উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব দুই
- উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব এক
- উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব দুই
- উপন্যাস ।। আমি আঁধারে থাকি।। সাদিয়া সুলতানা।। পর্ব তিন
২.
আমার নাম নূর। আমার দাদা নেয়ামত উল্লাহর রাখা নাম নূর-ই-জান্নাত। আমার মায়ের নাম নুরুন্নাহার, সবাই ডাকত নাহার। আমার জন্মের আগে-পরে মা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। আমরা তখন দাদাবাড়িতে থাকতাম। গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানায়। গ্রামের নাম সোনারা। বামনডাঙা রেলস্টেশন থেকে সোনারা গ্রাম পায়ে হাঁটা পথ। মাকে তখনও বাচ্চা হওয়ার জন্য বাপের বাড়িতে পাঠানো হয়নি। কোথাও নেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না মায়ের। সারাদিন মা তার ছোটোখাটো শরীরের সঙ্গে বেমানান, বেকায়দা পেট নিয়ে ঘর অন্ধকার করে বসে থাকতো আর কেউ পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে আদর করে ডেকে বলতো, ‘কেটা যায় রে? মোক এ্যানা পানি দিবু? তিয়াস লাগছে।’
মায়ের আহবানে প্রলুব্ধ হয়ে কেউ ছিটকিনি খুলে মায়ের ঘরে ঢুকতেই মা তাকে চেপে ধরে কামড়ে-খামচে রক্তাক্ত করতো। তার পেটের বাচ্চাকে চুরির দায়ে অভিযুক্ত করে হুমকি দিতো, ‘মরেক। তোক আন্ধার কব্বরত পাঠে দেম। তোক কীড়ায় খাবু। তোক আন্ধার খাবু।’
ফুপুজির মুখে মায়ের গল্প শুনতে শুনতে সব ঘটনা আমি চোখের সামনে দেখতে পেতাম। মাঝে মাঝে ফুপুজি চোখ মুছতো আর বলতো, ‘একটা মানষের জিন্দিগিত কতভাবে যে দুক্কের ফয়সালা আল্লাহ আনব্যার পায়, তার নিশানা পাওয়া মুশকিল। তোর মায়ের দুক্কের কোনো শ্যাষ আছিল না। অক দুক্ক দিতে দিতে আল্লাহতায়ালাও হাঁপি উঠিয়া অক দুনিয়াত থাকি তুলি নিয়া গেল।’
ফুপুজি মায়ের দুঃখের বর্ণনা করতে করতে নিজের সব দুঃখ ভুলে যেতো। সত্যি বড় করুণ ছিল আমার মায়ের দিনলিপি। মায়ের দুঃসময় বাড়ির সকলের জন্য দুর্গতি ডেকে আনতো। তখন পরিবারের সদস্যদের উৎকন্ঠার সীমা থাকত না। একদিন মা শাহীন কাকাকে রামদা দিয়ে আক্রমণ করেছিল। কাকার বাম কাঁধে এখনও সেই আঘাতের চিহ্ন আছে। এরপর থেকে মায়ের ঘর বাইরে থেকে তালা দেওয়া থাকতো। আমাকে পেটে নিয়ে শেষ দুমাস মা এভাবে গৃহবন্দি অবস্থায় ছিল। একদিন মাঝরাতে ব্যথা উঠলে মাকে বাড়ির আঁতুড়ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আসে আমার জন্মতিথি।
পৌষের এক জন্মান্ধ রাত আমার জন্মতিথি। ফুপুজি বলতো, ‘পউষ মাসত তোর জন্ম রে বেটি। দিনের হিসাব মোর মনে নাই। হামরা কী আর সাল তারিখ দিয়া দিন মাপি? হামরা মাপি জার দিয়া, উসুম দিয়া, আন্ধার দিয়া, বাসনা দিয়া।’
স্কুলে ভর্তির সময় আমার জন্ম সাল, তারিখ আন্দাজ মতো দেওয়া হয়েছিল। দশ ডিসেম্বর, উনিশশো চুয়াত্তর। মামার হাত ধরে আমি প্রথম স্কুলে যাই। মামাই আমার জন্ম তারিখ ঠিক করে দেয়। আমার দুজন একান্ত আপন মানুষের মধ্যে মামা একজন। আরেকজন ফুপুজি। ফুপুজির কাছ থেকে শুনতাম আমার জন্মরাতের গল্প। গল্প বলতে বলতে ফুপুজি কেঁপে কেঁপে উঠতো। ফুপুজির চোখের সামনের দৃশ্যায়ন এখন নিখুঁত আমার চোখের তারায়।
আমার জন্মক্ষণের অনেক আগে থেকেই মায়ের গগনবিদারী চিৎকারে রাতের জমাট কুয়াশা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। দীর্ঘ সময় প্রসব যন্ত্রণা দেওয়ার পরও আমি পৃথিবীতে আসতে চাইছিলাম না। যেন আমি বুঝে গিয়েছিলাম বাইরের পৃথিবীতে আমার জন্য খুব অনাদর অপেক্ষা করছে। অনিচ্ছুক আমার একগুঁয়েমিতে আর মায়ের চিৎকারে রাতের অন্ধকারও বারবার শিউরে উঠেছিল।
একসময় রক্ত পানিতে মাখামাখি আমি পেটের বাইরে এসে মায়ের কষ্ট লাঘব করলাম। অন্ধকারের ঘন আবরণের মধ্যে হারিয়ে গেল আমাদের দুজনের অবিশ্রান্ত কান্না। সেই রাতে প্রচুর রক্তপাতের কারণে আমাকে মায়ের নাড়ী থেকে কেটে নিয়েই ভ্যান খোঁজা শুরু হয়েছিল। মুরুব্বিদের কথা না শুনে ফুপুজি ফজিলা বাড়ির কামলাদের সঙ্গে করে ভোর রাতে মাকে ভ্যানে তুলে সদরে নিয়ে গিয়েছিল। বাবা তখন বাড়িতে ছিল না। হাজতে ছিল। বাড়িঘরের দায়িত্ব ছিল ছোটো কাকা আর ফুপুজির ওপর। দাদি অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে ফুপুজিকে সেদিন আটকাতে চেয়েছিল। কিন্তু ফুপুজি যেন নিয়তির সাথে বোঝাপড়ায় ঠিক টের পেয়ে গিয়েছিল, সামনে বিপদ অপেক্ষা করছে। তাই সেই রাতে ফুপুজি কারও কথা শোনেনি। কিন্তু হাসপাতালে নিতে নিতে পথেই মায়ের রক্তহীন শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। আমি পেটে আসার পর থেকেমা খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল। সেই রাতে প্রচুর রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল মায়ের শরীর থেকে। যাবে না? সেই রাত তো ছিল আমার আর মায়ের বিচ্ছেদের রক্তক্ষরণের রাত!
শরীরে তিন ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পর মোটামুটি সুস্থ হয়ে দিন তেরো পর মা বাড়ি ফিরেছিল। ততদিনে উঠানের পুবপাশে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ানো কদম গাছের সঙ্গে আমার বিরাট সখ্য হয়ে গেছে। আমাকে কোলে নিয়ে ফুপুজি রোজ তো ঐ কদমের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতো আর সুরে সুরে জানাতো, একদিন মা আসবে। মা যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন আমি মাকে ছাড়া থাকতে শিখে গেছি। হাসতেও শিখে গেছি। যদিও ঠোঁট-তালুকাটা আংশিক বিকৃত মুখের হাসি দেখে পরিবারের কারও মুখে স্বস্তির হাসি ফুটতো না। বরং আমার মুখে তাকিয়ে বদলি হাসি দেওয়ার পরিবর্তে বাড়ির গৃহস্থালি কাজ করলে তাদের সময় সাশ্রয় হতো। তবু কেঁদে কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলে আমি সবার মনোযোগ আদায় করে নিতাম। দাদিও ধীরে ধীরে আমাকে ভালবাসতে শুরু করলো। আমার ঠোঁট-তালুকাটার অসঙ্গতি তাদের ভালবাসায় ঢেকে যেত। আমার কান্না শুনলে ঘরের সব কাজ ফেলে দাদি বা ফুপুজি আমাকে কোলে বসিয়ে ঝিনুকের খোলে বাড়ির গাভী ‘মায়া’র দুধ খাওয়াত। মায়ের দুধ যে আমার কপালে জোটেনি।
মা আমাকে কোলেই নিতো কালেভদ্রে। তাও যদি ফুপুজি আমাকে মায়ের কোলে তুলে দিতো। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে মা আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি। আপনমনে চুপচাপ ঘরে বসে থাকতো। আগের মতো কারও কাছে পানি খাওয়ার জন্য মিনতিও করতো না। খেতে দিলে খেতো, নিজে থেকে খাবারও চাইতো না। শীতের কনকনে ঠান্ডায় এক মাসের মাথায় আমার নিউমোনিয়ার মতো হলো, তা-ই দেখে দাদি বলল, মায়ের বুকের ওম চাই। ফজিলা ফুপুজি মায়ের বুকের ওম দিতে আমাকে কোলে তুলে সাহস করে মায়ের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। তার মনে ক্ষীণ আশা ছিল আমাকে পেলে মা বদলে যাবে। নিজেকে ফিরে পাবে। কিন্তু আমাকে মায়ের কোলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। মা আমার দিকে ফিরে তাকায়নি। ফুপুজি অনেকক্ষণ মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও আমাকে মায়ের কোলে দিতে পারেননি। মা ঘোলা চোখে ফুপুজির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘চরুপাকে আন্ধার। এ্যানাও শলক নাই!’
মায়ের ঘর আমার জন্য স্বাস্থ্যকর ছিল না। ঐ ঘরে সবসময় তীব্র দুর্গন্ধ থাকতো। মায়ের শরীরের দুধ দুধ গন্ধের সঙ্গে তার শরীর থেকে প্ররাবের ভেজা ভেজা গন্ধ আসতো। প্রতিদিনই মায়ের বিছানা-বালিশ রোদে দিতে হতো। আমার জন্মের সময় মাসিকের নালীর সাথে মায়ের মূত্রনালী এক হয়ে গিয়েছিল। একদিকে আমার যত্নআত্তি আরেক দিকে মায়ের অসুস্থতা সব মিলিয়ে এই বাড়ির লোকজন বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। ফুপুজি বলতো, মায়ের দুরবস্থা বাবাকে একটুও বিব্রত করেনি। বাবা মায়ের ঘরমুখো হতো না, গালমন্দও করতো না। মানসিক বিকারগ্রস্ত স্ত্রীর জন্য সময় নষ্ট না করে বাবা মন দিয়ে তার ব্যবসা করতো আর পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার ফন্দিফিকির খুঁজতো।
আমাকে নিয়ে বাবার মধ্যে কোনো আবেগ কাজ করেছে কি না সেই প্রশ্ন করলে ফুপুজি বলতো, মায়া খুব আজব জিনিস। কেউ তা দেখায় কেউ দেখায় না। ভাইয়ের প্রতি ফুপুজির পক্ষপাতদুষ্ট কথায় আমার রাগ হতো তাই বুঝতে শেখার পর থেকে এসব প্রশ্ন করে ফুপুজিকে আর আক্রমণ করতাম না। তার চেয়ে বরং নিজের শৈশবের গল্প শোনায় মন দিতাম। আমার জন্মবেলার দুর্দশার গল্প শুনতে শুনতে একদিন জানতে পারি, আমার বয়স যখন দুই বছর আমাকে আর মাকে আমার নানাবাড়ি চাটমোহরে নিয়ে যেতে একদিন কাকডাকা ভোরে মামা আর নানা এই বাড়িতে এসে হাজির হয়।
