পার্পল সন্ধ্যা : হামিম কামাল ।। ২য় খণ্ড :: মাশা : তায়কোয়ান্দো ক্লাস

মাশা

গতপর্বে : সাগরপাড়ে এক পাহাড়ের ওপর পৃথিবীর বাতাসে প্রথম শ্বাস নিলো অদ্রি সাগরিকা মাশা। তার জন্মের রাতে মা মেরি আশীর্বাদ করতে এসেছিলেন। ক্রমশ মাশা বেড়ে উঠল, স্কুলে ভর্তি হলো, অতঃপর অন্য শিশুদের কাছ থেকে নানাভাবে বুলিংএর শিকার হতে থাকল; কখনো নাম, কখনো ওর খেয়ালী মনের কারণে। সবার সঙ্গে ওর বুদ্ধিমত্তার যেন যোজন পার্থক্য…

তায়কোয়ান্দো ক্লাস

আনন্দ সাবম

স্কুলের নামটা কোরীয় থেকে বাংলা করলে দাঁড়ায় “প্রাচ্যের চাঁদ তায়কোয়ান্দো”। প্রাচ্যের চাঁদের শান্ত সৌন্দর্য আর আধ্যাত্ম্যবাদ হয়ত স্কুল-কর্তৃপক্ষকে প্রেরণা দিয়ে থাকবে।

সেগুনবাগিচার একটা দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে স্কুলটা দেওয়া হয়েছিল। ছয়টা হলঘর বা দোজাং ছিল ওপরনিচ মিলিয়ে। ঘুরেফিরে সবকটায় ক্লাস, প্রশিক্ষণ হতো ওদের। স্কুলের সামনে একটুকরা উঠান, দুর্বাঘাসে ছাওয়া। চারদিকে উঁচু দেয়াল। দেয়ালের চার কোণে চারটা বড় বড় গাছ। একটা দীর্ঘকায় আকাশমণি গাছে সারাবছর হলুদ ফুল ফুটে থাকত।  

এ স্কুলের কাছে মাশা একজন কৃতজ্ঞ-সৎ মানুষের মতো নত। এইখানে তার ভাবনা, জীবন, যার হাত ধরে বাঁক নিয়েছিল, তিনি শিক্ষক মাহমুদ আনন্দ। আনন্দ সাবম। 

মাশাদের অরেঞ্জবেল্ট পাওয়ার পর দিন আনন্দ সাবম বলেছিলেন, “এইবার একটু একটু কইরা বড়গো কথা শিখন লাগে।” মধ্য-উত্তরের আঞ্চলিক টানে কথা বলতেন আনন্দ সাবম। বললেন, “তায়কোয়ান্দোর লক্ষ্য হইলো একটা শান্তির পৃথিবী। কারে কয় শান্তির পৃথিবী?”

চল্লিশজনের ভেতর আটাশজন পেয়েছিল অরেঞ্জবেল্ট। “বড়দের কথা” শেখাতে শুরু করার কারণটা এই অরেঞ্জবেল্টের তাৎপর্যের ভেতর ধরা যাবে।

অরেঞ্জবেল্টের তাৎপর্য :

উষাকাল এখন তুঙ্গে। আঁচ বোঝাতে শুরু করেনি সূর্য। যা আছে তা আঁচের আভাস, আর কোমল সৌন্দর্য, কমলা রঙ যার প্রতীক। তবে, আসছে সম্ভাবনাময় দিন। যে দিনের রূপকার সূর্য-বহ্নিমান। যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। শিখে নিতে হবে এইবার কিছু রীতি, নীতি, নতি। 

আনন্দ এমনিতে হাসিখুশি। কিন্তু যখন কিছু বলার সময় আসে, গম্ভীর মুখে প্রথমে কিছুক্ষণ হাতের দিকে তাকিয়ে থাকেন, যেন রেখাগুলো তার ভাবনার বর্ণমালা। এরপর হাত গুটিয়ে কেমন লুকিয়ে ফেলতেন, এমনভাবে, যে জানে না, তার সন্দেহের উদ্রেক হবেই।

“যেই পৃথিবীতে সব সব ঠাণ্ডা মাইরা আছে, সেইটাই কি শান্তির পৃথিবী? কোনো শোরগোল চিল্লাপাল্লা নাই, সবাই ইশকুলে হেডমাস্টারের ক্লাসে যেমন চুপ কইরা বইসা থাকে, বা হেডডাউন কইরা থাকে, এইটা?”

অরেঞ্জ বেল্টের অধিকারীরা অন্তত কিশোরকিশোরী। তাদের সিংহভাগ আনন্দর কথা বুঝতে পারছিল বলেই মনে হচ্ছিল। অল্পসংখ্যাকই পা নাচাচ্ছিল। এ-তার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল আরো কমসংখ্যক।

“হেডমাস্টারের ওই ক্লাসের মতো পৃথিবীরে শান্তির পৃথিবী বলে না। তেমন শান্তির পৃথিবী একজনে বানাইতে চাইছিল, হের নাম চেঙ্গিস খান। রক্তের বন্যা বহাইয়া দিছে, মানুষের রক্ত!” মানুষের রক্ত কথাটা শুনে মাশার বুকে ধক করে উঠেছিল। “কাছাকাছি শান্তি আরো একজনে আনতে চাইছিল, এডলফ হিটলার। ছাইয়ের গন্ধে দম বন্ধ হয়া গেছে, মানুষের ছাই!”

কিশোর-কিশোরীরা নড়ে চড়ে উঠলেও মাশা প্রার্থনা করতে শুরু করেছিল যেন শিগগির এইসব কথা বন্ধ হয়। তবে তখনো ওর জানা নেই, ঠিক পরমুহূর্ত থেকে ওর প্রার্থনা বিপরীত দিকে বইতে শুরু করবে। আনন্দ সাবম যখন তার কাছে শান্তির পৃথিবী কী তা ব্যাখ্যা করতে শুরু করবেন।

যেখানে অশান্ত, সেখানেই জীবন। যেখানে শোর নেই, গোল নেই, হয় সেখানে কোনো ঘাতক আবহ ঘোট পাকিয়েছে, নয়ত-

“বুঝতে হইবো সব মইরা মিশা গেছে।”

অনেক মানুষ এক হলে তাকে বলে মেলা। বহু মানুষকে এক করেই মেলা বসে। সেই মেলায় যেতে মন চঞ্চল।

“না-জানি কত রঙ, কত প্রাণ সেই মেলায়!”

যে যাচ্ছে না, সেই বুঝি বঞ্চিত হয়ে থাকল।

মেলা মানে বারো রঙের মানুষ। যতক্ষণ সেই বারো রঙের মানুষের সহাবস্থানে মেলা আলো, বুঝতে হয় সেখানে ছন্দ বজায় আছে। আর যতক্ষণ সেই ছন্দ বজায় আছে, ততক্ষণ শান্তি।

“শান্তির পৃথিবী মানে হইলো সেই ছন্দের পৃথিবী।”

তায়কোয়ান্দোর লক্ষ্যের সেই শান্তির পৃথিবী গড়তে দরকার বড় মানুষ।

“কারে কয় বড় মানুষ?”

এবং এই বড়ত্ব শরীরে নয়, বয়সেও নয়। তাহলে? কোথায় বড় হলে তাকে বড় বলা যায়?

আনন্দ সাবম আবার হাতের তালুর দিকে তাকিয়েছিলেন। তারপর মুঠো করে হাতটা লুকিয়ে অপেক্ষা করছিলেন, কেউ বুঝি জবাব দেবে।

আনন্দ সাবমের একজন শিক্ষক ছিলেন, জিনাত আরা। আনন্দের কাছে তিনি ছিলেন ছায়াদায়িনী ফলদ বৃক্ষের মতো। আনন্দের এই হাতের তালু পরখের অভ্যাসের কারণে তিনি তাকে কিরো বলে ডাকতেন।

“কিরো, কিরো! বলো তো, মানুষ বড় হয় কিসে?”

প্রশ্নটা প্রথম তারই করা, এবং উত্তরটা তারই শেখানো। মানুষ বড় হয় মনে। আনন্দ সাবম মনে মনে শিক্ষকের পা স্পর্শ করলেন।

“বড় হওয়ার ছোট এক্সারসাইজগুলা শরীরে। আর বড় এক্সারসাইজগুলা মনে। শরীররে গড়ন দেওয়া সহজ। মনরে গড়ন দেওয়া কঠিন। তাই বড় হওয়া কঠিন। একটা শান্তির পৃথিবী গড়া কঠিন। তায়কোয়ান্দো কঠিন।”

মাশার ভালো লাগার শুরু। কথাগুলো বিরাট ঘরের সঙ্গে, সকালের আলোর সঙ্গে সঙ্গত করে যাচ্ছিল। সুরের সঙ্গে অপরিহার্য বাজনা হয়ে বাজছিল। 

“কঠিন, কিন্তু অসম্ভব না।” আনন্দ সাবম এক পা এগিয়ে এসেছিলেন। “তারে সম্ভব করার শক্তি লুকায়া আছে এইখানে।” আনন্দ বুকের বাঁ পাশে হাত রাখলেন। তার রুগ্ন মুখে হাসি ফুটে উঠল।

“তায়কোয়ান্দোর স্টুডেন্ট তাই এইটার যত্ন করে সবার আগে। এইখানে থাকে মন। আমি কাউরে মারলাম। লাথিটা মারে পা। কিন্তু মারার আগে, জানে আমার মন। যতক্ষণ কিছু করার আগে মন জানবে, ততক্ষণ তুমি মানুষ। যখন মন জানবে না, তখন তুমি আর মানুষ নাই।”

এইসময় দলের ভেতর একটা শিথিল ভাব চলে এলো। কেউ কেউ তার কথা বুঝতে পারছিল না। হাত পা দোলাতে থাকল, গাছের পাতা গুনতে থাকল।

“আমাগো প্রথম ফাইটা নিজের সাথে। নিজেরে মানুষ কইরা রাখতে। এইটাই বড়গো শিক্ষা। বড়গো জিনিস।”

আলাপের সেই শুরুর শব্দটা ফিরে আসায় কেউ কেউ আবার ফিরে তাকাল।

“মনে করবা, এইটাই তায়কোয়ান্দো।”

আনন্দ সাবমের ভেতর শুধু বাবাই নয়, মাশা মায়ের ছায়াও দেখেছিল। মাশুক আর ঐশী এক হয়ে হন আনন্দ।

সেদিনের ক্লাস শেষে সবাই যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, আনন্দ সেন্নি বিষণ্ন মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখ দুটোর যেন কোনো গন্তব্য নেই। দূরের জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কিছুই দেখছে না।

মাশা এক পা এগিয়ে এলো।

“সাবম!”

মাশার কণ্ঠে একটা উদ্বেগ আর যত্নের ছায়া। আনন্দ হেসে বলল, “মাশা মামণি! তুমি ভালো তো? কিছু বলবা?”

সেদিন মাশা কিছু বলতে পারেনি। বলেছিল আরো তিন সপ্তাহ পর এক বৃহস্পতিবারে। একেক বৃহস্পতিবার যেন তার জীবনের একেক বাঁকের সাক্ষী।

আনন্দ সাবমের ওই কথাগুলো আরো শুনতে চায় মাশা- এই ছিল বলার। যার জন্যে এতো প্রস্তুতি।

মাঝে মাঝে ক্লাসের ফাঁকে সাবম যখন কোরিয়ার গল্প করেন, যেখানে তার দীক্ষার শুরু, মাশা মোহিত হয়ে শোনে। সেখানকার নীল রাত, পাহাড় চ‚ড়ার ডুমুর গাছ, ছাউনি পেতে উপদেশ দেওয়া রহস্যময় শিক্ষকদের মাঝে সে নিজেকে কল্পনা করে সুখী হয়। উষ্ণ অনুভব করে।

সাবম যখন তার আদর্শের কথা বলেন, যে আদর্শকথা তাঁকে তাঁর দীক্ষাগুরুরা শিখিয়েছেন, মাশার সেদিন ট্রেনে ওঠার মতো আনন্দ হয়। তেমন আলাপ এখানে কেউ করে না।

“তায়কোয়ান্দো তো শুধু সজোরে পা ছোড়া না!”

অরেঞ্জবেল্টদের প্রথম ক্লাসে আনন্দর বলা কথাগুলো নিজের মতো গুছিয়ে বাবা মায়ের কাছে উত্তেজিত হয়ে ব্যাখ্যা করছিল মাশা।

সেই বৃহস্পতিবার মাশা বলল, “সাবম, আমার ওসব কথা আরো অনেক শুনতে ইচ্ছা করে!”

“কোনসব কথা মা?”

“বড়দের কথা।”

“হা হা হা হা!”

ক্লাসঘর থেকে বের হওয়ার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ল কেউ কেউ। তবে এলো না। মাশা বলল, “যখন ওসব কথা শুনি, মনে হয় আমি কী করছি, কেন করছি, জানি। এছাড়া অন্যসময় কী করছি কেনই বা করছি বুঝতে পারি না। কোনো মানে পাই না। একেকসময় মনে হয়, এমনিই করে যাচ্ছি সব। যেভাবে অংক করি, ইংরেজি পড়ি, কিন্তু কিচ্ছু আপন লাগে না, সেরকম। কিন্তু যখন আপনি বড়দের কথাগুলা বলেন… ”

আনন্দ সাবম আবারও ঠা ঠা করে হাসতে থাকলেন। মাশা বিব্রত হলো, কিন্তু থামল না।

মেয়েটার চোখেমুখে জিজ্ঞাসার একটা আলো, আর চিন্তার বহু রং। কোন ক্লাসে পড়ে মেয়েটা? এইট? কোনো শিক্ষার্থীর ভেতরও আনন্দ এমন আলো, এমন রং দেখতে পেলে একজন শিক্ষক আর কী চান। আনন্দ সাবম বললেন, “চলো, ওইখানে গিয়া বসি।”

ওরা একটা কাঠের বেঞ্চে গিয়ে বসল। বহুক্ষণ কেউ বসেনি এখানে, ঠাণ্ডা হয়ে আছে কাঠ।

অনেক আলাপ হলো সেদিন। মাশার আনন্দের স্মৃতি, ব্যথার স্মৃতি জেনে নিলেন আনন্দ। নিজেরও ছোটবেলার গল্প করলেন। গাবতলীর কাছে এক শহরতলীতে তিনি বড় হয়েছেন। সেখানে রাত হলেই গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যেত। বুদ্ধিজীবী করবস্থানের একটুকরো ফাঁকা জায়গায় তায়কোয়ান্দো চর্চা করতেন এক কোরীয় ভদ্রলোক। একদিন আনন্দ তার খুব কাছে চলে গিয়েছিল। লোকটা অজান্তে তাকে আঘাত করে বসেছিল। এবং সেই তার তায়কোয়ান্দোর শুরু।

আরো কিছুক্ষণ দাপ্তরিক ক্রিয়াকর্ম চলল, তারপর দরজায় তালা পড়ার সময় হলো। আনন্দ সাবমের সঙ্গে তখন মাশাও উঠে দাঁড়াল।

সেদিনের পর প্রতিদিন ক্লাস শেষে দুজন কিছুক্ষণ হলেও আলাদা বসে গল্প করত।

ক্রমশ ছাত্রশিক্ষক সম্বন্ধ সুরভিত হতে থাকল।

সমাপ্ত কাজমাত্র ফলবতী

মাঝখানে তায়কোয়ান্দোর স্কুলিং নিয়ে আনন্দের খুলনা যাওয়ার একটা প্রস্তাব এলো। ওপর থেকে কেউ একজন আনন্দকে নির্বাচন করেছেন। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতর কারো চোখ উজ্জ্বল, কারো আঁধার।

শুধু খুলনা নয়, যেতে সবক’টি বিভাগীয় শহরে। সিউল আর ঢাকার যৌথ উদ্যোগে দেশময় তায়কোয়ান্দো ক্যাম্পেইন। দেশে সেবারই প্রথম। ছেলেমেয়েদের, বিশেষ করে মেয়েদের উৎসাহী করার চেষ্টা ছিল সরকারের। সেইমতোন ব্যানার পোস্টারিং দেখা যেত। ছেলেদের ফি ছিল, মেয়েদের ফ্রি। সুনাম পেয়েছিল সরকার।

স্বজনরা বলল, দেখো, তুমি তায়কোয়ান্দোকে যেভাবে দেখো, সেই ভাবনা ছড়িয়ে দিতে পারবে। এরচেয়ে বড় সুযোগ হয়, বলো? তারওপর ভালো মাসোহারার সাথে থাকা খাওয়ার একটা পুরু উপরি আছে। ভেবে দেখো।

উপরির চিন্তা পড়ে থাক। দেশময় ওর ভাবনাকে পৌঁছে দেওয়ার এমন সুযোগ দুর্লভ। এবং সেই প্রথম, আনন্দ সাবম বড় ধরনের দ্বিধার মুখে পড়লেন।

তবে শেষপর্যন্ত যাননি।

মাশা যেন মনে মনে জানত, তিনি যেতে পারবেন না। যেদিন হাসিমুখে আনন্দ জানাল, এখানে চাকরির ছাড়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই, সেদিন সবাই হাঁফ ছাড়লেও মাশার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না।

“তুমি খুশি হও নাই মা?”

“হয়েছি তো।” বলে এই প্রথম মাশা হাসল।

“আসলেই?” সন্দেহ আনন্দের চোখে। 

মাশা বলল, “সাবম, আমি জানতাম আপনি যেতে পারবেন না।”

“কও কী। কিভাবে জানতা?”

“তা বলতে পারব না। শুধু জানতাম।”

সেদিন ক্লাসের পর কাঠের বেঞ্চিটার ওপর বসে আনন্দ তাকে “মনের বাড়ির” কথা বললেন। জানালার বাইরে শাল গাছের বিরাট পাতার ফাঁকে শরতের আকাশ। সাদা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে আকাশ ঘন নীল!

মনের বাড়িটা ছিল আনন্দের ধ্যানের জগতে।

যে কোনো জায়গায় শান্ত হয়ে ব’সে শরীর শিথিল করে চোখ দুটো বুজে, আনন্দ তার মনের বাড়িতে আবির্ভূত হতো। প্রথমে চারপাশটা যেন মাঘের কুয়াশায় ঢাকা পড়ে থাকত। মনের চাওয়া আরো কেন্দ্রীভূত হতে হতে কুয়াশা কেটে যেত।

মনের বাড়ির চারপাশটা ছিল বনে ঘেরা। উঠানটা ছিল দুই সারি দর্শকের জন্যে জায়গা রেখে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার মতো বড়। উঠানের ওপাশে ছিল একটা ঘর। তার চালা খড়ের তৈরি, দেয়াল মাটির, কিন্তু দরজা জানালা স্বচ্ছ কাচের তৈরি। ওই তার গুরুগৃহ। সেখানে একটা বিশেষ ঘরে, কাচের দেয়াল পেছনে রেখে, কালো মেহগণি টেবিলের ওপারে, একটা লতানো বাহুর চেয়ারে, বসে মিটিমিটি হাসতেন থাকতেন আনন্দের কৈশোরের শিক্ষিকা, জিনাত আপা।

আনন্দ তার স্মৃতি থেকে যতটা সম্ভব নিখুঁত করে জিনাত আপাকে গড়েছিল। আনন্দ তাঁর সামনে নতমুখে উপস্থিত হয়ে তার সমস্যার কথা বলত। জিনাত আপা উত্তরে সমাধান বলে যেতেন।

আনন্দর দ্বিধার কথা সবিস্তারে শুনে জিনাত আপা বলেছিলেন, “কিরো, এখানে যা শুরু করেছ, সেটা আগে শেষ করো তুমি। সমাপ্ত কাজমাত্র ফলবতী, জানো না?”

তার পেছনে কাচের ওপারে আঙুর লতার মতো লতাঝাড় জ্বলজ্বল করছিল, তার বড় বড় পাতার ফাঁকে ফাঁকে সাদা সাদা বৃত্তের মতো ফুল, তার ভেতর থেকে জবার মতো মঞ্জুরি বেরিয়ে এসেছে। বাতাসে অল্প অল্প দুলছিল নেই লতা। তারও পেছনে, দূরে একটা নীলচে ধূসর আকাশ অপার্থিব চাপা আলোয় ঐশ^রিক অতল রহস্যের আভাস দিয়ে যাচ্ছে।

আনন্দ হাত জোড় করে জিনাত আপার কথা মেনে নিলো। “আপনি আমারে অনেক বড় নিষ্ফলা থেইকা বাঁচাইলেন!”

মাথার ভেতর ঘুমজমাট কটকট ভাব, বুকের অসুখী ধড়ফড় দূর হয়ে গেল আনন্দের, এবং পরদিন, “প্রাচ্যের চাঁদ তায়কোয়ান্দো”তে ঢোকার মুখে তোরণটাকে তার মনে হলো আরো আপন। মনে হলো এও তার নিজ হাতে গড়া। সার্থকতার একটা বুকভরা অনুভব তার চোখে আলো হয়ে ফুটে ছিল। তার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে বন্ধু, শত্রæ উভয়েরই মনে হলো, আনন্দ বুঝি সরকারি প্রস্তাবটা গ্রহণ করেছে!

“মানুষ নিজে যখন বদলায়, তখন সেই একাই বদলায় না,” ক্লাসে বলতে জিনাত আপা। “জ্ঞাতে, অজ্ঞাতে সে চারপাশটাকেও বদলাতে থাকে।”

আনন্দ তার জিনাত আপাকে নিয়ে মনের বাড়ির গুরুগৃহ সাজিয়েছিল। আর মাশা সাজাল তার আনন্দ সাবমকে নিয়ে।

আনন্দের অনুকরণে, মনের জগতে, নিজের একটা একচালা বাড়ি হলো মাশার। বাড়িটার দুপাশ মাধবীলতায় ছাওয়া। সামনে সেই দাঁড়িয়াবান্ধার উঠান। চারপাশে হালকা বন ধীরে ধীরে গভীর হয়েছে। পাখির ডাক আর ফুলের ঘ্রাণের নির্জন উৎসবে চারপাশ বিভোর। তবে শিক্ষক আনন্দের চেয়ে যা ভিন্ন, তা হলো, মাশার গুরুগৃহ কোনো আবদ্ধ ঘরে নয়। ঘরটা ছেড়ে বের হলেই গুরুগৃহ। ওর গুরুর গৃহ চারপাশ ঘিরে থাকা বন বা বন পেরিয়ে আরো দূরের পর্বতশ্রেণি। মাশা ঘরের বাহির হয়ে চোখ বন্ধ করে যখন তার গুরুকে স্মরণ করত, তিনি আসতেন।

তাকে দেখে প্রথম দর্শনে আনন্দ সাবম বলে চেনা যেত না। কারণ তিনি আসতেন সুবিরাট এক হিমালয় ঈগলের রূপ ধরে। মাশা নত মুখে তার দ্বিধার কথা, মনোকষ্টের কথা বলত। ঈগল বলত, “করুণা করো, করুণা করো বিয়াঙ্কাকে! যেমন করে এসেছ।”

“সাবম!”

“কও মা!”

“আচ্ছা, হতে পারে না আপনার জিনাত আপার কথাগুলো আসলে আপনারই কথা? তিনি কিছু বলেননি। আসলে আপনি নিজেই নিজেকে বলেছেন?”

মাশা প্রশ্নটা সেদিন, যেদিন আনন্দ জানালেন সরকারি প্রস্তাবটা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। মনের বাড়ি, জিনাত আপার কথাগুলো বলে আনন্দ তখন থেমেছেন। ওদের নীরবতার সুযোগে একটা কাঠঠোকরা ঠোঁট ঠুকছিল কোথাও।

শুনে আনন্দ সাবম বলেছিলেন, “তুমি তোমার বাপ-মায়ের যোগ্য সন্তান। হ, ঠিকই কইসো। জিনাত আপার মূর্তিটা একটা আড়াল। সেই মূর্তির আড়ালে আসলে আমিই তো কথা কই। কিন্তুÑ”

কাঠঠোকরাটাও বুঝি অপেক্ষা করছিল উত্তরের।

“সেই আমি, আর এই আমি, এক মানুষ না।”

আনন্দের সব কথা মাশা সেদিন বুঝতে পারেনি, কিন্তু তার অবচেতন সব টুকে রেখেছিল।

তায়কোয়ান্দোর নয় গ্রেড শেষে মাশাদের ছ’জন ব্ল্যাকবেল্ট পাওয়ার পর আনন্দ উদযাপনের দিন সাবম বিদায় নিয়েছিলেন।

মাশা তখন পাঁচ থেকে শূন্য গোনামাত্র, মনের বাড়িতে আবিভর্‚ত হয়ে তার হিমালয় ঈগলের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে পারত। এর আরো এক বছর পর, মাশা চাওয়ামাত্র মনের বাড়িতে পৌঁছে যেতে পারত। এবং তার মানসগুরু হিমালয় ঈগল সচেতনে কি অবচেতনে সর্বক্ষণ থাকত তার সঙ্গে। 

“কেউ যখন তোমারে মারে,” বিদায়ী আলাপে বলছিলেন আনন্দ সাবম, “সে তোমার চেয়ে ছোট বইলাই তোমারে মারে। বড়রা মারে না।”

যে ছোট, তাকে পাল্টা মার মারলে কোনো ভবিষ্যত নেই। বড়কে মারা সহজ। কারণ সেখানে আঘাতের তীব্রতা যাচাইয়ের দরকারটা কম। ছোটকে মারা শক্ত। সেখানে অনুতাপ ঠেকাতে মারের তীব্রতার জটিল হিসাব কষতে হয়। মারমুখো সেই ছোটকে ঠেকানো কাজটা ভালোবাসার সাথে করতে হবে।

“তাইলে তুমি বড়!”

যে মারতে এসেছে, তাকে ভালোবাসা নয়। বরং তাকে না-মারাটাকে ভালোবাসা। যে মারতে এসেছে, তাকে ভালোবাসতেই হবে এমন না। তাকে অপছন্দ থেকে শুরু করে ঘৃণাও করা যেতে পারে। শুধু, তাকে না-মারাটাকে তোমার ভালোবাসতে হবে। এই ভালোবাসা ছোটকে বড় হওয়ার সুযোগ দেয়।

“যদি সে তোমার হাতে বড় হয়, তোমার সে চিরমিত্র হয়ে যাবে।”

আনন্দ সাবম যখন ডায়াজ থেকে নেমে আসছিলেন, বিয়াঙ্কা মাশাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেছিল।

একদিন মাশার পাঁজর ভেঙে দিতে চাইত যে বিয়াঙ্কা।

-০-

Series Navigation<< উপন্যাস । পার্পল সন্ধ্যা । হামিম কামাল । ১ম খণ্ড, অধ্যায় ৪ + ২য় খণ্ড , মাশা : বৃহস্পতিবার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *