ছোটগল্প

মুক্তিযুদ্ধের গল্প।। দুলিসুন্দরের ধূলি।। সাদিয়া সুলতানা


ধূলির ঘূর্ণির ভেতরে নিমজ্জিত থাকা পলকা দেহটা সাঁই করে বেরিয়ে আসে। অস্পষ্ট অবয়বটা ক্রমে স্পষ্ট হয়। দুলিসুন্দরের পথে ঘাটে নেচে-কুঁদে সে কী যেন জানাতে চায়। হয়তো বলতে চায়, এই পথ ধরে হানিকুল একদিন ঠিকই ফিরে আসবে।
দুলিসুন্দর গ্রামের হানিকুলের খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। হানিকুলের শোকে ওর মা হাচিনা খাতুন এত বছর ধরে পাগলপ্রায়। প্রায় না বলে এখন পূর্ণ পাগলই বলা যায় হাচিনাকে। এই তো এই স্কুল মাঠে দাঁড়ানো অবস্থাতেই চোখে পড়ছে তার পাগলামির নিশানা।
পথে পথে ধূলি উড়াচ্ছে হাচিনা। ধূলির ঘূর্ণি হাওয়ার মই বেয়ে আসমানে ওঠার পাঁয়তারা করছে। হাচিনার মুখ, চুল, হাত-পা সব সাদা হয়ে গেছে। মলিন শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। ভোর হতে না হতেই সে প্রতিদিনের মতো ঝাড়ু হাতে বেরিয়ে পড়েছে। দুলিসুন্দরের পথে পথে ছড়ানো ধূলি, ময়লা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছে। দুলিসুন্দরের ধূলিও সুন্দর। তবু হাচিনার এই বেগার খাটুনি করা চাই। হানিকুলের আশায় পথ চেয়ে চেয়ে দিনভর সে রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার করে চলে। ওদিকে নিজের ঘরে রাজ্যের ধূলি,
ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে আছে।

রাত ছাড়া ঘরমুখো হয়ই না হাচিনা। ক্লান্ত হলে শত জনমের চিনপরিচয় থাকা স্কুলের প্রবেশদ্বার সংলগ্ন জাম গাছের নিচে বসে। প্রকাণ্ড গাছটা সাগ্রহে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে হানিকুলের মায়ের দেহ জুড়িয়ে দেয়।
আজও দেহ জুড়িয়ে নিচ্ছে হাচিনা। বছর তিন আগে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের জন্য প্যান্ডেল করার সময় গাছের গোড়ার মাটি খুঁড়ে বাঁশ গাড়তে গিয়ে একটা লোহার বাকশো বেরিয়ে এসেছিল। বাকশের ভেতরে থ্রি নট থ্রি রাইফেলের তিনশ চল্লিশটা গুলি উদ্ধার করা হয়েছিল। মরিচা পড়া অকেজো গুলি উদ্ধারের ঘটনা স্ব চোখে দেখার পর থেকে এই জাম গাছের সঙ্গে হাচিনার ঘনিষ্ঠতা আরও বেড়ে গেছে।
গাছের কা- জড়িয়ে ধরে খরখরে বাকলে চুমুর পর চুমু খায় হাচিনা। ফুট তিনেক উঁচুতে থাকা খোড়লের ভেতর থেকে একটা রাগী ধনেশ পাখি ঠোঁট বাড়িয়ে হাচিনাকে পরখ করে। ভাবগতিক দেখে বোঝার চেষ্টা করে, এই নারী তার ছাওয়ের কোনো ক্ষতি করতে এসেছে কি না। বুঝেশুনে লাল ঠোঁট বাড়িয়ে সে পুরুষ সঙ্গীর মুখ থেকে খাবার তুলতে শুরু করে। হাচিনা ওদের কাণ্ড দেখে খুশি হয়ে লাফিয়ে উঠে আবার ঝাড়ু হাতে তুলে নেয়।
আগের মতো শরীরে জোর পায় না বলে ঝাড়ু দিতে দিতে হাতের গতি মন্থর হয়ে আসে, তবু দমে না হাচিনা। তার সাত রাজার ধন, বুকের মানিক হানিকুল কবে বাড়ি ফিরবে, তার ঠিক তো নেই, পথঘাট সাফসুতরো থাকা চাই। ঘরের দিকে কে তাকায়, ঘর থাকুক ঘরের মতো। ঐ ঘরে কে আছে, কী আর আছে হাচিনার! এক পুঁটলিতে মোড়ানো কাঁথা, কাপড়, সুঁই-সুতা আর একাত্তরে নিরুদ্দেশ হওয়া স্বামীর লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, স্যান্ডেল। আরেক পুঁটলিতে গোঁজা মাদুলি, তাবিজ, বিষ বেদনার মালিশ, এক জোড়া টিনের
থালা, গ্লাস এই তো।

হাচিনার ঘরে দরজাই নেই। দরজা নেই বলে চোরের উৎপাতও নেই। একটা সময়ে মানুষের উৎপাত ছিল। মানুষ না ঠিক, সুযোগসন্ধানী পুরুষ মানুষ। কারও মোহ, প্রলোভনের কাছেই নত হয়নি হাচিনা। সন্দেহ করি, নত হবে না বলেই সে পাগল হওয়ার ভান করেছে এককালে; দুলিসুন্দরের ধূলি, মাটি, কাদা শরীরে মেখেছে। ভান করতে করতে একসময় হানিকুলের মা হাচিনা সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেছে।
এই দেশের একজন বিখ্যাত লেখক বলতেন, পাগল হলো একটা গ্রামের শোভা। পাগলের পাগলামি দর্শনার্থীদের না দেখালে গ্রামের সম্মান রক্ষা হয় না। হাচিনা ছাড়াও দুলিসুন্দর গ্রামের সম্মান রক্ষা হয় না। এই তো এই বছর ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মোটা মোটা হরফে স্থানীয় সব পত্রিকার প্রথম পাতায় হাচিনার সংবাদ ছাপা হয়েছিল। দুই দুইটা জাতীয় পত্রিকার পঞ্চম আর ষষ্ঠ পৃষ্ঠার দেশ ও জনপদের জন্য বরাদ্দ তিন আর চার নম্বর কলামের একেবারে নিচে ছবিসহ স্থানীয় সাংসদের হাত থেকে হাচিনার বিশ হাজার টাকার চেক নেওয়ার সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। যদিও ঐ চেক ভাঙানোর মতো কোনো উপায় হাচিনার জানা না থাকায় সেটার স্থান হয়েছে ওর চুলার পাশে ঠেক দিয়ে রাখা খড়ির পালার ভেতরে।

দুলিসুন্দর গ্রামের চ্যাংড়া দলের সর্দার মোতাহার অবশ্য বলেছিল, ‘দাও চাচী, চেকটা ভাঙানির ব্যবস্থা কইরা দেই।’ কিন্তু হাচিনা ওর কথা বিশ্বাস করবে কেন? বিশ্বাস করে করে জীবনভর বহু ঠকেছে সে। তাই তো পরোপকারী মোতাহারকে সেদিন ঝাড়ু হাতে তাড়া করেছিল হাচিনা। হাচিনা মাঝেমধ্যে এভাবেই পথে পথে একে তাকে তাড়া করে। আবার হঠাৎ হঠাৎ ‘মিলিটারি আইছে, পালাও পালাও…’ চিল চিৎকার করে ছোটে। শোনা যায়, আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে এভাবে চিৎকার করতে করতে হাচিনার শাশুড়ি সদ্য প্রসূতিকে ঘরে রেখে এগারো দিনের শিশু হানিকুলকে কোলে তুলে পালিয়েছিল। সেই থেকে হানিকুলের সন্ধানে আছে হাচিনা। যদিও হানিকুল আর ওর দাদির অন্তর্ধানের পর আরও একবার হাচিনার গর্ভসঞ্চার হয়েছিল তবু প্রথম সন্তানের জন্যই হাচিনা পাগলপারা।
কেউ ওসব কথা মনে করালেই ঝাড়ু হাতে তেড়ে যায় সে। হাচিনার ঐ সন্তানও কোলছাড়া হয়েছে, আঁতুড়ঘরে মরেছে। দুলিসুন্দরের ময়মুরুব্বিরা বলে, ‘মরছে, ভালো হইছে। হাচিনা বাঁচছে, ওর শরীর থেইকা নাপাক রক্ত সাফ হইছে।’ এদের কথা শুনতে শুনতে পথে পথে ঝাঁটা মারে হাচিনা আর গুনগুন করে, ‘আমার নাম হাচিনা/মিলিটারিরে পুছি না/ও হাচিনা তোর ছাও কই/মিলিটারির বাপ কই/মিলিটারির বাপ জেলে/হাচিনার ছাও খেলে।’ নিজের ছাওয়ের নামটি ছাড়া পেছনের কথা তেমন কিছুই আর মনে করতে পারে না হাচিনা। মনে করতে পারে না বা চায় না বলেই হয়তো সবাইকে চমকে দিয়ে হুটহাট সে ময়লা দাঁতে ঝিলিক তুলে হাসে। সহসা অমন হাসির শব্দ শুনে লালঠুঁটি মা ধনেশ পাখিটি খোড়লের ভেতরে ঢুকে ছানাকে আড়াল করে। পথচারীরা এলোমেলো পা ফেলে। পায়ের ঘায়ে দুলিসুন্দরের পথ ধূলিতে ধূসরিত হয়ে ওঠে।
ঐ মেঠো পথেই কালো ধোঁয়া আর সাদা ধূলি উড়িয়ে একদিন মিলিটারিদের গাড়ি এসেছিল। গাড়ির চাকা, বনেট ধূলিতে সাদা হয়ে গিয়েছিল। ঘুরঘুর ঘুরঘুর চাকা থামলে হেলমেট পরা, রাইফেলধারী মিলিটারিরা নেমেছিল মাটির রাস্তায়। তাদের দেখে দুলিসুন্দরের মানুষেরা ঘরবাড়ি ছেড়ে টাটিয়ার জঙ্গলের দিকে ছুটতে শুরু করেছিল। রিফিউজি ইসহাক আর তার লোকেরা মিলিটারিদের সঙ্গে করে জঙ্গলের ভেতর থেকে মানুষ খুঁজে খুঁজে বের করে এনেছিল। ভয়ার্ত মানুষগুলোকে সান্ত্বনা দিতে দিতে রিফিউজি ইসহাক চিৎকার করছিল, ‘ভয় পেয়ো না, কারও কিছু হবে না।’ এরপর দুলিসুন্দরের একান্ন জন পুরুষকে হত্যা করে স্কুলের মাঠে মাটি চাপা দিয়েছিল ওরা। যেই মানুষগুলোকে মিলিটারিরা বন্দুকের নল চেপে, বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে, বাঁট দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছিল, ওদের মধ্যে কি হাচিনার স্বামীও ছিল? জানা নেই হাচিনার, মনে নেই। দুলিসুন্দরের মানুষগুলোরও তেমন কিছু মনে নেই। শুধু মনে আছে, মিলিটারিরা গ্রাম ছাড়লে রিফিউজি ইসহাকের লাশটা পাওয়া গিয়েছিল স্কুলের মাঠে। আর একলা ঘরে মাসের পর মাস নির্জীব পড়ে ছিল হাচিনা।

থকথকে স্রাবে বিছানা ভেসেছিল, দুর্গন্ধে ভরেছিল ঘর। ঐ বর্জ্যরে ভেতরেই কি রক্তস্নাত একটা মানব শিশু শুয়েছিল? ধাঁধা লেগেছিল চোখে। কেউ শিশুটিকে দ্বিতীয়বার দেখতে পায়নি। শিশুটির কান্নাও শোনেনি। কাছে ভিড়তেও সাহস করেনি কেউ। ঐ ঘর ছেড়ে যেদিন বেরিয়ে এসেছিল হাচিনা সেদিন ওর চুলহীন, কংকালসার দেহকাঠামোটা দেখে দুলিসুন্দরের মানুষগুলো ভয়ে ছুটে পালিয়েছিল। এখনো অশান্ত হাচিনাকে দেখলে ওরা ছোটে, পালায়।
চৈত্রের উজানি রোদে ঘাড়, পিঠ পুড়ে খাক হয়ে এলে শান্ত হয় হাচিনা। ঘরে ফিরে চুলা ধরিয়ে এক কৌটা চাল ফুটিয়ে নেয়। ধোঁয়া ওঠা ভাত ধূলি মাখা মুঠোতে চেপে চেপে বল বানিয়ে সামনে হাঁটতে থাকা শালিকের দলের দিকে ছুঁড়ে দেয়। নিজের আর শালিক দলের খাওয়া শেষ হলে পুনরায় কাজে নামে সে। হুট করে কেঁপে ওঠে পথটা। মনে হয় মস্ত এক অজগরের পিঠে বসে আছে গোটা দুলিসুন্দর গ্রাম।
হাওয়া গুমরে ওঠে। অসময়ের গুমরানি দেখে ভয় হয়। কিছু একটা হবে আজ। কী হবে? ঐ শালিকের দল বোঝে না, লালঠুঁটি ধনেশ পাখি বোঝে না। হাচিনাও বোঝে কী বোঝে না, ধূলির উড়ানে চারদিক তোলপাড় করতে করতে ভূতুড়ে কণ্ঠে চিৎকার করতে থাকে, ‘আমার হানিকুল আইলে সব কয়টারে দেইখা নিবো…ও হানিকুল তাড়াতাড়ি আয় বাপ।’ হানিকুলের মায়ের আহ্বানে রাশি রাশি ধূলিকণা আলোর কার্ণিশে ঝুলে মাতম জোড়ে, ‘আয়…আয়…আয়…’
ঐ ডাক শুনেই যেন হানিকুল ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসবে, মায়ের পাত বিছানো পাটির ওপরে হাত পা ছড়িয়ে বসে খেয়েদেয়ে কোমর বেঁধে যুদ্ধে নামবে। ময়লার আস্তর পড়ে গেছে হাচিনার চোখে, তবু দৃশ্যটা সে জ্যন্ত দেখতে পায়। দেখে দেখে খুশি হয়ে নেচে গেয়ে করিৎকর্মা মানুষটির মতো ঝাড়ু দেওয়ার কাজে মন দেয়। আছরের ওয়াক্তের বিষণ্নতায় হঠাৎ কানাকানি শুরু করে এক ঝাঁক শালিক। এক শালিক, দুই শালিক, তিন শালিক….গুনতে গুনতে পলকে ওরা দলছুট হয়ে যায়। দৌড়াতে দৌড়াতে তখনই এক দল বালক খবর নিয়ে আসে, স্কুল মাঠে ঝাড়ু হাতে হাচিনা পাগলির দেহ নিথর পড়ে আছে।
অবশেষে হানিকুলের মা হাচিনা খাতুনের প্রতীক্ষার প্রহরের সমাপ্তি ঘটে। দুলিসুন্দরের আবালবৃদ্ধবনিতা স্বস্তির শ্বাস ফেলে। হাচিনার লাশও নামে কবরে।
কবরে লাশ নামানোর অগ্রবর্তী দলে থাকে মোতাহার। হাচিনার দুবলা শরীরটা কাফনের ভেতরে আছে কী নেই বোঝা মুশকিল হয়ে যায়। লাশটা মাটিতে শোয়াতে শোয়াতে মোতাহার আর তার সঙ্গীর হাত অহেতুক কেঁপে কেঁপে ওঠে। ক্ষণে ক্ষণে ওদের মনে সংশয় জাগে, সাদা কাফনের ভেতরে সত্যি সত্যি হাচিনা খাতুনের লাশ আছে তো?
ওদের সংশয়কে বাড়িয়ে তুলে পাশ থেকে বিষণ্ন স্বরে কে যেন বলে ওঠে, ‘হানিকুলরে ছাড়া কবরে নামবো না নিয়ত করছিল হাচিনা, আহারে কই গেল ছেলেটা! মায়ের কবরে মাটি দিতে পারল না!’

হাচিনার ছেলে হানিকুল আসে না। হাচিনার লাশ কবরে নামে। মাটির শরীর মাটিতে ঢাকা পড়ে গেলে দুলিসুন্দরের পথে পথে উড়তে থাকা ধূলির রাশি চিরকালের মতো নিস্তেজ হয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *