিন আসেইনি। কোথায় যে সেই গাছপালায় ঢাকা একটা পোড়ো ভিটা, ভিটাসংলগ্ন একটা মজা পুকুর, তা সে খুঁজে বের করবে কীভাবে? যতোদূর চোখ যায়, হাউজিং কোম্পানির সাইনবোর্ড, টুকরোটাকরা জমি, লোকালয়ের দালানকোঠা আর ঘরবাড়ি ছাড়া ওই রকম কিছু আবুল হাশেমের নজরে পড়ে না। যে আদুচাচা তাকে জায়গাটার বর্ণনা দিয়েছে, সে-ও যদি এখন এই এলাকাটা একবার দেখতো, তাহলে, আবুল হাশেমের বিশ্বাস, তারও টাসকি লেগে যেতো। এখন সে কী করবে, ভেবে ঠিক করতে পারে না, হাতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে, প্রায় পনের কিলোমিটার দূর থেকে টেম্পু, রিকশার ঝাকুনি সয়ে সয়ে সে এসেছে, শুধু ওই জায়গাটা এক নজর দেখবে বলে, তারপর জায়গাটার কয়েকটা ছবি তুলে নেবার জন্য ক্যামেরাঅলা দামি মোবাইল সেটটাও সাথে করে নিয়ে এসেছে সে, এখন খালি হাতে ফিরে যেতে তার ইচ্ছে করে না। কী করে জায়গাটার নামনিশানা পাওয়া যেতে পারে, তার একটা উপায় সে একটু আগে মনে মনে ঠিক করেছে, আর তা হলো, এই এলাকার কোনো পুরনো লোককে খুঁজে বের করা, তার কাছে জায়গাটার মোটামুটি একটা বর্ণনা দিতে পারলে নিশ্চয় সে ঠিক ঠিক বলে দিতে পারবে, এমন কী সাথে করে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েও দিতে পারে? কিন্তু ওইরকম লোক খুঁজে পাওয়াও খুব সহজ ব্যাপার নয়, এই তো একটু আগে, ষাট সত্তরের কোঠার একজন বয়স্ক লোককে দেখে সে ভেবেছিল, লোকটি স্থানীয়; তার কাছে এগিয়ে গিয়ে সে জায়গাটির বর্ণনা দিয়ে জানতে চেয়েছিল, তার কোনো হদিশ সে দিতে পারে কি না। কিন্তু লোকটি তার আপাদমস্তক একনজর দেখে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তা সম্ভব নয়, কারণ, এই তো অল্প কিছুদিন হলো জমি কিনে সে বাড়ি করেছে। এই এলাকার এমন কিছু সে চেনেজানে না। তবে যাদের মাধ্যমে সে জমি কিনেছে, তারা এই এলাকার নাড়িনক্ষত্র চেনে, জমির দালাল তারা, তাদের একজনের নাম নাছির উদ্দিন, মোড়ের ওই চায়ের দোকানে গেলেই তার খোঁজ পাওয়া যাবে, দোকানে সে না থাকলেও, কাছেধারে কোথাও গেলে, খবর পেলে ঠিক ঠিক ছুটে আসবে, সে নিশ্চয় এর একটা বিহিত করতেপারবে।

অতঃপর আবুল হাশেমের গন্তব্য সেই চায়ের দোকান। দোকানটা ছোট। ছোট হলেও কাস্টমারের অভাব নেই। একটা বেঞ্চে বসার মতো একটু জায়গা পাওয়া গেলো। সেখানে বসে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে সে খোঁজ করলো নাছির উদ্দিনের। ছোকড়া দোকানদার, ঝটপট কাপটা ধুতে ধুতে কোণার দিকে হাক ছাড়লো, এই নাছির ভাই, আপনারে ওই লোকটা খুঁজে। কোণার টেবিলটাতে তিনচারজন লোক সিগ্রেট ফুঁকছিল। তার মধ্যে একজন, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, দোকানদারের দিকে একবার তাকালো, দোকানদার আবুল হাশেমকে দেখিয়ে দিতেই সে তাড়াতাড়ি উঠে এলো তার কাছে। সে হয়তো ভেবেছিল জমির কাস্টমার, তাই মুখটা বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, কিন্তু যখন সে জানতে পারলো আবুল হাশেম ওই রকম কেউ নয়, তখন তার সাথে কথা বলার আগ্রহটাই যেন মরে গেল তার, তবু এলাকা সম্পর্কে নিজের বিশাল অভিজ্ঞতা জানাতে সে কার্পণ্য করলো না, সে বললো যে, প্রায় বছর তিনেক হলো সে এই এলাকায় বাড়ি করে বসবাস করছে, তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব অনেককে সে জমি কিনে দেবার জন্য এই এলাকার প্রায় সবটাই চষে বেড়িয়েছে, কিন্তু ওই রকম কোনো পোড়ো ভিটা তার চোখে পড়েনি। তাছাড়া ওই ভিটাটাই বা তার কেন দরকার, কী আছে সেখানে, এসব কিছু সে জানতে চাইলো না, যেখান থেকে উঠে এসেছিল, ফের সেখানে গিয়ে লোকগুলোর সাথে কথা বলতে লাগলো। অর্থাৎ বিনা স্বার্থে দু’মিনিট সময়ও সে ব্যয় করতে রাজি নয়। এখন তাহলে কী করা যায়, চা খেতে খেতে ভাবতে লাগলো আবুল হাশেম। চোখের সামনে ভেসে উঠলো আদুচাচার মুখ। ইশ্ বছর দশেক আগে যদি একবার আদু চাচাকে সঙ্গে নিয়ে আসা যেতো, তাহলে ভালই হতো, জায়গাটার একটা হদিশ করা সহজ হতো, কিন্তু তখন আসি আসি করেও আর আসা হয়ে ওঠেনি, আর এখন আদুচাচার যা অবস্থা, চোখে তো বলা চলে দেখেই না, হাঁটতে পারে বলেও মনে হয় না, দিনরাত ওই একটা পুরনো চৌচালা ঘরের মধ্যে তার বসবাস, ধুনকের মতো বাঁকা শরীরটা নিয়ে সে খালি ঝিমোয় আর ঝিমোয়, পাশ দিয়ে কেউ গেলে যদি সে টের পায়, তাহলে হঠাৎ হঠাৎ হয়তো সে জিগায়, কেডা যায়; কেউ ইচ্ছে হলে জবাব দেয়, না হলে, কোনোরকম ভ্রক্ষেপ না করে চলে গেলেও কোনো অসুবিধা নেই, আদুচাচার সাধ্য নেই জোরে একটা ডাক দিয়ে তাকে থামানোর। ক্ষীণ কণ্ঠস্বর আপনিই বন্ধ হয়ে যায়, বিরক্তি কিংবা শারীরিক অক্ষমতায়। তাছাড়া তার কাছে বসে নিজের নাম বললেও, কখনো কখনো সে সহজে কাউকে চিনে উঠতে পারে না, বাবার নাম জিগায়. দাদার নাম জিগায়, বাড়ি কোথায়, কোন গ্রাম…এই সব জিজ্ঞেস করতে করতে, কোনো জবাবের অপেক্ষা না করে, একসময় হয়তো নিজের শৈশব কৈশোরের স্মৃতির মধ্যে ডুবে যায়, মৃত স্ত্রী মাজুবিবির মুখ মনে পড়ে, তারপর একা একাই সে বিড় বিড় করতে থাকে, কী বলে তা অবশ্য বোঝা যায় না, তার পাশে কেউ একজন যে বসে আছে, একথাও তার মনে থাকে না। তো, এমন একজন মানুষকে এতোদূর. পায়ে হেঁটে আনা তো দূরের কথা, রিকশা কিংবা গাড়ি ঘোড়া করে নিয়ে আসাও বিরাট ঝক্কির ব্যাপারস্যাপার, তাছাড়া তাকে এনেও তো কোনো লাভ নেই, জায়গাটা যে কোথায়, তা সে কোনোভাবেই দেখিয়ে দিতে পারবে না এখন। তবে বছর দশেক আগে হলে, বোধহয় দিকনির্দেশনা মোটেও ভুল হতো না তার, কারণ তখন ডায়াবেটিস তার শরীরে বাসা বাঁধলেও, চোখের আলো পুরাপুরি খেয়ে ফেলতে পারেনি, শরীরটাও বেশ শক্তপোক্ত ছিল, আর স্মৃতি, বলা চলে, তাকে সারাক্ষণই দাবড়িয়ে বেড়াতো, শৈশব কৈশোরের ঘটনা এমনভাবে সে বর্ণনা করতো, শ্রোতাদের মনে হতো, এই তো চোখের সামনেই বুঝি ঘটে যাচ্ছে সব। তখন, কোনো একদিন বিকালবেলা কিংবা রাতে নানারকম স্মৃতিচারণ করতে করতে এক সময় আচমকাই সে ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল, একবার এই জায়গাটায় আসার। তখন সাথে সাথে যদি সে রাজি হয়ে যেতো, আর তার পরদিন যদি তাকে নিয়ে রওয়ানা হতো, তাহলে সেদিন নিশ্চয় জায়গাটার একটা হদিশ করা যেতো, আজ এতো বিড়ম্বনার মধ্যে তাকে পড়তে হতো না। কিন্তু তখন কোন পাগলে যে পেয়ে বসেছিল, ভাবলো সে, একেবারে চুপ করে ছিলাম, সেদিন না হয় চুপ করে ছিলাম, কিন্তু তার পরদিন, পর দিনের পর দিন, কিংবা তার মাস খানেক পরে হলেও তো অসুবিধা ছিল না, ঠিকই সে আসতে পারতো, কিন্তু তখন কেন যে এলাম না। তারপর যখন আসতে চাইলাম, তখন, তার হার্ট বিকল হয়ে গেছে, কিডনিতে ক্ষয় ধরেছে, আর অল্পদিনে শরীর এতো ধসে গেলো যে, সেই যে সে শয্যা নিলো, তারপর আর ভালমতো উঠতেই পারলো না। ডায়াবেটিস যে কী ভয়ঙ্কর রোগ তা তার শরীরের পরতে পরতে নজীর রেখেছে। হাড়গুলো সব ভাঙা নায়ের গুড়ার মতো জেগে উঠেছে। এখন সে পুরনো জংধরা ওই চৌচালা টিনের ঘরের নড়বড়ে একটা চৌকিতে শুয়ে শুয়ে কিংবা কখনো কখনো ঘরের দাওয়ায় পিঁড়িতে বসে চরম অবহেলা আর উপেক্ষায় মৃত্যুর জন্য প্রহর গোণছে। ঠিক মতো তিনবেলা খেতে পায় বলেও মনে হয় না। কারণ চাচীর মৃত্যুর পর দুছেলের মধ্যে সংসার ভাগ হয়ে গেলে, বুড়ো আদুচাচাও ভাগ হয়ে যায়। তখন থেকে মাসের প্রথম পনেরদিন বড় ছেলের ঘর থেকে এবং মাসের শেষ পনেরটা দিন ছোট ছেলের ঘর থেকে তার জন্য তিনবেলা খাবার আসার কথা। কিন্তু তিনবেলা তা আসে বলে মনে হয় না আবুল হাশেমের। প্রত্যেক ছেলে-বউ তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত, এই দুর্মূল্যের বাজারে সংসারের আয়-উন্নতি নিয়ে তাদের মাথা ঘামাতে হয়, কই মাছের প্রাণের মতো এই বুড়োর খাবারদাবার, যত্ন আত্তি নিয়ে, তাদের ভাবার এখন সময় কোথায়, তাছাড়া খাওয়াদাওয়া একটু বেশি পেলে বুড়ো নাকি মাঝে মাঝেই কাপড়চোপড় নষ্ট করে ফেলে, তখন বাড়ি জুড়ে বউঝিদের চড়া গলায় বুড়োর চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধারকর্ম চলতে থাকে, দুনিয়ার যতোরকম শাপশাপান্ত তাদের মনে আসে, দরাজগলায় অনবরত তা তারা করতে থাকে, অনেক দূরে থেকেও তা স্পষ্ট শোনা যায়। ও-সব কথা বুড়ো আদুচাচার কানে ঢুকে কিনা, বোঝা যায় না, কারণ সে তখনো ভাবলেশহীন শূন্য চোখে কখনো ঘরের উঁচু টুই কিংবা অন্যকোনো দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে, হয়তো মরণকেই সে ব্যাকুল হয়ে খোঁজে, কিন্তু পায় না। কিন্তু বুড়ো আদুচাচার যদি তখন বিন্দুমাত্র হুঁশজ্ঞান থাকতো, তাহলে সে দেখতে পেতো, গুয়ের গন্ধে তিষ্ঠাতে না পেরে ছেলের বউঝিরা তাকে সাফসুতরো করার সময় এক একজন এক একদিন কীরকম আজরাঈল হয়ে উঠেছে।

আদুচাচার মুখটা চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যেতে যেতে চা-খাওয়া শেষ হওয়ায় সে অনেকটা হতাশ কিংবা বেদনাভারাক্রান্ত মনে টেবিল থেকে উঠে এসে ছোকড়াকে চায়ের বিল মিটিয়ে দেবার সময় সে দেখলো, মাথায় টুপি, মুখে পাকা দাড়ি, লুঙ্গি আর শাদা পাঞ্জাবি পরা একজন বয়স্ক লোক দোকানে ঢুকছে, তখন কোণার টেবিল থেকে নাছিরউদ্দিন বললো, এই যে, ভাই, শুনেন, আবুল হাশেম তার দিকে তাকালে সে বললো, আপনার সামনে ওই যে উনি, আক্কল আলী চাচা, এই এলাকার পুরনো লোক, এই ইউনিয়নের সচিব ছিল দীর্ঘদিন। উনার কাছেই জিগায়া দেখেন, এইরকম কোনো জায়গা এই এলাকায় কোনোদিন ছিল কি না। তারপর গর্বভরে পানের পিকে লালচে-হলুদ দাঁত কেলিয়ে হাসলো সে। কোনোকিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সেই লোকটি মানে আক্কেল আলী চাচা বেশ ভাল করে আবুল হাশেমকে একনজর দেখলো, তারপর নাছিরউদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বললো, এই নাছির কী সমস্যা উনার?

নাছির বললো, তা উনারেই জিগান, চাচা। লোকটি তার দিকে তাকাতেই আবুল হাশেম বললো,
আমি একটা জায়গা খুঁজছি, কিন্তু লোকেশনটা কেউ বলতে পারছে না?
কিনবেন নাকি?
না, দেখার জন্য এসেছি।
দেখার জন্য!
হ্যাঁ, বলতে পারেন শুধু একনজর দেখার জন্য।
শুধুই দেখার জন্য! আচ্ছা কী ধরনের জায়গা, বলেন তো দেখি…।

চায়ের দোকানে ঢুকে লোকটি, সেই টেবিলেই বসে পড়লো, একটু আগে যে টেবিলটি ছেড়ে উঠে এসেছিল আবুল হাশেম, তারপর চোখের ইশারায় আবুল হাশেমকে তার সামনে মুখোমুখি বসার ইঙ্গিত দিয়ে তার নাম ঠিকানা জানতে চাইলো সে। আবুল হাশেম নিঃশব্দে চেয়ারে বসে নামঠিকানা সব বললো। তখন দোকানী ছোকড়া আক্কেল আলীর দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বললো, ও চাচা, চা দিমু? আক্কেল আলী হাত ইশারায় তাকে বারণ করলে দোকানদারের মনটা খানিক ভার হয়ে যায়, মুখের হাসি ম্লান হয়ে আসে। সে অন্য কাস্টমারের জন্য চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লে সে আবুল হাশেমকে প্রশ্ন করে, এবার বলেন তো কী ধরনের জায়গা?

আবুল হাশেম বললো, আসলে বিল যেখান থেকে শুরু, সেখানে কোথায় নাকি একটা পোড়ো ভিটা আছে। তার পাশে বড় একটা পুকুর।
আক্কেল আলী চুপ করে রইলো, তারপর জিজ্ঞেস করলো, কতোদিন আগের কথা?
তা ঠিক জানি না। তবে আমার জানামতে ঊনচল্লিশ চল্লিশ বছর আগে সেই ভিটা আর পুকুরের অস্তিত্ব ছিল এই এলাকার কোথাও।
আক্কেল আলী কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে কী যেন ভাবলো, তারপর হঠাৎ বললো, ওহ্ হ বুঝছি, কী
খুঁজছেন আপনি, খালাসিগো ভিটা, তাই না?
আবুল হাশেম বললো, আমি ঠিক জানি না, কার ভিটা সেটা। কিন্তু ভিটাটা ঠিক সেরকম, যা আমি আপনাকে বলেছি। আর ওইরকম একটি ভিটা আর পুকুর নাকি তখন এই এলাকায় আর কোথাও ছিল না।
হ বুঝছি, আর বলতে হবে না। ওটা ছিল খালাসিগো…।

তাহলে কোথায় সেটা, সেখানে যাবার রাস্তাটা কি…প্রায় উঠতেই যাচ্ছিলো আবুল হাশেম, আক্কেল আলী তাকে থামালো, আরে বসেন বসেন, কোথায় যাইতে চান আপনি, সেই ভিটা আর পুকুর দেখতে তো? কিন্তু তার কোনো চিহ্ন এখন আর নাই।
সংশয় আর হতাশায় ডুবে যেতে যেতে আবুল হাশেম বললো, নাই! কী বলেন?
না, নাই। পছর পাঁচেক আগে, ঢাকার এক ব্যবসায়ী তোরাব আলী সেই ভিটা আর পুকুরটা চড়াদামে কিনে মাটি ভরাট করে পাওয়ার লোমের ফ্যাক্টরি দিছে। এখন রাতদিন সেখানে মেশিন চলে।
আবুল হাশেম বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। চোখমুখে আঁধার দেখে আক্কেল আলী তাকে প্রশ্ন করলো,
এতোদিন পর সেই জায়গাটার খোঁজ করার কী এমন দরকার পড়লো?
আবুল হাশেম বললো, দরকার আছে। আমার ছোট চাচা মানে একমাত্র চাচা শহীদ আলফাজ মিয়ার কবর সেই জায়গায়?

আপনি তো এই এলাকার কেউ না। তা আপনার চাচার কবর এখানে এলো কী করে? বুঝলাম না। আমার চাচা মুক্তিযোদ্ধা ছিল, আবুল হাশেম বলতে লাগলো, একাত্তরে জুলাই মাসে এইখানে পাকবাহিনীর সাথে এক যুদ্ধে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয় সে। সেই সময় লাশ গ্রামে নিয়ে দাফন করা সম্ভব হয়নি। তাই তার সঙ্গীরা এখানেই তাড়াহুড়ো করে তাকে কবর দিয়েছিল। একটা পোড়ো ভিটা, ভিটাসংলগ্ন একটা পুকুর, সেই পোড়ো ভিটার পশ্চিম পাশে তার কবর…।
হ। একটা কবর আমরা দেখছিলাম সেই জায়গায়। কিন্তু কবরটি মুক্তিযোদ্ধা না রাজাকারের তা আমরা জানতাম না, যুদ্ধের শেষের দিনগুলোতে আমরা কেউ এই এলাকায় ছিলাম না। মিলিটারি আসছে, এই সংবাদ শুনেই আমরা বাড়িঘর ফেলে যে যার মতো পালায়ে গেছিলাম। স্বাধীনের পর ফিরে আসি। তারপর একদিন বিকালে হাঁটতে হাঁটতে ওই দিকে গিয়ে প্রথম দেখতে পাই কবরটা।
আপনারা তাহলে তার কিছুই জানতেন না?

না। জানার কোনো উপায় ছিল না। এই গেরামের কেউ হলেই না জানবো। আর তাছাড়া তখন এদিক ওদিক এতো এতো অজানা অচেনা লাশ পড়েছিল যে, এই নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় ছিল না সেটা। দেখতে দেখতে কবরটা একদিন মাটির সাথে একেবারে মিশে গেলো। তারপর আবুল হাশেমকে জিজ্ঞেস করলো সে, এতোদিন পর কেন? আরো আগে এলেই তো পারতেন। অন্তত বছর চারেক আগে…।

আসলে তখন বুঝতে পারিনি। তাছাড়া…।
তাছাড়া?
আমার বাবা রাজাকার ছিল তো। স্বাধীনতার পরও তার কোনো অসুবিধা হয়নি। দিন দশেক আগেও বেশ দাপটের সাথে গ্রামশাসন করেছে। এখন সে শুয়ে আছে কবরে। বাবা কোনোদিন চাচার নাম মুখে আনেনি। অনেকদিন আমরা কেউ জানতামও না যে আমাদের কোনো চাচা ছিল। বছর দশেক আগে, তখন আমি বেশ ছোট, ক্লাশ ফাইভে পড়ি, তখনই একদিন বিকালে, মুক্তিযোদ্ধা আদুচাচার কাছে জানতে পারি, কলেজে পড়ার সময় আলফাজ চাচা যুদ্ধ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছে। তার কবর এই এলাকায়। তখন একবার আদুচাচার সাথে চাচার কবরটা দেখার জন্য আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাবার ডরে সাহস পাইনি। কিন্তু এখন যখন এলাম তখন…তখন
যদি একবার সাহস করে আসতাম…।
টেবিলে গালে হাত ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে রইলো আবুল হাশেম। আক্কেল আলী তাকে সান্ত¡না দিলো, এখন আর মন খারাপ করে কী হবে? এখন আর করার কিছুই নাই।
আবুল হাশেম বললো, না এখনো করার মতো অনেক কিছুই আছে। আমি সেখানে যাবো, নিজের চোখে একবার দেখবো জায়গাটা, স্পর্শ করবো তার মাটি। আপনি কি আমাকে রাস্তাটা দেখিয়ে দেবেন?
আক্কেল আলী কিছু বললো না। চুপ করে রইলো। তাকিয়ে রইলো একটু দূরে একটা পাওয়ার লোম ফ্যাক্টরির দিকে। সেখান থেকে ক্রমাগত চলমান মেশিনের শব্দ আসছে…। আবুল হাশেমের মনে হলো, শব্দটা খুবই কর্কশ আর বিশ্রী।

সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে ঊর্ধ্বমুখী ধোঁয়ার কুন্ডলী ছড়ায় আলতা বানু। আড় চোখে শ্যেনদৃষ্টিতে ঋতুকে যেনো পড়ে নেয় একজন বিশে¬ষকের মতো। ভ্রু দুটো কপালে তুলে জানতে চাইলো কী চায় সে এই পতিতালয়ে। ইন্টারভিউ? কার? আলতা বানুর? কিন্তু কেনো? ত্রিশ বছর আগে যে পর্বের পালা শেষ করে ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে এই নিশাচর পল্লীতে তাকে আর কেনো পিছু ডাকা! বীরাঙ্গনা রাজকীয় নাম ভূষণটির খোলসমুক্তি ঘটিয়েছে সেই কবে। যে মনের চিতা ভস্ম হয়ে গেছে সেখানে কোনো মণিমাণিক্য খুঁজে পাওয়া যায় কী? এ ভষ্ম তো স্বর্ণকারের আগুনের নয় যে খুঁজলেও কিছু প্রাপ্তি ঘটবে। ছিটেফোটা স্বর্ণ হাতে এসে যেতেও পারে হয়তো। এতো কাল পর আয়ুক্ষয়ে দেহে-মনে অবশিষ্ট কিছু আনন্দ আর বেঁচে নেই, যা দিয়ে কিচ্ছা কাহিনি রচনা করা যায়। আলতাবানু চায় না এই দেহে আর পোস্টমর্টেম হোক।
নিবিড়ভাবে আলতাবানুকে পর্যবেক্ষণ করছে ঋতু। চেহারায় ভদ্রঘরের বলেই মনে হয়। যদিও বয়সের ভারে সময়ের যাঁতাকলে বীরাঙ্গনার জীবন আজ ক্ষয়িষ্ণু। দেহপসারিণীর জীবনে কি আর শেষ পরিণতি আছে? কত জনমের বেদনার করাঘাতে বলিরেখা ওই কপাল জুড়ে। শরীরের সৌন্দর্য কালের ঘাত-প্রতিঘাতে ব্ল¬টিং পেপার যেন শুষে নিয়েছে। তবুও ছিমছাম দেহের গড়নে সৌন্দর্য কিছুটা হলেও অনুমেয়। অবশ্য আজ তার যতটুকু অবশিষ্ট আছে তা হলো মুক্তিযুদ্ধের এক বীরাঙ্গনার “ফসিল” ছাড়া আর কিছুই নয়।
যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, সেই প্রাণের স্পন্দনটুকুর বহিঃপ্রকাশ নির্জীব দেহে কেবল শ্বাস ওঠানামা। ধূমপানের কু-অভ্যাসে ভীষণ বিব্রতকর এক কাশি থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছে না আলতা বানু। যতক্ষণ না সিগারেটের আগুনের আঁচ আঙ্গুলের ডগায় ছ্যাকা দেয় ততক্ষণ চলে সুখটান। আলতা বানুর এ জীবন নয়তো আঁচলে বাঁধা চাবির গোছা−যাকে যতনে আগলে রাখবে; সাত রাজার ধন প্রাপ্তির আশায়। মৃত্যুর দ্বার পর্যন্ত যত্নহীন জীবন শুধু টেনে চলা। শীতের সকাল কাঁচামিঠে সোনা রোদ উঠোনে। এক প্রান্তে আলতা বানু তার জীবনের বিড়ম্বনার ইতিহাসের ঝুলি নিয়ে, তার পাশে মোড়ার নিবিষ্ট মনে ঋতু। মন ছুঁয়ে যায় মনকে। এই সেই ঋতু যে দেখেনি একনায়ক আইয়ুবের শাসন, দেখিনি স্বৈরাচারী ইয়াহিয়ার পতন, গণজাগরণ, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, দেখেনি একাত্তর, বিজয় ও স্বাধীনতা। তবুও সব কিছুই মনের দর্পণে উজ্জ্বল। বাবা মায়ের মুখের স্বাদে সব কিছুই প্রতিস্থাপিত হয়েছে ওর হৃদয়জুড়ে। মুক্তিযোদ্ধা বাবা তার বোধটুকু ইথারের মতো ছড়িয়ে দিয়েছে শিরা-উপশিরায়। মননে চিন্তায় বোধে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পলল জমে উর্বর হয়েছে অভিজ্ঞতায়, এক স্বাধীন মানবিক সত্তা। সময়ের কাঁধে পা ফেলে শিখেছে চলা। দেশ-বোধের বীজ বপন করে দিয়েছিল ওর বাবা-মা− সে বীজ আজ মহীরুহ ঋতুর মননে চৈতন্যে। যদিও জন্ম ঋতুর একাত্তরের কিছু পরে। তবুও হৃদয়ে ধারণ করেছে মুক্তিযুদ্ধের বীরগাথা। বাবা-মায়ের ইচ্ছে অনুযায়ী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়নি। হয়েছে সাংবাদিক। কাজ করছে একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার নিষিদ্ধ পল্লীর পতিতাদের বিষয়ে। বোধের জমিনে নিজের ইচ্ছের ফসল চাষ করবে বলে।
হঠাৎ এই আলতাবানুকে পেয়ে উর্বর হয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরগাথা, পৈশাচিকতার শিকার কিছু নারীর মর্ম বেদনার ইতিহাস। জাতীয় দৈনিকের পাতা থেকে জেনেছে আলতা বানুর কথা। যারা নিজের চোখের জলে পিদিম ভাসিয়েছে স্বাধীনতার গাঙে। দুর্বার আকর্ষণ ঋতুর মনে এই যে এই আলতা বানুর জন্য। এই তো সেই একাত্তরের নির্যাতিত সত্তা। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর পাশবিকতার শিকার এ দেশের দুই লক্ষ নারী। এ দেশের নিরীহ মানুষ, মনুষ্যত্ব, মাটিকে করেছে ক্ষতবিক্ষত। আলতা বানুর মত কত নারীর সতীত্ব হরণ করেছে ওরা। জন্ম নিয়েছে কত যুদ্ধশিশু। কালের সাক্ষী হয়ে আলতা বানুও জন্ম দিয়েছে একটি যুদ্ধশিশু।
এই আলতা বানুর ছোট্ট সংসার ছিল। বাবা-মা, ভাই-বোন ছিল। ছোট্ট ঘর ছিল। উঠোনে ছিল সোনালি ধান। ক্ষেতভরা ফসল। ঘরগুলো গায়ে গায়ে লাগোয়া। পাখিদের কাকলিতে মুখরিত ছিল ওদের সারাটা গ্রাম। তখন কতই বা বয়স হবে আলতা বানুর, চৌদ্দ কি পনের− বড় ভাইয়ের বিশ কি বাইশ।
সেই একাত্তর। মাঝামাঝি মাসগুলোর কথা। হঠাৎ একদিন খবর এলো গঞ্জে আর্মি এসেছে। দিন থাকতে থাকতেই পুরুষশূন্য হয়ে যায় মহল্লাগুলো। এ দিকে রেড করতে পারে হানাদাররা মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে। গ্রামকে গ্রাম চষে ফেলেছে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে। তমসাচ্ছন্ন কালাকাল গাঢ়কাল রাতের আঁধার। হানাদার বাহিনী সার্চ লাইটের আলোতেই খোঁজাখুঁজি করছে মুক্তিযোদ্ধাদের। সারা গ্রামের মানুষ ভয়ে তটস্থ। তারপর ঘরে ঘরে পড়ে যুবতীদের খোঁজে। খোঁজ তাদের লালসা মিটানোর খোরাক। জীপে তুলে নিলো ওদের মতো কয়েকজনকে। অবশেষে আগুন ধরিয়ে দিল সারা গ্রাম। রাইফেল, বেয়নেট, এস. এম. জিÑ এর ভয়ে কাচুমাচু হরিণ শাবক ওরা কয়েকজন। রাতের আঁধারে বিদীর্ণ চিৎকার− বাঁচাও বাঁচাও। প্রতিবাদ প্রতিরোধের হাতিয়ার নেই কাছেপিঠে কোথাও। শব্দের মাঝে নিঃশব্দরা হাহাকার করে। ক্যাম্পের চার দেয়ালে মৃত্যুর প্রহর গুণে মাথা কুটে। প্রতিরাতের পাশবিক অত্যাচার ওদের করেছে ছিন্ন ভিন্ন তছনছ। পালাক্রমে পর্যায়ক্রমে শারীরিক- মানসিক অত্যাচারের করুণ কাহিনি চার দেওয়ালের বীভৎসতায় দাগ কাটে। আলতা বানুর শরীর মন ঘৃণায় যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ওঠে। রাতের পর রাত দেহের সাথে চলে হোলি খেলা। এ যেন হরিণ শাবককে কামড়ে ছিঁড়ে খায় ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্র। উলঙ্গ শরীর লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তবুও চেষ্টা করে আত্মহননের। মাথা কুটে দেয়ালে রক্তে রক্তাক্ত শরীর আচ্ছন্নের মত পরে থাকা। শুধু রাত আর রাত-কখন সকাল, কখন দুপুর, কখন সন্ধ্যা একাকার হয়ে গেছে ওই রাতের গুহায়। পাহারার সিপাইিটার একজোড়া শকুন দৃষ্টি গিলে খায় ওদের শরীরের ভাঁজে ভাঁজে। কিছুদিন পর পর ক্যাম্প বদল। এভাবেই বেশকিছু দিন কেটে যায় ওদের জীবনের পাতা থেকে।
অবশেষে আলতা বানুর শরীর স্থুল হয়ে ওঠে। সারা শরীরে সাপের মতো কী যেন কিলবিল করে। আঁধার প্রকোষ্ঠে জন্ম নেয় আর এক শরীর। নরপশুর দল ক্যাম্প ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। বাইরে খোলা আকাশ উঁকি দেয়। বেরিয়ে পড়ে ওরা নিজ বাড়ি নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে। নেই কিছুই নেই। বাবা-মা, ভাই-বোন কেউ নেই। আলতার মনে পড়ে ডাক্তার মহিউদ্দিনের কথা। তার মাধ্যমেই আলতা বানুর থাকার ব্যবস্থা হয় আশ্রয় শিবিরে। ওর ভেতরে যে শিশুটি বেড়ে উঠছে তাকে বের করতে হবে নতুবা পাপ মুক্তি হবে না। ডাক্তার বুঝিয়েছে বেশ দেরী হয়ে গেছে। এখন কিছু করা যাবে না। কয়টা মাস আরও ধৈর্য ধর। দেশ স্বাধীন হবে। বীরাঙ্গনার নামে রাষ্ট্র তোমাদের সম্মান দেবে, পুনর্বাসন দেবে। সম্মানিত হবে তোমরা।
অবশেষে ঘনিয়ে এলো সেই দিন। দেশ স্বাধীন হলো। আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে সুখ এলো। তার কয়েক মাস পরে আশ্রয় শিবিরে আলতা বানু জন্ম দিল এক যুদ্ধশিশু। একদলা রক্ত-মাংসের পিন্ড তীব্র আর্তনাদে বেরিয়ে এলো খোলা বাতাসে। আলতা বানু কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে− না ডাক্তার সাহেব ওই পিশাচের সন্তান আমারে দেখাবেন না। ওরে দেখলেই ওই নরপশুদের মুখ আমার সামনে ভাইস্যা উঠবো।
ডাক্তার বলেছে ওকে জীবন দিয়েছো। তোমার শরীরের ভেতরের রক্ত মাংস দিয়ে সে বেড়ে উঠেছে। একটু দেখ। না না কখনোই না। ডাক্তার সাহেব ওরে কোথাও দিয়া দেন। ডাক্তার মহিউদ্দিন শিশুটিকে তুলে দিয়েছেন কোনো এক সংগঠনের হাতে। কখনও জানবার চেষ্টা করেননি কোথায় আছে, কেমন আছে?
− আলতা বানুর বীরাঙ্গনা জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের শুরু। ঈশান কোণে কত যে মেঘ জমে ছিল দুঃখের শ্রাবণ ঝরাবে বলে জানা ছিল না ওর। মৃত্যু ওকে গ্রহণ করেনি বলে জীবন ওকে শান্তি দেয়নি এক দণ্ডও। গাল ভরা‘বীরাঙ্গনা’ নামটি ওকে আরও উটকো ঝামেলায় ফেলেছে। জুটেছে নানা জাতের ফেউ। সাংবাদিক এবং আরও নানা ধরনের মানুষের মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত। সতীত্ব হরণের ঘটনা বলতে হয় সারাক্ষণ। পৌরাণিক কাহিনির দ্রৌপদী হতে হয় বারবার। এভাবে উত্ত্যক্ত করেছে অনেকেই। এই নাম শব্দে নেই কোনো প্রশান্তি বা স্বস্তি। আলতা বানু বাঁচতে চায়, জীবনের গান শুনতে চায়। ভুলতে চায় সেই আতংকিত দিনগুলোর কথা। এদেরই একজন মধু ওর কাছের মানুষ হয়ে যায়। সবসময় আগলে রেখেছে আলতাকে। ও জানে কোন বস্তু কতটুকু গুড়ে কত মিঠা হয়। ভালোবাসে আলতাকে। ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখায়। ভুলিয়ে দিতে চায় আলতাকে- সে একজন বীরাঙ্গনা। মধুর প্রতি আসক্ত হয়। শরীরের জমিনে আবার ফসল বুনতে চায়। ভালোবাসার ফসল। ভালোবাসার নদীতে সাঁতার কাটবে। ডুব সাঁতারে মাছরাঙ্গা বালিহাঁস হবে। ভুলে যাবে কিছুটা হলেও সেই বীভৎস দিনগুলো। পশুদের পৈশাচিকতার স্মৃতিগুলো। মধুর বিশ্বাসের নৌকায় জীবনের বাকি পথটুকু পাড়ি দিবে। আশা বুকে নিয়ে মধুর সাথে আলতা বানুর বিয়ে হয়। মধুচন্দ্রিমা রাত সোহাগে-সম্ভোগে আরো মধুর হয়। ছোট্ট বেড়ার ঘরে চাঁদের আলোর প্লাবন। মনে মনে শুধু মধু নামটি জপবে আর কিছু নয়। এভাবেই দিন কাটে। তবে বেশি দিন নয়। এই সুখের ঘরে ওৎ পেতে বসে আছে বিপদ− যেমন বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। কে জানতো তা?
হঠাৎই এক রাতে মধু ফিরছে না। অপেক্ষায় রাত জেগে আলতা বিছানায় তন্দ্রাচ্ছন্নভাবে পরে আছে। দরজায় খুট খুট শব্দ। আলো আঁধারীতে কে যেনো ঘরের ভেতর ঢোকে। তার পাশে এসে বসে। চোখ বুঝে আলতা ভাবে মধুই এসেছে তাই জানতে চায়− এতো দেরি কেন হইছে? ভাত খাইবা না? রা নাই ক্যান? আলতার শরীরে হাত বুলিয়ে যায় আলতোভাবে। আলতার শরীর হিম হয়ে আসে। চমকে ওঠে সে? মধু? এক ঝটকায় হাত সরিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। না পারে না।
আলতা বানু স্তম্ভিত। এখানেও পাক-হানাদার বাহিনীর পশু! শব্দহীন অসাড় আলতা বানু শুধু হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে। রেহাই পাই না। সে তার পৌরুষ চরিতার্থ করে শেষ আশাটুকু পূরণ করে উঠে পড়ে। ডাকে- মধু, মধু আয়, আমি যাই।
আলতা বানুর চৈতন্যে ঝড়। আর্তনাদ করে। ওর বুঝতে অসুবিধা হয় না। মধুই মাগীর দালাল। এ কেমন স্বামী? নিজের স্ত্রীকে পরের হাতে তুলে দিতে দ্বিধা বোধ করে না। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে, অপমানে সারাটা দিন কেঁদেছে আলতা বানু। অপমানের তীব্র জ্বালায় নিজেই নিজের পথ বেছে নিয়েছে।
শরীর বেইচ্যাই যদি খাওন লাগবো তায় অইন্যের মর্জিতে না। নিজেই নিজের শরীরের মালিক। আইজ থাইক্যা শরীরই বেচুম। নিজের পছন্দ মত খদ্দের পাইলে এই পোড়া শরীরটা দিমু- না পাইলে নাই। আর করুম না সংসার নামের এই পতিতাবৃত্তি।
চলে যায় বানিয়াশান্তা পতিতালয়ে। সেই থেকে ওটাই ওর ঠিকানা। যে নর্দমায় পা ফেলেছে তা থেকে আর উত্তরণের উপায় নেই। বিশ্বাস নামের বস্তুটির মৃত্যু সেদিনই আরো নিশ্চিত করেছে আলতা। আশাও করে না সুদিনের সুবাতাসের। ও জেনেছে সব ফুলই তো দেবতার পূজায় পূণ্যতা পায় না। সব ফুলই তো পরিপক্ক ফলে রূপান্তর হয় না। ফুলের অজান্তেই সেই ফুলে কীট বসতি গড়ে। সময়ের আগেই সে ঝরে যায়। তাতে কি অন্য ফুলেরা ব্যথিত হয়?
ঋতু ওকে ডেকেছে মা বলে। প্রণম্যা, আমি তোমারই সন্তানÑ বলে কত সেধেছে আলতাকে তার কাছে নিয়ে যাবে। আলতার বিশ্বাসের ঝুড়িতে কিছু বিষধর সাপ জমা আছে। না, যাবে না সে এ বানিয়াশান্তার শান্তির নীড় থেকে। নিজের ভিত, এখানেই গড়েছে নিজেকে নিজের বিশ্বাসে। যদিও ঋতুকে কিছুটা বিশ্বাস করা যায়। যায় না করা বিশ্বাস ওর আশপাশের মানুষগুলোকে। বিশ্বাসের ঘর আগুনে পুড়েছে তাই আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায় আলতা বানু।
ফিরে এসেছে ঋতু খালি হাতে। হৃদয়ে বপন করেছে আলতা বানুর করুণ কাহিনি। যা তাকে প্রতিনিয়ত দহন করছে। অহর্নিশ পীড়ন করছে আলতা বানুর মতো আরও অনেকের কাহিনি। আলতা বানুর মতো ঋতুর বিশ্বাসের বেড়িবাঁধে ধরেছে ফাটল। হাজারও আলতা বানু ঋতুর চৌহদ্দি জুড়ে আর্তচিৎকার− আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও। আমি সেই একাত্তরের আলতা বানু। আমিই আলতা বানু। আমিই একাত্তর। সংবেদনশীল কোনো কোনো মন দুঃখের বোঝা ভার বহনে অনুভূতির চাকার স্পোকগুলো কেটে যায়। হয়তো কখনও জোড়া লাগে ভালোবাসার যতনের ছোঁয়ায়। ঋতু নামের মেয়েটির চৈতন্যে আলতা বানুর গ্রহণ লেগে যায়, রাহু মুক্তি ঘটার আশায় অপেক্ষার দিন গোনা।

ঘুটঘুটে অন্ধকার। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ওর ছায়া দীর্ঘ হয়। বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসে একটা নেড়ে কুকুর। শরীরে দগদগে ঘা, লোমগুলো উঠে গেছে। মুখ দিয়ে লালা পরছে। কুকুরের ছায়াও দীর্ঘ হচ্ছে। কারফিউর মতো নির্জন রাস্তায় ওর চলার শব্দ কুকুরটির শব্দ ‘ঘেউ’ ছাড়া শব্দহীন সরনিতে এগোতে থাকে। ওর ছায়া অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। এখন অন্ধকার। বিকট শব্দে শম্ভূগঞ্জ ব্রিজ দিয়ে ট্রেন ছুটে যায়। আজ আকাশে তারার মেলা বসেছে। কালপুরুষ বেশ বীরদর্পে পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সপ্তর্ষীম-ল সুখেই মিটমিট করছে। ওর কিছুই মনে পড়ে না। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া ক্লান্ত হোমোসেপিয়েন। দূরে শম্ভূগঞ্জের গায়ে অন্ধকার। কোনো পিদিমের আলো জ্বলে না। হেঁসেলের ধোঁয়া নজরে আসে না। এত তাড়াতাড়ি সব ঘুমিয়ে গেল!

এত শান্ত গ্রাম! ধনচে গাছ আড়াল করে জল বরাবর চোখ বুলাতে থাকে ও। কতক্ষণ। কৃষি বিশ্বদ্যিালয়ের দিকে সিগনাল দিচ্ছে নীলাভ আলো। বলাশপুরের দিকে কনভয় ছুটে চলার বিকট শব্দ ভেসে আসে। প্রায় এক ঘণ্টা জেগে ওঠা চরের মধ্যে বসে আছে। সাহেব কোয়াটার, সার্কিট হাউসসহ নদীর পাড় ঘেঁষে সারি সারি বাঙ্কার। কামানসহ অন্যান্য ভারী অস্ত্র নাক বরাবর তাক করা।

একটা টুস শব্দের সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার গুলি ছুটে আসবে। ও ঘড়ির দিকে তাকায়। আটটা সতের। হঠাৎ ওর মনে পড়ে, হাতে কাপড়ে পেচানো আগ্নেয়াস্ত্র অত্যন্ত মারাত্মক। এটা হাতে নিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হেঁটে আসা ঠিক হয়নি। এস কে হাসপাতালের কাছে ছোট একটা ট্রুপস অ্যামবুস করেছে। নদী পথে এসে যেন বটতলার এই বিপদসংকুল রাস্তায় সরাসরি ঢুকে গেরিলা আক্রমণ করতে না পারে। পেছন দিক থেকে কেউ ‘হল্ট’ বললেই ধরা পরে যেত। নইলে গোলাগুলির মধ্যে পরে বেঘোরে প্রাণ হারানো ছাড়া উপায় ছিলো না। হঠাৎ করে ওর গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে ওঠে। শিড়দাঁড়ায় বয়ে গেল শৈত্যের হলকা। এই বোকামিটা করা ঠিক হয়নি। কমান্ডারকে বলা যাবে না। জাবেদকে বলা যাবে। কিন্তু এখনো আসেনি। আদৌ আসবে কি না! তারও ঠিক নেই।

আসলে না হয় প্ল্যানমাফিক এগোনো যাবে। না এলে? আবার এতটা পথ মাড়িয়ে কমান্ডারের নাগাল পাওয়া দুস্কর। সকালের দিকে দুবলাকান্দা পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করার কথা। সিগারেটের তৃষ্ণায় কন্ঠ কাঁপছে। জ্বালানোর উপায় নেই। নিশ্চিদ্র অন্ধকারে হঠাৎ আলো ভয়ঙ্কর। সহজে টার্গেট করে। ছুটে আসে এক ঝাঁক মেশিনগানের গুলি। ওরা প্রশিক্ষিত। মিস হয় কম। নান্দিয়া পাড়ার সৈয়দ আলী এভাবেই ঝাঁঝরা হয়েছিল। তারপর সবাই সতর্ক। অন্ধকারে মিশে থাকতে হবে। আলোতে নয়।

জুন মাসের গুমোটগরমে ঘামছে ও। আবার আকাশের দিকে তাকায়। তারার মেলা। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকারে নক্ষত্রের মুখ জ্বলজ্বল করছে। তৃষ্ণা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখান থেকে দুইশ গজ দূরে ব্রহ্মপুত্র কলকল করে বয়ে যাচ্ছে। ভারী বর্ষণ হলে গাড়ো পাহাড়ের ঢলে ব্রহ্মপুত্রে জোয়ার বইবে। ও যেখানে বসে জাবেদের জন্য অপেক্ষা করছে তাও তলিয়ে যাবে অথৈ জলে। স্রোতের কলকল ধ্বনি, বাঁকে বাঁকে ঘূর্ণনের গোত্তা মেরে দু’কূলে ভাঙনের গান গেয়ে বয়ে যাবে। ট্রিগার ধরে অত্যন্ত সন্তর্পণে ও ব্রহ্মপুত্রের দিকে এগিয়ে যায়। জলের কিনারায় অস্ত্র রেখে আজলা ভরে পানি পান করে। শীতল পানি নাকে মুখে ছিটকা মারে। আবার সেই ধনচে গাছের ঢিবির কাছে এসে জাবেদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

ঘড়িতে এখন পৌনে নয়টা। জাবেদের পাত্তা নেই। জাবেদ না এলে ওর করণীয় কী? ইত্যাকার ভাবে। হ্যান্ড ব্যাগে দুটো গ্রেনেড আছে। যা বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য ওদের মিশন। জাবেদ এলেই কাজটা সম্পন্ন করার ভাবনা করা যেত। মশা, ডাঁশ, ওলা পোকার বিস্তর উৎপাত। নাকে মুখে হিচকা পরছে। তারপরও ও স্থির বসে থাকে। রাত পোকাদের গুঞ্জরণে পৃথিবীকে শব্দহীন করে দিয়েছে।
মাস তিনেক আগেও অন্ধকারকে ভয় ছিল। সাপের ভয়, ভূতের ভয়, মানুষের ভয় মিলিয়ে আঁধার আতঙ্কের মধ্যে যার পৃথিবী, সেই কিনা চার মাইল অন্ধকার মাড়িয়ে কেওয়াটখালী পাষাণবেদী বায়ে রেখে এখন ব্রহ্মপুত্রের চর ভেসে ওঠা ধনচে বনে আশ্রয় নিয়েছে একা। একাকী। ভয় শব্দটা এখন ওর মধ্যে বিরাজ করে না।

বরঞ্চ উন্মত্ত হিংস্রতা বসতি গেড়েছে। ওর হাতে স্টেনগানের মতো মারাত্মক মারণাস্ত্র। যার প্রতিটি কার্তুজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক একটি মানুষের প্রাণ। না, ও মানুষ হত্যা করতে চায় না। জীবনকে তুল্যমূল্য করে পশু হত্যা করতে চায়। যারা অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পরে সবুজ প্রান্তর জুড়ে রক্তের হলি খেলায় মেতে উঠেছে, তাদের সঙ্গে ফয়সালা না করে ফিরে যাবার পথ নেই। মৃত্যু নইলে স্বাধীনতা। নিরীহ পিতা মাতা, থেকে অবোধ কিশোর হত্যা করে যারা, তাদের জন্য কোনো অনুকম্পা নয়। ওকে কোনো অনুকম্পা করেনি। হাজার হাজার পাকিস্তানী আর্মি এই চর পর্যন্ত ছুটে আসছে। হায়েনার মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই শ্যামল প্রান্তর জুড়ে।

হঠাৎ ওর মনে পড়ে, ‘এ দেশের শ্যামল রঙ রমনীর সুনাম শুনেছি।’ ও ইষৎ মুচকি হাসে। কবি, রমনীরা সব সম্ভ্রম রক্ষায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে, এসব খবর কি রাখেন? দরকার কি? এই সুন্দর তো তোমার। মহাকাব্যিক দার্শনিকতা। আহারে শ্যামল রমনী! মাতৃকূল। তোমার জন্য বিরল এই প্রান্তরে ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে অপেক্ষা করছি। একটি বুলেট নাক বরাবর ছুটে যাবে। আবার আরেকটি বুলেট আমার দিকে ফিরে আসবে। কি চমৎকার! তুমি ভাবতে পারো? রক্তের মহাজন সেজে বসে আছি।

ঠিক এসময় ক্ষীণ পদশব্দ। ও মাটির সঙ্গে দেহ মিশিয়ে অপেক্ষা করে। জাবেদ না অন্য কেউ? ঢিবিটার অতি কাছে হেঁটে যায় জাবেদ। জলের সঙ্গে ওর দেহের ছায়া মিলিয়ে ডাক দেয়, ‘পুটটুস।’ থমকে দাঁড়ায় জাবেদ। তড়িৎ উত্তর দেয়, ‘টুকু।’
কাছে এসে ধপাস করে ধনচে গাছে পিঠ রেখে শুয়ে পরে। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, ‘জানে বেঁচে গেছি, প্রায় জীবনটা
গেছিলো।’ টুকু উত্তর দেয়, ‘আমারও। বোকামি করে ফেলেছিলাম। আমিও।’
টুকু ঘড়ির দিকে তাকায়। প্রায় দশটার কাছাকাছি। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে।

‘আমার ক্ষুধা পেয়েছে।’
‘তোর জন্য রুটি এনেছি।’
‘দে।’

জাবেদ কার্তুজের ব্যাগ থেকে একখ- বনরুটি বের করে দেয়।
কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করে টুকু রুটি খেতে খেতে জলের নিকট হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে থাকে। ক’ আজলা জল খেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে। যেন কতকাল ধরে ও এখানে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রস্রাব শেষ হতে চায় না। জলের গায়ে দু’একটা নক্ষত্র। তার আলোয় মাছ কিলবিল করে।
জাবেদ ডাক দেয়, ‘টুকু।’
ডাকও যেন শব্দহীন। জাবেদের কণ্ঠ ভরাট সত্ত্বেও ওর কণ্ঠ রাতের পাখির ডাকের মতো শোনায়। টুকু বুঝতে পারে। এই বুঝতে পারার বয়স দু’মাস হয়নি। টুকু আবার হামাগুড়ি দিয়ে জাবেদের কাছে ফিরে আসে।

‘এখন?’ টুকু প্রশ্ন করে।
‘অপেক্ষা।’
‘কার জন্য?’
‘মতি ভাই আসবে।’
‘কখন?’
‘জানি না।’
ধনচে গাছে গায়ের শার্ট বিছিয়ে স্টেন জাপটে ধরে টুকু বলে, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে।’
‘তুই ঘুমা। আমি অপেক্ষা করি।’
‘শত্রু এলে তুই একা কী করবি?’
‘গুলি করতে করতে ব্রহ্মপুত্রের জলে হারিয়ে যাবো।’
‘ওরা আসবে না। ভীতু। রাজাকাররাও আসবে না। ওরা ভয় পায়। ওরা নিরীহ মানুষ হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধার নাগাল পায় না।’
‘তা ঠিক।’

ঠিক এক মিনিটের ভেতর টুকু ঘুমিয়ে যায়। ওলাপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে। দূরে কোথাও শেয়ালের হুক্কাহুয়া ভেসে আসছে। শম্ভূগঞ্জের ব্রিজের পাশেই পাষাণবেদি। এখন শেয়াল-কুকুরের মচ্ছব চলছে। গুলিবিদ্ধ বঙ্গসন্তানের নাড়িভুড়ি নিয়ে ওরা মহাসুখে আছে। তাই রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে ডেকে ওঠে। ওটুকুই। এ নিয়ে জাবেদ ভাবতে চায় না। প্ল্যান করে এগোতে হবে। কমান্ডার যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই। চুল পরিমাণ এদিক সেদিক হবার জো নেই। ভুলটা করেছিল ও। মণিকাকে খুঁজতে যাওয়া ঠিক হয়নি। দিনমজুরের ক্যামোফ্লেক্স ঠিক ছিল।

কিন্তু কাপড়ের ব্যাগে রাখা স্টেনগান-কার্তুজ-ব্যাগ অত্যন্ত বিপজ্জনক। চ্যালেন্স করলেই আটকে যেত। ধরা পরলেই নির্ঘাত মৃত্যু। সশস্ত্র শত্রুকে কেউ বাঁচিয়ে রাখে না। ও নিজেও রাখবে না।
বড় সড়ক ক্রস করে গলির মাথায় দাঁড়ায়। তখন এদিকটায় বিদ্যুত ছিল না। গতকাল কেওয়াটখালি পাওয়ার স্টেশনে হামলা হয়েছে। ভয়ঙ্কর রকেট ল্যান্সার দিয়ে হামলা। তিনটা ইউনিটের মধ্যে একটা পুরোপুরি বিধ্বস্ত।
শহরে লোডশেডিং চলছে।

গলি পেরিয়ে মণিকাদের বাড়ির আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে ছিল কতক্ষণ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভেতরে জনমনিষ্যির আঁচ পাওয়া যায়। অনেকটা বেদিশার মতো মণিকার বাবা অ্যাডভোকেট ত্রৈলঙ্গর গোস্বামী বাড়ির টপ-বারান্দায় উঠে আসে। সতর্ক পদক্ষেপ, নিশব্দ পদচারণা, সজাগ কান শুধুই অশুভ ইঙ্গিত করতে থাকে। তারপরও মণিকার পড়ার রুমের বদ্ধ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ইতিউতি ভাবতে থাকে। ভেতরের মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর অচেনা।

গোস্বামী কাকা তো না! অন্য কেউ। নারীকণ্ঠ আছে। মণিকা বা মাসীমার নয়। অন্য কারো।
নানা রকম চিন্তা মাথায় কাজ করতে থাকে। হিসাব মতে মণিকাদের থাকার কথা নয়। পঁচিশ মার্চ ক্র্যাক
ডাউনের পরপর ওরা এ বাসা থেকে সটকে পরেছে। শহরে দু’বার বিমান হামলার পর গোস্বামী কাকা মণিকাদের আর এ শহরে রাখা নিরাপদ মনে করেনি। এখন মনে হয়, তার সিদ্ধান্ত সঠিক। এ দেশে আর মানুষ বাস করতে পারে না। দখলদার দস্যু আর ফুঁসে ওঠা রাগী যুবকের মুক্তির ‘জয় বাংলা’র গেরিলা ছাড়া।

তারপরও কেন যে মণিকাকে খুঁজতে এলো, তা ও নিজেই জানে না। কেষ্টপুর দিয়ে পাস হওয়ার কথা ছিল।
পুরবী’র দুলাল ভাইয়ের কাছ থেকে গ্রেনেড নিয়ে চর ধরে টুকুর কাছে পৌঁছানোর কথা।
‘এ বাড়ির মালিক ইন্ডিয়ায় গেছে গা। আমরার দহলে আছে। বাড়ি আমাগো। পাকিস্তান সরকার লেইক্কা দেব।’
ওর মনে হয় মণিকাদের বাড়ি বেদখল হয়ে গেছে। মণিকার সঙ্গে আর দেখা হবে না। ভাবতে ভাবতে নারকেল গাছের আড়ালে আবার চলে আসে। ঠিক এ সময় বিদ্যুৎ এলো। দু’-একটা বাতি জ্বললেও ল্যাম্পপোস্ট প্রায় তিনশ গজ দূরে। এদিকে অন্ধকার ছেয়ে আছে। খুব সহজে বের হয়ে যাওয়া যাবে। ঠিক এ সময়ে জিপ ছুটে এলো গলির মুখ থেকে। ধামধাম করে ওপাশের আমগাছের গোড়ায় দু’জন পাক আর্মি নেমে আসে। পেছন থেকে দু’জন রাজাকার। মুখ বাঁধা প্রায় বিবস্ত্র এক নারী, রাজাকাররা ওকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। দ্রুততায় গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় উঠে যায় ওরা। অনেকটা টেনে-হেঁচড়ে মেয়েটাকে জাপটে ধরে ডাক দেয়, ‘মানিক স্যার আইছে।’

খুঁট করে দরজা খোলার শব্দ হয়। ওরা ঢোকার পরে আবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ও নারকেল গাছ আড়াল করে স্টেনগান লোড করে, অপেক্ষায় থাকে। জিপ একলা আম গাছের গোড়া বরাবর। বের হওয়ার উপায় নেই। জিপে ফৌজি থাকতে পারে। ঘড়ির কাটা এক সেকেন্ড করে এগিয়ে যেতে থাকে। দু’-একবার ওই নারীর আর্তনাদ শুনেছে। তারপর থেকে অপেক্ষা করছে। ওর কিছুই শুনতে ইচ্ছে করে না।
ওই কাতর নারীর কথাও মনে হয় না। অপেক্ষা করে। অপেক্ষারত জিপটা নিথর। ড্রাইভারসহ হয়তো গোস্বামী কাকার বাসায়। ও অপেক্ষা করে। ওরা চারজন, অভাগী নারী, বাড়ির দখলদার। মোট ছয় জন। ও ভাবে- লোডেড কার্তুজ আটাশটা। এক ম্যাগাজিন একস্ট্রা। তিনটা গ্রেনেড। দুঃখী নারীকে বাদ দেয়। ওর বেঁচে থাকবার দরকার নেই। ও এই পৃথিবীতে সব অধিকার খুইয়েছে। ব্রাশ ফায়ারে মরে গেলে ক্ষতি কি? বাকি পাঁচজনকে অন্ধকারের এত নিকট থেকে…। সাত-পাঁচ ভাবে। সাহস হারাতে থাকে। একটু এদিক-সেদিক হলেই বিপদ।

মৌডালের ঝোঁপ পেছনে রেখে উঠে দাঁড়ায়। এদিক দিয়ে দ্রুত বেরোবার পথ আছে। মসজিদের পাশ ঘেঁষে ধানক্ষেত দিয়ে বড় রাস্তা ক্রস করে বেরিয়েই নদীর পাড়। ধনচের আড়ালে আড়ালে টুকুর কাছে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। টুকু অপেক্ষা করছে। হঠাৎ করে ওর ভয়ানক সিগারেটের তৃষ্ণা পায়। মণিকাকে মনে পরে। এম কলেজে মণিকা ওর সহপাঠি। কলেজ থেকে পূজাতে দল বেঁধে এ বাড়িতে এসেছে। হইচই করে বাড়ি মাতিয়েছে। গোস্বামী কাকা বেশ শিক্ষিত মানুষ। কন্যার বন্ধুদের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাত দেখিয়েছে। মণিকা সাদামাটা তরুণী। বুদ্ধিদীপ্ত ক্লাসের সবাই মণিকাকে মনে রাখতে চায়। অথচ আজ মণিকা কি জানে, কি ভয়ংকর সময়ের মুখোমুখি ও। ওর বিছানায় ধর্ষিত হচ্ছে বঙ্গললনা। একজন অপেক্ষা করছে মৃত্যুর ওপারে। ওর মনে হয় ক্যাচ করে বেয়নেট ঢুকিয়ে দিল। দরজা খুলে টপ-বারান্দায় এসে দাঁড়ালো চারজন। একজনের হাতে সিগারেট। ‘আচ্ছা হ্যায়, মান্তা হ্যায়’ এই জাতীয় বাতচিতের মধ্যে ও স্পষ্ট দেখতে পায়। ও অপেক্ষা করে। ট্রিগারে আঙুল। আরো একজনের জন্য অপেক্ষা করে। সে বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়েছে। ও অপেক্ষা করে। ঠিক এ সময় পঞ্চম লোকটি বের হয়।

‘পা-মুখ বাইন্ধা আইলাম।’

ঠিক এ মুহূর্তে আঙুলে চাপ পরে। ঠা-ঠা শব্দ চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে। ধপাধপ পাঁচটি দাঁতাল গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় লুটিয়ে পরে। ও দশ সেকেন্ড অপেক্ষা করে। তারপর মৌডাল আড়াল করে অন্ধকারে মিশে যায়। বড় রাস্তায় কনভয় ছুটিয়ে পাকিস্তানী সেনারা এদিকে আসছে। ও তখন দড়াইখাল পেরিয়ে বলাশপুর পৌঁছে গেছে। এ সময় একবার মনে হয়েছিল স্টেশন কোয়াটারে শোয়েব সিদ্দিকীর বাসার কথা। ওর বাবা গার্ড সাহেব।

স্টেশন সংলগ্ন কলোনিতে থাকে। বড় ছেলে শোয়েব সিদ্দিকী এপ্রিল থেকে লাপাত্তা। শোয়েব ওর বন্ধু। সবাই জানে। প্রয়োজনে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ আছে। পুত্র শোকার্ত ওর মায়ের মুখ মনে পরায় কষ্ট পায়, কী জবাব দেবে?
তারপর অনেক কাঠখড় পেরিয়ে টুকুকে আবিস্কার করা। টুকু এখন ঘুমুচ্ছে। স্টেনের ম্যাগাজিন খুলে পরিস্কার করে। এ ম্যাগজিনের চৌদ্দ কার্তুজ পাঁচ দানব খেয়ে ফেলেছে। মনে মনে হাসে। আহারে বেচারারা!
এখনও এক ম্যাগাজিনসহ চৌদ্দটা কার্তুজ আছে। গ্রেনেড আছে তিনটা। ও এখন মতি ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করবে। ঘড়ির দিকে তাকায় এগারটা সাতাশ। দূরে শম্ভূগঞ্জের চটকলে অসংখ্য বাতি জ্বলছে। জলের রেখায় বাতির ঝিলিক।

ওর মনে হয়, এতক্ষণের মধ্যে লাশগুলোসহ ওই নারীকে আরেক জিপে তুলে নিয়ে গেছে। অথবা সহযোগী হিসেবে বেয়নেটের খোঁচায় হৃদপি- এখন এফোঁড়-ওফোঁড়। তাহলে কেউ বাঁচতে পারেনি! পূর্বাপর ঘটনাটি ভাবতে থাকে জাবেদ। এক ইস্টু পাঁচ। মুচকি হাসে। পাঁচ ডেড বডি দেখে কি প্রতিক্রিয়া দাঁতালদের। পাগলা কুত্তা!
ভাবনার মধ্যে মণিকাকে মনে পড়ে, পড়বেই তো। মণিকার জন্য। প্রিয় মণিকা, তোমার বিছানায় ধর্ষিত নারীর প্রতিশোধ নিয়েছি। তুমি কি খুশি হও নি? আমি এখন মাতৃভূমির সৈনিক। মাতৃভূমির কন্যা-জায়া-জননীর জন্য…।

মশা-ডাঁশ ছেঁকে ধরেছে। টুকু মাঝে মাঝে হাত নাড়ছে। শরীর ক্লান্ত। তারপরও তন্দ্রা আসছে না। জাবেদের মনের মাঝে তড়পাতে থাকে। হুটহাট পাঁচটি গুলিবিদ্ধ মানুষ গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় পড়ে গেছে। ওর জন্য এ এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। এত কাছ থেকে শত্রু নিধনের আনন্দই আলাদা। ওর বুক ভরে উদ্বেলিত আনন্দ।
প্রকাশ করতে পারে না। টুকুকে বলা যেত। টুকু ঘুমাচ্ছে। সড়সড় শব্দে দু’একটা শেয়াল শন খেতে ঢুকে পরে। হুক্কাহুয়া ডেকে ওঠে। জাবেদ শুধু কান খাড়া করে থাকে, কখন মতি ভাই আসবে? ওর হঠাৎ করে আজিজুল হক স্যারের কথা মনে পড়ে। স্যার এম কলেজে বাংলা পড়ান। অসাধারণ বাগ্মী।
রবীন্দ্রনাথের শত শত কবিতা তার মুখস্ত। কি তার উচ্চারণ! সুমিষ্ট। এখনো কানে লেগে আছে। তার সঙ্গে শেষ ক্লাস ১৩ জানুয়ারি। এরপর আর দেখা হয়নি। উত্তাল বাংলাদেশ। হঠাৎ করে মণিকার দিকে তাকিয়ে বলে,

‘এই মেয়ে, নাজিম হিকমতের নাম জানো?’
মণিকা অসহায়ের মতো মাথা নাড়ে।
‘তুরস্কের কবি। মাতৃভূমির প্রতি ইঞ্চি মাটির প্রতি দায়বদ্ধ সচকিত কণ্ঠস্বর। কবিতা লেখার অপরাধে জেল-
জুলুমসহ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত কবি। ভ্রাম্যমাণ জীবন নিয়ে শুধু মাতৃভূমিকেই মনে রেখেছে। নারীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছে, ‘তুমি আমার কোমল প্রাণ মৌমাছি, চোখ তোমার মধুর মতো মিষ্টি।’ লিখেছে, ‘দড়ির একপ্রান্তে মৃত্যু, সে মৃত্যু আমার কাম্য নয়। তুমি জানো, জল্লাদের লোমশ হাত যদি আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পড়ায় নাজিমের নীল চোখে ওরা ব্যথায় খুঁজে ফিরবে ভয়।’ তারপর স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন নির্ধারিত সময়ের আগে।

মণিকা কি মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে? ও কি জানে ওর বন্ধুরা প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করছে।
ওর শান্ত, নির্লিপ্ত স্বভাবের জন্য মণিকা ভাবতেই পারে ওর পক্ষে যুদ্ধফ্রন্টে হামাগুড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। আহা!
মণিকা, তুমি জানবে না শত্রু নিধনের মধ্যে কি অসীম আনন্দ জড়িয়ে আছে। আসলে মণিকাকে কিছুই বলা হয়নি। সুযোগ কোথায়? আর বললেই বা কী হতো?
মণিকার মুখাবয়বে কে যেন একটি সবুজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত পৌনে একটা।
মতি ভাই আসেনি। অপেক্ষা করছে। শান্ত নির্জন রাতের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে জাবেদের মনে হয়, এ পৃথিবীতে এত ক্রন্দন কেন? এ সময়ে ঘোর ভাঙ্গে। তাকাতেই চোখের মণিতে নক্ষত্রের ঝিলিক খেলে যায়। আড়মোড়া ভেঙ্গে হামাগুড়ি দিয়ে জলের দিকে এগিয়ে যায়। আজলা ভরে জল খায়। নাকে-মুখে জলের ছিটা দেয়। জাবেদের কাছে গিয়ে বলে, ‘মতি ভাইয়ের কী খবর?’

‘আসেনি। সংবাদহীন।’
‘তাহলে?’
‘অপেক্ষা।’
‘মাঝরাত।’
‘অপেক্ষা।’
‘কী ভাবছো?’
‘কিছুই না। ভাবতে চাই না।’
‘খুব শিগগির অপেরেশন শেষ করতে হবে।’
‘জানি।’
‘হাতে সময় আছে।’
‘এতক্ষণ অপেক্ষা করা বিপজ্জনক।’

সুনসান নীরবতা। ওলাপোকা ডাকছে। তারপর ওদের আর কিছুই মনে নেই। ঘুমের অতলে হারিয়ে যায়।
জাবেদের ঘুম ভাঙ্গে শেষ প্রহরের একটু আগে। আকাশের গায়ে তখনো নক্ষত্রের মুখ। তড়িঘরি করে টুকুকে ডাকে।

‘ওঠ। মতি ভাই আসেনি। একটু পরে সকাল হবে।’
টুকু আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে, ‘উপায়!’
‘মতি ভাই ছাড়াই প্ল্যান মাফিক আক্রমণ করতে হবে।’
‘সম্ভব!’
‘ভয় পাস?’
‘না।’
‘তাহলে আমার পিছে পিছে আয়।’

জাবেদ স্টেনগান হাতে পেছনে ধনচে গাছ রেখে উঠে দাঁড়ায়। অন্ধকারে সতর্ক দৃষ্টি রেখে সামনে পা বাড়ায়।
টুকু জাবেদকে অনুসরণ করে। জাবেদ খুব পথ হাঁটে। অনেকটা তেলেসমাতির মতো জুবলিঘাট বরাবর ব্রহ্মপুত্রের পাড় ঘেঁষে মন্দিরের ভিমের আড়ালে এসে দাঁড়ায়। টুকুর দিকে গ্রেনেডের ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘রুটি আছে।
খেয়ে নে। গ্রেনেডগুলো দে। চার্জ করার পরে এক মিনিট অপেক্ষা করবি। ফিরে না এলে কিছুই ভাববি না।
কমান্ডার তোর জন্য অপেক্ষা করবে। হিঙ্গানগর রাজাকার ক্যাম্প…।’
টুকু কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকারে হেঁটে গেল জাবেদ। রুটি মুখে দিতেই বিকট শব্দে পরপর তিনটা গ্রেনেড ফাটে ভয়াবহ ভয় নিয়ে শেষ রাতে জেগে উঠল। সাইরেন বাজছে। পটাপট গুলির শব্দ ভেসে আসছে। এই আতঙ্কিত সময়ের মধ্যে ১-২ করে ৩ মিনিট অপেক্ষা করে। তারপর দুর্দান্ত গেরিলা কায়দায় ধনচে ক্ষেত পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের জলে মিশে যায়। ঠিক এ সময় বড় মসজিদ থেকে ভেসে আসছে, ‘কল্যাণের জন্য এসো।’

পাদটীকাঃ- পরদিন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এম আর আখতার মুকুল চরমপত্র পড়ে, ‘আমাদের ময়মনসিংয়ের বিচ্ছুরা কলেজ রোডে ব্রাশ ফায়ারে পাঁচ জন, জুবলী ঘাটে গ্রেনেড দিয়া পাকসেনারে খতম। হা হা হা। এর মধ্যে আবার দু’জন জন্মের দুশমন, জন্মভূমির কুলাঙ্গার রাজাকার আছে। কে বা কারা এই সফল গেরিলা আক্রমণ করেছে, কেউ জানে না। খালি গেরিলা টুকুর বরাত দিয়া মিয়া চাঁদ কমান্ডার জানায়, মাতৃভূমির যোগ্য সন্তান জাবেদ শহীদ হয়েছেন, ইন্না…রাজেউন ‍।

বিরাট লোহার গেট। গেটের পাশে সোনালী পাতে খোদাই করে লেখা-মোল্লা প্যালেস। মোল্লা শব্দটার সাথে প্যালেস শব্দটা ঠিক মানানসই নয়। তারপরও লেখা হয়েছে। জগতে সব কিছু মানিয়ে চলতে হবে এর কোনো মানে নেই।
মোল্লা প্যালেসের গেটের ওপর দিয়ে উঁকি দিলে আপনি দেখতে পাবেন ভেতরে সাদা রঙের একটা তিন তলা দালান। দালানের চারপাশে পর্যাপ্ত খালি জায়গা। খালি জায়গায় ছায়া ফেলে রেখেছে আম, নারিকেল, সুপারি গাছ। দালানের সম্মুখভাগে কিছুটা জায়গা জুড়ে বাগান। বাগানে নানা জাতের ফুল বর্ণিল সাজে সেজে আছে। ফুলের সুগন্ধে চারিদিক মাতোয়ারা। মোল্লাা সাহেব ফুল ভালবাসে। বেহেস্তেও তো ফুল বাগিচা থাকবে।
আম গাছের ছায়ায় সিমেন্টর বেঞ্চি বানানো। পাশে আছে দোলনা। রকিং চেয়ারও আছে অদূরে।
প্যালেস বলতে যা বোঝায় বাড়িটা ঠিক তা হয়নি। তারপরও ঢাকা শহরে এমন একটা বাড়ির নামে প্যালেস যুক্ত করা কোনো অপরাধের কাজ নয়, অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়।
আপনি কি ঢাকা শহরে তিন তলা একটা বাড়ি তৈরীর কথা ভাবতে পারেন? বাগান, আম-নারিকেল-সুপারির ছায়া, বেঞ্চি, দোলনা, রকিং চেয়ার ইত্যাদির কথা বাদ দিলাম। শুধু তিন তলা একটা দালান?
আমার কাছে দালান অনেক পরের কথা। আমি এই ঢাকা শহরে এক টুকরো মাটির কথাও কল্পনা করতে পারি না। মাটির কল্পনা তো নক্ষত্র পরিমান দূরের কথা, আমি একটু শূন্য স্থানের কথাও ভাবতে পারি না। মানে শূন্যের ওপর তিন কক্ষের একটা ফ্ল্যাটের কথা বলছি। অসংখ্য ডেভলপার কোম্পানির বদৌলতে ঢাকা শহরে এখন শূন্যস্থানই বেশি কেনা-বেচা হচ্ছে। আমি ঢাকা শহরের মাটি বা শূন্যস্থান কিনতে পারি না বলে কি কেনা-বেচা বন্ধ থাকবে? দেদারছে কেনা-বেচা চলছে। কারা কিনছে এসব? যারা ছল-চাতুরি করে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেয়, তারা কিনতে পারে। যারা ঋণের নাম করে ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দেয় না-ঋণ খেলাপি হয়ে যায়, তারা কিনতে পারে। রাজনৈতিকরা তো কিনতে পারেই, তাদের পালিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজরাও কিনতে পারে। যারা মাল্টিলেভেল কোম্পানি দাঁড় করিয়ে অসহায় বেকার যুবকদের স্বপ্ন কিনে নেয় তারাও কিনতে পারে। আর দারিদ্র্য দূরীকরনের জন্য ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবসা শুরু করতে পারলে তো আরও ভালো। দরিদ্র মানুষের রক্ত দিয়ে প্রাসাধ তো প্রাসাধ, শত শত ব্যবসা গড়ে উঠবে হেসে-খেলে।
তাহলে কি এই মোল্লা প্যালেস এ জাতীয় কারও? না, মোল্লা প্যালেস এ জাতীয় কারও না। এই ঢাকা শহরের মাটি আরও অনেকেই অনেকভাবে নিজের করে নিয়েছে।
আপনাদের হাতে কি সময় আছে? যদি থাকে তো আমি মোল্লা প্যালেসের ইতিহাসটা বলি। যতদূর সম্ভব সংক্ষেপেই বলবো। তাহলে থাকুন আমার সাথে কিছুটা সময়।
ফয়েজ মোল্লা। লোকে বলতো ফাইজা মোল্লা। শিক্ষা-দীক্ষা বিশেষ কিছু নাই। তবে ভালো কোরআন তিলওয়াত করতে পারে। কিছু দোয়া-কলমার অর্থও তার মুখস্থ।
এইটুকু বিদ্যা পুঁজি করে সে ঢাকা এসেছিল জীবিকার সন্ধানে। সে ৬৪/৬৫ সালের কথা।
ঢাকায় এসে তার প্রথম কাজ হয় টিউশনি করা। স্কুল, কলেজের ছেলেমেয়েদের বাংলা, ইংরেজি, অংক পড়ানোর টিউশনি না। সে যোগ্যতা তার ছিল না। তার টিউশনি মানে ছোট ছেলেমেয়েদের শুদ্ধ উচ্চারণে কোরআন শেখানো।
মাস খানেক সে রাত কাটালো মসজিদে মসজিদে। ঢাকা শহর মসজিদের শহর। এখনও-তখনও। সে দু’রাত এ মসজিদে তো দু’রাত ও মসজিদে থাকে। মার্জিত চেহারা, পরিচ্ছন্ন পোশাক-আশাক, বিনম্র আচরণ, খোদাভক্ত মন, তিলওয়াতের সুমিষ্ট কন্ঠ ইত্যাদি কারণে সে যে মসজিদেই থাকে সেই মসজিদের মুসুল্লিদের কাছে খুব প্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রথম মাসের টিউশনির বেতন পাবার পরই সে বাসা খুঁজতে শুরু করল। সে জীবিকার জন্য ঢাকা শহরে এসেছে। মসজিদে সারা জীবন থাকা যাবে না। নিজের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকার দরকার।
তার মাথা গোজার ঠাঁই-এর প্রথম শর্ত হল, দাম হতে হবে খুব কম। কারণ, তার টিউশনির দাম কম। বাংলা, অংক, ইংরেজি একটা পড়িয়ে যা পাওয়া যায়, সে পাঁচটা পড়িয়েও তা পায় না।
খুঁজতে খুঁজতে সে তার উপযুক্ত একটা বাসা পেল। চারিদিকে ইটের দেয়াল। সে দেয়ালে কোনো রঙ নেই। অথবা ছিল, তা বিলীন হয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। দেয়ালটা নোনা ধরা, শ্যাওলায় অনেকটা সবুজ। দেয়ালের জায়গায় জায়গায় হাঁ করে আছে বড় বড় ফাটল। ফাটলের ফাঁকে বট-পাকুরেরা রীতিমত ঝোপ বানিয়ে ফেলেছে।
মাথার ওপর টিনের ছাদ। জং ধরা। লালচে রঙ। জায়গায় জায়গায় ফুটো। রোদের দিনে সে ফুটো দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকে মেঝোতে গোল গোল আলোক বিন্দু তৈরী করে। সেটা দেখার মত বিষয় হলেও বৃষ্টির দিনে যখন ফোটায় ফেটায় জল পড়ে তাতে দেখার মত কিছু থাকে না। তখন বিছানাপত্র গুটিয়ে বসে থাকতে হয়।
ছোট্ট কক্ষটার মেঝে যে স্যাঁতস্যাঁতে হবে তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? ভেতরে বিদ্যুত নেই। রাতে হারিকেন বা কুপি বাতি জ্বালিয়ে থাকতে হয়। বাড়িটার মালিক আবার হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তবে ফয়েজ মোল্লার কাছে এইসব কোনো বিষয় না।
বিষয় একটাই-ভাড়া তার সাধ্যের মধ্যে।
বাড়ির মালিকের নাম সুশীল ভট্টাচার্য। তার স্ত্রীর নাম মালতী ভট্টাচার্য। তাদের দুইটি ছেলে-মেয়ে। মেয়েটা বড়। কলেজে পড়ে। নাম মহুয়া। কলেজের খাতায় লেখা মহুয়া ভট্টাচার্য। আর ছেলের নাম সুমন। সে পড়ে ক্লাশ নাইন-এ। স্কুলের খাতায় তার পুরো নাম লেখা সুমন ভট্টাচার্য।
ফয়েজ মোল্লা যেমন ধর্মপ্রাণ, সুশীল ভট্টাচার্যের পরিবারও তেমন। ভোর হতেই আযানের আহ্বানে ফয়েজ মোল্লা ছুটে যায় মসজিদে। এদিকে মালতী যায় পুঁজোর ঘরে। ঠাকুরকে ফুল চন্দনের স্পর্শ না দিয়ে, ধূপের গন্ধ না শুকিয়ে সে দিনের কাজ শুরু করে না। ঠিক তেমনি সন্ধ্যাবেলা ফয়েজ মোল্লাও যায় মাগরিবের নামাজ পড়তে, আর মালতির উঠোনে ওঠে শঙ্খ ধ্বনি। সে ব্যস্ত হয় সাঁঝের পুঁজোয়। ধূপের গন্ধে মৌ মৌ কর সারা বাড়ি।
ফয়েজ মোল্লা ধার্মিক কিন্তু সাম্প্রদায়িক নয়। হ্যাঁ, এরকম কোনো আভাস তার মধ্যে পাওয়া যায়নি। আর ভট্টাচার্য পরিবার তো অসাম্প্রদায়িক হিসাবে এলাকায় সবার কাছে পরিচিত। ফয়েজ মোল্লার সাথে তাদের চমৎকার হৃদয়িক সম্পর্ক গড়ে উঠল। মহুয়া আর সুমনকে দেখলেই সে যেচে কথা বলে। তোমাদের লেখাপড়া ঠিকমত চলছে তো? মন দিয়া লেখাপড়া করবা। লেখাপড়া হইল আলো। এই আলো মনকে আলোকিত করে। নিজে বেশি লেখাপড়া করতে পারি নাই।
তবে এখন আল্লাহর পাক কালাম নিয়া আছি বইলা মনে শান্তি আছে। আল্লাহর নির্দেশিত পথের বাইরে পা ফেলি না।
মহুয়া আর সুমন ফয়েজ মোল্লাকে চাচা ডাকে। সুমন মাঝে মাঝে তার ঘরে যায়। এটা-ওটা গল্প করে। বাড়িতে ভাল কিছু রান্না হলে মহুয়া বাটিতে করে ফয়েজ মোল্লার ঘরে পৌছে দেয়।
অল্প দিনেই ফয়েজ মোল্লা এলাকায় বেশ পরিচিত হয়ে গেল। নম্র ব্যবহার সবাইকে খুব সহজে আকৃষ্ট করে। এরই মাঝে ফয়েজ মোল্লা ভাগ্যের আকাশে নতুন এক রঙ লেগে গেল। পাড়ার মসজিদের মুয়াজ্জিন হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিল। সে তার গ্রামের মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসাবে ডাক পেয়েছে। এখানে মুয়াজ্জিন হিসাবে সে যা বেতন পায় তাতে নিজের থাকা-খাওয়ার পর বাড়িতে বউ, ছেলেমেয়ের কাছে তেমন কিছু পাঠাতে পারে না। তারা কষ্ট করে। গ্রামের মসজিদে চাকরি করলে নিজের খেত-খামার-পুকুর ইত্যাদিরও দেখাশোনা করতে পারবে। বাড়তি আয় হবে।
মুয়াজ্জিন চলে যাবার পর মসজিদ কমিটি মুয়াজ্জিনের জন্য আর এখানে-সেখানে গেল না। সুললিত কন্ঠের অধিকারী ফয়েজ মোল্লাকে চাকরির পস্তাবটা দিল তারা। ফয়েজ মোল্লা এতটুকু গড়িমসি না করে প্রস্তাবটা লুফে নিল। যে চাকরিতে কারও চলে না, সে চাকরিতে আর কারও ষোলআনা পাওয়া হয়ে যায়।
ঝট করে ফয়েজ মোল্লার আয়-রোজগার চারগুণ বেড়ে গেল। মুয়াজ্জিন হিসেবে বেতন তো আছেই, টিউশনির সংখ্যা গেল বেড়ে। তার ওপর আছে এবাড়ি-ওবাড়ি মিলাদ, খতম ইত্যাদি। এসব অনুষ্ঠানে গেলে ভাল খাওয়ার পর না চাইতেই হাতের মুঠোয় কিছু না কিছু টাকা চলে আসে।
বাড়ির মালিক সুশীল ভট্টাচার্য নিশ্চিত ছিল যে, এবার ফয়েজ মোল্লা তার স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার রুমটা ছেড়ে দিয়ে ভাল একটা বাড়িতে ভাড়া যাবে। ফয়েজ মোল¬া সেরকম ইঙ্গিতও দিয়েছিল। হঠাৎ সে বলল-নাহ! এখানেই বেশ আছি।
বিলাসিতায় অর্থ অপচয় আল্লাহপাক পছন্দ করেন না।

৭ মার্চ ১৯৭১।

বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স মাঠে ভাষন দিলেন। দেশ তখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে। সে ভবিষ্যতটা কি স্বাধীনতা প্রাপ্তি, না আরও বেশি করে শোষন-শাসনের বেড়া জালে আবদ্ধ হওয়া তা মানুষ বুঝতে পারছে না। এরকম সময় মসজিদ কমিটি সিদ্ধান্ত নিল, ফয়েজ মোল্লাকে কোয়ার্টার দেবে। ঈমাম সাহেবের কোয়ার্টারের ছাদে দেয়াল তুলে দুই রুমের বাসা বানিয়ে দেবে। এরকম অনিশ্চিত সময়ে মোয়াজ্জিনের বাইরে থাকা ঠিক না।

স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার এক রুমের চেয়ে দোতালার ওপর দুই রুমের বাসা অবশ্যই ভাল। তার ওপর সে বাসার জন্য কোনো ভাড়া গুণতে হবে না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ফয়েজ মোল্লা কোয়ার্টার নেয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল। সে বলল- এতদিন তাদের সাথে আছি। দেশ এখন এক ক্রান্তি লগ্নে। শেষ পর্যন্ত কী হয় তা বলা যাচ্ছে না। বিভ্রান্ত মানুষেরা বড় রকমের ঝামেলা বাঁধাতে পারে। এরকম অনিশ্চিত সময়ে আমি তাদেরকে ছেড়ে যেতে পারি না। আমি তাদের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে থাকতে চাই। ঝামেলা মিটে গেলে তারপর নিজের কোয়ার্টারে যাব।

জগতে ভাল মানুষ আছে, এতটা ভাল মানুষ বোধহয় খুব কমই আছে। সুশীল ভট্টাচার্য এবং তার স্ত্রী মিতালী ভট্টাচার্য যারপর নাই খুশি হল। বাবা-মায়ের সাথে মহুয়া আর সুমনও খুশি। পশ্চিম পাকিস্তানিরা নানাভাবে হিন্দুদের দোষ দিচ্ছে।

তাদেরকে ইন্ডিয়ার দালাল বলছে। বলছে, স্বাধীনতা চেয়ে যে আন্দোলন হচ্ছে তার সবই করছে হিন্দুরা ভারতের উস্কানিতে। মসুলমানরা স্বাধীনতা চায় না। তারা পাকিস্তানের প্রতি গভীর অনুরক্ত। সুতরাং, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর তাদের রাগটাই বেশি। এরকম সময়ে ফয়েজ মোল্লার মত খাঁটি ধার্মিক মুসলিম পাশে থাকলে সুবিধাই হবে। কিন্তু ফয়েজ মোল্লা বিভ্রান্ত মানুষ বলতে কাদেরকে বোঝাল তারা তা বুঝতে পারল না।

ফয়েজ মোল্লার সাথে সুমনের গল্পের প¬ট পরিবর্তন হয়ে গেল। সুমন বলল-চাচা, আপনার কী মনে হয়?
-কিসের কী মনে হয়?
-যুদ্ধ তাহলে বেঁধেই যাবে?
-যুদ্ধ! যুদ্ধ কিসের? এই সব পোকা তোমাদের মাথায় ঢুকায় কে? তোমার আর মহুয়ার মধ্যে কি কখনো ঝগড়া হয় না?
টুকটাক গন্ডগোল বাঁধছে, আবার মিটেও যাবে।
-বঙ্গোবন্ধু কিন্তু বলেছেন-যার যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ো, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। দেশকে স্বাধীন করে ছাড়ব।
-তিনি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন। রীতিমত স্বাধীনতা ঘোষণা করে ফেলেছেন।
-বাড়াবাড়ি?
-নয়তো কী? মুক্তির সংগ্রাম! স্বাধীনতার সংগ্রাম! আমরা কি এখন পরাধীন আছি? ৪৭-এ কি পেলাম? আবার কিসের স্বাধীনতা? দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান তৈরী হয়েছে। এই পাকিস্তান আর ভাঙতে পারে না। দ্বিজাতী তত্ত্ব কী বোঝ?
এটা একটা মহান তত্ত্ব। এটা মার্কস-লেনিনের কোনো নাস্তিকবাদ তত্ত্ব না।
-আপনিই বলেন চাচা, ’৪৭-এর পর থেকে অদ্ভূত এক পাকিস্তান ছাড়া আর কি পেয়েছি আমরা?
-অদ্ভূত! পাকিস্তানকে তুমি অদ্ভূত বলছো কেন?
-কেন বলবো না ? শুধু ধর্মের মিল নিয়ে একটা দেশ হতে পারে না। প্রথমেই তারা আঘাত হানল আমাদের ভাষার ওপর।
৫৪% এর ভাষা ছিল বাংলা, আর উর্দু তো টেনেটুনে ৩%।
-তোমার সাথে আমি এ নিয়ে কথা বলতে চাই না। তুমি এই সব বুঝবা না।
-বলেন আপনি। আপনি মুরুব্বি। আমি ভুল বলতে পারি। আপনার কাছ থেকে আমার শেখার আছে।
-শোন, পার্সেন্ট দিয়ে সবকিছু হয় না।
-মানে?
-মানে আরবী, ফারসি. উর্দু এগুলো ইসলামের ভাষা, এগুলো পরকালের ভাষা। ইসলামিক রাষ্ট্র হিসাবে উর্দুই এই দেশের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত ছিল। গোলাম আযম সাহেব কী বলেছেন পত্রিকায় পড়োনাই? তিনি বলেছেন, ভাষার জন্য আন্দোলন করাটা ভুল ছিল। কার কী মাতৃভাষা সেটা কথা না, সব অঞ্চলের মসুলমানরাই উর্দু বোঝে।
-কি বলছেন এসব! মাতৃভাষার মর্যাদা তো মা আর মাতৃভূমির মত।
-এ সব নাস্তিক সাহিত্যিকদের কথা।
-ঈশ্বরতো সব ভাষাই বোঝেন। সব ধর্মেও মাতৃভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তারপর ওরা আর কী দিল আমাদের? পদে পদে আমাদেরকে বঞ্চিত করে রেখেছে। অন্যায়ভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে। এ অঞ্চলের সম্পদ কেড়ে নিয়ে…….।

-ক্ষমতাবান নেতা না থাকলে ক্ষমতা দেবে কার হাতে? আইয়ুব, ইয়াহিয়ার মত নেতা এখানে কয়টা আছে?
-তারা কি নেতা? তারা আর্মির লোক। তারা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করে রেখেছে। তারা স্বৈরশাসক। ৭০-এর নির্বাচনে তো আওয়ামিলীগই জিতল। দিল ক্ষমতা?
-এর জন্য স্বাধীনতা চাইতে হবে?
-পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে কী করে মানুষ?
-কী করে এখন বুঝবা। দেয়লের সাথে পিষা মাইরা ফেলবো। স্বাধীনতা তো ময়রার দোকানের সন্দেস না যে, ইচ্ছা হল আর গপাগপ মুখে তুলে দিলাম। পাকিস্তানের আর্মি হল পৃথিবীর সবচেয়ে স্ট্রং আর্মি। দাঁড়াও তাদের সাথে। স্বাধীন ও শক্তিমান রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে বেঁচে আছে তো বাঙালির ভাল লাগছে না।
ফয়েজ মোল্লার সাথে কথা বলে সুমনের মনে কেমন খটকা লাগে। সে দেশের স্বাধীনতা চায় না। তাহলে যারা স্বাধীনতা চায় তাদেরকেই কি সে বিভ্রান্ত মানুষ বলেছে?

ফয়েজ মেল্লার সাথে কথোপকোথন নিয়ে সুমন মহুয়ার সাথে কথা বলে। সব শুনে মহুয়া হাসে। বলে-তোর সাথে তিনি মজা করেছেন। তোকে বাজিয়ে দেখলেন। তোর মনোভাব বুঝলেন। স্বাধীনতা এখন সবাই চায়। স্বাধীনতা ছাড়া এখন আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। তার মত প্রাজ্ঞ লোক যে স্বাধীনতা চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। দেখিস, খুব শীঘ্রই যুদ্ধ বেঁধে যাবে। সেদিন এই ফয়েজ চাচাই মুক্তিবাহিনীর দল গঠন করে ফেলবেন।
সুমন মহুয়ার কথা বিশ্বাস করে। হয়তো তাই। ফয়েজ মেল্লা তার সাথে ঠাট্টা করেছে, তাকে বাজিয়ে দেখেছে। যে যতই বাজিয়ে দেখুক, সে স্বাধীনতার পক্ষে। যুদ্ধ বেঁধে গেলে সে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে।

২৫ মার্চ।

রাতে আচানক গুলিশ শব্দ। গোটা শহর প্রকম্পিত। সুমনের ঘরে দরজায় খটখট শব্দ। মহুয়ার ঘরের দরজায় খটখট শব্দ। সুনীল আর মালতীর ঘরের দরজায় খটখট শব্দ। ওরা জানালা ফাঁক করে দেখে ফয়েজ মোল্লা। সবার হৃদকম্প থামে। তারা দরজা খোলে। ফয়েজ মোল্লা পান চিবুতে চিবুতে দাড়িতে হাত বুলায়। সান্ত¦নার সুরে বলে-তোমরা ভয় পেয়ো না। আমি আছি। তোমাদের কিছু হবে না। যত গোলাগুলি সব বিভ্রান্তদের জন্য। তোমরা তো বিভ্রান্ত না। সুমন নিজের ঘর থেকে মহুয়ার ঘরে চলে আসে। জানালা ফাঁক করে দূরে আগুন দেখতে পায়। গুলি ছুড়ছে। আগুন জ্বালাচ্ছে। কত মানুষ মরছে এই রাতে? যাদেরকে মারছে তারা বিভ্রান্ত? ফয়েজ মোল্লা তাই বললো। ওরা নিজেরাও তো স্বাধীনতা চায়। তাহলে কি ওরাও বিভ্রান্ত? শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বেধে গেল। যদ্ধের শুরুতেই সুশীল ভট্টাচার্য উধাও। মালতীকে শুধু বলে গেছে-ড্রয়ারে কিছু টাকা আছে। আর ভাড়ার টাকা নিয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে চলো। ফয়েজ ভাই তো আছেনই। কোনো সমস্যা হবে না। সুযোগ বুঝে আমিও আসবো মাঝে মাঝে।

সুশীলের যদ্ধে যাবার কথা শুনে ফয়েজ মোল্লাা যারপর নাই বিরক্ত হল। ক্ষোভের সাথে বলল- সুশীল দা’ কাজটা ঠিক করল না। আমি তো আছি। আমার সাথে একবার আলোচনা করতে পারতো। মন চাইল আর যুদ্ধে চলে গেল! তার বোঝা উচিত ছিল, বাঘের সাথে ছাগলের কোনো যুদ্ধ হয় না। এখন ঝপে-জঙ্গলে মশার কামড় খেয়ে ম্যালেরিয়া বাঁধিয়ে মরবে আর কি। এবার মহুয়াও দ্বিধাগ্রস্থ। সে বুঝতে পারে না, ফয়েজ মোল্লা সত্যিকারে কি বলতে চায়। সত্যিই কি সে স্বাধীনতা চায় না?
এরই মাঝেই একদিন সুমন বলে বসল, সে যুদ্ধে যাবে। যাবে মানে যাচ্ছে। সব চূড়ান্ত। পাড়ার যুবকরা এক দল হয়ে যুদ্ধে যাচ্ছে। কিশোররাও চাইলে তাদের সাথে যেতে পারে। তাদেরকে সরাসরি যুদ্ধ না করলেও চলবে। মুক্তিযোদ্ধাদের এটা-ওটা সাহায্য করলেও উপকার হবে। সুমনের বেশ কয়েকজন বন্ধু নাম লিখিয়েছে। সে আর বসে থাকবে কেন? স্কুল বন্ধ।
লেখাপড়া নেই। ঘরে বসে থেকে লাভ কী? দেশের জন্য যুদ্ধে গেলে লাভ আছে।
সুমনের কথা শুনে মালতীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে হাহাকার করে উঠে-তুই এ সব কী বলছিস!
তার কান্নার শব্দে ফয়েজ মোল্লা ছুটে আসে। সব শুনে সে বলে-বাপ ভুল পথে গেছে, ছেলে তো যাবেই।
সুমন প্রতিবাদ করে বলে-ভুল না চাচা। এখন দেশের জন্য যুদ্ধ করাটাই সবচেয়ে সঠিক কাজ। যারা সেটা করছে না তারাই ভুল করছে।

স্বামী ও একমাত্র পুত্র যুদ্ধে যাবার পর, বয়সী একটা মেয়েকে নিয়ে থাকা একটা মায়ের জন্য যে কতটা কঠিন তা বর্তমান সময়ে বসে কল্পনা করা যাবে না। বাবা ও একমাত্র ভাইটি যুদ্ধে যাবার পর, মাকে নিয়ে থাকা একটা বয়সী মেয়ের জন্য যে কতটা কঠিন তা বর্তমান সময়ে বসে কল্পনা করা যাবে না। তার ওপর তারা যদি ধর্ম বিশ্বাসে হয় হিন্দু। মালতী আর মহুয়ার সামনে তখন একমাত্র ভরসা ফয়েজ মোল্লা । ফয়েজ মোল্লাার ওপর তাদের যথেষ্ট বিশ্বাসও আছে। সে স্বাধীনতার বিপক্ষে থাকলেও তাদের কোনো ক্ষতি হতে দেবে না। ফয়েজ মোল্লা সে বিশ্বাসকে আর দৃঢ় করে তার কাজ-কর্মের মাধ্যমে। সে প্রতিদিনের বাজার এনে দেয়। টুকটাক যা দরকার তাও এনে দেয়। মালতিকে বলে-কিছু ভাববেন না ভাবী। আমি তো আছি। মহুয়াকে বলে-কিছু ভেবো না মা। আমি তো আছি।

যে এত সুন্দর করে ‘মা’ ডাকতে পারে সে থাকতে ভয় কিসের? কয়েকদিন পর লক্ষ্য করা গেল। ফয়েজ মোল্লার ঘরে কিছু অপরিচিত লোক আসছে। তারা নিচু স্বরে আলাপ-আলোচনা করে। তারপর চলে যায়। তাদের ফিসফিসানি থেকে মহুয়া আলাপ-আলোচনার বিষয়-বস্তু বুঝতে পারে। হামলা, আক্রমন, হত্যা, গুম, আটক এসব শব্দগুলো মহুয়ার কানে যায়। আগত লোকদের কাছে যে অস্ত্র থাকে এমন আভাসও মহুয়া পেয়েছে। সে মনে মনে খুশি হয়। তাহলে ফয়েজ মোল্লাও যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। তার মত ভাল মানুষ দেশের ডাকে সাড়া দেবে না, তা কী করে হয়?

কিন্তু একদিনের দু/একটা শব্দ মহুয়াকে কাঁপিয়ে দেয়। মাল, ধর্ষণ, ভোগ। এসব শব্দ কেন উঠছে? দেশের জন্য যুদ্ধ করলে ধর্ষণের প্রসঙ্গ আসবে কেন? কাদেরকে কে ধর্ষণ করছে? একদিন কিছু লোক আসে ফয়েজ মোল্লার ঘরে। সেদিন ফয়েজ মোল্লা অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। নানা রকম খাবারের আয়োজন করে। খাবার খেতে খেতে তারা হাসি-তামাসাও করে। হাসির উচ্চ শব্দ এসে আছড়ে পড়ে মহুয়ার ঘরে। সে সব শব্দ থেকে সে কিছু শব্দ আলাদা করতে পারে। যে শব্দগুলো আমাদের বাংলা ভাষার না। ঠিক এমতাবস্থায় মহুয়ার ঘরে ঠকঠক। মহুয়া দরজা খুলে দেখে ফয়েজ মোল্লা। ফয়েজ মোল্লা বলে-মা জননী, ঘরে আমার সম্মানিত মেহমান। তাদেরকে একটু চা খাওয়াতে পারবে? যদি একটু কষ্ট স্বীকার করে…..।

-আমি চা করে দিচ্ছি চাচা।

ট্রেতে চায়ের পেয়ালা সাজিয়ে মহুয়া ফয়েজ মোল্লার ঘরে ঢোকে। ঢুকেই প্রচন্ড হোঁচট খায় মনে। অন্যান্য লোকের সাথে সেখানে তিনজন পাকিস্তানি আর্মি। তারা একযোগে ছয়টা চোখ ফেলে মহুয়ার ওপর। দৃষ্টিতে তীব্র ক্ষুধা। মহুয়া কম্পিত হাতে টেবিলে চা রাখে। তাদের একজন পেটমোটা একটা বোতল থেকে গলগল করে গলার ভেতর তরল ঢেলে দেয়। কিসের তরল ওটা? আরেকজন চারটা প্রশ্ন করে। বিজাতীয় ভাষা হলেও মহুয়া প্রশ্ন কিছুটা বোঝে। কিন্তু ফয়েজ মোল্লার উত্তর তো না বোঝার কিছু নেই। ফয়েজ মোল্লা উত্তর দেয়-

১. মা জননীর নাম মহুয়া। মহুয়া ভট্টাচার্য।
২. কলেজে পড়ে।
৩. বয়স ১৭/১৮।
৪. জি জি, মা জননীর রূপ-সুরত মাশাল্লা। এই তল্লাাটে এমন মেয়ে……!

মহুয়া চা রেখে ছুটে পালায়। নিজের ঘরে এসে সে ভীষণ কাঁপতে থাকে। কাঁপতে কাঁপতেই তার শরীরে রাগের আগুন জ্বলে উঠে। লোকরা তখন চলে গেছে। মহুয়া ফয়েজ মোল্লাার ঘরে ঠকঠক শব্দ করে। ভীষণ জোরে। ফয়েজ মোল্লা ধরপরিয়ে এসে দরজা খোলে। দরজা খুলে মহুয়াকে দেখে ধরে পানি ফিরে পায়। বলে-মা জননী যে? এত জোরে ঠকঠক করছো! আমি আবার ভাবলাম মুক্তির বাচ্চারা নাকি।

-মুক্তির বাচ্চাদের আপনার খুব ভয়?
-আরে না। ওরা আমার কী করবে? দেখলা না আমি কাদের সঙ্গে ওঠ-বস করি?
-দেখলাম তো। আপনি রাজাকারে নাম লিখিয়েছেন?
-তোমার বাপ-ভাই ভুল করবে বলে আমিও কি ভুল করবো?
-নিজের দেশে আর দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যাওয়া শুদ্ধ?
-আমি নিজের দ্যাশের বিরুদ্ধে যাই নাই। আমার দ্যাশ পাকিস্তান। আমি পাকিস্তানের পক্ষে লড়াই করছি। বলতে পার ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করছি। ওরাই তো সব নাটের গুরু।
-আপনি নিজ দেশের মানুষদের হত্যা করছেন।
-আমি দেশের শত্রুদের নিধন করছি।
-আপনি নিজ দেশের মা-বোনদের তুলে দিচ্ছেন পিচাশ হানাদারদের হাতে। দয়া করে আপনি কালই
আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন।
-অতো মাথা গরম করো না। আমিই এখন তোমাদের একমাত্র ভরসা।
-যার বাবা-ভাই দেশের জন্য যুদ্ধ করছে, দেশের শত্রু তার কেমন ভরসা হবে তা সে ভালোই বোঝে। আপনি কালই চলে যাবেন।
-এই যুদ্ধের দিনে আমি কোথায় যাব?
-তা আমরা জানি না। মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে বসে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার পরিকল্পনা আমরা সইবো না।
-আমি না গেলে আমাকে তাড়াতে পারবে না। আমি এখন সেই আগের ফয়েজ মোল্লা না। আমি এই এলাকার শান্তি কমিটির প্রধান।
-আমি মুক্তিযোদ্ধা বাবার মেয়ে। মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের বোন। আপনাকে তাড়াতে পারি কি পারি না তা টের পাবেন।
-মুক্তিযোদ্ধা বলতে তুমি যা মনে করছো আসলে তা না। তারা হল শেয়াল। জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে দুই/একটা ঠুসঠাস করে কি যুদ্ধ হয়? পাকিস্তানি আর্মি হল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিমান আর্মি। তার সাথে আছে আমেরিকা আর চীন। তার চেয়ে চুপ থাকো। আমি তোমাদের রক্ষা করবো। তোমার বাপ-ভাইকেও রক্ষা করবো। বলো, তারা কোথায় যুদ্ধ করছে। আমি আর্মিদের বলে দেব যাতে……।

-চুপ করেন। তার আগে আপনার খবর চলে যাবে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। দেখবেন তখন……।
মহুয়া অপেক্ষায় থাকে বাবা বা সুমনের আসার জন্য। যুদ্ধে যাবার পর বাবা এসেছে একবার আর সুমন এসেছে দুইবার। এবার এলেই সে ফয়েজ মোল্লার বেঈমানীর কথা বলে দেবে। অনুরোধ করবে দ্রুত ব্যবস্থা নেবার।

এপ্রিল মাসের ২৭ তারিখ।

খুব গরম পড়েছে। মহুয়া জানালার একটা দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়েছিল। রাত তখন বারোটা পেরিয়ে। মহুয়া মাথার কাছে ফিসফিস শুনতে পায়-মা, দরজাটা খোল। নিশ্চয় স্বপ্ন। পাত্তা দেয় না মহুয়া। কিন্তু বার বার একই কথা। স্বপ্ন এত দীর্ঘ হয় না। একটা স্বপ্নের দৈর্ঘ্য মাত্র ৩ সেকেন্ড। মহুয়া চোখ মেলে। ঘাড় ফিরিয়ে জানালায় তাকায়। দেখে জানালায় বাবার মুখ। সে ছুটে গিয়ে দরজা খোলে। সুশীল ঘরে ঢুকলে মালতী ব্যস্ত হয়ে পড়ে খাবার তৈরীতে। সুশীলের প্রিয় খাবার ডাল আর পুঁই শাক ভাজা। ডাল রান্না করা আছে। পুঁইশাকটা ভাজলেই হয়। সাথে একটা ডিম ভেজে দেবে। মালতী রান্না ঘরে যায়। সেই ফাঁকে মহুয়া বাবাকে এক গ্লাশ লেবুর শরবত দেয়। মহুয়ার নিজ হাতে লাগানো লেবু গাছ। সেই গাছে এই প্রথম লেবু ধরেছে। যুদ্ধের এই দুঃসময় তার মনে কোনো রেখাপাত করতে পারেনি। সে দিব্যি বাতাসের সাথে দুলে দুলে খেলা করছে, ফুল ফোটাচ্ছে, ফুল থেকে ফোটাচ্ছে ফল।

সুশীল যখন ভাত খাচ্ছে তখন মহুয়া কথাটা তোলে। তবে তাকে বিস্তারিত কিছু বলতে হল না। একটু বলতেই সুশীল বলল-আমি সব জানি মা।
-তোমরা কি কোনো ব্যবস্থা নিতে পার না?
-আমাদের দলটা ঢাকা থেকে অনেক দূরে। আমরা যুদ্ধ করছি সীমান্তের কাছে একটা গ্রামে। গ্রামের নাম সুসং দূর্গাপুর। আর ঢাকা এখনও পুরোপুরি আর্মিদের ক্যাপচারে। তাই এখানে সহসা কোনো অপারেশনে যাওয়া খুব কঠিন। তবে আমি ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেছি অনেকের সাথে। ঢাকার আশেপাশের দুটো দল আক্রমনের পরিকল্পনা তৈরী করছে।

খাওয়া প্রায় শেষ। হাত ধোয়ার আগেই দরজায় বুটের লাথি। দরজা খুলতে হল না। পুরনো দরজা ভেঙে পড়ল। ঘরে ঢুকল আর্মি। তারা সুশীলকে বেঁধে নিয়ে গেল। মালতী ছুটে গেল ফয়েজ মোল্লার ঘরের কাছে। ফয়েজ মোল্লা ঘরে নেই। মহুয়া পাথর। চোখের ভেতর রাগ আর ঘৃনার আগুন।

ফয়েজ মোল্লা বাড়িতে ফেরে শেষ রাতে। ছুটে এসে হাহাকার করে বলে-আমি বাড়িতে ছিলাম না, আর তখনই….। আমি থাকলে নিতে পারত না। দাদা আসার আগে আমাকে একটা খবর তো দিতে পারত। তাহলে আমি বাড়ি থেকে বের হতাম না। ভাবী, আপনি কিচ্ছু ভাবনে না। আমি নামাজটা পড়ে আসি। তারপর ভাইয়ের খোঁজে বের হব। খোঁজ আমি বের করবোই।

দু’দিন মালতী বা মহুয়া কেউ ফয়েজ মোল্লার সামনে যায়নি। জিজ্ঞেসও করেনি কোনো খোঁজ করেছে কিনা। কারণ, তারা ভালই জানে ফয়েজ মোল্লার কাছ থেকে কী সাহায্য পাওয়া যাবে। মালতী আশেপাশে পরিচিত মানুষদের কাছে গিয়েছে।

কিন্তু কেউ ভাল কোনো আশ্বাস দিতে পারেনি।
দু’দিন পর হঠাৎ ফয়েজ মোল্লা ছুটে এসে বলল-দাদার খোঁজ পাওয়া গেছে।
সব রাগ, ঘৃণা দূরে রেখে মহুয়া তাকাল ফয়েজ মোল্লার মুখে। শত হলেও প্রিয় বাবা। বাবাকে ফিরে পেতে পশুর সাহায্য নিতেও দোষ নেই। মালতি বলল-কোথায়?
-সহিসালামতেই আছে। যারা ধরে নিয়েছে তাদের সাথে আমার ভাল জানাশোনা। তারা পরে জেনেছে আমি যার বাড়ি ভাড়া থাকি এ সেই ব্যক্তি। এটা জেনে কোনো ক্ষতি করে নাই। মা জননী, তুমি যদি এখন আমার সাথে যাও, তো তোমার বাবাকে নিয়ে আসতে পারবে।
মালতী বলল-ওর যাবার দরকার নেই, আমি যাব।
-না না, আপনি বয়স্ক মানুষ। আপনি কেন কষ্ট করবেন? আধা ঘন্টার ব্যাপার।
মহুয়া বলল-চলুন, আমি যাব বাবাকে আনতে।
-তাহলে হাত-মুখটা ধুয়ে নাও। মাথার চুলগুলো বিন্যস্ত করো। দুদিনে শরীরে যা হাল করেছো। বাবা তো তোমাকে দেখে চিনতেই পারবে না।
মহুয়া বসে আছে ঘরের ঠিক মাঝখানে মেঝোর ওপর। তার মুখ দুই হাঁটুর মধ্যে গুজে দেয়া। শরীরে পোশাক বলতে মাথার দীঘল কালো চুল। সে চুল পিঠ ছাড়িয়ে মাটিতেও লুটিয়ে পড়েছে। তার অদূরে একটা চেয়ারে ফয়েজ মোল্লা বসে বসে পান চিবুচ্ছে। পান চিবুতে চিবুতে সে বলল-তোমাকে আমি মা জননী ডাকতাম তা ঠিক। তবে ধর্মে রক্তের সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক মানা হয় না। ধর্ম মা, ধর্ম বাপ, ধর্ম ভাই, ধর্ম বোন এগুলা আমাদের ধর্মে হারাম। আর এখন তো যুদ্ধের সময়। আমরা দ্যাশের পক্ষে। তোমরা দ্যাশের বিপক্ষে, মানে তোমরা ইন্ডিয়ার পক্ষে। যুদ্ধে গণিমতের মাল বলে একটা কথা আছে। একটু পর আমার স্যাররা এসে পড়বেন। তার আগে আমি একটু…..। তুমি মনে কিছু করো না। আমার স্যাররা সাচ্চা প্রাণের মসুলমান। আর আমাকে তো জানোই। হয়তো শুধু এই কারণেই হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও তুমি বেহেস্ত পেতে পারো।

আমি ধর্ম মতের বাইরে জীবনে এক পা হাঁটি নাই, কোনোদিন হাঁটবোও না। সত্যি বলছি, এখন আমি যা করছি সেটাও ধর্ম মতে। বললাম তো এখন যুদ্ধের সময়…..। তুমি আমার জন্য জায়েজ। স্বামী, ছেলে, মেয়ের জন্য কয়েকদিন অপেক্ষা করে মালতী শেষে এক আত্মীয়ের সাথে কোথায় যেন চলে যায়। যাবার সময় ঘরের আসবাব-মালামাল কিছু নিল না। এমন কি ঘরের দরজা পর্যন্ত বন্ধ করে গেল না। জীবনের যা সে হারিয়েছে তার চেয়ে মূল্যবান আর কী আছে? এসব রক্ষা করে কী হবে?

যুদ্ধের নয় মাস ফয়েজ মোল্লা সেখানে ছিল। দেশ স্বাধীনের সাথে সাথে সে লাপাত্তা। তারপর থেকে সুশীল ভট্টাচার্যের বাড়িটা জনশূন্য। প্রথম প্রথম এলাকার ছেলেপুলে সে বাড়িতে ঢুকে খেলাধুলা করত। ছিচকে চোর ঢুকে ঘরের এটা-সেটা নিয়ে যেত। তারপর ধীরে ধীরে বাড়িটা ঝোপ-ঝাড়ে ভরে উঠে। হয়ে উঠে একটা জঙ্গল। ভূতুরে বাড়ি। কেউ আর সেখানে প্রবেশ করে না। সবাই বাড়িটার নাম দেয়-ভট্টাচার্যের ভূতের বাড়ি।

১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ সাল।

শেখ মুজিব স্বপরিবারে নিহত হলেন। তার ক’দিন পরই আচানক ফয়েজ মোল্লা এসে হাজির। এসেই সাফ-সূতোর করতে শুরু করে দিল ভট্টাচার্যের ভূতের বাড়ি। বলল-সে নাকি বাড়িটা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সুশীল ভট্টাচার্যের কাছ থেকে কিনে রেখেছিল। সে কাগজ-পত্রও দেখাতে পারবে। কাগজ-পত্র দেখবে এমন সাধ্য কার? ফয়েজ মোল্লার তখন ভীষণ ক্ষমতা। কর্নেল, মেজর, লেফটেনেন্ট, জেনারেল সবার সাথেই নাকি তার দহরহম-মহরম। খুব শীঘ্রই তার অন্যান্য লোকরা যারা পাকিস্তান বা এখানে-ওখানে ছিল সবাই দেশে এসে পড়বে। ’৭১-এর আগে দেশ যেমন ছিল ঠিক তেমন নাকি হয়ে যাবে।

সপ্তাহ খানের মধ্যে বাড়ি পরিস্কার। ঝকঝকে-তকতকে। ভেঙে ফেলা হল সুশীল ভট্টাচার্যের নোনা ধরা দেয়াল আর জং ধরা চিনের ঘর। বাড়ির চারদিকে দশ ফিট উচু কংক্রিটের বাউন্ডারি উঠতে লাগল। ভেতরে উঠতে লাগল পরিকল্পিতভাবে দুই ইউনিটের তিন তলা দালান। একতলা শেষ হতে না হতেই তার বউ-বাচ্চা এসে পড়ল।

ফয়েজ মোল্লাা ভাগ্যান্নষণে এসে যে মসজিদের মুয়াজ্জিন হয়েছিল সেই মসজিদ কমিটির সভাপতি হয়ে গেল। মানে পুরাতন কমিটি ভেঙ্গে তাকে সভাপতি বানাতে হল। ক’দিন পর সভাপতি কাম ঈমাম। তারপর ঈমাম সাহেবে কোয়ার্টারকে সে বানাল মাদ্রাসা। মূলতঃ মাদ্রাসার মালিকানা তার একার। বাজারে দুইটা দোকান নিল। এরই মাঝে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ল ফয়েজ মোল্লা। সেনা শাষকরা ধর্মকে বেশ গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। গুরুত্ব মানে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রথম শর্ত হল, সাধারণ মানুষের তুলতুলে ধর্মীয় অনুভূতিকে ইতবাচকভাবে নাড়া দেয়া।
আর সেই সুযোগে ’৭১-এর পরে যে ফয়েজ মোল্লারা গর্তে ঢুকেছিল তারা আবার বেরিয়ে এল। ফয়েজ মোল্লা তার দলে পটাপট প্রমশন পেতে লাগল। তার দলও আর্থিকভাবে ফুলেফেপে উঠতে লাগল। কারণ, তার দলে পশ্চিম থেকে আসতে লাগল অলস-অকর্মাদের তেল বেচা টাকা। সে টাকা ফয়েজ মোল্লাার পকেটেও পড়তে থাকে। তার ওপর আছে আর্মি ভাইদের সুদৃষ্টি। ফয়েজ মোল্লা হয়ে গেল শিল্পপতি। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানে মাদ্রাসা। মোল্লা খেতাব ছুড়ে ফেলে সে হয়ে গেল মাওলানা ফয়েজউল্লা চাটবাড়ি। চাটবাড়ির স্থলে হওয়া উচিত ছিল বাটপাড়ি। কিন্তু সেটা হওয়াবে কে? কার বুকে অত বড় ছাতি?

সেনা শাসক সংবিধানেও ধর্ম নিয়ে নানা কিছু যুক্ত করতে থাকে। চারিদিকে ওয়াজ মাহফিলের ধুম পড়ে যায়। মাওলানা ফয়েজউল্লা চাটবাড়ির পোয়া বারো। তার নাওয়া-খাওয়ার সময় নাই। তিন মাস/ ছয় মাসের পরের মাহফিলের টাকাও সে অগ্রিম পেতে থাকে। মিডিল ইস্টেও তার মাহফিল হতে থাকে। সে হয়ে যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মাওলানা। স্বাভাবিকভাবেই রেডিও/টিভি ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠে। হয়ে উঠে বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ-বুজর্গ। বিকালে ওয়াজ করে-ছবি তোলা হারাম, আর সন্ধ্যায় বসে টিভি ক্যামেরার সামনে।

দর্শক-শ্রোতা-আসসালামুআলাইকুম।
-অলাইকুমআসসালাম। মেহেরবানী করে আপনার নামটা বলুন।
-আমার নাম মোহাম্মদ ইব্রাহিম।
-এবার মেহেরবানী করে প্রশ্নটা বলুন।
-কোরবানীর গোশত বন্টনের পদ্ধতিটা জানতে চাই।
-আল্লাহ আপনার ওপর অশেষ রহমত বর্ষণ করুন। কোরবানীর গোশত সমান তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ আপনার পারিবার খাবে, এক ভাগ পাবে আত্মীয়-স্বজন, আর এক ভাগ পাবে ইয়াতিম-গরীব-মিশকিন।
-আসসলামু আলাইকুম। আমার প্রশ্ন হল….।
-অলাইকুম আসসালাম। আগে আপনার নামটা বলুন।
-আমার নাম মোহাম্মদ আব্দুস সোবাহান।
-আল্লাহ আপনার ওপর রহমত বর্ষণ করুন। এবার আপনার প্রশ্নটা বলুন।
-আমি জানতে চাই অজু করার পদ্ধতি।
-আল্লাহ আপনার সহায় হোন। আমি বলছি…….।

টেলিভিশনে দর্শকদের এরকম জটিল সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে স্বাভাবিকভাবেই মাওলানা ফয়েজউল্লাা চাটবাড়ি হয়ে ওঠে বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ। তার পসার যত বাড়তে থাকে সুশীল ভট্টাচার্যের বাড়ির জৌলুসও তত বাড়তে থাকে। তিন তলা দালানের সামনে বাগান। তাল-নারিকেলের সারি। কলাপসেবল গেট। দারোয়ান। গ্যারেজ। প্রাডো ও মার্সিডিজ বেঞ্চ। বাড়ির সামনে সোনালী পাতে খোদাই করে লেখা মোল্লা প্যালেস। মোল্লাকে ঝেটিয়ে বিদায় করে মাওলানা খেতাব নেবার পরও বাড়ির নাম মোল্লা প্যালেস রাখল কেন তা কেউ বুঝতে পারল না। নির্বিঘ্ন ও সম্মানিত জীবন মাওলানা ফয়েজউল্লা চাটবাড়ির। সে বিভিন্ন মাহফিলে খেদের সঙ্গে একটা কথা বারবার বলে-মানির মান আল্লাাহ রাখেন।
নাফরমানরা আমার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র করেছে, অপপ্রচার চালিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমারই জয় হয়েছে। আল্লাহ যার সহায় মানুষ তার ক্ষতি করবে কিভাবে?
ওয়াজের মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয় ওয়াজ হল নারী বিষয়ক। যে কোনো স্থানে সে নারী বিষয়ক ওয়াজটা করবেই। যারা তার ওয়াজের নিয়মিত শ্রোতা তাদের সে ওয়াজ মুখস্ত। ওয়াজ করার সময় সে অনেকটা আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে।
ওয়াজটা এরকম-হে আল্লাহর পেয়ারা বান্দাগণ! আপনার স্ত্রী-কন্যার ব্যাপরে সাবধান। নারী মুক্তি, নারী শিক্ষা, নারীদের চাকরি-বাকরি ইত্যাদির নামে ইউরোপ-আম্রিকায় কী হইতেছে তা আপনারা জানেন নিশ্চয়। সেই ঢেউ আইসা লাগতেছে আমাদের দ্যাশে। ঢেউ এ যাতে আমরা ভাইসা না যাই তাই আগেই সতর্ক কইরা বলছি-নারীদের কোনো মুক্তির দরকার নাই। আম, কাঁঠাল, লিচু ইত্যাদির চামরা ছিললে কী হয় বলেন? সবার সে সব ভক্ষণ করতে ইচ্ছা হয়। টক দেখলে কী হয় বলেন? মুখে লালা আসে। তাই নারী পুরুষের সামনে গেলেই পুরুষের কাম বাসনা জাগে, যদি সে পুরুষ ধ্বজভঙ্গ রোগি না হয়। তাই আপনার স্ত্রী-কন্যাদের ঘরে আব্রু সহকারে রাখেন। শিক্ষা শিক্ষা কইরা পাগল হইয়েন না। মেয়েদের কোরআন শেখান, নামাজ-কালাম শেখান, নাম-ধাম লেখা শেখান তারপর বিয়া দিয়া দেন। শিক্ষা, চাকরি-বাকরি, কল-কারখানায় কাজ এগুলা আল্লাহ পাক পুরুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন, নারীর জন্য না। আর ঘরের দায়িত্ব দিয়েছেন নারীকে। বলেন সুবাহান আল্লাহ। এত আস্তে বলেন ক্যান? গলা ছাইরা বলেন। এই তো। শোনেন, আপনার স্ত্রী-কন্যা ঘরের বার হইলে আপনে মুক্তি পাইবেন না। সাপ, বিচ্ছু সব রাক্ষসের মত কামরাইবো আপনেরে। আর আপনের স্ত্রী-কন্যা যদি ঘরে আবদ্ধ থাকে তাহলে আপনার জন্য রয়েছে পুরস্কার। সত্তুরটা হুর পাইবেন। অমন সুন্দরী মাইয়া মানুষ এই দুনিয়ায় পয়দা হয় নাই। ক্লিওপেট্রার কথা শুনছেন? সে নাকি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ্য সুন্দরী। সেই হুরদের রূপের কাছে ক্লিওপেট্্রা বান্দী। হে আল্লাাহর পেয়ারা বান্দাগণ, বলেন সুবাহান আল্লাাহ! গলায় জোর নাই? আরও জোরে বলেন। তাই নারীর রোজগারের টাকা খাওয়ার চিন্তা কইরেন না। আপনের কন্যা চাকরি কইরা টাকা কামাই করবো মানে জ্বিনা কইরা টাকা কামাই করবো। বলেন, আস্তাগফিরুল্লাাহ।

ভালোই কাটছিল মাওলানা ফয়েজউল্লাা চাটবাড়ির জীবন। তারই জাতভাইরা যখন একে একে ধরা পড়ল, সে তখন অক্ষত। উচিত সাজা হোক বা না হোক, ভোটের রাজনীতির কথা তো আর কিছু বলা যায় না। ধরা পড়াটাও তো একটা টেনশন। মাওলানা ফয়েজউল্লা চাটবাড়িকে সেই টেনশনের মধ্যে যেতে হল না। কারণ, সে দূর থেকে জিভ বাড়িয়ে ক্ষমতার রস খেলেও সরাসরি ক্ষমতায় যায়নি কখনো। তার জাত ভাইরা অপবিত্র ও নোংড়া আত্মা নিয়ে পবিত্র সংসদে গেছে। মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে রক্তে কেনা পতাকা উড়িয়েছে, আর মনে মনে বলেছে-শালা খবিস জাতি, আমাগো মাইর খাইয়া-মা-বোনোর ইজ্জত খুয়াইয়া যে পতাকা পাইলি সেই পতাকাই আবার তুইলা দিলি আমাগো গাড়িতে। মুজিবর যে ক্যান এই খবিস জাতিটারে স্বাধীনতা দিয়া গেছে?
তখনও মাওলানা ফয়েজউলল্লা চাটবাড়ি নিশ্চুপ থেকেছে। তার গাড়িতে পতাকা ওড়ানোর সাধ যে হয় নাই তা না, কিন্তু সে ভালোই জানে যে, অতো সাধ করা ভালো না।
হঠাৎ তার যন্ত্রনার কারণ হয়ে উঠল-তার আট বছরের নাতি মোহাম্মদ সোলায়মানুর রহমান। নামটা তারই দেয়া। নবী-রাসূলদের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখলে আল্লাাহ খুশি হোন। আল্লাাহ এমন খুশিই হয়েছে যে, এখন এই ছোকড়া তার গায়ে কাঁদা ছিটিয়ে দিচ্ছে। মাওলানা ফয়েজউল্লা চাটবাড়ি তার বাড়ির সামনে রকিং চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছিল আর ভাবছিল পুরনো দিনের কথা। কোন কোণায় তার সেই স্যাঁতস্যাঁতে ঘরটা ছিল তা তার ঠিক মনে আছে। মনে আছে কোন দিকের ঘরটায় মহুয়া থাকতো, কোন দিকের ঘরটায় থাকতো সুমন। সে মনে মনে বলল-হায়রে কপাল! দ্যাশের জন্য যুদ্ধ করলি, অথচ সেই দ্যাশে তোগো কোনো খবরই নাই। তোগো বাড়ি-ঘর হইয়া গেল মোল্লা প্যালেস, অথচ এই মোল্লা…….!
এমন সময় এল তার নাতি মোহাম্মদ সোলায়মানুর রহমান। সে কোথা থেকে যেন একটা পতাকা যোগার করেছে। চাঁদ-তারা মার্কা পতাকা না। বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। সেই পতাকা হাতে সে মাওলানা ফয়েজউল্লা চাটবাড়ির চারদিকে ঘুরতে লাগল আর বলতে লাগল-রাজাকারের ফাঁসি চাই। রাজাকারের ফাঁসি চাই।

তারপর থেকে সে এই একই শ্লোগান নিয়ে দিনরাত এঘর-ওঘর করছে। মাওলানা ফয়েজউল্লাা চাটবাড়ি প্রথম প্রথম না শোনার ভান করে চুপ করে ছিল। ভেবেছিল, দু’দিন পর নাতি থেমে যাবে। কিন্তু থামাথামি নাই। পনেরো দির ধরে সে একই খেলা খেলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে জীবনভর এমনই করে যাবে। এক পর্যায়ে মাওলানা ফয়েজউল্লা চাটবাড়ি নিজেকে আর সামলে রাখতে পারে না। তার সহ্যের সীমা যায় ছাড়িয়ে। সে দাঁত-মুখ খেঁচিয়ে ধমকে উঠে-ঐ বেজন্মা! রাজাকারের ফাঁসি চাস, তুই কার বংশ জানোস? তোর শরীরে কিসের রক্ত তুই জানোস? যখন অনেক অনেক মুক্তিযোদ্ধা স্বার্থে পইরা নব্য রাজাকার হইয়া যাইতেছে তখন তুই রাজাকারের বংশে জন্মাইয়া…..।
আর একবার যদি ঐ শোলোগান দ্যাস তো থাবড়া দিয়া তোর মুখ ভাইঙ্গা ফালামু। শিশুটা একটু থমকে দাঁড়াল। দাদার মুখে ক্ষাণিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর সে কন্ঠকে আরও চড়িয়ে বলতে লাগল- রাজাকারের ফাঁসি চাই। রাজাকারের ফাঁসি চাই।

সেদিন ছিল বাংলাদেশের পঞ্চাশতম বিজয় দিবস। বাংলাদেশ সাজ সাজ রবে সেজেছে ষোড়শী বউয়ের মতো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসছেন বাংলাদেশে । আপ্যায়নের ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খুবই কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। সব ধরনের নদীর মাছ, বাংলাদেশের সব সবজি, সব ফল যেন থাকে সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নিজে আদেশ দিয়েছেন। আনানো হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের পিঠা যেমন; মুগপাকন, বিবিখানা, রসে ভিজানো চিতই, চালের রুটি, হাঁসের মাংস, ছিটারুটি ইত্যাদি। যশোর থেকে প্রধানমন্ত্রী আনিয়েছেন কাঁথাষ্টিচ এর নকশীকাঁথা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন তিনি বাংলাদেশে এসে ওই দিনই টুঙ্গিপাড়া যাবেন জাতির পিতার সমাধিস্থলে। গিয়েছেন ও। গিয়েছেন রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে।

০২.

প্রেসিডেন্ট শুরুতেই বলেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নৈশভোজ করতে চান। গনভবনে সেরকমই ব্যবস্থা হয়েছে। বিশেষ করে তিনি জীবিত সব নারী মুক্তিযোদ্ধা যেন উপস্থিত থাকে সে ব্যপারে বলে দিয়েছেন। নৈশভোজে বসে প্রেসিডেন্ট খোঁজ করেছেন সজনা ডাটা দিয়ে ডাল। ছিল সেটাও। নৈশভোজ শেষে প্রেসিডেন্ট বক্তৃতা করবেন। সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা ভীষণ খুশি, তাঁরা সম্মানিত। গণভবনে সেদিন হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা বসে আছেন। আছেন বেশ কয়েকজন নারী মুক্তিযোদ্ধা। গণভবনে আসার জন্য সব মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া হয়েছে নতুন কাপড় কেনার টাকা। সবার নতুন কাপড় নিশ্চিত করেই প্রবেশ করানো হয়েছে গণভবনে।

০৩.

শুরু হয়ে গেছে প্রেসিডেন্টের বক্তৃতা। প্রথমেই ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মার প্রতি সম্মান দেখান, সাড়ে চার লাখ নারী মুক্তিযোদ্ধার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান। এবার তিনি বাংলা বলতে শুরু করেছেন। সবার চোখে বিষ্ময়।
প্রেসিডেন্ট বলছেন; আজ আমি আপনাদেরকে দুজন মানুষের কথা বলবো। তাঁদের একজন ফরাসি আর একজন বাঙালি।
আমার বাবার নাম জ্যাঁ কুয়ে। ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর ফরাসির ওর্লি বিমানবন্দর থেকে পাকিস্তানের পি আই-এর ৭২০ বি বিমানটি ছিনতাই হয়। ছিনতাইকারী যাত্রী বেশে বিমানে উঠে কিছুক্ষণের মধ্যেই ককপিটে ঢুকে কোপাইল্ট আর পাইলটের মাথায় আগ্নেয়াস্ত্র ধরে জানান বিমানটি ছিনতাই হয়েছে। ছিনতাইকারীর দাবী কোনো টাকাপয়সা ছিলো না। ছিলো ভারতের শরণার্থী শিবিরে আটকে পড়া ঔষধ ও পথ্য। ওদিন বিমানবন্দরে আসার কথা ছিলো জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি রাষ্ট্রপতির। ওই ফাঁকেই কুয়ে ঢুকে যান।

সেদিন জ্যাঁ কুয়ে কোনো টাকাপয়সা দাবী করেননি। দাবী করেছিলেন ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে আটকে পড়া বাংলাদেশীদের জন্য ঔষধ আর পথ্য। কুয়ে বুকে হাত দিয়ে দেখাচ্ছিলেন তার বুকে বোম বাঁধা আছে, দাবী না মানলে বিমান উড়িয়ে দেবেন। অতপর দুজন রেডক্রস কর্মী আসে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। প্রকৃত পক্ষে তারা ছিলো পুলিশ। ধরা পড়ার পর দেখা যায় যেটাকে তিনি বোমা বলেছিলেন সেটা আসলে বাইবেল আর একটা অভিধান। যদিও উপস্থিত সবাই বলেছিলেন যে, কুয়ে কারো ক্ষতি করেননি। তিনি যা করেছেন মানবতার জন্য করেছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি, পাঁচ বছর জেল হয় জ্যাঁ কুয়ের। এখানেই সব শেষ নয়। বাংলাদেশের জন্য তিনি ছুটে যান অষ্ট্রেলিয়া, ওয়েষ্ট ইন্ডিজ, ভারতসহ অনেক জায়গায়। কুয়ের এই অভিযানের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ফরাসি রেডক্রস আর মাল্টার কিংস হসপিটাল ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে ২০ টন ঔষধ পথ্য পাঠিয়েছিলো। কিন্তু আফসোস, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে কুয়েকে কোথাও এতটুকু স্মরণ করেনি। বাংলাদেশের নাগরিকরা কুয়ের অবদানের কথা জানেন না।

০৪.

প্রেসিডেন্ট একটু বিরতি নেন, কফি খান। অত:পর আবার বলতে শুরু করেন;

আমি আরেকজন বাঙালি নারীর কথা বলতে চাই, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। যাকে পাকিস্তানী ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিলো পনেরো দিন। প্রতিদিন অন্তত পাঁচজন পাকিস্তানি সৈনিক তাকে ধর্ষণ করত পালাক্রমে। খাবার বলতে বাসি পাউরুটি, কলা আর পানি এসবই দেয়া হতো। অবশেষে তিনি পালিয়ে বেঁচে ছিলেন পাহারায় থাকা ঘুমন্ত দুইজন পাকিস্তানি সৈন্যকে আঘাত করে। নয়মাস তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন বিভিন্নভাবে। কখনো ক্যাম্পে গিয়ে নিজে ধরা দিয়েছেন, আবার কখনো গেরিলাদের খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে পরিবার তাকে আশ্রয় দিতে চাইলো না। পরিবারের আত্মসম্মানে বাঁধলো। মেয়েটি হলো বাস্তুহারা। সে ভাসমান পদ্মর মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল এখানে-সেখানে। যে দেশের জন্য তাঁর সব গেল সেই দেশেই যেন তার একবিন্দু ঠাঁই হলো না।

নসীমন ছিলেন শ্যামা মেয়ে তার চোখদুটো ছিলো পদ্মদিঘির মতো টলটলে। মাথায় ঘন কালো চুল। আর হাসি ছিল ভুবন ভোলানো। কুয়ে তখন কাজ করছিলেন যশোর সীমান্তে যুদ্ধের অবস্থা নিয়ে। কুয়ে প্রেমে পড়ে যান নসীমনের। বিয়ে করে নিয়ে যান আমেরিকাতে। আর আমি কুয়ে ও নসীমনের একমাত্র পুত্র সন্তান।

বাবা মারা যান আমার বারো বছর বয়সে। মা ছোট বেলা থেকেই আমাকে বাংলা শিখিয়েছেন। বাংলা কবিতা পড়ে শোনাতেন। মা আমাকে লালনগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি শোনাতেন। মায়ের খুব প্রিয় কবি ছিলেন জীবনানন্দ দাস আর নজরুল। প্রায় প্রতিদিনই মা রবীন্দ্রসংগীত শুনতেন। খুব প্রিয় গান ছিল- ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা। তাই তোমার আনন্দ আমার কাছে, তুমি তাই এসেছ নীচে..। মা আমেরিকার গিয়ে আইন পড়েছিলেন। আমেরিকায় মা মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। কাজ করেছেন অসহায় প্রবাসী-নারী- শিশুদের জন্য।

শেষ বয়সে মা ডিমেনশিয়া আক্রান্ত হয়ে স্মৃতি হারিয়ে ফেলেন। স্মৃতি হারিয়ে ফেলেন কিন্তু জয় বাংলা আর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত শুনলে চুপ হয়ে থাকতেন। তখন মায়ের চোখ থেকে টুপটাপ জল ঝরে পড়তো।

অপার বিষ্ময়ে সবাই শুনছে প্রেসিডেন্টের ভাষণ। এবার কুয়ে ঘোষণা দেন তিনি বাংলাদেশে একটা প্রকল্প করবেন যেখানে গরুর খামার হবে, আম বাগান হবে, সবজি বাগান হবে আর হবে নারী ও অসহায় মুক্তযোদ্ধাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সশ্রদ্ধ চিত্তে কুয়েকে স্মরণ করেন। আর সবাইকে অনুরোধ করেন জ্যাঁ কুয়ের-এর উদ্দেশ্যে স্যালুট দিতে। এবং তিনি বিনম্র চিত্তে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানান তিনি কুয়েকে সর্বোচ্চ সম্মানিত করার ব্যবস্থা করবেন।

পরিশেষে, প্রেসিডেন্ট জানান তিনি সবার সাথে জাতীয় সংগীত গাইতে চান। তিনি জানতে চান; যশোর অঞ্চলের কোনো নারী মুক্তিযোদ্ধা আছেন কিনা। সত্তুর বছর বয়স্ক নমিতা দাসকে খুঁজে পাওয়া যায়। প্রেসিডেন্ট নিজে এসে হাত ধরে মাইকের সামনে নিয়ে যান নমিতা দাসকে। নমিতা দাস আর প্রেসিডেন্টের যৌথ কণ্ঠে শুরু হয় “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।” অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল। টিভি স্ক্রিনের সামনে থাকা সমস্ত বাঙালির কণ্ঠে তখন,“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”

দ্রষ্টব্যঃ ফরাসি নাগরিক জ্যাঁ কুয়ের ত্যাগের শ্রদ্ধায় নিবেদিত।

অখিলেশ বাবু নব্বই ছুঁয়েছেন দিন পনেরো আগে, সেই জন্মতিথির ক্ষীরে পরিমিত মিষ্টি ছড়িয়ে ঠিক পনেরো দিন পরে এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল হেমন্ত দিনের পড়ন্ত বিকেলে অনেকটা নিঃশব্দ বৃষ্টির মতো তার স্ত্রী প্রভাতি রানী দেহত্যাগ করেন। এই সংবাদটি দত্তপাড়ার দ্বিতীয় গলিতে বসবাসকারী অনেকের কাছেই পৌঁছায় ‘এটা কি বোলচো দাদা’ হতবাক স্বরে জানতে চায়। সুস্থ মানুষের হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ সদা বিনা মেঘ বজ্রপাত মতোই কাছেপিঠের সবার কাছে পৌঁছায়।
মৃত্যু যে-কারও যেকোনো সময়ই হতে পারে, তবুও সত্তর ডিঙিয়ে একাত্তরে চলমান প্রভাতি রানী ছিলেন শক্তপোক্ত এক রমনী। যার সারাটা দিন কেটে যেত শ্মশানে এক পা রাখা স্বামীর সারাদিনকার পথ্যের জোগাড়যন্তর করে। তার মায়া কাটানোর খবরটি প্রথমে দোতলার ঘর পেরিয়ে, টানা বারান্দা পেরিয়ে, লোহার রেলিংয়ের ফাঁক গলে উঠোনে এসে পৌঁছায়, বিশ বছরের পুরোনো গৃহপরিচারিকার চিৎকারে।

সেই উঠানের সোনা রঙা রোদ্দুরে তখন এক ঝাঁক চড়ুই, ফিঙে, দোয়েল, টুনটুনি ওড়াউড়ি করছিল, ওরাই পরে খবরটা ডানার পালকে গেঁথে বাড়ির ফটকের বাহিরে নিয়ে যায় ভর সন্ধ্যায়। দত্তপাড়ার সেদিনের সন্ধ্যায় আশপাশের অনেকগুলো বাড়িতে সন্ধ্যা প্রদীপের আলো উঠানে গড়িয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায় না। শোকের সাথে স্বান্তনার বাণী আওড়াতে আশপাশের লোকজন এসে ভীড় করে অখিলেশ বাবুর ঠাকুরদার আমলের তৈরি বাড়ির উঠানে। নিকট আত্মীয়রা বাড়ির ভেতরে শ্মশানের যাত্রীর পাশে কান্নাকাটি করার সুযোগ পায়।

বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে হুগলি, থাকে নিউ টাউনে। সে চলে আসে স্বামী, সন্তানসহ। বড় ছেলে, ছেলের বৌয়ের কাছে খবরটা পৌঁছায় বিকেলের অনেকটা পরে পুনে শহরে। ছোট ছেলে অর্ণব, সে-তো টানা বারান্দা পেরিয়ে শেষ দিকের ঘরে থাকে। ওদিকে ছোট কন্যা দার্জিলিংয়ের পাহাড় থেকে নেমে সেদিন কলকাতা পৌঁছতে অনেক রাত করে ফেলে। বড় ছেলে পৌঁছায় রাত পেরিয়ে ভোরবেলায়। এরপরে সৎকার হয়, তারপরে শোক কাটিয়ে নেয়ার জন্য কেউ কেউ ঘুমোতে যায়। কেউ জেগে থাকে পুরোনো স্মৃতিচারনের মশগুল হয়ে। সে যাইহোক, বিরাট বাড়িটা শোকে দুঃখে বেশ জমজমাট হয়ে উঠে।

শীত পড়ছে পড়ছে সময়। এইভাবে তিনদিন কাটতে না কাটতেই গৃহপরিচারিকারা প্রভাতি রানির রেখে যাওয়া সাজানো রান্নাঘর থেকে চা, কফির সঙ্গে গরম গরম ফুলকপির পাকোড়া কাজের লোকরা বানিয়ে দেয়। ফাঁকে ফাঁকে বড় মেয়ে, ছেলের বউ, ছোট মেয়েসহ আরও কয়েকজন সদ্য স্ত্রী হারানো মানুষটার কাছে জানতে চায় তাদের মায়ের রেখে যাওয়া গয়না, ইন্সুইরেন্সের টাকাগুলোর হালহকিকত। এরপরে আরও দুটো দিন কাটে নানাবিধ কথোপকথনে। ছেলেমেয়েদের তাড়ায় তাড়িত হয়ে অখিলেশবাবু এক রাতে বিলিবন্টনের জন্য নিজের ঘরে সন্তানদের গোল আর ঘন হয়ে বসতে বলেন। সাথে শ্রাদ্ধে বিষয়টিও তোলেন, সেটা ছিল অবশ্য গৌণকর্ম।
“শ্রাদ্ধে কার্ড ছাপতে দিয়েছিস? অর্ণব, সেটা করতে হবে তো।” এই দিয়ে বড় ছেলে শুরু করে আলোচনা। পাশ থেকে বড়ো বৌমা ‘কার্ড কি ছাপাতে হবে? আজকাল তো সবাই হোয়াটস্অ্যাপে নেমন্তন্ন করছে। কার্ড ফার্ড তো উঠেই গেছে বলা যায়’ বলে অপেক্ষা করে অন্যদের মতামত জানার জন্য। তখন হিসেবি বড়ো মেয়ে অখিলেশ বাবুর সামনে গয়নার বিষয়টি তোলে। শোকে ভেঙে পড়া মানুষটি সন্তানের কথায় শোয়া থেকে উঠে বসতে বেশ খানিকটা সময় নেয়। তার মনে পড়ে স্ত্রী রেখে যাওয়া গোপন কথাগুলো, সাথে সম্পত্তির হিসেবনিকেশ যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তার পৌঁছে দেয়ার সময় এসেছে। তাছাড়া ইন্সুইরেন্সের টাকাগুলোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তারও এখন ভরসা নেই। তাই তো তিনি বড়ো মেয়ে ও বৌমাকে ঘরের আলমারির চাবিটা তুলে দেন অর্থ সম্পদের ভাগবাটোয়ারা করার জন্য। আর ছোট ছেলে অর্ণবকে দেন দুটো চাবি, একটি চিলেকোঠার ঘরের অন্যটা সে ঘরের আলমারির। প্রভাতি রানী তাকে বলেছিলেন, দুনিয়ায় মায়া কাটিয়ে যদি আগে চলে যায়, তাহলে যেন অখিলেশ বাবু চাবি দুটো ছোট ছেলের হাতে তুলে দেয়।
বিলি বন্টনে ছোটো মেয়ে খুশী হলেও বড় মেয়ে ও ছেলের বৌয়ের গালের ভারে পুরোনো বাড়িটাও হেলে পড়ে। এরপরে ধীরে ধীরে বাড়ি ফাঁকা হয়, সবাই ব্যস্ততায় মিশে যায়। সেই ব্যস্ততার মাঝে ছত্রিশ বছর পেরোনো অর্ণব একরাতে চিলেকোঠার দুয়ারে এসে দাঁড়ায়।

ছোটবেলা থেকেই এই ঘরটা অর্ণবকে টানত, একটা সময় মায়ের পিছুপিছু আসত, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার সময়ে যখন ওর মা সারা বাড়ির কাজ শেষে একটুখানি নিজের মতো সময় কাটাতে এখানে আসত,ওটা যে মায়ের একান্ত একটা সময় ছিল, তবে সে বিষয় ওকে কেউ বলেনি কখনও, তবে ও মায়ের আচরনে বুঝে নিয়েছিল। তবে সবসময় আসত না, হঠাৎ হঠাৎ। কখনও যদি ওর মামনিকে বাড়ির কেউ খুঁজে না পেত কোথাও, তখন অর্ণব এসে এই ঘরটায় কড়া নাড়াত, জানত এখানেই মামনি আছে। বাকি তিন ভাইবোনের সাথে ওর বয়সে ফারাকটা একটু বেশি। ও যে মায়ের পেট পোছা সন্তান। আর ভীষণ আদরের। মায়ের সাথে সখ্য ছিল একটু বেশি। সবাই বলত, মায়ের ছেলে। মাকে হারিয়ে কিছুটা একঘরে হয়ে পড়ে অর্ণব। কিছুদিনের জন্য সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে গৃহবন্দী করে ফেলে নিজেকে। ওদিকে বৌদি ও বড়দির গয়না নিয়ে কুকুরের মতো কামড়াকামড়ি দেখে লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে ওর। বিশেষ করে বড়দিকে দেখে, সাথে মাকে নিয়ে বৌদির নানারকম কটুবাক্য চোখে জ্বালা ধরিয়ে দেয়।

গৃহবন্দী জীবনে কিছুটা শান্তির আশায় আজ প্রায় একমাস পরে ও মায়ের ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ায়। গানবাজনা করা প্রভাতি রানীর এই ছেলেটা খুব আবেগপ্রবণ, চাবি দিয়ে তালায় মোচড় দেয়ার সময় ওর বুকটা একটু কেঁপে ওঠে একদিনের কথাটা মনে করে।
অনেকদিন আগে, বারান্দায় বসে আচারে তেল মাথাতে মাথাতে ওর মা বলেছিল, ‘আমি যখন থাকব না অনু তখন তুই আমার ঘরটা দেখে রাখিস, ওখানে আমার গোছানো একটুকরো বাংলাদেশ আছে, আমার অন্ত:শীলের পালা আছে, সময় পেলে জেনে নিস তোর মাকে, অন্য এক প্রভাতি রানীকে। মায়ের শুদ্ধ অশুদ্ধ সবটুকুই রেখে গেলাম’সেদিন মায়ের কথাটি যে অন্যসব কথার থেকে একদম আলাদা ছিল, সেটা বুঝতে পেরেছিল মায়ের গলার কাঁপা কারুকাজে, কথাটা বুকে ভেতরে তীক্ষ্ণ তীরের মতো ঢুকে পড়েছিল, সে কথা আর কাউকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি অর্ণব। কথাগুলো ওর কাছেই সযত্নে থেকে গেছে।
মা বাংলাদেশের মেয়ে, এতটা সময় এই দেশে থেকেও মা নিজেকে ভারতীয় বাঙালি হয়ে উঠতে পারেনি। মায়ের কথাবার্তা ও উচ্চারণ বরাবরই বাংলাদেশের প্রভাব ছিল, মাঝেমধ্যে বাবাকে খুশী করার জন্য জোর করে বাবার মতো উচ্চারণ করতে মা।
দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার মুখে চট করে একটা ইঁদুর দ্রুত দৌড়ে লুকিয়ে পড়ে আলমারিটার পিছনে। অর্ণব বোঝো অনেকটা দিন এই ঘরের ঝাড়পোঁছ হয়নি, কেমন যেন একটা বিদঘুটে গন্ধ চারপাশে। সাথে ইঁদূরে রাজত্ব কায়েম হয়েছে।

ঘরটায় ছোট একটা চৌকি, দুটো চেয়ার, একটি টেবিল ও একটি আলমারি দিয়ে পরিপূর্ণ। অর্ণব এসে ঘরের ছোটো চৌকির চাদরবিহীন তোশকের ওপরে বসে। চৌকির পাশের জানালাটা বন্ধ ছিল, খুলে দিতেই হুড়মুড় করে কিছু বাতাস এসে অর্ণবকে সান্ত্বনা দেয়। পুরোনো কাঠের টেবিলে হলদে রঙের কাপড় বিছানো যাতে গোলাপি, আকাশী-নীল ফুল ফুটে আছে পরিপাটি হয়ে আর নীচে ঝুলে আছে কুরুশ-কাঁটায় বোনা লেস। দাদার আমলের পরিত্যক্ত আলমারিটা মা নিজের হাতে রং করে নতুন করে তুলেছিল। ঘরে চোখ বুলিয়ে অর্ণব দেখে পুরো ঘরে মায়ের এখনও মায়ের গন্ধ লেগে আছে।

অর্ণব ধীরে ধীরে আলমারি কাছে যায়, চাবি দিয়ে দু-বার ঘোরাতেই আলমারিটা খুলে যায়। পুরোনো কাঠের আলমারিটা বয়সের ভারে কিছুটা নাজুক, পাল্লা খোলার সময় কষকষে শব্দ করে ওঠে। চারটা তাকে থরে থরে জিনিসপত্র সাজানো গোছানো। নিচের দিকটাতে সিন্ধুক, আরও একটি পাল্লা সদৃশ দরজাসহ আটকানো। প্রথমে অর্ণবের চোখ চলে যায় বাংলাদেশের পতাকায় যা আলমারির দরজার সাথে চারটি পেরেক দিয়ে গেঁথে রাখা। এটা ওটা ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে অর্ণব পেয়ে যায় লাল কাপড়ে মোড়ানো একটি বই। কাপড় সরিয়ে বইটা বের করার পরে বোঝে ওটা একটি ডায়েরি। আনন্দে অর্ণবের চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। ছোটবেলায় মায়ের সাথে এখানে এলে দেখত, মা চোখের জল লুকিয়ে কিছু লিখছে, জানার আগ্রহ হতো খুব, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেত না, যদি আর কখনও এইঘরে আসতে না দেয় মা, সেই ভয়ে। ছোটবেলার মতো আজও কাঁপা কাঁপা হাতে অর্ণব ডায়েরির শক্ত মলাট উলটে দেখে, সেখানে পারিবারিক একটি ছবি।
তারপরে তিনটি পাতা কলমের আঁচড়বিহীন। চতুর্থ পাতায় ছয় লাইন কিছু অক্ষরের সমাবেশ। উল্লেখিত সময়টা ১৬/০৮/১৯৭৫, কখনও এমন দুঃসংবাদ ভেসে আসবে তা কখনও কল্পপনাতেও ভাবিনি গো, কাজের তাড়ায় মাঝে সকালে রেডিয়োটা খুলে বসেছিলুম মাত্র তখনই অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো আকাশবাণীতে বলল, ‘'যীশু মারা গেছেন’ প্রথমে বুঝতে পারি নাই পরে ক্ষনিকের থমকে দাঁড়ানো, একটু পরে বুঝলুম হাত দুটো কাঁপছে, হাতে থাকা আধা খোসা ছাড়ানো পেঁপের খন্ডটুকু কখন হাত গড়িয়ে পড়েছে টের পাইনি, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মর্মান্তিক সংবাদটি আকাশবাণীর ওরা পাঠ করেছিল এভাবে- ‘এখন কোটি কোটি মানুষ ক্রুশ পরিধান করে যীশুকে স্মরণ করে। সম্ভবত, একদিন মুজিবকেও এমনিভাবে স্মরণ করা হবে।’আহা মুজিব, এই মানুষটাইতো হায়নাদের ক্যাম্পে বন্দি মেয়েগুলোকে মা বলে ডেকেছিলেন, বীরাঙ্গনা নাম দিয়েছিলেন, যখন মেয়েগুলোর পরিবার মেয়েগুলোকে ছুঁড়ে ফেলেছিল, তখন তো বঙ্গবন্ধু ওদের ‘মা’ বলে মাথার উপরে ছায়া দিয়েছিল। আজ এই মানুষটাকে মেরে ফেলল ওরা। বড্ড অকৃতজ্ঞ আমরা? আমি? আমি কি এখনও বাংলাদেশের? হয়তো আমিও তাই, মাঝেমধ্যে মনটা অস্থির হয়ে ওঠে, যেতে ইচ্ছে করে নিজের দেশে, ইশ্ আজ যদি যেতে পারতুম।

কীভাবে যাই, আমি যে শিকড় ছিঁড়ে এসেছিলুম, আমার গর্ভে নতুন দেশের নতুন শিকড় বেড়ে ওঠছে। ভালো লাগে না কিছুই আজকাল। লেখা ওখানেই শেষ হয়। অর্ণব ওর মায়ের লেখার উপরে আঙুল বুলায়, হালকা হয়ে আসা অক্ষরগুলো মিটমিট করে যেন হাসে, ডায়েরির পরবর্তী পাতাটা যখন ওলটায়, তখন নীচের ঘর থেকে ‘অনু’ ‘অনু’ বলে চিৎকার ভেসে আসে। অর্ণব তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা লাল কাপড়ে মুড়িয়ে নিচে নেমে আসে। এসেই দেখে বড়দি হরেকরকমের রান্না করা খাবার নিয়ে এসেছে। অর্ণব বুঝতে পারে, মায়ের অভাব পূরণের চেষ্টা করছে বড়দি, আদরে পুরোপুরি সায় দিতে ব্যর্থ অর্ণবের মন পড়ে থাকে ডায়েরির পরের পাতায়। অস্থির হয়, ওর ভেতরের এই উসখুস ভাব দেখে বড়দি হালকা রসিকতা করে,

‘কি রে নতুন কেউ জুটেছে নাকি?’

অর্ণব কথাটা হেসে উড়িয়ে দিয়ে দিদির সাথে গল্পে মেতে ওঠে কিন্তু মনটা আটকে থাকে ডায়েরির হলদে পাতায়। দিদিকে বিদায় দিয়ে রাতে নিজের ঘরে ডায়েরিটা নিয়ে বসে অর্ণব। যেন আজ রাতেই ডায়েরিটা পাঠ শেষ করতে হবে। ইচ্ছেটা যে ওর তেমনই , কৌতূহলী মনটাকে শান্ত করতে পারে না কিছুতেই। বিছানায় আধাশোয়া হয়ে ডায়েরিটা খোলে অর্ণব, ওই লেখাটুকুর পরে একটি পাতা অপচয় করেন প্রভাতি রানী। তারপরের পাতায় শুধু তারিখ ও মাস দেয়া, সাল অবর্তমান।

১৩/১০

আজ বড্ড মালতীর কথা মনে পড়ছে, ও আমার সই। আমার থেকে বছর দেড় বড় ছিল, তারপরও আমরা সই ছিলুম… এখন জানি না কোথায় আছে? বেঁচে কি আছে! নাকি যে রাতেই! মালতিদের টিনে চলায় যে রাতে আগুন দেয় হয়, সে রাতেই আমরা বাক্স-পোটলা, সোনা গয়না শরীরের এদিক সেদিকে লুকিয়ে মামা বাড়িতে পালিয়ে আসি, এরপরে আর কিছুই জানা হয়নি, পরে ভাসা ভাসা শুনেছিলাম, মালতীকে সে রাতে কুদ্দস কাকা ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল। তবে সেটা কতটুকু সত্যি জানা হয়নি, আর জেনে কি হবে, সবারই তখন দুঃসময় চলছিল, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের। ১৯৭১ সালটা বাঙালিদের হিন্দু ও মুসলমানে বিভক্ত করে দেয়, আর উর্দু জানা অবাঙালিগুলোকে জানোয়ার। ওর সময়টায় সাবালিকা মেয়েদের নিয়ে বাবা মায়েরা পড়েছিল ভয়ংকর বিপদে, একরাতে মিলিটারী আসার সংবাদ শুনে আমি বড়দি প্রায় সারারাত পুকুরের জলে নাক উঁচিয়ে ভেসেছিলুম। সে এক ভয়ংকর রাত গো। ভাবতেই রক্ত আবারও হিম হয়ে আসে এখনও। মামার বাড়িটা আমাদের বাড়ি থেকে আরো দক্ষিণে দয়ারামপুরে। একটি খালের কারণে বিচ্ছেদ ঘটেছিল মূল জনপদ থেকে।
সে কারণে মামার বাড়ির গ্রামটা কিছুটা নিরাপদ ছিল সে সময়টায়, খালের উপরে দুটো বাঁশের চিকন সাঁকো হওয়ায়, কিছুটা চিন্তামুক্ত ছিলাম আমরা। প্রায় বিশ পঁচিশ দিন আমাদের বেশ স্বাচ্ছন্দ্য কেটেছিল মামা বাড়িতে, ওখানে গিয়ে বাবা রাশি কুন্ডির নিকুচি করে বেশ তাড়াহুড়ো করে বড়দির বিয়ে দেয় অতুল দাদার সাথে। আহ্ াঅতুলদা, কি সুন্দর দেখতে ছিল সেসময়। গৌড়বর্ন, খাড়া নাক, বড় চোখ, স্বাক্ষাৎ শিব ঠাকুর। বড়দি খুব খুশী ছিল ওর বিয়েতে, কিন্তু সে খুশী বড়দির বেশি দিন স্থির হয়নি, বিয়ের পনেরো দিনের মাথায় অতুল দাদা রাতের অন্ধকারে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে যায় যুদ্ধে।

অতুল দাদার সাথে প্রতুল ও চলে যায়। যুদ্ধে…
প্রতুল, দিদির দেবর। আর আমার! আমার সাথে তো প্রতুলের কোনো অঙ্গীকার হয়নি কখনও, তবুও সেদিন অতুল ও প্রতুল দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধে চলে যাওয়ায় পরে আমার কেন শুধু প্রতুলের জন্য কষ্ট হয়েছিল, কেন? নাকি ওর তীক্ষ্ণ চাহনি, নিরবতা আমার ভেতরে প্রতিশ্রুতির জালে বুনেছিল।
আজও মাঝে মাঝে মনে পড়ে প্রতুলের আদর মাখা ‘প্রভা’ ডাকখানি। আমায় প্রভা ডাকত প্রতুল।
ডায়েরির সেই পাতার শেষ শব্দটা ছিল ‘প্রতুল’। পড়া শেষ অর্ণব একটু হাসে। সেই অশনি সময় মায়ের প্রতুলের প্রভালো লাগা তৈরি হয়েছিল। এখন কেমন আছে ওরা? শুনেছিল ওর মায়ের বাড়ির সবাই বাংলাদেশে থাকেন। তাও আপন কেউ না। তাহলে মাসী কি বেঁচে আছেন? অতুল, প্রতুল দুই ভাই কি যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরেছিল? অর্নবের জানার আগ্রহের থার্মোমিটারে সঞ্চিত পারদের শেষ সীমায় পৌঁছে স্থির হয়ে অপেক্ষা করে। কীভাবে জানা যায়! বাবাকে কি জিজ্ঞেস করবে একবার? নানা ভাবনা ওর মন জুড়ে ছোটাছুটি করে।
অর্ণব পাতা উলটোয়…
একটি পাতা পরে নতুন আরও একটি তারিখ ডায়েরির পৃষ্ঠায় ডান কোনে, ১৪/০৪/১৯৭৭ আজ সেই কালরাত্রি, ১৯৭১ সালের বৈশাখের প্রথম দিনটা যে আমার জীবনের কালো অধ্যায় হয়ে রইবে, সেটা কেন জানত! শুধু আমার নয়, আমার পুরো পরিবারের, আমাদের গোটা গ্রামের কালরাত্রি ছিল। বছর বদলেছে, সময় বদলেছে, কিন্তু সেই স্মৃতি কি মুছে ফেলা হয়েছে?
মাস পরথম দিনে হওয়াতে মা একটু নিরামিষ রেঁধেছিল। সাথে পায়েস। এই অসময়ে এর থেকে ভালো আর কি হবে, অতুল দাদা ও প্রতুল চলে গেছে আটদিন গত হয়েছিল। এরই মাঝে রাত বিরাতে কাছেপিঠে টুকটাক আওয়াজ ভেসে আসত।
এক বিকেলে হঠাৎ সংবাদ আসে আজ রাতে এই গ্রামে হানা দিতে পারে মিলিটারির দল। খবরটা নিয়ে এসেছিল আমাদের অংকের মাস্টার মশাই, তিনি আমাদের সবার শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। তাই তো বাবা মন স্থির করে ফেলেন সে রাতেই দেশ ত্যাগে করবেন। সে কথা শুনে মায়ের ছোটাছুটি শুরু হয়। সঞ্চিত সঞ্চয় বলতে মায়ের ঠাকুমার সোনার গয়নাগুলো।
বাড়িঘর কেটেছেটে নেয়ার উপায় নেই তাই এককাপড়ে বাড়ি থেকে বের হই বাবা, আমি, দিদি, মা, মামার পরিবারের সবাই, দিদির শ্বশুর কুলের কয়েকজন। সাথে মাস্টার মাশাইয়ের মেয়ে লীলা। জনা বিশে মানুষ হবে। এতো মানুষ একসাথে যাওয়া ঠিক হবে কিনা সেটা ভাবার সময় পায় না কেউ। সবাই জান বাঁচাতে চায়। আমরা নৌকায় খাল পেরিয়ে মাটির রাস্তা ধরে এগিয়ে ছিলাম। তারপরে শালবন, পাটক্ষেত, বিল, মাঝেমধ্যে মা একটু থেমে যাচ্ছিল, আবার শুরু করছিল হাঁটা। মায়ের পেটিকোটের নিচে আলগা কাপড়ে সেলাই করা কিছু গয়না ছিল, বাকিগুলো মামার বাড়িতে মাটির নিচে পুঁতে রেখে ছিল।
বৈশাখের প্রথম দিনের শুক্লপক্ষ। সারারাত ধরেই চাঁদের আলো। চাঁদের আলোয় সতর্কভাবে পা ফেলছিলাম আমরা, ভূমি বিপদ মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, কখন কি হয়। আতংক গ্রাস করছিল আমায়, মাঝেমধ্যে ফিসফিস কথা বলছিলাম দিদির সাথে। শুধু বাবা নির্বাক ছিল। আমার সেই নির্বাক বাবা হঠাৎ চিৎকার করে বলে ওঠে, প্রভাতি পালা…
আমরা তখন দয়ারামপুরের বড় রাস্তায়। লোকমুখে খবর এসেছিল এই রাস্তাটা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। তাই অনেকটা নিশ্চিতে আমরা যাত্রা করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ অর্তকিত হামলায় আমরা দিকশূন্য হয়ে এদিক সেদিক পালিয়ে বাঁচতে দলছাড়া হয়ে যাই। শুরু হয় আমার কালরাত্রি ও দুঃসহ দিনের মহাকাল। হায়নাগুলো কীভাবে আমাকে ওদের ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল,আমার কিছু মনে নেই। আমার স্মৃতিভান্ডার ওই সময়টায় একেবারে শূন্য। শুধু মনে আছে, সরু নলের গরম পানির ঢালছিল কেউ আমার মুখের ওপরে, দুর্গন্ধ। আমি লাফিয়ে উঠি। উঠে যা চোখে পড়ে সেটুকু লেখার রুচি ও ইচ্ছে আমার হয় না। চোখে সামনে মাঝবয়সী জল্লাদ চেহারার পুরুষ। কি বলছিল উর্দুতে মনে নেই। কানদুটোতে ভনভন শব্দ।
গায়ে শাড়ি লোপাট, পেটিকোটটা কোনোমতে আছে, ব্লাউজটি হরির মায়ের ব্লাউজের মতো শতছিন্ন। চিৎকার করতে গিয়েও চিৎকার করতে পারি না। গলায় নখর হাতের থাবা। একজনের থাবার আচঁড় থেকে মুক্ত হতেই আরেকজনের অত্যাচার শুরু হয়। তারপরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
দুদিন পরে আমার জ্ঞান ফেরে, আমাকে সে কথা বলেছিল মাধবী। মাধবীর বাবাকে মেরে ফেলেছিল,ওরই সামনে। সাথে ছোট ভাইটাকেও। ওর মাকে চেয়ারম্যান টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যায় পাশের ঘরে,আর ওকে উর্দিওয়ালারা ক্যাম্পে নিয়ে আসে, তখন মাধবীর বয়স সতেরো-আাঠারোর মাঝামাঝি, আমরা সমবয়সী প্রায়। ক্যাম্পে আমাদের বয়সী প্রায় আরও দুজন মেয়ে ছিল, বাকিরা মাঝবয়সী, একটি মেয়ে ছিল তেরো বছরের। সেই মেয়েটাকে ওর বেশি অত্যাচার করত। আলাদা ঘরে রাখত, ওদের ক্যাপ্টেন শুধু সে ঘরে যেত। বাকিরা সুযোগ পেলে সদব্যবহার করত।
মাঝবয়েসী কয়জনকে দিয়ে ওরা ক্যাম্পের কাজগুলো করাত। হায়নাগুলোর আমাদের বয়সী কয়জনকে দিয়ে চলত মনোরঞ্জনের চাহিদা পূরণ। আমরা হয়ে যাই পশুগুলো জন্য ঝুলিয়ে রাখা কাঁচা মাংস। একরাতে আমার স্তনে সিগারেটের শেঁক দিয়েছিল, তীব্র কষ্ট চেঁচিয়ে ছিলাম, আমি যত চিৎকার করেছিলাম লোকটা আমাকে ততটাই শক্তি প্রয়োগ করেছিল, ১০ দিন একবার গায়ে পানি ঢালার সুযোগ পেতাম, সারা গায়ে দুর্গন্ধ, নিজের গায়ের গন্ধে নিজেরই বমি আসত। প্রতিমুহূর্তে মনে হত মরণ আসে না কেন, কেন এখনও বেঁচে আছি। এইভাবে বেঁচে থেকে কী হবে আমার। তারপরে আমি বেঁচে ছিলুম।
ডায়েরি পাতায় মগ্ন অর্ণব মায়ের বিভীষিকাময় অতীতের বর্ননা পড়তে পড়তে চিৎকার করে ওঠে। মাঝরাতে নিরবচ্ছিন্ন নিরবতায় সেই চিৎকার অনেকটা দূরে ছড়িয়ে পড়ে। যা পাশের ঘরের অখিলেশ বাবুকে জাগিয়ে তোলে। বৃদ্ধ লোকটা ছেলের চিৎকার ও কান্নার কারণটা বোঝে।
তারপরও জিজ্ঞেস করে…
ও অনু, কী হলো তোর, কী হয়েছে? আমার কাছে আয় বাবা, কাছে আয়। মায়ের জন্য কষ্ট হচ্ছে তোর? আয় কাছে আয়, কাছে আয় বাবা।
অর্ণব, চোখ মোছে, আবারও ডায়েরির পাতা উলটায়। ডায়েরির পাতায় চুম খায় তীব্র আবেগে। যেন মায়ের কপালে চুম আঁকছে। পরবর্তী পাতায় তারিখটা অনেকরা সময় পরের। বুঝতে পারে ওই সময়টায় মা সংসার ও সন্তান নিয়ে নানান সামাজিকতায় সময় কাটিয়েছেন।

১৬/১২/ ৮৩

আজ কোলকাতার থিয়েটার রোডে গিয়েছিলুম, কিছুক্ষণ ৮ নম্বর বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে রইলুম। কয়েক পাক হাটলুম। বারবার মনে হচ্ছিল, এই তো সেই বাড়ি, মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতার প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের কার্যালয়।
সেখানে বসে চার নেতা, সেনাপ্রধান বৈঠক করতেন। এক যুগ হয়ে গেল। এই কয়টা বছরে কত কিছু বদলে গেলে, আমি বাঙালি থেকে বাংগাল হলাম, আত্মীয় স্বজনহীন কোলকাতা শহরে নিজেকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করলুম। এই বারো বছরে বাবার আদুরে মেয়েটি দিব্যি ভালোবেসে পরবাসী দেশে বসতি গড়ে তুললাম। এই কয়বছরে আপন পর চেনা হলো।
যুদ্ধ না হলে হয়তো আমার এই দেশে আসাই হতো না, আজ বড্ড আয়েশার কথা মনে পড়ছে, মেয়েটার সাথে দেখা হয়েছিল নরকে, মেয়েটা কথা বলত না, শুধু তাকিয়ে থাকত, কিছুটা বিকারগস্ত হয়ে পড়ে শেষের দিকে। এতো অত্যাচার কীভাবে সইবে। সারাক্ষণ চারকোনা জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত, ওইটুকু ফাঁক থেকে আকাশ দেখা যেত। ছোট ওটা জানালা ছিল না, ছোট ভেন্টিলেটার, আমরা তখন ওটাকে জানালা ভাবতুম। আয়েশার বাবা ছিলেন শিক্ষক, কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই ছাত্ররাই শিক্ষককে মেরে ফেলেছিল রাতের অন্ধকারে, তার একমাত্র মেয়েকে পাকিস্তানিদের আখড়ায় নিয়ে দিয়ে আসে, আয়েশাকে দেখতে কেউ আসেনি পুনবার্সনকেন্দ্রে। আমরা একসাথে পুনবার্সনকেন্দ্রেও ছিলাম।
এক ভোরে ক্যাম্পের চারপাশে হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে। উর্দিওয়ালাগুলোর ছোটাছুটি শুরু হয়। চারপাশে গোলাগুলির আওয়াজ পাই। প্রায় দুই ঘন্টা পরে আমাদের বন্ধ দরজাটা খুলে যায়। দেখি, সামনে দাঁড়িয়ে আছে, লুঙ্গি, ছেঁড়া জামা পরা তিনজন বলিষ্ঠ যোদ্ধা। তাদের চোখে মুখে আনন্দ, আর আমাদের চোখে বিষাদ। ক্যাম্প থেকে মোট আটজনকে জীবিত উদ্ধার করে মুক্তিযোদ্ধারা। তারপরে শুরু হয় আমাদের এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে ছুটে চলা। অবশেষে ঠাঁই হয় পুনবার্সনকেন্দ্রে। আয়েশা আর আমি একসাথে পুনবার্সনকেন্দ্রে এসেছিলুম। পুনবার্সনকেন্দ্রে ছিলাম প্রায় একমাস। এই একমাসে আয়েশা কথা বলেছিল হাতের আঙুল গুনে দশবার। সারাক্ষণ কাঁদত শুধু। আর অপেক্ষা করত, যদি কেউ ওর খোঁজে আসে। আমি পুনবার্সনকেন্দ্রে সবার সাথে কথা বলতুম।
অর্ণব ডায়েরির সেই পাতা মুড়ে, সামনের পাতাটা ওলটায়, মায়ের কষ্টের আঘাতগুলো আর পড়তে মন চায় না ওর। এতটা কষ্টের জীবন বয়ে বেরিয়েছিল এতোটা দিন। কখনো কাউকে কখনো বলতে পারেনি নিজের জল ভেজা দুঃখের কথা। সামনের পাতায় আরও কয়েকটা লাইন শুধু। তারিখ সময় উল্লেখ ছিল না। একদিন বিকেলে হঠাৎ আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল মামা। কীভাবে আমার খবর পেয়েছিলেন, জিজ্ঞেস করি নাই। হয়তো আমার নাম ঠিকানাসহ পুনবার্সনকেন্দ্রে এসে খুঁজেছিলেন। সেদিন মামার চোখে ছিল জল,আমার চোখেও জল, দুজনেই ছিলাম নির্বাক। মামাই আমাকে ওখান থেকে নিয়ে আসেন। মামার সাথে ইন্ডিয়ায় চলে আসি। পরিবারের একমাত্র মামাই বেঁচেছিলেন। যুদ্ধের ডামাডোলে। বাকিদের কোনো সংবাদ এত বছরেও জানতে পারিনি। আজ মামা গত হলেন।
আমার একমাত্র কাছের মানুষটি আজ আমাকে রেখে চলে গেলেন পরিবারের অন্যদের কাছে স্বর্গে। আমি থেকে গেলুম অখিলেশের সংসারে চার সন্তানকে সম্বল করে। এখন অপেক্ষায় আছি, মুক্তির। কবে যে আমার মুক্তি মিলবে, কবে… মৃত্যু আগে মামা আমাকে বাবার শেষ চিহ্নটা হাতে তুলে দিয়েছিলেন, একটা কালো বেল্টের সাথে রূপালি বাকেলটা ঘড়ি। গ্রাম ছাড়ার রাতে ওটা মামার হাতে ছিল। তাই তো সেটা রয়ে গেছে আমার কাছে স্মৃতিচিহ্ন হয়ে। জানি, কখন আমার আর বাংলাদেশে যাওয়া হবে না। অখিলেশ চায় না আমি ওদেশে যাই। অখিলেশকে ভালোবাসি, তাই ওর কথা রাখতে যাওয়া হবে না কখনোই। তারপরও জানতে ইচ্ছে করে কেমন আছে আমার দেশ? দাদার রেখে যাওয়া বইয়ের আলমারিটা, যা ছিল আমার ছেলেবেলায় অখণ্ড অবসরে সঙ্গী। আমাদের দোতালা বাড়ির ঝুল বারান্দাটা, বাড়ির ফটকের সামনের কদম গাছটা। মায়ের পিতলের বাসনগুলো যেগুলো মা চিলেকোঠা থেকে সরিয়ে পাশ- দুয়ারের মাঝের জায়গাটায় মাটি খুঁড়ে যতœ করে গুছিয়ে রেখেছিলেন, গন্ডগোল শুরুর আগে আগে।
মায়ের শখ ছিল, মেয়েদের বিয়েতে পিতলের বাসন দিয়ে মেয়েদের সংসার সাজিয়ে দেবেন। মায়ের স্বপ্নপূরণ হয়নি।
আমার স্বপ্নও হয়তো পূরণ হবে না। আমার স্বপ্নটা সাধারণ কিন্তু অসাধ্য। আমি চাই, আমার একটি সন্তান যেন একবার আমার দেশটা ঘুরে আসে। আমি জানি, ওরা যদি যেতেও চায় ওদের বাবা যেতে দেবেন না। সে চায় না আমার অতীত কারো সামনে আসুক। এক সন্তানের জনক বিপত্নীক অখিলেশের কাছে ওটা ঘৃন্য অতীত। বিয়ের সময় শর্ত ছিল, আমি কখন বাংলাদেশে যেতে চাইব না। মামা সব মেনে নিয়ে আমায় বিয়ে দিয়েছিলেন। তখন আমাদের বয়সের তফাৎ ছিল প্রায় বিশ বছর।

অর্ণবের বাবার কাছে যা ছিল ঘৃণ্য, আমার কাছে ওটা গর্বের, দেশের পরিস্থিতি কারণে আমাদের লাঞ্চিত হতে হয়েছিল, ওটাও যে আমার যুদ্ধ ছিল সে কথা আমি কীভাবে বলবো সবাইকে। আমিও যে আমার দেশের স্বাধীনতায় আবদার রেখেছিলাম। লোকের কাছে আমার পরিচয় ‘বীরাঙ্গনা’। কিন্তু আমার কাছে আমার পরিচয় আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে আমারও তো ভূমিকা আছে।
ভোরের আলো উঁকি দিচ্ছে পর্দার ফাঁক গলিয়ে। অর্ণব ডায়েরির পাতা থেকে মুখ তুলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। মায়ের ডায়েরি শেষ পাতা পড়ে শেষ করে, ডায়েরিটা আবারও লাল কাপড়ে মুড়ে ফেলে। অর্ণবের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়েছে, মনে মনে ঠিক করে মায়ের দেশে যাবে, মায়ের সন্মান- মর্যাদা কাগজ কলমে লিখিয়ে আনতে ওকে যেতেই হবে।

তখনও রাত্রি গভীর হয় নাই। শেষ বিকেলের অসামান্য সূর্যাস্তের লাল আভাময় সন্ধ্যা পেরিয়ে হালকা কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে রাত প্রায় নিঝুম হতে চলেছে। শেয়াল কুকুরের গগন বিদারী আহাজারিতে ঝিঝি পোকার মাধুরী মেশানো সুর কানে পৌঁছানো কঠিন। স্বজনহারা মানুষের বুকফাটা মর্মস্পর্শী কান্নার আবরণে ঢাকা তেলচিটে আকাশটায় শত সহস্র কোটি তারার মেলা, তবুও বিদঘুটে অন্ধকারাচ্ছন্ন অসহনীয় ব্যথাতুর নির্ঘুম এক ভয়ংকর রাত। দাদীমা তার সুশীতল হস্তখানা মাথায় সঞ্চালন করে আমাকে ঘুম পারানোর চেষ্টায় মগ্ন। স্তব্ধ নিঝুম আঁধারে বাইরে থেকে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। স্তিমিত স্বরে কে যেন বাইরে থেকে বলছে- মা দরজাটা খোলো। দাদীমা আড়ষ্টভাবে ঝুকে বসে অনুচ্চস্বরে গম্ভীর ভাবে শুধায়- কে? মা আমি আছাদ। বাইরে থেকে কূলপ্লাবি আবেগমাখা কণ্ঠে জবাব দেয় মেজ কাকা। ধূসর আঁধারের মাঝে কেরোসিনের কুপির ক্ষীণ আলোয় দেখি দাদীমার স্নিগ্ধ হাসিতে মুখমণ্ডল চকচক করছে। উচ্ছ্বসিত আবেগ সংবরণ করে সন্তর্পণে দরজা খোলে দাদীমা। সহসা তড়িৎ বেগে ঘরে ঢোকে মেজ কাকা। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে অশ্র“সিক্ত কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে দাদীমা। তার কান্নার শব্দে পরিবারের অন্য সবাই উঠে আসে। বাবা তার স্নেহপ্রবণ হস্তদ্বয় দিয়ে মেজ কাকাকে অন্তরঙ্গ আলিঙ্গনে বুকে আবৃত করে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে। মেজ কাকা সবাইকে আশ্বস্ত করে বলে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনী হানাদারদের বিভিন্ন ঘাটি তাদের অধিকারে নিয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের চার মহাসংগঠক যুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকার গঠন করেছেন (মুজিবনগর সরকার)।
তাদের মধ্যে আমাদের ক্যাপটেন মনসুর আলী অন্যতম। মুজিবনগর সরকার থেকে অস্ত্র চালনাসহ যুদ্ধের বিভিন্ন উপকরণ আমাদের সরবরাহ করছেন। কিছু দিনের মধ্যেই আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করব। ন্যায়ের জয় হবে। ছেলের স্বপ্নমাখা বার্তায় অদ্ভুত আনন্দে ভরে ওঠে মায়ের মন। মায়ের স্পর্শকাতর হৃদয়টা ওর ভেতরে যাতনা বোঝে। দেশমাতৃকার ক্রান্তিলগ্নে ছেলের দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ও প্রত্যয়বান শাণিত বক্তব্যে দাদীমা বসন্তের ফুলের মত সরস তাজা হয়ে ওঠে। কৃতজ্ঞ চিত্তে ছেলেকে বলে- চূড়ান্ত বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরবি তার আগে নয়।
আর একবার তোমার চরণে মাথা নোয়াবার জন্য আসব মা। আমার জন্য লাল কলার ওয়ালা সবুজ পাঞ্জাবী বানিয়ে রাখবে। তোমার স্নেহের পরশ বুলানো পাঞ্জাবী পরে রেসকোর্সে অস্ত্র জমা দিতে যাব। বলেই আধ্যাত্মিক দৃঢ়তায় বেড়িয়ে যায় ঘর থেকে। দাদীমা অশ্রুভরা কণ্ঠে বলতে থাকে কাকার যুদ্ধে যাওয়ার কাহিনি। বড় আত্মভোলা বে-খেয়ালী ছেলে আমার। প্রথম যৌবনেই ভালবেসে আমাদের না জানিয়ে ক্লাসমেট সীমা আক্তার পরীকে বিয়ে করেছিল আছাদ। তখন দুজনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতো। পরী শুধু নামেই নয়, দেখতেও স্বপ্নরাজ্যের পরী ছিল শুনেছি। পরীর অসামান্য সৌন্দর্যে বিমোহিত আছাদ পরীকে বিয়ে করতে পারিবারিক সামঞ্জস্যতার কথা ভেবে একটুও কুণ্ঠাবোধ করেনি। আর সে কারণেই স্ত্রীকে শ্বশুরালয়ে রেখে রাজশাহীতে পড়ত আছাদ।
বিয়ের পাঁচ মাসের মাথায় অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় পরীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। স্নাতক পরীক্ষার আগেই শুরু হয় বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন পরীর কোলে এক বছরের ছেলে সায়েম। কলিজার টুকরা ছেলে ও প্রিয়তমা স্ত্রী পরীকে শ্বশুর বাড়িতে রেখেই দীর্ঘ তিন বছর পর ওর নানা বাড়িতে আসে আছাদ।
আমার বাবাই আছাদকে আমার সামনে নিয়ে আসে। ভয়ে ওর মুখটা নির্লিপ্ত ঔদাস্যে অন্যদিকে ফিরানো থাকে। আছাদের দৃষ্টি তখন খুঁজতে থাকে না শুধানো প্রশ্নের উত্তর। চারিদিকে তখন যুদ্ধের দামামা বাজছে। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে পশ্চিমা হায়েনার নগ্ন থাবায় দিশেহারা হতচকিত বাঙালি জাতি। জাতির এই দুর্দিনে শত অভিমান থাকা সত্ত্বেও আছাদকে বুকে টেনে নেই। নাতী সায়েম ও পরীকে না আনার জন্য কিছুটা ভর্ৎসনা করি।
অল্পদিনের ব্যবধানে গোটা পূর্ব-বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে আইয়ুব বাহিনীর নগ্ন কাপুরুষোচিত বর্বর হামলা ও তাদের দোসর বাংলা মায়ের কু-সন্তান দেশদ্রোহী রাজাকারদের লুটপাট এবং নারীর সম্ভ্রম লুট করার কু-প্রতিযোগিতা। ভয়ে শংকিত বিহ্বলিত আমি। নাতী সায়েম ও পুত্রবধূ পরীকে দেখার অতৃপ্ত আকাক্সক্ষায় উদ্বিগ্ন মনটা। পরী ও সায়েমকে বাড়িতে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করায় আছাদ কলিজার টুকরা ছেলে ও প্রেমময়তার সঙ্গী প্রিয়তমা স্ত্রীকে কাছে পাবার আনন্দে আত্মহারা। পরদিন সকাল হবার আগেই অর্থাৎ ভোর রাতেই রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায় আছাদ। রাজশাহীতে তখন অত্যাচারী হায়েনার তাণ্ডবলীলায় ও অমানবিক হত্যাযজ্ঞে নিথর মৃত্যুপুরীতে রূপ নিয়েছে। আছাদ ওর শ্বশুর বাড়িতে পৌঁছালো নিষ্পাপ সূর্যটা তখন অভিশপ্ত দিনের আলো থেকে মুক্তি নিয়ে রাত্রির অতল গহ্বরে মুখ লুকিয়েছে। মর্ত্যলোকের পশুদের হিংস্রতাকে আকাশ তার চোখের জলের বোবা কান্নার বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে দিচ্ছে। থমথমে এক ভয়ংকর রাত। বাড়ির আঙ্গিনায় পা রাখতেই বজ্রের আলোক ঝলকানি ও আলো আঁধারির ধূসরতার মাঝে দেখতে পায় উঠোনে পড়ে থাকা কয়েকটি লাশ। প্রথমে শ্বশুর পরে দুই শ্যালক ও একটু এগুতেই উঠোনের কোণায় চোখে পড়ে বেয়োনেট দিয়ে খোঁচানো নিষ্পাপ শিশু সায়েমের রক্তাক্ত লাশ। হৃদয়ে ফিনকি দিয়ে থেমে যায় যন্ত্রণা, যেন হঠাৎ বজ্রপাতে কলিজা ছিদ্র হয়ে যায়। ছেলের গলিত- বিকৃত লাশ বুকে নিয়ে পাগলের মত প্রলাপ বকতে থাকে আছাদ।
আছাদের বিলাপ শুনে পাশের বাড়ির সম্ভ্রমহারা অর্ধপাগলিনী কাজের মেয়ে শোলার মুঠিতে আগুন জ্বালিয়ে দেখতে আসে এবং চিৎকার দিয়ে বলে-
“আল্লা গো, এনা দেহি বড় কুটুম গো; পোলারে নিতে আইছো? পোলা কতা কয় না? আর কোনদিন কতা কইবো না। কুত্তারা দুধের পোলাডারে বাইচপার দিল না। তোরেও ছাইরবো না। তুই ভেগে যা এহনি। পরীরে ওরা ধইরা নিছে; পাছে আমারেও নিব। কি মজা! কি মজা! হা… হা… হা…।”
বুকে পাষাণ বেঁধে কলিজা ছেড়া ধন সয়েমকে কোনমতে রাতেই কবরস্থ করে কবর ছুঁয়ে শপথ নেয় আছাদ।

‘জীবন দিব তবুও পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করব ইনশাআল্লাহ। প্রতিশোধের রণতুর্য প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল রক্তে-মাংসে ধমনী শিরা-উপশিরা, অস্থি-মজ্জায়। পরদিন বাড়িতে এসে বাংলা মাকে মুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় আমার কাছে পুনর্ব্যক্ত করে। আমি ওর ভেতরের যন্ত্রণাকে না বুঝে ছেলে হারানোর ভয়ে অস্বীকৃতি জানালে রাতের অন্ধকারে ওর ছোট মামাকে নিয়ে পালিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করে। এরপর আর বলতে পারে না দাদীমা, অশ্র“সিক্ত নয়নে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে। এভাবে শত বাঁধা-বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে বাংলা মায়ের দামাল ছেলে, কৃষক, মজদুর, ছাত্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সর্বস্তরের মুক্তিকামী বাঙালি নগ্ন হায়েনার ছোবল থেকে দিনকে দিন এক এক অঞ্চল শত্রু মুক্ত করতে করতে অবশেষে আসে স্বপ্নের সেই প্রহর; আমাদের কাক্সিক্ষত বিজয় ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর। গোটা বাঙালি জাতি স্বজনহারা ব্যথা ভুলে বিজয়ের আনন্দে মেতে ওঠে।

আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল- ‘জয় বাংলা’ স্লোগান।

দাদীমা জয়নব বেগম পাঞ্জাবী হাতে নিয়ে প্রতীক্ষায় থাকে। সবাই বলে আছাদ আর আসবে না পাঞ্জাবীটা ফকির-মিসকিনকে দিয়ে দিন। দাদীমা বলত, তোমরা দেখে নিও আছাদ ঠিকই আসবে, বড় আত্মভোলা ছেলে আমার; ও হয়তো বিজয়ের আনন্দে পাঞ্জাবীর কথা ভুলেই রেসকোর্সে চলে গেছে। ও আসবেই। ও আমাকে কথা দিয়ে গেছে ও ফিরে আসবে একটি স্বাধীন মানচিত্র খঁচিত লাল সবুজের পতাকা হাতে নিয়ে। এভাবে প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে পেরিয়ে গেছে ৩৫ বছর। দাদীমা নেই-আজও আসে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন আর কেউই বীর মুক্তিযোদ্ধা আছাদের প্রতীক্ষায় অষ্টপ্রহর চেয়ে থাকে না। সন্তানহারা দাদীমার অযাচিত প্রতীক্ষার ৩৫ বছর দুর্বিষহ দিনগুলির অসহনীয় স্মৃতি অশ্র“সিক্ত অন্ধপ্রায় ঝাপসা ধূসর চোখ আজও আমায় খুঁজে ফেরে। অহর্নিশ যন্ত্রণা দেয় মেজ কাকার সে-ই সবুজ পাঞ্জাবী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *