উপন্যাস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর নয়

এখন বৈশাখের প্রখর তাপ উপেক্ষা করে ক্ষেতের পাকা মরিচ আর মিষ্টিআলু তোলার সময়। বিকালে ঈশানে জমে কালো মেঘ আর তারপর কালশৈাখী। মড়মড় কওে ভেঙ্গে পড়ে আম নিমের ডাল আর নারকেলের ডেগো, চালা উড়ে গিয়ে বিলে পড়ে খড়কুটার মতো। নৌকা নিয়ে যারা খোদ মেঘনায় যায় তাদের বাড়িতে চলে কান্নাকাটি চেঁচামেচি কচিৎ আল্লাবিল্লাহ। তারপর সবকিছু মিটেটিটে গেলে রাতের খাবার খেয়ে সব ঘুমাতে যায় নিশ্চিন্ত হয়ে। নিজেদের নিয়ে যখন এত ব্যস্ততা তখন কারো জানার কথা নয় যে সন্ধ্যায় রজব আজান দেয়নি, দেবে কীভাবে তখন তো ঝড় ছিল, ঝড়ে সামান্য গলার শব্দ কীভাবে শুনবে! এশার আজান দেয়নি, এশার আজানের কথা কারো মনেই পড়ে না, ঝড়ের ভাব দেখে গুটি কয়েক নামাজি নিজের ঘরেই সেরে নিয়েছে নামাজ। ফজরের ওয়াক্তেও যখন আজান হয় না, তখন মনে হতে পারত গেল কই! না কইয়া তো কোন দিক যাওনের মানুষ না! পুবকান্দি পশ্চিমকান্দি নিয়ে শিমুলচর গাঁয়ে সে গত দশ বছর আছে। এসেছে কিশোর বয়সে, এখন রীতিমত উপযুক্ত যুবক, মুখভরা দুব্বাঘাসের মতো ফিনফিনে দাড়ি। তো সকালে একদল বালকবালিকা কায়দা-আমসিপারা নিয়ে হুজুরকে খুঁজে না পেলে জানা যায় সে মসজিদে নাই। আর তারাই বানায়, রজব হুজুর হারায় গেছে গা! আর বালুর গোছায় দা ধার দিতে দিতে এই খবর পায় এহাকবর। আবিয়াত্বা হুজুর মানুষ, তাতে আবার সুন্দর এবং স্বভাবের নরম, তাতে আবার এতিম, মানুষের ঘরে মানুষ হওয়া। এহাকবর ভাবে, তার থাহাই কি আর হারানোই কি! খবর পশ্চিমকান্দি পূবকান্দি মিয়াবাড়ি মৃধাবাড়ি সরকারবাড়ি মাস্টারবাড়ি হয়ে একেবারে জেলেপাড়া পর্যন্ত চলে গেলে চন্দ্রভানু আর না জানে কেম্নে! যে দু’একজন জানতো চন্দ্রভানুকে পানিপড়া দিতে চাঁদপুর গিয়েছিল, তারা সন্দেহ করে, গল্প বানায় আর বানানো গল্পর দ্রুত বিস্তার দেয়। যদিও সৃষ্টির আদিকাল থেকে যেমন, আজও তেমনি, সম্ভবনা কি আশংকা নিয়েই গল্প বানানো হয় খালপাড়ে। কেউ কেউ এই সুযোগে, সুযোগ কি, প্রায়শই যা করে, চন্দ্রভানুর স্বভাবচরিত্র নিয়ে, শুরু করে।

দুপুরবেলা কলসি ভরতে খালে নেমে ফিসফাস, কেউ মাঝখালে গিয়ে সাঁতার দিচ্ছি দিব করতে করতে ঈশারায় কাছে ডাকে — আবার বলে আরাইয়া গেছে!
— দুনিয়ায় এত মানুষ থাকতে হেয়ই আবার আরাইল?
— আরে কেউ আরাইতে চাইলে ডাহা শহর অইলো উপযুক্ত জায়গা।
— ডাহায় আবার গেল কবে?
ভুল কথার লাগাম টেনে ধরে এগিয়ে আসে একজন — আগো না, নিজে এইবার আরায় নাই, আরাইছে রজব মিয়া।
— কুদ্দুসের বউ আছে তো বাড়িত্!
হাসতে হাসতে পানিতে ভেঙে পড়ে, কলসি হাত ছাড়া হয়ে দূরে চলে যায়, আর এমনকি, ডুব দিতে ভুলে গিয়ে সাঁতার কেটে পাড়ে ওঠে। কত দিন পর আবার হেয় খবর হইল!
— কাবান্নি মাগির পেটে তো আবার কতা হিলাই করা থাহে, কেমনে বুজুম বাইত্তেই আছে! কলসি নিয়ে উঠতে উঠতে কে যেন বলে ওঠে, দেখ গা রজবের কোলে বইয়া মাগি মজা খায়! তারপর স্বগতোক্তি, চাঁনপুর যাওয়ার সময় বলে কী ডক কইরা সাজন দিছে, রূপের কি দেমাগ গো, কতাই কয় না, যেন আমরা মানুই না! — নতুন কোনো!

খালপাড়ে সরকারবাড়ির কেউ আসে না কাজে। নিজস্ব পুকুরেই এই সুদিনকালে কাজ চলে আর বর্ষায় দক্ষিণধারের নিজস্ব ঘাটকুলে। তো এখন তাই স্বাধীন যৌনালোচনা চলে যথেচ্ছভাবে, লাগামহীন। সদরঘাট থেকে যেটাকে পেটে করে নিয়ে এসেছিল বেঁচে থাকলে এখন কুদ্দুস আঙুল ধরে আড়ং আর হাট করত আর কুদ্দুসের যৌনাঙ্গ, যৌনক্ষমতা নিয়ে এই প্রথম মেয়ে মহলে বন্যা বয়ে যায়। চন্দ্রভানুর পিনিস যাত্রা, হারিয়ে যাওয়া, ফিরে আসা, কালিপুরা বাজারের কবিরাজের আগমন, আর গত কয়েকমাস ধরে সাজসাজ রব করে দুই নদীর মিলন খুঁজে নিজেদের মিলন করানোর যাত্রা, সবই তাদের জানা, তারা এখন শুধু যাত্রাদলের নটনটিদের দিয়ে মনে মনে অভিনয় করায় আর অপার কামতৃষ্ণা নিয়ে খালপাড় বীর্যকর্দম করে তোলে। বলা চলে ইতিহাস না জানা নবীনদের বড়ো উপকার হলো! তারপর খালপাড় পেরিয়ে সেই কর্দম সারা গ্রাম ছড়িয়ে পড়লেও রজবের কোন খবর নাই। দু’একদিন পর মতলু ওঝার বউ আর তিন মেয়ে পালং মাছ মানে পটকা মাছে খেয়ে মারা গেলেও, যদিও প্রতি বছর ২/৩ জন এভাবে মারা যায়, সেই শোক সারা গ্রামকে খুব অল্প সময়ই শোকাহত করে রাখে। ‘আহারে মইরা বাঁইচ্যা গেছে’, খাইতে দিতে পারে না মরণে আর কি ক্ষতি’ — কিংবা ‘মতলুর মন্ত্রও কোন কাজে দিল না!’
— হেয় না বলে কামরূপ কামাক্ষার পাহাড়ে সতের মাস দীক্ষা নিয়া আইছে,
— খালি সাপের বিষ নামার মন্ত্রই শিখছে?
— কি সুন্দর মন্ত্র কয়!

মনসা দেবী আমার মা
ওলটা পালটা পাতার ফোঁড়
ধোরার বিষ তুই নে তোর বিষ ধোরারে দে
দুগ্ধরাজ মনিরাজ, কার আজ্ঞা?
বিষহরির আজ্ঞা  

 — মন্ত্র দিয়া ভাত খাইলে কি মন্ত্র থাহে? ক্ষতি না হইয়া যায় না গো!
— আকালের আত থেইক্যা বাঁচলেও পালং এর আত থেইক্যা বাঁচলো না!
— লোব, কত মাছ, পালং খাইতে কে কয়!

এই সব বলতে বলতে শোক সয়ে আসলেও চন্দ্রভানুর কাণ্ডকীর্তি তাদের মনে কচি লাউয়ের ডগার মত থাকে জীবন্ত বেয়ে বেয়ে উঠতেই থাকে! গুণে গুণে ঠিক চার দিন পর এক ভোরে মসজিদের পিছনে রজবের ছাপড়ার সামনে কয়েকটা ছেলেমেয়ে, যারা রজবের কাছে আমসিপাড়া পড়তো তারা খুঁজে পায় একটা খুব সুন্দর ফুলতোলা রেশমি রুমাল। রজবকে পরীরা নিয়ে গেছে, দিনের অর্ধেক না যেতেই খবর চাউর হয়ে যায়। সংসারে তো তার কেউ ছিল না যে তার জন্য ব্যবন্থা নেয়। তো অপেক্ষাই সই। বিপজ্জনক ব্যাপার হলো পরীরা নেয়ার আগে নাকি রেশমী রুমাল পাঠায় কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটনা ঘটলো উল্টো। কেউ বলে ওকে আর ছাড়বে না পরীরা তারই সংকেত, খুব দুষ্টুলোক যারা, তাদের কেউ বলে, এ সব চন্দ্ররই কারসাজি, দেখ্ গা কই লুকায় রাখছে। মোট কথা, যে পরীই নিয়ে থাক বিষয়টা কঠিন, ফিরিয়ে দেয়া না দেয়া একদম তার ইচ্ছা, সাধারণের এমনই বিশ্বাস।

ক্রমশ পরীর চিন্তাটাই পাকাপোক্ত রূপ নিলে তারা মনে করতে পারে বহু বছর আগে মতি মিয়ারে কীভাবে বিড়াল, বাঘ, গরু আর শুন্যে ওড়া নৌকায় ধরেছিল। আর মতি কি তখন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে নাই যে, রজবদাদার সঙ্গে যাওয়ার সময় প্রায়ই কে জানি মিছরি আর বাতাসা ছুইড়া মারে; আমরা হাতে নিলে মাটির ঢিল্!

আসলে ছেমড়াটার চেহারায় কী যেন আছে, নইলে তার উপর আসর হবে কেন? আর কবে নাকি তাকে আরেকবার পরীরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু রাখতে পারেনি বেশি দিন, কালাম জানে যে! পুরো সময়টাই সে চোখ বন্ধ করে ছিল, চোখ খুললে তো ফিরিয়ে দেয় না। তারা পছন্দ করে বিয়ে করে ফেলে। তো ঐ অবস্থায় তাকে কত কিছু খাইয়েছে, ফল মিষ্টি আরো কত কিছু! পরীরা যখন কিছুতেই ওর চোখ খোলাতে পরলো না তখন হাল ছেড়ে ফিরিয়ে দেয়। আর এই সুযোগে একবারের জন্য ও চোখ খুলে যা দেখেছে, চোখ জুড়িয়ে যাবার মত সব কিছু। সবুজ বনভুমি, পাশ দিয়ে বয়ে চলা শান্ত নদী আমাদের গাঙের মতই, আর গাছে গাছে কত যে ফল! সব রকম ফলে ভরপুর আর সেখানে কারো কোন দুঃখ নাই। দুঃখহীন এক জগত। যার যা খুশি করে বেড়ায়, খালি সুখ আর সুখ। এ সব বর্ণনা রজবের কাছ থেকে শোনেনি মতি, মতি এমন একজনের কাছ থেকে শুনেছে যে রজবের কেমন আত্মীয় আবার মাদ্রাসায় একই সঙ্গে পড়েছে। আর এ সব সংবাদ সেই আত্মীয় জনে জনে বলে বেড়ায়নি। বলে বেড়ায়নি তাতে কি, আজকের দিনে এসব এখন সবারই জানা আর ডালপালা তার বাড়তেই থাকে। তারপরও চন্দ্রভানু জাতীয় একজনের নাম ওর সাথে জড়ানো থাকায় কোথায় যেন একটু বিপত্তিও ঘটে।

ঠিক সাতদিন পর রজবকে পাওয়া যায় তার ঘরে। তাকে কেউ গ্রামে ঢুকতে দেখেনি, হলফ করেই সবাই জানে। রজব যথারীতি দাঁত মেসওয়াক করে দক্ষিণধারের বিলের দিকে মুখ করে, মাথার উপর বারমাসি তালগাছে পাকা তালের কাঁদি ঝোলে। রজবের চেহারা অমলিন, দৃষ্টি দিগন্তছোঁয়া। আর গ্রামের মানুষ সে দৃষ্টিতে কী কী আবিষ্কার করে সে সব তাদেরই ব্যাপার। রজবের সে সবে কোন আগ্রহ নাই। তাকে প্রশ্ন করা হয়, হুজুর শরীলডা ভালা? রজব প্রশ্নকারীর সমীহভরা দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে যত অবাক হয় তার চেয়ে বেশি অবাক হয় হুজুর ডাকে। বহুদিন সে এই গ্রামে, মুরুব্বিরা তো তাকে নাম ধরেই ডাকে, এমনকি তুই তুকারিও করে অনেকে। উত্তর দেয় সে, ভালা।

— কহন ফিরলা?
— রাইতে।

উৎসুক আরো দু’একজন কাছেই ছিল কিন্তু এবার তারা সরে বাতেনকেই প্রশ্ন করতে দিতে চায়। স্বভাবে ঠোঁটকাটা, যা ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পারবে। বাতেনের সঙ্গ খুবই বিরক্তিকর, ঠোঁটকাটা বেহায়া কিসিমের। সব সময় অশ্লীলে ভরা কথা নিয়ে চলাফেরা। এই বয়সেই পাঁচ ছেলের বাপ, রাতদিন  হুক্কা খায় আর মহিলাদের নিয়ে যত কুৎসিত মন্তব্য, এমনকি মসজিদের ইমাম হওয়া সত্ত্বেও এসব কথা রজবের সাথেও করতে চায়। এবার বাতেন রজবের হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে রজবের ঘরে নিয়ে যায়,
— কই আছিলা মিয়া? বিয়া করতে গেছিলা?
রজবের কি হয়, সে বলে, ক্যা, বাইতেই তো আছিলাম!
— শয়তানি ছাড়, কই আছিলা কও?
—তুমি তো ভালা মানুষ না, তোমারে উত্তর দিম্ ক্যা!
—তুমি কুদ্দুস ভাউরার অন্দর ঘরে আছিলা না?
রজব এবার চিৎকার করতে গেলে মুখ চেপে ধরে চাপা গলায় বলে, কই আছিলা ঠিক কইরা কও, সত্যি কতা কও, নাইলে কিন্তু ইমামতি ছুডাইয়া দিম্।
— বাইতেই আছিলাম, এই বাইতেই।
বাতেন এইবার কুৎসিত হাসে, নাকি সাবিহার ধানের গোলায় আছিলা, জামাইডা তো বাইতে নাই, খেপুপাড়ায় গেছে না আবার!
— পূবকান্দির মানুষ আপনে পশ্চিমকান্দির খবর রাহেন ক্যা?
রজব জোর করে ঘর থেকে বেরিয়ে দক্ষিণধারের ছিপটিমুড়ায় আবৃত পায়খানায় গিয়ে ঢোকে। যারা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল বাতেনের বয়ানের জন্য তারা রজবকে অনুসরণ করে আর ছিপটিমুড়ার নিচ দিয়ে পড়ন্ত বস্তুটা গু না তরল তাই পর্যবেক্ষণ করে গভীরভাবে।

Series Navigation<< উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর আটউপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর দশ >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *