উপন্যাস

উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব ছয়

ভরা বর্ষায় উত্তরধার দক্ষিণধার ছুঁইছুঁই বিলের পানি। বড়ো অত্যাচার এখন কুকুরের আর কৃমির। কদাচিৎ আক্রমণ পথভুলো কুমিরের আর নিয়মিত ভয়ংকর কলেরার। কাজিবাড়ির তিনদিনে তিনজন মরলে তারপর আসে মতলবের স্পিডবোট। ডজন ডজন প্রার্থী থাকলেও বোটে আর নিতে পারে কয়টা, চারটা নেয়, পথে মরে দুইটা, দুইটা কোন রকম পৌঁছাতে পারলে সে যাত্রা বেঁচে যায়। কালিবাজার টহল বোট অপেক্ষা করে থাকে আর আশপাশ এলাকা বাইল্যাকান্দি বৈশারচর, দতেরচর, ভবেরচর, শিমুলচর এলাকার রোগীদের নিয়ে তুলে দেয় স্পিডবোটে। একবারে ৪/৫ জনের বেশী ক্ষমতা না থাকায় তীর্থের কাকের মত বসে থাকতে হয় আরেকবার ফিরে আসার অপেক্ষায়। আর সাবিহা স্পিডবোটে মতলব কলেরা হাসপাতালে বিদেশীদের চিকিৎসা নিয়ে ফিরে এলে দারুণ এক কাণ্ড করে ফেলেছে বলে নতুন করে সবাই তাকে দেখতে আসে। মুখে নিরহংকার ভাব ফুটে উঠলেও মনে বড়ো গর্ব, খুব সম্ভব সেই প্রথম রোগিণী যে স্পিডবোটে চিকিৎসা ফেরত। মাত্র কয়েক মাস আগে যার স্বামীকে ভূতে পেড়ে ফেলেছে আর ছয় মাস না ঘুরতে তাকে যেতে হলো মতলব, তো এবার তাকে সহ পুরো বাড়ি বাঁধার চিন্তা আসে কাজির। মামলা মোকদ্দমারও বড়ো জটিল অবস্থা, সহসা বিহিত হওয়ার সম্ভবনা নাই।

 লাগাতার বর্ষায় এক অমাবশ্যার রাতে বাড়িতে আসে জিন। চালান দিয়ে নিয়ে আসে আডিলার মওলানা। ঘরে ঢুকতে জিন বেচারার তো মাথা ঠেকে যায় দরজার আড়ায়, তো কীভাবে ঘাড় কুজা করে ঢুকেছে তা ভাবতেই উপস্থিত মানুষের বড়ো কষ্ট। ঘরে ঢুকে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ, যেন কোথাও কোন খুব অপরাধ হয়েছে। ‘নাপাক দূর করিয়া সাবধান হও’ ঘোষ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সবাই যেন চমকে যায়, যেন কী সব অন্ধকার ঘরে জালের মত জড়িয়ে ধরেছে সবাইকে, যেন নাপাকের এই আস্তানা থেকে কারোই আর মুক্ত হওয়া সম্ভব না। অল্প সময় অথচ ভোগ করে  অনন্তকাল, কারো মুখই তো দেখা যায় না এই আলোতে! বাড়ির সবাইকে তিনি আখের গুড়ের সরবত খেতে বলে প্রথম চমক দিলেন, দ্বিতীয় চমক, রসি ঘরের কাঁরে মাটির কলসে মজুত গুড়ের সংবাদ পরিবেশন আর তৃতীয় চমক, বসতঘরের কাঁরে যে আইঠ্যাকলার কাঁদি পেকে আছে তা কি বাড়ির মানুষ ভুলেই থাকবে! তারা কী জানে না কত গুন এই কলার! আর এ সবের পরই শান্তি নেমে আসে কুয়াশাময় ভোরের মত। মনে হয় সব গ্লানি দূর হবে সহসাই, আর কোন ভয় নাই। তারপর সামান্য দোয়া-দরূদ ঝাঁড়ফুক তাবিজ তেলপড়া। যাওয়ার সময় কি মনে করে কোলে নেয় মমতাজের মেজো পুত্রকে। গম্ভীর গলায় বলে, অবহেলা না করে এরে মানুষ করেন আম্মা, এ আপনের মান বাড়াইবে। চলে গেলে ছয় বছরের পুত্রকে সামনে নিয়ে মমতাজ কত কি যে প্রশ্ন করে, আর ছেলে ছাগল দেখিয়ে বলে, হের গায়ে এমন লোম, আঙ্গুল ডুইব্যা যায়! জিন কোলে নেয়ায় ছেলেকে সবাই সমীহ করলেও ছেলের ভিতর বিশেষ ভাবগতিক না দেখে অনেকেই হতাশ। নানা প্রকার জিজ্ঞাসায় বিরক্ত জাকের শেষ পর্যন্ত বলে ওঠে, আমার কাছে হেয় আবার আইব!

কিন্তু পর দিনই ঘটে ঘটনা, এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে কিনা আজকে মনে করতে ঠিক পারে না বয়স্করা! খুব সকালে জাকেরকে বিছানায় খুঁজে পায় না মমতাজ, প্রথমে ভাবে আমসিপারা পড়তে গেছে মক্তবে কিন্তু কেমন খটকা লাগে। না ডেকে দিলে তো সে নিজ থেকে উঠতেই পারে না। তাছাড়া বড়ো ছেলেটা তো তখনও বিছানায়। আলো ফুটেছে কি ফোটে নাই, বর্ষার প্রভাত বোঝা দায়। গাছপালা ঘরবাড়ি উঠান নাড়াবিচালি সবই খুব ভেজা আর স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। দক্ষিণধারে এসে দ্যাখে ছেলে মোরতাকের ঝোড় থেকে পায়খানা সেরে বেরিয়ে আসছে। মাকে দেখে পেটে হাত দিয়ে বসে পড়ে জামগাছটার গোড়ায়। দু’হাত দূরেই বর্ষার প্লাবনের পানি, বদনা ভরে আনে ছেলের জন্য। ছেলের উঠার ভাব নাই, পায়খানা করছে কি করছে না তাও বোঝা যায় না। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলে ছেলে বলে, মা হাপ বাইরায়, দেহ কত বড়ো হাপ। কুন্ডলী পাকানো দলা থেকে একটা বেরিয়ে ভেজা মাটিতে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলতে থাকে। সেদিকে খেয়াল দিতে গিয়ে ছেলেকেই মা আর খেয়াল করে না। তারপর একই সাপ বেরিয়ে আসে তার নাক দিয়ে মুখ দিয়ে, নাকি সারা শরীর দিয়ে মমতাজ আর কিছু দেখার চেষ্টা না করে শুধু চিৎকার করলে সেই ভোরে, নাকি ভোরের মতো সকালে শিমুলচরের কাজিবাড়ি মিয়াবাড়ি মাস্টারবাড়ির অনেকেই এসে তা দেখতে থাকে। একবাক্যে গতকালের জিনের আশীর্বাদ বলে ধরে নেয় বর্তমান পরিস্থিতি। কিন্তু নাক দিয়ে অর্ধেক বেরুনো একটা সাপ যে আর না বেরিয়ে তার প্রাণ বায়ু কেড়ে নিচ্ছে সেদিকে কারো খেয়াল নাই একেবারেই। তারপর সামান্য তরপাতে তরপাতে ঢলে পড়ে ভেজা জামগাছের গোড়ায়। মমতাজ বেগম বুঝি তখনও বিশ্বাস করবে এ সবই কোন অশরীরী শরীর বেশধারীর আশীর্বাদের অংশ! তারপর ভাওয়াল চকের কবরস্থানে নিয়ে যেতে যেতে সব দোষ পড়ে সাবিহার উপর,  চালান দেয়া জিনের এখানে কোন ভূমিকাই নাই এ কথা কে বিশ্বাস করবে! আর বাড়ি ভরা মানুষেরা কান্নায় অংশগ্রহণ করলেও খালা হওয়া সত্ত্বেও সাবিহা বসে বসে সূচিকর্মে লেখে ‘পাখি উড়ে যায়, নীচে পড়ে ছায়া, মানুষ মরে যায়, রেখে যায় মায়া’।

আর সেই বর্ষায় বড়ো বেশী কুকুরের উপদ্রব, এমনকি কামড়াতে কামড়াতে আর বুড়া-কড়া বাছবিচার না করলে কুকুরের বিরুদ্ধে এক বিরাট বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা নেয় শিমুলচরবাসী। গ্রামবাসীর আর দোষ কী, ঘরে ঘরে কুকুরে কামড়ানোর সংখ্যা আশংকাজনক হারে বাড়লে পিঠে ঝাড়ফুঁক করা কাঁসার বাটি বেঁধে ছেলে বুড়ারা যে ভাবে বসে থাকে তা বড়োই বিরক্তিকর। বেওয়ারিশ কুকুরে গ্রাম একেবারে ছেয়ে গেলে পরিকল্পনা মতো কুকুর ধাওয়া করার কার্যক্রম হাতে নেয় যুবকেরা। কুকুর ধাওয়া করে পানিতে নামাবে, তারপর লম্বা বাঁশের লগি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরেই ফেলার চেষ্টা নিবে। ভাগ্যের জোর থাকলে পালাবে নয় মরে ভাসতে থাকবে বিলের কালো পানিতে। দু’একদিনেই মরে গন্ধ ছড়াবে, কলসি নিয়ে দক্ষিণধারে পানি নিতে এসে দেখবে কুকুরটা তার দিকে তাকিয়ে জোয়ারের পানিতে ভাসছে ডুবছে। বউগুলিও বেশ, লগি এনে ধাক্কা দিয়ে হাত কয়েক দূরে ঠেলে দিয়েই কলসি ভরে নিয়ে আসবে খাওয়ার পানি।

গ্রামবাসীর এই কুকুর খেদানো উৎসবের নেতৃত্ব দেন মাস্টার, প্রাইমারি স্কুলের উচ্চশ্রেণি, মানে থ্রী-ফোর-ফাইভের প্রায় যুবক ছাত্র সব। সীমাহীন উদ্দীপণায় দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হৈহৈ রব করে ঝাঁপিয়ে পড়ে বনেবাদারে। মুড়ির টিনে বাড়ি দিয়ে বহুমানুষের বিচিত্র চিৎকার চেঁচামেচিতে যেন রণক্ষেত্র, যেন সেই বহু বহু বছর আগে চর দখলের দৃশ্যেরই মহড়া। এত কুকুর যে এ গাঁয়ে, তা কি করে মানুষ জানল সেটাই আশ্চর্য! তবে সবচেয়ে আশ্চর্য, কুকুরদের তাড়িয়ে বাড়ির বার করা লাগেনি তারা বিকট শব্দেই বুঝে গেছে বছরকার কুকুর মারা কাজে মানুষ বেরিয়েছে, এবার রক্ষা নাই। হয় পালাও, নয় মরো। প্রথম কাজ তারা জানে, কোন দিকে না তাকিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে বিলের কালো পানিতে তারপর ঘন পানাশেঁওলাদাম উজিয়ে সাঁতরে চলে যেতে হবে দূর। কারণ কাছাকাছি নৌকা থেকেও আক্রমণ আসে খুব, বাড়ি দিবে মাথা বরাবর অসূরের মত গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে। এক বাড়িতেই তলিয়ে যাবে বিলের পানির তলদেশে, খাবি খেয়ে উঠতে চাইলে আর মাত্র একটা বাড়িরই প্রয়োজন হয়। কুকুর খেদানো উৎসবে নারী-পুরুষ কম বেশী সবাই অংশ নিলেও সরকারবাড়িরই কেবল সদর দরজায় খিল আঁটা থাকে। চন্দ্র খবর পায় সকালেই, এমন ঘৃণ্য একটা জীবকে মেরে তাড়ানই তো উচিত। টাটকা গু চেটে খাওয়া আর যাকে তাকে কামড়ে দেয়া ছাড়া এই প্রাণীর আর কী কাজ তা সে বুঝতেই পারে না! তো তার এক প্রকার নীরব নির্দেশেই কেউ অংশ নেয় না তাতে, এমন কি বাড়ির বাইরেও যায় না কেউ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মল্লমমাঝির বাড়ির নেড়ি কুত্তাটা পালাতে গিয়ে কুদ্দুসকেই দংশায়! কুদ্দুস যে কখন বেরুল আর কখন তামাশা দেখতে দক্ষিণধারের মাটির ঢিবিটায় উঠে দাঁড়াল, খেয়ালই করল না বাড়ির কেউ!

  কুকুরে কামড়ানো কুদ্দুসকে এবার ঘরে ডুকতে দেয় না চন্দ্রভানু। সাফ্ কথা, আমার বমি আসে। আর বাড়ির লোকজন জানে একবার চন্দ্রভানু বমি শুরু হলে থামানো খুব মুশকিল। তারপর আর কী, কবিরাজ আসে, ঝাড়ফুঁক হয়। টানা চল্লিশ দিন সে বাপের ঘরে আলাদা চৌকিতে রাত কাটায়। দিন কাটায় কাচারি ঘরে নানা পদের ঔষধব্যঞ্জণ সেবন করে আর পিঠে কাঁসার বাটি আটকে।

Series Navigation<< উপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব পাঁচউপন্যাস─ চন্দ্রভানুর পিনিস। নাসিমা আনিস─ পর্ব সাত >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *