জয় বাংলা শিশুসাহিত্য উৎসব।। শিকারি।। সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্

 

– দাদু, একটা গল্প শোনাও না।

– কীসের গল্প, ভূতের?

– না, আজ মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনব।

দাদু কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

– মুক্তিযুদ্ধের কোনো গল্প হয় না রে। তখন যা যা হয়েছিল, সেসব কথা গল্পের ভাষায় নিয়ে আসা, আমার মত সাধারণের কম্ম নয়। তবে… গল্প শুরু করছি একটা, শোন।

– হ্যাঁ দাদু, মন দিয়ে শুনব।

খাদ্য শৃঙ্খলের চাপে পড়ে বাঘ মশাই একটা হরিণ শিকার করে বসলেন। অনেক কষ্ট হয়েছে একে শিকার করতে। ডানে গেলে বামে বাওতি কাটে, সোজা গেলে স্টিমারের মতোন ছুটে। কিন্তু বাঘের লক্ষ্য ছিল টনটনে। তাই শেষমেশ কাবু করতে পেরেছে। নইলে এমন তাগড়া হরিণ শিকার করা কি চাট্টিখানি কথা!

কথায় আছে না, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়? এখানে বাঘের জায়গায় হায়েনা বসিয়ে দিব আমরা। কারণ বাঘের আরামসে হরিণ খাওয়ার সময় এই শেষ হয়ে এল বলে!

বাঘ কত কষ্ট করে, বুদ্ধি খাটিয়ে, লক্ষ্য স্থির করে একটা শিকার ধরে। আর হায়েনা যেন ওৎ পেতেই থাকে, কখন বাঘ শিকার ধরবে আর সে তাতে ভাগ বসাবে! তুমিই বলো, অনেক কষ্ট করে কিছু পাওয়ার পর যখন তুমি সেটা নিজের কাজে লাগাতে পারো না, কতটা মন খারাপ হয়! বাঘেরও ঠিক একই দশা। হায়েনার দল এসে কি ভীষণ বিরক্ত যে করতে থাকে বাঘকে! আর হায়েনার হাসি যদি শুনতে, তাদের গায়ের গন্ধের চেয়েও ভয়ানক!

এভাবেই চলতে লাগল। যখনই বাঘ খেতে যায়, প্রায়ই হায়েনার দল খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে তার খাওয়া বরবাদ করতে আসে। কাঁহাতক এই যন্ত্রণা ভালো লাগে! তাই একদিন বাঘ রাগে গর্জন করে উঠল। হায়েনার দলকে বলল, ‘ বনে যেন কোন অশান্তি সৃষ্টি না হয় তার জন্য এতদিন তোমাদের কিছু বলিনি। কিন্তু তার মানে এই না, সারাজীবন তোমরা আমার খাবারে ভাগ বসিয়ে যাবে! এইবার ভালোয় ভালোয় বলে রাখছি, নিজের খাবার নিজে খুঁজে নাও। পরের বার এলে আমার এই ধারালো থাবার আঘাত থেকে কেউ রেহাই পাবে না!’

বাঘের এই হুঁশিয়ারি পেয়ে হায়েনার দল একটু ভড়কে গেল। যত কিছুই হোক, বাঘের জোর আর বুদ্ধির সাথে তো ওরা পারবে না। কিন্তু তাই বলে কি এত সহজে কেউ তার বাজে স্বভাব থেকে বের হতে পারে? আর বাঘের উপর নির্ভর করতে করতে কী করে যে নিজের খাবার জোগাড় করতে হয়, সেটাই তারা বেমালুম ভুলে বসে আছে!

তাই হায়েনার দল ঠিক করল, এবারে শুধু শিকারের আশায় হ্যাংলামি করলে চলবে না। চালাকি করে বাঘকে বিপদে ফেলে দিতে হবে। তারপর বাঘের শিকার করা খাবার গপাগপ খেয়ে নেয়া যাবে। এই পরিকল্পনা করেই তারা খুশিতে বিচ্ছিরি করে হেসে উঠল।

আজ পুরো এক দিন পর বাঘ একটা শিকার কব্জা করতে পেরেছে। আশেপাশে ইদানিং আর হায়েনা দেখা যায় না। তাই বাঘ খুব আয়েশ করে গা হেলিয়ে খেতে বসল। এদিকে হায়েনার ফন্দির কথা তো জানোই। আড়াল থেকে সবগুলো হায়েনা হুট করে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঘের উপর। এরকম হামলার জন্য বাঘ মোটেই প্রস্তুত ছিল না। শেষে তাদের ধারালো দাঁতের অত্যাচারে বাঘটা মরে গেল।

ঘটনাটা পৌঁছে গেল অন্য বাঘদের কাছে। বানর এক গাছ থেকে অন্য গাছে ঝুলে ঝুলে প্রচার করে বেড়ালো এই কথা। বাঘদের তো ভয়াবহ রাগ হল। এত সাহস হায়েনার, বাঘের প্রাণ নেয়! তাই সমস্ত বাঘ সম্প্রদায় হায়েনা জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। ঠিক হল, লড়াই করে যদি বাঘের দলের জিত হয়, তাহলে হায়েনার দলকে চিরতরে এই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হবে।

এমন ঘোষণা বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়ল সবার কানে। ‘ঠিক কাজ হয়েছে। হায়েনার যন্ত্রণায় আমরা সবাই অতিষ্ঠ। এবার হবে উত্তম বিচার।’

হায়েনার দল সত্যিই খুব ভয় পেয়ে গেল। যত কিছুই হোক, বাঘের সাথে তারা কোনোভাবেই পারবে না। তাও আবার রয়েল বেঙ্গল টাইগার! তাদের মুখ থেকে এবার ফ্যাচফ্যাচে হাসিখানা মিলিয়ে গেল।

কিন্তু হায়েনার কি ফিচলে বুদ্ধির অভাব আছে! লড়াই শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে, যখন সব বাঘ প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কয়েকটা হায়েনা গিয়ে বাঘের ছানাদের চুরি করে নিয়ে লুকিয়ে রাখল।

মা বাঘেরা তো খুঁজে খুঁজে হয়রান। কারো ছানা পাচ্ছে না। এখন বাঘেরা লড়াই করবে কি, ছানাদের খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল।

বনের টহলদার বনবিড়াল এসে হাজির হল বাঘ সম্প্রদায়ের সামনে। এসে বলল, ‘ আমি দেখেছি তোমাদের ছানাদের কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। লড়াইয়ে যেন তোমাদের মনোবল ভেঙে যায়, সেজন্য হায়েনারা লুকিয়ে রেখেছে তোমাদের শিশুদের।’

ব্যস, আর যায় কোথায়! ‘ হালুম ‘ ডেকে বাঘেরা ঝাঁপিয়ে পড়ল হায়েনার দলের উপর। সে কি লড়াই, যদি তুমি দেখতে দাদুভাই! পুরো বন যেন থত্থর করে কেঁপে উঠল। ভয়ে সবাই পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে। জানো তো, চোরের দশ দিন আর গৃহস্থের একদিন। ঠিক তাই হল এই লড়াইয়ে। বাঘের সাহস আর বীরত্বের কাছে হায়েনাদের চালাকি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল!

শেষে হায়েনাদের দলনেতা এগিয়ে এসে সবার সামনে মাথা নিচু করে বলল,’ হ্যাঁ, আমরাই বাঘের ছানাদের লুকিয়ে রেখেছি। কারণ সামনাসামনি যুদ্ধে বাঘের সাথে আমরা পারব না। ক্ষমা চাইছি তোমাদের কাছে, আমাদের ছেড়ে দাও। আর কখনও বাঘদের শিকারে ভাগ বসাবো না। এই বনে আর ফিরে আসব না।’ এই বলে হায়েনারা বাঘের ছানাদের ফিরিয়ে দিল আর লেজ গুটিয়ে এই বন থেকে চলে গেল।

– দাদুভাই, কেমন লাগল আমার গল্পটা?

নাতি গালে হাত দিয়ে বলল,

– দাদু, আমরাই কি সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার?

দাদু নাতির চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললেন,

– হ্যাঁ গো দাদুসোনা!

– তবে আমিও রয়েল বেঙ্গল টাইগার হব!

– আচ্ছা! কেন তুমি রয়েল বেঙ্গল টাইগার হতে চাও?

নাতি চোখ বন্ধ করে গলা ভারি করে বলল,

– যারা সাহসী, তাদের জয় হবেই। আর তাদেরকে সবাই ভালোবাসে, পাশে থাকে। আর যাদের স্বভাব হায়েনার মত, তাদেরকে সবাই ঘৃণা করে। তাই আমি বাঘের মত সাহসী হতে চাই।

দাদু মুচকি হেসে বললেন,

– রয়েল বেঙ্গল টাইগার,

আটকে রাখে! সাহস কার?

One thought on “জয় বাংলা শিশুসাহিত্য উৎসব।। শিকারি।। সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্

  • মার্চ ১১, ২০২১ at ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ
    Permalink

    – রয়েল বেঙ্গল টাইগার,

    আটকে রাখে! সাহস কার?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.