উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব তিন
- উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব এক
- উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব দুই
- উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব তিন
৩.
আমার বাবা হেদায়েত উল্লাহ সোনারা গ্রামের কোনো বড় মাথা ছিল না। কিন্তু গ্রামের দশটা মাথা নামিয়ে দেওয়ার মতো মানুষ ছিল। একটা সময় ছিল যখন বাবার নামে গাইবান্ধা জজ কোর্টে এক ডজনের মতো মামলা চলমান ছিল। বেশিরভাগই মাদক আইনের মামলা, খুন-জখমের মামলাও ছিল কয়েকটা। যদিও বাবাকে বাড়ির কেউ না কি কখনও নেশা করতে দেখেনি। বাবা ছিলেন যোগানদাতা। তার আয়-রোজগার ছিল ঈর্ষণীয়।
বাবার অধীনে অনেকেই কাজ করতো। রাতের অন্ধকারে আমাদের বাড়িতে এসব লোকের আনাগোনা ছিল। নেশাগ্রস্ত উঠতি যুবক থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষের কাছে বাবার কদরও ছিল বেশ। গ্রামবাসী ভয়ে বাবার বিরুদ্ধে মুখ খুলতো না।
এই বাড়ির লোকজনও বাবার বিরুদ্ধে কখনও কথা বলত না। সংসারে বাবার ছিল একক আধিপত্য। দাদাজান বিছানায় পড়ে থাকা জড় পদার্থ ছিলেন। সংসারের চাল-ডালের হিসাব ফুপুজির কাছে থাকলেও সংসারের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক ছিল বাবা। বনেদি ঘর না হলেও এই বাড়িতে ছিল বনেদি বাড়ির জৌলুস। আমার দাদাবাড়িতে ঘর ছিল পাঁচটা। বড় ঘর, যেটাতে দাদা-দাদি থাকতো। ফুপুজি ফজিলা আর আমি একটা ঘরে থাকতাম।
বৈঠকখানায় ছোটো কাকার জন্য খাট পাতা ছিল। অসুস্থ মায়ের জন্য ছিল আলাদা ঘর, যেখানে বাড়ির মালসামানা রাখা হতো। আর ছিল বাবার ঘর। বাবার অনুপস্থিতিতে এই ঘরের কড়ায় সবসময় তালা ঝুলতো। তালা না ঝুললেও এই ঘরে সবার প্রবেশ নিষেধ ছিল। শুধু মাঝে মাঝে বাড়িতে পুলিশ এলে সেই নিষেধাজ্ঞা ভেঙে যেত।
দিনের সিংহভাগ সময় নিজের আর সাগরেদদের জন্য কোর্ট-কাচারিতে থাকতে হতো বলে আমাকে বা মাকে নিয়ে ভাবার ফুরসৎ বাবার ছিল না। কখনও কখনও বাবা লাপাত্তা হয়ে যেত। এরপর স্বল্পকালীন হাজতবাস শেষে পুরনো পেশায় ফিরে আসতো। জেলখানা বেশিদিন বাবাকে বন্দি রাখতে পারতো না। বাবার ধূর্তবুদ্ধির কাছে কোর্ট-গারদের শিকগুলো কিছুই ছিল না। তার চেয়ে বরং মায়ের ঘরের জানালার শিক ছিল অনেক বেশি দুর্ভেদ্য। যা ভেদ করে বাইরে বের হওয়া মায়ের জন্য সম্ভব ছিল না। বাবা মায়ের ঘরে কখনও ঢুকতো না। বিশেষত আমার জন্মের পরে মায়ের দুর্দশার পর বাবাকে কেউ ঐ ঘরে যেতে দেখেনি। ফুপুজি বলতো শরীরের প্রয়োজনে বাবা মায়ের ঘরে যেত। একটা সময়ে মায়ের দেওয়ার ক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে বাবার মায়ের ঘরে যাওয়ার প্রয়োজনও ফুরিয়েছিল। আমার জন্মের আগে মায়ের দুইটা বাচ্চা মারা যায়। ঠিক বাচ্চা বলা যায় না, এ রক্তপি-ের স্খলনই ছিল শুধু। কিন্তু অজাত ভ্রুণের শোকে মা সারাক্ষণই বিহ্বল হয়ে থাকতো। হয়তো এই কারণেই আমি পেটে আসার পর থেকে মা আমাকে পাহারা দিতো আর অযাচিত আগন্তুককে হুমকি দিতো, ‘মরেক। তোক আন্ধার কব্বরত পাঠে দেম।’ অথচ কাউকে অন্ধকারে পাঠানোর ক্ষমতা মায়ের ছিল না বরং অন্ধকারই ছিল তার নিত্যসঙ্গী।
মায়ের সঙ্গে বাবার দাম্পত্য সম্পর্ক বলতে তেমন কিছু ছিল না। বাবার সহকর্মী আর শুভাকাঙ্ক্ষ্মীরা তখন বাবার জন্য ভালো মেয়ের সন্ধানে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। যদিও মা যতদিন বাবার সংসারে ছিল ততদিন বাবা রেহনুমাকে ঘরে তোলেনি। মায়ের প্রতি বাবার উদাসীনতা ছিল, কিন্তু ঘৃণা ছিল বলে ফুপুজি দাবী করতো না। প্রতিবার জামিন পেয়ে ঘরে ফেরার সময় বাবা মায়ের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতো। শাড়ি-কাপড়, তেল, সাবান কোনো কিছুরই অভাব ছিল না মায়ের। মা এসবের সদ্ব্যবহার করতো না। রুক্ষ্ম চুলে, উন্মত্ত চোখে-মুখে মা নিজের অন্ধকার ঘরে একাকী দিন কাটাতো।
আমি পেটে আসার পর মায়ের উন্মত্ততা দিন দিন বাড়তে শুরু করে। তবু বাবা আমার জন্মের সময় মাকে নানাবাড়ি পাঠায়নি। আমার জন্মের আগে বাবার মাকে নিরুপদ্রব সহ্য করার সক্ষমতা দেখে বাড়ির সবাই অবাক হতো। তবু সেই সকালে মামা আর নানা আমাদের নিতে এসেছিল। তাদের দেখে ব্যতিব্যস্ত বাবা হাঁক-ডাক করে বাড়ি মাথায় তুলেছিল। যখন বাবা মামা আর নানাকে নিয়ে খেতে বসেছিল তখনই বাড়িতে পুলিশ এসেছিল।
খাবারের বিশাল আয়োজন ফেলে বাবা সদর দরজায় পা রাখতে রাখতে বলেছিল, ‘ফিরি আসি দুট্যাক য্যান না দ্যাখম। বাড়িত নয়া শাগাই আসপে।’আমার আর মায়ের বিদায় পর্বে দুজনের জন্য কান্না ছিল অনিবার্য। তারা হলো, দাদি আর ফুপুজি। ঐ দিনের গল্প বলতে গেলে ফুপুজির চোখ জলে ভিজে আসতো। তখন তো ফুপুজিই আমার মা ছিল। আমার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার শোক ফুপুজিকে তাই সেদিন কান্নার স্রোতে ভাসিয়েছিল।
কাঁদতে কাঁদতেই ফুপুজি আমাকে নাইয়ে-খাইয়ে তৈরি করেছিল। মাকে শাড়ি বদলে দিতেই মা বরাবরের মতো সেদিন শাড়ি ভিজিয়ে ফেলেছিল। মায়ের কোলে জায়গা হয়নি আমার। নানার কোলে উঠে আমি নতুন গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলাম। নানাবাড়িতেই আমার শৈশব-কৈশোরের প্রজাপতিকাল কেটেছে। যার সমাপ্তি হয়েছিল প্রবল যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে। তবু নানাবাড়িতে কাটানো মধুর দিনগুলোর স্মৃতি আজও আমাকে সুখের দরিয়ায় ভাসায়।
চাটমোহরে আসার পর আমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আমি এখানে আসার কয়েক দিনের মধ্যে আমার নানা মারা যান। দিন যেতে থাকে আর আমি বড় হতে থাকি। চারপাশের সবকিছু বুঝতেও শুরু করি। তখনও আমি আয়না দেখতে শিখিনি। তবে কথা বলতে শিখেছি। যদিও স্বরযন্ত্রের বাতাস আমার নাক-তালু-ঠোঁটের সন্ধিস্থলে বাধা পেয়ে বদলে যেত আর সুরেলা, শ্রুতিমধুর শব্দের পরিবর্তে মুখ নিঃসৃত শব্দগুলো পরস্পরের সাথে ঠোকাঠুকিতে বিচিত্র সব ধ্বনির সৃষ্টি করতো। মনে হতো কাদা মাখামাখিতে বিপর্যস্ত বোলেরা নিজেদের অস্তিত্ব প্রকাশে সবসময় যুদ্ধরত থাকছে। কাছের মানুষেরা আমার কথা বলার ধরনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল বলে বাক্যের অর্থ বুঝতে আমার প্রতি তাদের ততটা মনোযোগ দিতে হতো না। কিন্তু যেকোনো আগন্তুককে আমার কথা বুঝতে বেশ মনোযোগী হতে হতো। উৎসুক মানুষ কখনও কখনও আমার কাছে প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিতে জানতে চাইতো, আমি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছি। আমি অত ব্যাখ্যা করে কাউকে কিছু বোঝাতে যেতাম না। কারণ ততদিনে জগতসংসারের কাছ থেকে আমি সবচেয়ে সুচারুভাবে যে জিনিসটা শিখেছি সেটা হলো, উপেক্ষা।
আমিও তাই আমার চারপাশের কথার সমুদ্র থেকে নিজের সুবিধামাফিক কথা কানে তুলতাম, বাকি কথা সযত্নে এড়িয়ে যেতাম। কোনো প্রতিবেশী যখন বাড়িতে এসে রান্নাঘরে বসে পান চিবাতে চিবাতে নানির কাছে বাপ খেদানি ঠোঁট-তালুকাটা মেয়ের কী করে বিয়ে হবে তা নিয়ে গ্রাম্য শ্লোক আওড়াতে আওড়াতে দুঃখের বিশাল ফিরিস্তি তৈরি করে বলতো, ‘তোগার ওপরে আঘিন্নে দায় চেপেছে’, আমি তখন ফড়িং ধরতে ছুটে যেতাম। তুষারকে অনুসরণ ঘাস-লতা, শস্যের কচিপাতার উপর লাফিয়ে লাফিয়ে চলা ঘাসফড়িঙের পিছু নিয়ে আমিও লাফ দিতাম। আমার মামাতো ভাই তুষার এই সাদা, লাল, রঙিন সব ঘাসফড়িং, গঙ্গাফড়িং ধরার সঙ্গী ছিল। আমরা দুজনে মিলে ফড়িংখাদক পাখিকে ফাঁদে ফেলে পাখিও ধরতাম আর পাখির মতো ছটফট করে বেড়াতাম।
তুষার আমার চেয়ে দুই বছরের বড় ছিল। বয়সে বড় হওয়ার কারণে ও আমার সঙ্গে মুরুব্বির মতো আচরণ করতো। আসলে আমি ছিলাম তুষারের চ্যালা। ওর কথা আমার কাছে বেদবাক্যের মতো ছিল। তুষারের জ্যাঠামি আমি অবলীলায় মাথা পেতে নিতাম। কারণ পৃথিবীতে তুষারই একমাত্র ব্যক্তি ছিল যে আমাকে গুরুত্ব দিতো। এমন কি আমার মুখশ্রী আর কণ্ঠের বিকৃতি তুষারের কাছে কোনো বিশেষ বিষয় ছিল না। মুখে কিছু বলার আগেই তুষার আমার মনের ভাষা পড়ে নিতো। তাই বাড়ির সবার বাধা-নিষেধ আর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে আমি তুষারের পিছু পিছু দৌড়াতাম। তুষার আমাকে শাসন করতো, বকতো, প্রশ্রয় দিতো। সাহসও দিতো। আমি মন খারাপ করলে বলতো, ‘আরেট্টু বড় হ, তোর ঠোঁট আমি অপারেশন করায় আনবোনে। তহন তুই দেখিস তোক আয়নায় কত সুন্দর লাগে।’
আমি দুই কান ভরে তুষারের কথা শুনতাম। সুখের তোড়ে আমার বুকের নদীতে জোয়ার উঠতো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি আমার ঠোঁট-তালুকাটা মুখে হাত বুলাতাম আর স্বপ্ন দেখতাম এই বিসদৃশ ক্ষতটা কোনো এক জাদুকরের জাদুমন্ত্রে অদৃশ্য হয়ে গেছে। তুষারই যেন সেই জাদুকর! যে আমার দুঃখের দাগ ভোজবাজিতে উড়িয়ে দিয়ে রাজপুত্রের মতো সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘দ্যাখ, এইবার তোক কত সুন্দর লাগে!’ তুষারের কথা ভেবে মনে মনে আমি নিজেকে রাজকন্যা সাজাতাম। যেন আমার সোনার পালঙ্কে গা, রূপার পাদানিতে পা, উঠতে দাসী, বসতে দাসী।
আর আমার চারপাশে আয়নার দেওয়াল। যেখানে শুধু আমার অপরূপ মুখশ্রীর প্রতিচ্ছবি।
সত্যি সত্যি একদিন সেই কাক্ষ্মিত ক্ষণ আমার জীবনে এল। তুষারকে ছেড়ে আমি শহরে গেলাম। যদিও তুষারকে ছেড়ে একদিনও থাকার কথা আমি ভাবতে পারতাম না। তবে সেবার বড় মামা আমাকে শহরে নিয়ে গিয়েছিল। তুষার সঙ্গে যাওয়ার জন্য বায়না করছিল খুব। আগের রাতে ভাত পর্যন্ত খায়নি।
তখন আমার বয়স কত হবে? মনে নেই। মামা ডাক্তারের খবর আগেই নিয়েছিলেন। শহরে বিদেশী ডাক্তার এসেছিল, ঠোঁট-তালুকাটা মানুষের অপারেশন করাতে। সেখানে অপারেশন হয়ে আমার মুখের সাথে শ্রী শব্দটি যুক্ত হবে। আমার স্বরের সাথে সুর যুক্ত হবে। এই আনন্দের চেয়ে তুষারের সাথে বিচ্ছিন্নতার কষ্টই আমাকে বেশি আহত করছিল। ঐ সময়ের কথা তেমন কিছু মনে নেই আমার। অপারেশন টেবিল, ডাক্তার এসবের স্মৃতি যেন কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেছে। বেশ কয়েকদিন পরে আমি যখন বাড়িতে ফিরে এলাম তখন আমি আলাদা নূর। আমার ঠোঁট-নাকের সংযোগস্থল মেরামত করার পরেও নিখুঁত মুখায়ব আমি পেলাম না ঠিকই কিন্তু আমার গলার স্বরে বেশ খানিকটা পরিবর্তন এল। আমার কথা বলে আরাম হলো, লোকের শুনেও আরাম হলো। নানি আমাকে দেখে খানিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, ‘গেদির গতি হইল!’ কিন্তু মামীর ভ্রুকুটি গেল বেড়ে।
