ছোটগল্প

মুক্তিযুদ্ধের গল্প।। গ্রেনেড ফল।। প্রিন্স আশরাফ


মুক্তিযোদ্ধাদের ইনফর্মার মুকুল। ওর বয়স এগারো। মুক্তিযোদ্ধা পলাশদের দলের ইনফর্মার হিসাবে কাজ করে। কমান্ডার পলাশ আজ ফেরিওয়ালা সেজে এলাকা রেকি করছে। তাই দেখে মুকুল কৌতুহলের সাথে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার ওই ফেরিওয়ালার থালির নিচে পিস্তল আছে? ব্রিজের উপরের দুজনকে গুলি করবেন নাকি?’
পলাশ দুদিকে মাথা নেড়ে বলল, ‘উহু। একটা দুটো মেরে ওদেরকে ক্ষেপিয়ে তোলার ইচ্ছে নেই। গোটা দলটাকে একসাথে ঘায়েল করার পরিকল্পনায় এগুচ্ছি আমরা। এদিকের অবস্থা কি? মিলিটারিরা আগের মতই স্কুল কম্পাউন্ডেই আছে।’ ‘হু। আছে। তবে আগের চেয়ে একটু পাহারা কমেছে মনে হয়। সেদিন সন্ধ্যেয় ওদিক থেকে আসার সময় মাত্র দুজন দেখলাম। পেছনের পাচীলের দিকে কেউ ছিল না।’ ‘শোন, আমরা যেকোন রাতে তোদের স্কুল আক্রমণ করতে যাচ্ছি। আর সেক্ষেত্রে তোকে স্কুলের কোন দিকে কি আছে খুব ভালভাবেই আমাদের জানাতে হবে। পারবি না?’ ‘পারব না মানে? স্কুল আমার খুব চেনা। কতবার স্কুল পালিয়েছি।’ ‘ঠিক আছে। আমি তোর কাছ থেকে জেনে নেব। তার আগে শোন, স্কুল আক্রমণ করতে গেলে আমাদের অনেক অস্ত্রপাতি লাগবে। বিশেষত গ্রেনেড। কালকে নদীপথে গ্রেনেডের একটা চালান আসবে। কিন্তু
সেটা আমরা এর ভেতর দিয়ে বয়ে নিয়ে যেতে পারব না। গ্রেনেডের চালানটা তোকে নিয়ে স্কুল কম্পাউন্ডের পেছনে লুকিয়ে রাখতে হবে। রাতে স্কুল আক্রমণের সময় আমরা ওখান থেকে নিয়ে নিতে পারব। পারবি না?’
‘পারব।’
‘আর শোন, গ্রেনেডের চালানটা আসবে এক ঝুড়ি কামরাঙার নিচে করে। তুই নদীর তীর থেকে কামরাঙা ভর্তি ঝুড়ি নিয়ে যাবি।

বলবি বাড়িতে খাওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছিস। তারপর বাড়ির পিছনে জঙ্গলে নিয়ে রাখবি। ওখান থেকে আমার লোক এসে নিয়ে যাবে।’ পলাশ ব্রিজের দিকে তাকাল। এখান থেকে ব্রিজের উপরের মিলিটারিদের দেখা যাচ্ছে না। এদিকে আসছে কিনা কে জানে? সন্দেহ করলে বিপদ হতে পারে। নিরাপত্তার জন্য ওর গজার নিচে সত্যি সত্যিই পিস্তল রাখা আছে। পলাশ মুুকুলের হাফ প্যান্টের পকেটে এক মুুঠো গজা ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, ‘কাল জোহরের আজান দিলে তুই খেয়াঘাটে থাকবি। তোর কাছে কামরাঙার ঝুড়ি দেয়া হবে। কিন্তু খুব সাবধান কেউ যেন সন্দেহ না করে। কামরাঙার নিচে কিন্তু থরে থরে গ্রেনেড সাজানো।’

জোহরের আজানের অনেক আগেই মুকুল ছোট্ট খেয়াঘাটে ঘোরাঘুরি করছে। হাতে যথারীতি ঘুড়ি আছে। যাতে কেউ সন্দেহ না করতে পারে। দুপুরের রোদ খা খা করছে। খেয়া পারাপারে তেমন লোক নেই। একটা টাবুরি নৌকা দেখা গেল। মানুষের যাতায়াতে ব্যবহত ছোট নৌকা। ছই দেয়া। অল্প বয়স্ক মাঝি নৌকার হাল ধরে আছে। অল্পবয়স্ক
কিশোরদের মিলিটারিরা ঝামেলা করে না। বয়স্ক আর অল্পবয়স্করাই এখন কামকাজ বেশি করে। কিশোর মাঝি বেশ আয়েসী ভঙ্গিতে অনেক সময় ধরে নৌকা ঘাটে
বাধল। যেন তার কোন কিছুতেই কোন তাড়া নেই। নৌকার ভেতর থেকে পানি সেচল কিছুক্ষণ। বাজারের মসজিদ থেকে জোহরের আজানের ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসছে। কিশোর মাঝি নৌকা থেকে চরের কাদায় নেমে পড়েছে। হাত খালি। মুুকুল হতাশ হলো। আর একটু দেখবে। তারপর চলে যাবে। তখনই দেখতে পেল ছেলেটা একটা মাঝারি সাইজের ডালা ঝুড়ি নৌকার ভেতরে থেকে তুলে নিল। দুহাতে ডালাটা ধরে এগিয়ে আসতে লাগল তার দিকে। ছেলেটা কোন কথা না বলে ডালাটা মুকুলের হাতে দিয়ে দিল। সবুজ, হলদেটে সুবুজ বেশ পাকা পাকা কামরাঙায় ঝুড়ি ভর্তি। কিন্তু শুধু কামরাঙা থাকলে যেটুকু ভার হওয়ার কথা তার চেয়ে অনেক বেশি ভারী। ভারী হলেও মুকুল স্বাচ্ছন্দ্যের ভঙ্গিতে কামরাঙার ডালাটা ধরে এগুতে লাগল।

মুকুলদের বাড়ির দিকে যেতে গেলে ব্রীজ এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। ব্রীজের উপর উঠতে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাটার চেষ্টা করতে লাগল। যদিও তার বুকের মধ্যে ধুকপুক, আর মনের মধ্যে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। ‘ইয়া বাচ্চালোক, ইধার আও।’ ব্রীজের ওপাশ থেকে একজন মিলিটারি ডাক দিল।
মুকুলের বুকের মধ্যে এত জোরে শব্দ হতে লাগল, তার মনে হলো মিলিটারিরাও সে শব্দ শুনতে পাচ্ছে। মুকুল দুরু দুরু বুকে এগিয়ে গেল। ‘ইয়া কিয়া হ্যায়?’ মিলিটারি বন্দুকের নল তার ঝুড়ির কামরাঙার দিকে তাক করে বলল। ‘কামরাঙা।’ মুকুল ঢোক চিপে উত্তর দিল।
‘কিয়া করতা হ্যায়?’
‘ফল ফ্রুট হ্যায়। খ্যাতা হ্যায়।’ মুুকুলও উর্দুতে বলার চেষ্টা করল। এদের বাতচিৎ শুনে ওপাশের ডিউটি মিলিটারি এগিয়ে এলো। সে মুকুলের হাতের ঝুড়িতে কামরাঙা দিয়ে চমকে লাফ দিয়ে উঠল।
‘ইয়া গ্রেনেড হ্যায়।’ মিলিটারি বলল, ‘গ্রেনেডকা লোগ
দেখতা হ্যায়।’
মুকুলের ইচ্ছে করছিল কামরাঙার ঝুড়ি ফেলে ঝেড়ে দৌড় দিতে। কিন্তু সে ভাল করেই জানে, এদের কাছ থেকে ঝেড়ে দৌড় দেয়া মানেই মৃত্যু। কামরাঙার নিচে যে গ্রেনেড আছে তা হয়তো দেখতে পেয়েছে। কিন্তু মুকুলের সন্দেহ হলো। গ্রেনেড তো দেখতে পাওয়ার কথা নয়। সে তো দেখতে পায়নি। তাহলে কি ঝাকুনিতে কামরাঙা সরে গিয়ে গ্রেনেড বেরিয়ে পড়েছে?
মুকুল মিলিটারির কথা শুনে ফ্যাকাশে মুখে নিজেই ঝুড়ির দিকে তাকাল। তার ধড়ে পানি এলো। না কোন গ্রেনেড বা গ্রেনেডের মত কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। গ্রেনেড বস্তুটা কিরকম তা সে জানে না। শুধু শুনেছে, হাতের মুঠোয় ধরে ছুড়ে মারলে বিস্ফোরিত হয়ে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তাহলে ওরা কামরাঙাকেই গ্রেনেড ভেবেছে। কামরাঙা ফল ওদের কাছে অপরিচিত। ওগুলো যে খেতে হয় তাও বোধ হয় ওরা জানে না। খেয়ে দেখিয়ে দিলেই হয়। মুকুল বাম হাত দিয়ে পেটের সাথে ঝুড়িটা আকড়ে ধরে ডান হাতে সাবধানে একটা কামরাঙা তুলল। তারপর চোখ মুখ কুচকে কামড়ে খেয়ে বলল, ‘দেশী ফ্রুট। খাতা টক হ্যায়। আপলোগ খাইয়ে।’ বাবার সাথে থেকে থেকে সে কাজ চালানোর মত কিছু উর্দু শব্দ শিখেছে। তাছাড়া বাংলা বলেই শেষে হ্যায় যোগ করে দিলেই হয়। মুকুল নিজের কামরাঙাটা মুখে ধরে রেখে একটা তুলে ওদের দিকে বাড়িয়ে দেয়। প্রথমজন একটু ইতস্তত করে। তারপর মুখে নিয়ে কামড় দিয়ে মুখ বিকৃত করে ফেলে। কিন্তু ভাব দেখে মনে হয় মজা পাচ্ছে। তার দেখাদেখি দ্বিতীয়জন যে গ্রেনেড মনে করছিল সেও একটা সাবধানে তুলে কামড় দেয়। ওদের বোধ হয় এই ভর দুুপুরে খিদে পেয়েছিল। কারণ দেখতে দেখতে একের পর এক বেশ কয়েকটা কামরাঙা খেয়ে ফেলে। মুকুল শংকিত বোধ করে। এরকম স্পিডে খেলে কামরাঙা শেষ হতে সময় লাগবে না। কামরাঙা খেয়ে ফেললে ক্ষতি নেই। কিন্তু খেতে খেতে যদি নিচের গ্রেনেড
বেরিয়ে পড়ে। ওগুলোকে তো আর কামরাঙা বলে চালানো যাবে না। মিলিটারীরা গ্রেনেড চিনবে না তাতো হয় না। তখনই বিপদ আরো ঘনিয়ে আসে। শিফটিং ডিউটি হিসাবে
আরো দুজন মিলিটারিকে ব্রীজ ধরে এদিকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। এরা খেয়ে এসেছে। এখন ডিউটি করবে। ওরা খেতে যাবে। প্রথমদল উদুতে ব্যাপারটা কি বুঝিয়ে ওদের দুজনের হাতে কামরাঙা দেয়। ওরাও খেতে শুরু করে। এদিকে মুকুলের অবস্থা খারাপ। অনেকগুলো কামরাঙা সাবাড় করেছে। আরেক পরত পেরোলেই নিচে থরে থরে সাজানো গ্রেনেড পেয়ে যাবে। মুকুল কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। নতুন দুজনের অবশ্য আগ্রহ কম। খেয়ে আসায় পেটে জোর আছে। আর ভরাপেটে সুস্বাদু খাবারও বিস্বাদ লাগে। শেষ মেষ নিরুপায় হয়ে মুকুল আকুতি ঝরায়, ‘স্যার, আমার ছোটবোনের জন্য নিয়ে যাচ্ছি স্যার। ওগুলো না থাকলে ও খুব কান্নাকাটি করবে স্যার।’

মুকুলের কথায় কিছুটা কাজ হয়। একে অন্যের মুখ চাওয়াচায়ি করে। আর তখনও ওদের একজনের ওয়াকিটকিতে আওয়াজ ভেসে আসে। কিছু একটা নির্দেশ দেয়া হয়। সম্ভবত যাদের ডিউটি শেষ হয়ে গেছে তাদের চলে আসতে বলে। ওরা মুকুলকে ছেড়ে দেয়। মুকুল হাফ ছেড়ে বাচে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *