উপন্যাস । পার্পল সন্ধ্যা । হামিম কামাল । ১ম খণ্ড, অধ্যায় ৪ + ২য় খণ্ড , মাশা : বৃহস্পতিবার

অধ্যায় ৪

“যাবেন? আরামবাগ।”

রিকশাওয়ালা যাবে। মাশা উঠে বসল। কে জানে কেন, শরীরে যেন আনন্দ নিঃসরণ হচ্ছে আপনাতেই। কেন? হাসি পাচ্ছে থেকে থেকে। কেন রে? যখন কথা বলছিল সাহসের সঙ্গে, কয়েকবারই হার্ট তার বিট মিস করেছে পুরনো দিনের মতো। যখন বলল, “যতটুকু জানিয়েছ”, তখন বিশেষ করে। সাহসের চোখে অনুতাপ ছিল, তাই দেখে বোধয় মাশার ভেতরের কোনো কষ্ট তার স্বীকৃতি পেল।

কষ্ট স্বীকৃতি পেলে বহন সহজ হয়। মনে হয় সব যদি ঠিক নাও হয় তবু আমি একা না। অবচেতনে এই বোধ আসায় হয়ত এমন হালকা লাগছে, হাসি হাসি লাগছে। অতিকষ্ট থেকেও নাকি হয় এমন। কিন্তু কষ্ট কোথায়? মাঝখানের অনেকগুলো দিনে তো সবাই মিলে নিজেদের অনেকখানি বদলে নিয়ে, বদলে অভ্যস্ত হয়ে সুখীই হয়েছে। বোধয় অভ্যস্ত হওয়াই সুখ।

তবে প্রকৃতির নিয়মেই অভ্যস্ততায় কুঠার পড়ে। কারণ সম্পদ অসীম, তবে তা সীমার মাঝে। তাই একজনেরটা ভেঙে আরেকজনকে দেওয়ার নীতি চক্রের রূপ ধরে ঘুরছে, আর সবাইকে তার পরিধির অংশ করেছে। এসবের পেছনে প্রকৃতির বিপুল আয়োজন। আনন্দের যেমন আয়োজন আছে, আঘাতেরও তেমনই। এতো আয়োজন করে যে আঘাত, তা যেন বৃথা না হয়, প্রকৃতি তাই আঘাতের আগে স্থান কমনীয় করে। হারিয়ে যাওয়ার আগে আসে সুন্দরতম দিন। মনই প্রকৃতি। সে আলোর আঁচ পায়, আঁধারের আভাসও। শরীরে যখন অজ্ঞাত আনন্দ হয়, তখন মনের একাংশে ভয় জাগে। তাই ভয়ের রং লাল। উৎসবেরও।

“ঢাল দিয়ে একটু আস্তে নামুন ভাই।” আরামবাগ প্রায় চলে এসেছে। “ভয় করে জায়গাটায়।”

রিকশাওয়ালা পেছনচাকার ব্রেক চেপে ধীরে নামতে থাকল।

দ্বিতীয় খণ্ড

(পেছনের গল্প)

মাশা

বৃহস্পতিবার

মাশা যখন মায়ের পেটে, মা একদিন ওর বাবাকে ডেকে বলল, “মাশুক, তুমি কি একটা রিস্ক নিতে পারবে?”

ঐশী ইচ্ছেটা বলল স্বামীকে। মাশুক প্রথমে ভেবেছিল, ঐশী দুষ্টুমি করছে। কিন্তু পরে তার চোখে প্রতীজ্ঞা দেখে বিমূঢ় হয়ে গেল। তবে মূঢ় হওয়ার সুযোগ ছিল না, কারণ স্ত্রীকে সে জানে। একরোখামো তার ভালোবাসার শক্তির মতোই অসীম। অবশেষে ঐশীর যেমন ইচ্ছে, কক্সবাজারের দরিয়ানগরে এক অরণ্যঘেরা পাহাড়চূড়ায় ক্যাম্বিসের তাঁবুর ভেতর মাশার জন্ম হলো। পাহাড়ের ওপর হলো তাই ও অদ্রি, পাহাড়ের নিচেই ছিল সাগর, তাই ও সাগরিকা। দুইয়ে মিলে অদ্রি সাগরিকা। আর নামের শেষ অংশটি এলো যিশুর মায়ের নাম থেকে। মাশা।

“কী নাম তোমার?”

“মাশা।”

“কিহ, মশা?”

স্কুলে ছেলেমেয়েরা হাসতে হাসতে দূরে সরে যেত। মাশা ধীরে ধীরে শেষ বেঞ্চে গিয়ে বসত।

তাকাত জানালার বাইরে।

একদিন, স্কুলের জানালার বাইরে জুলাই মাসের রোদ। মেঘচাপা রোদ্দুর। প্রকৃতিতে বর্ষা। কালচে ধূসর মেঘ কেটে যখন রোদ আসে, মনে হয় আলো যেন মায়ের আঁচলের ভেতর দিয়ে আসছে। তেমন রোদে বাইরের জগৎটা যেন কবিতা পড়ে সারাক্ষণ। জানালার বাইরে গাছ দেখা যেত, কাছে কাছে দূরে দূরে। একটা গাছ ছিল মাশার বেঞ্চের পাশে জানালার বাইরে। তার পাতা ছোঁয়া যেত, কচি ডাল ধরা যেত। শিরিষ গাছ। জুলাই মাসে শিরিষে ফুল আসত, ঝুঁটির মতো ফুল। ফুলটা অদ্ভুত। একটাই বৃন্তে শত শত রোঁয়া। প্রতিটা রোঁয়ার গোড়ায় সবুজাভ রং, ওপরের দিকে সাদা। ফুলটা দেখলে মনে হতো ও স্বপ্নের ফুল, ভুল করে বাস্তবে ফুটে আছে। মনটা যখন ভালো থাকত, মাশা তার বন্ধুদের দিকে তাকাত, ভালো মন আরো ভালো হয়ে উঠত তখন। মন যখন খারাপ থাকত, তখনো আশ্রয়ের আশায় মাশা তাকাত তার বন্ধুদের দিকে, মনটা হালকা হয়ে উঠত। যারা ওকে মশা বলে কৌতুক করত অবশ্যই তারা ওর বন্ধু ছিল না। যারা দূরে করুণাকাতর মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকত তারাও না। ওর বন্ধু ছিল জানালার বাইরের সেই শিরিষের ফুলগুলো। ওদের দেখে মাশা অন্তরে অদ্ভুত ছায়া অনুভব করত। সেই অনুভূতির ব্যাখ্যা নেই ছোট্ট তার ভেতর ছিল না, কিন্তু তার প্রকাশটুকু ছিল। ফুলগুলোও হাসত তাকে দেখলে।

মাশার স্কুল নজরুল একাডেমি। প্রতি বৃহস্পতিবার সেখানে ইচ্ছেমতো পোশাক পরে আসা যায়। মাশা একটা সাদা রানিফ্রক পরে আসত। আর চুলে সবুজ ফিতা। পায়ে হালকা টিয়ারঙের ছায়া দেওয়া একজোড়া বেলি কেডস। প্রিয় পোশাক পরে আসত বলেই হয়ত এই দিন চুপচাপ মাশা আনন্দে একটু পরপর পা দোলাত। সাধ্যমতো মন দিয়ে শিক্ষকদের কথা শোনার চেষ্টা করত। যখন ছুটি হতো, করিডোরে ছেলেমেয়েরা জড়ো হয়ে নানান কথা বলতে বলতে এগোত। দলে দলে, জোড়ায় জোড়ায়। কেবল মাশা হাঁটত একা। করিডোরটায় খুব বেশি আলো ছিল না।

আলো ছিল দূরে, দরজার কাছে। লম্বা একটা পথ অন্যদের কথা শুনতে শুনতে মাশা এগোত।

কারো আলাপে কখনো অংশ নিতো না।

এমনি এক বৃহস্পতিবার আবীর নামে একটা ছেলে পেছন থেকে পুরনো করে তোলা কথাটা বলে

উঠল, “আরে এই এই মশা! কয় গ্লাস রক্ত খাও প্রতিদিন?”

মাশা তাকাল না।

নীরা নামে একটা মেয়ে, নতুন কান ফুড়িয়েছে তাই কানে নীল সুতো পরা, বলল, “আল্লা,

গাছের সাথে কথা বলে, পাগল! কামড়ে দেবে।”

“ঠিক বলছিস, পাগল!” বলল সানা, নীরার বান্ধবী। “গাছের সাথে কথা বলে। আমিও দেখছি।”

আবীর বলল, “তুমি কি একটা কামড় দেওয়া পাগল? সমাজ মিস বলেন, কামড় দেয়

বন্যপ্রাণি। তুমি কি একটা বন্যপ্রাণি?”

নীরা বলল, “বন্যপ্রাণি! আমাকে খিমচি দিও না প্লিজ!”

মাশার ঠোঁট কাঁপতে থাকল। এমন কেন এরা? হঠাৎ ও ঘুরে দাাঁড়য়ে দৌড়াতে শুরু করল।

আবীর বলল, “আচ্ছা ঠিকাছে বন্যপ্রাণি না, তুমি টারজান, ওকে? মহিলা টারজান।”

কেউ একজন জাপটে ধরল আবীরকে। ভয় পাওয়া গলায় ও বলে উঠল, “আরে, আরে!”

ধস্তাধস্তি। কেউ হিসহিসিয়ে কিছু একটা বলল। উত্তরে আবীর বলল, “আরে টারজান তো

ভালো! আমি ভালো মনেই বলেছি। খোদার কসম!”

মাশা পেছনের শব্দ পেয়েছে, কিন্তু ঘুরে তাকানোর মন ওর ছিল না। এক দৌড়ে টানেলের শেষপ্রান্তে এক বিন্দু আলোর দিকে যেতে থাকল। দৌড় দৌড়! তাকে যত দ্রুত পারে ওই আলোর কাছে পৌঁছাতে হবে। তারপর ইট বিছানো মাঠটা সে খুব দ্রুত পার হয়ে যাবে। শিরিষ গাছের নিচেও ফুল কুড়াতে দাঁড়াবে না। স্কুলের ফটক পেরিয়ে বাইরে সারসার লাল-হলুদ রিকশার একটায় উঠে গিয়ে হুড টেনে দেবে, যেন কেউ ওকে দেখতে না পায়। ওকে বাসায় যেতে হবে, দ্রুত।

বাসায় ফিরে চুপচাপ শুয়ে থাকল মাশা বিছানায়। জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমি মাশা।”

“হ্যাঁ মা, তুমি মাশা।” বলল ঐশী। ওর বইখাতা গুছিয়ে দিতে ঘরে এসেছিল। “কী হয়েছে

মামণি? এমন বলছ যে?”

“কিছু হয়নি।”

ঐশী তাকে ফেরাল নিজের দিকে। চোখ দুটো ফোলা মেয়ের। আজ বৃহস্পতিবার। মেয়েটা অনেক আনন্দ নিয়ে প্রিয় জামা পরে স্কুলে গেছে, বিষাদ নিয়ে ফিরে এসেছে। ঐশী তাকে বুকে টেনে নিলো। ছোট মেয়েটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে ওর নিজের দুঃখ কষ্টের ভুবন।

“বলবি না আমাকে?”

মাশা দুপাশে মাথা নাড়ল।

পরের বৃহস্পতিবার, ক্লাস টিচার রেবেকা মিস বাহুতে শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে বললেন, “আজ

তোমাদের পড়াব না। গল্প করব। তোমরা বলবে, আমি শুনব। কে গল্প বলবে?”

পড়ালেখার ধারাটা এমন যে ওদের শিশুতোষ আচরণগুলো ধীরে চাপা পড়ে গিয়ে একটা কৃত্রিম বড়ত্ব ধীরে ধীরে আরোপ হতে থাকে। সেখান থেকে শিশুদের যথাসম্ভব বের করে আনতে চান রেবেকা। মাঝে মাঝেই এমন গল্পবলা, গান, আবৃতির জন্যে তিনি সময় বের করেন। কেউ কেউ যদি নাচ দেখাতে চায়, ক্লাস ক্যাপ্টেনসহ ডায়াজের টেবিল নামিয়ে এনে তাকে জায়গা করে দেন। আশাপাশের ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আসা যাওয়ার ফাঁকে যাতে উঁকি মেরে বিব্রত করতে না পারে তাই দরজা বন্ধ করে দেন। তবে তাতে আড়াল তৈরি হয় নামমাত্র, কারণ জানালাগুলো খোলাই থাকে, আর কোনো কোনো শিক্ষক পর্যন্ত সেই জানালা দিয়ে তাকিয়ে দাঁত বার করে হাসতে থাকে।

সবকিছুর ভেতর গল্প বলাটাই সবচেয়ে কঠিন। ক্লাসে আবৃতিটা আর কারো কবিতা দিয়ে করা যায়, গানটা কারো বেঁধে দেওয়া কথা আর সুরে গাওয়া যায়, শেখানো মুদ্রায় নাচা যায় নাচটাও। তবে গল্পে বিপদ, কারণ গল্পটা বলতে হয় বানিয়ে বানিয়ে, রেবেকা মিসের নিয়ম। গল্প বলার পর্বটা তাই সচরাচর আসে না। যথারীতি কেউ হাত তুলল না বলে শেষ বেঞ্চের শেষ কোণে বসা মেয়েটির দিকে রেবেকাই আঙুল তুলল।

“মাশা! তুমি এসো মা!” মাশা চমকে তাকাল। রেবেকা বলল, “তুমি সবচেয়ে চুপচাপ। তুমিই এসো।”

সবাই লুকিয়ে হাসি চাপল, কানে মুখে কথা বলতে থাকল। বেঞ্চের মাঝখানে গলিপথ ধরে নতমুখে এড়িয়ে ধীরে ধীরে ডায়াজে উঠে দাঁড়াল মাশা। কী নিয়ে গল্প বলবে মাশা? বড় মামার কাছে মা ওর জন্ম হওয়ার আর নাম রাখার গল্পটা করছিলেন গত শুক্রবার। গল্প দুটো মাশা জানত, কিন্তু সেদিন নতুন করে শুনে আরো ভালো লাগল। যতবার শোনে, কোনো কারণে গল্পটা ততবার আগের চেয়ে প্রিয় মনে হয়। মাশা কি ওটাই বলবে? তাতে সমূহ সম্ভাবনা আছে ওর অপ্রস্তুত হওয়ার। এতোদিন তাকেই শুধু পাগল-পাগল শুনে আসতে হয়েছে। এমনও হতে পারে এবার ওর বাবা-মাকে সহ পাগল বলবে সবাই। তাহলে মাশা সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাবে।

রেবেকা বলল, “ভয় নেই মা, বলো? পারবে।”

“মিস!”

“জি?”

রেবেকা এগিয়ে গিয়ে ওর কানে কানে বলল, “এমন একটা গল্প বলো যেটা তুমি যতবার শোনো

ততবার ভালো লাগে!”

“যদি সবাই হাসে?”

রেবেকা সবার দিকে একবার তাকাল। এ ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মেয়েটা লাজুক। এবং যতটা শুনেছে রেবেকা, তাতে মনে হয়েছে ক্লাসের বাইরে মেয়েটাকে ওর নাম আর কিছু সরল আচরণের কারণে যথেষ্ট উত্ত্যক্তের স্বীকার হতে হয়। কোনো কারণে এই মেয়েটিকে অন্য শিশুরা আলাদা করে দিয়েছে। এমন তিনি আগেও দেখেছেন। মেয়েটির দুর্ভাগ্য বলতে হবে। এমন অন্তত একজনকে প্রয়োজন ছিল ক্লাসে যে মেয়েটির হয়ে লড়বে। কিন্তু কারো মুখ দেখে রেবেকার তেমন ভরসা হলো না। শিশুরা প্রাকৃতিক শক্তির অকপট প্রকাশ। এ কারণেই বোধয় তাদের ভেতর থেকে অকপট নিষ্ঠুরতাও সহজে বেরিয়ে আসতে পারে। বড় হতে হতে সেসব আড়ালে চলে যায়।

মেয়েটাকে এমন একটা কিছু বলা দরকার, যেটা আজীবনের জন্যে তাকে আঁকড়ে থাকার একটা অবলম্বন দেবে। রেবেকা বলল, “হাসলে হাসবে। অন্তত তুমি তো জানবে যে তুমি হাসির কিছু বলোনি।” মাশা বলল, “আমি যে গল্পটা বলব, সেটা আমার জন্মের গল্প। আমি যেভাবে হয়েছিলাম। বাসায় আমি অনেকবার শুনেছি। গল্পটা আমার খুব প্রিয়। তাই বলছি। আরেকটা গল্প বলব। সেটাও এটার সাথেই। আমার নাম রাখার গল্প। এটাও আমার খুব পছন্দের গল্প।” চাপা হাসির একটা ঢেউ থেকে থেকে বয়ে যাচ্ছিল। রেবেকার কঠিন চোখ মুখের সামনে ধীরে ধীরে সেটা স্তিমিত হয়ে এলো।

মাশা বলল, “মিস, একটু পানি খাব।”

“নিশ্চয়ই!”

তাকে পানি দেওয়া হলো।

মাশার জন্মের দিনের সকাল। সূর্য উঠেছে, কিন্তু চোখে পড়ছে না। পূর্বদিকে ঘন অরণ্য। কাঠবাদাম গাছের মতো এক ধরনের গাছ চোখে পড়ে, স্তরে স্তরে সাজানো শাখা। সেগুলোর পীতসবুজ একেকটা পাতা দিয়ে গায়ে বাতাস করা যাবে। শিরিষ জাতীয় দানবাকার সব বৃক্ষ বাবা মায়ের মতো ঘিরে আছে। সবুজের কত স্তর! গাছের গোড়ায় গোড়ায় চেনাঅচেনা ঝোপঝাড়, সাদা আর হলুদ ছোট ছোট ফুলে ছাওয়া। বাতাসে তাদের বুনো গন্ধ। ছোট ছোট সাদা প্রজাপতি ফুলে ফুলে উড়ছে। এখানে ওখানে ঝোপাল হয়ে আছে ঘন সবুজ এক ধরনের ঘাস। একেকটা পাতা হাত তিনেক করে লম্বা। পাহাড়ের কিনারের অংশটায় বনদুর্বা আর শেয়াললেজা ঘাসের মাদুর হালকা হয়ে এসেছে। তার ওপরই কাছাকাছি পাতা দুটো রুপালি তাঁবু। তাঁবুর ওপারে পশ্চিমে কিছুদূর এগিয়ে সেইসব বড় বড় ঘাসের বেড়ার পর আচমকা পাহাড় শেষ। বহু নিচে সমুদ্রসৈকত, ফেনায়িত বঙ্গোপসাগর। সাগরের ওপর সকালের সৌম্য আলো।

মাশুক স্টোভ জ্বালিয়ে চা করছিল। ঐশী দেখছিল পাশে বসে। হঠাৎ তার তলপেটে একটা সূক্ষ্ম ব্যথা শিনশিন করে উঠল। ঐশী প্রথমে বলেনি মাশুককে। ব্যথাটা ঘুরে ঘুরে আসতে থাকল এবং প্রতিবার দ্বিগুণ ত্রিগুণ হয়ে বেড়ে উঠতে থাকল। না বলে আর পারল না। এই কি সেই বহুবার শোনা মুহূর্ত? পেটে হাত রেখে ঐশী বলল, “মাশুক, “ও আসছে!”

আরেকটা তাঁবুকে থাকে তিনজন সেবিকা। কমবয়েসী দুজন, একজন বয়স্কা। বয়স্কা ভদ্রমহিলার নাম আফলাতুন নিসা, অর্থাৎ মহিলা প্লেটো। সবসময় সাদা জামদানি শাড়ি আর মাঝখানে টানটান সিঁথিতে বেশ পরিপাটি হয়ে থাকেন। পিজির গাইনোকোলজির হেডনার্স হিসেবে সুনামের সঙ্গে অবসর নিয়েছিলেন। মাশুক তাকে আপা বলে ডেকেছে। সেই সকালে উদ্বিগ্ন কণ্ঠের “আপা!” ডাক শুনে মিস সিদ্দিকা হুড়োতাড়া করে তাঁবুতে ঢুকলেন।

“হুমায়রা, নন্দিতা, ওঠো, ফর গড’স সেইক!”

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ডাক্তার লাকিং মে চাকমা, একজন হেডসহ দুজন সাবর্ডিনেট নার্স, আর সীমা নামে একজন পরিচারিকা, ব্যস। মাস্টার, সারেং, সুকানি ও যন্ত্রীর এই ছোট দলটি নিয়ে প্রসবপ্রক্রিয়ার উত্তাল সমুদ্র মাশুকের হাত শক্ত করে ধরে পাড়ি দিলো ঐশী। ওই বিশেষ পাহাড়টি শুধু নয়, দরিয়ানগরের কোনো পাহাড়ে কোনো নাগরিক দম্পতি শেষ কবে কোনো শিশুর পিতামাতা হয়েছিল জানে না কেউ। নিরুৎসাহিত করার পক্ষে যথেষ্ট বৈপ্লবিক এ ঘটনা সংবাদপত্রেও ছাপা হতে দেয়নি প্রশাসন। হয়ত সেই প্রথম, সেই শেষ।

“পাহাড়ের ওপর হলো তাই অদ্রি। নিচেই ছিল সাগর, তাই সাগরিকা।” নবজাতককে ঐশীর পাশে শুইয়ে দিতে দিতে মাশুক ঐশীর কথাটাই বলল। ফ্যাকাসে ঠোঁটে হাসল ঐশী, ক্লান্ত চোখের কোণে জল। ফিসফিস করে বলল, “অদ্রি সাগরিকা!”

নন্দিতা আর হুমায়রার সে রাতে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। পাহাড়ের রাত। নিস্তব্ধ, আদিম। টানা সতের ঘণ্টা নবজাতক নিয়ে ব্যস্ততার পর দুজন খানিক অবসর পেয়েছে। তাঁবু থেকে অনেকটা দূরে এসে নন্দিতা একটা সিগারেট ধরাল। ক্যাসেল। হঠাৎ একটা ঠক শব্দ! যেন পাথরের গায়ে কেউ পাথর ঠুকেছে। হুমায়রা বলে উঠল, “নন্দি!” নন্দিতাও আর দেরি করল না, সিগারেট মাটিতে ফেলে নিভিয়ে দিলো সঙ্গে সঙ্গে। আফলাতুন মিস তাঁবুতে খানিকক্ষণ হলো পিঠ রেখেছেন। এখনই উঠে আসার কথা নয়। উঠেও যদি থাকেন, তাদের পেছন পেছন এসেছেন এমন কখনো হয়নি। তাহলে কোনো কারণে কি মাশুক? ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল দুজন। কেউ নেই।

এমন সময় শব্দটা আবার হলো। আরো স্পষ্ট। মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকাতেই চমকে উঠল দুজন। প্রায় চৌদ্দ হাত শুভ্র শাড়ি জড়ানো খোলা চুলের এক কিশোরী তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার ত্বক থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে উজ্জ্বল ফিরোজা আলো। কিশোরী যেন আলোর তৈরি। মুখটা পাহাড়ি কোনো জাতির নয়, ঠিক বাঙালিরও নয়। মিহি কণ্ঠে নিখুঁত বাংলায় মেয়েটি বলল “এখান থেকে একটা আলোর রাধা উঠেছে।”

“জি?”

নন্দিতা তার দাদার বৈষ্ণব-সনাতনী ধারার সূত্রে জানে ধারা যেমন আছে, তেমনই আছে রাধা। ধারা যা ওপর থেকে নিচে নামে। আর রাধা যা নিচ থেকে ওপরে যায়। বিস্ময়, এই আলোর কিশোরী সেই আপ্তজ্ঞান ব্যবহার করছে। মহাভারতবর্ষে এমন চেহারা আছে। এর কোনো ভারতীয় উত্তরাধিকার না থেকে যায় না। কিন্তু এমন সময়ে, এমন পরিবেশে এটা কিসের নিদর্শন। কিশোরী আবারও বলল-

“একটা আলোর রাধা। শুভ্র। দেখতে এলাম। তোমরা কারা?”

মেয়েটির কণ্ঠে আন্তরিক কৌতূহল। হুমায়রা একবার কেঁপে উঠে লুটিয়ে পড়ে যেতে থাকল। শেষ মুহূর্তে তাকে আঁকড়ে ধরল নন্দিতা। ভয়বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল কিশোরীর দিকে। কিশোরীর মুখে গভীর ব্যথা ফুটে উঠল। “আমাকে ভয় কোরো না, ঈশ্বরের দোহাই!” নন্দিতা হুমায়রার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল চোখ দুটো খোলা। হুমায়রার জ্ঞান পরমুহূর্তে ফিরে এসেছে। তাকিয়ে আবারও আলোর কিশোরীকে দেখে মেয়েটা নন্দিতাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। কিশোরী আবারও অনুনয় করে বলল, “আমায় ভয় কোরো না ঈশ্বরের দোহাই! “কে আপনি?” কী করে নন্দিতার কণ্ঠ থেকে কথা বেরিয়ে পড়ল নিজেও খেই পেল না। তার স্নায়ু এতোখানি দৃঢ় তা এই পরিবেশে না পড়লে হয়ত কোনোদিন জানা হতো না। কিশোরী বলল, “আমি মরিয়ম।”

নন্দিতা বলল, “হ্যাঁ, এখানে একটা বাচ্চা হয়েছে। এটা মেয়ে।”

“আমি জানি।”

মরিয়ম আঙুল তুলে দূরে তাঁবু দেখাল। দূরে আলো জ্বলছে একটা বাঁশের তেপায়ায়, দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল। “ আশ্চর্য, খুবই আশ্চর্য শিশু।” হুমায়রা উঠে দাঁড়িয়েছে। নন্দিতা দাঁড়িয়েছে তার আগেই। সে সনাতনী মেয়ে। প্রকৃতির বিস্ময়বাদে তার প্রণতির ধারা আদিম। নন্দিতা হাত জোড় করল। কিশোরীর চোখ দুটো হাসতে থাকল। নন্দিতা বলল, “বাচ্চাটার জন্য আশীর্বাদ করবেন।”

“তুমি ওর কে হও?”

“আমি নার্স। এখানে ডিউটি করছি। কেউ হই না।”

“ভালো মেয়ে তুমি। বড় ভালো মেয়ে। তোমার ভালো হোক।” কিশোরী চোখ বুজল। “শিশুটির

ভালো হোক।”

“ধন্যবাদ!”

নন্দিতা বলল, “মা আপনার নাম?” বলেই লজ্জিত হলো। “ওহ!”

মেয়েটি আবারও বলল, “মরিয়ম আমার নাম। তুমি মেরি ডাকতে পারো, মেরিজা ডাকতে পারো, বা মাশা। মাশা ডাকটা আদরের। যদি কেউ আদর করে ডাকে, আমি ধন্য হই।” বৃদ্ধার সাদা শাড়ির পাড়জুড়ে ফিরোজা আলোর দীপন হঠাৎ বেড়ে গেল। চোখ বন্ধ করল দুজন। চোখ খুলে দেখে কেউ নেই। হুমায়রা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল অন্ধকারে, যেন ভূমিষ্ট হয়েছে। নন্দিতা বলল, “এই বাবা অন্যরকম আমি আগেই বুঝেছিলাম। কিন্তু এই শিশু তারচেয়ে বেশি কিছু।”

হুমায়রা বিড়বিড় করছে, “মরিয়াম। মেরিজা। মাশা। মেরিজা। মরিয়ম।”

ধাতস্থ হওয়ার পর দুজন তাঁবুতে ফিরে গিয়ে সমস্ত বলল। বলতে বলতে নন্দিতা অকারণেই কেঁদে ফেলল। হুমায়রার চোখে প্রশ্ন নিয়ে জড়িয়ে ধরল বন্ধুকে। “কাঁদছ কেন, আরে!” ঐশী বলল, “কাঁদছ কেন! নন্দিতা!” নন্দিতা কোনো জবাব দিতে পারল না। কাঁদতেই থাকল। কেন কাঁদছে সে নিজেও কি জানে। এতো অকারণ কান্না বুকে আটকে ছিল, এ তার জন্যে বিস্ময়ের।

পরদিন সকালে প্রথমবারের মতো তাঁবু থেকে বের হয়েছে ঐশী। কোলে নবাগতা শিশু। পাহাড়ি পাখির নাচ, বাতাসের সুর, মানুষের কথা, সাগরের গর্জন প্রথমবারের মতো শিশুর ইন্দ্রিয় অনুরণিত করল। ঐশী অনেকটা সুস্থ বোধ করছে। শরীরের শক্তি দ্রুত ফিরে এসেছে। আফলাতুন নেসা বলেছেন, “দশমাসের নির্ঘুম কিন্তু একরাতের ঘুমে সেরে উঠলেন। সন্তানের এমনই শক্তি।”

এক বাকশো ডার্ক চকোলেট নিয়ে এলো কক্সবাজার সদর থানার অপারেশন ইন চার্জ মুনীর উল পিয়াস। শিশুর মুখ দেখে জোর করে আরো একশ টাকা মুখদেখা-সম্মানি দিয়ে বলল, “কিছু মনে করবেন না স্যার, আমি ক্যামেরা নিয়ে এসেছি। আপনাদের একটা ছবি তুলতে চাই স্যার। এমন অবাক পরিবার আর কখনো দেখব কিনা আল্লা জানে। আপনাদের দেখা পেয়েছি খোদার হুকুম স্যার।”

“ছি ছি, এভাবে বলবেন না।”

ছবি তোলা হলো।

“আপনারা যতক্ষণ কক্সবাজার আছেন স্যার, দায়িত্ব আমার। অপারেশন ইন চার্জ এখন এই মুনীর উল পিয়াস। এখন আর আগের মতো হবে না স্যার।”

আগে কী হয়েছিল তা অবশ্য কারো জানা নেই।

“ইলিয়াস স্যারকে বলবেন স্যার, তিনি যেন আমাকে একটু সুনজরে রাখেন।”

ইলিয়াস মাশুকের বন্ধু। কক্সবাজার জেলা আদালতের অতিরিক্ত দায়রা জজ। ঐশী বলল, “আমি আমার মেয়ের নাম ঘোষণা করতে চাই।” “নাম ঠিক করে ফেলেছেন দিদি?” অবাক লাকিং মে চাকমা। সকালে ডিউটিতে যাওয়ার আগে গাড়ি থামিয়ে পাহাড় বেয়ে একবার দেখে যাওয়ার কষ্টটুকু স্বীকার করেছেন। বলেছেন আমি পাহাড়ি মেয়ে, পাহাড় বাওয়ায় আমার কষ্ট নেই।

ঐশী হেসে মাথা দোলাল। অদ্রি সাগরিকা- নাম ঘোষিত হলো। একদফা করতালি। ঐশী বলল, “এবার ডাক নাম। ডাক নাম নিয়েই আমাদের বেশি উত্তেজনা ছিল। কারণ এই নামটাই শিশু সারাজীবন সবচেয়ে বেশি শোনে, তাই না? তার ব্যক্তিত্ব অনেকটাই এ নামটা গড়ে দেয়। আমার তাই মনে হয়। তো, মাশুক বলো- ”

মাশুক হেসে বলল, “আর এই ডাক নামটা আমরা পেয়েছি নন্দিতার কাছ থেকে।”

নন্দিতার বড় চোখ আরো বড় হয়ে গেল। “মানে স্যার? কী রকম?”

মাশুক বলল, “আমি রাশিয়ার উপন্যাসের পোকা ছোটবেলা থেকে। রাদুগার বই আমার নিত্য সহচর। মাফ করবেন, আমি পড়ার গৌরব করছি না, আসলে এটা এমন একটা ভূমিকা যেটা না দিয়ে উপায় নেই। আমি হয়ত পরে বোঝাতে পারব।” ওসি বলল, “আপনি বলেন স্যার, প্লিজ।”

মাশুক ঐশীর দিকে তাকাল। মেয়ের দিকে তাকাল।

ডা. লাকিং মে চাকমা বললেন, “আরে আমাদের যে হার্টবিট উঠিয়ে দিচ্ছেন! বলেন না!”

ঐশী বলল, “আর কথা না বাড়িয়ে বলে দিই। ডাক নাম রাখছি মাশা।”

“মাশা!” উচ্চারণ করল সবাই; “বাহ, সুন্দর নাম!”

“দারুণ নাম!”

“চমৎকার স্যার!”

ঐশী বলল, “যে কারণে এতো ভূমিকা মাশুকের, তা হলো মাশা নামটা ‘মরিয়ম’ নামের ছোট রুশ সংস্করণ। মাশা নামটা ওর রুশ উপন্যাসে বোধয় বহুবার পেয়েছে। আমি রুশ উপন্যাস তত পড়িনি, আমার জানা নেই।”

ওসি বলল, “মাফ করবেন স্যার, মেরিজা কে?”

ঐশী বলল, “মেরিজা হলেন মা মেরি বা মরিয়ম।”

“ওহ!” ওসি আকাশ থেকে পড়লেন। “তাই বলেন ম্যাম!”

ঐশী বলল, “আর এ নামটা পাওয়ার জন্য নন্দিতা আর হুমায়রার কাছে কৃতজ্ঞ। তবে বিশেষ করে নন্দিতার কাছে। আশা করি হুমায়রা অনুমতি দেবেন।”

“জি ম্যাডাম!” বলল হুমায়রা।

ওসি বললেন, “কোনো ঘোরাল কেস আছে মনে হচ্ছে স্যার।”

“ওর নাম দাঁড়াচ্ছে অদ্রি সাগরিকা মাশা। কেমন লাগছে?”

“খুব সুন্দর!”

“ভীষণ!”

আফলাতুন নেসা বলল, “আমার একটা বিশেষ কারণে বেশি ভালো লেগেছে নামটা, ম্যাডাম।”

“আমাকে নাম ধরে ডাকলে খুশি হবো আপা,” ঐশী বলল। “আপনি আমার মায়ের বয়েসী।”

“আসলে-”

“বিশেষ কারণটা কী আপা?” বলল মাশুক।

“আমার নামটা গ্রিক। গ্রিক থেকে ঘুরিয়ে আরবির দিকে নিয়ে রেখেছিলেন বাবা। এখানে মাশা নামটাও যেন তেমনই।”

ঐশী বলল, “হ্যাঁ আপা, এটা তেমনই হিব্রু থেকে এক পাক ঘুরেছে।”

ওসি বলল, “আরবি হয় নাই অবশ্য, ম্যাম। তাতে সমস্যা নাই।”

ঐশী হাসল। ওসি বলল, “আর অদ্রি সাগর, না?”

“অদ্রি সাগরিকা-”

“অদ্রি সাগরিকা। বাংলা নাম ভালো লাগে। আমার মায়ের নাম ছিল আহ্লাদি বেওয়া। সুন্দর নাম না?”

“অনেক সুন্দর নাম।”

“সুন্দর নাম আবার মজারও আছে। আহ্লাদী। ম্যাম ঠিকই বলছেন। ডাকনামের প্রভাব। আমার মা-র মতো হাসিখুশি মহিলা আজো দেখি নাই। সতিকারের হাসিখুশি” ওসি হাসল।

“তিনি কেমন আছেন?” বলল ঐশী।

ওসি বলল, “এক মা যায়, আরেক মা আসে ম্যাম। অদ্রি সাগর মায়ের জন্যে দোয়া। আমাদের

মাশা মা।”

ওসির আলাপে একটা সাময়িক কষ্টের ছায়া নামল। তবে তিনিই সেটাকে নানান হাসিঠাট্টায় চাঙা করে তুললেন। গতকালের পর আজ সকালে আবারো মিষ্টি আনানো হয়েছিল। কাঁচাগোল্লা আর পোড়া চমচম। ওসি মুখভরাট চমচম খেতে খেতে মিষ্টি নিয়ে তার ছেলেবেলার স্মৃতি বললেন। কী করে আমতলী বাজার থেকে পোড়া চমচম মিষ্টি কিনে দিয়ে বাবা তাকে বাড়ি পাঠিয়েছিল। যখন বাড়িতে পৌঁছায় আর দুটো চমচম বাকি ছিল।

ওসি আর আসেননি, কিন্তু সেদিনের পর থেকে দুজন পুলিশ নিজেদের ভেতর গল্প করতে করতে পাহারা দিয়ে গেল। দু’দিন পর প্রশাসনে বলে কয়ে ওদের ফেরৎ পাঠাল মাশুক। চতুর্থদিন বিকালে ঢাকার পথে রওনা হওয়ার আগের রাত পর্যন্ত ঐশী সেই আলোর তৈরি কিশোরীর জন্যে অপেক্ষা করে গেছে। শিশু জন্মালে অনেক অন্ধ সংস্কারে পায় মায়েদের, কিছুকালের জন্য। মেয়ের মাথার কাছে ইস্পাতের চাবি আর দিয়াশলাইয়ের বাকশো রাখত।

কেউ না কেউ সারাক্ষণ মাশার কাছে থাকলেও, মেয়েকে কাছছাড়া করে বেশিক্ষণ বাইরে থাকত না। মাশাকে তাঁবুর বাইরে আনলেও তিন গজের বাইরে নিতো না। তটস্থ থাকত সর্বক্ষণ। তটস্থতার ভেতরই নন্দিতার মুখে শোনা সেই আলোকিত মাশার জন্যে তার অপেক্ষা মুহূর্তের জন্যেও তীব্রতা হারাত না। নয় বছরের মেয়ের শব্দভাণ্ডার তার বারো বছরের ভীষণ পড়–য়া ছেলের মতো, শুনতে শুনতে এ কথাই ভাবছিল রেবেকা। কয়েকবার মাশা আটকেছে, শব্দ বদলছে, গল্প আগপিছ করে ফেলেছে, তবু শুরু থেকে শেষটা ভীষণ নিবেদনের সঙ্গে বলে গিয়ে তার মনে কিছু জটিল ছবির জন্ম দিতে যে পেরেছে মেয়েটা, তাতে সন্দেহ নেই। পড়াশোনায় মোটামুটি হলেও মাশা মেয়েটা বিশেষ- রেবেকার এমন একটা অনুমান ছিল। কিন্তু সেই অনুমানকে মাশা ছাপিয়ে গেল। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে রেবেকা প্রথম তালিটা বাজাল। তার সেই উদযাপন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল গোটা ক্লাসে। বাহুতে আঁচল পেঁচিয়ে যে বিশেষ ভঙ্গিতে রেবেকা হাঁটে, তেমনি হেঁটে গিয়ে ডায়াজে উঠে মাশাকে জড়িয়ে ধরল। করতালি বেড়ে গেল বহুগুণে। জানালায় জড়ো হওয়া অন্য ক্লাসের মুখগুলো তার চোখে পড়ল এই প্রথম। তারাও তালি দিচ্ছে। এমনকি ক্লাস ফাইভের বিজ্ঞান শিক্ষক ফিরোজও সেখানে আছেন। রেবেকা বলল “তুমি এতো সুন্দর গল্প বলো মা? কার কাছে শিখেছ?

” মাশা তাকিয়ে রইল। উত্তর দেবে কী, ক্লাসের করতালি দেখে তার বুকের ভেতর মাসাইদের ড্রাম বাজছে। তাছাড়া আদতে “সুন্দর” করে কিছু বলেছে কিনা তার সন্দেহ আছে। গল্পটা বলার সময় সে প্রাণপণে চেষ্টা করছিল মায়ের মতো করে বলতে, এবং বলাই বাহুল্য, পারেনি। মা যে কত সুন্দর করে বলেন, তা যদি রেবেকা মিস জানতেন! রেবেকা ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি জানতাম না তোমাদের এতো ভালো, এতো গুণী একজন বন্ধু আছে।”

মাশা তার সহপাঠীদের ক্ষমা করে দিয়েছে। আর ক্লাস-সন্তানদের ওপর প্রবল বাৎসল্যবোধে গলা বুজে আছে রেবেকার। করতালি ধীরে ধীরে স্তিমিত হলো। এমন সময়ে কে যেন বলে উঠল, “ম্যাডাম, ও কিন্তু পাগল। গাছের সাথে কথা বলে।”

“কে? কে বললে এ কথা?”

কেউ সাড়া দিলো না।

রেবেকা বলল, “এসব খুব খারাপ কথা। ও তোমাদের অন্যরকম ভালো একজন বন্ধু। এমন বলতে পারলে? তোমরা ওর যত্ন করবে। আর কখনো এমন কথা বলবে না। বললে আমি একদম সহ্য করব না।”

কথাগুলো সবার দিকে গেছে। রেবেকা অনুভব করল এমন কিছু ওদের বলতে হবে এ মুহূর্তে, যাতে ওরা এমন ভাবার অবকাশ না পায় যে মিস ওদের খল ভেবেছেন। “তোমরা এমন আর বলবে না আমি জানি। আমি তোমাদের বিশ্বাস করলাম। তোমরা ওর ভালো বন্ধু হবে।”

আরো কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু স্থিতির কোথাও যেন একটা বড় ধাক্কা এসেছে। সেদিনের মতো সবুজ হাজিরা খাদা, হলুদ স্কেল, সাদা চক, এলোচুলের মতো দেখতে ডাস্টার, সব গুছিয়ে রেবেকা মিস আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল। তার পায়ের শব্দটা করিডোরে হারিয়ে যেতেই বাচ্চারা নিজেদের জগতে ফিরে এলো। একটা লব্ধি শোরগোল বাড়তে থাকল ক্লাসে। মাশা তার জায়গায় গিয়ে বসল। তাকিয়ে রইল শিরিষ গাছের ফুলগুলোর দিকে। ওর একমাত্র বন্ধু।

Series Navigation<< উপন্যাস।।পার্পল সন্ধ্যা।। হামিম কামাল।। পর্ব তিনপার্পল সন্ধ্যা : হামিম কামাল ।। ২য় খণ্ড :: মাশা : তায়কোয়ান্দো ক্লাস >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *