কবিতাই আমার প্রথম প্রেম, প্রথম আহ্লাদ : ফারুক সুমন

ফারুক সুমন। ১৯৮৫ সালের ১ মার্চ চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার অন্তর্গত শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় দেয়ালিকায় ছড়া ও কবিতা দিয়ে লেখালেখির হাতেখড়ি। তখন শিল্পসাহিত্যে আনাড়ি এই বালকের নতুন বিস্ময় ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ এখানে এসে কিছু সৃষ্টিশীল গুণী মানুষের সংস্পর্শ তার ভাবনাবিশ্বকে প্রবল ভাবে আলোড়িত করে। প্রয়াত নাট্যকার, নাট্যাচার্য সেলিম আলদীন, কবি মোহাম্মদ রফিক, কবি খালেদ হোসাইন, লেখক ও গবেষক আবু দায়েন, কবি ও গল্পকার রায়হান রাইন, কবি হিমেল বরকত, কবি সুমন সাজ্জাদ প্রমুখ ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য তাঁকে শিল্পের সড়কে হাঁটতে শেখায়। ছাত্রাবস্থায় যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন সাহিত্য সংশ্লিষ্ট ছোট কাগজ ‘অক্ষৌহিণী ‘। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক পাঠচক্র ‘কালবোধন’ এর সংগঠক ছিলেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে যথাক্রমে স্নাতক (২০০৫), স্নাতকোত্তর (২০০৬) প্রথম শ্রেণি এবং উচ্চতর এম. ফিল. (২০১৪) ডিগ্রি অর্জন করেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। কবিতার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ থাকলেও মননশীল গবেষণার প্রতি তিনি সমান আগ্রহী। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ গবেষণা-কেন্দ্রিক। গ্রন্থের নাম ‘শামসুর রাহমানের কবিতা: নগর-চেতনা ও নাগরিক অনুষঙ্গ ‘ (২০১৫)। এই গ্রন্থের জন্য তিনি “উপমা-খোলাচিঠি সম্মাননা- ২০১৬” লাভ করেন। এছাড়া একাডেমিক কৃতিত্বের জন্য ২০০৬ সালে “নিপ্পন ফাউন্ডেশন অব জাপান” থেকে শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি হিসেবে ‘সার্ক সাহিত্য সম্মেলন’-এ যোগ দিয়েছেন। পরিচিত মহলে একজন আবৃত্তিকার হিসেবে তাঁর সুনাম রয়েছে।

ফারুক সমুনের প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ:

১. “শামসুর রাহমানের কবিতা: নগর-চেতনা ও নাগরিক অনুষঙ্গ”, (গবেষণাগ্রন্থ) প্রকাশক- রাবেয়া বুকস, প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০১৫।

২. “অচঞ্চল জলের ভিতর নিরাকার বসে”, (কাব্যগ্রন্থ) প্রকাশক- ভিন্নচোখ, প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০১৭।

৩. “আঙুলের ডগায় সূর্যোদয়”, (কাব্যগ্রন্থ) প্রকাশক- ভিন্নচোখ, প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০১৮।

৪. “শিল্পের করতালি”, (প্রবন্ধগ্রন্থ) প্রকাশক- ভিন্নচোখ, প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি ২০১৯

কর্মজীবন:
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র’-এ ইউনিট ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও শিক্ষকতাই তার আসল ব্রত। তিনি যথাক্রমে ‘গুলশান কমার্স কলেজ’ এবং ‘কুইন মেরী কলেজ’- এ বাংলা বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে ‘বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ’ (রাইফেলস কলেজ, বিজিবি সদর, পিলখানা, ঢাকা)- এ বাংলা বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

সাহিত্য জীবনের নানা বাঁকবদলের দিক নিয়ে ফারুক সুমন মুখোমুখি হয়েছিলেন সাহিত্য বিষয়ক ওয়েবম্যাগ কাব্যশীলন এর। নির্দ্বিধায় কথা বলেছেন কবি ও সাংবাদিক শব্দনীলের সঙ্গে।

কাব্যশীলন : সমকালীন বাংলাদেশ কতটুকু ভালো রেখেছে আপনাকে?

ফারুক সুমন:

সমকালীন পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় খুব একটা ভালো নেই। যেন সুতোর ওপর দাঁডিয়ে আছি। চারিদিকে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের অবয়ব। করোনার এই আকালে ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সবাই দিশেহারা। পারস্পরিক সম্পর্কগুলো নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। করোনাক্রান্ত সন্তানের কাছে যেতে পারছেনা মা-বাবা। অসুস্থ স্বামীর পাশে দাঁড়াতে পারছে না স্ত্রী। পিতার লাশ হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যাচ্ছে সন্তান। মৃতদেহ কবরস্থ করার অনুমতি দিচ্ছে না গ্রামবাসী। মানবিকতার এমন অবর্ণনীয় বিপর্যয় দেখে বিপর্যস্ত অবস্থায় দিনযাপন করছি। প্রতিনিয়ত অদৃশ্য এক শত্রু যেন তাড়া করছে।

হ্যাঁ, অতীতে এরকম মহামারী একেবারেই যে ছিলো না তেমন নয়। তবে এমন বিচ্ছিন্ন অন্তরীণ দিনযাপনের দৃষ্টান্ত খুব কমই ছিলো। তথ্যপ্রযুক্তির এই তুমুল বিপ্লবের যুগেও প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায়। করোনা এসে এই ব্যাপারটি আরও গভীরভাবে বুঝিয়ে দিলো। দিনদিন কর্মহীন হয়ে পড়ছে মানুষ। আয়ের উৎস সীমিত হয়ে পড়ছে। শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে গ্রামে। অথবা অন্য কোথাও।
‘দেশ কতটুকু ভালো রেখেছে’ এই জিজ্ঞাসার উত্তর ব্যাপকতা দাবি করে। তবে সংক্ষেপে বলি। দেশ মানে তো কেবল একটি ভূখণ্ড নয়। আমি, আপনি এবং তিনি মিলে সমগ্র দেশ। আমাদের সামগ্রিক কার্যকলাপ নিয়ে দেশের পরিচয়। আমরা দাবি করি ‘দেশ মাতৃসম’। কিন্তু মাতৃভূমির সন্তান হয়েও আমরা মায়ের সম্মান কতটুকু রক্ষা করছি? দেখুন, এই করোনার ভয়াবহতার দিনেও আমাদের দুর্নীতি থেমে নেই। নকল ওষুধ, নকল কীট, করোনার ভুয়া টেস্ট এবং রিপোর্টে সয়লাব দেশ। সমাজের দায়িত্বশীলদের কেউ কেউ এসবের সাথে জড়িত আছেন। এসব দেখে অসহায় বোধ করি। তবুও স্বপ্ন দেখি। নিশ্চয় কেটে যাবে অমানিশাকাল।

কাব্যশীলন : স্বপ্ন, কল্পনা এবং আবেগ লেখালেখির শুরুর দিকে নতুনদের মনন তৈরি করতে কতটা সাহায্য করে? কিংবা লেখালেখির শুরুর দিকের সূত্র মনে করেন কি এগুলোকে?

ফারুক সুমন:

মানুষমাত্রই কমবেশি স্বপ্ন-কল্পনা কিংবা আবেগের কারবারি। এক্ষেত্রে একজন সৃজনশীল শিল্পী সাধারণের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল। স্বপ্ন-কল্পনা-আবেগ তাদের জন্য বিস্ময়কর ভুবন। মনোরাজ্যের নানাস্তরে ভাবের যে অসীম লীলা। এসব নিয়েই তো একজন সৃজনশীল ব্যক্তির কাজ। দর্শনশাস্ত্রে স্বপ্ন-কল্পনা-আবেগ সম্পর্কে আলাদা অধ্যায় আছে। মানবমনের দুর্জ্ঞেয় অঞ্চলের খোঁজ পেতে বিভিন্ন সময়ে দার্শনিকগণ এসবের আলোচনা করেছেন। যিনি কবি, যিনি শিল্পী, যিনি শিল্পের সৃজনক্রিয়ার সাথে জড়িত। তিনি শৈশব-কৈশোরেই অতিমাত্রায় স্বপ্ন-কল্পনা কিংবা আবেগের আহ্বান পেয়ে থাকেন। বলতে চাইছি, একজন সৃজনমুখর শিল্পী হঠাৎ করেই শিল্পী হিসেবে আবির্ভূত হন না। শৈশব-কৈশোরেই তৈরি হয় শিল্পের বীজতলা। খুব ছোটবেলায়, যখন শিল্পসাহিত্য ব্যাপারটি বিন্দুবিসর্গও বুঝি না। তখন পুকুরপাড়ে উবু হয়ে থাকা হিজলগাছের কাছে বসে ভাবতাম। জলের মাঝ হিজলগাছের কী চমৎকার প্রতিছায়া ভেসে আছে। শেওলাজমা পুকুরে টুপটাপ ঝরে পড়ছে হিজলফুল। নাওয়াখাওয়া ভুলে সেসব দৃশ্যে মগ্ন হয়ে থাকি। অঞ্জলিপূর্ণ করে ফুল কুড়াই। মালা গাঁথি। কলিজায় কাঁপন ওঠে। আবেগে থরথরানি অনুভব করি শিরায় শিরায়। আমার এই আত্মমগ্ন দিনে অন্য বন্ধুরা তখন ব্যস্ত আছে অন্যকোনো খেলায়। যেখানে হয়তো এরকম ভাবমগ্ন অনুভূতি অনুপস্থিত। শৈশবে লেখালেখির বীজতলা এভাবেই তৈরি হয়ে যায়। খুব শৈশবে এই যে আবেগের ছটফটানি। একা একা উদাস হয়ে হৃদয়ের হরিৎ উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া। এটা সবার ক্ষেত্রে সমান ভাবে হয়নি। প্রকৃতির এই অভাবিত লীলারহস্যে যারা আচ্ছন্ন থেকেছেন সেই অবুঝ সবুজ শৈশবে। তারাই বোধহয় শিল্পী কিংবা কবিবোধের ইশারা নিয়ে বেড়ে ওঠেন। অবশ্য এই বোধ শৈশবকৈশোর এবং তারুণ্যে অনেকের মাঝেই থাকে। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই সবুজ সারল্য ক্রমশ অপসৃত হয়। নিসর্গের সেই লীলারহস্যের সন্ধান হারিয়ে যায়। পার্থিব ভোগবিলাস কিংবা মাত্রাতিরিক্ত অর্থবিত্তের মোহে পড়ে শিল্পীর সেই শৈশবভাবনার মৃত্যু ঘটে।
কেবল তারাই শৈশবসময়ের সেই ইশারাকে বহন করতে সক্ষম হয়। যারা ভুলে যায়নি প্রখর রৌদ্রে প্রজাপতির পেছন পেছন কাটানো ব্যাকুল সময়। যারা ভুলে যায়নি শবেবরাতের জ্যোৎস্নাপ্লাবন রাত। যারা ভুলে যায়নি নদীতে ঝিলিক দিয়ে হারিয়ে যাওয়া ছোট মাছের ঝাঁক। যারা ভুলে যায়নি রাতের শেষপ্রহরে পাখির কিচিরমিচির। যারা ভুলে যায়নি অসীম আকাশে হাওয়ায় ভেসে থাকা নিঃসঙ্গ চিল।

কাব্যশীলন : ডাকাতিয়ার তীর থেকে জাহাঙ্গীরনগরের নান্দনিকতা ফারুক সুমনকে সৃজনশীল করতে কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছে?

ফারুক সুমন:

আমার বাড়ির কোলঘেঁষে মায়াময় এক নদীর নাম ডাকাতিয়া। ষড়ঋতুর বহুবর্ণিল রূপ আমি এই নদীর কিনারে বসে দেখেছি। নদীর দু’কূলজুড়ে ঘরবাড়ি। মানুষের বিচিত্র দিনযাপন। কোথাও পাড়ভাঙার হাহাকার। ছোটছোট জেলে নৌকাগুলো ভেসে আছে নিঃশব্দে। দূর থেকে তাকিয়ে দেখলে মনে হয় অন্য এক পৃথিবী। রাতের বেলায় গাঢ়রূপ অন্ধকারে নদী যেন তারাভরা আকাশ। জ্বেলেনৌকোয় কেরোসিনের কুপিগুলো মিটমিট করে জ্বলতে থাকে। হঠাৎ মাঝরাতে গান গেয়ে বাড়ি ফেরে কোনো হাঁটুরিয়া। কিংবা উদাসী কোনো সওদাগর নৌকায় বসে বাঁশির সুরে প্রকাশ করে মনের গোপন কথা। এই যে নদীতীরবর্তী ব্যতিক্রম জীবন। এটা আমার শৈশব-কৈশোরের মানসগঠনে ছিলো বেশ প্রভাববিস্তারি।
লাকসাম থেকে চাঁদপুরগামী রেললাইন এবং নিকটবর্তী নদী ডাকাতিয়া। এখানে আমার বেড়ে ওঠা। এই দুইয়ের কাছে স্বীকার করি সীমাহীন শিল্পঋণ। ছোটবেলায় বিনাটিকেটে রেলভ্রমণ ছিলো একধরনের এডভেঞ্চার। ধরা খাওয়ার ভয়ে এক স্টেশন পর পর বগি পরিবর্তন। তারপর বন্ধুদের সাথে দলবেঁধে লাকসাম কিংবা হাজীগঞ্জ গিয়ে সিনেমা দেখা। তারপর রেল জংশন থেকে গল্প-উপন্যাসের বই কেনা। তারপর রাস্তার পাশে সাপুড়িয়ার সাপখেলা। তারপর ওষুধ হিসেবে গাছের শেকড় বিক্রি। আহা, হারিয়ে গেছে সেই ঘর্মাক্ত দিন। পাগল পাগল দিনগুলো।
ডাকাতিয়া নদীর ঘাটে বেদে সম্প্রদায়ের অসংখ্য নৌবহর। নদীর তীরে বসে দেখতাম নিপুণ হাতে বেদে তরুণীর ধোঁয়াওড়া রান্নার দৃশ্য। ছোট্ট পাতিলে টগবগ করছে ফুটন্ত ভাত। এসব দেখে দেখে সন্ধ্যার আগমুহূর্তে বাড়ি ফিরতাম। মায়ের বকুনি খেয়ে হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসতাম। কিন্তু আমার চোখে ভাসে বেদে সম্প্রদায়ের নৌবহর। কানে বাজে কুঝিকঝিক ট্রেনের হুঁইসেল। এই ছিলো আমার শৈশবের সীমাহীন অনুভবের যৎসামান্য কথা। মূলত শৈশবকৈশোরের কোমল মনে ভিন্নতর বিস্ময় হয়ে হাজির হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সে অনেক দীর্ঘ অনুভবে ও উপলব্ধির গল্প। একটি নিস্তরঙ্গ পুকুর ঢিল ছুঁড়লে যেমন তরঙ্গ তৈরি হয়। তেমনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমার চিন্তার সরোবরে কে যেন ঢিল ছুঁড়ে দিয়েছে। সেই যে শিল্পতরঙ্গ তৈরি হয়েছিলো। আমি এখনো আমার মানসভূগোলে সেসবের স্পর্শ অনুভব করি। এখানে এসে আমি পেয়েছি নন্দিত নাট্যকার সেলিম আলদীনের সান্নিধ্য। পেয়েছি কবি খালেদ হোসাইন, কবি মোহাম্মদ রফিক, কবি সুমন সাজ্জাদ, কবি ও গল্পকার রায়হান রাইনসহ আরো জ্ঞানীগুণি গুরুজনদের সান্নিধ্য। বন্ধু কবি আহমেদ বাসারসহ লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছি। সাহিত্য সংগঠন করেছি। কবিতা উৎসব করেছি। সমসময়ে যাদের সাথে কমবেশি বাহিত হয়েছে শিল্পসময়। এই মুহূর্তে তাদের অনেকের কথাই মনে পড়ছে। কবি সঞ্জীব পুরোহিত, কবি আহমেদ বাসার, কবি চাণক্য বাড়ৈ, কবি পিয়াস মজিদ, কবি নওশাদ জামিল, কবি শিমুল সালাহ উদদীন, কবি আলতাফ শাহনেওয়াজ, কবি রাহেল রাজিব, কবি মেহেদী রাসেল, কবি অনিকেত আরিফ, তৈমুর রেজাসহ একঝাঁক তরুণ প্রতিভা তখন জাহাঙ্গীরনগরে শিল্পমাতাল দিনযাপন করেছি। সবার সাথে হয়তো তুমুল নৈকট্য হয়নি। তবে আমরা একসাথে শিল্পে সচল ছিলাম। এখনো অনেকেই সচল আছি।

কাব্যশীলন : শিল্পের অন্তর্গত তরঙ্গ আপনি কোন মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারেন বেশি। কবিতা, গল্প নাকি গদ্যে-

ফারুক সুমন:

কবিতাই আমার প্রথম প্রেম, প্রথম আহ্লাদ। কবিতা আমাকে দিয়েছে কারুকার্যখচিত কল্পাকাশ। যেখানে নিঃশব্দে চলে অলৌকিক আনন্দবিহার। ফলে শিল্পের সরণিতে কবিতাই আমার অন্তিম আরাধ্য। কিন্তু কখনোবা পাঠাভিজ্ঞতার আলোকে লিখি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক গদ্য। বিভিন্ন সময়ে পড়তে পড়তে মাথার মধ্যে যে চিন্তাবিন্দু জমা হয়েছে, গদ্যগুলোতে তার প্রকাশ হয়তো দেখা যাবে।
অন্তর্গত তাড়নায় স্মৃতিগন্ধে ভরপুর কিছু গল্পও লিখেছি। এছাড়া ভারতভ্রমণ নিয়ে একটি ভ্রমণগদ্য ও একটি উপন্যাস সহসা প্রকাশিত হবে। শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে দীর্ঘকলেবরের একটি গবেষণাগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের হাতে।
মাঝেমধ্যে সমসাময়িক কোনো ইস্যু নিয়ে বিচলিত বোধ করলে কলাম লিখি। ছড়া লিখছি সেই শৈশব থেকে। সম্প্রতি ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করছি। আবহমান গ্রামবাংলার রূপবৈচিত্র আমার ফটোগ্রাফির মূল থিম। আসলে ইতোমধ্যে শিল্পের নানা আঙ্গিকে কাজ করার প্রতি আগ্রহী হয়েছি। কারণ কিছু বক্তব্য থাকে যেগুলো কবিতায় বলে তৃপ্ত হতে পারি না। ফলে আঙ্গিক বদল করতে হয়।
তবে কবিতায় বেশি আনন্দ পাই। আগেই বলেছি, এই আনন্দ একান্তই যেন অলৌকিক আশ্রয়।

কাব্যশীলন : গুষ্ঠিবদ্ধ শিল্পসাহিত্য চর্চা নতুনদের প্রতিভা বিকাশের অন্তরায় বলে মনে করেন কি?
(কারণ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছেন- নতুন লেখক তৈরিতে দৈনিক সাহিত্য পাতার ভূমিকা তলানিতে)

ফারুক সুমন:

হ্যাঁ, বলেছি। সেখানে আমার বক্তব্যটি ছিলো এরকম- ‘বর্তমানে হাতেগোনা কিছু দৈনিকের সাহিত্যপাতা ছাড়া বাকি সব সাহিত্যপাতাই ঘুরেফিরে মুষ্টিমেয় কিছু লেখকের লেখা প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এক্ষেত্রে ওয়েবম্যাগের স্বাতন্ত্র্য ও সুবিধা রয়েছে। পুঁজিপতি পত্রিকা মালিকের চাপ নেই বলে ওয়েবম্যাগ সম্পাদক স্বাধীনভাবে লেখা বাছাইয়ের সুযোগ পেয়ে থাকেন। ফলে ‘তারকা লেখক’-এর পাশাপাশি নবীন লেখকের লেখা স্থান পায় বেশি। যদিও কিছুটা রূঢ় শোনাবে, নতুন লেখক তৈরিতে দৈনিক সাহিত্যপাতার ভূমিকা আমি বলব ‘তলানিতে’। এক্ষেত্রে পুঁজিবাদী মনোভঙ্গি কর্তৃপক্ষের ইচ্ছের কাছে সাহিত্যপাতার সম্পাদক অসহায়। স্বাধীনতাহীন সাহিত্য সম্পাদক চাকরির কারণে হুকুম তালিম করবেন, এই তো স্বাভাবিক।’
মানুষ জোটবদ্ধ থাকতে ভালোবাসে। ফলে গোষ্ঠিবদ্ধ হয়ে সাহিত্যচর্চা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এখন পত্রিকা এবং সংগঠন কেন্দ্রিক যে গোষ্ঠিবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বোধকরি এটাও একধরনের অচলায়তন। নবীন যারা লেখালেখির সাথে যুক্ত হতে চাইছেন। অচলায়তনের খপ্পরে পড়ে যদি তারা অন্ধ হয়ে যান। তবে স্বাধীন শিল্পচর্চার পথে কিছুটা অন্তরায় তৈরি হয় বৈকি। গোষ্ঠিবদ্ধ কবি-সাহিত্যকরা পারস্পরিক কুৎসা রটানোর মধ্যে থেকে বেশ আমোদিত হন।
গোষ্ঠীবদ্ধতার কারণে আমাদের এখানে ভালো সমালোচনা সাহিত্যধারা গড়ে ওঠেনি। কারণ গোষ্ঠীবদ্ধ লেখকেরা কেবল নিজেদের সাহিত্য নিয়েই আলোচনা করে তৃপ্ত হয়। অধিকাংশ সময় সেই আলোচনা শৈল্পিক মানদণ্ডের বিবেচনা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত তোষণে রূপ নেয়। ফলে নৈর্ব্যক্তিক সাহিত্য সমালোচনার ধারা দিনকে দিন আরো অনুর্বর হয়ে উঠেছে। তরুণ কবিযশপ্রার্থীরা দ্রুত এইসব গোষ্ঠীবদ্ধ বৃত্তের ভেতর স্রোতের তোড়ে আটকা পড়ে।

কাব্যশীলন : দীর্ঘদিন কবিতা চর্চার পরে আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “অচঞ্চল জলের ভিতর নিরাকার বসে” ২০১৭ সালে প্রকাশ করেন। নতুন যারা কবিতা চর্চা করছেন এটা কি তাদের জন্য কোন ধরনের বার্তা বল বলে মনে করেন? (কারণ নতুনদের মধ্যে অল্পতেই একধরণের চঞ্চলতা লক্ষ্য করা যায় গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে)

ফারুক সুমন:

আপনি হয়তো জেনে থাকবেন, শৈশব থেকেই আমি লেখালেখির সাথে যুক্ত। গ্রামের পাশেই চিতোষী রেল স্টেশন। সেখানে স্থানীয় দেয়ালিকায় আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। এটা ১৯৯৬ সালের কথা। আমি তখন সবেমাত্র ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। তারপর থেকে অদ্যাবধি লিটল ম্যাগাজিন, ওয়েব পোর্টাল, দৈনিক পত্রিকাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লিখছি। বয়স এবং সময়ের বিবেচনায় এটা আমার জন্য দীর্ঘ শিল্পভ্রমণ। তবে বই প্রকাশ করেছি অনেক পরে। এই বিলম্বের কারণ দুটি। এক, লেখার প্রতি তৃপ্ত হতে না পারা। দুই, পরিস্থিতি ও সমসাময়িক বাস্তবতা। এখন নবীন লেখকদের মধ্যে বইপ্রকাশের ব্যাপারে যে উন্মুখ মনোভঙ্গি দেখা যায়। ১৫/২০ বছর বা তারও আগে এরকম পরিস্থিতি হয়তো ছিলো না। এখন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে বইপ্রকাশের সুযোগ বেড়েছে। এছাড়া দ্রুত খ্যাতিমান হওয়ার মনোবাসনা নবীন লেখকদের বইপ্রকাশে প্রণোদিত করে থাকতে পারে। তবে এই প্রসঙ্গগুলো একান্তই গৌণ ব্যাপার। দিনশেষে লেখাই সত্য। মহৎসৃষ্টি তার স্রষ্টাকে বাঁচিয়ে রাখে।

কাব্যশীলন : গদ্যচর্চা বা সমালোচনা সাহিত্য চর্চার প্রতি আপনার সমসাময়িক কবি-লেখকদের আগ্রহ কম দেখা যায়। এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আপনার মূল্যায়ন যদি বলতেন। তার কারণ কী হতে পারে বলে মনে করেন?

ফারুক সুমন:

সমকালীন প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মনেপড়ে, ২০১৯-এর বইমেলায় ‘বাংলা একাডেমি’ প্রথমবার আয়োজন করে ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠান। আমি সেই মঞ্চে আমন্ত্রিত হয়েছি। আমার প্রবন্ধগ্রন্থ ‘শিল্পের করতালি’ নিয়ে কথা বলেছি। সেই মঞ্চে আমাকে অনুরূপ একটি প্রশ্ন করেছিলেন কথাশিল্পী মনি হায়দার। প্রশ্নের উত্তরে বলেছি, সমকালীন তরুণদের মধ্যে গদ্য কিংবা শিল্পসমালোচনামূলক সাহিত্য চর্চার প্রতি আগ্রহ কম। এর পেছনে দুটি কারণ ভেবে দেখা যেতে পারে। প্রথমত, পরিশ্রমের কাজ বলে অনেকে এড়িয়ে যান। দ্বিতীয়ত, শিল্পসমালোচনার জন্য যে গভীর অভিনিবেশ এবং পাঠপরিধি প্রয়োজন। এই সময়ের তরুণদের মধ্যে সেটা কম।
দেখুন, পৃথিবীর খ্যাতিমান কবি-শিল্পীরা মৌলিক সৃষ্টির পাশাপাশি শিল্পসমালোচনামূলক গদ্য লিখেছেন। সমকালীন নানা ইস্যু নিয়ে মতামত দিয়েছেন। পরস্পরের বইপত্র নিয়ে সমালোচনা লিখেছেন। গ্রিক-রোমান, ইংরেজি, ফরাসি, রুশসহ বিভিন্ন ভাষার কালজয়ী কবিশিল্পীদের রচনাসম্ভার খুঁজে দেখলে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ উত্তরকালের খ্যাতিমান কবিসাহিত্যিকগণ প্রবন্ধ কিংবা সমালোচনাধর্মী লেখা লিখেছেন। বর্তমানে সমালোচনা সাহিত্যের ধারাটি কিছুটা নিষ্প্রভ। এই ক্ষেত্রে আমাদের আরও কাজ করা দরকার।

কাব্যশীলন : কবি বা লেখক হওয়ার জন্য মোহ (যে কোন ধরণের হতে পরে- সামাজিক, আর্থিক, অথবা ভোগবিলাস) কতটুকু ক্ষতিকর বলে মনে করেন? বা নির্মোহ হওয়া কতটা প্রয়োজন-

ফারুক সুমন:

কবি বা লেখক হওয়ার জন্য মোহ থাকা সমীচীন নয়। তবে সুদুরস্বপ্ন থাকা ভালো। মোহ না বলে আমি বরং এটাকে ‘শিল্পজেদ’ বলি। অর্থাৎ কবি বা লেখক হওয়ার জন্য প্রয়োজন শিল্পজেদ। যিনি স্বীয় অন্তঃকরণে শিল্পসৃজনের তাগাদা অনুভব করেন। তিনিই কেবল মহৎশিল্প সৃষ্টি করেন। জাগতিক ভোগবিলাস, খ্যাতি কিংবা আর্থিক প্রতিপত্তি লাভ করা যখন মুখ্য হয়ে ওঠে। তখন শিল্পের দায়বদ্ধতার জায়গা নষ্ট হয় বৈকি। তবে সবার যাপিত জীবন একরকম হয় না। সুখে-দুঃখের সংজ্ঞাও ব্যক্তিভেদে আলাদা। শিল্পী কিংবা কবি-মনে চিরন্তন দুঃখবোধের একটা অদৃশ্য নহর প্রবাহিত হয়। যারফলে শত আনন্দময়তার ভেতরেও একজন শিল্পী সেই নহরে নিঃসঙ্গতার নৌকায় ভেসে থাকেন। এই প্রসঙ্গে শামসুর রাহমানের লেখা কয়েকটি পঙক্তি মনে পড়ে গেলো। ‘খুব বেশি ভালো থাকতে নেই’ কবিতায় তিনি বলেন-
‘সংগীত সাধক, কবি; চিত্রকর অথবা ভাস্কর, কাউকেই
খুব বেশি ভালো থাকতে নেই।

খুব বেশি ভালো থাকা মানে
মোহের নাছোড় লতাগুল্মসমেত স্নোতের টানে
সেখানেই অনিবার্য খড় ভেসে-যাওয়া,
যেখানে কস্মিনকালে বয় না শিল্পের জলহাওয়া।’

কাব্যশীলন : শিল্পকর্ম অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কের মুখোমুখি হয় অশ্লীলতার জন্য। শিল্প-সাহিত্যে অশ্লীলতার স্থান আছে বলে মনে হয় আপনার?

ফারুক সুমন:


শিল্পসাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল ব্যাপারটি নতুন নয়।
অশ্লীলতার অভিযোগে এ যাবৎ নামকরা অনেক শিল্পকর্মই বিতর্কিত হয়েছে। মূলত এই বিভেদ ব্যক্তির পাঠপ্রস্তুতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে শিল্প একজনের কাছে অশ্লীল কিংবা প্রাপ্তমনস্কদের সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত, ঠিক অন্য কারো কাছে সেটা অশ্লীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার দৃষ্টান্তও কম নেই। ডি এইচ লরেন্সের ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ উপন্যাসটি ১৯২৯ সালে ব্রিটেনের আদালতের নির্দেশে ত্রিশ বছরের অধিককাল নিষিদ্ধ ছিল। অশ্লীলতার অভিযোগ এনে বইয়ের কপি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ উত্তরকালে এই গ্রন্থ বেশ সমাদৃত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে কালিদাসের ‘মেঘদূত’, রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’, তারাশঙ্করের ‘কবি’, বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভরে বৃষ্টি’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘খেলারাম খেলে যা’, সৈয়দ আলী আহসানের ‘জিন্দাবাহারের গলি’-সহ অসংখ্য গ্রন্থের দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে—যেখানে যৌনতার খোলামেলা বর্ণনা পাওয়া যায়।

শিল্প তো মানব জীবনের উত্তম রূপায়ণ। যদি তা-ই হয়, তবে মানব-মানবীর যৌনজীবন শিল্প-সাহিত্যে উপেক্ষিত হতে পারে কি? নিঃসন্দেহে পারে না। শুদ্ধতাবাদী শিল্প-তাত্ত্বিকেরা হয়তো বলবেন, যৌনতার প্রকাশ শিল্পে শৈল্পিক হওয়াই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু সাহিত্যে যাঁরা বাস্তব জীবনের রূঢ় সত্যকে উপস্থাপনে উৎসাহী, যাঁরা মানব জীবনের অনালোকিত অধ্যায়কে কোনোরকম ভণিতা ছাড়া শিল্পরূপ দিতে চান, তাঁদের সঙ্গে শুদ্ধতাবাদী শিল্পপ্রেমিদের মতবিরোধ থাকা অস্বাভাবিক নয়। আমার কাছে মনেহয় শ্লীল-অশ্লীল ব্যাপারটি একান্তই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার।

কাব্যশীলন : আপনি সম্প্রতি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত “সার্ক সাহিত্য সম্মেলন” এবং নেপালে অনুষ্ঠিত “নেপাল আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেল”-এ অংশ নিয়েছেন। আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

ফারুক সুমন:

আমার জন্য অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতা। এই ভেবে আনন্দিত হয়েছি যে, জীবনে প্রথম প্লেনে চড়ে বিদেশে গেলাম। তাও কেবল কবিতার আমন্ত্রণে। শিল্পের টানে। শিল্পসাহিত্য যে কেবল নির্দিষ্ট একটি ভাষা কিংবা ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সম্মেলনে যোগ দিয়ে এটা উপলব্ধি করেছি। সার্কভুক্ত দেশগুলোর নিজস্ব শিল্পসংস্কৃতির যে স্বাতন্ত্র্য। সেসম্পর্কে জেনেছি। পারস্পরিক ভাববিনিময়ের জন্য এই আয়োজনগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমি এই শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি ভ্রমণ বিষয়ক বই লিখেছি। আশাকরি আগামী বইমেলায় গ্রন্থকারে প্রকাশিত হবে। সম্প্রতি ‘সার্ক সাহিত্য সম্মেলন’-এর আয়োজক কমিটির প্রেসিডেন্ট এবং ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত লেখক অজিত কৌর আমাকে অভিনন্দিত করে পত্র পাঠিয়েছেন। এটাও আমার জন্য বিশেষ প্রাপ্তি।

কাব্যশীলন : কেনো লেখেন?

ফারুক সুমন:

হঠাৎ এমন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক উত্তরে যদিও বলি, ‘না লিখে থাকতে পারিনা তাই লিখি।’ তবুও অতৃপ্তি রয়েই যায়। বুকের গোপন-গহীন বাতায়ন খুলে উঁকি দিয়ে দেখি। নাহ, এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক মতো দেওয়া হয়নি। দূরে আবছা হয়ে আছে না বলা অনেক কথা। আবছায়া, অধরা সেই কথার কাছে গিয়ে হাঁটুমুড়ে বসি। দু’হাত পেতে উত্তর প্রার্থনা করি। কিছু উত্তর হয়তো পাই। কিছু অধরাই থেকে যায়।

অন্তঃপুরে উদিত ‘কেন লিখি’ প্রশ্নটি আমাকে আন্দোলিত করে। বোধকরি, এই প্রশ্নের গুঞ্জরন সকল কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীর মনেই শোনা যাবে। সবাই যার যার উপলব্ধি এবং বিশ্বাসের পাটাতনে বসে প্রশ্নের জবাব হয়তো খুঁজেছেন। আদতে সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। কী এক অলৌকিক তাড়নায় শরাহত হয়ে একজন শিল্পী পাড়ি দেন শিল্পের মোহহীন দীর্ঘপথ? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটা দুর্গম অরণ্যে হেঁটে যাওয়ার মতোই।

কেন লিখি? এমন প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া কঠিন। পৃথিবীতে কিছু প্রশ্নের অমীমাংসিত ব্যাপার আছে বলেই মানুষ এখনো অনুসন্ধিৎসু অভিপ্রায় নিয়ে বেঁচে আছে। ভ্রুকুঞ্চনে খুঁজে ফিরে সেই অমীমাংসিত রহস্যের সমাধান। কিছু হয়তো মিলে, কিছু রয়ে যায় আগের মতোই কুয়াশাময়। শিশু যেমন পিতামাতাকে প্রশ্ন করে- ‘আমাকে ভালোবাসো কেন?’ প্রেমিকপ্রেমিকা যেমন পরস্পরকে প্রশ্ন করে- ‘আমাকে ভালোবাসো কেন?’ এসব প্রশ্নের উত্তর একেবারেই যে নেই তা নয়। তবুও পিতামাতা কিংবা প্রেমিকপ্রেমিকার মনে অতৃপ্তিকর দ্বন্দ্বমুখর জিজ্ঞাসা রয়েই যায়। কেন লিখি, এই প্রশ্নের উত্তরে তবে কি বলা যায়?
বলা যায়-
-আমি চন্দ্রাহত। সেজন্যে না লিখে থাকতে পারি না।
-আমি নিসর্গের ডাকে তৃষ্ণার্ত। সেজন্যে না লিখে থাকতে পারি না।
-আমি স্রষ্টা ও সৃষ্টিরহস্যে বিপর্যস্ত। সেজন্যে না লিখে থাকতে পারি না।

এই যে না লিখে থাকতে পারা অসম্ভব। এটাও একধরনের রোগ। এই রোগ শৈশব-কৈশোর কিংবা তারুণ্যে যদি সেরে যায় তবে ভালো। যদি না সারে তবে আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হয়। এই রোগ যিনি প্রাপ্ত হন। তিনি সৌভাগ্যবান বটে। কারণ এই রোগের শিল্পিত নাম ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’। রবীন্দ্রনাথ বোধহয় এটাকেই বলেছেন-
‘আপন বিরাট নীড়।– অলৌকিক আনন্দের ভার
বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার,
তার নিত্য জাগরণ; অগ্নিসম দেবতার দান
ঊর্ধ্বশিখা জ্বালি চিত্তে আহোরাত্র দগ্ধ করে প্রাণ।’

কাব্যশীলন : ধন্যবাদ আপনাকে।

ফারুক সুমন: কবি শব্দনীল, আপনাকে ও কাব্যশীলনকে ধন্যবাদ। নিরাপদে থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *